12-06-2026, 01:53 AM
২।
আমাদের ‘ঢাকা পেপারস’ অফিসে প্রায় সত্তর জন লোক কাজ করে। সত্তর জন মানুষ একটা ফ্লোরে বসে যখন একসাথে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালায়, তখন অদ্ভুত একটা শব্দ হয়। চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হবে, বিশাল কোনো টিনের চালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
অফিসটা মূলত কয়েকটা ডেস্কে ভাগ করা। ন্যাশনাল ডেস্ক, পলিটিক্স, এন্টারটেইনমেন্ট, স্পোর্টস এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক। এর মধ্যে সবচেয়ে নিরিবিলি এবং শান্তিতে থাকি আমরা। মানে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের মানুষজন।
আমাদের ডেস্কে আমরা মোট তিনজন। আমি, মামুন আর আমাদের লাইন ম্যানেজার এহসান ভাই। আমি আর মামুন সমান লেভেলের কর্মী। আমাদের পদবি এক, কাজ এক, বেতনও এক। এমনকি আমাদের ল্যাপটপের কনফিগারেশনও এক। আমাদের কাজ হলো রয়টার্স, বিবিসি বা আল-জাজিরা থেকে বিদেশি খবরগুলো নামিয়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া।
মামুন ছেলেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। তার ইংরেজি জ্ঞান ভয়ংকর রকমের আক্ষরিক। সে মাঝে মাঝেই অনুবাদ করতে গিয়ে এমন সব বাক্য তৈরি করে, যা পড়লে চমকে উঠতে হয়। সেদিন দেখলাম সে ‘He kicked the bucket’ (সে মারা গেছে) অনুবাদ করেছে— ‘সে বালতিতে লাথি মেরেছে’। আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি যে বিদেশি খবরের মধ্যে বালতি বা লাথির কোনো জায়গা নেই। সে আমার কথা শোনে, কিন্তু দুই দিন পর আবার নিজের নিয়মে ফিরে যায়।
অফিসে আমার ছুটি সোমবার। আর মামুনের ছুটি শুক্রবার।
শুক্রবার ছুটি থাকা মানে আপনি সামাজিকভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। আপনি জুমার নামাজ পড়তে পারবেন, দুপুরে বাসায় গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে পারবেন, বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবেন। কিন্তু সোমবার ছুটি থাকাটা এক ধরনের সামাজিক অভিশাপ। সোমবার আপনার সব বন্ধু অফিসে ব্যস্ত। রাস্তায় জ্যাম, বাজারে ভিড়। সোমবার আপনি চাইলেও কারও সাথে আড্ডা দিতে পারবেন না।
তাই সোমবারে মাঝেমধ্যে ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রকাশনীর অফিসে যাই।
চন্দ্রবিন্দুর অফিসটা কাঁটাবনে। পুরনো একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায়। সেখানে সবসময় নতুন ছাপানো বইয়ের গন্ধ, আঠা আর পুরনো কাগজের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ তৈরি করে। এই ঘ্রাণটা আমার খুব পরিচিত এবং প্রিয়।
প্রকাশনীর মালিক মতিন সাহেব আমাকে বেশ পছন্দ করেন, কারণ আমি বিনা পয়সায় তার অফিসের একটা চেয়ার দখল করে বসে থাকলেও, মাঝে মাঝে ফ্রি-তে দু-একটা পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখে দিই।
বিকেলের দিকে এখানে বেশ জমজমাট আড্ডা হয়। ঢাকা শহরের কিছু উদীয়মান কবি, সাহিত্যিক আর বেকার বুদ্ধিজীবীরা এখানে জড়ো হন। তারা অত্যন্ত গম্ভীর মুখে চায়ে চুমুক দেন এবং ফরাসি সাহিত্য, লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা কিংবা উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করেন, যেন এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে।
আমি চুপচাপ তাদের কথা শুনি। মাঝে মাঝে তারা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, "কী রাশেদ ভাই, আপনার কী মত?"
আমাদের ‘ঢাকা পেপারস’ অফিসে প্রায় সত্তর জন লোক কাজ করে। সত্তর জন মানুষ একটা ফ্লোরে বসে যখন একসাথে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে আঙুল চালায়, তখন অদ্ভুত একটা শব্দ হয়। চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হবে, বিশাল কোনো টিনের চালে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
অফিসটা মূলত কয়েকটা ডেস্কে ভাগ করা। ন্যাশনাল ডেস্ক, পলিটিক্স, এন্টারটেইনমেন্ট, স্পোর্টস এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক। এর মধ্যে সবচেয়ে নিরিবিলি এবং শান্তিতে থাকি আমরা। মানে ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কের মানুষজন।
আমাদের ডেস্কে আমরা মোট তিনজন। আমি, মামুন আর আমাদের লাইন ম্যানেজার এহসান ভাই। আমি আর মামুন সমান লেভেলের কর্মী। আমাদের পদবি এক, কাজ এক, বেতনও এক। এমনকি আমাদের ল্যাপটপের কনফিগারেশনও এক। আমাদের কাজ হলো রয়টার্স, বিবিসি বা আল-জাজিরা থেকে বিদেশি খবরগুলো নামিয়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বাংলায় অনুবাদ করে দেওয়া।
মামুন ছেলেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। তার ইংরেজি জ্ঞান ভয়ংকর রকমের আক্ষরিক। সে মাঝে মাঝেই অনুবাদ করতে গিয়ে এমন সব বাক্য তৈরি করে, যা পড়লে চমকে উঠতে হয়। সেদিন দেখলাম সে ‘He kicked the bucket’ (সে মারা গেছে) অনুবাদ করেছে— ‘সে বালতিতে লাথি মেরেছে’। আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি যে বিদেশি খবরের মধ্যে বালতি বা লাথির কোনো জায়গা নেই। সে আমার কথা শোনে, কিন্তু দুই দিন পর আবার নিজের নিয়মে ফিরে যায়।
অফিসে আমার ছুটি সোমবার। আর মামুনের ছুটি শুক্রবার।
শুক্রবার ছুটি থাকা মানে আপনি সামাজিকভাবে একজন প্রতিষ্ঠিত মানুষ। আপনি জুমার নামাজ পড়তে পারবেন, দুপুরে বাসায় গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেতে পারবেন, বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবেন। কিন্তু সোমবার ছুটি থাকাটা এক ধরনের সামাজিক অভিশাপ। সোমবার আপনার সব বন্ধু অফিসে ব্যস্ত। রাস্তায় জ্যাম, বাজারে ভিড়। সোমবার আপনি চাইলেও কারও সাথে আড্ডা দিতে পারবেন না।
তাই সোমবারে মাঝেমধ্যে ‘চন্দ্রবিন্দু’ প্রকাশনীর অফিসে যাই।
চন্দ্রবিন্দুর অফিসটা কাঁটাবনে। পুরনো একটা বিল্ডিংয়ের দোতলায়। সেখানে সবসময় নতুন ছাপানো বইয়ের গন্ধ, আঠা আর পুরনো কাগজের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ তৈরি করে। এই ঘ্রাণটা আমার খুব পরিচিত এবং প্রিয়।
প্রকাশনীর মালিক মতিন সাহেব আমাকে বেশ পছন্দ করেন, কারণ আমি বিনা পয়সায় তার অফিসের একটা চেয়ার দখল করে বসে থাকলেও, মাঝে মাঝে ফ্রি-তে দু-একটা পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখে দিই।
বিকেলের দিকে এখানে বেশ জমজমাট আড্ডা হয়। ঢাকা শহরের কিছু উদীয়মান কবি, সাহিত্যিক আর বেকার বুদ্ধিজীবীরা এখানে জড়ো হন। তারা অত্যন্ত গম্ভীর মুখে চায়ে চুমুক দেন এবং ফরাসি সাহিত্য, লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতা কিংবা উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে এমনভাবে আলোচনা করেন, যেন এই সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস হয়ে যাবে।
আমি চুপচাপ তাদের কথা শুনি। মাঝে মাঝে তারা আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, "কী রাশেদ ভাই, আপনার কী মত?"
আমি খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বলি, "আপনারা যা বলেছেন, এর বাইরে আসলে আর কিছু বলার নেই। আমি আপনাদের সাথে একমত।"
এই একটা বাক্যের কারণে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর আড্ডায় আমার বেশ কদর আছে। সবাই আমাকে ‘সমঝদার’ এবং ‘জ্ঞানী’ মানুষ হিসেবে সম্মান করে। মাঝে মাঝে এই প্রকাশনী থেকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন বা পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়। তখন আমাকেও ডাকা হয়। আমি গম্ভীর মুখে স্টেজে বসে থাকি। দু-চারটে কঠিন শব্দ ব্যবহার করে বইয়ের ওপর আলোচনা করি। মানুষজন খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে।
এরকমই এক সোমবার সকালের কথা। আমি মেসে বসে ঝিমুচ্ছি। হঠাৎ চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবের ফোন।
এই একটা বাক্যের কারণে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর আড্ডায় আমার বেশ কদর আছে। সবাই আমাকে ‘সমঝদার’ এবং ‘জ্ঞানী’ মানুষ হিসেবে সম্মান করে। মাঝে মাঝে এই প্রকাশনী থেকে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন বা পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়। তখন আমাকেও ডাকা হয়। আমি গম্ভীর মুখে স্টেজে বসে থাকি। দু-চারটে কঠিন শব্দ ব্যবহার করে বইয়ের ওপর আলোচনা করি। মানুষজন খুব মনোযোগ দিয়ে শোনে।
এরকমই এক সোমবার সকালের কথা। আমি মেসে বসে ঝিমুচ্ছি। হঠাৎ চন্দ্রবিন্দুর মতিন সাহেবের ফোন।
আমি ফোন রিসিভ করলাম, "জি মতিন সাহেব, বলুন।"
মতিন সাহেব একটু ব্যস্ত গলায় বললেন, "রাশেদ ভাই, সামনের বুধবার সন্ধ্যায় কি আপনার সময় হবে? একটু আসতে হবে আমাদের অফিসে।"
"কী ব্যাপার? কোনো জরুরি কাজ?"
"তেমন কিছু না। একটা বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। ছোট করে। আপনাকে একটু কথা বলতে হবে।"
"কোন বই?"
"ওই যে, দশ-পনেরো দিন আগে আপনি যে বইয়ের প্রুফ দেখলেন না?"
আমি স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, একটা কবিতার বই।
আমি স্মৃতি হাতড়ে মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, একটা কবিতার বই।
আমি বললাম, "লেখকের নাম কী যেন?"
"আনিকা নাওহার। বইয়ের নাম ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’। আপনি তো প্রুফ দেখেছেন, বইটা নিয়ে ভালো-মন্দ দুই-চার কথা বলবেন আরকি। পারবেন না?"
আমি বললাম, "পারব। কিন্তু বুধবার তো আমার অফিস ভাই। ৬টার আগে তো ফ্রি হতে পারব না।"
"আরে ভাই, আমার প্রোগ্রাম তো পাঁচটা থেকে, একটু ম্যানেজ করেন।"
"ঠিক আছে, দেখতেছি।"
"দেখতেছি না, আপনার থাকা লাগবে।"
"আচ্ছা, আসব আমি। প্যারা নাই।"
ফোন রেখে আমি ল্যাপটপে ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটার পিডিএফ ফাইল ওপেন করলাম। বই নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রস্তুতি লাগে। নাহলে স্টেজে উঠে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশে এমনিতেই মহিলা কবির সংখ্যা কম। যারা আছেন, তারা বেশিরভাগই ফেসবুকে দুই লাইনের স্ট্যাটাস দেন, যেগুলোকে ঠিক কবিতা বলা যায় না। আনিকা নাওহার সেই হিসেবে কিছুটা ব্যতিক্রম। উনি মোটামুটি পরিচিত। তবে উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।
আমি বইয়ের পিডিএফের শেষে দেওয়া ‘লেখক পরিচিতি’ অংশটা বের করলাম। উনার জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান নিবাস ইংল্যান্ডে। উনার মতো কবিদের আমরা বলি ‘পরিযায়ী পাখি’ বা ‘অতিথি পাখি’। এরা বছরে একবার দেশে আসেন। ঠিক বইমেলার আগে আগে। এসে নিজেদের টাকায় বই প্রকাশ করেন, পুরো বইমেলায় অত্যন্ত সুন্দর শাড়ি পরে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়ান, পাঠকদের অটোগ্রাফ দেন। তারপর বইমেলা শেষ হলেই আবার ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় ফিরে যান। পরের এগারো মাস তাদের আর কোনো খবর থাকে না।
লেখক পরিচিতির নিচে একটা ছবি দেওয়া আছে। ফ্ল্যাপের ছবি। ছবি অনুযায়ী উনার বয়স বোঝা মুশকিল, তবে ফ্ল্যাপের লেখায় দেওয়া আছে— জন্ম ১৯৯০, অর্থাৎ বয়স ৩৬।
ফ্ল্যাপের ছবির একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। এখানে সবাইকেই একটু চিন্তিত এবং সুন্দর দেখায়। আনিকা নাওহারকেও খুব সুন্দর লাগছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের উদাসীনতা আছে, যেটা কবিদের জন্য বাধ্যতামূলক। একজন কবি যদি বাজারের ফর্দ হাতে নিয়ে তোলা ছবি ফ্ল্যাপে দেন, মানুষ সেই বই কিনবে না। কবিদের থাকতে হয় মেঘ, বৃষ্টি আর বিষণ্ণতার কাছাকাছি।
আমি উনার কয়েকটা কবিতা আবার পড়লাম। প্রুফ দেখার সময় খেয়াল করেছিলাম, উনি ‘শূন্যতা’ শব্দটা খুব বেশি ব্যবহার করেছেন। প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই কোনো না কোনো শূন্যতা আছে। ইংল্যান্ডের মতো একটা সুন্দর দেশে বসে একজন মানুষের ভেতরে এত শূন্যতা কোথা থেকে আসে, সেটা আমার মতো মিরপুরের মেসে থাকা একজন সাধারণ অনুবাদকের পক্ষে বোঝা মুশকিল।
বুধবারের জন্য আমি আমার মাথায় একটা ছোটখাটো স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ফেললাম। স্টেজে উঠে আমি বলব— "আনিকা নাওহারের কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার..." ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের কথাগুলো শুনতে খুব ভারী মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো মানে নেই।
মঙ্গলবার অফিসে গিয়েই আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দাঁড়ালাম।
ফোন রেখে আমি ল্যাপটপে ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’ বইটার পিডিএফ ফাইল ওপেন করলাম। বই নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রস্তুতি লাগে। নাহলে স্টেজে উঠে বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে হয়। বাংলাদেশে এমনিতেই মহিলা কবির সংখ্যা কম। যারা আছেন, তারা বেশিরভাগই ফেসবুকে দুই লাইনের স্ট্যাটাস দেন, যেগুলোকে ঠিক কবিতা বলা যায় না। আনিকা নাওহার সেই হিসেবে কিছুটা ব্যতিক্রম। উনি মোটামুটি পরিচিত। তবে উনাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।
আমি বইয়ের পিডিএফের শেষে দেওয়া ‘লেখক পরিচিতি’ অংশটা বের করলাম। উনার জন্ম বাংলাদেশে। কিন্তু বেড়ে ওঠা এবং বর্তমান নিবাস ইংল্যান্ডে। উনার মতো কবিদের আমরা বলি ‘পরিযায়ী পাখি’ বা ‘অতিথি পাখি’। এরা বছরে একবার দেশে আসেন। ঠিক বইমেলার আগে আগে। এসে নিজেদের টাকায় বই প্রকাশ করেন, পুরো বইমেলায় অত্যন্ত সুন্দর শাড়ি পরে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়ান, পাঠকদের অটোগ্রাফ দেন। তারপর বইমেলা শেষ হলেই আবার ইংল্যান্ড বা আমেরিকায় ফিরে যান। পরের এগারো মাস তাদের আর কোনো খবর থাকে না।
লেখক পরিচিতির নিচে একটা ছবি দেওয়া আছে। ফ্ল্যাপের ছবি। ছবি অনুযায়ী উনার বয়স বোঝা মুশকিল, তবে ফ্ল্যাপের লেখায় দেওয়া আছে— জন্ম ১৯৯০, অর্থাৎ বয়স ৩৬।
ফ্ল্যাপের ছবির একটা অদ্ভুত নিয়ম আছে। এখানে সবাইকেই একটু চিন্তিত এবং সুন্দর দেখায়। আনিকা নাওহারকেও খুব সুন্দর লাগছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের উদাসীনতা আছে, যেটা কবিদের জন্য বাধ্যতামূলক। একজন কবি যদি বাজারের ফর্দ হাতে নিয়ে তোলা ছবি ফ্ল্যাপে দেন, মানুষ সেই বই কিনবে না। কবিদের থাকতে হয় মেঘ, বৃষ্টি আর বিষণ্ণতার কাছাকাছি।
আমি উনার কয়েকটা কবিতা আবার পড়লাম। প্রুফ দেখার সময় খেয়াল করেছিলাম, উনি ‘শূন্যতা’ শব্দটা খুব বেশি ব্যবহার করেছেন। প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই কোনো না কোনো শূন্যতা আছে। ইংল্যান্ডের মতো একটা সুন্দর দেশে বসে একজন মানুষের ভেতরে এত শূন্যতা কোথা থেকে আসে, সেটা আমার মতো মিরপুরের মেসে থাকা একজন সাধারণ অনুবাদকের পক্ষে বোঝা মুশকিল।
বুধবারের জন্য আমি আমার মাথায় একটা ছোটখাটো স্ক্রিপ্ট তৈরি করে ফেললাম। স্টেজে উঠে আমি বলব— "আনিকা নাওহারের কবিতায় আমরা এক ধরনের প্রবাসকালীন বিচ্ছিন্নতাবোধ দেখতে পাই। এই শূন্যতা শুধু ব্যক্তির নয়, এই শূন্যতা যেন পুরো আধুনিক সভ্যতার..." ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের কথাগুলো শুনতে খুব ভারী মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো মানে নেই।
মঙ্গলবার অফিসে গিয়েই আমি এহসান ভাইয়ের ডেস্কের সামনে দাঁড়ালাম।
এহসান ভাই তখন খুব মনোযোগ দিয়ে আল-জাজিরার ওয়েবসাইট খুলে কী একটা নিউজ পড়ছেন। তার কপালে ভাঁজ। পৃথিবীর কোথাও কোনো বোমা ফুটলে বা কোনো দেশের সরকার পতন হলে এহসান ভাইয়ের কপালের ভাঁজ গভীর হয়।
"এহসান ভাই?" আমি শান্ত গলায় ডাকলাম।
এহসান ভাই চোখ না তুলেই বললেন, "বলো রাশেদ। সিরিয়ার অবস্থা তো ভালো না। আরেকটা হামলা হয়েছে।"
"সিরিয়ার অবস্থা তো গত দশ বছর ধরেই ভালো না ভাই। আমি অন্য একটা বিষয়ে কথা বলতে এসেছিলাম।"
এহসান ভাই এবার মুখ তুলে তাকালেন। "কী বিষয়?"
"আগামীকাল বুধবার আমাকে একটু আগে ছাড়তে হবে। মানে, বিকেল ৩টার দিকে।"
অফিসে ছুটি বা আর্লি লিভ চাওয়ার সময় বসের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে হয় না। একটু অপরাধী ধরনের চেহারা করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমি সেই চেষ্টা করলাম।
অফিসে ছুটি বা আর্লি লিভ চাওয়ার সময় বসের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে হয় না। একটু অপরাধী ধরনের চেহারা করে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। আমি সেই চেষ্টা করলাম।
এহসান ভাই ভ্রু কুঁচকে বললেন, "তিনটায়? কেন? তোমার তো আবার বিয়ে-শাদির ব্যাপার নেই যে পাত্রী দেখতে যাবে।"
"পাত্রী না ভাই। একটা প্রকাশনা অনুষ্ঠান আছে কাঁটাবনে। সেখানে আমাকে একটু কথা বলতে হবে।"
"কীসের প্রকাশনা?"
"কবিতার বই।"
এহসান ভাই এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন, যেন আমি তাকে বলেছি আমি মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জন্য টিকিট কাটতে যাচ্ছি।
"কবিতা? তুমি কবিতা নিয়ে কথা বলবে? তুমি তো অনুবাদক। তুমি কবিতা বোঝো?"
আমি বিনীত গলায় বললাম, "একটু-আধটু বুঝি ভাই। প্রুফ রিডিংয়ের কাজ তো করি। সেখান থেকেই ডাকছে।"
এহসান ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ঠিক আছে, যাও। তবে ভাই, তুমি তো জানোই এগুলার কী সব টাইম-ইন, টাইম-আউটের হিসাব করে। একদিন যেহেতু ৩ ঘণ্টা আগে চলে যাবা, আরেকদিন কিন্তু ৩ ঘণ্টা বেশি করে কাভার আপ করে দিও।"
আমি বললাম, "জি ভাই, অবশ্যই।"
আমি ডেস্কে ফিরে, নিউজ করলাম প্রথমে দুটো। একটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আপডেট। আরেকটা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। নিউজ দুটো শেষ করে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’-এর পিডিএফ বের করে আবার দু-একটা কবিতা পড়লাম।
মানুষ আসলে সারাজীবনই মুখোশ পরে থাকে। আমি যে কাল স্টেজে উঠে উনার কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করব, সেটাও একটা মুখোশ। কারণ আমি জানি, উনার কবিতাগুলো খুব সাধারণ মানের। কিন্তু আমি সেটা বলব না।
আমি ডেস্কে ফিরে, নিউজ করলাম প্রথমে দুটো। একটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আপডেট। আরেকটা ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। নিউজ দুটো শেষ করে আনিকা নাওহারের ‘মিথ্যা মুখোশ, সত্য মুখোশ’-এর পিডিএফ বের করে আবার দু-একটা কবিতা পড়লাম।
মানুষ আসলে সারাজীবনই মুখোশ পরে থাকে। আমি যে কাল স্টেজে উঠে উনার কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করব, সেটাও একটা মুখোশ। কারণ আমি জানি, উনার কবিতাগুলো খুব সাধারণ মানের। কিন্তু আমি সেটা বলব না।
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, মিথ্যা বলাটা একটা শিল্প। আর আমরা সবাই সেই শিল্পের ছোটখাটো এক একজন শিল্পী।
বুধবার সকালটা অন্য আট-দশটা সাধারণ দিনের মতোই শুরু হলো। তাড়াহুড়ো করে গল্প এগিয়ে নেওয়ার কিছু নেই। মানুষের জীবন তো আর সিনেমার ট্রেইলার না যে শুধু অ্যাকশন আর ক্লাইম্যাক্স থাকবে। জীবনের বেশিরভাগ অংশ জুড়েই থাকে একঘেয়েমি, পুনরাবৃত্তি আর ভীষণ সাধারণ কিছু মুহূর্ত।
আমাদের মেসের সকালবেলাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। চার রুমের এক বাসিন্দার নাম রাজু। একটা ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, অল্প বেতন। তবে এইটা ওর আপাত জীবন। ওর টার্গেট সরকারি চাকরি। সে বিসিএস পরীক্ষার্থী। তার জীবনের একটাই লক্ষ্য— যেকোনো মূল্যে সরকারের একজন গ্যাজেটেড কর্মকর্তা হওয়া। এজন্য সে প্রতিদিন ভোরে উঠে বারান্দায় পায়চারি করে আর বিড়বিড় করে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করে।
আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই শুনলাম রাজু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপন মনে বলছে, "বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া, মুদ্রার নাম লেভ... বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, মুদ্রার নাম ফ্র্যাঙ্ক..."
আমাদের মেসের সকালবেলাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। চার রুমের এক বাসিন্দার নাম রাজু। একটা ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ, অল্প বেতন। তবে এইটা ওর আপাত জীবন। ওর টার্গেট সরকারি চাকরি। সে বিসিএস পরীক্ষার্থী। তার জীবনের একটাই লক্ষ্য— যেকোনো মূল্যে সরকারের একজন গ্যাজেটেড কর্মকর্তা হওয়া। এজন্য সে প্রতিদিন ভোরে উঠে বারান্দায় পায়চারি করে আর বিড়বিড় করে সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করে।
আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই শুনলাম রাজু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আপন মনে বলছে, "বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া, মুদ্রার নাম লেভ... বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, মুদ্রার নাম ফ্র্যাঙ্ক..."
আমি বিছানা ছেড়ে উঠে বারান্দায় গেলাম। চোখেমুখে ঘুমের রেশ। রাজু আমাকে দেখে পড়া থামিয়ে বলল, "রাশেদ ভাই, উঠলেন?"
আমি হাই তুলে বললাম, "হুম। তুমি তো দেখি আজ আফ্রিকায় চলে গেছ। বুরকিনা ফাসো নিয়ে পড়েছ।"
রাজু গম্ভীর মুখে বলল, "ভাই, বিসিএস জিনিসটা হলো একটা মহাসাগর। কোথা থেকে যে এক মার্কের প্রশ্ন চলে আসবে, কেউ জানে না। গত বছর প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ছোট দ্বীপের রাজধানীর নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আমি রিস্ক নিতে চাই না।"
রাজু গম্ভীর মুখে বলল, "ভাই, বিসিএস জিনিসটা হলো একটা মহাসাগর। কোথা থেকে যে এক মার্কের প্রশ্ন চলে আসবে, কেউ জানে না। গত বছর প্রশান্ত মহাসাগরের একটা ছোট দ্বীপের রাজধানীর নাম জিজ্ঞেস করেছিল। আমি রিস্ক নিতে চাই না।"
আমি বললাম, "খুব ভালো। তা বুরকিনা ফাসোর রাজধানী ওয়াগাদুগু, এটা জেনে তোমার জীবনে ঠিক কী উন্নতি হবে বলে তুমি মনে করো?"
রাজু একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর বলল, "উন্নতি তো হবে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর। তখন তো আর বুরকিনা ফাসো নিয়ে ভাবতে হবে না। তখন ভাবব পোস্টিং আর প্রমোশন নিয়ে। আপাতত এই ওয়াগাদুগুই আমার ভবিষ্যৎ।"
আমি হাসলাম। রাজুর লজিক খুব পরিষ্কার। আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ব্যাচেলর মেসে সকালবেলা বাথরুমের সিরিয়াল পাওয়াটা অনেকটা লটারি জেতার মতো। আমাদের ফ্ল্যাটে বাথরুম দুটো। কিন্তু সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে এই দুটো বাথরুম নিয়ে রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধ চলে। আমি গিয়ে দেখলাম, তুহিন একটা বাথরুম দখল করে বসে আছে। ভেতর থেকে আইইএলটিএস-এর স্পিকিং প্র্যাকটিসের শব্দ আসছে। সে বাথরুমে বসেও ইংরেজিতে কথা বলছে।
"ইয়েস, আই থিংক গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইজ আ ভেরি বিগ ইস্যু..."
রাজু একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর বলল, "উন্নতি তো হবে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার পর। তখন তো আর বুরকিনা ফাসো নিয়ে ভাবতে হবে না। তখন ভাবব পোস্টিং আর প্রমোশন নিয়ে। আপাতত এই ওয়াগাদুগুই আমার ভবিষ্যৎ।"
আমি হাসলাম। রাজুর লজিক খুব পরিষ্কার। আমি বাথরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ব্যাচেলর মেসে সকালবেলা বাথরুমের সিরিয়াল পাওয়াটা অনেকটা লটারি জেতার মতো। আমাদের ফ্ল্যাটে বাথরুম দুটো। কিন্তু সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে এই দুটো বাথরুম নিয়ে রীতিমতো স্নায়ুযুদ্ধ চলে। আমি গিয়ে দেখলাম, তুহিন একটা বাথরুম দখল করে বসে আছে। ভেতর থেকে আইইএলটিএস-এর স্পিকিং প্র্যাকটিসের শব্দ আসছে। সে বাথরুমে বসেও ইংরেজিতে কথা বলছে।
"ইয়েস, আই থিংক গ্লোবাল ওয়ার্মিং ইজ আ ভেরি বিগ ইস্যু..."
আমি বাথরুমের দরজায় টোকা দিয়ে বললাম, "তুহিন ভাই, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে পরে থিংক করো। এখন বাথরুমটা একটু ছাড়ো। আমার অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে।"
তুহিন ভেতর থেকেই বলল, "জাস্ট টু মিনিটস, ব্রাদার! আই অ্যাম অলমোস্ট ডান।"
সকাল দশটায় আমি কারওয়ান বাজারে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসে এসে পৌঁছালাম।
সকাল দশটায় আমি কারওয়ান বাজারে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসে এসে পৌঁছালাম।
অফিসের পরিবেশ প্রতিদিনের মতোই। সবাই ল্যাপটপে মুখ গুঁজে আছে। আমি আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে আমি আর মামুন পাশাপাশি বসি। মামুন আজ খুব সিরিয়াস মুখে একটা নিউজ অনুবাদ করছে। তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ আটকে গেল।
সে একটা আমেরিকান নিউজ এজেন্সির খবর অনুবাদ করছে। খবরটা হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা ব্যাংকে ডাকাতি করতে গিয়ে একজন লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ইংরেজিতে লেখা ছিল: "The bank robber was caught red-handed by the security officer."
সে একটা আমেরিকান নিউজ এজেন্সির খবর অনুবাদ করছে। খবরটা হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা ব্যাংকে ডাকাতি করতে গিয়ে একজন লোক হাতেনাতে ধরা পড়েছে। ইংরেজিতে লেখা ছিল: "The bank robber was caught red-handed by the security officer."
মামুন তার স্বভাবসুলভ আক্ষরিক অনুবাদ করেছে: "ব্যাংক ডাকাতটিকে পুলিশ লাল হাতে ধরে ফেলে।"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, একটু এদিকে তাকাও।"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, "মামুন, একটু এদিকে তাকাও।"
মামুন চোখ না সরিয়েই বলল, "বলেন ভাই। খুব ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডাকাতি।"
"ডাকাতি ঠিক আছে। কিন্তু ডাকাতটা লাল হাতে ধরা পড়ল কীভাবে? সে কি ডাকাতি করার আগে হাতে আলতা মেখেছিল?"
মামুন এবার আমার দিকে তাকাল। "লাল হাত মানে? ওহ, 'রেড-হ্যান্ডেড' বুঝাচ্ছেন? তো রেড মানে তো লাল আর হ্যান্ড মানে হাত। লাল হাতই তো হয়।"
মামুন এবার আমার দিকে তাকাল। "লাল হাত মানে? ওহ, 'রেড-হ্যান্ডেড' বুঝাচ্ছেন? তো রেড মানে তো লাল আর হ্যান্ড মানে হাত। লাল হাতই তো হয়।"
আমি অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে বললাম, "রেড-হ্যান্ডেড একটা ইডিয়ম। এর মানে হলো হাতেনাতে ধরা পড়া। লাল হাতে ধরা পড়া না। তুমি যদি এটা পাবলিশ করো, পাঠকরা ভাববে ক্যালিফোর্নিয়ার ডাকাতরা হাতে মেহেদি বা আলতা দিয়ে ডাকাতি করতে যায়।"
মামুন একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। "ও আচ্ছা! ঠিক আছে ভাই, চেঞ্জ করে দিচ্ছি। আপনি না থাকলে যে আমার কী হতো!"
মামুন একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। "ও আচ্ছা! ঠিক আছে ভাই, চেঞ্জ করে দিচ্ছি। আপনি না থাকলে যে আমার কী হতো!"
"আমার কিছু হতো না, তবে ঢাকা পেপারসের পাঠকদের ইংরেজি জ্ঞান সম্পর্কে অদ্ভুত একটা ধারণা তৈরি হতো।" আমি বলে নিজের ল্যাপটপ অন করলাম।
দুপুরের দিকে এহসান ভাই আমাদের ডেস্কে এলেন। তার হাতে একটা কফির মগ।
দুপুরের দিকে এহসান ভাই আমাদের ডেস্কে এলেন। তার হাতে একটা কফির মগ।
"রাশেদ, আজকে তো তুমি একটু আগে বের হবে, তাই না?"
আমি ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে বললাম, "জি ভাই।"
"হ্যাঁ, মনে আছে। যাওয়ার আগে ইউরোপের ওই নিউজটা একটু দেখে দিয়ে যেও। আর শোনো, ওই যে কবিতার বই নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছ... বই পড়েছ তো ঠিকমতো? নাকি শুধু ফ্ল্যাপ পড়েই স্টেজে উঠে যাবে?"
আমি হাসলাম। "প্রুফ দেখার সময় পুরো বই-ই পড়তে হয়েছে ভাই। চিন্তা করবেন না, মান-সম্মান ডুববে না।"
আমি হাসলাম। "প্রুফ দেখার সময় পুরো বই-ই পড়তে হয়েছে ভাই। চিন্তা করবেন না, মান-সম্মান ডুববে না।"
"বেস্ট অফ লাক,"
বলে এহসান ভাই চলে গেলেন। এহসান ভাই যেতেই মামুন ফিসফিস করে বলল, "রাশেদ ভাই, কাহিনী কী?"
"কীসের কাহিনী?"
"এই যে আপনি কবিতা-টবিতা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন। প্রেম-ট্রেম নাকি?"
আমি হাসলাম। "প্রেম হবে কার সাথে? বইয়ের কাগজের সাথে?"
মামুন চোখ ছোট করে বলল, "কাগজের সাথে না। নিশ্চয়ই কোনো মহিলা কবি। আমি খেয়াল করেছি, পুরুষ কবিদের অনুষ্ঠানে কেউ আগে ছুটি নিয়ে যায় না। মহিলা কবিদের ব্যাপার আলাদা। তা কবির বয়স কত?"
আমি মামুনের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ছত্রিশ। ইংল্যান্ডে থাকেন।"
"কীসের কাহিনী?"
"এই যে আপনি কবিতা-টবিতা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন। প্রেম-ট্রেম নাকি?"
আমি হাসলাম। "প্রেম হবে কার সাথে? বইয়ের কাগজের সাথে?"
মামুন চোখ ছোট করে বলল, "কাগজের সাথে না। নিশ্চয়ই কোনো মহিলা কবি। আমি খেয়াল করেছি, পুরুষ কবিদের অনুষ্ঠানে কেউ আগে ছুটি নিয়ে যায় না। মহিলা কবিদের ব্যাপার আলাদা। তা কবির বয়স কত?"
আমি মামুনের দিকে তাকিয়ে বললাম, "ছত্রিশ। ইংল্যান্ডে থাকেন।"
মামুন একটু হতাশ হলো বলে মনে হলো। "ছত্রিশ? তাইলে তো খালাম্মা। খালাম্মাদের বইয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য আপনি নিউজ ফেলে যাচ্ছেন? আপনার লজিক তো আমি বুঝতেছি না ভাই।"
আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে বললাম, "মামুন, পৃথিবীতে সব কিছুর লজিক থাকে না। তুমি যেমন ‘He kicked the bucket’-এর অনুবাদ করো বালতিতে লাথি মারা, এটাও ঠিক সেরকম। এর কোনো লজিক নেই, কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে।"
আমি ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে বললাম, "মামুন, পৃথিবীতে সব কিছুর লজিক থাকে না। তুমি যেমন ‘He kicked the bucket’-এর অনুবাদ করো বালতিতে লাথি মারা, এটাও ঠিক সেরকম। এর কোনো লজিক নেই, কিন্তু ব্যাপারটা ঘটে।"
মামুন আর কথা বাড়াল না। সে তার রয়টার্সের নিউজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
বিকেল চারটার দিকে আমি অফিস থেকে বের হলাম।
বিকেল চারটার দিকে আমি অফিস থেকে বের হলাম।
কারওয়ান বাজার থেকে কাঁটাবনের দূরত্ব খুব বেশি না হলেও ঢাকা শহরের জ্যামে সেটা পাড়ি দেওয়া একটা ছোটখাটো যুদ্ধ। আমি একটা রিকশা নিলাম। রিকশাওয়ালা ষাট টাকা চাইল, আমি দরদাম করলাম না। আজ আমার ভেতরে এক ধরনের অদ্ভুত চাঞ্চল্য কাজ করছে। প্রতিদিনের একঘেয়ে রুটিনের বাইরে গিয়ে আজ আমি একটা সাহিত্য আড্ডায় কথা বলতে যাচ্ছি। যদিও আমি জানি, এসব আড্ডার বেশির ভাগ কথাই ফাঁকা আওয়াজ, তবুও একটু তো ভালো লাগেই।
কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা চারটা পয়তাল্লিশ বাজে।
কাঁটাবনে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর অফিসে যখন পৌঁছালাম, তখন সন্ধ্যা চারটা পয়তাল্লিশ বাজে।
অফিসের ভেতরটা বেশ জমজমাট। নতুন বইয়ের গন্ধ, সিউডোর (Sudo) আঠার গন্ধ আর চায়ের গন্ধ মিলেমিশে একটা অদ্ভুত সাহিত্যিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মতিন সাহেব অত্যন্ত ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছেন। তার পরনে একটা ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি। প্রকাশকরা সাধারণত খুব সাধারণ পোশাকে থাকেন, কিন্তু কোনো অনুষ্ঠান থাকলে তারা হঠাৎ করেই বুদ্ধিজীবীদের মতো পোশাক পরেন।
আমাকে দেখেই মতিন সাহেব এগিয়ে এলেন। "আরে রাশেদ ভাই! আসেন আসেন। আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম। অনুষ্ঠান তো একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে।"
আমি বললাম, "বাকিরা কোথায়? লেখক এসেছেন?"
আমাকে দেখেই মতিন সাহেব এগিয়ে এলেন। "আরে রাশেদ ভাই! আসেন আসেন। আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম। অনুষ্ঠান তো একটু পরেই শুরু হয়ে যাবে।"
আমি বললাম, "বাকিরা কোথায়? লেখক এসেছেন?"
"হ্যাঁ, উনি তো সেই কখন এসে বসে আছেন। উনার তো ইংল্যান্ডের অভ্যাস, একদম টাইম ধরে চলে। আসেন, আপনাকে পরিচয় করিয়ে দিই।"
আমি মতিন সাহেবের পেছন পেছন প্রকাশনীর ভেতরের দিকের ছোট কেবিনটার দিকে এগোলাম। কেবিনের দরজা খোলা।
আমি মতিন সাহেবের পেছন পেছন প্রকাশনীর ভেতরের দিকের ছোট কেবিনটার দিকে এগোলাম। কেবিনের দরজা খোলা।
ভেতরে ঢুকতেই আমার চোখের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। আমার মনের ভেতরে খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু স্পষ্ট একটা ধাক্কা লাগল। আমি সাধারণত খুব সহজে চমকাই না। ঢাকা শহরে থাকতে থাকতে এবং সারাদিন দুনিয়ার সব উদ্ভট খবর অনুবাদ করতে করতে আমার আবেগ-অনুভূতি বেশ ভোঁতা হয়ে গেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে আমি সত্যিই চমকে গেলাম।
সোফায় যিনি বসে আছেন, তিনি আনিকা নাওহার।
সোফায় যিনি বসে আছেন, তিনি আনিকা নাওহার।
বইয়ের ফ্ল্যাপে পড়েছিলাম উনার বয়স ছত্রিশ। কিন্তু এই মহিলাকে দেখে কোনোভাবেই ছত্রিশ মনে হচ্ছে না। ইংল্যান্ডের পরিষ্কার আবহাওয়া, দূষণমুক্ত পরিবেশ আর উন্নত জীবনযাপন সম্ভবত মানুষের বয়সকে একটা জায়গায় ফ্রিজ করে দেয়। আমাদের দেশের ছত্রিশ বছর বয়সী একজন সাধারণ গৃহিণীর চেহারায় যেখানে সংসারের ক্লান্তি আর বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সেখানে আনিকা নাওহারের চেহারায় এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা।
উনার পরনে একটা গাঢ় মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি। শাড়ি পরার ধরনে একটা দারুণ আভিজাত্য আছে, আবার একই সাথে আছে একটা সূক্ষ্ম অবহেলা। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর দিয়ে খুব সুন্দরভাবে লুটিয়ে পড়েছে। আমার চোখ অনুবাদকের চোখ। খুঁটিনাটি খেয়াল করা আমার পেশাগত রোগ। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের একটা অদ্ভুত আবেদন আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
তাঁর গায়ের রঙ নিখুঁত ফর্সা, তবে ফ্যাকাশে নয়। চোখের দৃষ্টিতে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ভাব। কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর শারীরিক গড়ন। যাকে ইংরেজিতে বলে পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। আমি মনে মনে একটা দ্রুত হিসাব কষলাম। আমার আন্দাজ খুব একটা ভুল হয় না। উনার ভাইটাল স্ট্যাটস সম্ভবত ৩৬-২৮-৩৬ এর আশেপাশে হবে। ভরাট এবং সুডৌল বক্ষদেশ, শাড়ির কুঁচির ফাঁক দিয়ে হালকা উঁকি দেওয়া মেদহীন ছিপছিপে কোমর আর আকর্ষণীয় নিতম্ব— সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা।
হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।
উনার পরনে একটা গাঢ় মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি। শাড়ি পরার ধরনে একটা দারুণ আভিজাত্য আছে, আবার একই সাথে আছে একটা সূক্ষ্ম অবহেলা। স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে শাড়ির আঁচলটা কাঁধের ওপর দিয়ে খুব সুন্দরভাবে লুটিয়ে পড়েছে। আমার চোখ অনুবাদকের চোখ। খুঁটিনাটি খেয়াল করা আমার পেশাগত রোগ। আনিকা নাওহারের শারীরিক সৌন্দর্যের একটা অদ্ভুত আবেদন আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।
তাঁর গায়ের রঙ নিখুঁত ফর্সা, তবে ফ্যাকাশে নয়। চোখের দৃষ্টিতে একটা শান্ত, স্নিগ্ধ ভাব। কিন্তু সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে তাঁর শারীরিক গড়ন। যাকে ইংরেজিতে বলে পারফেক্ট ‘আওয়ারগ্লাস’ ফিগার। আমি মনে মনে একটা দ্রুত হিসাব কষলাম। আমার আন্দাজ খুব একটা ভুল হয় না। উনার ভাইটাল স্ট্যাটস সম্ভবত ৩৬-২৮-৩৬ এর আশেপাশে হবে। ভরাট এবং সুডৌল বক্ষদেশ, শাড়ির কুঁচির ফাঁক দিয়ে হালকা উঁকি দেওয়া মেদহীন ছিপছিপে কোমর আর আকর্ষণীয় নিতম্ব— সবকিছু মিলিয়ে ছত্রিশ বছরের একজন পূর্ণাঙ্গ নারীর যে শারীরিক আবেদন থাকতে পারে, সেটা তাঁর মাঝে শতভাগ, বরং তার চেয়েও বেশি উপস্থিত। অথচ এই পুরো আবেদনটার মধ্যে কোনো উগ্রতা নেই। আছে এক ধরনের পরিশীলিত মুগ্ধতা।
হালকা মেকআপ করেছেন তিনি। ঠোঁটে শাড়ির সাথে মিলিয়ে গাঢ় মেরুন রঙের লিপস্টিক। চুলগুলো খোঁপা করা, সেখান থেকে দু-এক গোছা অবাধ্য চুল ঘাড়ের কাছে এসে পড়েছে। পুরো রুমের বাতাসে একটা খুব দামি পারফিউমের গন্ধ ভাসছে। শ্যানেল বা ডিওর-এর কোনো একটা পারফিউম হবে হয়তো।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)