05-06-2026, 12:23 PM
তৃতীয় অধ্যায়: ভাঙনের শব্দ ও মাটির তৃষ্ণা
বরিশালের মেঘনা নদীর পাড়ে তখন কালবৈশাখীর ঘন কালো মেঘ জমছে। দুপুরের চড়া রোদকে এক লহমায় গিলে খেয়ে আকাশটা কেমন যেন এক অলৌকিক বেগুনী আর কালচে রঙের চাদর মুড়ি দিয়েছে। বাতাসটা হঠাৎ করেই তার চেনা গতিপথ বদলে এক হিংস্র পশুর মতো গোঙাতে গোঙাতে ছুটে আসছে চরের বুক চিরে। বাতাসের তীব্র ঝাপটায় কাঁচা ইলিশ মাছের আঁশটে গন্ধ, নদীর ওপাড়ের পলিমাটি আর নোনা জল ছিটকে এসে আছড়ে পড়ছে ফাতেমার মুখের ওপর। নদীর বুক থেকে উঠে আসা সেই জল কণার স্বাদ নোনতা, ঠিক যেমন ফাতেমার সারাজীবনের চোখের জলের স্বাদ।
ফাতেমা তাদের ভাঙাচোরা খড় আর টিনের চালার দাওয়ায় বসে একটা ক্ষয়ে যাওয়া লণ্ঠনের কাঁপা কাঁপা আলোয় কাঁচা আম কাটছিল। তার সামনে রাখা একখানা পুরনো লোহার বঁটি। বঁটির ডগাটা নোনা বাতাসে কিছুটা মরচে ধরা হলেও, তার ধারালো পেটটা লণ্ঠনের আলোয় মাঝে মাঝেই এক একটা ক্ষুরধার বিদ্যুতের মতন ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। ফাতেমার হাতের নখগুলো কর্দমাক্ত, নদীর চরে কাজ করতে করতে চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। সে একটা একটা করে আম কাটছিল আর তার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন ওই বঁটির ওপর গিয়ে পড়ছিল। আমের আঁটিটা যখন বঁটির টোকা খেয়ে দু-টুকরো হয়ে যাচ্ছিল, ফাতেমার মনে হচ্ছিল ওটা যেন আম নয়, মন্টু মাঝির বুকের পাঁজর।
আজ সকালেই ফাতেমার জীবনের শেষ সম্বলটুকু চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার মা মরার আগে একটা সস্তা তামার ওপর সোনার জল করা কানের দুল দিয়ে গিয়েছিল। ওটা দামী কিছু ছিল না, কিন্তু ওই এক জোড়া দুলের মধ্যেই ফাতেমা তার শৈশবের মাটির গন্ধ, মায়ের আঁচলের ওম খুঁজে পেত। আজ সকালে মন্টু মাঝি এসে ফাতেমার চুলটা মুঠো করে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল উঠোনের মাঝখানে। চরের মাতব্বরদের সাথে নতুন করে জুয়া খেলার টাকা চাই তার। ফাতেমা যখন নিজের বুক দিয়ে দুল জোড়া আগলে রাখার চেষ্টা করেছিল, তখন মন্টু তার শক্ত, কাদা মাখা পা দিয়ে ফাতেমার তলপেটে একটা তীব্র লাথি বসিয়ে দেয়।
"হারামজাদী! এত বড় সাহস তোর? আমার মুখের ওপর কথা কস? দে কইতাছি, দুল জোড়া দে!"
মন্টুর গলার সেই মদ্যপ, কর্কশ চিৎকার চরের বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফাতেমা উঠোনের ধুলোয় পড়ে ছটফট করছিল, আর চারপাশের প্রতিবেশীরা যে যার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিল। এই চরে কোনো নারীর আর্তনাদ কারো কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। মন্টু ফাতেমার কান থেকে দুল জোড়া প্রায় ছিঁড়ে রক্তারক্তি করে নিয়ে চলে গেছে। প্রতিবাদ করায় যে পিটুনিটা ফাতেমা আজ খেয়েছে, তার নীল কালশিটে দাগগুলো এখন তার পিঠে, কোমরে আর স্তনের নিচে কামড়ে ধরে আছে।
কিন্তু ফাতেমা আজ কাঁদেনি। এই চরের উত্তাল বাতাসে আর মেঘনার নোনা জলে তার চোখের জল বহু বছর আগেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে শুধু ধুলোবালি মাখা মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় মন্টুর চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই লাল, নেশাগ্রস্ত চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, কোনো দয়া ছিল না। ছিল এক আদিম, পশুতুল্য পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ। মন্টু যাওয়ার সময় ফাতেমার মুখের ওপর থুতু ফেলে বলেছিল, "তুই আমার টাকা দিয়া বিয়া করা বউ। তোরে পিটামু না তো কারে পিটামু? বেশি চিল্লাচিল্লি করবি তো এক্কেবারে গাঙে ভাসাইয়া দিমু।"
এই নদীপাড়ের গ্রামটাতেই ফাতেমার জন্ম, এখানেই তার বেড়ে ওঠা। সে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে, মেঘনা নদীটা কেমন রাক্ষসীর মতো প্রতি বছর নিঃশব্দে এক একটা পাড় ভাঙে, মানুষের ভিটেমাটি গিলে খায়। আজ যে জমিটা সবুজ ফসলে ভরা, কাল সকালে তা নদীর পেটে। ফাতেমার মনে হয়, এই চরের পুরুষমানুষগুলোও ঠিক ওই নদীর মতোই। তারা প্রতিদিন, প্রতি রাতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেয়েদের স্বপ্নগুলো, তাদের শরীর আর আত্মসম্মানকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
মন্টু মাঝির সাথে তার বিয়ে হয়েছিল মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে। তখন সে শরীর কী, পুরুষ কী—তার কিছুই বুঝত না। বিয়ের প্রথম রাত থেকেই মন্টু তার ওপর যে আদিম পাশবিকতা চালিয়ে আসছে, তা ফাতেমার কাছে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল স্রেফ এক রক্তাক্ত শিকারের মতন। এই প্রতিদিনের অবমাননা, এই পশুর মতন যাপন ফাতেমার ভেতরের এক কোমল বালিকাকে বহু আগেই মেরে ফেলেছে। কিন্তু তার জায়গায় এখন জন্ম নিয়েছে এক ভয়ঙ্কর, ঠাণ্ডা এবং বিষাক্ত হিংসা।
বিকেলের আলো পুরোপুরি মুছে গিয়ে যখন কালবৈশাখীর রাত নামল, তখন চরের আকাশ চিরে বজ্রপাত হতে শুরু করেছে। মন্টু মাঝি নদীর ঘাট থেকে মদ গিলে, জুয়ায় সব হেরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ঘরে ফিরে এলো। এসেই কোনো কথা না বলে চৌকির ওপর ধপ করে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নাক ডাকার বিকট শব্দ আর মুখের সস্তা মদের পচা গন্ধ পুরো ছোট ঘরটায় ছড়িয়ে পড়ল।
ফাতেমা তখনো দাওয়ায় বসে আছে। তার চোখ দুটো গিয়ে আটকাল ঘরের কোণে পড়ে থাকা সেই ভারী, ধারালো বঁটিটার ওপর। ঘরের টিনের চালার একটা ফুটো দিয়ে আসা বিদ্যুতের আলোয় বঁটিটা যেন ফাতেমাকে ডাকছিল। ফাতেমার শিরায় শিরায় এক অদ্ভুত, আদিম রাগ বয়ে যেতে লাগল। তার ভেতরের অবদমিত বাঘিনীটা ফিসফিস করে বলতে লাগল— “উঠে দাঁড়া ফাতেমা। এই লোকটা যখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে, এক কোপে তার ওই অহংকারী গলাটা দু-টুকরো করে দে। যে হাত দিয়ে সে তোর মায়ের স্মৃতি কেড়ে নিয়েছে, সেই হাতটা কেটে গাঙে ভাসিয়ে দে।”
ফাতেমা বঁটিটার দিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে বসে রইল। তার হাত দুটো কাঁপছিল, কিন্তু সেই কাঁপাটা ভয়ের ছিল না, ওটা ছিল এক চরম উত্তেজনার। সমাজ হয়তো তাকে খুনি বলবে, পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যাবে, হয়তো তার ফাঁসি হবে। কিন্তু ফাতেমার মনে হলো, ফাঁসির মঞ্চটাও মন্টু মাঝির এই নরককুন্ডের চেয়ে অনেক বেশি শান্তির হবে। সে অন্তত একটা রাতের জন্য হলেও এই পুরুষতান্ত্রিক চাবুক থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাবে।
টিনের চালে তখন বৃষ্টির উন্মাদনা শুরু হয়েছে। বড় বড় ফোটার বৃষ্টিগুলো যখন পুরনো টিনের ওপর আছড়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে। বাতাসের ধাক্কায় ঘরের বাঁশের বেড়াটা মড়মড় করে উঠছে। ফাতেমা বঁটিটা হাত দিয়ে ধরল না। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকে মন্টুর থেকে অনেকটা দূরে, বিছানার এককোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। ছেঁড়া কাঁথাটা গায় দিয়ে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল।
এই নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, মদের গন্ধে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া বিছানায় শুয়েও ফাতেমার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব তাকে এক সম্পূর্ণ অন্য জগতে নিয়ে গেল। সে তো একজন নারী, তার খসখসে, রুক্ষ চামড়ার নিচেও তো একটা জ্যান্ত শরীর আছে, যা একটু আদর চায়, একটু সোহাগ চায়। মন্টু মাঝির মতন কোনো পশুর উগ্রতা নয়, সে চায় এমন একজন পুরুষের স্পর্শ—যে হবে প্রকৃত পৌরুষের প্রতীক।
ফাতেমা চোখ বন্ধ করে অন্ধকার চরের বুকে এক কাল্পনিক পুরুষের অবয়ব তৈরি করতে লাগল।
কল্পনার সেই পুরুষটি মন্টুর মতো নোংরা বা দূষিত নয়। সে অত্যন্ত লম্বা, চওড়া কাঁধ আর তার বুকের ছাতিটা যেন কোনো শক্ত পাথরের দেয়াল। তার শরীর থেকে মদের গন্ধ বের হয় না, তার শরীর থেকে আসে গভীর নদীর তাজা বাতাস আর চরের তপ্ত বালির এক তীব্র, মাতাল করা পুরুষালী ঘ্রাণ।
কল্পনায় সেই পুরুষটি ফাতেমার এই খসখসে, কাদা মাখা হাত দুটো পরম যত্নে নিজের বড়, উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার ছোঁয়াতে কোনো আঘাত নেই, কোনো ক্ষত তৈরি করার জেদ নেই। পুরুষটি ফাতেমার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো পশুর লালসা নেই, আছে এক অমোঘ, গভীর নদীসম ভালোবাসা—যা ফাতেমাকে এক সেকেন্ডে অবশ করে দেয়।
ফাতেমা কল্পনা করতে লাগল, সেই পুরুষালী শক্ত হাত দুটো যখন তার পিঠের কালশিটে দাগগুলোর ওপর পরম মমতায় বুলাচ্ছে, ফাতেমার বাস্তব শরীরটা এই ছেঁড়া কাঁথার নিচে শুয়েই এক অজানা কামে শিউরে উঠছে। পুরুষটি তার ঠোঁট দুটো ফাতেমার কানের কাছে নিয়ে এসে চরের আঞ্চলিক ভাষায় কিন্তু অত্যন্ত নরম, পুরুষালী কণ্ঠে বলছে, "ফাতেমা, তোর এই শরীরে আর কেউ কোনোদিন হাত তুলতে পারবে না। তুই শুধু আমার।"
কল্পনায় সেই প্রকৃত পুরুষটি ফাতেমার ভেজা সুতি শাড়িটা আলতো করে শরীর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। তার শক্ত, লড়াকু বুকটা ফাতেমার খসখসে শরীরের ওপর চেপে বসছে। এই মিলনে কোনো যান্ত্রিকতা নেই, কোনো জবরদস্তি নেই। পুরুষটি ফাতেমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে, তার জরায়ুকে এক পরম তৃপ্তির আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, যেখানে ফাতেমা নিজেই নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতে চাইছে। সেই কাল্পনিক পুরুষের তীব্র, বন্য অথচ শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসার ঘর্ষণে ফাতেমা নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় আবিষ্কার করল, যেখানে সে কোনো চরের দাসী নয়, সে এক আদিম প্রকৃতির মতন স্বাধীন নারী।
ফাতেমা চোখ খুলল। টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল এসে তার কপালে পড়ছে। পাশে মন্টু মাঝি একইভাবে পড়ে আছে। ফাতেমা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফোটাল। এই চর, এই সমাজ, এই দারিদ্র্য আর মন্টুর চাবুক হয়তো তার বাস্তব জীবনটাকে নরক বানিয়ে রেখেছে; কিন্তু তার ভেতরের আসল যে কামনার আকাশ, তার যে গোপন তীব্র বাসনা—সেখানে আঘাত করার ক্ষমতা এই চরের কোনো পুরুষমানুষের নেই। সে তার নিজের কল্পনার পুরুষের বাহুডোরে জড়িয়ে এই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতি রাতে বেঁচে থাকার এক নতুন বারুদ খুঁজে পায়।
বরিশালের মেঘনা নদীর পাড়ে তখন কালবৈশাখীর ঘন কালো মেঘ জমছে। দুপুরের চড়া রোদকে এক লহমায় গিলে খেয়ে আকাশটা কেমন যেন এক অলৌকিক বেগুনী আর কালচে রঙের চাদর মুড়ি দিয়েছে। বাতাসটা হঠাৎ করেই তার চেনা গতিপথ বদলে এক হিংস্র পশুর মতো গোঙাতে গোঙাতে ছুটে আসছে চরের বুক চিরে। বাতাসের তীব্র ঝাপটায় কাঁচা ইলিশ মাছের আঁশটে গন্ধ, নদীর ওপাড়ের পলিমাটি আর নোনা জল ছিটকে এসে আছড়ে পড়ছে ফাতেমার মুখের ওপর। নদীর বুক থেকে উঠে আসা সেই জল কণার স্বাদ নোনতা, ঠিক যেমন ফাতেমার সারাজীবনের চোখের জলের স্বাদ।
ফাতেমা তাদের ভাঙাচোরা খড় আর টিনের চালার দাওয়ায় বসে একটা ক্ষয়ে যাওয়া লণ্ঠনের কাঁপা কাঁপা আলোয় কাঁচা আম কাটছিল। তার সামনে রাখা একখানা পুরনো লোহার বঁটি। বঁটির ডগাটা নোনা বাতাসে কিছুটা মরচে ধরা হলেও, তার ধারালো পেটটা লণ্ঠনের আলোয় মাঝে মাঝেই এক একটা ক্ষুরধার বিদ্যুতের মতন ঝিলিক দিয়ে উঠছিল। ফাতেমার হাতের নখগুলো কর্দমাক্ত, নদীর চরে কাজ করতে করতে চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। সে একটা একটা করে আম কাটছিল আর তার ভেতরের সমস্ত শক্তি যেন ওই বঁটির ওপর গিয়ে পড়ছিল। আমের আঁটিটা যখন বঁটির টোকা খেয়ে দু-টুকরো হয়ে যাচ্ছিল, ফাতেমার মনে হচ্ছিল ওটা যেন আম নয়, মন্টু মাঝির বুকের পাঁজর।
আজ সকালেই ফাতেমার জীবনের শেষ সম্বলটুকু চিরতরে হারিয়ে গেছে। তার মা মরার আগে একটা সস্তা তামার ওপর সোনার জল করা কানের দুল দিয়ে গিয়েছিল। ওটা দামী কিছু ছিল না, কিন্তু ওই এক জোড়া দুলের মধ্যেই ফাতেমা তার শৈশবের মাটির গন্ধ, মায়ের আঁচলের ওম খুঁজে পেত। আজ সকালে মন্টু মাঝি এসে ফাতেমার চুলটা মুঠো করে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল উঠোনের মাঝখানে। চরের মাতব্বরদের সাথে নতুন করে জুয়া খেলার টাকা চাই তার। ফাতেমা যখন নিজের বুক দিয়ে দুল জোড়া আগলে রাখার চেষ্টা করেছিল, তখন মন্টু তার শক্ত, কাদা মাখা পা দিয়ে ফাতেমার তলপেটে একটা তীব্র লাথি বসিয়ে দেয়।
"হারামজাদী! এত বড় সাহস তোর? আমার মুখের ওপর কথা কস? দে কইতাছি, দুল জোড়া দে!"
মন্টুর গলার সেই মদ্যপ, কর্কশ চিৎকার চরের বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ফাতেমা উঠোনের ধুলোয় পড়ে ছটফট করছিল, আর চারপাশের প্রতিবেশীরা যে যার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছিল। এই চরে কোনো নারীর আর্তনাদ কারো কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। মন্টু ফাতেমার কান থেকে দুল জোড়া প্রায় ছিঁড়ে রক্তারক্তি করে নিয়ে চলে গেছে। প্রতিবাদ করায় যে পিটুনিটা ফাতেমা আজ খেয়েছে, তার নীল কালশিটে দাগগুলো এখন তার পিঠে, কোমরে আর স্তনের নিচে কামড়ে ধরে আছে।
কিন্তু ফাতেমা আজ কাঁদেনি। এই চরের উত্তাল বাতাসে আর মেঘনার নোনা জলে তার চোখের জল বহু বছর আগেই শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে শুধু ধুলোবালি মাখা মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ানোর সময় মন্টুর চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই লাল, নেশাগ্রস্ত চোখে কোনো অনুশোচনা ছিল না, কোনো দয়া ছিল না। ছিল এক আদিম, পশুতুল্য পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ। মন্টু যাওয়ার সময় ফাতেমার মুখের ওপর থুতু ফেলে বলেছিল, "তুই আমার টাকা দিয়া বিয়া করা বউ। তোরে পিটামু না তো কারে পিটামু? বেশি চিল্লাচিল্লি করবি তো এক্কেবারে গাঙে ভাসাইয়া দিমু।"
এই নদীপাড়ের গ্রামটাতেই ফাতেমার জন্ম, এখানেই তার বেড়ে ওঠা। সে ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে, মেঘনা নদীটা কেমন রাক্ষসীর মতো প্রতি বছর নিঃশব্দে এক একটা পাড় ভাঙে, মানুষের ভিটেমাটি গিলে খায়। আজ যে জমিটা সবুজ ফসলে ভরা, কাল সকালে তা নদীর পেটে। ফাতেমার মনে হয়, এই চরের পুরুষমানুষগুলোও ঠিক ওই নদীর মতোই। তারা প্রতিদিন, প্রতি রাতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেয়েদের স্বপ্নগুলো, তাদের শরীর আর আত্মসম্মানকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়।
মন্টু মাঝির সাথে তার বিয়ে হয়েছিল মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে। তখন সে শরীর কী, পুরুষ কী—তার কিছুই বুঝত না। বিয়ের প্রথম রাত থেকেই মন্টু তার ওপর যে আদিম পাশবিকতা চালিয়ে আসছে, তা ফাতেমার কাছে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল স্রেফ এক রক্তাক্ত শিকারের মতন। এই প্রতিদিনের অবমাননা, এই পশুর মতন যাপন ফাতেমার ভেতরের এক কোমল বালিকাকে বহু আগেই মেরে ফেলেছে। কিন্তু তার জায়গায় এখন জন্ম নিয়েছে এক ভয়ঙ্কর, ঠাণ্ডা এবং বিষাক্ত হিংসা।
বিকেলের আলো পুরোপুরি মুছে গিয়ে যখন কালবৈশাখীর রাত নামল, তখন চরের আকাশ চিরে বজ্রপাত হতে শুরু করেছে। মন্টু মাঝি নদীর ঘাট থেকে মদ গিলে, জুয়ায় সব হেরে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে ঘরে ফিরে এলো। এসেই কোনো কথা না বলে চৌকির ওপর ধপ করে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নাক ডাকার বিকট শব্দ আর মুখের সস্তা মদের পচা গন্ধ পুরো ছোট ঘরটায় ছড়িয়ে পড়ল।
ফাতেমা তখনো দাওয়ায় বসে আছে। তার চোখ দুটো গিয়ে আটকাল ঘরের কোণে পড়ে থাকা সেই ভারী, ধারালো বঁটিটার ওপর। ঘরের টিনের চালার একটা ফুটো দিয়ে আসা বিদ্যুতের আলোয় বঁটিটা যেন ফাতেমাকে ডাকছিল। ফাতেমার শিরায় শিরায় এক অদ্ভুত, আদিম রাগ বয়ে যেতে লাগল। তার ভেতরের অবদমিত বাঘিনীটা ফিসফিস করে বলতে লাগল— “উঠে দাঁড়া ফাতেমা। এই লোকটা যখন অঘোরে ঘুমাচ্ছে, এক কোপে তার ওই অহংকারী গলাটা দু-টুকরো করে দে। যে হাত দিয়ে সে তোর মায়ের স্মৃতি কেড়ে নিয়েছে, সেই হাতটা কেটে গাঙে ভাসিয়ে দে।”
ফাতেমা বঁটিটার দিকে তাকিয়ে এক দৃষ্টিতে বসে রইল। তার হাত দুটো কাঁপছিল, কিন্তু সেই কাঁপাটা ভয়ের ছিল না, ওটা ছিল এক চরম উত্তেজনার। সমাজ হয়তো তাকে খুনি বলবে, পুলিশ এসে তাকে ধরে নিয়ে যাবে, হয়তো তার ফাঁসি হবে। কিন্তু ফাতেমার মনে হলো, ফাঁসির মঞ্চটাও মন্টু মাঝির এই নরককুন্ডের চেয়ে অনেক বেশি শান্তির হবে। সে অন্তত একটা রাতের জন্য হলেও এই পুরুষতান্ত্রিক চাবুক থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাবে।
টিনের চালে তখন বৃষ্টির উন্মাদনা শুরু হয়েছে। বড় বড় ফোটার বৃষ্টিগুলো যখন পুরনো টিনের ওপর আছড়ে পড়ছে, মনে হচ্ছে যেন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে। বাতাসের ধাক্কায় ঘরের বাঁশের বেড়াটা মড়মড় করে উঠছে। ফাতেমা বঁটিটা হাত দিয়ে ধরল না। সে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের ভেতর ঢুকে মন্টুর থেকে অনেকটা দূরে, বিছানার এককোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। ছেঁড়া কাঁথাটা গায় দিয়ে সে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করল।
এই নোংরা, স্যাঁতসেঁতে, মদের গন্ধে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া বিছানায় শুয়েও ফাতেমার অবচেতনের মনস্তত্ত্ব তাকে এক সম্পূর্ণ অন্য জগতে নিয়ে গেল। সে তো একজন নারী, তার খসখসে, রুক্ষ চামড়ার নিচেও তো একটা জ্যান্ত শরীর আছে, যা একটু আদর চায়, একটু সোহাগ চায়। মন্টু মাঝির মতন কোনো পশুর উগ্রতা নয়, সে চায় এমন একজন পুরুষের স্পর্শ—যে হবে প্রকৃত পৌরুষের প্রতীক।
ফাতেমা চোখ বন্ধ করে অন্ধকার চরের বুকে এক কাল্পনিক পুরুষের অবয়ব তৈরি করতে লাগল।
কল্পনার সেই পুরুষটি মন্টুর মতো নোংরা বা দূষিত নয়। সে অত্যন্ত লম্বা, চওড়া কাঁধ আর তার বুকের ছাতিটা যেন কোনো শক্ত পাথরের দেয়াল। তার শরীর থেকে মদের গন্ধ বের হয় না, তার শরীর থেকে আসে গভীর নদীর তাজা বাতাস আর চরের তপ্ত বালির এক তীব্র, মাতাল করা পুরুষালী ঘ্রাণ।
কল্পনায় সেই পুরুষটি ফাতেমার এই খসখসে, কাদা মাখা হাত দুটো পরম যত্নে নিজের বড়, উষ্ণ হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার ছোঁয়াতে কোনো আঘাত নেই, কোনো ক্ষত তৈরি করার জেদ নেই। পুরুষটি ফাতেমার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো পশুর লালসা নেই, আছে এক অমোঘ, গভীর নদীসম ভালোবাসা—যা ফাতেমাকে এক সেকেন্ডে অবশ করে দেয়।
ফাতেমা কল্পনা করতে লাগল, সেই পুরুষালী শক্ত হাত দুটো যখন তার পিঠের কালশিটে দাগগুলোর ওপর পরম মমতায় বুলাচ্ছে, ফাতেমার বাস্তব শরীরটা এই ছেঁড়া কাঁথার নিচে শুয়েই এক অজানা কামে শিউরে উঠছে। পুরুষটি তার ঠোঁট দুটো ফাতেমার কানের কাছে নিয়ে এসে চরের আঞ্চলিক ভাষায় কিন্তু অত্যন্ত নরম, পুরুষালী কণ্ঠে বলছে, "ফাতেমা, তোর এই শরীরে আর কেউ কোনোদিন হাত তুলতে পারবে না। তুই শুধু আমার।"
কল্পনায় সেই প্রকৃত পুরুষটি ফাতেমার ভেজা সুতি শাড়িটা আলতো করে শরীর থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। তার শক্ত, লড়াকু বুকটা ফাতেমার খসখসে শরীরের ওপর চেপে বসছে। এই মিলনে কোনো যান্ত্রিকতা নেই, কোনো জবরদস্তি নেই। পুরুষটি ফাতেমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজকে, তার জরায়ুকে এক পরম তৃপ্তির আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে, যেখানে ফাতেমা নিজেই নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতে চাইছে। সেই কাল্পনিক পুরুষের তীব্র, বন্য অথচ শ্রদ্ধাপূর্ণ ভালোবাসার ঘর্ষণে ফাতেমা নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় আবিষ্কার করল, যেখানে সে কোনো চরের দাসী নয়, সে এক আদিম প্রকৃতির মতন স্বাধীন নারী।
ফাতেমা চোখ খুলল। টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির জল এসে তার কপালে পড়ছে। পাশে মন্টু মাঝি একইভাবে পড়ে আছে। ফাতেমা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফোটাল। এই চর, এই সমাজ, এই দারিদ্র্য আর মন্টুর চাবুক হয়তো তার বাস্তব জীবনটাকে নরক বানিয়ে রেখেছে; কিন্তু তার ভেতরের আসল যে কামনার আকাশ, তার যে গোপন তীব্র বাসনা—সেখানে আঘাত করার ক্ষমতা এই চরের কোনো পুরুষমানুষের নেই। সে তার নিজের কল্পনার পুরুষের বাহুডোরে জড়িয়ে এই সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রতি রাতে বেঁচে থাকার এক নতুন বারুদ খুঁজে পায়।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)