26-04-2026, 09:56 PM
পর্ব ১৮
সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে ডাইনিং টেবিলে।
আরজুদা বেগম ভোর থেকেই রান্নাঘরে। গরম গরম রুটি, আলু ভাজি, ডিম পোচ—সব সাজিয়ে দিয়েছেন রাতুলের প্লেটে। রাতুল অফিসের শার্ট গায়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসল।
ঠিক তখনই রিয়া এলো। চোখ দুটো ফোলা, চুল এলোমেলো। যেন রাতে একফোঁটাও ঘুম হয়নি।
রাতুল হেসে বলল, “শুভ সকাল, জান।”
রিয়া কোনোমতে ঠোঁট টেনে হাসল, “শুভ সকাল, জান।”
চেয়ারে বসেই সে টেবিলের উপর মাথা রেখে আবার চোখ বুজল।
আরজুদা বেগম রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, “কী রে মা? রাতে ঘুম হয়নি? অর্ক জ্বালিয়েছে বুঝি?”
‘অর্ক’ নামটা শুনে রিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কাল রাতের সোফার দৃশ্য, হরিশের মুখ, তার বুকে চেপে ধরা ঠোঁট... সব একসাথে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
মনে মনে বলল, ছেলে না, ছেলের বাবাই সারারাত জ্বালিয়েছে। ঘুমাতে দিলে তো!
ঠিক তখনই রান্নাঘরের দরজায় হরিশ এসে দাঁড়াল। হাতে তার সেই ছোট্ট প্রেশার কুকার। চোখেমুখে রাতের ক্লান্তির ছাপ নেই, বরং কেমন একটা তৃপ্তি।
রাতুল তাকে দেখে হাত নাড়ল, “আরে কাকা, আপনি! এখন আবার রান্না করার কী দরকার? আসুন না আমাদের সাথে। মা, রুটি বেশি আছে?”
আরজুদা বেগম ঘাড় নাড়লেন, “হ্যাঁ বাবা, আছে তো। আপনি বসুন।”
রিয়া সাথে সাথে মাথা তুলল। রাতুলের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “আরে রাতুল, কী দরকার? লোকটা নিজের রান্না নিজে করুক না। শুধু শুধু...”
কিন্তু আরজুদা বেগম ততক্ষণে বলে ফেলেছেন, “হ্যাঁ হরিশ ভাই, আসুন। লজ্জা পাবেন না।”
হরিশ একবার রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়ার চোখে বিরক্তি, অস্বস্তি। হরিশের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি। সে আর কথা বাড়াল না। সোজা এসে রিয়ার পাশের চেয়ারটাই টেনে বসল।
আরজুদা বেগম একটা প্লেটে দুটো রুটি, আলু ভাজি আর ডিম তুলে দিলেন হরিশের সামনে।
হরিশ খেতে শুরু করল। আয়েশ করে, ধীরে ধীরে।
রিয়া পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, দাঁতে দাঁত চেপে, “অন্যের খাবার খেতে খুব ভালো লাগে, তাই না? ফ্রি-তে পেলে...”
হরিশ রুটি ছিঁড়ে মুখে দিল। তারপর পাশে রাখা পানির গ্লাসটা তুলে ঢকঢক করে পানি খেল। গ্লাসটা নামিয়ে রিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, “রুটির সাথে তোর বুকের দুধটা পেলে, মজাটা আরও জমত।”
রিয়া চমকে উঠল। বড় বড় চোখ করে হরিশের দিকে তাকাল। টেবিলের নিচে পা দিয়ে হরিশের পায়ে একটা খোঁচা মারল। ফিসফিস করে বলল, “শরম নাই তোমার? মা আর রাতুল আছে সামনে!”
হরিশ খাওয়া থামাল না। রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিচু গলায় প্রশংসা করল, “এত মজার দুধ কাল রাতে খেয়েছি, ভোলা যাচ্ছে না রিয়া। তুই আসলেই অনেক সুন্দর... সব দিক দিয়েই।”
কথাটা শুনে রিয়ার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেল। মনে মনে একটা অদ্ভুত খুশির স্রোত বয়ে গেল, কিন্তু সাথে সাথে রাগও হলো। এই লোকটা তাকে প্রশংসা করছে? ছিঃ! তবু... ‘সুন্দর’ কথাটা কানে বাজতে লাগল।
এর মধ্যে রাতুলের খাওয়া শেষ। সে উঠে দাঁড়াল, “ওকে, আমি অফিস যাচ্ছি। তোমরা খাও।”
আরজুদা বেগম বললেন, “সাবধানে যেও বাবা। রাস্তায় জ্যাম।”
রাতুল বেরিয়ে গেল। রাতুল যেতেই আরজুদা বেগমও আঁচলে হাত মুছতে মুছতে উঠলেন, “আজ মমতা আসেনি। বাথরুমে এক গাদা কাপড় জমে আছে। আমি ধুয়ে আসি। তোমরা খেয়ে নাও।”
তিনি রান্নাঘর পেরিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেলেন।
ডাইনিং রুমে এখন শুধু দুজন।
একদিকে রিয়া—মাথা নিচু করে রুটির টুকরো নাড়াচাড়া করছে। আর অন্যদিকে হরিশ—রুটি শেষ করে এখন প্লেটের শেষ আলু ভাজিটা তুলছে, আর আড়চোখে রিয়াকে দেখছে।
টেবিলের মাঝখানে নিস্তব্ধতা। শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন কানের মধ্যে হাতুড়ি পিটছে।
রিয়া রুটির একটা কোণা ছিঁড়ে প্লেটে ঘষছে, কিন্তু মুখে তুলছে না। গলা দিয়ে কিছু নামবে না। পাশে বসে থাকা মানুষটার গরম নিঃশ্বাস সে টের পাচ্ছে।
হরিশ প্লেটের শেষ আলু ভাজিটা মুখে দিয়ে চিবুতে লাগল। চিবুনো শেষ করে সে প্লেটটা একপাশে ঠেলে দিল। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারটা টেনে রিয়ার আরও কাছে সরে এল। এতটাই কাছে যে দুজনের হাঁটুতে হাঁটু ঠেকে গেল।
রিয়া চমকে উঠে পা সরিয়ে নিতে গেল। কিন্তু হরিশ সাথে সাথে নিজের পা দিয়ে রিয়ার পা-টা চেপে ধরল টেবিলের নিচে।
রিয়া ফিসফিস করে উঠল, চোখে আগুন, “পা সরাও! কী শুরু করলে সকাল সকাল?”
হরিশ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু টেবিলের উপর রাখা রিয়ার ডান হাতটার দিকে তাকাল। তারপর নিজের খসখসে, মোটা হাতটা এনে আলতো করে রিয়ার হাতের উপর রাখল।
রিয়া যেন কারেন্ট শক খেল। হাতটা টেনে নিতে গেল, কিন্তু হরিশের মুঠি শক্ত। সে রিয়ার আঙুলগুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে নিল।
“ছাড়ো... মা চলে আসবে...” রিয়ার গলা কাঁপছে। সে বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল। পানি পড়ার শব্দ আসছে।
হরিশ রিয়ার হাতটা নিজের মুখের কাছে তুলে আনল। তারপর নাক ডুবিয়ে রিয়ার হাতের উল্টো পিঠের ঘ্রাণ নিল। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করল, “সাবানের গন্ধ... আর কাল রাতের গন্ধটাও আছে।”
রিয়ার সারা গা রি রি করে উঠল। সে হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিল। “অসভ্য! সকাল বেলাই নোংরামি?”
হরিশ হাসল। সেই বাঁকা, বিজয়ীর হাসি। সে আবার ঝুঁকে এল রিয়ার কানের কাছে। ফিসফিস করে বলল, “কাল রাতে তো ‘আস্তে’ বলেছিলি। আজ সকালে ‘আস্তে’ বলবি না?”
কথাটা শুনে রিয়ার কান গরম হয়ে গেল। রাগে, লজ্জায় সে কথা বলতে পারছে না। সে শুধু টেবিলের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল।
হরিশ এবার আরেক কাঠি সরেস। সে টেবিলের নিচ দিয়ে হাতটা নামিয়ে আনল। রিয়ার শাড়ির উপর দিয়েই তার উরুর উপর হাত রাখল। আলতো করে চাপ দিল।
রিয়া বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো লাফিয়ে উঠল। চেয়ারটা ঘষা খেয়ে শব্দ করে উঠল। সে হরিশের হাতটা খামচে ধরে সরিয়ে দিল। চোখে পানি এসে গেছে এবার।
“খবরদার! আর একবার হাত দিলে আমি চিৎকার করব। সবাইকে ডাকব।” রিয়ার গলা কাঁপছে, কিন্তু চোখে আগুন।
হরিশ হাতটা সরিয়ে নিল। কিন্তু ভয় পেল না। বরং রিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ডাক। ডেকে বল কী হয়েছে। বল যে রাতে নিজের হাতে বাঁধন খুলেও চুপ করে মজা নিয়ে ছিলি। বল যে ‘আস্তে’ বলে আদর খেয়েছিস।”
রিয়ার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। হরিশ তার দুর্বল জায়গাটা ধরে ফেলেছে।
ঠিক তখনই বাথরুম থেকে পানি বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। আরজুদা বেগমের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “রিয়া? তোর খাওয়া হলো?”
হরিশ সাথে সাথে সোজা হয়ে বসল। মুখে একদম স্বাভাবিক ভাব। যেন কিছুই হয়নি। প্লেটের দিকে তাকিয়ে ঢেকুর তুলল।
রিয়া তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল। চোখের কোণটা আঁচল দিয়ে মুছে জোর করে গলায় স্বাভাবিক স্বর আনল, “হ্যাঁ মা... এই তো শেষ।”
আরজুদা বেগম বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
টেবিলে দুজন বসে আছে। একজন প্লেটে খাবার নাড়ছে, আরেকজন খাওয়া শেষ করে ভদ্রলোকের মতো বসে আছে।
কিন্তু টেবিলের নিচে, আর দুজনের চোখের ভেতর যে ঝড় বয়ে গেল—সেটা আরজুদা বেগম টেরও পেলেন না।
হরিশের খাওয়া শেষ। সে ঢেকুর তুলে প্লেটটা একটু ঠেলে দিল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“যাই তাহলে আপা। অনেক বেলা হলো। গাড়ি নিয়ে বেরোতে হবে।” আরজুদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল হরিশ।
রিয়া প্লেটের দিকে তাকিয়ে ছিল। হরিশের যাওয়ার কথা শুনে মুখ তুলল। চোখে সেই সকালের বিরক্তি ফিরে এসেছে। সে খোঁচা মেরে বলল, “যাওয়ার সময় মনে থাকে যেন। রাত আটটার মধ্যে বাসায় ঢুকবে। আটটা এক মিনিট হলেও গেট খুলব না আমি।”
হরিশ দরজার দিকে দু’পা এগিয়ে থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে রিয়ার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি। গলাটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, যাতে শুধু রিয়াই শোনে, “হ্যাঁ বুঝলাম। তা আটটার আগে আসলে কি কোনো পুরস্কার আছে? কাল রাতের মতো?”
রিয়ার মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। টেবিলের নিচে হাত মুঠো হয়ে গেল তার। সে কিছু বলল না। শুধু চোখ দিয়ে আগুন ঝরিয়ে হরিশের দিকে তাকিয়ে রইল।
আরজুদা বেগম ততক্ষণে বেসিনে প্লেট ধুতে ব্যস্ত। তিনি কিছু শুনতে পাননি।
হরিশ রিয়ার চুপ থাকাটাকেই সম্মতি ধরে নিল। সে আর দাঁড়াল না।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। ধপ।
রিয়া সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে দেখল হরিশ গলির মোড়ে মিশে যাচ্ছে।
যতক্ষণ হরিশকে দেখা গেল, রিয়া দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জানালা থেকে সরে এসে বিড়বিড় করে বলল, “জানোয়ার, ছোটলোক... পুরস্কার চাই? তোকে আমি এমন পুরস্কার দেব...”
সে ওরনাটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিল। চোখে প্রতিজ্ঞা।
“হরিশ... তোকে আমি একদিন দেখে নেব। খুব ভালো করে দেখে নেব।”
কথাটা বলে রিয়া রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। বুকের ভেতর রাগ, ঘৃণা, আর তার সাথে মিশে থাকা একটা অচেনা অস্থিরতা।
সকালের রোদ তখন আরও চড়া হয়েছে।
সকালের নরম রোদ এসে পড়েছে ডাইনিং টেবিলে।
আরজুদা বেগম ভোর থেকেই রান্নাঘরে। গরম গরম রুটি, আলু ভাজি, ডিম পোচ—সব সাজিয়ে দিয়েছেন রাতুলের প্লেটে। রাতুল অফিসের শার্ট গায়ে দিয়ে চেয়ার টেনে বসল।
ঠিক তখনই রিয়া এলো। চোখ দুটো ফোলা, চুল এলোমেলো। যেন রাতে একফোঁটাও ঘুম হয়নি।
রাতুল হেসে বলল, “শুভ সকাল, জান।”
রিয়া কোনোমতে ঠোঁট টেনে হাসল, “শুভ সকাল, জান।”
চেয়ারে বসেই সে টেবিলের উপর মাথা রেখে আবার চোখ বুজল।
আরজুদা বেগম রিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, “কী রে মা? রাতে ঘুম হয়নি? অর্ক জ্বালিয়েছে বুঝি?”
‘অর্ক’ নামটা শুনে রিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কাল রাতের সোফার দৃশ্য, হরিশের মুখ, তার বুকে চেপে ধরা ঠোঁট... সব একসাথে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
মনে মনে বলল, ছেলে না, ছেলের বাবাই সারারাত জ্বালিয়েছে। ঘুমাতে দিলে তো!
ঠিক তখনই রান্নাঘরের দরজায় হরিশ এসে দাঁড়াল। হাতে তার সেই ছোট্ট প্রেশার কুকার। চোখেমুখে রাতের ক্লান্তির ছাপ নেই, বরং কেমন একটা তৃপ্তি।
রাতুল তাকে দেখে হাত নাড়ল, “আরে কাকা, আপনি! এখন আবার রান্না করার কী দরকার? আসুন না আমাদের সাথে। মা, রুটি বেশি আছে?”
আরজুদা বেগম ঘাড় নাড়লেন, “হ্যাঁ বাবা, আছে তো। আপনি বসুন।”
রিয়া সাথে সাথে মাথা তুলল। রাতুলের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “আরে রাতুল, কী দরকার? লোকটা নিজের রান্না নিজে করুক না। শুধু শুধু...”
কিন্তু আরজুদা বেগম ততক্ষণে বলে ফেলেছেন, “হ্যাঁ হরিশ ভাই, আসুন। লজ্জা পাবেন না।”
হরিশ একবার রিয়ার দিকে তাকাল। রিয়ার চোখে বিরক্তি, অস্বস্তি। হরিশের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি। সে আর কথা বাড়াল না। সোজা এসে রিয়ার পাশের চেয়ারটাই টেনে বসল।
আরজুদা বেগম একটা প্লেটে দুটো রুটি, আলু ভাজি আর ডিম তুলে দিলেন হরিশের সামনে।
হরিশ খেতে শুরু করল। আয়েশ করে, ধীরে ধীরে।
রিয়া পাশ থেকে ফিসফিস করে বলল, দাঁতে দাঁত চেপে, “অন্যের খাবার খেতে খুব ভালো লাগে, তাই না? ফ্রি-তে পেলে...”
হরিশ রুটি ছিঁড়ে মুখে দিল। তারপর পাশে রাখা পানির গ্লাসটা তুলে ঢকঢক করে পানি খেল। গ্লাসটা নামিয়ে রিয়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করল, “রুটির সাথে তোর বুকের দুধটা পেলে, মজাটা আরও জমত।”
রিয়া চমকে উঠল। বড় বড় চোখ করে হরিশের দিকে তাকাল। টেবিলের নিচে পা দিয়ে হরিশের পায়ে একটা খোঁচা মারল। ফিসফিস করে বলল, “শরম নাই তোমার? মা আর রাতুল আছে সামনে!”
হরিশ খাওয়া থামাল না। রুটি ছিঁড়তে ছিঁড়তে নিচু গলায় প্রশংসা করল, “এত মজার দুধ কাল রাতে খেয়েছি, ভোলা যাচ্ছে না রিয়া। তুই আসলেই অনেক সুন্দর... সব দিক দিয়েই।”
কথাটা শুনে রিয়ার গাল দুটো টকটকে লাল হয়ে গেল। মনে মনে একটা অদ্ভুত খুশির স্রোত বয়ে গেল, কিন্তু সাথে সাথে রাগও হলো। এই লোকটা তাকে প্রশংসা করছে? ছিঃ! তবু... ‘সুন্দর’ কথাটা কানে বাজতে লাগল।
এর মধ্যে রাতুলের খাওয়া শেষ। সে উঠে দাঁড়াল, “ওকে, আমি অফিস যাচ্ছি। তোমরা খাও।”
আরজুদা বেগম বললেন, “সাবধানে যেও বাবা। রাস্তায় জ্যাম।”
রাতুল বেরিয়ে গেল। রাতুল যেতেই আরজুদা বেগমও আঁচলে হাত মুছতে মুছতে উঠলেন, “আজ মমতা আসেনি। বাথরুমে এক গাদা কাপড় জমে আছে। আমি ধুয়ে আসি। তোমরা খেয়ে নাও।”
তিনি রান্নাঘর পেরিয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেলেন।
ডাইনিং রুমে এখন শুধু দুজন।
একদিকে রিয়া—মাথা নিচু করে রুটির টুকরো নাড়াচাড়া করছে। আর অন্যদিকে হরিশ—রুটি শেষ করে এখন প্লেটের শেষ আলু ভাজিটা তুলছে, আর আড়চোখে রিয়াকে দেখছে।
টেবিলের মাঝখানে নিস্তব্ধতা। শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ।
দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা যেন কানের মধ্যে হাতুড়ি পিটছে।
রিয়া রুটির একটা কোণা ছিঁড়ে প্লেটে ঘষছে, কিন্তু মুখে তুলছে না। গলা দিয়ে কিছু নামবে না। পাশে বসে থাকা মানুষটার গরম নিঃশ্বাস সে টের পাচ্ছে।
হরিশ প্লেটের শেষ আলু ভাজিটা মুখে দিয়ে চিবুতে লাগল। চিবুনো শেষ করে সে প্লেটটা একপাশে ঠেলে দিল। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারটা টেনে রিয়ার আরও কাছে সরে এল। এতটাই কাছে যে দুজনের হাঁটুতে হাঁটু ঠেকে গেল।
রিয়া চমকে উঠে পা সরিয়ে নিতে গেল। কিন্তু হরিশ সাথে সাথে নিজের পা দিয়ে রিয়ার পা-টা চেপে ধরল টেবিলের নিচে।
রিয়া ফিসফিস করে উঠল, চোখে আগুন, “পা সরাও! কী শুরু করলে সকাল সকাল?”
হরিশ কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু টেবিলের উপর রাখা রিয়ার ডান হাতটার দিকে তাকাল। তারপর নিজের খসখসে, মোটা হাতটা এনে আলতো করে রিয়ার হাতের উপর রাখল।
রিয়া যেন কারেন্ট শক খেল। হাতটা টেনে নিতে গেল, কিন্তু হরিশের মুঠি শক্ত। সে রিয়ার আঙুলগুলো নিজের আঙুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে নিল।
“ছাড়ো... মা চলে আসবে...” রিয়ার গলা কাঁপছে। সে বাথরুমের দরজার দিকে তাকাল। পানি পড়ার শব্দ আসছে।
হরিশ রিয়ার হাতটা নিজের মুখের কাছে তুলে আনল। তারপর নাক ডুবিয়ে রিয়ার হাতের উল্টো পিঠের ঘ্রাণ নিল। চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করল, “সাবানের গন্ধ... আর কাল রাতের গন্ধটাও আছে।”
রিয়ার সারা গা রি রি করে উঠল। সে হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিল। “অসভ্য! সকাল বেলাই নোংরামি?”
হরিশ হাসল। সেই বাঁকা, বিজয়ীর হাসি। সে আবার ঝুঁকে এল রিয়ার কানের কাছে। ফিসফিস করে বলল, “কাল রাতে তো ‘আস্তে’ বলেছিলি। আজ সকালে ‘আস্তে’ বলবি না?”
কথাটা শুনে রিয়ার কান গরম হয়ে গেল। রাগে, লজ্জায় সে কথা বলতে পারছে না। সে শুধু টেবিলের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল।
হরিশ এবার আরেক কাঠি সরেস। সে টেবিলের নিচ দিয়ে হাতটা নামিয়ে আনল। রিয়ার শাড়ির উপর দিয়েই তার উরুর উপর হাত রাখল। আলতো করে চাপ দিল।
রিয়া বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো লাফিয়ে উঠল। চেয়ারটা ঘষা খেয়ে শব্দ করে উঠল। সে হরিশের হাতটা খামচে ধরে সরিয়ে দিল। চোখে পানি এসে গেছে এবার।
“খবরদার! আর একবার হাত দিলে আমি চিৎকার করব। সবাইকে ডাকব।” রিয়ার গলা কাঁপছে, কিন্তু চোখে আগুন।
হরিশ হাতটা সরিয়ে নিল। কিন্তু ভয় পেল না। বরং রিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, “ডাক। ডেকে বল কী হয়েছে। বল যে রাতে নিজের হাতে বাঁধন খুলেও চুপ করে মজা নিয়ে ছিলি। বল যে ‘আস্তে’ বলে আদর খেয়েছিস।”
রিয়ার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। হরিশ তার দুর্বল জায়গাটা ধরে ফেলেছে।
ঠিক তখনই বাথরুম থেকে পানি বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। আরজুদা বেগমের গলার আওয়াজ পাওয়া গেল, “রিয়া? তোর খাওয়া হলো?”
হরিশ সাথে সাথে সোজা হয়ে বসল। মুখে একদম স্বাভাবিক ভাব। যেন কিছুই হয়নি। প্লেটের দিকে তাকিয়ে ঢেকুর তুলল।
রিয়া তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল। চোখের কোণটা আঁচল দিয়ে মুছে জোর করে গলায় স্বাভাবিক স্বর আনল, “হ্যাঁ মা... এই তো শেষ।”
আরজুদা বেগম বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
টেবিলে দুজন বসে আছে। একজন প্লেটে খাবার নাড়ছে, আরেকজন খাওয়া শেষ করে ভদ্রলোকের মতো বসে আছে।
কিন্তু টেবিলের নিচে, আর দুজনের চোখের ভেতর যে ঝড় বয়ে গেল—সেটা আরজুদা বেগম টেরও পেলেন না।
হরিশের খাওয়া শেষ। সে ঢেকুর তুলে প্লেটটা একটু ঠেলে দিল। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“যাই তাহলে আপা। অনেক বেলা হলো। গাড়ি নিয়ে বেরোতে হবে।” আরজুদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল হরিশ।
রিয়া প্লেটের দিকে তাকিয়ে ছিল। হরিশের যাওয়ার কথা শুনে মুখ তুলল। চোখে সেই সকালের বিরক্তি ফিরে এসেছে। সে খোঁচা মেরে বলল, “যাওয়ার সময় মনে থাকে যেন। রাত আটটার মধ্যে বাসায় ঢুকবে। আটটা এক মিনিট হলেও গেট খুলব না আমি।”
হরিশ দরজার দিকে দু’পা এগিয়ে থমকে দাঁড়াল। ঘাড় ঘুরিয়ে রিয়ার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা বাঁকা হাসি। গলাটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, যাতে শুধু রিয়াই শোনে, “হ্যাঁ বুঝলাম। তা আটটার আগে আসলে কি কোনো পুরস্কার আছে? কাল রাতের মতো?”
রিয়ার মুখটা মুহূর্তে লাল হয়ে গেল। টেবিলের নিচে হাত মুঠো হয়ে গেল তার। সে কিছু বলল না। শুধু চোখ দিয়ে আগুন ঝরিয়ে হরিশের দিকে তাকিয়ে রইল।
আরজুদা বেগম ততক্ষণে বেসিনে প্লেট ধুতে ব্যস্ত। তিনি কিছু শুনতে পাননি।
হরিশ রিয়ার চুপ থাকাটাকেই সম্মতি ধরে নিল। সে আর দাঁড়াল না।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো। ধপ।
রিয়া সাথে সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। জানালা দিয়ে দেখল হরিশ গলির মোড়ে মিশে যাচ্ছে।
যতক্ষণ হরিশকে দেখা গেল, রিয়া দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জানালা থেকে সরে এসে বিড়বিড় করে বলল, “জানোয়ার, ছোটলোক... পুরস্কার চাই? তোকে আমি এমন পুরস্কার দেব...”
সে ওরনাটা কোমরে ভালো করে গুঁজে নিল। চোখে প্রতিজ্ঞা।
“হরিশ... তোকে আমি একদিন দেখে নেব। খুব ভালো করে দেখে নেব।”
কথাটা বলে রিয়া রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। বুকের ভেতর রাগ, ঘৃণা, আর তার সাথে মিশে থাকা একটা অচেনা অস্থিরতা।
সকালের রোদ তখন আরও চড়া হয়েছে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)