26-04-2026, 09:58 PM
পর্ব ১৯
দুই দিন কেটে গেছে।
আজ রাত ন’টা। বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। সাথে ঝড়ো হাওয়া। জানালার কপাটগুলো বারবার বাড়ি খাচ্ছে দেওয়ালে।
পুরো বাড়ি অন্ধকার। দুপুর থেকেই কারেন্ট নেই।
ড্রয়িং রুমে রিয়া একা। কোলে অর্ক। ছেলেটা গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। কিছুতেই থামছে না। রিয়া তাকে বুকে চেপে ধরে পায়চারি করছে, পিঠ চাপড়াচ্ছে। “সোনা বাবা... কাঁদে না... মা আছে তো...”
কিন্তু অর্কের কান্না থামে না। ক্ষুধায়, নাকি ভয়ে—বোঝা যাচ্ছে না।
রাতুল সন্ধ্যায় ফোন করেছিল, “বৃষ্টিতে আটকে গেছি। শুভর বাসায় থেকে যাব আজ। টেনশন করো না।”
আরজুদা বেগমও সকালে মমতার সাথে তার ভাইয়ের বাসায় গেছেন। রাতে ফিরবেন না।
পুরো দোতলা বাড়িতে রিয়া আর অর্ক ছাড়া কেউ নেই। অন্ধকার, ঝড়, আর একটা কাঁদতে থাকা বাচ্চা।
রিয়া হাতড়ে হাতড়ে মোমবাতি খুঁজছে। ড্রয়ারে, শোকেসে... কোথাও পাচ্ছে না। অন্ধকারে আসবাবের কোণায় পা লেগে ব্যথা পাচ্ছে।
হঠাৎ দরজার কাছে ‘খট’ করে একটা শব্দ হলো।
রিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সে কেঁপে উঠল। অর্ককে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল। “কে? কে ওখানে?” গলাটা কাঁপছে ভয়ে।
অন্ধকার চিরে হলুদ একটা আলো দেখা গেল। আলোটা এগিয়ে আসছে।
আলোর পেছনে হরিশ। হাতে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি। গা ভেজা, চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
আজ এই প্রথম, হরিশকে দেখে রিয়ার ভয় না—স্বস্তি হলো। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়ের পাথরটা যেন একটু নড়ল।
হরিশ মোমবাতিটা উঁচু করে ধরে চারপাশ দেখল। তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেউ নেই ঘরে?”
রিয়া মাথা নাড়ল, “না তো। কেউ নেই। সবাই বাইরে।”
“ও আচ্ছা।” হরিশ ছোট্ট করে বলল। তারপর মোমবাতি নিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
রিয়া হঠাৎ একটু জোরে ডেকে উঠল, “শুনুন!”
হরিশ থেমে গেল। পেছন না ফিরেই দাঁড়িয়ে রইল।
রিয়া অর্কের দিকে তাকাল। ছেলেটা এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। “অর্ক... অর্ক কাঁদছে। একটু... একটু ধরবেন ওকে?”
হরিশ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল রিয়ার দিকে। চোখে প্রশ্ন।
রিয়া আর কিছু বলল না। শুধু অর্ককে সামনে বাড়িয়ে দিল।
হরিশ মোমবাতিটা হাতে নিয়ে রিয়ার বেডরুমে ঢুকল। রিয়া কাঁপা হাতে অর্ককে হরিশের কোলে তুলে দিল।
এই প্রথম। এই প্রথম হরিশ নিজের ছেলেকে কোলে নিল।
আশ্চর্য! হরিশের কোলে যেতেই অর্কের কান্না থেমে গেল। সে দু’বার ফুঁপিয়ে হরিশের ভেজা শার্টের বুকের কাছে মুখ গুঁজে দিল। তারপর চোখ বন্ধ করে ফেলল।
হরিশ অবাক হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মোমবাতির আলোয় অর্কের ঘুমন্ত মুখটা দেখল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে আস্তে আস্তে অর্ককে দোলনায় শুইয়ে দিল। কাঁথাটা টেনে দিল গলা পর্যন্ত।
তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল, “ও ঘুমিয়ে গেছে। আমি চলে যাই।”
রিয়া সাথে সাথে বাধা দিল। বাইরে তখনো ঝড়ের দাপট, আর ঘরের ভেতর গা ছমছমে অন্ধকার। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছে।
“না, যাবেন না। ঘরে কেউ নেই। এত বড় ঘরে আলাদা মানুষ থেকে কী লাভ? আর... আর মোমবাতিও তো একটাই।” রিয়া এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল।
হরিশ রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়ার চোখে ভয়, অনুরোধ।
হরিশ একটু চুপ করে থেকে বলল, “ভাত খেয়ে আসি তবে। পেটে কিছু পড়েনি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন। একসাথেই যাই।” রিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠল। একা থাকার সাহস নেই তার।
একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে দুজন রান্নাঘরে গেল। নীরবে ভাত খেল। কথা হলো না কোনো। শুধু বাইরে বৃষ্টির শব্দ, আর মাঝে মাঝে দূরে বাজ পড়ার আওয়াজ।
খাওয়া শেষে রিয়া আর হরিশ আবার বেডরুমে ফিরে এল। অর্ক দোলনায় গভীর ঘুমে।
রিয়া বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। হরিশ দাঁড়িয়ে রইল।
রিয়া চাদরের নিচ থেকে একটা কোলবালিশ টেনে বের করল। বিছানার মাঝখানে লম্বা করে রাখল সেটা। তারপর হরিশের দিকে না তাকিয়েই বলল, “শুয়ে পড়ুন।”
হরিশ আর কথা বাড়াল না। ভেজা শার্টটা খুলে চেয়ারের উপর মেলে দিল। তারপর খালি গায়ে বিছানার অন্য পাশে শুয়ে পড়ল।
মাঝে শুধু একটা কোলবালিশ।
একদিকে রিয়া, অন্যদিকে হরিশ। মাথার কাছে একটা মোমবাতি জ্বলছে টিমটিম করে। বাইরে ঝড়, ভেতরে নিস্তব্ধতা।
দুজনের কেউ ঘুমাতে পারছে না।
বাইরে বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দ। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। মোমবাতির শিখাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
বিছানার মাঝে কোলবালিশ। একপাশে রিয়া কাত হয়ে শুয়ে, অন্যপাশে হরিশ চিৎ হয়ে। দুজনের মাঝে হাতখানেক দূরত্ব। কিন্তু সেই দূরত্বটাই যেন ঘরটাকে আরও ভারী করে তুলেছে।
নীরবতা ভাঙল রিয়া। গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে ফিসফিস করে বলল, “ঘুমিয়ে গেছ?”
ওপাশ থেকে হরিশের গলা এলো, একদম সজাগ। “না। কেন?”
রিয়া আর কিছু বলল না। কী বলবে? ‘ভয় লাগছে’—এই কথাটা বলতে গিয়েও গলায় আটকে গেল।
আবার চুপচাপ। দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও থেমে গেছে—কারেন্ট নেই বলে। শুধু বৃষ্টি, আর দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ।
দুই মিনিট কেটে গেল। রিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই ঘর, এই অন্ধকার, এই মানুষটা পাশে—সব মিলিয়ে তার অস্বস্তি হচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। কোলবালিশটা যেন কোনো বাঁধাই না।
সে আবার মুখ খুলল। এবার গলায় একটু কাঁপুনি, “ঘুমিয়ে গেছো?”
হরিশ পাশ ফিরল না। ছাদের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল, “না তো। বললাম না, ঘুমাইনি।”
রিয়া চোখ বন্ধ করল। হরিশের গলার স্বরটা শুনে ভয়টা একটু কমল, কিন্তু অস্বস্তিটা গেল না। বরং বেড়ে গেল।
সে কোলবালিশটা আরও একটু নিজের দিকে টেনে নিল। যেন ওটাই তার শেষ ঢাল।
“তাহলে... তাহলে চুপ করে আছো কেন?” রিয়ার গলা ফিসফিসে, অভিমানী শোনাল।
হরিশ এবার পাশ ফিরল। মোমবাতির আলোয় তার চোখ দুটো চকচক করছে। সে রিয়ার পিঠের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই কথা বলিস না দেখে।”
রিয়া জবাব দিল না। শুধু কোলবালিশটা খামচে ধরল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। ঘরটা এক সেকেন্ডের জন্য দিনের আলোর মতো ফর্সা হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
সেই আলোয় হরিশ দেখল—রিয়ার পিঠ কাঁপছে।
আবার নিস্তব্ধতা। মোমবাতির শিখাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়েছে। পরিবেশ টা শীতল হচ্ছে আরো।
রিয়া আর পারল না। এই চুপচাপ, এই দমবন্ধ করা পরিবেশ তার অসহ্য লাগছে। সে ঝট করে পাশ ফিরল হরিশের দিকে।
“কথা বলছেন না কেন? আমি কি দেওয়ালের সাথে কথা বলছি?” রিয়ার গলায় বিরক্তি, রাগ, ভয়—সব মিশে আছে।
পাশ ফিরতেই রিয়া থমকে গেল।
সে আর হরিশ মুখোমুখি। মাঝে কোলবালিশটা থাকলেও, দুজনের মুখ এখন খুব কাছাকাছি। এক বিঘতও ফারাক নেই। হরিশের গরম নিঃশ্বাস রিয়ার ঠোঁটে এসে লাগছে।
হরিশ নড়ল না। মোমের হলদে, কাঁপা আলোয় সে একদৃষ্টে রিয়াকে দেখছে। ঘামে ভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে, চোখ দুটো ভয়ে আর রাগে বড় বড় হয়ে আছে, ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক হয়ে কাঁপছে।
হরিশের গলা দিয়ে ফিসফিস করে বেরোল, “রিয়া... তুই অনেক সুন্দর। এত সুন্দর জিনিস আমি জন্মে দেখি নাই।”
কথাটা শেষ করে হরিশ তার ডান হাতটা তুলল। খসখসে, মোটা আঙুলগুলো রিয়ার কপাল ছুঁল। খুব আলতো করে। তারপর আঙুলটা নামতে লাগল—কপাল থেকে নাকের ডগা, নাক থেকে উপরের ঠোঁট।
রিয়া পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সরছে না। গলায় কথা আটকে গেছে।
হরিশের আঙুলটা এবার রিয়ার নিচের ঠোঁটের উপর ঘষা দিল। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট দুটো ফাঁক করে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। একটা আঙুল, তারপর দুটো।
রিয়ার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে ‘উম্ম’ করে একটা শব্দ করল, কিন্তু আঙুলটা বের করে দিল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল।
বাইরে বৃষ্টি আরও বাড়ল। সাথে দমকা হাওয়া। জানালার কপাটটা শব্দ করে বাড়ি খেল। ঘরের ভেতরটা আরও শীতল, আরও নিস্তব্ধ হয়ে এল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
হরিশ এবার হাত বাড়িয়ে মাঝের কোলবালিশটা একটানে সরিয়ে দিল। কোনো বাধা রইল না আর।
সে আরও কাছে সরে এল। এতটাই কাছে যে রিয়ার বুকের ওঠানামা সে নিজের বুকে টের পাচ্ছে।
রিয়া চোখ মেলল। কিছু বলল না। বলতে পারল না। বলা উচিতও না। এই লোকটাই তো তার বাবার খুনি ছিল... এই হাতেই তো রক্ত লেগে আছে। মাথার ভেতর কথাটা বাজছে। কিন্তু শরীর? শরীরটা বিশ্বাসঘাতকতা করছে। ঝড়, অন্ধকার, ভয়, একাকীত্ব—সব মিলে তাকে বেঁধে ফেলেছে। সে বাধা দিতে পারছে না।
হরিশ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে তার কালো, পুরু ঠোঁট দুটো নামিয়ে আনল রিয়ার কাঁপতে থাকা গোলাপি ঠোঁটের উপর।
ঠোঁটে ঠোঁট মিলে গেল।
একটা গভীর, ভেজা, উষ্ণ চুমু। বাইরে তখন বাজ পড়ল কড়কড় করে। আর ঘরের ভেতর মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল।
দুই দিন কেটে গেছে।
আজ রাত ন’টা। বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। সাথে ঝড়ো হাওয়া। জানালার কপাটগুলো বারবার বাড়ি খাচ্ছে দেওয়ালে।
পুরো বাড়ি অন্ধকার। দুপুর থেকেই কারেন্ট নেই।
ড্রয়িং রুমে রিয়া একা। কোলে অর্ক। ছেলেটা গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। কিছুতেই থামছে না। রিয়া তাকে বুকে চেপে ধরে পায়চারি করছে, পিঠ চাপড়াচ্ছে। “সোনা বাবা... কাঁদে না... মা আছে তো...”
কিন্তু অর্কের কান্না থামে না। ক্ষুধায়, নাকি ভয়ে—বোঝা যাচ্ছে না।
রাতুল সন্ধ্যায় ফোন করেছিল, “বৃষ্টিতে আটকে গেছি। শুভর বাসায় থেকে যাব আজ। টেনশন করো না।”
আরজুদা বেগমও সকালে মমতার সাথে তার ভাইয়ের বাসায় গেছেন। রাতে ফিরবেন না।
পুরো দোতলা বাড়িতে রিয়া আর অর্ক ছাড়া কেউ নেই। অন্ধকার, ঝড়, আর একটা কাঁদতে থাকা বাচ্চা।
রিয়া হাতড়ে হাতড়ে মোমবাতি খুঁজছে। ড্রয়ারে, শোকেসে... কোথাও পাচ্ছে না। অন্ধকারে আসবাবের কোণায় পা লেগে ব্যথা পাচ্ছে।
হঠাৎ দরজার কাছে ‘খট’ করে একটা শব্দ হলো।
রিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। সে কেঁপে উঠল। অর্ককে আরও শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরল। “কে? কে ওখানে?” গলাটা কাঁপছে ভয়ে।
অন্ধকার চিরে হলুদ একটা আলো দেখা গেল। আলোটা এগিয়ে আসছে।
আলোর পেছনে হরিশ। হাতে একটা জ্বলন্ত মোমবাতি। গা ভেজা, চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।
আজ এই প্রথম, হরিশকে দেখে রিয়ার ভয় না—স্বস্তি হলো। বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়ের পাথরটা যেন একটু নড়ল।
হরিশ মোমবাতিটা উঁচু করে ধরে চারপাশ দেখল। তারপর রিয়ার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেউ নেই ঘরে?”
রিয়া মাথা নাড়ল, “না তো। কেউ নেই। সবাই বাইরে।”
“ও আচ্ছা।” হরিশ ছোট্ট করে বলল। তারপর মোমবাতি নিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
রিয়া হঠাৎ একটু জোরে ডেকে উঠল, “শুনুন!”
হরিশ থেমে গেল। পেছন না ফিরেই দাঁড়িয়ে রইল।
রিয়া অর্কের দিকে তাকাল। ছেলেটা এখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। “অর্ক... অর্ক কাঁদছে। একটু... একটু ধরবেন ওকে?”
হরিশ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল রিয়ার দিকে। চোখে প্রশ্ন।
রিয়া আর কিছু বলল না। শুধু অর্ককে সামনে বাড়িয়ে দিল।
হরিশ মোমবাতিটা হাতে নিয়ে রিয়ার বেডরুমে ঢুকল। রিয়া কাঁপা হাতে অর্ককে হরিশের কোলে তুলে দিল।
এই প্রথম। এই প্রথম হরিশ নিজের ছেলেকে কোলে নিল।
আশ্চর্য! হরিশের কোলে যেতেই অর্কের কান্না থেমে গেল। সে দু’বার ফুঁপিয়ে হরিশের ভেজা শার্টের বুকের কাছে মুখ গুঁজে দিল। তারপর চোখ বন্ধ করে ফেলল।
হরিশ অবাক হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মোমবাতির আলোয় অর্কের ঘুমন্ত মুখটা দেখল। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। সে আস্তে আস্তে অর্ককে দোলনায় শুইয়ে দিল। কাঁথাটা টেনে দিল গলা পর্যন্ত।
তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল, “ও ঘুমিয়ে গেছে। আমি চলে যাই।”
রিয়া সাথে সাথে বাধা দিল। বাইরে তখনো ঝড়ের দাপট, আর ঘরের ভেতর গা ছমছমে অন্ধকার। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছে।
“না, যাবেন না। ঘরে কেউ নেই। এত বড় ঘরে আলাদা মানুষ থেকে কী লাভ? আর... আর মোমবাতিও তো একটাই।” রিয়া এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে ফেলল।
হরিশ রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়ার চোখে ভয়, অনুরোধ।
হরিশ একটু চুপ করে থেকে বলল, “ভাত খেয়ে আসি তবে। পেটে কিছু পড়েনি।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন। একসাথেই যাই।” রিয়া প্রায় লাফিয়ে উঠল। একা থাকার সাহস নেই তার।
একটা মোমবাতি হাতে নিয়ে দুজন রান্নাঘরে গেল। নীরবে ভাত খেল। কথা হলো না কোনো। শুধু বাইরে বৃষ্টির শব্দ, আর মাঝে মাঝে দূরে বাজ পড়ার আওয়াজ।
খাওয়া শেষে রিয়া আর হরিশ আবার বেডরুমে ফিরে এল। অর্ক দোলনায় গভীর ঘুমে।
রিয়া বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। হরিশ দাঁড়িয়ে রইল।
রিয়া চাদরের নিচ থেকে একটা কোলবালিশ টেনে বের করল। বিছানার মাঝখানে লম্বা করে রাখল সেটা। তারপর হরিশের দিকে না তাকিয়েই বলল, “শুয়ে পড়ুন।”
হরিশ আর কথা বাড়াল না। ভেজা শার্টটা খুলে চেয়ারের উপর মেলে দিল। তারপর খালি গায়ে বিছানার অন্য পাশে শুয়ে পড়ল।
মাঝে শুধু একটা কোলবালিশ।
একদিকে রিয়া, অন্যদিকে হরিশ। মাথার কাছে একটা মোমবাতি জ্বলছে টিমটিম করে। বাইরে ঝড়, ভেতরে নিস্তব্ধতা।
দুজনের কেউ ঘুমাতে পারছে না।
বাইরে বৃষ্টির একটানা ঝমঝম শব্দ। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। মোমবাতির শিখাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে।
বিছানার মাঝে কোলবালিশ। একপাশে রিয়া কাত হয়ে শুয়ে, অন্যপাশে হরিশ চিৎ হয়ে। দুজনের মাঝে হাতখানেক দূরত্ব। কিন্তু সেই দূরত্বটাই যেন ঘরটাকে আরও ভারী করে তুলেছে।
নীরবতা ভাঙল রিয়া। গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে ফিসফিস করে বলল, “ঘুমিয়ে গেছ?”
ওপাশ থেকে হরিশের গলা এলো, একদম সজাগ। “না। কেন?”
রিয়া আর কিছু বলল না। কী বলবে? ‘ভয় লাগছে’—এই কথাটা বলতে গিয়েও গলায় আটকে গেল।
আবার চুপচাপ। দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও থেমে গেছে—কারেন্ট নেই বলে। শুধু বৃষ্টি, আর দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ।
দুই মিনিট কেটে গেল। রিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই ঘর, এই অন্ধকার, এই মানুষটা পাশে—সব মিলিয়ে তার অস্বস্তি হচ্ছে। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। কোলবালিশটা যেন কোনো বাঁধাই না।
সে আবার মুখ খুলল। এবার গলায় একটু কাঁপুনি, “ঘুমিয়ে গেছো?”
হরিশ পাশ ফিরল না। ছাদের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিল, “না তো। বললাম না, ঘুমাইনি।”
রিয়া চোখ বন্ধ করল। হরিশের গলার স্বরটা শুনে ভয়টা একটু কমল, কিন্তু অস্বস্তিটা গেল না। বরং বেড়ে গেল।
সে কোলবালিশটা আরও একটু নিজের দিকে টেনে নিল। যেন ওটাই তার শেষ ঢাল।
“তাহলে... তাহলে চুপ করে আছো কেন?” রিয়ার গলা ফিসফিসে, অভিমানী শোনাল।
হরিশ এবার পাশ ফিরল। মোমবাতির আলোয় তার চোখ দুটো চকচক করছে। সে রিয়ার পিঠের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই কথা বলিস না দেখে।”
রিয়া জবাব দিল না। শুধু কোলবালিশটা খামচে ধরল। বাইরে বিদ্যুৎ চমকাল। ঘরটা এক সেকেন্ডের জন্য দিনের আলোর মতো ফর্সা হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
সেই আলোয় হরিশ দেখল—রিয়ার পিঠ কাঁপছে।
আবার নিস্তব্ধতা। মোমবাতির শিখাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়েছে। পরিবেশ টা শীতল হচ্ছে আরো।
রিয়া আর পারল না। এই চুপচাপ, এই দমবন্ধ করা পরিবেশ তার অসহ্য লাগছে। সে ঝট করে পাশ ফিরল হরিশের দিকে।
“কথা বলছেন না কেন? আমি কি দেওয়ালের সাথে কথা বলছি?” রিয়ার গলায় বিরক্তি, রাগ, ভয়—সব মিশে আছে।
পাশ ফিরতেই রিয়া থমকে গেল।
সে আর হরিশ মুখোমুখি। মাঝে কোলবালিশটা থাকলেও, দুজনের মুখ এখন খুব কাছাকাছি। এক বিঘতও ফারাক নেই। হরিশের গরম নিঃশ্বাস রিয়ার ঠোঁটে এসে লাগছে।
হরিশ নড়ল না। মোমের হলদে, কাঁপা আলোয় সে একদৃষ্টে রিয়াকে দেখছে। ঘামে ভেজা চুল কপালে লেপ্টে আছে, চোখ দুটো ভয়ে আর রাগে বড় বড় হয়ে আছে, ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক হয়ে কাঁপছে।
হরিশের গলা দিয়ে ফিসফিস করে বেরোল, “রিয়া... তুই অনেক সুন্দর। এত সুন্দর জিনিস আমি জন্মে দেখি নাই।”
কথাটা শেষ করে হরিশ তার ডান হাতটা তুলল। খসখসে, মোটা আঙুলগুলো রিয়ার কপাল ছুঁল। খুব আলতো করে। তারপর আঙুলটা নামতে লাগল—কপাল থেকে নাকের ডগা, নাক থেকে উপরের ঠোঁট।
রিয়া পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সরছে না। গলায় কথা আটকে গেছে।
হরিশের আঙুলটা এবার রিয়ার নিচের ঠোঁটের উপর ঘষা দিল। তারপর ধীরে ধীরে ঠোঁট দুটো ফাঁক করে মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। একটা আঙুল, তারপর দুটো।
রিয়ার সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। সে ‘উম্ম’ করে একটা শব্দ করল, কিন্তু আঙুলটা বের করে দিল না। চোখ বন্ধ করে ফেলল।
বাইরে বৃষ্টি আরও বাড়ল। সাথে দমকা হাওয়া। জানালার কপাটটা শব্দ করে বাড়ি খেল। ঘরের ভেতরটা আরও শীতল, আরও নিস্তব্ধ হয়ে এল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
হরিশ এবার হাত বাড়িয়ে মাঝের কোলবালিশটা একটানে সরিয়ে দিল। কোনো বাধা রইল না আর।
সে আরও কাছে সরে এল। এতটাই কাছে যে রিয়ার বুকের ওঠানামা সে নিজের বুকে টের পাচ্ছে।
রিয়া চোখ মেলল। কিছু বলল না। বলতে পারল না। বলা উচিতও না। এই লোকটাই তো তার বাবার খুনি ছিল... এই হাতেই তো রক্ত লেগে আছে। মাথার ভেতর কথাটা বাজছে। কিন্তু শরীর? শরীরটা বিশ্বাসঘাতকতা করছে। ঝড়, অন্ধকার, ভয়, একাকীত্ব—সব মিলে তাকে বেঁধে ফেলেছে। সে বাধা দিতে পারছে না।
হরিশ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে তার কালো, পুরু ঠোঁট দুটো নামিয়ে আনল রিয়ার কাঁপতে থাকা গোলাপি ঠোঁটের উপর।
ঠোঁটে ঠোঁট মিলে গেল।
একটা গভীর, ভেজা, উষ্ণ চুমু। বাইরে তখন বাজ পড়ল কড়কড় করে। আর ঘরের ভেতর মোমবাতিটা দপ করে নিভে গেল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)