03-06-2026, 03:53 AM
দুপুরবেলা। কলেজের পার্কিং লট সংলগ্ন এলাকা।
কলেজের বিশাল পার্কিং লটে চারপাশে সারি সারি দাঁড় করানো দামি গাড়িগুলোর কাঁচে দুপুরের রোদের আলো ঠিকরে পড়ছে। পার্কিং লটের একপাশে নিজের স্পোর্টস কারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রোহিত। ফোর্থ ইয়ার, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট। শহরের এক নামকরা ব্যবসায়ীর একমাত্র ছেলে। স্টাইলিশ স্পাইক করা চুল, কানে ডায়মন্ড স্টাড, পরনে ব্র্যান্ডেড টি-শার্ট আর চোখে আরমানির রোদচশমা।
তার হাতে একটা গাঢ় নীল রঙের ভেলভেটের বাক্স। ভেতরে একটা অত্যন্ত দামি প্ল্যাটিনাম চেইন। সে আজ মনস্থির করেই এসেছে।
তার থেকে কয়েক হাত দূরে, পার্কিং লটের একটা পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন। আজ তার পরনে একটা সি-গ্রিন রঙের স্লিভলেস লিনেন ড্রেস, চোখে প্রাডার সানগ্লাস। তার পারফেক্ট, ম্যানিকিওর করা আঙুলগুলো আইফোনের স্ক্রিনে দ্রুত টাইপ করছে। বাতাসের সাথে তার দামি ডিওর পারফিউমের গন্ধটা মিশে একটা মাদকতাভরা আবেশ তৈরি করেছে।
কিন্তু চন্দ্রিমার মাথার ভেতরে শুধু একজনের মুখই জাঁকিয়ে বসে আছে, সেটা অয়ন।
গতকাল তার এক বন্ধু, স্নেহা, তাকে একটা অদ্ভুত ইনফরমেশন দিয়েছে। তাদের একজন কমন ফ্রেন্ড নাকি গত পরশুদিন সন্ধেবেলায় অয়নকে সেন্ট্রাল কলকাতার ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।
চন্দ্রিমা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। অয়ন? সেন্ট্রাল কলকাতায়? কী করতে যাবে ও ওখানে? নিশ্চয়ই দেখার ভুল।
কিন্তু, যদি ওটা সত্যিই অয়ন হয়? সে স্নেহাকে বলে রেখেছে সে যেন এর মধ্যে ওই এরিয়াতে গেলে চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর রাখে এবং অয়নকে দেখলেই তাকে ইনফর্ম করে।
চন্দ্রিমা যখন চিন্তার জগতে মগ্ন হয়েছিল ঠিক সেই সময় রোহিত তার বাইক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং একটা আত্মবিশ্বাসী, প্লে-বয় মার্কা হাসি মুখে ঝুলিয়ে চন্দ্রিমার দিকে এগিয়ে এল।
"হেই, গর্জিয়াস!"
রোহিত চন্দ্রিমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর গা থেকে ভেসে আসা দামী কোলোনের গন্ধটা চন্দ্রিমার নাকে ধাক্কা মারল।
চন্দ্রিমা সানগ্লাসের ওপর দিয়ে একবার রোহিতের দিকে তাকাল। ওর চোখে কোন ইমোশন নেই।
"কী ব্যাপার রোহিত ?" চন্দ্রিমার গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা।
রোহিত তার চার্মিং হাসিটা আরও একটু চওড়া করল। সে পকেট থেকে ভেলভেটের বাক্সটা বের করে চন্দ্রিমার চোখের সামনে মেলে ধরল। রোদের আলোয় প্ল্যাটিনামের চেইনটা ঝিলিক দিয়ে উঠল।
"জাস্ট আ স্মল টোকেন অফ অ্যাপ্রিসিয়েশন, ফর দ্য মোস্ট বিউটিফুল গার্ল ইন দ্য ক্যাম্পাস। দিস উইকএন্ড, আমার ফার্মহাউসে একটা প্রাইভেট পার্টি আছে। অ্যান্ড আই ওয়ান্ট ইউ টু বি মাই ভিআইপি গেস্ট। হোয়াট ডু ইউ সে?"
রোহিতের গলার স্বরে প্রচ্ছন্ন অহংকার, যেন সে নিশ্চিত চন্দ্রিমা এই দামি গিফট আর ইনভাইটেশন পেয়ে ইমপ্রেসড হয়ে যাবে।
কিন্তু, চন্দ্রিমা কোন কথা না বলে একদৃষ্টে রোহিতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মাস আগে এই দামি গিফট, এই অ্যাটেনশন আর ইনভিটেশন ওর ইগোকে স্যাটিসফাই করতে সমর্থ হতো। সে বক্সটা হাতে নিয়ে একটু মুচকি হাসত, একটু ফ্লার্ট করত আর ছেলেটার ইগোটাকে একটু সুড়সুড়ি দিয়ে নিজের ফ্যান ফলোয়িং বাড়াত।
কিন্তু আজ? আজ রোহিতের এই মুখটার দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমার ভেতর থেকে একটা তীব্র তাচ্ছিল্য উপচে পড়ল।
রোহিতের এই সাজানো, মেকি পৌরুষের সাথে অয়নের সেই ঘামে ভেজা, শীতল-পাথুরে রূপটার কোনো তুলনাই হয় না। ডার্ক, আনপ্রেডিক্টেবল, ডেঞ্জারাস না হলে কিসের পুরুষ? আসল পুরুষ সেই, যাকে বশ করতে বেগ পেতে হয়।
অয়নের চোখের একটা নিস্পৃহ দৃষ্টির কাছে রোহিতের এই লক্ষ টাকার গ্ল্যামার ভীষণ সস্তা মনে হলো চন্দ্রিমার।
সে ধীরে ধীরে নিজের সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলল। তার চোখের দৃষ্টি এখন ছুরির ফলার মতো ধারালো। অয়নের অবজ্ঞা আর প্রত্যাখ্যান চন্দ্রিমার সাইকোলজিতে কিছুটা হলেও বদল এনেছে।
"রোহিত", চন্দ্রিমার গলাটা এতটাই নিস্পৃহ আর ঠান্ডা ছিল যে রোহিতের মেকি হাসিটা এক লহমায় থমকে গেল। সে যেরকম ভেবেছিল চন্দ্রিমার রিঅ্যাকশনটা সেরকম নয়।
"তুমি কি ভেবেছ পুরো পৃথিবীটা শুধু তোমার আর তোমার বাবার টাকার চারপাশে ঘোরে?"
রোহিত চমকে এক পা পিছিয়ে গেল।
"এক্সকিউজ মি? চন্দ্রিমা, আই জাস্ট থট..."
"তুমি কী ভেবেছ, আর তুমি কী চাও, তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", চন্দ্রিমা সেদিন ম্যাচের শেষে অয়ন ঠিক যে কথাগুলো ওকে নির্মমভাবে শুনিয়েছিল ঠিক সেই শব্দগুলোই নিখুঁতভাবে রোহিতের সামনে উচ্চারণ করল।
"শোনো রোহিত, তুমি কে আর তুমি কী চাও তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। তোমার এই প্লে-বয় ইমেজ আর দামি গিফটগুলো অন্য সস্তা মেয়েদের কাছে গিয়ে ফ্লন্ট করো। আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি আমার কাছে জাস্ট এই পার্কিং লটের একটা ল্যাম্পপোস্ট বা পিলারের মতো একটা অবজেক্ট। আমার সময় নষ্ট কোরো না। রাস্তা ছাড়ো।"
কথাটা বলে চন্দ্রিমা এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। রোহিতের হতবাক, অপমানিত, ফ্যাকাশে মুখটার দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে সে নিজের হিল জুতোর খটখট শব্দ তুলে পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে গেল।
চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা একটা পৈশাচিক আনন্দে ভরে উঠল। অয়নের সেদিনের নির্মম ব্যবহারের আস্বাদ সে আজ নিজে অনুভব করল। নো ডাউট যে ওই বুনো জংলি ছেলেটাই আসল পুরুষ। অয়ন চ্যাটার্জীকে তার চাই-ই চাই।যেকোনো মূল্যে।
ওদিকে, রোহিত বেশ কিছুক্ষণ সেখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের সমস্ত পুরুষালি দম্ভ এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেছে। এরকম জঘন্য ব্যবহার সে এর আগে জীবনে কখনও পায়নি। এত দামী উপহার দিতে এসে এই ব্যবহার ? কী মনে করে মেয়েটা নিজেকে ?
ওর হাতের ভেলভেটের বাক্সটা তখনো খোলা ছিল। সে আস্তে আস্তে ঢাকনাটা বন্ধ করল। ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল।
এর একটা বিহিত করতেই হবে।
পরিশিষ্ট
রাত তখন প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই।
বাইপাসের ধারে শহরের অন্যতম এক্সক্লুসিভ লাউঞ্জ ক্লাব, 'দ্য ভেলভেট লাউঞ্জে তখন পার্টি চলছে। সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে শ্রান্ত শহর তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
বাইপাসের ধারের এই 'দ্য ভেলভেট লাউঞ্জ'-এর মেম্বারশিপ শহরের ক্ষমতাশালী হাই-প্রোফাইল পলিটিশিয়ান, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এবং কর্পোরেট ব্যারন ছাড়া আর কারোর নেই। এখানকার বাতাস সবসময় ক্ষমতার গন্ধে ভারী হয়ে থাকে।
কালো সাফারি স্যুট পরা বাউন্সারদের কড়া প্রহরার বাইরে থেকে ভেতরের রাজকীয় জাঁকজমকের কোনো আঁচই মেলে না।
আজ এখানে শহরের অন্যতম এক্সক্লুসিভ, 'ইনভাইটেশন-ওনলি' পার্টি চলছে। এত রাতেও বাইরের গেটে বেশ কিছু বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
লাউঞ্জের একদম ভেতরের দিকের 'ভিআইপি এনক্লেভ'-এর পরিবেশটা অদ্ভুত মায়াবী এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা অ্যান্টিক ক্রিস্টাল শ্যান্ডেলিয়ার থেকে এক ম্লান, সোনালি-অ্যাম্বার রঙের আলো নিচে দামি পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর এসে পড়েছে। স্পিকারে খুব নিচু গ্রামে বাজছে একটা স্লো, সেন্সুয়াল জ্যাজ স্যাক্সোফোনের সুর। বাতাসে মিশে আছে কিউবান চুরুটের ধোঁয়া এবং অত্যন্ত দামি ফ্রেঞ্চ পারফিউমের একটা মাদকতাময় সংমিশ্রণ।
এনক্লেভের একদম কোণের দিকের একটা হাফ-মুন লেদার সোফায় বসে আছেন একজন মাঝবয়সী, অত্যন্ত প্রভাবশালী চেহারার মানুষ। শিশিরকুমার রায়। রাজ্যের অন্যতম বড় পোর্ট ট্রাস্ট এবং শিপিং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান।
কিন্তু, এই মুহূর্তে তার চেহারায় কোনো ক্ষমতার দম্ভ নেই। বরং সেন্ট্রাল এসির এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও তার কপাল দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
তিনি একটু পরপরই হাতের রুমালে কপালের ঘাম মুছছেন আর তার সামনের টেবিলে রাখা আঠারো বছরের পুরোনো সিঙ্গল মল্ট স্কচের গ্লাসটায় চুমুক দিচ্ছেন। তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছে।
তিনি কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন। এমন একজনের জন্য, যাকে তিনি ভয় পান, আবার যার মোহ থেকে তিনি বেরোতেও পারেন না।
একটু পরে ভিআইপি এনক্লেভের ভারী মেহগনি কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল একটা ছায়ামূর্তি। শিশির বাবুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তিনি প্রায় রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো নিজের সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
মহিলা ধীর, অত্যন্ত মাপা এবং রাজকীয় পদক্ষেপে ভেতরের অ্যাম্বার আলোর মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।
বয়স চল্লিশের কোঠায়, কিন্তু তার শরীর এবং উপস্থিতিতে এমন একটা আদিম অথচ সফিস্টিকেটেড আকর্ষণ আছে, যা যেকোন যুবতীকে লজ্জায় ফেলে দেবে।
আজ তার পরনে একটা ডিপ মিডনাইট-ব্লু রঙের ডিজাইনার ফ্রেঞ্চ শিফন শাড়ি। শাড়ির ফ্যাব্রিকটা এতটাই মিহি এবং স্বচ্ছ যে, লাউঞ্জের ম্লান আলোয় তার মেদহীন, মাখনের মতো মসৃণ কোমরের খাঁজ আর নাভির গভীরতা একটা অদ্ভুত মায়াবী মোহ তৈরি করেছে।
শাড়ির সাথে তার পরনে একটা স্লিভলেস, ডিপ-কাট ব্ল্যাক ভেলভেটের ব্লাউজ। ব্লাউজের সামনের দিকের গভীরতা তার সুডৌল, স্ফীত বক্ষবিভাজিকার একটা আকর্ষণীয়, অথচ পরিশীলিত আভাস দিচ্ছে। আর পেছনের দিকটা প্রায় পুরোটাই উন্মুক্ত, যেখানে শুধু একটা সরু কালো ফিতে তার ফর্সা, নিটোল পিঠের মেরুদণ্ডকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।
তার চুলগুলো একটা নিটোল, টাইট ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা, ঘাড়ের কাছে কয়েকটা অবাধ্য চুল এসে পড়েছে। চোখে ডার্ক স্মোকি আই মেকআপ, যা তার চাউনিকে আক্ষরিক অর্থেই শিকারি চিতার মতো ধারালো করে তুলেছে। ভরাট, সুগঠিত ঠোঁটে গাঢ় বার্গান্ডি রঙের ম্যাট লিপস্টিক। গলায় কোনো গয়না নেই, শুধু তার ডান হাতের অনামিকায় একটা বিশাল আকারের সলিটেয়ার ডায়মন্ড রিং লাউঞ্জের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
তিনি সামনের সোফাটার দিকে এগিয়ে এলেন। তার স্টিলেটোর খটখট শব্দগুলো লাউঞ্জের কার্পেটে একটা নীরব ছন্দের মতো বাজতে লাগল।
শাড়ির কুঁচিগুলো তার সুগঠিত উরু আর নিতম্বের খাঁজে একটা অদ্ভুত সেন্সুয়াল দুলুনি তৈরি করছে। তার শরীর থেকে ভেসে আসা একটা কড়া অথচ মোহময়ী পারফিউমের গন্ধ শিশিরবাবুর নাকে এসে ধাক্কা মারল।
গন্ধটার মধ্যে নিঃসন্দেহে একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে গুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
"গুড ইভিনিং... ম্যাডাম," শিশির বাবুর গলাটা সামান্য কেঁপে গেল। রাজ্যের এতবড় একজন ক্ষমতাবান আমলা, যার একটা সইয়ের ওপর কোটি টাকার শিপিং টেন্ডার পাস হয়, তিনি এই মহিলার সামনে একটা বাধ্য, নার্ভাস কলেজছাত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
মহিলা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি অত্যন্ত ধীরেসুস্থে শিশিরবাবুর ঠিক উল্টোদিকে একটা হাই-ব্যাক লেদার সোফায় পা এলিয়ে বসলেন। তার বসার ভঙ্গিতে কোনো আড়ষ্টতা নেই, বরং এমন একটা রাজকীয় শিথিলতা আছে, যা শুধুমাত্র সেইসব মানুষদের থাকে যারা নিজেদের ক্ষমতার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য উপভোগ করে।
বসার সময় তিনি ইচ্ছে করে তার শাড়ির আঁচলটা একটু অযত্নের সাথে ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলেন। এর ফলে তার বক্ষ ভাঁজের গভীরতা এবং ফর্সা কলারবোন লাউঞ্জের আলোয় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
শিশির বাবুর চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওদিকে আটকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ভয় পেয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন।
এই মহিলা সাংঘাতিক।
"বসুন, মিস্টার রায়" মহিলার গলাটা একদম খাদে নামানো, হাস্কি এবং বরফের মতো ঠান্ডা। গলার স্বরে একটা কমান্ডিং টোন আছে।
শিশিরবাবু ঢোক গিলে আবার সোফায় বসলেন। মহিলা তার পার্স থেকে একটা লম্বাটে, গোল্ড-প্লেটেড সিগারেট কেস বের করলেন। অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে একটা সরু মেন্থল সিগারেট দুই ঠোঁটের মাঝে রাখলেন। সাথে সাথে শিশিরবাবু নিজের পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুনটা তার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।
মহিলা লাইটারের আগুনের দিকে সামান্য ঝুঁকলেন। শিশিরবাবু খুব কাছ থেকে দেখতে পেলেন ওই গাঢ় বার্গান্ডি কালারের লিপস্টিকে মোড়া ঠোঁটদুটো কীভাবে ফিল্টারটাকে স্পর্শ করেছে। লাইটারের আলোয় মহিলার স্মোকি চোখের শিকারের মতো দৃষ্টি তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নামিয়ে দিল।
মহিলা একটা গভীর টান দিয়ে ধোঁয়াটা খুব ধীর গতিতে, সেন্সুয়াল ভঙ্গিতে শিশির বাবুর মুখের দিকে ছাড়লেন।
"আপনি ঘামছেন, মিস্টার রায়", মহিলা ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললেন।
"এই ষোল ডিগ্রির সেন্ট্রাল এসির মধ্যেও আপনার কপাল ঘামছে। কোনো বিশেষ কারণ?"
"ম্যাডাম... সি-কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ওই ফাইলটা..."
শিশির বাবু আমতা আমতা করে বললেন, "ওটা পাস করানো এই মুহূর্তে ইম্পসিবল। মিনিস্ট্রি থেকে ডিরেক্ট অডিট বসিয়েছে। আমি যদি এখন ওই ফেক চালানটাতে সই করি, তাহলে আমি সোজা সিবিআইয়ের জালে পড়ব।"
মহিলা সিগারেটের ছাইটা টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের অ্যাশট্রেতে আলতো করে ঝেড়ে ফেললেন। তার চোখের দৃষ্টি এক চুলও কাঁপল না।
"ইম্পসিবল বলে কোনো শব্দ আমার ডিকশনারিতে নেই, মিস্টার রায়" মহিলার গলার স্বরটা হঠাৎ করেই যেন আরও কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে গেল। "আপনার পোর্ট ট্রাস্টের ওই ক্লিয়ারেন্সটা আমার দরকার। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।"
"কিন্তু ম্যাডাম, আমার চাকরি চলে যাবে! আমি ফেঁসে যাব!" শিশিরবাবু প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন।
মহিলা এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার বুকের শিফন শাড়ির আবরণটা আরও একটু সরে গেল। তিনি নিজের মসৃণ, পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা হাতটা বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা শিশির বাবুর ঘামে ভেজা হাতটার ওপর রাখলেন। তার সারা শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। মহিলার হাতের স্পর্শটা অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা, কিন্তু তার মধ্যে একটা ইলেকট্রিক উত্তেজনা আছে। তার নখের ধারালো কোণটা শিশিরবাবুর হাতের চামড়ায় খুব হালকাভাবে আঁচড় কাটছে।
"মিস্টার রায়..." মহিলা প্রায় ফিসফিস করে, একটা মোহময়ী স্বরে ডাকলেন। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস শিশির বাবুর ঘাড়ের কাছে পৌঁছোচ্ছে।
"আপনি কি সত্যিই ভাবছেন সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে আপনি আমার কাজটা আটকাতে পারবেন?"
মহিলা তার আরেক হাত দিয়ে নিজের ডিজাইনার পার্সটা খুললেন। ভেতর থেকে একটা ছোট কালো পেন-ড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর, ঠিক শিশির বাবুর স্কচের গ্লাসের পাশে রাখলেন।
"এই পেন-ড্রাইভে একটা ছোট্ট ভিডিও আছে," মহিলা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে, যেন আবহাওয়ার খবর পড়ছেন, এমনভাবে বললেন।
"গত মাসে ব্যাংককের একটা প্রাইভেট ইয়টে আপনি এবং আপনার দুজন রাশিয়ান এসকর্টের কিছু এক্সক্লুসিভ মুহূর্ত। আপনার স্ত্রী এবং আপনার ওই পলিটিক্যাল গডফাদারদের এই ভিডিওটা দেখতে বেশ ভালোই লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।"
শিশির বাবুর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। তার চোখেমুখে চরম আতঙ্ক ফুটে উঠল।
"ম্যা... ম্যাডাম... প্লিজ! আপনি এটা করতে পারেন না..." তার গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোল।
মহিলা শিশির বাবুর হাতের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলেন। তিনি আবার সোফায় হেলান দিয়ে বসে সিগারেটে শেষ টানটা দিলেন।
"আমি কী করতে পারি আর কী পারি না, সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন"
মহিলা এবার অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বললেন। তার চোখের সেই সম্মোহনী মোহটা কেটে গিয়ে সেখানে এখন ক্রুরতা খেলা করছে।
"কাল সকাল দশটায় আমার লোক আপনার অফিসে যাবে। ফাইলে সইটা হয়ে যাওয়া চাই। আর হ্যাঁ, এই ডিলের কাটমানির পার্সেন্টেজটা আমি টুয়েন্টি থেকে থার্টি পার্সেন্ট করে দিয়েছি। দ্যাটস মাই ফি ফর নট রিলিজিং দিস ভিডিও।"
শিশির বাবুর আর কোনো কথা বলার মতো ক্ষমতা ছিল না। তার দম্ভ, তার অহংকার, সবকিছু আজকে এই শিফনে মোড়া আগুন আর বরফের সংমিশ্রণের সামনে ধুলোয় মিশে গেল।
তিনি শুধু অসহায়ভাবে মাথা ওপর-নিচ করে সম্মতি জানালেন।
মহিলা ঠোঁটের কোণে আবার সেই মোহময়ী হাসিটা ফুটিয়ে তুললেন। তিনি নিজের পার্সটা হাতে তুলে নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
"গুড বয়," মহিলা একটা তাচ্ছিল্যভরা স্বরে বললেন।
তিনি যাওয়ার আগে শিশিরবাবুর কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেলেন। তার ডিওর পারফিউমের গন্ধ আর উষ্ণ নিঃশ্বাসের তাপ শিশিরবাবুর গায়ের রোম খাড়া করে দিল।
"নেক্সট টাইম, মিস্টার রায়... আমার সাথে ডিল করার আগে নিজের লিমিটটা মনে রাখবেন। আই ক্যান বি ইওর বেস্ট ড্রিম, অর ইওর ওয়ার্স্ট নাইটমেয়ার।"
কথাটা বলে মহিলা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। তিনি ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তার হিল জুতোর ছান্দিক শব্দ আর শাড়িতে মোড়া পাছার মোহময়ী দুলুনি আবার লাউঞ্জের ওই অ্যাম্বার আলোর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
টেবিলের ওপর পড়ে রইল শুধু একটা অর্ধেক খাওয়া স্কচের গ্লাস, একটা কালো পেন-ড্রাইভ, আর একরাশ পোড়া সিগারেটের ছাই। শিশিরকুমার রায় সেখানে একটা জীবন্ত লাশের মতো বসে রইলেন, তার চোখ তখনো ওই দরজার দিকে স্থির।
তিনি দেখতে পেলেন না 'ম্যাডাম'-এর মুখে একটা পরম তৃপ্তির হাসি। এই ক্ষমতার খেলা, এই ম্যানিপুলেশন, সুতোর টানে ক্ষমতাশালী পুরুষদের পুতুলের মতো নাচানো, এটা তার কাছে নেশার মতো।
কলেজের বিশাল পার্কিং লটে চারপাশে সারি সারি দাঁড় করানো দামি গাড়িগুলোর কাঁচে দুপুরের রোদের আলো ঠিকরে পড়ছে। পার্কিং লটের একপাশে নিজের স্পোর্টস কারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রোহিত। ফোর্থ ইয়ার, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট। শহরের এক নামকরা ব্যবসায়ীর একমাত্র ছেলে। স্টাইলিশ স্পাইক করা চুল, কানে ডায়মন্ড স্টাড, পরনে ব্র্যান্ডেড টি-শার্ট আর চোখে আরমানির রোদচশমা।
তার হাতে একটা গাঢ় নীল রঙের ভেলভেটের বাক্স। ভেতরে একটা অত্যন্ত দামি প্ল্যাটিনাম চেইন। সে আজ মনস্থির করেই এসেছে।
তার থেকে কয়েক হাত দূরে, পার্কিং লটের একটা পিলারের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল চন্দ্রিমা সেন। আজ তার পরনে একটা সি-গ্রিন রঙের স্লিভলেস লিনেন ড্রেস, চোখে প্রাডার সানগ্লাস। তার পারফেক্ট, ম্যানিকিওর করা আঙুলগুলো আইফোনের স্ক্রিনে দ্রুত টাইপ করছে। বাতাসের সাথে তার দামি ডিওর পারফিউমের গন্ধটা মিশে একটা মাদকতাভরা আবেশ তৈরি করেছে।
কিন্তু চন্দ্রিমার মাথার ভেতরে শুধু একজনের মুখই জাঁকিয়ে বসে আছে, সেটা অয়ন।
গতকাল তার এক বন্ধু, স্নেহা, তাকে একটা অদ্ভুত ইনফরমেশন দিয়েছে। তাদের একজন কমন ফ্রেন্ড নাকি গত পরশুদিন সন্ধেবেলায় অয়নকে সেন্ট্রাল কলকাতার ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।
চন্দ্রিমা প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি। অয়ন? সেন্ট্রাল কলকাতায়? কী করতে যাবে ও ওখানে? নিশ্চয়ই দেখার ভুল।
কিন্তু, যদি ওটা সত্যিই অয়ন হয়? সে স্নেহাকে বলে রেখেছে সে যেন এর মধ্যে ওই এরিয়াতে গেলে চারপাশে তীক্ষ্ণ নজর রাখে এবং অয়নকে দেখলেই তাকে ইনফর্ম করে।
চন্দ্রিমা যখন চিন্তার জগতে মগ্ন হয়েছিল ঠিক সেই সময় রোহিত তার বাইক থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং একটা আত্মবিশ্বাসী, প্লে-বয় মার্কা হাসি মুখে ঝুলিয়ে চন্দ্রিমার দিকে এগিয়ে এল।
"হেই, গর্জিয়াস!"
রোহিত চন্দ্রিমার খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর গা থেকে ভেসে আসা দামী কোলোনের গন্ধটা চন্দ্রিমার নাকে ধাক্কা মারল।
চন্দ্রিমা সানগ্লাসের ওপর দিয়ে একবার রোহিতের দিকে তাকাল। ওর চোখে কোন ইমোশন নেই।
"কী ব্যাপার রোহিত ?" চন্দ্রিমার গলাটা বরফের মতো ঠান্ডা।
রোহিত তার চার্মিং হাসিটা আরও একটু চওড়া করল। সে পকেট থেকে ভেলভেটের বাক্সটা বের করে চন্দ্রিমার চোখের সামনে মেলে ধরল। রোদের আলোয় প্ল্যাটিনামের চেইনটা ঝিলিক দিয়ে উঠল।
"জাস্ট আ স্মল টোকেন অফ অ্যাপ্রিসিয়েশন, ফর দ্য মোস্ট বিউটিফুল গার্ল ইন দ্য ক্যাম্পাস। দিস উইকএন্ড, আমার ফার্মহাউসে একটা প্রাইভেট পার্টি আছে। অ্যান্ড আই ওয়ান্ট ইউ টু বি মাই ভিআইপি গেস্ট। হোয়াট ডু ইউ সে?"
রোহিতের গলার স্বরে প্রচ্ছন্ন অহংকার, যেন সে নিশ্চিত চন্দ্রিমা এই দামি গিফট আর ইনভাইটেশন পেয়ে ইমপ্রেসড হয়ে যাবে।
কিন্তু, চন্দ্রিমা কোন কথা না বলে একদৃষ্টে রোহিতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কয়েক মাস আগে এই দামি গিফট, এই অ্যাটেনশন আর ইনভিটেশন ওর ইগোকে স্যাটিসফাই করতে সমর্থ হতো। সে বক্সটা হাতে নিয়ে একটু মুচকি হাসত, একটু ফ্লার্ট করত আর ছেলেটার ইগোটাকে একটু সুড়সুড়ি দিয়ে নিজের ফ্যান ফলোয়িং বাড়াত।
কিন্তু আজ? আজ রোহিতের এই মুখটার দিকে তাকিয়ে চন্দ্রিমার ভেতর থেকে একটা তীব্র তাচ্ছিল্য উপচে পড়ল।
রোহিতের এই সাজানো, মেকি পৌরুষের সাথে অয়নের সেই ঘামে ভেজা, শীতল-পাথুরে রূপটার কোনো তুলনাই হয় না। ডার্ক, আনপ্রেডিক্টেবল, ডেঞ্জারাস না হলে কিসের পুরুষ? আসল পুরুষ সেই, যাকে বশ করতে বেগ পেতে হয়।
অয়নের চোখের একটা নিস্পৃহ দৃষ্টির কাছে রোহিতের এই লক্ষ টাকার গ্ল্যামার ভীষণ সস্তা মনে হলো চন্দ্রিমার।
সে ধীরে ধীরে নিজের সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলল। তার চোখের দৃষ্টি এখন ছুরির ফলার মতো ধারালো। অয়নের অবজ্ঞা আর প্রত্যাখ্যান চন্দ্রিমার সাইকোলজিতে কিছুটা হলেও বদল এনেছে।
"রোহিত", চন্দ্রিমার গলাটা এতটাই নিস্পৃহ আর ঠান্ডা ছিল যে রোহিতের মেকি হাসিটা এক লহমায় থমকে গেল। সে যেরকম ভেবেছিল চন্দ্রিমার রিঅ্যাকশনটা সেরকম নয়।
"তুমি কি ভেবেছ পুরো পৃথিবীটা শুধু তোমার আর তোমার বাবার টাকার চারপাশে ঘোরে?"
রোহিত চমকে এক পা পিছিয়ে গেল।
"এক্সকিউজ মি? চন্দ্রিমা, আই জাস্ট থট..."
"তুমি কী ভেবেছ, আর তুমি কী চাও, তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই", চন্দ্রিমা সেদিন ম্যাচের শেষে অয়ন ঠিক যে কথাগুলো ওকে নির্মমভাবে শুনিয়েছিল ঠিক সেই শব্দগুলোই নিখুঁতভাবে রোহিতের সামনে উচ্চারণ করল।
"শোনো রোহিত, তুমি কে আর তুমি কী চাও তাতে আমার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই। তোমার এই প্লে-বয় ইমেজ আর দামি গিফটগুলো অন্য সস্তা মেয়েদের কাছে গিয়ে ফ্লন্ট করো। আমার কাছে তোমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি আমার কাছে জাস্ট এই পার্কিং লটের একটা ল্যাম্পপোস্ট বা পিলারের মতো একটা অবজেক্ট। আমার সময় নষ্ট কোরো না। রাস্তা ছাড়ো।"
কথাটা বলে চন্দ্রিমা এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। রোহিতের হতবাক, অপমানিত, ফ্যাকাশে মুখটার দিকে একবার তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে সে নিজের হিল জুতোর খটখট শব্দ তুলে পার্কিং লট থেকে বেরিয়ে গেল।
চন্দ্রিমার বুকের ভেতরটা একটা পৈশাচিক আনন্দে ভরে উঠল। অয়নের সেদিনের নির্মম ব্যবহারের আস্বাদ সে আজ নিজে অনুভব করল। নো ডাউট যে ওই বুনো জংলি ছেলেটাই আসল পুরুষ। অয়ন চ্যাটার্জীকে তার চাই-ই চাই।যেকোনো মূল্যে।
ওদিকে, রোহিত বেশ কিছুক্ষণ সেখানে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের সমস্ত পুরুষালি দম্ভ এক লহমায় ধুলোয় মিশে গেছে। এরকম জঘন্য ব্যবহার সে এর আগে জীবনে কখনও পায়নি। এত দামী উপহার দিতে এসে এই ব্যবহার ? কী মনে করে মেয়েটা নিজেকে ?
ওর হাতের ভেলভেটের বাক্সটা তখনো খোলা ছিল। সে আস্তে আস্তে ঢাকনাটা বন্ধ করল। ওর চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল।
এর একটা বিহিত করতেই হবে।
পরিশিষ্ট
রাত তখন প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই।
বাইপাসের ধারে শহরের অন্যতম এক্সক্লুসিভ লাউঞ্জ ক্লাব, 'দ্য ভেলভেট লাউঞ্জে তখন পার্টি চলছে। সারাদিনের পরিশ্রমের শেষে শ্রান্ত শহর তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
বাইপাসের ধারের এই 'দ্য ভেলভেট লাউঞ্জ'-এর মেম্বারশিপ শহরের ক্ষমতাশালী হাই-প্রোফাইল পলিটিশিয়ান, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট এবং কর্পোরেট ব্যারন ছাড়া আর কারোর নেই। এখানকার বাতাস সবসময় ক্ষমতার গন্ধে ভারী হয়ে থাকে।
কালো সাফারি স্যুট পরা বাউন্সারদের কড়া প্রহরার বাইরে থেকে ভেতরের রাজকীয় জাঁকজমকের কোনো আঁচই মেলে না।
আজ এখানে শহরের অন্যতম এক্সক্লুসিভ, 'ইনভাইটেশন-ওনলি' পার্টি চলছে। এত রাতেও বাইরের গেটে বেশ কিছু বিলাসবহুল গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
লাউঞ্জের একদম ভেতরের দিকের 'ভিআইপি এনক্লেভ'-এর পরিবেশটা অদ্ভুত মায়াবী এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা অ্যান্টিক ক্রিস্টাল শ্যান্ডেলিয়ার থেকে এক ম্লান, সোনালি-অ্যাম্বার রঙের আলো নিচে দামি পার্সিয়ান কার্পেটের ওপর এসে পড়েছে। স্পিকারে খুব নিচু গ্রামে বাজছে একটা স্লো, সেন্সুয়াল জ্যাজ স্যাক্সোফোনের সুর। বাতাসে মিশে আছে কিউবান চুরুটের ধোঁয়া এবং অত্যন্ত দামি ফ্রেঞ্চ পারফিউমের একটা মাদকতাময় সংমিশ্রণ।
এনক্লেভের একদম কোণের দিকের একটা হাফ-মুন লেদার সোফায় বসে আছেন একজন মাঝবয়সী, অত্যন্ত প্রভাবশালী চেহারার মানুষ। শিশিরকুমার রায়। রাজ্যের অন্যতম বড় পোর্ট ট্রাস্ট এবং শিপিং কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান।
কিন্তু, এই মুহূর্তে তার চেহারায় কোনো ক্ষমতার দম্ভ নেই। বরং সেন্ট্রাল এসির এই কনকনে ঠান্ডার মধ্যেও তার কপাল দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।
তিনি একটু পরপরই হাতের রুমালে কপালের ঘাম মুছছেন আর তার সামনের টেবিলে রাখা আঠারো বছরের পুরোনো সিঙ্গল মল্ট স্কচের গ্লাসটায় চুমুক দিচ্ছেন। তার চোখ বারবার দরজার দিকে যাচ্ছে।
তিনি কারোর জন্য অপেক্ষা করছেন। এমন একজনের জন্য, যাকে তিনি ভয় পান, আবার যার মোহ থেকে তিনি বেরোতেও পারেন না।
একটু পরে ভিআইপি এনক্লেভের ভারী মেহগনি কাঠের দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। দরজার ফ্রেমে এসে দাঁড়াল একটা ছায়ামূর্তি। শিশির বাবুর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। তিনি প্রায় রিফ্লেক্স অ্যাকশনের মতো নিজের সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
মহিলা ধীর, অত্যন্ত মাপা এবং রাজকীয় পদক্ষেপে ভেতরের অ্যাম্বার আলোর মধ্যে এসে দাঁড়ালেন।
বয়স চল্লিশের কোঠায়, কিন্তু তার শরীর এবং উপস্থিতিতে এমন একটা আদিম অথচ সফিস্টিকেটেড আকর্ষণ আছে, যা যেকোন যুবতীকে লজ্জায় ফেলে দেবে।
আজ তার পরনে একটা ডিপ মিডনাইট-ব্লু রঙের ডিজাইনার ফ্রেঞ্চ শিফন শাড়ি। শাড়ির ফ্যাব্রিকটা এতটাই মিহি এবং স্বচ্ছ যে, লাউঞ্জের ম্লান আলোয় তার মেদহীন, মাখনের মতো মসৃণ কোমরের খাঁজ আর নাভির গভীরতা একটা অদ্ভুত মায়াবী মোহ তৈরি করেছে।
শাড়ির সাথে তার পরনে একটা স্লিভলেস, ডিপ-কাট ব্ল্যাক ভেলভেটের ব্লাউজ। ব্লাউজের সামনের দিকের গভীরতা তার সুডৌল, স্ফীত বক্ষবিভাজিকার একটা আকর্ষণীয়, অথচ পরিশীলিত আভাস দিচ্ছে। আর পেছনের দিকটা প্রায় পুরোটাই উন্মুক্ত, যেখানে শুধু একটা সরু কালো ফিতে তার ফর্সা, নিটোল পিঠের মেরুদণ্ডকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।
তার চুলগুলো একটা নিটোল, টাইট ফ্রেঞ্চ রোলে বাঁধা, ঘাড়ের কাছে কয়েকটা অবাধ্য চুল এসে পড়েছে। চোখে ডার্ক স্মোকি আই মেকআপ, যা তার চাউনিকে আক্ষরিক অর্থেই শিকারি চিতার মতো ধারালো করে তুলেছে। ভরাট, সুগঠিত ঠোঁটে গাঢ় বার্গান্ডি রঙের ম্যাট লিপস্টিক। গলায় কোনো গয়না নেই, শুধু তার ডান হাতের অনামিকায় একটা বিশাল আকারের সলিটেয়ার ডায়মন্ড রিং লাউঞ্জের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
তিনি সামনের সোফাটার দিকে এগিয়ে এলেন। তার স্টিলেটোর খটখট শব্দগুলো লাউঞ্জের কার্পেটে একটা নীরব ছন্দের মতো বাজতে লাগল।
শাড়ির কুঁচিগুলো তার সুগঠিত উরু আর নিতম্বের খাঁজে একটা অদ্ভুত সেন্সুয়াল দুলুনি তৈরি করছে। তার শরীর থেকে ভেসে আসা একটা কড়া অথচ মোহময়ী পারফিউমের গন্ধ শিশিরবাবুর নাকে এসে ধাক্কা মারল।
গন্ধটার মধ্যে নিঃসন্দেহে একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে, যা মানুষের চিন্তাশক্তিকে গুলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
"গুড ইভিনিং... ম্যাডাম," শিশির বাবুর গলাটা সামান্য কেঁপে গেল। রাজ্যের এতবড় একজন ক্ষমতাবান আমলা, যার একটা সইয়ের ওপর কোটি টাকার শিপিং টেন্ডার পাস হয়, তিনি এই মহিলার সামনে একটা বাধ্য, নার্ভাস কলেজছাত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছেন।
মহিলা কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি অত্যন্ত ধীরেসুস্থে শিশিরবাবুর ঠিক উল্টোদিকে একটা হাই-ব্যাক লেদার সোফায় পা এলিয়ে বসলেন। তার বসার ভঙ্গিতে কোনো আড়ষ্টতা নেই, বরং এমন একটা রাজকীয় শিথিলতা আছে, যা শুধুমাত্র সেইসব মানুষদের থাকে যারা নিজেদের ক্ষমতার ওপর নিরঙ্কুশ আধিপত্য উপভোগ করে।
বসার সময় তিনি ইচ্ছে করে তার শাড়ির আঁচলটা একটু অযত্নের সাথে ডান কাঁধ থেকে নামিয়ে দিলেন। এর ফলে তার বক্ষ ভাঁজের গভীরতা এবং ফর্সা কলারবোন লাউঞ্জের আলোয় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
শিশির বাবুর চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওদিকে আটকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তিনি ভয় পেয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন।
এই মহিলা সাংঘাতিক।
"বসুন, মিস্টার রায়" মহিলার গলাটা একদম খাদে নামানো, হাস্কি এবং বরফের মতো ঠান্ডা। গলার স্বরে একটা কমান্ডিং টোন আছে।
শিশিরবাবু ঢোক গিলে আবার সোফায় বসলেন। মহিলা তার পার্স থেকে একটা লম্বাটে, গোল্ড-প্লেটেড সিগারেট কেস বের করলেন। অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে একটা সরু মেন্থল সিগারেট দুই ঠোঁটের মাঝে রাখলেন। সাথে সাথে শিশিরবাবু নিজের পকেট থেকে লাইটার বের করে আগুনটা তার ঠোঁটের কাছে ধরলেন।
মহিলা লাইটারের আগুনের দিকে সামান্য ঝুঁকলেন। শিশিরবাবু খুব কাছ থেকে দেখতে পেলেন ওই গাঢ় বার্গান্ডি কালারের লিপস্টিকে মোড়া ঠোঁটদুটো কীভাবে ফিল্টারটাকে স্পর্শ করেছে। লাইটারের আলোয় মহিলার স্মোকি চোখের শিকারের মতো দৃষ্টি তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত নামিয়ে দিল।
মহিলা একটা গভীর টান দিয়ে ধোঁয়াটা খুব ধীর গতিতে, সেন্সুয়াল ভঙ্গিতে শিশির বাবুর মুখের দিকে ছাড়লেন।
"আপনি ঘামছেন, মিস্টার রায়", মহিলা ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা, রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বললেন।
"এই ষোল ডিগ্রির সেন্ট্রাল এসির মধ্যেও আপনার কপাল ঘামছে। কোনো বিশেষ কারণ?"
"ম্যাডাম... সি-কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ওই ফাইলটা..."
শিশির বাবু আমতা আমতা করে বললেন, "ওটা পাস করানো এই মুহূর্তে ইম্পসিবল। মিনিস্ট্রি থেকে ডিরেক্ট অডিট বসিয়েছে। আমি যদি এখন ওই ফেক চালানটাতে সই করি, তাহলে আমি সোজা সিবিআইয়ের জালে পড়ব।"
মহিলা সিগারেটের ছাইটা টেবিলের ওপর রাখা ক্রিস্টালের অ্যাশট্রেতে আলতো করে ঝেড়ে ফেললেন। তার চোখের দৃষ্টি এক চুলও কাঁপল না।
"ইম্পসিবল বলে কোনো শব্দ আমার ডিকশনারিতে নেই, মিস্টার রায়" মহিলার গলার স্বরটা হঠাৎ করেই যেন আরও কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে গেল। "আপনার পোর্ট ট্রাস্টের ওই ক্লিয়ারেন্সটা আমার দরকার। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে।"
"কিন্তু ম্যাডাম, আমার চাকরি চলে যাবে! আমি ফেঁসে যাব!" শিশিরবাবু প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন।
মহিলা এবার একটু সামনের দিকে ঝুঁকে এলেন। তার বুকের শিফন শাড়ির আবরণটা আরও একটু সরে গেল। তিনি নিজের মসৃণ, পারফেক্ট ম্যানিকিওর করা হাতটা বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা শিশির বাবুর ঘামে ভেজা হাতটার ওপর রাখলেন। তার সারা শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। মহিলার হাতের স্পর্শটা অদ্ভুত রকমের ঠান্ডা, কিন্তু তার মধ্যে একটা ইলেকট্রিক উত্তেজনা আছে। তার নখের ধারালো কোণটা শিশিরবাবুর হাতের চামড়ায় খুব হালকাভাবে আঁচড় কাটছে।
"মিস্টার রায়..." মহিলা প্রায় ফিসফিস করে, একটা মোহময়ী স্বরে ডাকলেন। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস শিশির বাবুর ঘাড়ের কাছে পৌঁছোচ্ছে।
"আপনি কি সত্যিই ভাবছেন সিবিআইয়ের ভয় দেখিয়ে আপনি আমার কাজটা আটকাতে পারবেন?"
মহিলা তার আরেক হাত দিয়ে নিজের ডিজাইনার পার্সটা খুললেন। ভেতর থেকে একটা ছোট কালো পেন-ড্রাইভ বের করে টেবিলের ওপর, ঠিক শিশির বাবুর স্কচের গ্লাসের পাশে রাখলেন।
"এই পেন-ড্রাইভে একটা ছোট্ট ভিডিও আছে," মহিলা অত্যন্ত ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে, যেন আবহাওয়ার খবর পড়ছেন, এমনভাবে বললেন।
"গত মাসে ব্যাংককের একটা প্রাইভেট ইয়টে আপনি এবং আপনার দুজন রাশিয়ান এসকর্টের কিছু এক্সক্লুসিভ মুহূর্ত। আপনার স্ত্রী এবং আপনার ওই পলিটিক্যাল গডফাদারদের এই ভিডিওটা দেখতে বেশ ভালোই লাগবে বলে আমার বিশ্বাস।"
শিশির বাবুর মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। তার চোখেমুখে চরম আতঙ্ক ফুটে উঠল।
"ম্যা... ম্যাডাম... প্লিজ! আপনি এটা করতে পারেন না..." তার গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে আওয়াজ বেরোল।
মহিলা শিশির বাবুর হাতের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিলেন। তিনি আবার সোফায় হেলান দিয়ে বসে সিগারেটে শেষ টানটা দিলেন।
"আমি কী করতে পারি আর কী পারি না, সেটা আপনি খুব ভালো করেই জানেন"
মহিলা এবার অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় বললেন। তার চোখের সেই সম্মোহনী মোহটা কেটে গিয়ে সেখানে এখন ক্রুরতা খেলা করছে।
"কাল সকাল দশটায় আমার লোক আপনার অফিসে যাবে। ফাইলে সইটা হয়ে যাওয়া চাই। আর হ্যাঁ, এই ডিলের কাটমানির পার্সেন্টেজটা আমি টুয়েন্টি থেকে থার্টি পার্সেন্ট করে দিয়েছি। দ্যাটস মাই ফি ফর নট রিলিজিং দিস ভিডিও।"
শিশির বাবুর আর কোনো কথা বলার মতো ক্ষমতা ছিল না। তার দম্ভ, তার অহংকার, সবকিছু আজকে এই শিফনে মোড়া আগুন আর বরফের সংমিশ্রণের সামনে ধুলোয় মিশে গেল।
তিনি শুধু অসহায়ভাবে মাথা ওপর-নিচ করে সম্মতি জানালেন।
মহিলা ঠোঁটের কোণে আবার সেই মোহময়ী হাসিটা ফুটিয়ে তুললেন। তিনি নিজের পার্সটা হাতে তুলে নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
"গুড বয়," মহিলা একটা তাচ্ছিল্যভরা স্বরে বললেন।
তিনি যাওয়ার আগে শিশিরবাবুর কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেলেন। তার ডিওর পারফিউমের গন্ধ আর উষ্ণ নিঃশ্বাসের তাপ শিশিরবাবুর গায়ের রোম খাড়া করে দিল।
"নেক্সট টাইম, মিস্টার রায়... আমার সাথে ডিল করার আগে নিজের লিমিটটা মনে রাখবেন। আই ক্যান বি ইওর বেস্ট ড্রিম, অর ইওর ওয়ার্স্ট নাইটমেয়ার।"
কথাটা বলে মহিলা আর এক সেকেন্ডও সেখানে দাঁড়ালেন না। তিনি ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তার হিল জুতোর ছান্দিক শব্দ আর শাড়িতে মোড়া পাছার মোহময়ী দুলুনি আবার লাউঞ্জের ওই অ্যাম্বার আলোর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
টেবিলের ওপর পড়ে রইল শুধু একটা অর্ধেক খাওয়া স্কচের গ্লাস, একটা কালো পেন-ড্রাইভ, আর একরাশ পোড়া সিগারেটের ছাই। শিশিরকুমার রায় সেখানে একটা জীবন্ত লাশের মতো বসে রইলেন, তার চোখ তখনো ওই দরজার দিকে স্থির।
তিনি দেখতে পেলেন না 'ম্যাডাম'-এর মুখে একটা পরম তৃপ্তির হাসি। এই ক্ষমতার খেলা, এই ম্যানিপুলেশন, সুতোর টানে ক্ষমতাশালী পুরুষদের পুতুলের মতো নাচানো, এটা তার কাছে নেশার মতো।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)