27-05-2026, 02:03 PM
পর্ব ৪০
৬ সপ্তাহ কেটে গেছে।
এই ৬ সপ্তাহ রিয়া কারো সাথে কোনো কথা বলেনি। না তার মায়ের সাথে, না রাতুলের সাথে। সে শুধু চুপচাপ ছিল। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে, মুখ ফ্যাকাশে। কিন্তু তার হাতের কাছে সবসময় একটা ধারালো চাকু রাখত। রাতে ঘুমানোর সময়ও বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখত। যদি গনেশ কাছে আসে, সে আর দ্বিধা করবে না।
গনেশও বুঝতে পেরেছিল। সে আর রিয়ার কাছে ঘেঁষার সাহস করেনি। দূর থেকে দেখলেও চোখ সরিয়ে নিত। কিন্তু তার চোখে এখনো সেই ক্ষুধার্ত দৃষ্টি লুকিয়ে ছিল।
আর হরিশ… হরিশ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
সে রাতে যে দৃশ্য দেখেছিল, সেটা তার মাথার ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সে প্রতি রাতে ভাবত — গনেশ ঘুমিয়ে পড়লে তার মুখে বালিশ মুড়ো দেবে। কিন্তু প্রতিবারই তার হাত কাঁপত। সাহস হতো না। সে নিজেকে অভিশাপ দিত, কিন্তু কিছুই করতে পারত না। শুধু নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছিল।
---
আজ রাতে ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে খেতে বসেছে।
রিয়া, আরজুদা বেগম, রাতুল, গনেশ আর হরিশ। টেবিলের উপর খাবার সাজানো, কিন্তু পরিবেশ ভারী। কেউ তেমন কথা বলছে না। শুধু চামচের শব্দ আর থালায় ভাত মাখার আওয়াজ হচ্ছে।
রাতুল হরিশের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করল তার মুখটা শুকনো, চোখ নিচু। সে হালকা হেসে বলল,
“আরে হরিশ কাকা, তোমার মন খারাপ কেন? কী হয়েছে?”
হরিশ চমকে উঠল। সে দ্রুত মাথা তুলে বলল,
“না না… কই, মন খারাপ কই? তেমন কিছু না।”
রিয়া এক ঝলক হরিশের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো অনুভূতি ফুটল না। সে আবার খাবারের দিকে মন দিল।
রাতুল বিশ্বাস করল না। সে হাসতে হাসতে বলল,
“বোঝাই যায় কাকা। মুখ দেখে তো মনে হয় পুরো দুনিয়া উল্টে গেছে।”
হরিশ জোর করে হাসার চেষ্টা করল,
“তেমন কিছু না রাতুল। শরীরটা ভালো লাগছে না।”
রাতুল একটু চুপ করে থেকে বলল,
“আচ্ছা, চলো না আমরা কোথাও ঘুরে আসি। তোমার গাড়ি নিয়ে যাব। মনটা ফ্রেশ হবে।”
গনেশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“কোথায় যাবে?”
রাতুল উৎসাহের সাথে বলল,
“চলো কক্সবাজার। সমুদ্র দেখে আসি। অনেক দিন হয়েছে কোথাও যাইনি।”
আরজুদা বেগম তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন,
“না বাবা, আমি যাব না। বাসায় অনেক কাজ পড়ে আছে।”
রাতুল অনুরোধ করল,
“চলুন না মা। সবাই মিলে যাই।”
আরজুদা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন,
“না। তোমরা যাও। আমি থাকব।”
রাতুল হরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে হরিশ কাকা, আমি আর রিয়া অন্তত যাই।”
রিয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
“না। আমি যাব না।”
রাতুল নাছোড়বান্দা হয়ে বলতে লাগল,
“আরে চলো না। অনেক দিন হয়েছে আমরা কোথাও ঘুরতে যাইনি। শুধু তুমি আর আমি। মনটা ভালো হয়ে যাবে। প্লিজ রিয়া…”
রাতুল অনেকক্ষণ ধরে বুঝিয়ে বলতে থাকল। রিয়া বারবার না করলেও শেষ পর্যন্ত আর না করতে পারল না। সে চুপ করে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
টেবিলের উপর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। হরিশ চুপ করে বসে রইল। তার হাতের চামচটা থরথর করে কাঁপছিল। গনেশ নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি লুকিয়ে ছিল।
রিয়া মনে মনে চিন্তা করছিল — এই ট্রিপটা হয়তো তার জন্য নতুন কোনো বিপদ ডেকে আনবে, নাকি স্বস্তি? হরিশও এ ট্রিপে আছে। কি হতে যাচ্ছে।
ট্রিপের দিন সকাল সকাল।
সূর্য তখনো পুরোপুরি উঠেনি, কিন্তু বাসার সামনে সাজানো হয়েছে হরিশের ট্যাক্সি গাড়িটা। লাগেজ গুছিয়ে রাখা হয়েছে। বাতাসে একটা হালকা উত্তেজনা মিশে আছে, কিন্তু রিয়ার মনে ছিল শুধু ভারী একটা চাপ।
রিয়া সকাল থেকেই চুপচাপ। সে একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরেছে, চুল পিঠের উপর খোলা। তার চোখে ঘুমের অভাব স্পষ্ট। কোলে অর্ককে নিয়ে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মন বলছিল — এই ট্রিপে না গেলেই ভালো হতো। কিন্তু রাতুলের অনুরোধ আর পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে।
ঠিক তখনই গনেশ বের হয়ে এল। তার পরনে একটা সস্তা জিন্স আর টি-শার্ট। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি। সে রাতুলের কাছে গিয়ে বলল,
“ভাইসাহেব, আমি কখনো কক্সবাজার যাই নাই। যদি একটু সাথে নেন, খুব খুশি হতাম। আমি তো কোনো ঝামেলা করব না।”
রাতুল এক মুহূর্ত চিন্তা করে হাসল। সে গনেশকে ফিরিয়ে দিতে পারল না।
“আচ্ছা ঠিক আছে। চলুন তাহলে। আরেকজন বেশি হলে সমস্যা নেই।”
রিয়ার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে গনেশের দিকে তাকাতেই পারল না। তার শরীর শক্ত হয়ে উঠল। হরিশের দিকেও তাকাতে তার ঘৃণা লাগছিল। দুজনকেই তার এখন অসহ্য মনে হচ্ছিল।
হরিশ গনেশকে দেখেও খুশি হয় নি। কিন্তু গনেশ এখন রিয়াকে দেখবে এটা ভেবে খুব উৎসাহিত।
---
সকাল সাড়ে ছয়টায় গাড়ি ছাড়ল।
**ড্রাইভারের সিটে:** হরিশ। তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত। চোখ দুটো লাল, ক্লান্ত। সে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। ড্রাইভার সিটের পাশে গনেশ।
**পেছনের সিটে:** রিয়া, তার কোলে অর্ক। ডান পাশে রাতুল।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই রিয়ার শরীর শিরশির করে উঠল। গনেশ তার সামনেই বসে আছে। তার শরীর থেকে সেই পরিচিত গন্ধ আসছিল — যে গন্ধটা কিছু দিন আগে তার শরীরে মেখে ছিল। রিয়া জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখল। তার হাত অর্ককে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে।
রাতুল উৎসাহের সাথে বলছিল,
“আজকে অনেক দিন পর আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাচ্ছি। সমুদ্র দেখলে মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
কিন্তু কেউ তেমন সাড়া দিচ্ছিল না।
আরজুদা বেগম আর মমতা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছিল। আরজুদা রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সাবধানে যাস। অর্ককে ভালো করে দেখে রাখিস। গিয়ে ফোন দিয়ে জানাস।”
রিয়া জোর করে হাসার চেষ্টা করল। গাড়ি সামনে এগোতেই সে জানালা দিয়ে হাত নাড়ল। কিন্তু তার চোখে কোনো আনন্দ ছিল না।
গাড়ি চলতে থাকল।
প্রায়ই রিয়ার সাথে গনেশের মিররে চোখাচোখি হচ্ছে। গনেশ তখন মুচকি হাসি দেয়। রিয়া আবার অন্যদিকে চেয়ে থাকে তখন। হরিশ তা ভালোভাবেই খেয়াল করে।
তিনজন পুরুষ। তিনজনই রিয়ার জীবনে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। একজন তার ধর্ষক, আরেকজন তার স্বামীকে ঠকিয়ে তার শরীর ভোগ করেছে, আরেকজন সেই স্বামী — যাকে সে আর মুখ দেখাতে পারছে না।
রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে পানি জমছিল, কিন্তু সে ফেলছিল না। অর্ক তার কোলে ঘুমিয়ে ছিল। সে মনে মনে ভাবছিল — এই ট্রিপটা কি তার জীবনকে আরও জটিল করে তুলবে?
গাড়ির ভিতরে একটা ভারী, অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছিল। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর রাস্তার আওয়াজ হচ্ছিল।
গাড়ি চলছিল দীর্ঘ রাস্তা ধরে।
**ড্রাইভিং সিটে** হরিশ, তার ঠিক পাশে **গনেশ**। পেছনের সিটে **রিয়া** আর **রাতুল**। রিয়ার কোলে অর্ক ঘুমিয়ে ছিল। রিয়া জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার শরীর শক্ত হয়ে আছে। গনেশের উপস্থিতি তার কাছে যেন বিষের মতো লাগছিল।
প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর হরিশ গাড়ির গতি কমিয়ে একটা তেলের পাম্পের সামনে থামাল।
রাতুল সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করল,
“হরিশ কাকা, তেল নেই?”
হরিশ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে শুকনো গলায় বলল,
“না। এখন নিয়ে নিলে পরে আর থামতে হবে না।”
গাড়ি থামতেই সবাই নামল।
হরিশ গাড়ির ট্যাঙ্কে তেল ভরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। গনেশ পাম্পের ছোট দোকানের দিকে গেল বিড়ি কিনতে। রাতুল রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি। তুমি অর্ককে নিয়ে একটু হাঁটো।”
রিয়া শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা।”
রাতুল চলে যাওয়ার পর রিয়া অর্ককে কোলে নিয়ে পাম্পের পাশের খোলা জায়গায় হাঁটতে লাগল। অর্ক একটু আগে জেগে উঠেছে, তাই সে তার ছোট হাত দিয়ে রিয়ার চুল খেলা করছিল। রিয়া মাঝে মাঝে তার কপালে চুমু খাচ্ছিল।
কিন্তু তখনই বিপদ এল।
পাম্পের একপাশে কয়েকজন উশৃঙ্খল যুবক দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তাদের চোখ পড়ল রিয়ার উপর। তার সুন্দর চেহারা, ফর্সা গায়ের রং আর অর্ককে কোলে নিয়ে হাঁটার ভঙ্গি দেখে তাদের একজন নিচু স্বরে বলল,
“ওই দেখ… কী সুন্দরী মাল। একদম ফ্রেশ।”
আরেকজন হাসতে হাসতে বলল,
“চল, কথা বলে আসি। মজা হবে।"
দুজন লোক সোজা রিয়ার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রথমজন বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“কী সুন্দরী, একা একা ঘুরছেন? আমাদের সাথে চলুন না। খুব মজা করব। সমুদ্রে নিয়ে যাব।”
রিয়া শক্ত হয়ে গেল। সে পিছিয়ে এক ধাপ গেল এবং কঠিন গলায় বলল,
“এখান থেকে চলে যান। আমাকে বিরক্ত করবেন না।”
দ্বিতীয় লোকটা আরও সাহস করে রিয়ার হাত ধরার চেষ্টা করল।
“আরে এত রাগ করছেন কেন? একটু গল্প করি…”
রিয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আঃ! ছাড়ুন! হেল্প!”
চিৎকারটা শুনেই হরিশ আর গনেশ দৌড়ে এল।
হরিশ প্রথমে এসে যে লোকটা রিয়ার হাত ধরার চেষ্টা করছিল, তাকে জোরে একটা ঘুষি মারল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল। গনেশও দ্বিতীয় লোকটাকে ধরে তার পেটে কয়েকটা লাথি মারল।
দুজনের চিৎকারে বাকি লোকগুলো ছুটে এল।
“কিরে! আমাদের লোকদের মারছিস কেন শালা?” একজন চিৎকার করে বলল।
হরিশ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তোর লোক মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে। আরেকবার হাত দিলে হাত ভেঙে দেব!”
লোকগুলো আরও উত্তেজিত হয়ে বলল,
“আমাদের লোক যা ইচ্ছা তাই করবে। তুই কে হস?”
গনেশ এগিয়ে এসে ভয়ংকর গলায় বলল,
“এদিক থেকে কেটে পড়। নইলে তোদের অবস্থা কী করি, দেখে নিস।”
কথা কাটাকাটি থেকে মারপিট শুরু হয়ে গেল। হরিশ আর গনেশ দুজন মিলে চার-পাঁচজনের সাথে লড়ছিল। ঘুষি, লাথি, ধাক্কাধাক্কি চলছিল। রিয়া অর্ককে শক্ত করে জড়িয়ে ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ঠিক তখনই দুটো পুলিশের মোটরসাইকেল এসে থামল। পুলিশ দেখে সবাই থেমে গেল।
পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় বলল,
“কী হচ্ছে এখানে? সবাই থামো!”
হরিশ রিয়াকে উদ্দেশ্য করে," এই গুন্ডাগুলো ওনাকে বিরক্ত করতে ছিল।'
একজন পুলিশ রিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি ঠিক আছেন?”
রিয়া কাঁপা গলায় মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ… ওরা আমাকে বিরক্ত করছিল।”
পুলিশ লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
“আজ বেঁচে গেলি। আর যদি এখানে ঝামেলা করিস, তাহলে লকআপে ঢুকিয়ে দেব। কেটে পড় এখান থেকে।”
লোকগুলো গজগজ করতে করতে চলে গেল।
হরিশ আর গনেশের জামা ছিঁড়ে গিয়েছিল, মুখে আঁচড়ের দাগ। রিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল — একদিকে ঘৃণা, অন্যদিকে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি।
রাতুল ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে পুরো ঘটনা শুনে অবাক হয়ে গেল।
রাতুল গনেশ আর হরিশের অবস্থা দেখে- " আরে তোমাদের এ অবস্থা কেন?"
হরিশ," তা অনেক বড় ঘটনা, চলুন গাড়িতে বসে বলি।"
গাড়িতে ওঠার আগে রিয়া একবার হরিশ আর গনেশের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা ছিল না। শুধু একটা ঠান্ডা, অন্ধকার দৃষ্টি।
৬ সপ্তাহ কেটে গেছে।
এই ৬ সপ্তাহ রিয়া কারো সাথে কোনো কথা বলেনি। না তার মায়ের সাথে, না রাতুলের সাথে। সে শুধু চুপচাপ ছিল। তার চোখের নিচে কালি পড়েছে, মুখ ফ্যাকাশে। কিন্তু তার হাতের কাছে সবসময় একটা ধারালো চাকু রাখত। রাতে ঘুমানোর সময়ও বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখত। যদি গনেশ কাছে আসে, সে আর দ্বিধা করবে না।
গনেশও বুঝতে পেরেছিল। সে আর রিয়ার কাছে ঘেঁষার সাহস করেনি। দূর থেকে দেখলেও চোখ সরিয়ে নিত। কিন্তু তার চোখে এখনো সেই ক্ষুধার্ত দৃষ্টি লুকিয়ে ছিল।
আর হরিশ… হরিশ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।
সে রাতে যে দৃশ্য দেখেছিল, সেটা তার মাথার ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সে প্রতি রাতে ভাবত — গনেশ ঘুমিয়ে পড়লে তার মুখে বালিশ মুড়ো দেবে। কিন্তু প্রতিবারই তার হাত কাঁপত। সাহস হতো না। সে নিজেকে অভিশাপ দিত, কিন্তু কিছুই করতে পারত না। শুধু নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছিল।
---
আজ রাতে ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে খেতে বসেছে।
রিয়া, আরজুদা বেগম, রাতুল, গনেশ আর হরিশ। টেবিলের উপর খাবার সাজানো, কিন্তু পরিবেশ ভারী। কেউ তেমন কথা বলছে না। শুধু চামচের শব্দ আর থালায় ভাত মাখার আওয়াজ হচ্ছে।
রাতুল হরিশের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করল তার মুখটা শুকনো, চোখ নিচু। সে হালকা হেসে বলল,
“আরে হরিশ কাকা, তোমার মন খারাপ কেন? কী হয়েছে?”
হরিশ চমকে উঠল। সে দ্রুত মাথা তুলে বলল,
“না না… কই, মন খারাপ কই? তেমন কিছু না।”
রিয়া এক ঝলক হরিশের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো অনুভূতি ফুটল না। সে আবার খাবারের দিকে মন দিল।
রাতুল বিশ্বাস করল না। সে হাসতে হাসতে বলল,
“বোঝাই যায় কাকা। মুখ দেখে তো মনে হয় পুরো দুনিয়া উল্টে গেছে।”
হরিশ জোর করে হাসার চেষ্টা করল,
“তেমন কিছু না রাতুল। শরীরটা ভালো লাগছে না।”
রাতুল একটু চুপ করে থেকে বলল,
“আচ্ছা, চলো না আমরা কোথাও ঘুরে আসি। তোমার গাড়ি নিয়ে যাব। মনটা ফ্রেশ হবে।”
গনেশ কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“কোথায় যাবে?”
রাতুল উৎসাহের সাথে বলল,
“চলো কক্সবাজার। সমুদ্র দেখে আসি। অনেক দিন হয়েছে কোথাও যাইনি।”
আরজুদা বেগম তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন,
“না বাবা, আমি যাব না। বাসায় অনেক কাজ পড়ে আছে।”
রাতুল অনুরোধ করল,
“চলুন না মা। সবাই মিলে যাই।”
আরজুদা দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়লেন,
“না। তোমরা যাও। আমি থাকব।”
রাতুল হরিশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে হরিশ কাকা, আমি আর রিয়া অন্তত যাই।”
রিয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠল,
“না। আমি যাব না।”
রাতুল নাছোড়বান্দা হয়ে বলতে লাগল,
“আরে চলো না। অনেক দিন হয়েছে আমরা কোথাও ঘুরতে যাইনি। শুধু তুমি আর আমি। মনটা ভালো হয়ে যাবে। প্লিজ রিয়া…”
রাতুল অনেকক্ষণ ধরে বুঝিয়ে বলতে থাকল। রিয়া বারবার না করলেও শেষ পর্যন্ত আর না করতে পারল না। সে চুপ করে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
টেবিলের উপর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। হরিশ চুপ করে বসে রইল। তার হাতের চামচটা থরথর করে কাঁপছিল। গনেশ নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে একটা অদ্ভুত হাসি লুকিয়ে ছিল।
রিয়া মনে মনে চিন্তা করছিল — এই ট্রিপটা হয়তো তার জন্য নতুন কোনো বিপদ ডেকে আনবে, নাকি স্বস্তি? হরিশও এ ট্রিপে আছে। কি হতে যাচ্ছে।
ট্রিপের দিন সকাল সকাল।
সূর্য তখনো পুরোপুরি উঠেনি, কিন্তু বাসার সামনে সাজানো হয়েছে হরিশের ট্যাক্সি গাড়িটা। লাগেজ গুছিয়ে রাখা হয়েছে। বাতাসে একটা হালকা উত্তেজনা মিশে আছে, কিন্তু রিয়ার মনে ছিল শুধু ভারী একটা চাপ।
রিয়া সকাল থেকেই চুপচাপ। সে একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরেছে, চুল পিঠের উপর খোলা। তার চোখে ঘুমের অভাব স্পষ্ট। কোলে অর্ককে নিয়ে সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মন বলছিল — এই ট্রিপে না গেলেই ভালো হতো। কিন্তু রাতুলের অনুরোধ আর পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে।
ঠিক তখনই গনেশ বের হয়ে এল। তার পরনে একটা সস্তা জিন্স আর টি-শার্ট। মুখে একটা কৃত্রিম হাসি। সে রাতুলের কাছে গিয়ে বলল,
“ভাইসাহেব, আমি কখনো কক্সবাজার যাই নাই। যদি একটু সাথে নেন, খুব খুশি হতাম। আমি তো কোনো ঝামেলা করব না।”
রাতুল এক মুহূর্ত চিন্তা করে হাসল। সে গনেশকে ফিরিয়ে দিতে পারল না।
“আচ্ছা ঠিক আছে। চলুন তাহলে। আরেকজন বেশি হলে সমস্যা নেই।”
রিয়ার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে গনেশের দিকে তাকাতেই পারল না। তার শরীর শক্ত হয়ে উঠল। হরিশের দিকেও তাকাতে তার ঘৃণা লাগছিল। দুজনকেই তার এখন অসহ্য মনে হচ্ছিল।
হরিশ গনেশকে দেখেও খুশি হয় নি। কিন্তু গনেশ এখন রিয়াকে দেখবে এটা ভেবে খুব উৎসাহিত।
---
সকাল সাড়ে ছয়টায় গাড়ি ছাড়ল।
**ড্রাইভারের সিটে:** হরিশ। তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত। চোখ দুটো লাল, ক্লান্ত। সে গাড়ি চালাচ্ছে, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। ড্রাইভার সিটের পাশে গনেশ।
**পেছনের সিটে:** রিয়া, তার কোলে অর্ক। ডান পাশে রাতুল।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই রিয়ার শরীর শিরশির করে উঠল। গনেশ তার সামনেই বসে আছে। তার শরীর থেকে সেই পরিচিত গন্ধ আসছিল — যে গন্ধটা কিছু দিন আগে তার শরীরে মেখে ছিল। রিয়া জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রাখল। তার হাত অর্ককে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে।
রাতুল উৎসাহের সাথে বলছিল,
“আজকে অনেক দিন পর আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাচ্ছি। সমুদ্র দেখলে মনটা ভালো হয়ে যাবে।”
কিন্তু কেউ তেমন সাড়া দিচ্ছিল না।
আরজুদা বেগম আর মমতা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাচ্ছিল। আরজুদা রিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“সাবধানে যাস। অর্ককে ভালো করে দেখে রাখিস। গিয়ে ফোন দিয়ে জানাস।”
রিয়া জোর করে হাসার চেষ্টা করল। গাড়ি সামনে এগোতেই সে জানালা দিয়ে হাত নাড়ল। কিন্তু তার চোখে কোনো আনন্দ ছিল না।
গাড়ি চলতে থাকল।
প্রায়ই রিয়ার সাথে গনেশের মিররে চোখাচোখি হচ্ছে। গনেশ তখন মুচকি হাসি দেয়। রিয়া আবার অন্যদিকে চেয়ে থাকে তখন। হরিশ তা ভালোভাবেই খেয়াল করে।
তিনজন পুরুষ। তিনজনই রিয়ার জীবনে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। একজন তার ধর্ষক, আরেকজন তার স্বামীকে ঠকিয়ে তার শরীর ভোগ করেছে, আরেকজন সেই স্বামী — যাকে সে আর মুখ দেখাতে পারছে না।
রিয়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে পানি জমছিল, কিন্তু সে ফেলছিল না। অর্ক তার কোলে ঘুমিয়ে ছিল। সে মনে মনে ভাবছিল — এই ট্রিপটা কি তার জীবনকে আরও জটিল করে তুলবে?
গাড়ির ভিতরে একটা ভারী, অস্বস্তিকর নীরবতা বিরাজ করছিল। শুধু গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ আর রাস্তার আওয়াজ হচ্ছিল।
গাড়ি চলছিল দীর্ঘ রাস্তা ধরে।
**ড্রাইভিং সিটে** হরিশ, তার ঠিক পাশে **গনেশ**। পেছনের সিটে **রিয়া** আর **রাতুল**। রিয়ার কোলে অর্ক ঘুমিয়ে ছিল। রিয়া জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার শরীর শক্ত হয়ে আছে। গনেশের উপস্থিতি তার কাছে যেন বিষের মতো লাগছিল।
প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর হরিশ গাড়ির গতি কমিয়ে একটা তেলের পাম্পের সামনে থামাল।
রাতুল সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞাসা করল,
“হরিশ কাকা, তেল নেই?”
হরিশ স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে শুকনো গলায় বলল,
“না। এখন নিয়ে নিলে পরে আর থামতে হবে না।”
গাড়ি থামতেই সবাই নামল।
হরিশ গাড়ির ট্যাঙ্কে তেল ভরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। গনেশ পাম্পের ছোট দোকানের দিকে গেল বিড়ি কিনতে। রাতুল রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি ওয়াশরুম থেকে আসছি। তুমি অর্ককে নিয়ে একটু হাঁটো।”
রিয়া শান্ত গলায় বলল, “আচ্ছা।”
রাতুল চলে যাওয়ার পর রিয়া অর্ককে কোলে নিয়ে পাম্পের পাশের খোলা জায়গায় হাঁটতে লাগল। অর্ক একটু আগে জেগে উঠেছে, তাই সে তার ছোট হাত দিয়ে রিয়ার চুল খেলা করছিল। রিয়া মাঝে মাঝে তার কপালে চুমু খাচ্ছিল।
কিন্তু তখনই বিপদ এল।
পাম্পের একপাশে কয়েকজন উশৃঙ্খল যুবক দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তাদের চোখ পড়ল রিয়ার উপর। তার সুন্দর চেহারা, ফর্সা গায়ের রং আর অর্ককে কোলে নিয়ে হাঁটার ভঙ্গি দেখে তাদের একজন নিচু স্বরে বলল,
“ওই দেখ… কী সুন্দরী মাল। একদম ফ্রেশ।”
আরেকজন হাসতে হাসতে বলল,
“চল, কথা বলে আসি। মজা হবে।"
দুজন লোক সোজা রিয়ার দিকে এগিয়ে গেল।
প্রথমজন বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“কী সুন্দরী, একা একা ঘুরছেন? আমাদের সাথে চলুন না। খুব মজা করব। সমুদ্রে নিয়ে যাব।”
রিয়া শক্ত হয়ে গেল। সে পিছিয়ে এক ধাপ গেল এবং কঠিন গলায় বলল,
“এখান থেকে চলে যান। আমাকে বিরক্ত করবেন না।”
দ্বিতীয় লোকটা আরও সাহস করে রিয়ার হাত ধরার চেষ্টা করল।
“আরে এত রাগ করছেন কেন? একটু গল্প করি…”
রিয়া ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
“আঃ! ছাড়ুন! হেল্প!”
চিৎকারটা শুনেই হরিশ আর গনেশ দৌড়ে এল।
হরিশ প্রথমে এসে যে লোকটা রিয়ার হাত ধরার চেষ্টা করছিল, তাকে জোরে একটা ঘুষি মারল। লোকটা মাটিতে পড়ে গেল। গনেশও দ্বিতীয় লোকটাকে ধরে তার পেটে কয়েকটা লাথি মারল।
দুজনের চিৎকারে বাকি লোকগুলো ছুটে এল।
“কিরে! আমাদের লোকদের মারছিস কেন শালা?” একজন চিৎকার করে বলল।
হরিশ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তোর লোক মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছে। আরেকবার হাত দিলে হাত ভেঙে দেব!”
লোকগুলো আরও উত্তেজিত হয়ে বলল,
“আমাদের লোক যা ইচ্ছা তাই করবে। তুই কে হস?”
গনেশ এগিয়ে এসে ভয়ংকর গলায় বলল,
“এদিক থেকে কেটে পড়। নইলে তোদের অবস্থা কী করি, দেখে নিস।”
কথা কাটাকাটি থেকে মারপিট শুরু হয়ে গেল। হরিশ আর গনেশ দুজন মিলে চার-পাঁচজনের সাথে লড়ছিল। ঘুষি, লাথি, ধাক্কাধাক্কি চলছিল। রিয়া অর্ককে শক্ত করে জড়িয়ে ভয়ে পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ঠিক তখনই দুটো পুলিশের মোটরসাইকেল এসে থামল। পুলিশ দেখে সবাই থেমে গেল।
পুলিশ অফিসার গম্ভীর গলায় বলল,
“কী হচ্ছে এখানে? সবাই থামো!”
হরিশ রিয়াকে উদ্দেশ্য করে," এই গুন্ডাগুলো ওনাকে বিরক্ত করতে ছিল।'
একজন পুলিশ রিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি ঠিক আছেন?”
রিয়া কাঁপা গলায় মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ… ওরা আমাকে বিরক্ত করছিল।”
পুলিশ লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলল,
“আজ বেঁচে গেলি। আর যদি এখানে ঝামেলা করিস, তাহলে লকআপে ঢুকিয়ে দেব। কেটে পড় এখান থেকে।”
লোকগুলো গজগজ করতে করতে চলে গেল।
হরিশ আর গনেশের জামা ছিঁড়ে গিয়েছিল, মুখে আঁচড়ের দাগ। রিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে ছিল — একদিকে ঘৃণা, অন্যদিকে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি।
রাতুল ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে পুরো ঘটনা শুনে অবাক হয়ে গেল।
রাতুল গনেশ আর হরিশের অবস্থা দেখে- " আরে তোমাদের এ অবস্থা কেন?"
হরিশ," তা অনেক বড় ঘটনা, চলুন গাড়িতে বসে বলি।"
গাড়িতে ওঠার আগে রিয়া একবার হরিশ আর গনেশের দিকে তাকাল। তার চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা ছিল না। শুধু একটা ঠান্ডা, অন্ধকার দৃষ্টি।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)