Thread Rating:
  • 6 Vote(s) - 3 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
WRITER'S SPECIAL অরণ্যের গোপন আদিমতা
#11
ষষ্ঠ অধ্যায়: শব্দের শেকল ও অদৃশ্য থাবা

বিকেলের দিকে গুলশানের একটা অতি দামী, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় বসেছিল জোয়া আর আসিফ। তাদের সাথে বসে আছেন আসিফের এক নতুন ব্যবসায়িক পার্টনার, রহমান সাহেব। টেবিলের ওপর দামী ক্রিস্টালের গ্লাসে আইস-টি আর প্লেটে সুদৃশ্য স্ন্যাক্স সাজানো। রহমান সাহেব একজন রসিক মানুষ, কথার মাঝখানে সে তাদের পুরোনো এক বিজনেস ডিল নিয়ে একটা বেশ মজার রসিকতা করলেন। রসিকতাটা এতটাই অকৃত্রিম ছিল যে জোয়া নিজের অজান্তেই, তার সেই সুশীল মুখোশটা ভুলে একটু শব্দ করে, খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই, টেবিলের নিচ থেকে একটা তীব্র, শক্ত আঘাত এলো জোয়ার পায়ে। আসিফের ফর্মাল ইতালিয়ান লেদার শু-টা মুহূর্তের মধ্যে জোয়ার পায়ের পাতায় আলতো কিন্তু প্রচণ্ড শক্তভাবে চেপে বসল। ওটা কোনো ভুলবশত ছোঁয়া ছিল না; ওটা ছিল একটা সুক্ষ্ম, তীব্র এবং হিংস্র সতর্কবার্তা। জোয়ার হাসির শব্দটা মাঝপথেই আটকে গেল, যেন কেউ তার গলায় একটা অদৃশ্য ফাঁস পরিয়ে দিয়েছে।

আসিফ তার মুখে সেই চিরচেনা অমায়িক, দেবতুল্য হাসিটা বজায় রেখেই রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "আসলে রহমান সাহেব, জোয়া একটু বেশি ইমোশনাল তো! সাহিত্যের ছাত্রী হওয়ায় ও ছোটখাটো বিষয়েই খুব উত্তেজিত হয়ে পড়ে। হাসিও ঠিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, হা হা।"

রহমান সাহেবও আসিফের কথায় তাল মিলিয়ে হাসলেন, কিন্তু জোয়ার ভেতরের পৃথিবীটা তখন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। বাড়ি ফেরার পথে গাড়ির এসি চালু থাকা সত্ত্বেও জোয়ার মনে হচ্ছিল সে একটা জ্বলন্ত চুল্লির ভেতর বসে আছে। আসিফ এতক্ষণ চুপচাপ গাড়ি চালাচ্ছিল, কিন্তু গুলশানের নিরিবিলি রাস্তায় ঢুকতেই তার রূপ এক সেকেন্ডে বদলে গেল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গলার স্বর নেমে গেল এক হিমশীতল স্তরে।

সে স্টিয়ারিং হুইলে চাপ দিয়ে বলল, "রেস্তোরাঁয় ওভাবে হাটের সস্তা মেয়েদের মতো উচ্চস্বরে হাসাটা বড্ড চিপ দেখায় জোয়া। তুমি আসিফ চৌধুরীর ওয়াইফ। একজন সফিস্টিকেটেড উচ্চবিত্ত নারীর জানা উচিত সমাজে কখন, কতটা এবং কীভাবে হাসতে হয়। তোমার ওই খিলখিল শব্দটা আমার পার্টনারের সামনে আমার ইমেজটা নষ্ট করে দিচ্ছিল। নেক্সট টাইম যেন আমি এমন সস্তা আচরণ না দেখি।"

জোয়া গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জলও পড়ল না, কিন্তু তার ভেতরের সেই অবদমিত রাগটা এবার একটা আগ্নেয়গিরির রূপ নিতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, আসিফ কেবল তার শরীর বা পোশাক নয়; তার ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসা আনন্দের শব্দটুকুও নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।

একই সময়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক চটচটে, নোংরা প্লাস্টিকের চেয়ার-টেবিলে সাজানো ক্যাফেটেরিয়াতে বসে ছিল এস্থার। টেবিলের ওপর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ আর কিছু আধখাওয়া সিঙ্গারা ছড়ানো। এস্থার তার ক্লাসের কয়েকজন বন্ধুর সাথে একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাডেমিক অ্যাসাইনমেন্টের তত্ত্ব নিয়ে তর্ক করছিল। আলোচনার বিষয় ছিল—উন্নয়নের নামে কীভাবে আদিবাসী মানুষদের তাদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

এস্থার নিজের জাতির এই আজন্ম লড়াই নিয়ে কথা বলার সময় স্বাভাবিকভাবেই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল। সে যখন নিজের যুক্তিটা একটু জোর দিয়ে, গলার আওয়াজ সামান্য চড়া করে বলছিল, ঠিক তখনই তার সহপাঠী ছেলে, রাকিব, হঠাৎ টেবিল চাপড়ে বলে উঠল, "আরে এস্থার! তুমি এত চিল্লাচ্ছ কেন বলো তো? এটা তো কোনো খাসিয়া পাড়ার সালিশি বৈঠক না যে এভাবে চিৎকার করে কথা বলতে হবে। মেয়েদের গলার আওয়াজ এত উগ্র আর চড়া হলে ছেলেরা কিন্তু ভয় পেয়ে যাবে। একটু সফট টোনে, মেয়েদের মতো করে কথা বলতে শেখো।"

ক্যাফেটেরিয়ার আশেপাশের টেবিল থেকে কয়েকজন ছাত্র আর সিনিয়র ভাইরা খিলখিল করে হেসে উঠল। এস্থার মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখের ভেতরের শব্দগুলো যেন তার গলার কাছে এসে এক একটা পাথরের মতো জমাট বেঁধে গেল। সে বুঝতে পারল, এই প্রগতিশীল শিক্ষার আঙিনাতেও একজন নারীর মেধা বা যুক্তির চেয়ে তার গলার ‘ডেসিবেল’টা পুরুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে সবসময় নিচু স্বরের, বিনীত এবং নীরব দেখতে চায়। নারী যখনই নিজের অধিকার বা যুক্তির জন্য গলার আওয়াজ উঁচিয়ে তোলে, তখনই সমাজ তাকে ‘উগ্র’, ‘অসভ্য’ বা ‘অবাধ্য’ বলে তকমা দিয়ে দেয়।

ওদিকে মফস্বলের সেই নিস্তব্ধ বাড়িতে প্রিয়ংবদা প্রতিদিন এই একই অদৃশ্য চাবুকের মুখোমুখি হচ্ছিল। রাত তখন সাড়েনয়টা। ডিনার টেবিলে বিকাশ চ্যাটার্জি খুব ঠান্ডা মাথায় প্রিয়াকে বলছিলেন যে, আগামী মাস থেকে প্রিয়াকে কলেজের থিয়েটার ক্লাবের দায়িত্বটা ছেড়ে দিতে হবে। কারণ সেখানে নাকি পুরুষ সহকর্মীদের সাথে তাকে অনেক রাত পর্যন্ত মিটিং করতে হয়।

প্রিয়া চামচটা প্লেটের ওপর রেখে সোজা হয়ে বসল। সে বলল, "বিকাশ, থিয়েটার ক্লাবটা আমি নিজের মেধা আর খাটুনি দিয়ে দাঁড় করিয়েছি। সেখানে কোনো নোংরামি হয় না। আর আমি কোনো অন্যায় করছি না যে আমাকে মাঝপথে এটা ছেড়ে দিতে হবে। তুমি এভাবে আমার প্রফেশনাল লাইফ নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না।"

বিকাশের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে এক কুৎসিত শাসকের রূপ নিল। সে তার হাতের জলের গ্লাসটা ডাইনিং টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল। সে প্রিয়ার দিকে আঙুল উঁচিয়ে অত্যন্ত নিচু কিন্তু ধারালো গলায় বলল, "মুখ সামলে কথা বলো প্রিয়া! গলার আওয়াজ একদম নিচে নামাও। এটা তোমার বাপের বাড়ি নয় যে যখন খুশি যেভাবে খুশি বরের মুখের ওপর চিল্লাইয়া কথা বলবে। এই বাড়িতে থাকতে হলে আমার নিয়ম মেনে, মাথা নিচু করে কথা বলতে হবে। মেয়েমানুষের গলার আওয়াজ ডাইনিং রুমের বাইরে গেলে সেই ঘরের আভিজাত্য শেষ হয়ে যায়।"

‘বাপের বাড়ি নয়’—এই একটা চিরন্তন পুরুষতান্ত্রিক বাক্য প্রিয়ার ভেতরের সমস্ত লড়াকু সত্ত্বাকে এক মুহূর্তে পিষে গুঁড়িয়ে দিল। এই উপমহাদেশে একজন নারী বিয়ের পর নিজের ঘর বলতে কোনো জায়গাই খুঁজে পায় না। বাপের বাড়ি পর হাত, আর স্বামীর বাড়ি এক পরম কয়েদখানা।

এই কণ্ঠস্বর চেপে রাখার, হাসির ডেসিবেল মেপে দেওয়ার এবং পোশাকের নিচ্ছিদ্র দেওয়াল তোলার সংস্কৃতি এই চারজন নারীর ভেতরেই—জোয়া, প্রিয়া, এস্থার এবং ফাতেমার অন্তরে এক নীরব, বিস্ফোরক ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছিল। তাদের ভেতরের এই অবদমিত কাম, রাগ আর স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষাগুলো এখন আর কেবল ফ্যান্টাসির জগতে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না। তা এক ভয়ঙ্কর বারুদে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা প্রকাশের জন্য একটা সঠিক, নিখুঁত এবং চরম ধ্বংসাত্মক মুহূর্তের অপেক্ষা করছে মাত্র। তারা চারজনই মনে মনে জানত, যেদিন এই বাঁধন ছিঁড়বে, সেদিন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কোনো দেওয়ালই তাদের আটকে রাখতে পারবে না।
[+] 2 users Like Moan_A_Dev's post
Like Reply


Messages In This Thread
অরণ্যের গোপন আদিমতা - ৬ (শব্দের শেকল ও অদৃশ্য থাবা) - by Moan_A_Dev - 11-06-2026, 08:40 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)