Thread Rating:
  • 482 Vote(s) - 3.5 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো
(04-11-2022, 10:29 PM)Jupiter10 Wrote: || ৪  ||


প্রধান মন্ডপের কাছে চলে আসে তারা। দুপুর দেড়টার কাছাকাছি।  শনিবার ছুটির দিন বোঝাই যায়। এই সময়েও দর্শনার্থীর ভিড় প্রচুর।  ঠাসাঠাসি নয় বটে, কিন্ত কিছু দূরত্বের তফাতেই নানাবয়সী নরনারীর জটলা। কিশোর কিশোরী তেমন বেশি নেই।  বালক বালিকা পরিবারের অভিভাবকদের সঙ্গে এসেছে কিছু।
সাধারণতঃ প্রতিটি জটলার সঙ্গে একজন স্থানীয় গাইড রয়েছে।
“একটি মত বলে, এই মন্দির তৈরি করেছিলেন কৃষ্ণপুত্র শাম্ব।  কৃষ্ণের অভিশাপে শাম্বের কুষ্ঠরোগ হয়েছিল। দেবর্ষি নারদ কুষ্ঠ রোগ সারানোর জন্যে তাঁকে কোণার্কে সূর্যদেবের উপাসনা করতে উপদেশ দিয়েছিলেন।   একথা আমি কালকূটের শাম্ব বইটা মাস দেড়েক আগে পড়ে জেনেছিলাম,” সুমিত্রা নিঃশ্বাস নিয়ে থামে।
“আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় মতগুলো?” সঞ্জয় বলে।
“দাঁড়াও সোনা শাম্বের কথা বলা শেষ হয়নি এখনও,” সুমিত্রা বাম হাতটা দিয়েও ছেলের বাম হাত ধরে হাসে।
“সারা ভারতবর্ষের শাম্ব বারোটি স্থানে কোণার্ক মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন,” সুমিত্রা বলে চলে।
“ওরে বাবা তাই নাকি? কি নাম সেই জায়গাগুলোর?” সঞ্জয় চুপ থাকতে পারে না।
“শাম্ব বইটাতে কালকূট নামগুলো দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু খুবই কঠিন সংস্কৃত নাম। আর বেশিরভাগই নদীর নাম। জায়গার নয়। মনে নেই সব,” সুমিত্রা হাসে।
“তবু!” সঞ্জয় মায়ের চোখে চায়।
সুমিত্রা চোখ বুজে স্মরণ করার চেষ্টা করে।
“পুষ্কর, কুরুক্ষেত্র…” সুমিত্রা থামে, “নাঃ আবার পড়তে হবে। ঠিক মনে পড়ছে না!” সরলভাবে হেসে ফেলে সে।
“পুষ্কর তো রাজস্থানে, আর কুরুক্ষেত্র তো দিল্লির কাছে!” সঞ্জয় বলে ওঠে।
“হ্যাঁ যা বলছিলাম,” সুমিত্রা এগিয়ে যায় একটু, তারপর শুরু করে, “১২৫০ খ্রিস্টাব্দে কোণার্ক মন্দির স্থাপন করেন পূর্ব গঙ্গা সাম্রাজ্যের সম্রাট প্রথম নরসিংহদেব।  এই হল দ্বিতীয় মত,” সুমিত্রা চিবুক উঁচু করে ছেলের চোখের উপর দৃষ্টি ফেলে।
“১২৫০ খ্রিস্টাব্দে? আজ থেকে প্রায় নশো বছর আগে?” সঞ্জয় চমৎকৃত হয় জেনে।
“হ্যাঁ,  ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে সুলতানি আমল শুরু হয়ে গেছে।  মামলুক বংশের কুতুবুদ্দিন আইবক দিল্লির প্রথম সুলতান।  নরসিংহদেব ১২৪৩ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সুলতানের সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে দক্ষিণবঙ্গের তৎকালীন রাজধানী গৌড়কে পুনরুদ্ধার করেন। সেই যুদ্ধ জয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তিনি কোণার্ক নির্মাণ কার্য শুরু করার আদেশ দেন,” সুমিত্রা যোগ করে।
“ওহ বাবা!” সঞ্জয় বিস্মিত হয়। ইতিহাসে বই পড়ে তার ধারণা ছিল সুলতানরা সারা ভারতে রাজত্ব করত। এখন দেখছে তারা বেশ কয়েকবারই দেশীয় রাজাদের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছিল। সত্যিই তো! নইলে এত বিশাল মন্দির নির্মাণ হল কি করে, যদি মহা পরাক্রমশালী কোনও নরপতি একে না রক্ষা করবেন?
“তারপর?” সঞ্জয় সামনের দিকে বিশালাকায় রথচক্রের দিকে তাকায়।
“এটা সপ্তাশ্ব বাহিত সূর্যদেবের রথের একটি চাকা। এমন চাকা আছে বারো জোড়া। অর্থাৎ চব্বিশটা।  বারো জোড়া চাকা বারোটা মাসের প্রতিনিধি। প্রতি মাসে দুটো চাকা কারণ প্রতি মাসে দুই পক্ষ,” সুমিত্রা একটু থামে।
“হ্যাঁ, ম-মিতা, শুক্ল আর কৃষ্ণ পক্ষ। তুমি শিখিয়েছিলে আমায়,” সঞ্জয় মা বলতে গিয়ে নিজেকে সামলায়। সবার সামনে এখনও মিতা নামে ডাকা তেমন রপ্ত হয়নি তার।
“এবারে তৃতীয় মতটার কথা বলে নিই,” সুমিত্রা মন্ডপের বামে আরও ভিতর দিকে এগিয়ে যায়, “তৃতীয় মতে মহারাজ প্রথম নরসিংহদেব পুরোন সূর্য মন্দিরের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করেন। বেশির ভাগ পুঁথি ও ঐতিহাসিক এই মতের সমর্থন করেন। কারণ এই মন্দিরের কথা হিউয়েন সাঙের লেখাতেও বিবরিত আছে,” সুমিত্রা তার ছেলের হাত বুকে আরও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরে।
“চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সপ্তম শতাব্দীতে ভারতে এসেছিলেন না?” সঞ্জয় মাথা নিচু করে মার মুখে চায়।
“হ্যাঁ সোনা, সেটা কনৌজের মহারাজ হর্ষবর্ধনের আমল। হর্ষ ৬০৬ থেকে ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দ অবধি রাজত্ব করেন,” সুমিত্রা উপর দিকে ছেলের মুখে চোখ মেলে হাসে।
“চব্বিশটা চাকা কেবল বারো মাসই নয়, প্রতি দিনে চব্বিশ ঘন্টার দ্যোতক,” সুমিত্রা দ্বিতীয় বড় চক্রটির দিকে নির্দেশ করে।
“মিত্রা দেখ প্রতিটি চাকায় আটটা স্পোক,” সঞ্জয় আঙুল দিয়ে দেখায়।
“হ্যাঁ, প্রতি দিনে আট প্রহর। একেবারে উপরের পাখিটা মধ্য রাত। তারপরের বাম দিকের দ্বিতীয় পাখিটা রাত তিনটে। তারপরে তৃতীয় পাখিটা ভোর ছটা। চতুর্থ পাখিটা সকাল নটা, পঞ্চমটি বেলা বারোটা,” সুমিত্রা বলে চলে।
“একি, এযে ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিক দিয়ে ঘুরছে!” সঞ্জয় অভিভূত স্বরে বলে।
“হ্যাঁ পড়েছি যে প্রতিটি রথের চাকা একটি সূর্য ঘড়ি। নির্ভুলভাবে সময় গণনা করা যায়,” সুমিত্রা হাসে।
“কেমন করে বুঝলে তুমি এখানে ঘড়ির কাঁটা উল্টো দিক দিয়ে সময় গুনতে হবে?” সঞ্জয় তার নতুন বউএর বাম কাঁধে হাত রাখে।
লেখকের ইতিহাসের বর্ণনা মোহিত করার মত। সুমিত্রার মুখে ইতিহাসের ভাষা এত সাবলীল, প্রশংসার দাবী রাখে।
[+] 1 user Likes anonya's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: সুন্দর শহরের ঝাপসা আলো - by anonya - 11-06-2026, 12:58 PM



Users browsing this thread: Red devil007, 5 Guest(s)