27-05-2026, 02:07 PM
পর্ব ৪১
রাত হয়েছে।
গাড়িটা কক্সবাজারের একটা মাঝারি মানের হোটেলের সামনে থামল। ভালো হোটেল আগেই বুকিং করতে হত, যা রাতুলের মনে ছিল না। সমুদ্রের হালকা ঢেউয়ের শব্দ দূর থেকে ভেসে আসছিল, কিন্তু কেউ তা উপভোগ করার মতো অবস্থায় ছিল না। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিতে সবাই শ্রান্ত।
রিয়া গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার মাথা জানালার কাচে হেলান দিয়ে ছিল। অর্ক তার কোলে ঘুমন্ত। রাতুল নরম করে তাকে ডাকল,
“রিয়া… উঠো। হোটেলে পৌঁছে গেছি।”
রিয়া চোখ মেলল। চোখে ঘুমের ভারী আস্তরণ। সে ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়াল। হোটেলটা খুব বেশি ভালো না। আগে থেকে বুকিং না করায় ভালো কোনো রুম পাওয়া যায়নি। মাঝারি মানের একটা হোটেল — পুরনো সিঁড়ি, হালকা আলো, আর সমুদ্রের দিকে খোলা বারান্দা।
রুম বুকিং হয়ে গেল।
**রুম ২০১:** রাতুল ও রিয়া (অর্কসহ)
**রুম ২০২:** হরিশ ও গনেশ
দুটো রুমই মুখোমুখি, খুব কাছাকাছি। মাঝখানে শুধু একটা সরু করিডর।
রিয়া ঘুমের ঘোরে হাঁটছিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় তার শরীর একবার টাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে গেল। ঠিক তখনই হরিশ দ্রুত এগিয়ে এসে তার কনুই ধরে ফেলল।
হরিশ নিচু গলায়, প্রায় অপরিচিতের মতো বলল,
“সাবধান… বাচ্চাটা দেন। আমি নিয়ে যাই। আপনার চোখে ঘুম আছে।”
রিয়া এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো আবেগ ফুটল না। সে শুকনো গলায় বলল,
“ধন্যবাদ। আমি নিয়ে যেতে পারব।”
হরিশের সাথে রিয়ার সম্পর্ক ঠিক হচ্ছেই না। আবার হরিশ নিজের বাচ্চাকেই ধরতে পারছে না।
ঠিক তখনই গনেশও পাশে এসে দাঁড়াল। সে হাত বাড়িয়ে বলল,
“রিয়া ম্যাডাম, আমাকে দিন। আমি নিয়ে যাই।”
রিয়া এবার কোনো উত্তরই দিল না। সে যেন গনেশের কথা শুনতেই পায়নি। তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে রইল। গনেশ লজ্জায় কিছুটা পিছিয়ে গেল। তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
রাতুল চাবি নিয়ে রুম খুলে দিল। রিয়া অর্ককে কোলে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা করিডরে প্রতিধ্বনিত হল।
---
রাত তখন দুটো বেজে গেছে।
হোটেলের করিডর নিস্তব্ধ। শুধু সমুদ্রের দূরাগত ঢেউয়ের শব্দ আসছিল।
হরিশের ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল। সে বিছানায় উঠে বসল। তার কানে ভেসে এল একটা কণ্ঠস্বর।
“হরিশ… হরিশ…”
রিয়ার গলা। কিন্তু কেমন যেন ভয়ার্ত, কাতর।
হরিশের বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দরজার কাছে ছুটে গেল। দরজার হ্যান্ডেল ঘোরালো, কিন্তু দরজা খুলল না। বাইরে থেকে লক করা।
সে জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগল।
“রিয়া… রিয়া! কী হয়েছে?”
কিন্তু দরজা খুলছিল না। হরিশের হাত কাঁপছিল। সে দরজায় কাঁধ দিয়ে জোরে ধাক্কা দিতে লাগল। **ঠাস… ঠাস… ঠাস!** শব্দটা পুরো করিডরে ছড়িয়ে পড়ছিল।
পাশের বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা গনেশের ঘুমও ভেঙে গেল। সে চোখ কচলে উঠে বসল এবং দেখল হরিশ দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে।
“কী হয়েছে রে হরিশ?” গনেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
হরিশ পাগলের মতো বলল,
“দরজা খুলছে না! বাইরে যেতে পারছি না! রিয়া ডাকছে… কি যেন হলো ওর?”
গনেশ কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। এবার তার কানেও আস্তে আস্তে ভেসে এল — রিয়ার কণ্ঠ। “হরিশ… হরিশ…” — খুব দুর্বল, কিন্তু স্পষ্ট।
গনেশও দরজার কাছে গিয়ে হ্যান্ডেল ঘোরালো, তারপর জোরে ধাক্কা দিল। কিন্তু দরজা খুলল না। দুজন মিলে অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু লকটা যেন আটকে গিয়েছিল।
আস্তে আস্তে রিয়ার ডাকটা মিলিয়ে যেতে লাগল।
“হরি… শ…”
শেষে একদম চুপ হয়ে গেল।
হরিশ দরজায় কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছিল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। গনেশ পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিল না।
রাতের নীরবতা আবার ফিরে এল। শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আর হরিশের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বাকি রইল।
রাত তখন অনেক গভীর।
হোটেলের রুম ২০২-এ দুজন মানুষ জেগে বসে ছিল। আলো নিভানো, শুধু বাইরের করিডরের হালকা আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল। হরিশ বিছানার একপাশে বসে মাথা নিচু করে ছিল। গনেশ অন্যপাশে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে।
দুজনের মাঝে ভারী নীরবতা।
গনেশের মাথার ভিতরে ঘূর্ণি চলছিল। সে বারবার একই প্রশ্ন ভাবছিল — **রিয়া কেন হরিশকে ডাকল?** রাতুল তো তার স্বামী। আর সে নিজে তো রিয়াকে জোর করে ভোগ করেছে। তাহলে হরিশকে কেন? হরিশ তো তার মধ্যে সবচেয়ে দূরের মানুষ।
কিন্তু গনেশ মুখ খুলতে পারছিল না। তার গলায় যেন কিছু আটকে ছিল। সে শুধু চুপ করে বসে রইল।
হঠাৎ হরিশ নিজে থেকেই নিচু, ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“রিয়া… আমার বাচ্চার মা। অর্ক আমার ছেলে।”
গনেশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে চমকে হরিশের দিকে তাকাল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।
“কী?!”
হরিশ চোখ তুলল না। সে একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার গলা কাঁপছিল।
“রাতুল কখনো বাবা হতে পারবে না। অর্ক… আমারই ছেলে। কিন্তু এতে রিয়ার কোনো দোষ নেই। আমিই… জোর করে করেছিলাম।”
ঘরের ভিতরে নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে গেল। গনেশ কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। তার মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ বের হল,
“ছি:…”
সে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। তার মাথার ভিতরে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। সে যে মেয়েটাকে জোর করে চোদার স্বপ্ন দেখত, যাকে সে নিজের ক্ষুধা মেটানোর জন্য ব্যবহার করেছিল — সেই মেয়েটা আসলে তার ভাইয়েরই সন্তানের মা।
গনেশ কিছুক্ষণ পর কাঁপা গলায় বলল,
“তাহলে তুই আগে বলিস নি কেন? আমিও তো… রিয়ার সাথে… ছি:… কী করলাম আমি!”
হরিশ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু চুপ করে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে মুছলও না।
দুজনের মাঝে আর কোনো কথা হলো না।
শুধু সমুদ্রের দূরাগত ঢেউয়ের শব্দ আর দুই ভাইয়ের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস ঘরের ভিতরে মিশে ছিল। একজনের মনে অপরাধবোধ, আরেকজনের মনে ধ্বংসের যন্ত্রণা।
রাত আরও গভীর হতে লাগল।
পর্ব ৪২
পরদিন সকাল।
রিয়ার চোখ ধীরে ধীরে খুলল। উজ্জ্বল সাদা আলো তার চোখে এসে পড়তেই সে চোখ সরু করে ফেলল। মাথাটা ভারী লাগছিল, চারপাশটা ঘুরছিল। সে বুঝতে পারল সে একটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। হাতে স্যালাইন লাগানো, নাকে অক্সিজেনের নল।
তার মনে ধীরে ধীরে রাতের ঘটনাগুলো ভেসে উঠতে লাগল।
তেলের পাম্পের সেই গুন্ডাগুলো…তাদের রুমে গিয়ে রাতুলের সাথে হাতাহাতি… তারপর হঠাৎ তাদের গাড়িতে তুলে নেওয়া… রাতুল আর অর্ক… কেউ একজন তার মুখে রুমাল চেপে ধরেছিল… তারপর সব অন্ধকার।
কিন্তু তার মনে আছে যে তার মুখে রুমাল ধরার আগেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। এতে গুন্ডারা ভয় পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে চলে যায়।
রিয়া ভয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই একজন ডাক্তার রুমে ঢুকলেন। মাঝবয়সি, শান্ত চেহারা।
ডাক্তার হেসে বললেন,
“আপনার জ্ঞান ফিরেছে? ভালো। কেমন লাগছে এখন?”
রিয়া শুকনো গলায় বলল,
“হ্যাঁ… তবে মাথাটা ঘুরছে। আমার কী হয়েছে ডাক্তার? আমার স্বামী আর ছেলে কোথায়?”
ডাক্তার একটু হেসে তার পাশে বসলেন। তারপর নরম গলায় বললেন,
“প্রথমে একটা ভালো খবর দেই। আপনি মা হতে চলেছেন।”
রিয়া যেন বজ্রাহত হয়ে গেল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“কী… কী বললেন?”
ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন,
“হ্যাঁ। আপনি প্রেগন্যান্ট। অভিনন্দন। মিষ্টি খাওয়াতে হবে তো!”
রিয়া কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তার চোখে পানি চলে এল, কিন্তু এবার সেটা আনন্দের পানি।
**সে আবার মা হতে চলেছে।**
কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল গত কয়েকদিনের ঘটনা — গনেশের সাথে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক।
তার হাতটা আপনা থেকেই পেটের উপর চলে গেল। সে ভয়ে, উত্তেজনায় আর বিভ্রান্তিতে কাঁপতে লাগল।
ডাক্তার তার অবস্থা দেখে বললেন,
“আপনি একটু বিশ্রাম নিন। আপনাকে অপহরণ করা হয়েছিল, কিন্তু অপহরণকারীরা নিজেরাই ভয় পেয়ে আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি করে রেখে চলে গেছে। আপনাকে এই নাম্বার দিতে বলেছিল অপহরণকারীরা।”
রিয়া চুপ করে শুয়ে রইল। তার মাথার ভিতরে ঝড় চলছিল।
**এই সন্তান কার?**
"গনেশের?"
সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার ঠোঁটে এখনো সেই হালকা হাসিটা লেগে ছিল, কিন্তু চোখের কোণে এখন ভয় আর অনিশ্চয়তার ছায়া।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে রিয়ার মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর সে আর শুয়ে থাকতে পারছিল না। তার স্বামী আর ছেলে অপহরণকারীদের হাতে — এই চিন্তাটা তার বুকের ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।
সে কাঁপা হাতে মোবাইলটা তুলে নিল। অপহরণকারীদের নম্বরটা তার ফোনে সেভ হয়ে ছিল। অনেকক্ষণ দ্বিধা করে অবশেষে কল করল।
ওপাশ থেকে রুক্ষ গলায় উত্তর এল,
“হ্যালো? কে?”
রিয়া গলা শক্ত করে বলল,
“আমি রিয়া। আপনারা আমার স্বামী আর ছেলেকে অপহরণ করেছেন।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর একটা ঠান্ডা হাসি ভেসে এল।
“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস। তুই যদি ওদের বাঁচাতে চাস, তাহলে সেক্টর ২-এর পুরোনো পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে চলে আয়। সাথে নিয়ে আসবি ১০ লক্ষ টাকা। নগদ। সময় বেশি নেই।”
রিয়া কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল।
রিয়ার হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার শরীর কাঁপছিল। ১০ লক্ষ টাকা? এত টাকা সে কোথায় পাবে? বাসায় ফোন দিলে সবাই চিন্তায় পড়ে যাবে। মা আরজুদা তো হয়তো অজ্ঞানই হয়ে যাবেন।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর একটা সিদ্ধান্ত নিল।
**হরিশকে ফোন করবে।**
যদিও তার মনে হচ্ছিল এটা ঠিক না। বিপদে পড়লেই সে হরিশকে ডাকে — এটা কেমন দেখাবে? কিন্তু তার কাছে আর কোনো উপায়ও ছিল না।
---
এদিকে হোটেলের রুম ২০২।
সকালে হোটেল ম্যানেজমেন্ট এসে দরজার লক খুলে দিয়েছে। তারা আগের রাতের সিসিটিভি ফুটেজও দেখিয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দিতে চেয়েছিল, কিন্তু হরিশ তাদের বাধা দিয়েছে।
“এখন না। যদি পুলিশে খবর দেই, ওরা রিয়ার ক্ষতি করে ফেলতে পারে।”
হরিশ আর গনেশ দুজনেই চিন্তিত হয়ে রুম থেকে বের হয়েছে। ঠিক তখনই হরিশের ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে।
গনেশ তার দিকে তাকিয়ে রইল। হরিশ দ্রুত ফোনটা ধরল।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে রিয়ার কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এল,
“হ্যালো হরিশ…”
হরিশের হৃদপিদ্দ জোরে বেড়ে গেল।
“রিয়া? তুমি কোথায়? কেমন আছো?”
রিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“আমি জেনারেল হাসপাতালের নিচে। ওই তেলের পাম্পের গুন্ডারা… তারা রাতুল আর অর্ককে তুলে নিয়ে গেছে।”
হরিশের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। গনেশও কানের কাছে মাথা নিয়ে শুনছিল।
হরিশ দ্রুত বলল,
“তুমি ঠিক আছো তো?”
রিয়া — “হ্যাঁ… কিন্তু আমার খুব ভয় করছে।”
হরিশ এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল,
“ঠিক আছে। তুমি ওখানেই থাকো। আমরা এখনই যাচ্ছি। আগে তোমাকে উদ্ধার করি, তারপর রাতুল আর অর্ককে দেখব। কোনো ঝুঁকি নিও না।”
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
“আচ্ছা… তাড়াতাড়ি এসো হরিশ। আমার সত্যি খুব ভয় করছে।”
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর হরিশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
গনেশ তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চল। আর দেরি করা ঠিক না।”
দুজন দ্রুত হোটেল থেকে বের হয়ে গেল।
রিয়া হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। তার হাতে মোবাইলটা শক্ত করে ধরা। চোখে ভয়, অনিশ্চয়তা আর এক অদ্ভুত অসহায়তা।
হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রিয়া। তার চোখে অস্থিরতা, হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামল হরিশ আর গনেশ।
রিয়ার বুকের ভিতরটা এক ঝটকায় হালকা হয়ে গেল। যে ভয়টা সারা রাত তার বুকে চেপে ছিল, হরিশকে দেখামাত্র সেটা যেন অনেকটা কমে গেল। তার চোখে পানি চলে এল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
রিয়া দৌড় দিল।
হরিশও তাকে দেখে থমকে গিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছিল। হাসপাতালের সামনের ভিড়ের মাঝে দুজন দৌড়ে একে অপরের কাছে চলে এল।
রিয়া হরিশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে তার পিঠ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। হরিশও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার একটা হাত রিয়ার মাথায়, অন্যটা পিঠে। দুজনের শরীর একসাথে কাঁপছিল।
“হরিশ… আমার খুব ভয় করছে…” রিয়া তার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল।
হরিশ তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“আমি এসে গেছি… আর ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছিল। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ছিল। রিয়ার ভয়, ব্যাকুলতা, একাকীত্ব — সবকিছু যেন কিছুটা হলেও কমে গিয়েছিল হরিশের বুকে মাথা রেখে।
হরিশের চোখও ভিজে গিয়েছিল। রিয়াকে এভাবে কাঁপতে দেখে তার বুকের ভিতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে গনেশ সব দেখছিল। তার মুখে কোনো কথা ছিল না। সে যেন এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। তার উপস্থিতি দুজনের কাছেই যেন অতিরিক্ত মনে হচ্ছিল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
---
কিছুক্ষণ পর হরিশ রিয়াকে আস্তে আস্তে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আমি ওদের ফোন করছি।”
সে রিয়ার কাছ থেকে নিয়ে অপহরণকারীদের নম্বরে ফোন করল। ওপাশ থেকে একই রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে এল। তারা স্পষ্ট করে বলে দিল — কোথায় যেতে হবে, কখন যেতে হবে, কীভাবে টাকা দিতে হবে। ১০ লক্ষ টাকা নগদ। কোনো পুলিশ নয়।
ফোন রেখে হরিশ রিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“কাল সকালে আমি আর গনেশ দাদা যাব। রাতুল আর অর্ককে উদ্ধার করে নিয়ে আসব। তুমি চিন্তা করো না।”
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা।”
হরিশ তার কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে রিয়া। আগামীকাল সব শেষ হয়ে যাবে। তুমি এখন বিশ্রাম নাও।”
রিয়া চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু হরিশের উপস্থিতিতে একটু শান্তি অনুভব করছিল।
গনেশ পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত অস্বস্তি।
রাত হয়েছে।
গাড়িটা কক্সবাজারের একটা মাঝারি মানের হোটেলের সামনে থামল। ভালো হোটেল আগেই বুকিং করতে হত, যা রাতুলের মনে ছিল না। সমুদ্রের হালকা ঢেউয়ের শব্দ দূর থেকে ভেসে আসছিল, কিন্তু কেউ তা উপভোগ করার মতো অবস্থায় ছিল না। দীর্ঘ জার্নির ক্লান্তিতে সবাই শ্রান্ত।
রিয়া গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার মাথা জানালার কাচে হেলান দিয়ে ছিল। অর্ক তার কোলে ঘুমন্ত। রাতুল নরম করে তাকে ডাকল,
“রিয়া… উঠো। হোটেলে পৌঁছে গেছি।”
রিয়া চোখ মেলল। চোখে ঘুমের ভারী আস্তরণ। সে ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়াল। হোটেলটা খুব বেশি ভালো না। আগে থেকে বুকিং না করায় ভালো কোনো রুম পাওয়া যায়নি। মাঝারি মানের একটা হোটেল — পুরনো সিঁড়ি, হালকা আলো, আর সমুদ্রের দিকে খোলা বারান্দা।
রুম বুকিং হয়ে গেল।
**রুম ২০১:** রাতুল ও রিয়া (অর্কসহ)
**রুম ২০২:** হরিশ ও গনেশ
দুটো রুমই মুখোমুখি, খুব কাছাকাছি। মাঝখানে শুধু একটা সরু করিডর।
রিয়া ঘুমের ঘোরে হাঁটছিল। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় তার শরীর একবার টাল সামলাতে না পেরে কাত হয়ে গেল। ঠিক তখনই হরিশ দ্রুত এগিয়ে এসে তার কনুই ধরে ফেলল।
হরিশ নিচু গলায়, প্রায় অপরিচিতের মতো বলল,
“সাবধান… বাচ্চাটা দেন। আমি নিয়ে যাই। আপনার চোখে ঘুম আছে।”
রিয়া এক মুহূর্ত তার দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো আবেগ ফুটল না। সে শুকনো গলায় বলল,
“ধন্যবাদ। আমি নিয়ে যেতে পারব।”
হরিশের সাথে রিয়ার সম্পর্ক ঠিক হচ্ছেই না। আবার হরিশ নিজের বাচ্চাকেই ধরতে পারছে না।
ঠিক তখনই গনেশও পাশে এসে দাঁড়াল। সে হাত বাড়িয়ে বলল,
“রিয়া ম্যাডাম, আমাকে দিন। আমি নিয়ে যাই।”
রিয়া এবার কোনো উত্তরই দিল না। সে যেন গনেশের কথা শুনতেই পায়নি। তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে রইল। গনেশ লজ্জায় কিছুটা পিছিয়ে গেল। তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
রাতুল চাবি নিয়ে রুম খুলে দিল। রিয়া অর্ককে কোলে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা করিডরে প্রতিধ্বনিত হল।
---
রাত তখন দুটো বেজে গেছে।
হোটেলের করিডর নিস্তব্ধ। শুধু সমুদ্রের দূরাগত ঢেউয়ের শব্দ আসছিল।
হরিশের ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেল। সে বিছানায় উঠে বসল। তার কানে ভেসে এল একটা কণ্ঠস্বর।
“হরিশ… হরিশ…”
রিয়ার গলা। কিন্তু কেমন যেন ভয়ার্ত, কাতর।
হরিশের বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সে দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দরজার কাছে ছুটে গেল। দরজার হ্যান্ডেল ঘোরালো, কিন্তু দরজা খুলল না। বাইরে থেকে লক করা।
সে জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগল।
“রিয়া… রিয়া! কী হয়েছে?”
কিন্তু দরজা খুলছিল না। হরিশের হাত কাঁপছিল। সে দরজায় কাঁধ দিয়ে জোরে ধাক্কা দিতে লাগল। **ঠাস… ঠাস… ঠাস!** শব্দটা পুরো করিডরে ছড়িয়ে পড়ছিল।
পাশের বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা গনেশের ঘুমও ভেঙে গেল। সে চোখ কচলে উঠে বসল এবং দেখল হরিশ দরজা ভাঙার চেষ্টা করছে।
“কী হয়েছে রে হরিশ?” গনেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল।
হরিশ পাগলের মতো বলল,
“দরজা খুলছে না! বাইরে যেতে পারছি না! রিয়া ডাকছে… কি যেন হলো ওর?”
গনেশ কান পেতে শোনার চেষ্টা করল। এবার তার কানেও আস্তে আস্তে ভেসে এল — রিয়ার কণ্ঠ। “হরিশ… হরিশ…” — খুব দুর্বল, কিন্তু স্পষ্ট।
গনেশও দরজার কাছে গিয়ে হ্যান্ডেল ঘোরালো, তারপর জোরে ধাক্কা দিল। কিন্তু দরজা খুলল না। দুজন মিলে অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু লকটা যেন আটকে গিয়েছিল।
আস্তে আস্তে রিয়ার ডাকটা মিলিয়ে যেতে লাগল।
“হরি… শ…”
শেষে একদম চুপ হয়ে গেল।
হরিশ দরজায় কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছিল। চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। গনেশ পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিল না।
রাতের নীরবতা আবার ফিরে এল। শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ আর হরিশের দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বাকি রইল।
রাত তখন অনেক গভীর।
হোটেলের রুম ২০২-এ দুজন মানুষ জেগে বসে ছিল। আলো নিভানো, শুধু বাইরের করিডরের হালকা আলো জানালা দিয়ে এসে পড়ছিল। হরিশ বিছানার একপাশে বসে মাথা নিচু করে ছিল। গনেশ অন্যপাশে, দেওয়ালে হেলান দিয়ে।
দুজনের মাঝে ভারী নীরবতা।
গনেশের মাথার ভিতরে ঘূর্ণি চলছিল। সে বারবার একই প্রশ্ন ভাবছিল — **রিয়া কেন হরিশকে ডাকল?** রাতুল তো তার স্বামী। আর সে নিজে তো রিয়াকে জোর করে ভোগ করেছে। তাহলে হরিশকে কেন? হরিশ তো তার মধ্যে সবচেয়ে দূরের মানুষ।
কিন্তু গনেশ মুখ খুলতে পারছিল না। তার গলায় যেন কিছু আটকে ছিল। সে শুধু চুপ করে বসে রইল।
হঠাৎ হরিশ নিজে থেকেই নিচু, ভাঙা গলায় বলে উঠল,
“রিয়া… আমার বাচ্চার মা। অর্ক আমার ছেলে।”
গনেশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সে চমকে হরিশের দিকে তাকাল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।
“কী?!”
হরিশ চোখ তুলল না। সে একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার গলা কাঁপছিল।
“রাতুল কখনো বাবা হতে পারবে না। অর্ক… আমারই ছেলে। কিন্তু এতে রিয়ার কোনো দোষ নেই। আমিই… জোর করে করেছিলাম।”
ঘরের ভিতরে নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে গেল। গনেশ কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। তার মুখ দিয়ে শুধু একটা শব্দ বের হল,
“ছি:…”
সে দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। তার মাথার ভিতরে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল। সে যে মেয়েটাকে জোর করে চোদার স্বপ্ন দেখত, যাকে সে নিজের ক্ষুধা মেটানোর জন্য ব্যবহার করেছিল — সেই মেয়েটা আসলে তার ভাইয়েরই সন্তানের মা।
গনেশ কিছুক্ষণ পর কাঁপা গলায় বলল,
“তাহলে তুই আগে বলিস নি কেন? আমিও তো… রিয়ার সাথে… ছি:… কী করলাম আমি!”
হরিশ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু চুপ করে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে মুছলও না।
দুজনের মাঝে আর কোনো কথা হলো না।
শুধু সমুদ্রের দূরাগত ঢেউয়ের শব্দ আর দুই ভাইয়ের ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস ঘরের ভিতরে মিশে ছিল। একজনের মনে অপরাধবোধ, আরেকজনের মনে ধ্বংসের যন্ত্রণা।
রাত আরও গভীর হতে লাগল।
পর্ব ৪২
পরদিন সকাল।
রিয়ার চোখ ধীরে ধীরে খুলল। উজ্জ্বল সাদা আলো তার চোখে এসে পড়তেই সে চোখ সরু করে ফেলল। মাথাটা ভারী লাগছিল, চারপাশটা ঘুরছিল। সে বুঝতে পারল সে একটা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। হাতে স্যালাইন লাগানো, নাকে অক্সিজেনের নল।
তার মনে ধীরে ধীরে রাতের ঘটনাগুলো ভেসে উঠতে লাগল।
তেলের পাম্পের সেই গুন্ডাগুলো…তাদের রুমে গিয়ে রাতুলের সাথে হাতাহাতি… তারপর হঠাৎ তাদের গাড়িতে তুলে নেওয়া… রাতুল আর অর্ক… কেউ একজন তার মুখে রুমাল চেপে ধরেছিল… তারপর সব অন্ধকার।
কিন্তু তার মনে আছে যে তার মুখে রুমাল ধরার আগেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। এতে গুন্ডারা ভয় পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে চলে যায়।
রিয়া ভয়ে উঠে বসার চেষ্টা করল। ঠিক তখনই একজন ডাক্তার রুমে ঢুকলেন। মাঝবয়সি, শান্ত চেহারা।
ডাক্তার হেসে বললেন,
“আপনার জ্ঞান ফিরেছে? ভালো। কেমন লাগছে এখন?”
রিয়া শুকনো গলায় বলল,
“হ্যাঁ… তবে মাথাটা ঘুরছে। আমার কী হয়েছে ডাক্তার? আমার স্বামী আর ছেলে কোথায়?”
ডাক্তার একটু হেসে তার পাশে বসলেন। তারপর নরম গলায় বললেন,
“প্রথমে একটা ভালো খবর দেই। আপনি মা হতে চলেছেন।”
রিয়া যেন বজ্রাহত হয়ে গেল। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“কী… কী বললেন?”
ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন,
“হ্যাঁ। আপনি প্রেগন্যান্ট। অভিনন্দন। মিষ্টি খাওয়াতে হবে তো!”
রিয়া কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারল না। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তার চোখে পানি চলে এল, কিন্তু এবার সেটা আনন্দের পানি।
**সে আবার মা হতে চলেছে।**
কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল গত কয়েকদিনের ঘটনা — গনেশের সাথে জোর করে শারীরিক সম্পর্ক।
তার হাতটা আপনা থেকেই পেটের উপর চলে গেল। সে ভয়ে, উত্তেজনায় আর বিভ্রান্তিতে কাঁপতে লাগল।
ডাক্তার তার অবস্থা দেখে বললেন,
“আপনি একটু বিশ্রাম নিন। আপনাকে অপহরণ করা হয়েছিল, কিন্তু অপহরণকারীরা নিজেরাই ভয় পেয়ে আপনাকে হাসপাতালে ভর্তি করে রেখে চলে গেছে। আপনাকে এই নাম্বার দিতে বলেছিল অপহরণকারীরা।”
রিয়া চুপ করে শুয়ে রইল। তার মাথার ভিতরে ঝড় চলছিল।
**এই সন্তান কার?**
"গনেশের?"
সে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার ঠোঁটে এখনো সেই হালকা হাসিটা লেগে ছিল, কিন্তু চোখের কোণে এখন ভয় আর অনিশ্চয়তার ছায়া।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে রিয়ার মন অস্থির হয়ে উঠেছিল। ডাক্তার চলে যাওয়ার পর সে আর শুয়ে থাকতে পারছিল না। তার স্বামী আর ছেলে অপহরণকারীদের হাতে — এই চিন্তাটা তার বুকের ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল।
সে কাঁপা হাতে মোবাইলটা তুলে নিল। অপহরণকারীদের নম্বরটা তার ফোনে সেভ হয়ে ছিল। অনেকক্ষণ দ্বিধা করে অবশেষে কল করল।
ওপাশ থেকে রুক্ষ গলায় উত্তর এল,
“হ্যালো? কে?”
রিয়া গলা শক্ত করে বলল,
“আমি রিয়া। আপনারা আমার স্বামী আর ছেলেকে অপহরণ করেছেন।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর একটা ঠান্ডা হাসি ভেসে এল।
“হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস। তুই যদি ওদের বাঁচাতে চাস, তাহলে সেক্টর ২-এর পুরোনো পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে চলে আয়। সাথে নিয়ে আসবি ১০ লক্ষ টাকা। নগদ। সময় বেশি নেই।”
রিয়া কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে গেল।
রিয়ার হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। তার শরীর কাঁপছিল। ১০ লক্ষ টাকা? এত টাকা সে কোথায় পাবে? বাসায় ফোন দিলে সবাই চিন্তায় পড়ে যাবে। মা আরজুদা তো হয়তো অজ্ঞানই হয়ে যাবেন।
সে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর একটা সিদ্ধান্ত নিল।
**হরিশকে ফোন করবে।**
যদিও তার মনে হচ্ছিল এটা ঠিক না। বিপদে পড়লেই সে হরিশকে ডাকে — এটা কেমন দেখাবে? কিন্তু তার কাছে আর কোনো উপায়ও ছিল না।
---
এদিকে হোটেলের রুম ২০২।
সকালে হোটেল ম্যানেজমেন্ট এসে দরজার লক খুলে দিয়েছে। তারা আগের রাতের সিসিটিভি ফুটেজও দেখিয়েছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ পুলিশে খবর দিতে চেয়েছিল, কিন্তু হরিশ তাদের বাধা দিয়েছে।
“এখন না। যদি পুলিশে খবর দেই, ওরা রিয়ার ক্ষতি করে ফেলতে পারে।”
হরিশ আর গনেশ দুজনেই চিন্তিত হয়ে রুম থেকে বের হয়েছে। ঠিক তখনই হরিশের ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে।
গনেশ তার দিকে তাকিয়ে রইল। হরিশ দ্রুত ফোনটা ধরল।
“হ্যালো?”
ওপাশ থেকে রিয়ার কাঁপা কণ্ঠ ভেসে এল,
“হ্যালো হরিশ…”
হরিশের হৃদপিদ্দ জোরে বেড়ে গেল।
“রিয়া? তুমি কোথায়? কেমন আছো?”
রিয়া কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
“আমি জেনারেল হাসপাতালের নিচে। ওই তেলের পাম্পের গুন্ডারা… তারা রাতুল আর অর্ককে তুলে নিয়ে গেছে।”
হরিশের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। গনেশও কানের কাছে মাথা নিয়ে শুনছিল।
হরিশ দ্রুত বলল,
“তুমি ঠিক আছো তো?”
রিয়া — “হ্যাঁ… কিন্তু আমার খুব ভয় করছে।”
হরিশ এক মুহূর্ত চিন্তা করে বলল,
“ঠিক আছে। তুমি ওখানেই থাকো। আমরা এখনই যাচ্ছি। আগে তোমাকে উদ্ধার করি, তারপর রাতুল আর অর্ককে দেখব। কোনো ঝুঁকি নিও না।”
রিয়া ফিসফিস করে বলল,
“আচ্ছা… তাড়াতাড়ি এসো হরিশ। আমার সত্যি খুব ভয় করছে।”
ফোনটা কেটে যাওয়ার পর হরিশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল।
গনেশ তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“চল। আর দেরি করা ঠিক না।”
দুজন দ্রুত হোটেল থেকে বের হয়ে গেল।
রিয়া হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। তার হাতে মোবাইলটা শক্ত করে ধরা। চোখে ভয়, অনিশ্চয়তা আর এক অদ্ভুত অসহায়তা।
হাসপাতালের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রিয়া। তার চোখে অস্থিরতা, হাত দুটো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামল হরিশ আর গনেশ।
রিয়ার বুকের ভিতরটা এক ঝটকায় হালকা হয়ে গেল। যে ভয়টা সারা রাত তার বুকে চেপে ছিল, হরিশকে দেখামাত্র সেটা যেন অনেকটা কমে গেল। তার চোখে পানি চলে এল। সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
রিয়া দৌড় দিল।
হরিশও তাকে দেখে থমকে গিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছিল। হাসপাতালের সামনের ভিড়ের মাঝে দুজন দৌড়ে একে অপরের কাছে চলে এল।
রিয়া হরিশের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই হাত দিয়ে তার পিঠ জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। হরিশও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার একটা হাত রিয়ার মাথায়, অন্যটা পিঠে। দুজনের শরীর একসাথে কাঁপছিল।
“হরিশ… আমার খুব ভয় করছে…” রিয়া তার বুকে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলল।
হরিশ তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল,
“আমি এসে গেছি… আর ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী যেন থেমে গিয়েছিল। ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ছিল। রিয়ার ভয়, ব্যাকুলতা, একাকীত্ব — সবকিছু যেন কিছুটা হলেও কমে গিয়েছিল হরিশের বুকে মাথা রেখে।
হরিশের চোখও ভিজে গিয়েছিল। রিয়াকে এভাবে কাঁপতে দেখে তার বুকের ভিতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে গনেশ সব দেখছিল। তার মুখে কোনো কথা ছিল না। সে যেন এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল। তার উপস্থিতি দুজনের কাছেই যেন অতিরিক্ত মনে হচ্ছিল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
---
কিছুক্ষণ পর হরিশ রিয়াকে আস্তে আস্তে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“আমি ওদের ফোন করছি।”
সে রিয়ার কাছ থেকে নিয়ে অপহরণকারীদের নম্বরে ফোন করল। ওপাশ থেকে একই রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে এল। তারা স্পষ্ট করে বলে দিল — কোথায় যেতে হবে, কখন যেতে হবে, কীভাবে টাকা দিতে হবে। ১০ লক্ষ টাকা নগদ। কোনো পুলিশ নয়।
ফোন রেখে হরিশ রিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
“কাল সকালে আমি আর গনেশ দাদা যাব। রাতুল আর অর্ককে উদ্ধার করে নিয়ে আসব। তুমি চিন্তা করো না।”
রিয়া তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা।”
হরিশ তার কাঁধে হাত রেখে আশ্বাস দিয়ে বলল,
“সব ঠিক হয়ে যাবে রিয়া। আগামীকাল সব শেষ হয়ে যাবে। তুমি এখন বিশ্রাম নাও।”
রিয়া চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরছিল। কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু হরিশের উপস্থিতিতে একটু শান্তি অনুভব করছিল।
গনেশ পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার চোখে এক অদ্ভুত অস্বস্তি।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)