11-06-2026, 03:24 PM
পঞ্চম অধ্যায়: মাপা কাপড়ের খাঁচা ও প্রকাশ্য লালসা
পরদিন সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন দিয়ে। গুলশানের সেই বিলাসবহুল পেন্টহাউসের ওয়াক-ইন ক্লোজেটের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল জোয়া। বাইরে তখন সকালের নরম রোদ চুইয়ে পড়ছে কাঁচের দেওয়াল বেয়ে। আলমারি খুলে সে একটা হালকা বেগুনি রঙের স্লিভলেস কটন শাড়ি বের করল। গরমের এই দিনগুলোয় এই শাড়িটা পরলে তার ত্বক কিছুটা শ্বাস নিতে পারে, নিজেকে একটু স্বাধীন মনে হয়। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে সে যখন আঁচলটা ঠিক করছিল, ঠিক তখনই আসিফ ওয়াশরুম থেকে বের হলো। তার মুখে তখনো শেভিং ক্রিমের সাদা ফেনা লেগে আছে, হাতে জ্বলজ্বলে রেজার।
আয়নায় জোয়ার স্লিভলেস ব্লাউজ আর উন্মুক্ত কাঁধের দিকে তাকিয়ে আসিফের হাতটা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তার চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা, পরিপাটি আভিজাত্যের মুখোশটা বজায় রইল। সে অত্যন্ত শান্ত, সুশীল গলায় বলল, "আজ আমাদের ক্লাবের কয়েকজন এলিট মেম্বার আসবে ফাইল সই করতে। তুমি বরং ওই ফুল-স্লিভ ঢাকাই জামদানিটা পরো, জোয়া। এই স্লিভলেস শাড়িতে তোমাকে বড্ড... কেমন যেন ক্যাজুয়াল আর একটু বেশি এক্সপোজড লাগে। আমার বন্ধুদের সামনে আমি চাই না তোমাকে নিয়ে কেউ কোনো আলগা কথা বলুক।"
আসিফ তাকে কোনো গালি দেয়নি, তার ওপর চিৎকারও করেনি। কিন্তু তার ওই "আলগা কথা" শব্দবন্ধ জোয়ার আত্মসম্মানে এক গভীর, অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করল। জোয়া আয়নায় আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে স্থির গলায় বলল, "আলগা কথা মানে কী আসিফ? এটা একটা সাধারণ সুতির শাড়ি। আর এখন যে গরম, তাতে এই পোশাকে আমি কমফোর্টেবল। তোমার বন্ধুরা কি আমার কাপড়ের দৈর্ঘ্য দেখতে আসে, নাকি ফাইল সই করতে?"
আসিফ রেজারের ফেনাটা একটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে জোয়ার দিকে এগিয়ে এলো। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, বিষাক্ত মৃদু হাসি। সে জোয়ার জাবড়ো করে ধরা শাড়ির আঁচলটার ওপর নিজের হাত রাখল। স্পর্শটা যেন একটা ঠান্ডা শেকল। সে নরম কিন্তু নিরেট গলায় বলল, "তুমি বড্ড ইমোশনাল হয়ে যাও জোয়া। পুরুষদের মনস্তত্ত্ব তুমি বোঝো না। ওটা একটা এলিট ক্লাব, সেখানকার পুরুষদের চাউনি বড্ড পরিমাপক। আমি ভয় পাই না সুইটহার্ট, আমি আসলে তোমার শরীরের ওপর অন্য কারও কাল্পনিক থাবা পড়তে দিতে চাই না। আমার সামাজিক মর্যাদার একটা দাম আছে। গো অ্যান্ড চেঞ্জ ইট, প্লিজ।"
জোয়া হাত থেকে শাড়িটা নামিয়ে রাখল। তার পুরো শরীর রাগে কাঁপছিল। তার মনে হলো, সে কোনো স্বাধীন মানুষ নয়; তার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি কাপড়ের মাপ, ব্লাউজের হাতার দৈর্ঘ্য—সবকিছু যেন আসিফের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে। সে একটা বন্ধী পুতুল, যাকে প্রতিদিন আসিফের পছন্দমতো পোশাকে সাজিয়ে ড্রইংরুমে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে।
ঠিক একই সময়ে, কয়েকশ কিলোমিটার দূরে মফস্বলের সেই ছায়াঘেরা পুরনো চুনকাম করা বাড়িতে প্রিয়ংবদা রেডি হচ্ছিল কলেজে যাওয়ার জন্য। বাইরে তখনো রাতের বৃষ্টির পর একটা স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা গরম ভাপ উঠছে মাটি থেকে। প্রিয়া একটা সুতির সাধারণ তাঁতের শাড়ি পরে যখন তার আঁচলটা বাম কাঁধে তুলে নিচ্ছিল, তখন ড্রইংরুমের ইজিচেয়ারে বসে নিজের মোটা ফ্রেমের চশমাটা মুছছিলেন বিকাশ চ্যাটার্জি। চশমাটা চোখের ওপর পরে সে প্রিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল। তার চাউনিতে একজন অধ্যাপকের গাম্ভীর্য যতটা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল একজন কড়া পাহারাদারের কর্তৃত্ব।
বিকাশ চ্যাটার্জি গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে কড়া গলায় বলল, "প্রিয়া, শাড়ির আঁচলটা বড্ড সরু করে রেখেছ। ওটাকে আরেকটু চওড়া করে পুরো বুকের ওপর টেনে দাও। ব্লাউজের গলাটাও বোধহয় একটু বেশি বড় হয়ে গেছে দর্জির ভুলের কারণে। কলেজের তরুণ ছেলেদের মনস্তত্ত্ব কিন্তু ভালো নয়। আজকালকার যুগের ছেলেদের চোখের ভাষা বড্ড নোংরা। একজন শিক্ষিকার পোশাক হওয়া উচিত একদম নিচ্ছিদ্র, চারপাশ থেকে ঢাকা, যাতে কোনো পুরুষ তোমার দিকে তাকানোর সাহস না পায়।"
প্রিয়া আয়নার দিকে তাকাল। তার সুতির শাড়ির আঁচলটা যথেষ্ট শালীনভাবেই জড়ানো ছিল, কিন্তু বিকাশের চোখে তা যেন এক মহা অপরাধ। প্রিয়া জোর করে নিজের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটাকে চেপে রেখে শান্ত গলায় বলল, "আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিকাশ। কলেজে আমি ক্লাস নিতে যাই, থিয়েটার করি। আমার পোশাক কতটা শালীন, তা নির্ধারণ করার বুদ্ধি আমার আছে। ছেলেদের চোখ নোংরা হলে শাসন ছেলেদের করা উচিত, আমার কাপড়কে কেন চাদর বানাতে হবে?"
বিকাশ চ্যাটার্জি তার হাতের খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর সশব্দে আছড়ে ফেলল। তার মুখটা রাগে অন্ধকার হয়ে গেল। সে বলল, "যুক্তি দেখাবে না প্রিয়া। এই উপমহাদেশে পুরুষরা নারীদের শরীরকে কেবল একটা কামনার বস্তু হিসেবেই দেখে। তুমি নিজেকে যত আধুনিকই ভাবো না কেন, রাস্তাঘাটে বের হলে তুমি স্রেফ একটা শরীর। আর আমি চাই না আমার স্ত্রীর শরীর নিয়ে কলেজের করিডোরে কোনো সস্তা আলোচনা হোক। আঁচলটা ঠিক করো, নয়তো আজ কলেজে যাওয়ার দরকার নেই।"
প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই পুরুষরা আসলে নারীদের সুরক্ষার নামে তাদের এক একটা জীবন্ত লাশে পরিণত করতে চায়। অথচ এই বিকাশ চ্যাটার্জিই রাতের অন্ধকারে ল্যাপটপের স্ক্রিনে অন্য কোনো অচেনা নারীর নগ্নতার খোঁজ করে। প্রিয়া জোর করে আঁচলটা আরও চওড়া করে বুকের ওপর টেনে পিন ফুটিয়ে দিল। কিন্তু তার মনে হলো, সেই সেফটিপিনের তীক্ষ্ণ ডগাটা আসলে তার নিজের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধছে। তার ভেতরের তীব্র রাগটা যেন সেই সুতির কাপড়ের নিচ্ছিদ্র বাঁধন ছিঁড়ে এক বুনো আগুনের মতো বেরিয়ে আসতে চাইল।
একই দিনে দুপুরের কড়া রোদে শহরের একটা ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল এস্থার। পিচগলা রাস্তার তপ্ত ভাপ আর শত শত গাড়ির কালো ধোঁয়া মিলে মিশে এক দমবন্ধ করা নরক তৈরি করেছে চারপাশ। এস্থারকে আজ একটা জরুরি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে অন্য একটা ক্যাম্পাসে যেতে হচ্ছে। একটা লোকাল বাস এসে হর্ন বাজিয়ে থামতেই চারপাশ থেকে একদল পুরুষ পঙ্গপালের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাসের দরজায়।
এস্থার যখন ভিড় ঠেলে বাসের হাতলটা ধরে ভেতরে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার পেছনে থাকা এক মাঝবয়সী লুঙ্গি আর শার্ট পরা লোক ইচ্ছে করেই নিজের শরীরটা এস্তারের পিঠের ওপর চেপে দিল। এস্থার তীব্র অস্বস্তিতে ঘুরে তাকিয়ে বলল, "আরে ভাই! ধাক্কা দিচ্ছেন কেন? একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ান।"
লোকটা একটা নির্বিকার, নোংরা হাসি হেসে বলল, "আরে আপা, বাসে উঠলে একটু-আধটু ছোঁয়া লাগবই। এত শরীর বাঁচাইয়া চললে পাবলিক বাসে চড়েন কেন? ট্যাক্সি ভাড়া কইরা যান।"
বাসের ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। এস্থার কোনোমতে লেডিস সিটের পাশে দাঁড়িয়ে হাতল ধরে ঝুলছিল। বাসের চাকা যখনই কোনো গর্তে পড়ছে বা ব্রেক কষছে, চারপাশের পুরুষ যাত্রীগুলো যেন সুযোগ পেয়ে গেল। এস্তারের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কলেজপড়ুয়া ছেলে কনুইটা এমনভাবে বাড়িয়ে রাখল, যা প্রতিবার বাসের ঝাঁকুনিতে এস্তারের স্তনের পাশে এসে সজোরে আঘাত করছিল। এস্থার নিজের ব্যাগটা বুকের সামনে তুলে ধরে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু চারপাশের লোলুপ চাউনিগুলো যেন তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও রেহাই দিচ্ছিল না।
বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে নিতে এস্তারের একদম গা ঘেঁষে চলে গেল। যাওয়ার সময় তার খসখসে নোংরা হাতটা ইচ্ছে করেই এস্তারের কোমরের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেল।
"এই যে আপা, ভাড়াটা দ্যান," কন্ডাক্টরের গলায় কোনো দ্বিধা নেই, যেন এই প্রকাশ্য হ্যারাসমেন্টটা তার নিত্যদিনের অধিকার।
"আপনি হাত দিচ্ছেন কেন? ভদ্রভাবে ভাড়া চাওয়া যায় না?" এস্থার চড়া গলায় চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসের পুরুষ যাত্রীরা এস্তারের দিকে তাকাল। কিন্তু তাদের চোখে কন্ডাক্টরের প্রতি কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল এস্তারের প্রতি এক অদ্ভুত অবজ্ঞা। বাসের এক কোণ থেকে এক বৃদ্ধ যাত্রী বলে উঠলেন, "আজকালকার মেয়েদের লজ্জা-শরম এক্কেবারে গেছে। বাসে একটু ছোঁয়া লাগতেই কী চিৎকার! পাহাড়ি মেয়ে তো, স্বভাবটাই বুনো। মেয়েদের এই জন্য একা একা বাইরে বের হতে নেই।"
এস্তারের চোখের কোণ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে তা গিলে ফেলল। তার মনে হলো, এই গণপরিবহনগুলো আসলে একেকটা বৈধ কয়েদখানা, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী তাদের অজান্তেই পুরুষদের নোংরা কামনার শিকার হচ্ছে। এই উপমহাদেশে একজন নারীর পোশাকের স্বাধীনতা, তার চলাফেরার নিরাপত্তা যে কতখানি আপেক্ষিক আর ভঙ্গুর—তা আজ এই তিন নারী তাদের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক স্তরে বসে সমান্তরালভাবে টের পাচ্ছিল।
পরদিন সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন দিয়ে। গুলশানের সেই বিলাসবহুল পেন্টহাউসের ওয়াক-ইন ক্লোজেটের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল জোয়া। বাইরে তখন সকালের নরম রোদ চুইয়ে পড়ছে কাঁচের দেওয়াল বেয়ে। আলমারি খুলে সে একটা হালকা বেগুনি রঙের স্লিভলেস কটন শাড়ি বের করল। গরমের এই দিনগুলোয় এই শাড়িটা পরলে তার ত্বক কিছুটা শ্বাস নিতে পারে, নিজেকে একটু স্বাধীন মনে হয়। শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে সে যখন আঁচলটা ঠিক করছিল, ঠিক তখনই আসিফ ওয়াশরুম থেকে বের হলো। তার মুখে তখনো শেভিং ক্রিমের সাদা ফেনা লেগে আছে, হাতে জ্বলজ্বলে রেজার।
আয়নায় জোয়ার স্লিভলেস ব্লাউজ আর উন্মুক্ত কাঁধের দিকে তাকিয়ে আসিফের হাতটা এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। তার চোখের মণি দুটো সামান্য সংকুচিত হলো, কিন্তু মুখে সেই চিরচেনা, পরিপাটি আভিজাত্যের মুখোশটা বজায় রইল। সে অত্যন্ত শান্ত, সুশীল গলায় বলল, "আজ আমাদের ক্লাবের কয়েকজন এলিট মেম্বার আসবে ফাইল সই করতে। তুমি বরং ওই ফুল-স্লিভ ঢাকাই জামদানিটা পরো, জোয়া। এই স্লিভলেস শাড়িতে তোমাকে বড্ড... কেমন যেন ক্যাজুয়াল আর একটু বেশি এক্সপোজড লাগে। আমার বন্ধুদের সামনে আমি চাই না তোমাকে নিয়ে কেউ কোনো আলগা কথা বলুক।"
আসিফ তাকে কোনো গালি দেয়নি, তার ওপর চিৎকারও করেনি। কিন্তু তার ওই "আলগা কথা" শব্দবন্ধ জোয়ার আত্মসম্মানে এক গভীর, অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করল। জোয়া আয়নায় আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে স্থির গলায় বলল, "আলগা কথা মানে কী আসিফ? এটা একটা সাধারণ সুতির শাড়ি। আর এখন যে গরম, তাতে এই পোশাকে আমি কমফোর্টেবল। তোমার বন্ধুরা কি আমার কাপড়ের দৈর্ঘ্য দেখতে আসে, নাকি ফাইল সই করতে?"
আসিফ রেজারের ফেনাটা একটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে জোয়ার দিকে এগিয়ে এলো। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, বিষাক্ত মৃদু হাসি। সে জোয়ার জাবড়ো করে ধরা শাড়ির আঁচলটার ওপর নিজের হাত রাখল। স্পর্শটা যেন একটা ঠান্ডা শেকল। সে নরম কিন্তু নিরেট গলায় বলল, "তুমি বড্ড ইমোশনাল হয়ে যাও জোয়া। পুরুষদের মনস্তত্ত্ব তুমি বোঝো না। ওটা একটা এলিট ক্লাব, সেখানকার পুরুষদের চাউনি বড্ড পরিমাপক। আমি ভয় পাই না সুইটহার্ট, আমি আসলে তোমার শরীরের ওপর অন্য কারও কাল্পনিক থাবা পড়তে দিতে চাই না। আমার সামাজিক মর্যাদার একটা দাম আছে। গো অ্যান্ড চেঞ্জ ইট, প্লিজ।"
জোয়া হাত থেকে শাড়িটা নামিয়ে রাখল। তার পুরো শরীর রাগে কাঁপছিল। তার মনে হলো, সে কোনো স্বাধীন মানুষ নয়; তার শরীরের প্রতিটি ইঞ্চি কাপড়ের মাপ, ব্লাউজের হাতার দৈর্ঘ্য—সবকিছু যেন আসিফের সামাজিক প্রতিপত্তি আর পুরুষতান্ত্রিক অহংকারের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হচ্ছে। সে একটা বন্ধী পুতুল, যাকে প্রতিদিন আসিফের পছন্দমতো পোশাকে সাজিয়ে ড্রইংরুমে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে।
ঠিক একই সময়ে, কয়েকশ কিলোমিটার দূরে মফস্বলের সেই ছায়াঘেরা পুরনো চুনকাম করা বাড়িতে প্রিয়ংবদা রেডি হচ্ছিল কলেজে যাওয়ার জন্য। বাইরে তখনো রাতের বৃষ্টির পর একটা স্যাঁতসেঁতে ভ্যাপসা গরম ভাপ উঠছে মাটি থেকে। প্রিয়া একটা সুতির সাধারণ তাঁতের শাড়ি পরে যখন তার আঁচলটা বাম কাঁধে তুলে নিচ্ছিল, তখন ড্রইংরুমের ইজিচেয়ারে বসে নিজের মোটা ফ্রেমের চশমাটা মুছছিলেন বিকাশ চ্যাটার্জি। চশমাটা চোখের ওপর পরে সে প্রিয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল। তার চাউনিতে একজন অধ্যাপকের গাম্ভীর্য যতটা ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল একজন কড়া পাহারাদারের কর্তৃত্ব।
বিকাশ চ্যাটার্জি গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে কড়া গলায় বলল, "প্রিয়া, শাড়ির আঁচলটা বড্ড সরু করে রেখেছ। ওটাকে আরেকটু চওড়া করে পুরো বুকের ওপর টেনে দাও। ব্লাউজের গলাটাও বোধহয় একটু বেশি বড় হয়ে গেছে দর্জির ভুলের কারণে। কলেজের তরুণ ছেলেদের মনস্তত্ত্ব কিন্তু ভালো নয়। আজকালকার যুগের ছেলেদের চোখের ভাষা বড্ড নোংরা। একজন শিক্ষিকার পোশাক হওয়া উচিত একদম নিচ্ছিদ্র, চারপাশ থেকে ঢাকা, যাতে কোনো পুরুষ তোমার দিকে তাকানোর সাহস না পায়।"
প্রিয়া আয়নার দিকে তাকাল। তার সুতির শাড়ির আঁচলটা যথেষ্ট শালীনভাবেই জড়ানো ছিল, কিন্তু বিকাশের চোখে তা যেন এক মহা অপরাধ। প্রিয়া জোর করে নিজের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটাকে চেপে রেখে শান্ত গলায় বলল, "আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী বিকাশ। কলেজে আমি ক্লাস নিতে যাই, থিয়েটার করি। আমার পোশাক কতটা শালীন, তা নির্ধারণ করার বুদ্ধি আমার আছে। ছেলেদের চোখ নোংরা হলে শাসন ছেলেদের করা উচিত, আমার কাপড়কে কেন চাদর বানাতে হবে?"
বিকাশ চ্যাটার্জি তার হাতের খবরের কাগজটা টেবিলের ওপর সশব্দে আছড়ে ফেলল। তার মুখটা রাগে অন্ধকার হয়ে গেল। সে বলল, "যুক্তি দেখাবে না প্রিয়া। এই উপমহাদেশে পুরুষরা নারীদের শরীরকে কেবল একটা কামনার বস্তু হিসেবেই দেখে। তুমি নিজেকে যত আধুনিকই ভাবো না কেন, রাস্তাঘাটে বের হলে তুমি স্রেফ একটা শরীর। আর আমি চাই না আমার স্ত্রীর শরীর নিয়ে কলেজের করিডোরে কোনো সস্তা আলোচনা হোক। আঁচলটা ঠিক করো, নয়তো আজ কলেজে যাওয়ার দরকার নেই।"
প্রিয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে বুঝতে পারল, এই পুরুষরা আসলে নারীদের সুরক্ষার নামে তাদের এক একটা জীবন্ত লাশে পরিণত করতে চায়। অথচ এই বিকাশ চ্যাটার্জিই রাতের অন্ধকারে ল্যাপটপের স্ক্রিনে অন্য কোনো অচেনা নারীর নগ্নতার খোঁজ করে। প্রিয়া জোর করে আঁচলটা আরও চওড়া করে বুকের ওপর টেনে পিন ফুটিয়ে দিল। কিন্তু তার মনে হলো, সেই সেফটিপিনের তীক্ষ্ণ ডগাটা আসলে তার নিজের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধছে। তার ভেতরের তীব্র রাগটা যেন সেই সুতির কাপড়ের নিচ্ছিদ্র বাঁধন ছিঁড়ে এক বুনো আগুনের মতো বেরিয়ে আসতে চাইল।
একই দিনে দুপুরের কড়া রোদে শহরের একটা ব্যস্ত বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল এস্থার। পিচগলা রাস্তার তপ্ত ভাপ আর শত শত গাড়ির কালো ধোঁয়া মিলে মিশে এক দমবন্ধ করা নরক তৈরি করেছে চারপাশ। এস্থারকে আজ একটা জরুরি অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে অন্য একটা ক্যাম্পাসে যেতে হচ্ছে। একটা লোকাল বাস এসে হর্ন বাজিয়ে থামতেই চারপাশ থেকে একদল পুরুষ পঙ্গপালের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ল বাসের দরজায়।
এস্থার যখন ভিড় ঠেলে বাসের হাতলটা ধরে ভেতরে ওঠার চেষ্টা করছিল, ঠিক তখনই তার পেছনে থাকা এক মাঝবয়সী লুঙ্গি আর শার্ট পরা লোক ইচ্ছে করেই নিজের শরীরটা এস্তারের পিঠের ওপর চেপে দিল। এস্থার তীব্র অস্বস্তিতে ঘুরে তাকিয়ে বলল, "আরে ভাই! ধাক্কা দিচ্ছেন কেন? একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ান।"
লোকটা একটা নির্বিকার, নোংরা হাসি হেসে বলল, "আরে আপা, বাসে উঠলে একটু-আধটু ছোঁয়া লাগবই। এত শরীর বাঁচাইয়া চললে পাবলিক বাসে চড়েন কেন? ট্যাক্সি ভাড়া কইরা যান।"
বাসের ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। এস্থার কোনোমতে লেডিস সিটের পাশে দাঁড়িয়ে হাতল ধরে ঝুলছিল। বাসের চাকা যখনই কোনো গর্তে পড়ছে বা ব্রেক কষছে, চারপাশের পুরুষ যাত্রীগুলো যেন সুযোগ পেয়ে গেল। এস্তারের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কলেজপড়ুয়া ছেলে কনুইটা এমনভাবে বাড়িয়ে রাখল, যা প্রতিবার বাসের ঝাঁকুনিতে এস্তারের স্তনের পাশে এসে সজোরে আঘাত করছিল। এস্থার নিজের ব্যাগটা বুকের সামনে তুলে ধরে নিজেকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু চারপাশের লোলুপ চাউনিগুলো যেন তাকে এক সেকেন্ডের জন্যও রেহাই দিচ্ছিল না।
বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া নিতে নিতে এস্তারের একদম গা ঘেঁষে চলে গেল। যাওয়ার সময় তার খসখসে নোংরা হাতটা ইচ্ছে করেই এস্তারের কোমরের ওপর দিয়ে টেনে নিয়ে গেল।
"এই যে আপা, ভাড়াটা দ্যান," কন্ডাক্টরের গলায় কোনো দ্বিধা নেই, যেন এই প্রকাশ্য হ্যারাসমেন্টটা তার নিত্যদিনের অধিকার।
"আপনি হাত দিচ্ছেন কেন? ভদ্রভাবে ভাড়া চাওয়া যায় না?" এস্থার চড়া গলায় চিৎকার করে উঠল।
মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসের পুরুষ যাত্রীরা এস্তারের দিকে তাকাল। কিন্তু তাদের চোখে কন্ডাক্টরের প্রতি কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল এস্তারের প্রতি এক অদ্ভুত অবজ্ঞা। বাসের এক কোণ থেকে এক বৃদ্ধ যাত্রী বলে উঠলেন, "আজকালকার মেয়েদের লজ্জা-শরম এক্কেবারে গেছে। বাসে একটু ছোঁয়া লাগতেই কী চিৎকার! পাহাড়ি মেয়ে তো, স্বভাবটাই বুনো। মেয়েদের এই জন্য একা একা বাইরে বের হতে নেই।"
এস্তারের চোখের কোণ দিয়ে জল বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে তা গিলে ফেলল। তার মনে হলো, এই গণপরিবহনগুলো আসলে একেকটা বৈধ কয়েদখানা, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী তাদের অজান্তেই পুরুষদের নোংরা কামনার শিকার হচ্ছে। এই উপমহাদেশে একজন নারীর পোশাকের স্বাধীনতা, তার চলাফেরার নিরাপত্তা যে কতখানি আপেক্ষিক আর ভঙ্গুর—তা আজ এই তিন নারী তাদের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক স্তরে বসে সমান্তরালভাবে টের পাচ্ছিল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)