6 hours ago
৪র্থ পর্ব
আজকের আকাশটা সকাল থেকেই এক অদ্ভুত ধূসর রূপ ধারণ করে আছে। মেঘগুলো যেন আলকাতরার মতো ভারী হয়ে ঝুলে আছে আকাশের বুকে, যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। রুদ্র তার গুলশানের আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতলার বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে কালো রঙের একটি সিল্কের বাথরোব, ডানহাতে জ্বলন্ত সিগারেট থেকে নীলচে ধোঁয়া অনবরত পাক খেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। বাইরে বাগানের ফোয়ারার জল পড়ার শব্দটা ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতাকে আরও প্রগাঢ় করে তুলছিল।
তার মনের ভেতর এখন একটা তীব্র ঝড় বইছে—দশ বছর আগের এক ঝড়, যা আজও তাকে প্রতি রাতে তাড়া করে বেড়ায়। গত রাতে সায়লার ওপর যে রুক্ষতা সে প্রকাশ করেছে, তার জন্য নিজের অজান্তেই তার বুকের ভেতর একটা তীব্র অপরাধবোধ আর অনুশোচনা মোচড় দিয়ে উঠছে। সায়লা কোনো অন্যায় করেনি, সে রুদ্রকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। অথচ প্রতি রাতে নিজের ভেতরের সেই পুরোনো ক্ষত আর ব্যর্থতার এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে সায়লার ওপর।
সিগারেটে একটা শেষ দীর্ঘ টান দিয়ে রুদ্র চোখ দুটো বন্ধ করল। স্মৃতির পাতাগুলো যেন কোনো অবাধ্য বাতাসের ঝাপটায় দশ বছর পেছনে ওল্টাতে শুরু করল।
দশ বছর আগে —
তখন রুদ্র গুলশানের এই অভিজাত ব্যবসায়ী 'টি. আই. রুদ্র' ছিল না। সে ছিল দেশের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অতি সাধারণ, মধ্যবিত্ত পরিবারের লড়াকু ছাত্র। চওড়া কাঁধ, তীক্ষ্ণ চোখ আর নিজের আত্মসম্মান নিয়ে চলা রুদ্রর জীবনটা বদলে গিয়েছিল ক্যাম্পাসের বকুলতলায় অনন্যাকে প্রথম দেখার পর।
অনন্যা ছিল এক অভিজাত, উচ্চবংশীয় পরিবারের মেয়ে। তার হাঁটার ধরন, তার গায়ের সুবাস, তার অহংকারী চোখের চাউনি—সবকিছুতেই এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য ছিল। রুদ্র প্রথম দেখাতেই অনন্যার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিল। সে অনন্যাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল, তার জন্য সে মরতেও পারত। কিন্তু তাদের এই সামাজিক দূরত্বের মাঝে সবচেয়ে বড় পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের পারিবারিক ও সামাজিক বিশ্বাসের ভিন্নতা। তারা দুজন সম্পূর্ণ আলাদা সংস্কৃতির, আলাদা রীতিনীতির এবং আলাদা ধর্মের। রুদ্র যে বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে বড় হয়েছে, অনন্যার পরিবারের কাছে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রুদ্র দিনের পর দিন অনন্যার পেছনে ঘুরেছে, তাকে নিজের ভালোবাসার কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু অনন্যার কাছে রুদ্রর এই তীব্র আবেগের কোনো মূল্য ছিল না। সে রুদ্রকে সবসময় এড়িয়ে চলত, তার মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সামাজিক ভিন্নতাকে তীব্র অবজ্ঞা করত।
একদিন দুপুরের তপ্ত রোদে, কার্জন হলের লাল ইটের দেওয়ালের আড়ালে রুদ্র অনন্যাকে একা পেয়ে তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। রুদ্রর চোখ দুটো ছিল আকুলতায় ভরা, সারা শরীরে এক অস্থির উত্তেজনা।
রুদ্র নিচু কিন্তু অনুনয়ভরা গলায় বলেছিল, "অনন্যা, প্লিজ একটা বার আমার কথাটা শোনো, আমি জানি আমাদের চারপাশের সমাজ আমাদের এই সম্পর্ককে সহজভাবে নেবে না। আমাদের বিশ্বাস আলাদা, পরিবার আলাদা। কিন্তু আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমার জন্য আমি আমার নিজের সমাজ, পরিবার সবকিছু ছেড়ে দিতে রাজি আছি। তুমি শুধু একটা বার আমাকে একটু জায়গা দাও তোমার জীবনে।"
অনন্যা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে এক চরম শীতল উদাসীনতা এবং অবজ্ঞার হাসি হেসেছিল। তার চোখে রুদ্রর জন্য কোনো সহানুভূতি ছিল না।
অনন্যা অত্যন্ত রূঢ় এবং অহংকারী গলায় বলেছিল, "তুমি কি পাগল হয়েছ, রুদ্র? আমি আমার বাবার এত বড় সম্পত্তি, আমার আভিজাত্য, আমার সমাজ ছেড়ে তোমার মতো একটা সাধারণ ছেলের সাথে জড়াব? আর তুমি যে বিশ্বাসের কথা বলছ, আমার পরিবার কখনোই তোমার ব্যাকগ্রাউন্ডকে মেনে নেবে না। আমাদের বিয়ের রিচুয়ালস, আমাদের ফ্যামিলি ভ্যালুজ—সবকিছু আলাদা। তোমার আর আমার মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। সো প্লিজ, এই সস্তা প্রেমিকের মতো আচরণ বন্ধ করো আর আমার সামনে আর কখনো আসবে না।"
অনন্যার সেই তীব্র প্রত্যাখ্যান এবং অবহেলা রুদ্রর ভেতরের পুরো অস্তিত্বকে এক মুহূর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। যে মেয়ের জন্য সে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল, সেই মেয়েটির কাছে তার এই পবিত্র অনুভূতি ছিল কেবলই একটা 'সস্তা' বিষয়। অনন্যা নিজের আভিজাত্য আর পারিবারিক অহংকারকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছিল, রুদ্রর তীব্র ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র মূল্য না দিয়ে তাকে চরম অপমান করে চলে গিয়েছিল।
সেই রাতে রুদ্রর ভেতরের সেই সরল প্রেমিক ছেলেটি মরে গিয়েছিল। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে এত বড় হবে, এত ক্ষমতার অধিকারী হবে যে এই সমাজ আর আভিজাত্য তার পায়ের নিচে এসে পড়বে। কিন্তু আজ ক্ষমতার শীর্ষে এসেও সে অনন্যাকে ভুলতে পারেনি, বরং সেই না-পাওয়ার বেদনা এক ভয়ানক মানসিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান সময় —
হঠাৎ দরজায় মৃদু টোকার শব্দে রুদ্রর স্মৃতির জাল ছিঁড়ে গেল। সে চোখ খুলে দেখল সায়লা ঘরে ঢুকেছে। সায়লার পরনে একটি সাধারণ সুতির শাড়ি, তার মুখটা কিছুটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। গত রাতের সেই ধকল এবং রুদ্রর মুখ থেকে বের হওয়া 'অনন্যা' নামটি সায়লার মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সায়লার চোখে আজ ক্ষোভের চেয়ে কৌতূহল এবং এক ধরণের গভীর মর্মবেদনা বেশি স্পষ্ট।
সায়লা ধীর পায়ে রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। সে রুদ্রর চোখের দিকে তাকাল, যেখানে এখনো সেই পুরোনো যন্ত্রণার ছায়া লেগে আছে।
সায়লা অত্যন্ত নরম কিন্তু কাঁপানো গলায় ডাকল, "রুদ্র...আজকে অফিসে যাবে না? শরীর কি খারাপ লাগছে?"
রুদ্র সায়লার দিকে তাকাল। এই মেয়েটি তাকে কতটা ভালোবাসে, তার সমস্ত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে। অথচ সে প্রতি রাতে এই পবিত্র মেয়েটির সাথে অন্যায় করে চলেছে। রুদ্রর বুকের ভেতর একটা তীব্র অনুশোচনা জেগে উঠল। সে সিগারেটের টুকরোটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে সায়লার হাত দুটো আলতো করে ধরল। গত রাতের মতো হিংস্রভাবে নয়, এবার তার স্পর্শে ছিল এক অদ্ভুত নরম অনুনয়।
"সায়লা... আই অ্যাম সরি," রুদ্র নিচু গলায় বলল, তার কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী হয়ে এল, "আমি জানি আমি তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করি না। প্রতি রাতে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
রুদ্রর মুখ থেকে এমন অনুশোচনার কথা শুনে সায়লার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। সে রুদ্রর চওড়া বুকে হাত রেখে বলল, "আমি তোমার কোনো আচরণে কষ্ট পাই না রুদ্র। তুমি আমার স্বামী, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?"
রুদ্র সায়লার দিকে তাকাল, কিছু বলল না।
সায়লা রুদ্রর চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করল, "কে এই অনন্যা? যার নাম তুমি প্রতি রাতে মিলনের চরম মুহূর্তে চিৎকার করে বলো? কেন তার নাম নিলে তোমার চোখ দুটো এত হিংস্র আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে? আমাদের বিয়ের আগের সেই আগ্রাসন, আর আজকের এই রূপ—সবকিছুর পেছনে কি এই অনন্যা জড়িয়ে আছে? আমি তোমার স্ত্রী রুদ্র, আমি তোমার অতীতটা জানতে চাই। তোমার মনের এই আগুন আমাকেও পুড়িয়ে মারছে।"
রুদ্র সায়লার প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে সায়লার হাত ছেড়ে দিয়ে আবার জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার মনের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের এই গল্প সে কাউকে বলতে পারে না, সায়লাকেও না।
রুদ্র অত্যন্ত ক্লান্ত গলায় বলল, "কিছু কিছু অতীত না জানাই ভালো সায়লা, তাতে শুধু অশান্তিই বাড়বে।"
সায়লা আর কিছু বলল না, কিন্তু তার মনের ভেতরের কৌতূহল এবং সন্দেহ আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে অনন্যা নামের মেয়েটি তার স্বামীর মনকে এভাবে বিষাক্ত করে রেখেছে, তাকে সে খুঁজে বের করবেই। সে জানতে চায়, কে এই অনন্যা এবং কী তার ইতিহাস।
আজকের আকাশটা সকাল থেকেই এক অদ্ভুত ধূসর রূপ ধারণ করে আছে। মেঘগুলো যেন আলকাতরার মতো ভারী হয়ে ঝুলে আছে আকাশের বুকে, যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়বে। রুদ্র তার গুলশানের আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ির দোতলার বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার পরনে কালো রঙের একটি সিল্কের বাথরোব, ডানহাতে জ্বলন্ত সিগারেট থেকে নীলচে ধোঁয়া অনবরত পাক খেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। বাইরে বাগানের ফোয়ারার জল পড়ার শব্দটা ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতাকে আরও প্রগাঢ় করে তুলছিল।
তার মনের ভেতর এখন একটা তীব্র ঝড় বইছে—দশ বছর আগের এক ঝড়, যা আজও তাকে প্রতি রাতে তাড়া করে বেড়ায়। গত রাতে সায়লার ওপর যে রুক্ষতা সে প্রকাশ করেছে, তার জন্য নিজের অজান্তেই তার বুকের ভেতর একটা তীব্র অপরাধবোধ আর অনুশোচনা মোচড় দিয়ে উঠছে। সায়লা কোনো অন্যায় করেনি, সে রুদ্রকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। অথচ প্রতি রাতে নিজের ভেতরের সেই পুরোনো ক্ষত আর ব্যর্থতার এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে সায়লার ওপর।
সিগারেটে একটা শেষ দীর্ঘ টান দিয়ে রুদ্র চোখ দুটো বন্ধ করল। স্মৃতির পাতাগুলো যেন কোনো অবাধ্য বাতাসের ঝাপটায় দশ বছর পেছনে ওল্টাতে শুরু করল।
দশ বছর আগে —
তখন রুদ্র গুলশানের এই অভিজাত ব্যবসায়ী 'টি. আই. রুদ্র' ছিল না। সে ছিল দেশের একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অতি সাধারণ, মধ্যবিত্ত পরিবারের লড়াকু ছাত্র। চওড়া কাঁধ, তীক্ষ্ণ চোখ আর নিজের আত্মসম্মান নিয়ে চলা রুদ্রর জীবনটা বদলে গিয়েছিল ক্যাম্পাসের বকুলতলায় অনন্যাকে প্রথম দেখার পর।
অনন্যা ছিল এক অভিজাত, উচ্চবংশীয় পরিবারের মেয়ে। তার হাঁটার ধরন, তার গায়ের সুবাস, তার অহংকারী চোখের চাউনি—সবকিছুতেই এক ধরণের রাজকীয় আভিজাত্য ছিল। রুদ্র প্রথম দেখাতেই অনন্যার প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছিল। সে অনন্যাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছিল, তার জন্য সে মরতেও পারত। কিন্তু তাদের এই সামাজিক দূরত্বের মাঝে সবচেয়ে বড় পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাদের পারিবারিক ও সামাজিক বিশ্বাসের ভিন্নতা। তারা দুজন সম্পূর্ণ আলাদা সংস্কৃতির, আলাদা রীতিনীতির এবং আলাদা ধর্মের। রুদ্র যে বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে বড় হয়েছে, অনন্যার পরিবারের কাছে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
রুদ্র দিনের পর দিন অনন্যার পেছনে ঘুরেছে, তাকে নিজের ভালোবাসার কথা বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু অনন্যার কাছে রুদ্রর এই তীব্র আবেগের কোনো মূল্য ছিল না। সে রুদ্রকে সবসময় এড়িয়ে চলত, তার মধ্যবিত্ত ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সামাজিক ভিন্নতাকে তীব্র অবজ্ঞা করত।
একদিন দুপুরের তপ্ত রোদে, কার্জন হলের লাল ইটের দেওয়ালের আড়ালে রুদ্র অনন্যাকে একা পেয়ে তার পথ আটকে দাঁড়িয়েছিল। রুদ্রর চোখ দুটো ছিল আকুলতায় ভরা, সারা শরীরে এক অস্থির উত্তেজনা।
রুদ্র নিচু কিন্তু অনুনয়ভরা গলায় বলেছিল, "অনন্যা, প্লিজ একটা বার আমার কথাটা শোনো, আমি জানি আমাদের চারপাশের সমাজ আমাদের এই সম্পর্ককে সহজভাবে নেবে না। আমাদের বিশ্বাস আলাদা, পরিবার আলাদা। কিন্তু আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। তোমার জন্য আমি আমার নিজের সমাজ, পরিবার সবকিছু ছেড়ে দিতে রাজি আছি। তুমি শুধু একটা বার আমাকে একটু জায়গা দাও তোমার জীবনে।"
অনন্যা রুদ্রর দিকে তাকিয়ে এক চরম শীতল উদাসীনতা এবং অবজ্ঞার হাসি হেসেছিল। তার চোখে রুদ্রর জন্য কোনো সহানুভূতি ছিল না।
অনন্যা অত্যন্ত রূঢ় এবং অহংকারী গলায় বলেছিল, "তুমি কি পাগল হয়েছ, রুদ্র? আমি আমার বাবার এত বড় সম্পত্তি, আমার আভিজাত্য, আমার সমাজ ছেড়ে তোমার মতো একটা সাধারণ ছেলের সাথে জড়াব? আর তুমি যে বিশ্বাসের কথা বলছ, আমার পরিবার কখনোই তোমার ব্যাকগ্রাউন্ডকে মেনে নেবে না। আমাদের বিয়ের রিচুয়ালস, আমাদের ফ্যামিলি ভ্যালুজ—সবকিছু আলাদা। তোমার আর আমার মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত। সো প্লিজ, এই সস্তা প্রেমিকের মতো আচরণ বন্ধ করো আর আমার সামনে আর কখনো আসবে না।"
অনন্যার সেই তীব্র প্রত্যাখ্যান এবং অবহেলা রুদ্রর ভেতরের পুরো অস্তিত্বকে এক মুহূর্তে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল। যে মেয়ের জন্য সে নিজের সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিল, সেই মেয়েটির কাছে তার এই পবিত্র অনুভূতি ছিল কেবলই একটা 'সস্তা' বিষয়। অনন্যা নিজের আভিজাত্য আর পারিবারিক অহংকারকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছিল, রুদ্রর তীব্র ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র মূল্য না দিয়ে তাকে চরম অপমান করে চলে গিয়েছিল।
সেই রাতে রুদ্রর ভেতরের সেই সরল প্রেমিক ছেলেটি মরে গিয়েছিল। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, সে এত বড় হবে, এত ক্ষমতার অধিকারী হবে যে এই সমাজ আর আভিজাত্য তার পায়ের নিচে এসে পড়বে। কিন্তু আজ ক্ষমতার শীর্ষে এসেও সে অনন্যাকে ভুলতে পারেনি, বরং সেই না-পাওয়ার বেদনা এক ভয়ানক মানসিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।
বর্তমান সময় —
হঠাৎ দরজায় মৃদু টোকার শব্দে রুদ্রর স্মৃতির জাল ছিঁড়ে গেল। সে চোখ খুলে দেখল সায়লা ঘরে ঢুকেছে। সায়লার পরনে একটি সাধারণ সুতির শাড়ি, তার মুখটা কিছুটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। গত রাতের সেই ধকল এবং রুদ্রর মুখ থেকে বের হওয়া 'অনন্যা' নামটি সায়লার মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সায়লার চোখে আজ ক্ষোভের চেয়ে কৌতূহল এবং এক ধরণের গভীর মর্মবেদনা বেশি স্পষ্ট।
সায়লা ধীর পায়ে রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়াল। সে রুদ্রর চোখের দিকে তাকাল, যেখানে এখনো সেই পুরোনো যন্ত্রণার ছায়া লেগে আছে।
সায়লা অত্যন্ত নরম কিন্তু কাঁপানো গলায় ডাকল, "রুদ্র...আজকে অফিসে যাবে না? শরীর কি খারাপ লাগছে?"
রুদ্র সায়লার দিকে তাকাল। এই মেয়েটি তাকে কতটা ভালোবাসে, তার সমস্ত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করে। অথচ সে প্রতি রাতে এই পবিত্র মেয়েটির সাথে অন্যায় করে চলেছে। রুদ্রর বুকের ভেতর একটা তীব্র অনুশোচনা জেগে উঠল। সে সিগারেটের টুকরোটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে সায়লার হাত দুটো আলতো করে ধরল। গত রাতের মতো হিংস্রভাবে নয়, এবার তার স্পর্শে ছিল এক অদ্ভুত নরম অনুনয়।
"সায়লা... আই অ্যাম সরি," রুদ্র নিচু গলায় বলল, তার কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী হয়ে এল, "আমি জানি আমি তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করি না। প্রতি রাতে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমাকে ক্ষমা করে দিও।"
রুদ্রর মুখ থেকে এমন অনুশোচনার কথা শুনে সায়লার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। সে রুদ্রর চওড়া বুকে হাত রেখে বলল, "আমি তোমার কোনো আচরণে কষ্ট পাই না রুদ্র। তুমি আমার স্বামী, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?"
রুদ্র সায়লার দিকে তাকাল, কিছু বলল না।
সায়লা রুদ্রর চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করল, "কে এই অনন্যা? যার নাম তুমি প্রতি রাতে মিলনের চরম মুহূর্তে চিৎকার করে বলো? কেন তার নাম নিলে তোমার চোখ দুটো এত হিংস্র আর যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে? আমাদের বিয়ের আগের সেই আগ্রাসন, আর আজকের এই রূপ—সবকিছুর পেছনে কি এই অনন্যা জড়িয়ে আছে? আমি তোমার স্ত্রী রুদ্র, আমি তোমার অতীতটা জানতে চাই। তোমার মনের এই আগুন আমাকেও পুড়িয়ে মারছে।"
রুদ্র সায়লার প্রশ্ন শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে সায়লার হাত ছেড়ে দিয়ে আবার জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। তার মনের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের এই গল্প সে কাউকে বলতে পারে না, সায়লাকেও না।
রুদ্র অত্যন্ত ক্লান্ত গলায় বলল, "কিছু কিছু অতীত না জানাই ভালো সায়লা, তাতে শুধু অশান্তিই বাড়বে।"
সায়লা আর কিছু বলল না, কিন্তু তার মনের ভেতরের কৌতূহল এবং সন্দেহ আরও তীব্র হয়ে উঠল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, যে অনন্যা নামের মেয়েটি তার স্বামীর মনকে এভাবে বিষাক্ত করে রেখেছে, তাকে সে খুঁজে বের করবেই। সে জানতে চায়, কে এই অনন্যা এবং কী তার ইতিহাস।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)