Thread Rating:
  • 5 Vote(s) - 4.2 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস?
#1
Video 
‘দি কাউ ইজ আ ভেরি ইউজফুল অ্যানিমেল। বাট ইন মাই কান্ট্রি, ট্রাফিক জ্যাম ইজ মোর ইউজফুল। বিকজ ইট টিচেস আস পেশেন্স...’
সকাল সাতটায় আমার ঘুম ভাঙল এই অদ্ভুত ইংরেজি শুনে। কণ্ঠস্বরটা তুহিনের। সে আমার পাশের রুমেই থাকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে এখন খুব সম্ভবত হাত-পা নেড়ে আইইএলটিএস (IELTS)-এর স্পিকিং টেস্টের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে যুক্তরাজ্যে যাবে। সে জন্য সে গরুর রচনার সাথে ট্রাফিক জ্যাম মিশিয়ে এক অভিনব দর্শনের জন্ম দিচ্ছে।
আমি বিছানায় উঠে বসলাম।
মেস বলতে সাধারণত মানুষের চোখে যে ছবিটা ভাসে— ঘিঞ্জি একটা ঘর, দড়িতে লুঙ্গি ঝুলছে, ছারপোকা মারা তোশক আর ডাইনিং টেবিলে তরকারির হলুদ দাগ— আমাদের বাসাটা ঠিক তেমন না। মিরপুরের এই বাসাটায় চারটা রুম। আমরা চারজন ব্যাচেলর থাকি। ভাড়া বিশ হাজার। প্রত্যেকে পাঁচ হাজার করে দিই। এর বাইরে বিদ্যুৎ, পানি আর গ্যাসের বিল ভাগাভাগি হয়।
আমাদের খাওয়া-দাওয়ার সিস্টেমটাও একটু অন্যরকম। মেসে সাধারণত দুই বেলা মিল থাকে, আমাদের এখানে তা নেই। দুপুরে আমরা সবাই যার যার অফিস বা কাজে বাইরে থাকি, তাই দুপুরের খাবারের কোনো ঝামেলা নেই। রহিমা খালা নামের একজন বয়স্ক মহিলা সন্ধ্যাবেলা আসেন। শুধু রাতের রান্নাটা করে দিয়ে চলে যান।
আমরা চারজনের মধ্যে তিনজনই ছোটখাটো চাকরি করি। শুধু তুহিন কিছু করে না। তার কাজ হলো সারাদিন ইংলিশ মুভি দেখা আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজদের মতো উচ্চারণ করার বৃথা চেষ্টা করা। ওর বাবা-মা গ্রাম থেকে টাকা পাঠান, সেই টাকায় তার দিব্যি চলে যায়।
আমি খাট থেকে নেমে মুখ ধুতে গেলাম। তুহিনের রুমের দরজা খোলা। আমাকে দেখতে পেয়েই সে চওড়া হাসি দিল।
‘ব্রাদার রাশেদ, গুড মর্নিং! হাউ ইজ দ্য ওয়েদার টুডে?’
আমি তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললাম, ‘ওয়েদার ভালো। তবে তুমি গরুর রচনার সাথে ট্রাফিক জ্যাম কেন মেলাচ্ছ, সেটা বুঝতে পারছি না। এক্সামিনার যদি জিজ্ঞেস করে তোমার প্রিয় প্রাণী কী, তুমি কি বলবে ট্রাফিক জ্যাম?’ তুহিন একটুও দমল না। ‘ভাই, আপনি বুঝবেন না। আইইএলটিএস-এ লজিক দেখে না, দেখে ফ্লুয়েন্সি। আপনি কত কনফিডেন্টলি গাঁজাখুরি কথা ইংরেজিতে বলতে পারেন, সেটাই হলো মেইন ফ্যাক্ট।’
কথা মন্দ বলেনি। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষই তো এই থিওরিতে চলছে। কে কত কনফিডেন্টলি মিথ্যা বলতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করে তার সফলতা।


আমি নিজের রুমে ফিরে এলাম। আমার রুমটা বেশ ছিমছাম। এক পাশে একটা সিঙ্গল খাট, আরেক পাশে ছোট একটা পড়ার টেবিল। টেবিলের ওপর কয়েকটা ডিকশনারি, ল্যাপটপ আর ছড়ানো ছিটানো কিছু কাগজ।

টেবিলের ওপর রাখা আমার মানিব্যাগটার দিকে চোখ পড়ল। মাসের দশ তারিখ পেরিয়েছে। পকেটের অবস্থা ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করেছে। আমার অফিস থেকে বেতন দেয় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। এই পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে। এরা মাসের এক তারিখে দলবেঁধে আমার অ্যাকাউন্টে ঢোকে, আর দশ তারিখের ভেতর এরা হাওয়া হয়ে যায়।

মিরপুরে এই চার রুমের ফ্লাটের একটা রুমের ভাড়া, রহিমা খালার বেতন, বাজারের টাকা, অফিসে যাওয়া-আসা, দুপুরের খাওয়া আর আমার দৈনিক এক প্যাকেট সিগারেটের খরচ মিলিয়ে পঁচিশ হাজার টাকা কীভাবে যেন উড়ে যায়। বাকি থাকে দশ হাজার। এই দশ হাজার টাকা আমি অত্যন্ত পবিত্র মনে করে মাসের শুরুতে নওগাঁয় বাবার কাছে পাঠিয়ে দিই।

আমি নওগাঁর ছেলে। পড়াশোনা করেছি নওগাঁ জিলা কলেজে। আহামরি কোনো ছাত্র ছিলাম না। ক্লাসের ফার্স্ট বয় বা সেকেন্ড বয় টাইপ ছেলেদের আমার সবসময় ভিনগ্রহের প্রাণী মনে হতো। আমি ছিলাম মাঝামাঝি গোত্রের। তবে আমার একটা অদ্ভুত শখ ছিল। বই পড়া আর সিনেমা দেখা। লুকিয়ে লুকিয়ে সেবা প্রকাশনীর বই পড়া আর সুযোগ পেলেই হলে গিয়ে সিনেমা দেখা।
জিলা কলেজ থেকে পাস করে নওগাঁ কলেজে ভর্তি হলাম। সেখানেও পড়াশোনার একই ধারা। কিন্তু কীভাবে কীভাবে যেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেলাম। শুধু টিকেই গেলাম না, সাবজেক্ট পেয়ে গেলাম জার্নালিজম!

আমার বাবা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তার ধারণা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম পড়া মানেই পাস করে বের হওয়ার সাথে সাথে আমি টেলিভিশনের পর্দায় বুম হাতে দাঁড়িয়ে যাব। সারা দেশের মানুষ আমাকে দেখবে।

বাস্তবতা যে কতটা ভিন্ন, তা আমি ঢাকায় এসে বুঝেছি। জার্নালিজম পাস করে আমি এখন কাজ করি ‘ঢাকা পেপারস’ নামের একটা অনলাইন পোর্টালে। সেখানে আমি ইন্টারন্যাশনাল ডেস্কে বসে বিদেশি খবর বাংলায় অনুবাদ করি। সোজা কথায়, আমি একজন অনুবাদক। টেলিভিশনের পর্দায় আমাকে কেউ দেখে না। আমার নামের বাইলাইনটাও খবরের একদম নিচে এমন ছোট করে দেওয়া থাকে যে, আতশ কাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়।

তবুও বাবা খুশি। তিনি গ্রামের ভুসিমালের দোকানে বসে চা খেতে খেতে এলাকার লোকদের বলেন, ‘আমার বড় ছেলে ঢাকা পেপারসে আন্তর্জাতিক খবর সামলায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কী পলিসি নিল, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোথায় বোমা মারল— সব আমার ছেলের হাত দিয়ে পাস হয়ে দেশে ছড়ায়।’

বাবার এই আনন্দটুকুর জন্যই আমি মাসের শুরুতে দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিই।

ল্যাপটপটা অন করতেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকালাম। মায়ের কল।

সকালবেলা মায়ের ফোন আসা মানেই কোনো না কোনো দুঃসংবাদ। সুসংবাদ দেওয়ার জন্য মায়েরা সাধারণত দুপুরবেলা বেছে নেন। আমি ফোন ধরলাম, ‘হ্যালো মা, বলো।’ মায়ের গলা কাঁপছে। ‘রাশেদ, তুই কি অফিসে যাস?’
‘না, মাত্র উঠলাম। কী হয়েছে? বাবা ঠিক আছে তো?’
‘তোর বাপ ঠিক আছে। কিন্তু তোর ছোট ভাই নিহাদ তো একটা কাণ্ড করে বসছে।’

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নিহাদ, আমার ছোট ভাই। আমার চেয়ে ৬ বছরের ছোট। খুব উড়নচণ্ডী। পড়াশোনায় একদম মন নেই। আমি বললাম, ‘কী কাণ্ড? আবার কারও সাথে মারামারি করেছে?’


‘মারামারি না। কাল রাতে বন্ধুদের সাথে কার যেন একটা মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে গেছিল। রাস্তায় স্লিপ কেটে পড়ে বাইকের সামনের অংশ পুরা ভাইঙ্গা ফেলছে। যার বাইক, সে এখন ক্ষতিপূরণ চায়।’

‘ক্ষতিপূরণ কত চায়?’

‘দশ হাজার টাকা। তোর বাপ তো শুনেই রেগে আগুন। বলছে, সে এক টাকাও দেবে না। ছেলে জেলে গেলে যাক। কিন্তু আমি তো মা, আমি ক্যামনে সহ্য করি বল? লোকটা আজ সকালেও আইসা দোকানের সামনে চিল্লাচিল্লি করছে।’

আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘মা, তুমি বাবাকে কিছু বোলো না। আমি দেখছি। নিহাদকে একটু সাবধানে থাকতে বোলো। ঢাকা শহর হলে কথা ছিল, নওগাঁর মতো জায়গায় এত স্পিডে বাইক চালানোর কী আছে?’

মা একটু আশ্বস্ত হলেন। ‘তুই টাকা পাঠাবি?’
‘হ্যাঁ, পাঠাব। তুমি টেনশন কোরো না।’

ফোন রেখে আমি আমার ল্যাপটপের এক্সেল শিটটা খুললাম। সেখানে আমার সেভিংসের একটা হিসাব রাখা আছে।

আমার আয়ের আরেকটা উৎস আছে। আমি ‘চন্দ্রবিন্দু’ নামের একটা প্রকাশনীতে পার্ট-টাইম প্রুফ রিডারের কাজ করি। অন্যের লেখা ভুল বানানের পাণ্ডুলিপি লাল কালি দিয়ে শুদ্ধ করা। কাজটা বিরক্তিকর হলেও আমি মনোযোগ দিয়ে করি। তাছাড়া বাজারে আমার নিজের অনুবাদ করা দুটো বই আছে। বই দুটো মোটামুটি চলে। এদেশে অনুবাদকের খুব একটা দাম নেই, তবে মাস শেষে কিছু রয়্যালটি আসে।

প্রুফ দেখা আর বইয়ের রয়্যালটি মিলিয়ে প্রকাশনী থেকে আমার মাসে হাজার দশেক টাকা আসে। এই টাকাটা আমি কখনো ছুঁয়েও দেখি না। এটা সোজা আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে চলে যায়।

বাবার একটা স্বপ্ন ছিল, জীবনে একবার হজ করবেন। কিন্তু ভুসিমালের দোকান চালিয়ে সংসার চালানোর পর হজের টাকা জমানো তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমার স্বপ্ন, বাবাকে হজ না হোক, অন্তত উমরাহটা করাব। মাকেও সাথে পাঠাব।

আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, দুজনের উমরাহ প্যাকেজে প্রায় তিন লাখ টাকার মতো লাগবে। আমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে গতকাল পর্যন্ত জমা ছিল এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা।

আমি এক্সেল শিটে এক লাখ চল্লিশ হাজার থেকে দশ হাজার বিয়োগ করলাম। সংখ্যাটা নেমে এলো এক লাখ ত্রিশ হাজারে। আমার স্বপ্নটা আরও কয়েক মাসের জন্য পিছিয়ে গেল।

হিসাবটা মেলাতেই আমার মনটা খারাপ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলো না। আমার মনে এক ধরনের অদ্ভুত নির্লিপ্ততা কাজ করে। যেকোনো পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আমার আছে। আমি জানি, জীবনে দুই আর দুইয়ে সবসময় চার হয় না। মাঝে মাঝে বাইশও হয়ে যায়, আবার শূন্যও হয়ে যায়।

আমি শার্ট গায়ে দিয়ে বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।

মিরপুর দশ নাম্বার থেকে কারওয়ান বাজার যাওয়ার বাস ধরতে হবে। আমার অফিসের শিফট শুরু হয় সকাল দশটায়। দশ নাম্বারের গোলচত্বরে এসে দাঁড়ালে মনে হয়, ঢাকা শহরে মানুষের চেয়ে বাসের সংখ্যা বেশি, আবার বাসে ওঠার সময় মনে হয় বাসের চেয়ে মানুষের সংখ্যা বেশি। এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা।

একটা ‘বিকল্প অটো’ বাস এসে দাঁড়াল। আমি ভিড় ঠেলে ওঠার চেষ্টা করলাম। ঢাকা শহরে বাসে ওঠার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। এখানে ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ বা সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট থিওরি কাজ করে। যে যত বেশি কনুই চালাতে পারবে, সে তত সহজে বাসে উঠতে পারবে।

আমি কনুই চালিয়ে বাসের ভেতরে জায়গা করে নিলাম। বসার সিট নেই। হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকতে হবে। আমার ঠিক পাশেই এক ভদ্রলোক অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে তার চশমার কাঁচ মুছছেন।

ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ভাই, ঢাকা শহরটা একটা গ্যাস চেম্বার হয়ে গেছে, খেয়াল করেছেন?’
আমি মাথা নাড়লাম, ‘জি। তবে গ্যাস চেম্বারে সাধারণত বাস চলে না, এখানে চলছে।’

ভদ্রলোক আমার রসবোধ বুঝলেন না। তিনি গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমি মতিঝিল যাচ্ছি। এই জ্যাম ঠেলে কখন পৌঁছাব আল্লাহ মালুম। আপনি কী করেন ভাই?’
‘আমি অনুবাদ করি।’
‘অনুবাদ? মানে কোর্ট-কাচারির দলিল-দস্তাবেজ?’
‘না। বিদেশি খবর অনুবাদ করি। একটা অনলাইন পত্রিকায়।’

ভদ্রলোক একটু হতাশ হলেন বলে মনে হলো। ‘ও আচ্ছা। খবর। দেশে তো খবরের অভাব নেই, আবার বিদেশি খবর! কে পড়ে এসব?’

কথাটা খুব একটা মিথ্যা না। আমাদের দেশের মানুষের অন্যের হাঁড়ির খবর জানার আগ্রহ বেশি। ট্রাম্প আমেরিকায় কী করল, তার চেয়ে পাশের বাড়ির ভাবি কেন আজকে শাড়ি পরে বের হলো, সেই খবর এদেশের মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাস কারওয়ান বাজার পৌঁছাতে পৌঁছাতে দশটা বেজে গেল। আমি বাস থেকে নেমে ‘ঢাকা পেপারস’-এর অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

আমাদের অফিসটা একটা কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ের পাঁচতলায়। অফিসে ঢুকতেই নিউজ রুমের চিরাচরিত কোলাহল কানে এল। সবাই ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে খটখট করে টাইপ করছে। কেউ কেউ ফোনে চিৎকার করে কথা বলছে।

আমি আমার ডেস্কে গিয়ে বসলাম। ডেস্কটা একদম কোণায়। জানালা দিয়ে বাইরের রাস্তা দেখা যায়। আমি ল্যাপটপ অন করতেই আমাদের শিফট ইনচার্জ এহসান ভাই আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

এহসান ভাইয়ের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। মাথার চুল সামনের দিকে বেশ পাতলা। তিনি সারাক্ষণ একটা অদ্ভুত তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকেন। পৃথিবীতে যেন এইমাত্র বিরাট কোনো প্রলয় ঘটে গেছে এবং সেটা ব্রেকিং নিউজ হিসেবে না দেওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই, এমন একটা ভাব।

‘রাশেদ, আজকে কিন্তু বেশ কয়েকটা ইম্পর্ট্যান্ট নিউজ আছে। জলদি হাত চালাও।’

আমি বললাম, ‘কী নিউজ ভাই?’

এহসান ভাই একটা প্রিন্ট করা কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ‘ফ্রান্সের এক লোক তার সমস্ত সম্পত্তি একটা বিড়ালকে উইল করে দিয়েছে। বিড়ালটার নাম হচ্ছে লুসি। লুসির নামে এখন নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, গাড়ি আর ড্রাইভার আছে। নিউজটা একটু রসিয়ে রসিয়ে লিখবে। মানুষ এসব পড়তে খুব পছন্দ করে।’

আমি কাগজটার দিকে তাকালাম। আমার এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকার সেভিংস আর নিহাদের বাইকের ক্ষতিপূরণ বিশ হাজার টাকার কথা মনে পড়ল। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লুসি নামের কোটিপতি বিড়ালের খবরটা বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করলাম।

অনুবাদ করতে করতে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি যদি ফ্রান্সের ওই বিড়ালটা হতাম, তাহলে আমার বাবা-মাকে উমরাহ করতে পাঠাতে কোনো সমস্যাই হতো না। হয়তো লুসি নিজেই একদিন মক্কায় গিয়ে উমরাহ করে আসবে, কে জানে!

খবরটা শেষ করে মাত্র সাবমিট করেছি, এমন সময় আমার মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে দেখলাম, ‘চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনী- মতিন সাহেব’।

মতিন সাহেব চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর মালিক। লোকটা ভালো, তবে অত্যন্ত হিসেবি। তিনি এক কাপ চা খাওয়াতেও দশবার হিসাব করেন।

আমি ফোন ধরলাম, ‘জি মতিন সাহেব, বলুন।’
‘রাশেদ ভাই, কেমন আছেন? আপনাকে গত সপ্তাহে দেওয়া বইটার প্রুফ দেখা শেষ? জমা দেওয়ার ডেট তো কালকে। কাজ কি শেষ হয়েছে?’

‘জি, প্রায় শেষ। আজ রাতের ভেতর কমপ্লিট করে কাল অফিসে দিয়ে আসব।’

‘খুব ভালো। আর শোনো ভাই, নতুন একটা অনুবাদের কাজ হাতে এসেছে। একটা স্প্যানিশ থ্রিলার বইয়ের ইংরেজি ভার্সন। তুমি কি করতে পারবে?’

আমার বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। নতুন বইয়ের অনুবাদ মানে নতুন রয়্যালটি। নতুন টাকা। 

আমি স্বাভাবিক গলা বজায় রেখে বললাম, ‘পারব। তবে আমার রেটটা কিন্তু এবার একটু বাড়াতে হবে মতিন সাহেব। আগের রেটে পোষাচ্ছে না।’

মতিন সাহেব সঙ্গে সঙ্গে গলা নামিয়ে ফেললেন। যেন আমি তার কাছে কিডনি চেয়ে বসেছি। ‘আরে রাশেদ ভাই, আপনি তো জানেনই প্রকাশনা শিল্পের কী করুণ অবস্থা! কাগজের যা দাম! বই তো বিক্রি হয় না। তার ওপর অনুবাদের বই। লোকে তো এখন পিডিএফ পড়ে। আমি তো আপনাকে আপন মানুষ মনে করে কাজটা দিতে চাইলাম।’

আমি মনে মনে হাসলাম। প্রকাশকদের এই এক কথা। কাগজের দাম আর প্রকাশনা শিল্পের করুণ অবস্থা। অথচ প্রতি বছর বইমেলায় তারা নতুন গাড়ি কিনে ঘুরে বেড়ায়।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, কাল যখন প্রুফ দিতে যাব, তখন রেট নিয়ে কথা হবে।’
‘আচ্ছা ভাই, চলে আসেন। কাল একসাথেই চা খাব।’

ফোন রেখে আমি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। স্প্যানিশ থ্রিলার বইটার অনুবাদ করতে পারলে হয়তো বিশ হাজার টাকা একসঙ্গে পাওয়া যাবে।


আমি আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকালাম। এহসান ভাই আরেকটা নিউজ পাঠিয়েছেন। এবার আর কোনো বিড়ালের খবর না। মেক্সিকোতে ড্রাগ কার্টেলের গোলাগুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর।

আমি কি-বোর্ডে আঙুল চালাচ্ছি। আমার মাথার ভেতর তখন মেক্সিকোর গোলাগুলির বদলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তিন লাখ টাকার স্বপ্ন, নিহাদের অ্যাকসিডেন্ট, আর স্প্যানিশ থ্রিলারের রেট।

আমার জীবনটা এই অনুবাদের মতোই। এক ভাষার আবেগ অন্য ভাষায় বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা। আমি আমার চারপাশের পৃথিবীর খবর বাংলায় অনুবাদ করি, কিন্তু আমার নিজের জীবনের ভেতরের খবর কেউ অনুবাদ করতে পারে না।

অফিস থেকে বের হতে হতে সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেল। কারওয়ান বাজারের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি বাসের জন্য। ঢাকা শহরের এই সময়টা সবচেয়ে অদ্ভুত। রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলোয় সবকিছু কেমন যেন মায়াময় মনে হয়। ধুলোমাখা বাতাস, হর্ন, মানুষের চিৎকার— সব কিছু মিলিয়ে একটা বিরাট বিশৃঙ্খলা। অথচ এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি আছে।

বাস এলে আমি উঠলাম। এবার বসার সিট পেয়েছি। জানালার পাশে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। বাতাস এসে আমার মুখে লাগছে। আমার পকেটে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা বেতনের হিসাব, আর মাথায় তিন লাখ টাকার স্বপ্ন।

বাস এগোচ্ছে। আমার জীবনও এগোচ্ছে। আমি রাশেদ আহমেদ। আমার গল্প শুরু হলো। আপনি শুনছেন তো?
[+] 8 users Like Orbachin's post
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.


Messages In This Thread
দরজার ওপাশে কার নিঃশ্বাস? - by Orbachin - 11-06-2026, 01:31 PM



Users browsing this thread: anik baran, 3 Guest(s)