Thread Rating:
  • 6 Vote(s) - 3 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
WRITER'S SPECIAL অরণ্যের গোপন আদিমতা
#14
সপ্তম অধ্যায়: নিয়তির সুতো

শহরের এক প্রান্তে যখন উচ্চবিত্তের চার দেওয়ালে ঘেরা ড্রইংরুমে এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ও নীরব যুদ্ধ চলছে, ঠিক তখনই অন্য প্রান্তে এক প্রবল জীবনসংগ্রামের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে। বুড়িগঙ্গার কালো, কুচকুচে এবং পচা জলের ওপর ভোরের ঘন কুয়াশা আর লঞ্চের ইঞ্জিন থেকে নির্গত পোড়া মবিলের ধোঁয়া মিলেমিশে এক নিঃশ্বাসবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছে। সকালের আলো ফোটার আগেই বরিশাল থেকে ছেড়ে আসা বিশাল তিন তলার একখানা ডাবল-ডেকার লঞ্চ এক বিকট, কানফাটানো সাইরেন বাজিয়ে সজোরে এসে ধাক্কা খেল লোহার পন্টুনের গায়ে। সেই ধাক্কায় লোহার নোঙর আর শেকলের ঘর্ষণে এক তীব্র শব্দের জন্ম হলো, আর পন্টুনটা কেঁপে উঠল এক বড় জলোচ্ছ্বাসে।

লঞ্চের নিচের ডেক থেকে তখন পঙ্গপালের মতো নামছিল মানুষ। চর্বিযুক্ত ঘামের গন্ধ, কাঁচা শুঁটকি মাছের আঁশটে ঘ্রাণ, পচা ফলের ঝুড়ি আর হাজারো মানুষের তীব্র চিৎকারে সদরঘাটের বাতাস যেন এক আদিম নরককুণ্ডে রূপ নিয়েছে। কুলিদের মাথায় বিশাল সব বস্তা, হকারদের সস্তা চিল- চিৎকার আর পন্টুনের মোড়ে মোড়ে জমে থাকা পানের পিকে চারপাশটা এক বীভৎস বাস্তব।

সেই চিল-চিৎকার আর বিশৃঙ্খল ভিড়ের আড়াল থেকে এক পা, দু-পা করে পন্টুনের পিচ্ছিল লোহার মেঝেতে এসে দাঁড়াল ফাতেমা। তার পরনে একটা মলিন, চটা ও তালি দেওয়া সস্তা সুতি শাড়ি। শাড়ির আঁচলটা তার বুকের ওপর কোনোমতে জড়ানো, যা গত কয়েকদিনের ধুলোবালি, লঞ্চের ডেকের নোংরা মেঝে আর ইঞ্জিনের কালিতে চটচটে হয়ে গেছে। তার এক হাতে একটা ছেঁড়া প্লাস্টিকের বস্তা, যার ভেতর তার জীবনের যসামান্য অবশিষ্টাংশ—একটা ভাঙা অ্যালুমিনিয়ামের বাটি, মায়ের দেওয়া সেই ছেঁড়া সুতি শাড়ির টুকরো আর একটা ক্ষয়ে যাওয়া প্লাস্টিকের চিরুনি।

ফাতেমার চোখ দুটোর দিকে তাকালে যে কেউ এক সেকেন্ডের জন্য থমকে যাবে। সেই চোখে কোনো জল নেই, কোনো চেনা ভয় নেই; আছে এক অলৌকিক, পাথর হয়ে যাওয়া শূন্যতা। বরিশালের মেঘনা নদীর পাড়ের সেই কালবৈশাখীর রক্তাক্ত রাতের কথা তার মগজের কোষে কোষে এখনো টাটকা হয়ে জ্বলছে। মন্টু মাঝি যখন মদের ঘোরে তার ওপর সেই পশুত্ব চালাতে চেয়েছিল, ফাতেমার ভেতরের অবদমিত বাঘিনীটা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। ঘরের কোণে পড়ে থাকা সেই মরচে ধরা ধারালো বঁটিখানা যখন মন্টুর ঘাড়ে আর পিঠে আছড়ে পড়েছিল, তখন ফাতেমা কোনো মানুষের চিৎকার শোনেনি; সে শুনেছিল একটা পশুর শেষ গোঙানি। মন্টুকে সেই অন্ধকার ঘরের মেঝেতে নিজের রক্তের পুকুরে ছটফট করতে ফেলে রেখেই সে রাতের অন্ধকারে মেঘনার বুক চিরে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া শেষ লঞ্চটার নিচের ডেকে এসে লুকিয়েছিল।

লঞ্চের পুরোটা রাত সে কাটিয়েছে ইঞ্জিনের ঠিক পেছনের নোংরা মেঝের এককোণে, আলুর বস্তার আড়ালে গুটিসুটি মেরে। ইঞ্জিনের বিকট গর্জন আর গরম ভাপ তার গায়ের চামড়া পুড়িয়ে দিচ্ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় আগুন জ্বলছিল তার বুকের ভেতর। মন্টু মাঝি মরেছে নাকি এখনো চরের হাসপাতালে বেঁচে বেঁচে মরছে, ফাতেমা তা জানে না, জানতে চায়ও না। সে শুধু জানে, সে সেই নরক থেকে নিজের সত্ত্বাটাকে ছিঁড়ে নিয়ে পালিয়ে এসেছে।

পন্টুন পার হয়ে ঘাটের কাদা-জল মাখা রাস্তায় দাঁড়াতেই ফাতেমার চারপাশটা কেমন যেন ঘুরতে লাগল। দীর্ঘ তিরিশ ঘণ্টা তার পেটে এক দানা অন্ন পড়েনি। তার ঠোঁট দুটো ফেটে চৌচির হয়ে রক্ত জমছে। ঠিক তখনই তার সামনে এসে দাঁড়াল ঘাটের এক দালাল, নাম তার কলিমুদ্দিন। কলিমুদ্দিনের চোখে এক ধরনের শিকারী চাতুর্য। সে ফাতেমার খসখসে চেহারা, তার তালি দেওয়া শাড়ি, বাম চোখের নিচে থাকা সেই গাঢ় বেগুনি রঙের কালশে দাগটার দিকে তাকাল। ওটা মন্টু মাঝির দেওয়া শেষ লাথির এক অমোঘ স্মৃতিচিহ্ন।

"কী রে খুকী? দেশ থেইকা ভাইগা আইছস বুঝি? লগে কেউ নাই?" কলিমুদ্দিন নিজের মুখের ভেতরের পানের জর্দাটা মাটিতে ফেলে জিজ্ঞেস করল।

ফাতেমা প্রথমে ভয় পেয়ে নিজের প্লাস্টিকের বস্তাটা বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হতে চাইল না। সে শুধু মাথা নেড়ে বোঝাল যে তার কেউ নেই।

কলিমুদ্দিন একটা কুৎসিত কিন্তু আশ্বাসের হাসি হেসে বলল, "ডরাইস না। এই ঢাকা শহরে ডরাইলে মানুষ কুত্তা-বেড়ালের মতো মরে। কাম কাজ করবি? বড় লোকের বাড়ি। গুলশানে। থাহন-খাওন পাবি, লগে কিছু টেকাটুকাও মিলব। তরে যেমন দেখতাছি, তগো বাড়িতে এমন জ্যান্ত কামের মানুষই লাগব। যাবি আমার লগে?"

ফাতেমা আর কিছু ভাবার অবস্থায় ছিল না। এই বিশাল, অচেনা যান্ত্রিক শহরে সে যদি এই দালালের হাত না ধরে, তবে আজ রাতেই হয়তো সদরঘাটের কোনো অন্ধকার গলিতে অন্য কোনো মন্টু মাঝির হিংস্র থাবার নিচে তাকে পড়তে হবে। সে অত্যন্ত নিচু, ভাঙা গলায় বলল, "যামু। আমারে খালি একটু পেটভইরা ভাত আর মাথা গোঁজার ঠাঁই দ্যাওন লাগব। আমি সব কাম করুম।"

ঠিক একই সময়ে, গুলশানের তেরো তলার সেই বিলাসবহুল পেন্টহাউসের বিশাল ইতালিয়ান মার্বেল বসানো ড্রইংরুমে বসে একা একা কফি খাচ্ছিল জোয়া। চারপাশটা বড্ড বেশি নিস্তব্ধ। সেন্ট্রাল এসির সেই একটানা মৃদু যান্ত্রিক শব্দটা জোয়ার মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছিল। আসিফ সকালে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট মিটিংয়ের সিলসিলায় হংকংয়ের ফ্লাইটে চলে গেছে। যাওয়ার আগে সে জোয়াকে এক চিলতে কিস খেয়ে বলে গেছে—"আই উইল বি ব্যাক অন নেক্সট ফ্রাইডে, সুইটহার্ট। এই কয়দিন একটু সাবধানে থেকো, আর হ্যাঁ, বাইরে বেশি ঘোরাঘুরি করার দরকার নেই। আজকাল শহরের পরিবেশ ভালো না।"

জোয়ার মনে হলো, আসিফের কাছে শহরের পরিবেশ কোনোদিনই ভালো থাকে না, যদি না জোয়া তার হাত ধরে বাইরে বের হয়। আসিফ চলে যাওয়ার পর এই বিশাল পেন্টহাউসটা জোয়ার কাছে একটা রাজকীয় মর্গ বলে মনে হচ্ছিল। সে তার দামী সিরামিকের কাপ থেকে কফিতে একটা চুমুক দিল। কফিটা বড্ড তিতো, ঠিক যেমন তার গত পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবন।

দেয়ালে ঝুলছে সেই বিমূর্ত তৈলচিত্র—ধূসর আর কালোর মাঝে সেই রক্তাক্ত লাল বৃত্তটা। জোয়া ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। কাল রাতেও আসিফ তার শোবার ঘরে এসে তার পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে, তার হাসির ডেসিবেল নিয়ে যে মানসিক চাবুক চালিয়েছে, তার দাগগুলো জোয়ার শরীরের কোথাও চামড়ায় দেখা যাবে না; কিন্তু তার আত্মাটা এখন রক্তবমি করছে। সে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের সুদৃশ্য ফুল-স্লিভ নাইটিটার কলারটা একটু নামাল। তার গলার নরম ত্বকে কোনো কালশিটে নেই, কিন্তু সেখানে এক অদৃশ্য ফাঁসের দাগ সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।

হুট করেই পেন্টহাউসের সদর দরজার বেলটা বেজে উঠল। এই অসময়ে কে আসতে পারে? আসিফের কোনো ড্রাইভার নাকি দারোয়ান? জোয়া কফির কাপটা কনসোল টেবিলের ওপর রেখে অলস, ক্লান্ত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

জোয়া দরজার লকটা ঘুরিয়ে যখন ভারী মেহগনি কাঠের দরজাটা খুলল, তখন বাইরের করিডোরের আলোয় সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। দালালের কলিমুদ্দিন সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছে, আর তার ঠিক পেছনে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রান্তিক, চূর্ণ-বিচূর্ণ নারী অবয়ব।

"সালাম খাম্মাজান! এই যে, আফনেরা একটা ভালো, বিশ্বস্ত কাজের বুয়া খুজতাছিলেন না? এই মেয়েডারে বরিশাল থেইকা এক্কেরে লঞ্চঘাট থেইকা লইয়া আইলাম। খুব সোজা-সরল মাইয়া, চরের মানুষ। আপনের ঘরের সব কাম এক্কেরে নিখুঁত কইরা দিব," কলিমুদ্দিন এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফাতেমাকে একটু সামনের দিকে ধাক্কা দিল।

জোয়া কলিমুদ্দিনের কথার দিকে কান দিল না। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল ফাতেমার মুখের ওপর। ফাতেমা তখন ভয়ে, লজ্জায় আর নিজের মলিনতার কারণে মাথাটা একদম নিচু করে রেখেছিল। তার হাতের সেই প্লাস্টিকের ছেঁড়া বস্তাটা সে পায়ের কাছে নামিয়ে রেখেছে।

"তোমার নাম কী?" জোয়া অত্যন্ত নরম, মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করল।

ফাতেমা আস্তে করে মাথাটা তুলল। জোয়ার সেই অভিজাত, সুগন্ধি মাখা চেহারা আর তার পরনের দামী রেশমি পোশাক দেখে ফাতেমা এক সেকেন্ডের জন্য চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, "ফাতেমা... আমারে সবাই ফাতেমাই ডাকে, বুজান।"

ফাতেমা যখন মাথাটা পুরোপুরি তুলল, তখন ড্রইংরুমের ভেতরের সাদা লাইটের আলো এসে পড়ল তার মুখের বাম পাশে। জোয়া এক লহমায় দেখতে পেল ফাতেমার বাম চোখের নিচে থাকা সেই কালচে, ফোলা কালশিটে দাগটা। ওটা কোনো সাধারণ আঘাতের দাগ নয়; ওটা যে একটা পুরুষালী পশুর শক্ত হাতের বা পায়ের আঘাতের চিহ্ন, তা বুঝতে জোয়ার এক সেকেন্ডও সময় লাগল না।

জোয়া এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। সে কলিমুদ্দিনের দিকে তাকিয়ে কিছু টাকা বের করে দিয়ে বলল, "তুমি আসতে পারো। একে আমি রাখছি।"

কলিমুদ্দিন টাকাটা পেয়ে খুশি মনে করিডোর দিয়ে চলে গেল। পেন্টহাউসের বিশাল দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। এবার ঘরের ভেতর কেবল দুজন নারী—একজন সিল্কের চাদরে মোড়ানো অভিজাত কয়েদী, আর অন্যজন সস্তা সুতির তালি দেওয়া শাড়িতে মোড়ানো এক রক্তাক্ত পলাতক বাঘিনী।

ফাতেমা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে ঘরের ভেতরের রাজকীয় সাজসজ্জা দেখছিল। এত বড় ঘর, মেঝেটা আয়নার মতো চকচক করছে যে নিজের পায়ের ঘাটের কাদা-জল মাখা ছাপ সেখানে পড়তেই ফাতেমা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল। সে তার প্লাস্টিকের বস্তাটা এক কোণে রেখে মেঝের ওপর, ঠিক যেখানে জুতো খোলার জায়গা, সেখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ার চেষ্টা করল। চরের মানুষেরা বড়লোকদের বাড়িতে এলে এভাবেই মেঝেতে বসে অভ্যস্ত।

"আরে! ওখানে বসছ কেন? ভেতরে এসো," জোয়া দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ফাতেমার হাতটা ধরল।

ফাতেমা বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল। সে নিজের হাতটা টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে ভাঙা গলায় বলল, "না না, বুজান! আমার গায়ে লঞ্চঘাটের ময়লা, চরের কাদা। আফনের এই চকচকা মেঝে নষ্ট হইয়া যাইব। আমি এইহানেই ভালো আছি।"

জোয়া ফাতেমার কোনো ওজর শুনল না। সে ফাতেমার সেই খসখসে, রোদে পোড়া আর কাদা মাখা হাত দুটো নিজের নরম, দামী লোশন মাখা ফর্সা হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। এই স্পর্শে কোনো ঘৃণা ছিল না, কোনো আভিজাত্যের দূরত্ব ছিল না; ছিল এক পরম, অব্যাখ্যায়িত মায়া। জোয়া ফাতেমাকে টেনে নিয়ে এসে ড্রইংরুমের সেই ইতালিয়ান দামী ক্যালাকাট্টা সোফার ওপর বসিয়ে দিল।

ফাতেমা সোফায় বসেই যেন এক অদ্ভুত আতঙ্কে শিউরে উঠল। এত নরম গদি সে জীবনে কোনোদিন দেখেনি। তার মনে হচ্ছিল সে যেন একটা তুলোর মেঘের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। সে সোফার এককোণে একদম গুটিসুটি মেরে বসে রইল, যেন একটু নড়াচড়া করলেই এই দামী জিনিসটা ভেঙে যাবে।

জোয়া ফাতেমার সামনে হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসল। সে ফাতেমার মুখের দিকে, বিশেষ করে তার চোখের নিচের সেই কালশিটে দাগটার দিকে হাত বাড়াল। তার আঙুলের ডগাটা যখন ফাতেমার ফোলা চামড়াটায় আলতো করে ঠেকল, ফাতেমা ব্যথায় চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলল।

"কে মেরেছে তোমাকে ফাতেমা? তোমার স্বামী?" জোয়ার গলাটা কাঁপছিল। সে নিজেই জানত না সে কেন এই প্রশ্নটা করছে, কিন্তু তার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব যেন আগে থেকেই উত্তরটা জানত।

ফাতেমা চোখ খুলল। তার চোখ দিয়ে এবার আর জল বের হলো না, বরং এক ধরনের শুকনো, তপ্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে সোজা জোয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

-"হ বুজান। মন্টু মাঝি। চরের জুয়ারী, মাতাল। প্রতিদিন রাইতে মদ খাইয়া আইসা আমারে পিটাইত। আমার মায়ের দেওন শেষ কানের দুল জোড়াও আজ সকালে ছিঁইড়া লইয়া গেছে। আমি আর সহ্য করতে পারি নাই, বুজান... হেই কালবৈশাভীর রাইতে যখন সে মদের ঘোরে আমার ওপর আইসা পড়ল, আমি ঘরের কোণের বঁটিডা দিয়া তারে কোপায়া ফালাইয়া লঞ্চে উইঠা পড়ছি। সে মরছে না বাঁচছে আমি জানি না।"

ফাতেমা এক নিঃশ্বাসে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যটা স্বীকার করে নিল। সে জোয়ার চোখের দিকে তাকাল, সেখানে কোনো পুলিশের ভয় বা ঘৃণার বদলে সে দেখতে পেল এক অদ্ভুত, শীতল সমর্থন।

জোয়ার ভেতরের পৃথিবীটা এই কথায় তোলপাড় হয়ে গেল। ফাতেমা নিজের ওপর হওয়া হিংস্র অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সে এক অর্থে মুক্ত। আর জোয়া? সে এই তেরো তলার বিলাসবহুল কফিনে প্রতিদিন নিজের অস্তিত্বকে একটু একটু করে মরতে দেখছে। কিন্তু জোয়া তার আভিজাত্য আর সামাজিক খোলসটা এক মুহূর্তে খুলে ফেলতে পারল না। সে একজন হাই-সোসাইটির কর্পোরেট ডিরেক্টরের স্ত্রী, তার রক্তে মিশে আছে নিজের আবেগ লুকিয়ে রাখার মেকি আভিজাত্য। প্রথম দিনেই এই অপরিচিত, প্রান্তিক নারীর সামনে নিজের দাম্পত্য জীবনের কুৎসিত অধ্যায়টা সে মেলে ধরতে পারল না। তার আত্মসম্মান আর সামাজিক আভিজাত্যের দেওয়াল তাকে আটকে দিল।

ফাতেমা জোয়ার এই রাজকীয় রূপ, তার এই অদ্ভুত নরম ব্যবহার দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "বুজান, আফনে এত বড় প্রাসাদে থাহেন, আফনের জামাই বুঝি আফনেরে অনেক ভালোবাসে? এত দামী শাড়ি, এত সুন্দর ঘর... আফনের মনে তো কোনো দুঃখ নাই? আফনে তো এক্কেরে রানীর মতো আছেন।"

ফাতেমার এই সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ প্রশ্নটা জোয়ার বুকের ভেতর একটা তীরের মতো বিঁধল। জোয়া এক লহমায় হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসিটা বড্ড ম্লান, বড্ড কৃত্রিম। সে নিজের নাইটির স্লিভটা একটু টেনে হাতটা আড়াল করল। সে ফাতেমার চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতরের ঝড়টাকে চেপে রেখে অত্যন্ত শান্ত, পরিপাটি গলায় বলল,

"সব চকচকে জিনিস সোনা হয় না, ফাতেমা। এই বড় বড় ঘরের দেওয়ালগুলো বড্ড বেশি ঠান্ডা। এখানে মানুষের শরীর ভালো থাকে, কিন্তু ভেতরটা মাঝে মাঝে বড্ড একা হয়ে যায়। তোমার মন্টু মাঝির আঘাত যেমন চোখে দেখা যায়, এই শহরের অনেক বড় সাহেবের দেওয়া আঘাত সহজে বাইরে থেকে দেখা যায় না। তবে তুমি আজ থেকে এখানে নিরাপদ। এই ঘরে তোমাকে আর কেউ মারতে পারবে না।"

জোয়ার গলার আওয়াজটা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে আসিফের নাম নিল না, তার সাইকোলজিক্যাল টর্চারের কোনো বিবরণ দিল না। কিন্তু তার চোখের ভেতরের গভীর বিষাদ আর গলার সেই ভারী হয়ে আসা স্বর ফাতেমার মতন এক চরের অশিক্ষিত নারীর বুঝতে একটুও সময় লাগল না। ফাতেমা বুঝতে পারল, এই বড় বেগম সাহেবের জীবনেও এক মস্ত বড় শূন্যতার পাহাড় জমে আছে, যা দামী আসবাব আর রেশমি কাপড়ের আড়ালে ঢাকা।

জোয়া উঠে দাঁড়িয়ে রান্নাঘরে গেল। সে নিজের হাতে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল আর কিছু খাবার প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে এলো ফাতেমার জন্য। ফাতেমা জলটা পেয়ে এক ঢোকে পুরো গ্লাসটা খালি করে দিল, যেন তার ভেতরের এক আজন্মের তৃষ্ণা এই এক গ্লাস জলে মিটবে। সে অত্যন্ত ক্ষুধার্তের মতো প্লেটের খাবারগুলো খেতে লাগল। জোয়া এক দৃষ্টিতে তার খাওয়া দেখছিল এবং তার মনে হচ্ছিল, এই মেয়েটার অবাধ্যতা আর লড়াকু মানসিকতা যেন তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিচ্ছে।

বিকেলের ম্লান আলোটা যখন পেন্টহাউসের ড্রইংরুমে আরও গাঢ় হয়ে এল, তখন সেই ঘরের সেন্ট্রাল এসির ঠাণ্ডা বাতাস আর বাইরের পৃথিবীর কোলাহল যেন এক অলৌকিক শান্তিতে রূপ নিয়েছে। ড্রেসিং টেবিলের ডিম্বাকৃতি আয়নাটার সামনে এখন দুজন নারী দাঁড়িয়ে।

জোয়া ফাতেমাকে তার নিজের একটা সুতির সাধারণ হালকা শাড়ি পরতে দিয়েছে। শাড়িটা ফাতেমার শরীরের সাথে বড্ড মানিয়েছে। ফাতেমা নিজের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে ফেলে চুলগুলো পিঠের ওপর মেলে দিয়েছে। তার চোখের নিচের কালশিটে দাগটা এখনো স্পষ্ট, কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জোয়ার চোখের ভেতরের যে শূন্যতা—দুজনের অবয়ব আয়নায় একসাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত একাত্মতা তৈরি করেছে।

জোয়ার মনে হলো, এই প্রথম সে আয়নায় নিজের আসল রূপটা দেখতে পাচ্ছে। ফাতেমা কোনো বাইরের মানুষ নয়; ফাতেমা হলো জোয়ারই এক আদিম, লড়াকু প্রতিচ্ছবি—যা সে নিজে কোনোদিন হতে পারেনি। আর ফাতেমার মনে হলো, এই শহরের বড় বেগম সাহেব আসলে তার চরের কোনো এক দুর্ভাগা বোনের মতোই এক নিঃসঙ্গ পাখি, যার খাঁচাটা লোহার নয়, সোনার তৈরি।

সিল্কের দামী কাপড়ের আভিজাত্য আর সস্তা তালি দেওয়া সুতির শাড়ির যে বিশাল সামাজিক দেওয়াল, তা আজ এই তেরো তলার পেন্টহাউসের চার দেওয়ালে এসে এক মুহূর্তে ধুলোয় মিশে গেল। কোনো বড় রকমের স্বীকারোক্তি বা কান্নাকাটি ছাড়াই, কেবল চোখের ভাষা আর নীরব সহমর্মিতায় দুজন নারী একে অপরের সাথে এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে গেল।

তারা দুজনই মনে মনে জানত, এই ঘরের ভেতরে এক নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস তৈরি হচ্ছে। নিয়তির এক অলৌকিক সুতো আজ মেদিনীপুরের প্রিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্থার, গুলশানের জোয়া আর বরিশালের চরের ফাতেমাকে এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করাল। এই কুয়াশার অরণ্যে এবার এক নতুন শিকারের গল্প শুরু হতে চলেছে, যেখানে শিকারী আর পুরুষ থাকবে না; এবার বাঘিনীরাই নিজেদের নীরব ইশারায় নিজেদের সাম্রাজ্য বুঝে নেওয়ার প্রস্তুতি নেবে।
Like Reply


Messages In This Thread
অরণ্যের গোপন আদিমতা - ৭ (নিয়তির সুতো) - by Moan_A_Dev - 12-06-2026, 07:53 AM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)