26-04-2026, 12:07 AM
পর্ব ১৪
১৮ মাস পার হয়ে গেছে...
সময় সব ক্ষত শুকিয়ে দেয় না, কিন্তু ঢেকে দেয়। রহমান মিয়ার মৃত্যু, হরিশের গ্রেফতার—সবকিছু যেন একটা দুঃস্বপ্নের মতো ঝাপসা হয়ে এসেছে।
এর মাঝে রিয়ার কোল জুড়ে এসেছে এক ফুটফুটে ছেলে সন্তান। শাশুড়ি রিনা বেগম আদর করে নাতির নাম রেখেছেন **অর্ক**। ছোট্ট অর্ক, মাত্র কয়েক মাস বয়স। রিয়ার পুরো পৃথিবী এখন এই ছোট্ট প্রাণটাকে ঘিরে।
বাবা মারা যাওয়ার পর আরজুদা বেগম একা হয়ে পড়েছেন। বিশাল বাড়িটা তার কাছে এখন খাঁ খাঁ করে। মায়ের কষ্ট বুঝতে পেরে রিয়া শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে অনুমতি চেয়েছিল—মায়ের সাথে বাবার বাড়িতে কিছুদিন থাকতে চায়। আনোয়ার মিয়া আর রিনা বেগম না করেননি। তারাও বোঝেন, এই সময়টায় মা-মেয়ের একে অপরকে দরকার।
রাতুল অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই শ্বশুরবাড়িতে আসে। ছেলেকে কোলে নেয়, রিয়ার সাথে গল্প করে, শাশুড়ির খোঁজখবর নেয়। জীবনটা এখন মোটামুটি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে।
শুধু আরজুদা বেগমের বুকের ভেতরটা এখনো হাহাকার করে। স্বামীকে এভাবে হারানোর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। রাতের বেলা প্রায়ই তিনি বারান্দায় একা বসে থাকেন।
---
এক দুপুরবেলা।
রিয়া অনেক কষ্টে অর্ককে ঘুম পাড়িয়েছে। ছেলেটা আজকাল খুব জ্বালায়। দোলনায় শুইয়ে দিয়ে গায়ের চাদরটা টেনে দিল। ক্লান্তিতে রিয়ার চোখও বুঝে আসছে।
নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “যাক বাবা, এবার একটু শান্তি।”
ঠিক তখনই দরজায় হন্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়াল কাজের মেয়ে মমতা। হাঁপাচ্ছে, চোখেমুখে ভয়।
“ছোট ম্যাডাম, ছোট ম্যাডাম!”
রিয়া বিরক্ত হয়ে তাকাল, “কী হয়েছে খালা? এভাবে হাঁপাচ্ছো কেন? অর্কটা মাত্র ঘুমাল।”
মমতা ঢোক গিলে বলল, “ছোট ম্যাডাম, বিরাট সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
রিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। “কী হয়েছে? খুলে বলবে তো?”
মমতা ফিসফিস করে বলল, “নিচে... নিচে বাসায় ওই যে হরিশ ভাই ছিল না? উনি এসেছে। সাথে পুলিশ আর উকিল নিয়ে এসেছে।”
‘হরিশ’ নামটা শুনে রিয়া কয়েক মুহূর্ত থমকে গেল। ১৮ মাসে অনেক কিছু বদলে গেছে। অনেক কিছু ভুলেও গেছে। মাথাটা কাজ করছে না।
রিয়া ভুরু কুঁচকে বলল, “কে এসেছে? কোন হরিশ?”
মমতা আরও ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “আরে আগে যে হরিশ ভাই আমাদের বাসায় কাজ করত, সেই হরিশ ভাই। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে মনে হয়।”
কথাটা শুনে রিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হাত-পা হঠাৎ অবশ হয়ে আসছে।
সেই হরিশ... যে তার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। যে তার পেটের সন্তান অর্কের আসল বাবা। যার জন্য তার বাবা রহমান মিয়া আজ কবরে শুয়ে আছেন।
রিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। দৌড়ে নিচতলায় নেমে গেল।
ড্রয়িং রুমে ঢুকেই তার পা জমে গেল।
সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে হরিশ। পরনে দামি শার্ট-প্যান্ট, চোখে কালো চশমা। জেলের সেই উস্কোখুস্কো চেহারা আর নেই। এখন তাকে আত্মবিশ্বাসী, ধূর্ত লাগছে। তার একপাশে দাঁড়িয়ে দুজন পুলিশ, আরেকপাশে কোট-টাই পরা একজন উকিল।
হরিশ রিয়াকে দেখে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল।
রিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই সেই হরিশ। তার ধ্বংসের কারণ। তার সন্তানের বাবা। ১৮ মাস পর আবার তার সামনে, পুলিশ আর উকিল নিয়ে।
কিন্তু কেন? কী চায় সে এখন?
১৮ মাস পর সেই চেহারা, সেই বাঁকা হাসি। রিয়ার ভেতরটা ঘৃণায় রি রি করে উঠল।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চিৎকার করে উঠল, “আপনি... আপনি এখানে? কী সাহস আপনার? বের হন! এখনই বের হন এখান থেকে!”
চিৎকার শুনে আরজুদা বেগমও দৌড়ে এলেন। হরিশকে দেখে তার মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী এই লোকটা আবার তার বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়েছে! রাতুল এখন অফিসে। এই মুহূর্তে তারা দুই অসহায় নারী ছাড়া আর কেউ নেই।
হরিশ ধীরে ধীরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার গায়ের দামি শার্ট-প্যান্ট আর চোখের কালো চশমা তার সাথে একদমই যাচ্ছে না। জেল থেকে বের হলেও শরীরটা ভেঙে গেছে, গাল বসে গেছে, চোখের নিচে কালি। কিন্তু চাহনিতে সেই পুরনো ধূর্ততা।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আমি জানতাম রিয়া মনি, আপনি আমাকে দেখে এভাবেই চেঁচাবেন। তাই আগে থেকেই ব্যবস্থা করে এসেছি।” পুলিশ দুজনের দিকে ইশারা করে বলল, “উকিল সাহেব, আপনিই বরং ম্যাডামকে বুঝিয়ে বলুন।”
কোট-টাই পরা উকিলটা একটা ফাইল খুলে এগিয়ে এল। রিয়ার দিকে একটা স্ট্যাম্প পেপার বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ম্যাডাম, এই বাড়িতে হরিশ সাহেবের আইনগত অংশ আছে। আপনার বাবা, মরহুম রহমান মিয়া, মৃত্যুর আগে এই উইল করে গেছেন। এখানে স্পষ্ট লেখা আছে—বাড়ির একটা অংশ হরিশ সাহেব পাবেন, আর বাকি অংশ আপনার, মানে তার একমাত্র মেয়ের।”
কথাটা শুনে রিয়ার মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে কাঁপা হাতে দলিলটা নিল। চোখ বুলাতে লাগল লাইনগুলোর উপর। পাশ থেকে আরজুদা বেগম ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “কী লেখা রে রিয়া? উনি কি সত্যি বলছে?”
দলিলটা পড়া শেষ করে রিয়ার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। সে কাগজটা উকিলের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, “এটা মিথ্যা! পুরোপুরি মিথ্যা! এই লোক আমার বাবাকে ঠকিয়ে, নেশা করিয়ে জোর করে এই বাড়ি লিখিয়ে নিয়েছে!”
উকিল শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, “ম্যাডাম, আবেগ দিয়ে আইন চলে না। এটা রেজিস্ট্রি করা দলিল, আপনার বাবার সই আর টিপসই আছে। আপনি যদি এটা অস্বীকার করেন, তবে সেটা আদালত অবমাননার শামিল হবে।”
আসলে রহমান মিয়া শেষের দিকে হরিশের সাথে মদ খেতে খেতে একেবারে বশ হয়ে গিয়েছিলেন। জামাই রাতুলকে তিনি মন থেকে কখনোই পছন্দ করেননি, বিশ্বাসও করতেন না। তার চেয়ে হরিশকে তিনি নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন, ভরসা করতেন। সেই দুর্বল মুহূর্তেই হরিশ কৌশলে এই দলিলে সই করিয়ে নিয়েছিল।
রিয়া আবার হরিশের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় থুথু ফেলার মতো করে বলল, “আপনি একটা প্রতারক! আমার বাবাকে নেশায় ডুবিয়ে, ঠকিয়ে আমাদের বাড়িটা লিখে নিয়েছেন!”
উকিল এবার গলার স্বর আরও কঠিন করল, “ম্যাডাম, আপনাকে শেষবারের মতো সাবধান করছি। আপনি যদি এই নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন, আদালতের রায় আপনার বিরুদ্ধে যেতে পারে। তখন আপনার পুরো বাড়িটাই হরিশ সাহেবের নামে চলে যেতে পারে। কারণ হরিশ সাহেব আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আইনি পথে এসেছেন, আর আপনি তাকে অপমান করছেন।”
উকিলের কথাগুলো যেন চাবুকের মতো রিয়ার গায়ে লাগল। রাগে, অপমানে, অসহায়ত্বে তার সারা শরীর কাঁপছে। চিৎকার করে সব ফাঁস করে দিতে ইচ্ছে করছে—এই লোকটা তার সন্তানের বাবা, এই লোকটা তার বাবার খুনি। কিন্তু সে জানে, এখন মুখ খুললে নিজের সংসার, নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ সব শেষ হয়ে যাবে।
রিয়ার চোখে পানি টলমল করছে, কিন্তু গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু ঘৃণা ভরা চোখে হরিশের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর জমা রাগটা পাথর হয়ে চেপে বসল।
হরিশ চশমার ফাঁক দিয়ে রিয়াকে দেখছে। তার ঠোঁটে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসি। সে জানে, এই দানে সে জিতে গেছে।
রাত তখন প্রায় নয়টা।
অফিস থেকে ফিরেই রাতুল সব শুনেছে। রিয়ার ভাঙা গলা, আরজুদা বেগমের ফ্যাকাশে মুখ—সবকিছু দেখে সে বুঝে গেছে পরিস্থিতি কতটা জটিল। সে আর দেরি করেনি।
এখন ড্রয়িং রুমে মুখোমুখি বসে আছে চারজন। রাতুল, রিয়া, আরজুদা বেগম, আর সোফার এক কোণায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে হরিশ। মমতা দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের বাতাস ভারী, থমথমে। বেডরুমে দোলনায় অর্ক ঘুমাচ্ছে।
রাতুল সবার দিকে একবার তাকাল। তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় কথা শুরু করল, “দেখুন, আমরা সবাই এখন এক ছাদের নিচে। ভবিষ্যতেও থাকতে হবে। তাই আমাদের মধ্যে কোনো রাখঢাক থাকা উচিত না। কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
সে হরিশের দিকে তাকাল, “হরিশ কাকা, আইন অনুযায়ী আপনি এই বাড়ির আংশিক মালিক। এটা আমরা মানতে বাধ্য। আপনাকে নিয়েই আমাদের থাকতে হবে। এটা নিয়ে আমরা কিছু করতে পারব না, আর করতেও চাই না।”
তারপর রিয়ার দিকে ফিরল রাতুল, “কিন্তু হরিশ কাকা, আপনাকেও মনে রাখতে হবে—রিয়াও এই বাড়ির আংশিক মালিক। শুধু মালিক না, এই বাড়ির মেয়ে। আমার স্ত্রী।”
রাতুলের গলাটা এবার একটু শক্ত হলো, “আমার শ্বশুর, রহমান মিয়া, এখন আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা যদি সত্যিই তাকে সম্মান করি, তার আত্মার শান্তি চাই—তবে এই সম্পত্তি নিয়ে আর কোনো বিবাদ, কোনো অশান্তি করব না। এটাই আমি আপনাদের দুজনের কাছে আশা করি।”
একটু থেমে রাতুল বলল, “এবার আপনারা দুজন বলুন। আপনাদের যা বলার আছে, খোলাখুলি বলুন। আমি সব মিটমাট করে নিতে চাই।”
ঘরে পিনপতন নীরবতা।
হরিশ ধীরে ধীরে রিয়ার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসিটা খেলে গেল। চশমার কাচের পেছনে চোখ দুটো চকচক করছে। সে এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল যেন কত বড় ত্যাগ স্বীকার করছে।
“আমি সব মেনে নিয়েছি, রাতুল। বড় সাহেবের বাড়ি, বড় সাহেবের মেয়ে... আমি আর কী বলব? আমি শান্তি চাই।”
রিয়া হরিশের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে আগুন জ্বলছে। মনে হচ্ছে এখনই ছুটে গিয়ে লোকটার গলা টিপে ধরবে। এই লোকটার জন্য তার বাবা মারা গেছে। এই লোকটাই তার শরীরটাকে নোংরা করেছে। এই লোকটাই তার সন্তানের বাবা।
কিন্তু রিয়া জানে, চিৎকার করে লাভ নেই। আইন, সমাজ, সংসার, সন্তান—সবকিছু তার হাত-পা বেঁধে রেখেছে। রাতুলের সামনে, মায়ের সামনে সে কিছুই ফাঁস করতে পারবে না।
রিয়া বুকের ভেতর সব ঘৃণা, সব রাগ চেপে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমিও... আমিও সব মেনে নিয়েছি।”
কথাটা বলার সময় তার গলাটা একটু কেঁপে গেল। আরজুদা বেগম মেয়ের পাশে বসে শুধু আঁচলে মুখ ঢাকলেন।
রাতুল দুজনের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে ভাবল, ঝামেলা বুঝি মিটে গেল।
সে জানে না, এই ‘মেনে নেওয়া’র আড়ালে কী ঝড় জমা হচ্ছে। রিয়ার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ যা করে, রিয়াও তাই করল—আপাতত মাথা নিচু করল।
কিন্তু হরিশের চোখের ভাষা রিয়া ঠিকই পড়তে পারছে। এই যুদ্ধ সবে শুরু।
১৮ মাস পার হয়ে গেছে...
সময় সব ক্ষত শুকিয়ে দেয় না, কিন্তু ঢেকে দেয়। রহমান মিয়ার মৃত্যু, হরিশের গ্রেফতার—সবকিছু যেন একটা দুঃস্বপ্নের মতো ঝাপসা হয়ে এসেছে।
এর মাঝে রিয়ার কোল জুড়ে এসেছে এক ফুটফুটে ছেলে সন্তান। শাশুড়ি রিনা বেগম আদর করে নাতির নাম রেখেছেন **অর্ক**। ছোট্ট অর্ক, মাত্র কয়েক মাস বয়স। রিয়ার পুরো পৃথিবী এখন এই ছোট্ট প্রাণটাকে ঘিরে।
বাবা মারা যাওয়ার পর আরজুদা বেগম একা হয়ে পড়েছেন। বিশাল বাড়িটা তার কাছে এখন খাঁ খাঁ করে। মায়ের কষ্ট বুঝতে পেরে রিয়া শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে অনুমতি চেয়েছিল—মায়ের সাথে বাবার বাড়িতে কিছুদিন থাকতে চায়। আনোয়ার মিয়া আর রিনা বেগম না করেননি। তারাও বোঝেন, এই সময়টায় মা-মেয়ের একে অপরকে দরকার।
রাতুল অফিস শেষে প্রায় প্রতিদিনই শ্বশুরবাড়িতে আসে। ছেলেকে কোলে নেয়, রিয়ার সাথে গল্প করে, শাশুড়ির খোঁজখবর নেয়। জীবনটা এখন মোটামুটি স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে।
শুধু আরজুদা বেগমের বুকের ভেতরটা এখনো হাহাকার করে। স্বামীকে এভাবে হারানোর শূন্যতা কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। রাতের বেলা প্রায়ই তিনি বারান্দায় একা বসে থাকেন।
---
এক দুপুরবেলা।
রিয়া অনেক কষ্টে অর্ককে ঘুম পাড়িয়েছে। ছেলেটা আজকাল খুব জ্বালায়। দোলনায় শুইয়ে দিয়ে গায়ের চাদরটা টেনে দিল। ক্লান্তিতে রিয়ার চোখও বুঝে আসছে।
নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “যাক বাবা, এবার একটু শান্তি।”
ঠিক তখনই দরজায় হন্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়াল কাজের মেয়ে মমতা। হাঁপাচ্ছে, চোখেমুখে ভয়।
“ছোট ম্যাডাম, ছোট ম্যাডাম!”
রিয়া বিরক্ত হয়ে তাকাল, “কী হয়েছে খালা? এভাবে হাঁপাচ্ছো কেন? অর্কটা মাত্র ঘুমাল।”
মমতা ঢোক গিলে বলল, “ছোট ম্যাডাম, বিরাট সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
রিয়ার বুকটা ধক করে উঠল। “কী হয়েছে? খুলে বলবে তো?”
মমতা ফিসফিস করে বলল, “নিচে... নিচে বাসায় ওই যে হরিশ ভাই ছিল না? উনি এসেছে। সাথে পুলিশ আর উকিল নিয়ে এসেছে।”
‘হরিশ’ নামটা শুনে রিয়া কয়েক মুহূর্ত থমকে গেল। ১৮ মাসে অনেক কিছু বদলে গেছে। অনেক কিছু ভুলেও গেছে। মাথাটা কাজ করছে না।
রিয়া ভুরু কুঁচকে বলল, “কে এসেছে? কোন হরিশ?”
মমতা আরও ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “আরে আগে যে হরিশ ভাই আমাদের বাসায় কাজ করত, সেই হরিশ ভাই। জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে মনে হয়।”
কথাটা শুনে রিয়ার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। হাত-পা হঠাৎ অবশ হয়ে আসছে।
সেই হরিশ... যে তার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। যে তার পেটের সন্তান অর্কের আসল বাবা। যার জন্য তার বাবা রহমান মিয়া আজ কবরে শুয়ে আছেন।
রিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। দৌড়ে নিচতলায় নেমে গেল।
ড্রয়িং রুমে ঢুকেই তার পা জমে গেল।
সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে হরিশ। পরনে দামি শার্ট-প্যান্ট, চোখে কালো চশমা। জেলের সেই উস্কোখুস্কো চেহারা আর নেই। এখন তাকে আত্মবিশ্বাসী, ধূর্ত লাগছে। তার একপাশে দাঁড়িয়ে দুজন পুলিশ, আরেকপাশে কোট-টাই পরা একজন উকিল।
হরিশ রিয়াকে দেখে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল।
রিয়ার দম বন্ধ হয়ে আসছে। এই সেই হরিশ। তার ধ্বংসের কারণ। তার সন্তানের বাবা। ১৮ মাস পর আবার তার সামনে, পুলিশ আর উকিল নিয়ে।
কিন্তু কেন? কী চায় সে এখন?
১৮ মাস পর সেই চেহারা, সেই বাঁকা হাসি। রিয়ার ভেতরটা ঘৃণায় রি রি করে উঠল।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চিৎকার করে উঠল, “আপনি... আপনি এখানে? কী সাহস আপনার? বের হন! এখনই বের হন এখান থেকে!”
চিৎকার শুনে আরজুদা বেগমও দৌড়ে এলেন। হরিশকে দেখে তার মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী এই লোকটা আবার তার বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়েছে! রাতুল এখন অফিসে। এই মুহূর্তে তারা দুই অসহায় নারী ছাড়া আর কেউ নেই।
হরিশ ধীরে ধীরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার গায়ের দামি শার্ট-প্যান্ট আর চোখের কালো চশমা তার সাথে একদমই যাচ্ছে না। জেল থেকে বের হলেও শরীরটা ভেঙে গেছে, গাল বসে গেছে, চোখের নিচে কালি। কিন্তু চাহনিতে সেই পুরনো ধূর্ততা।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আমি জানতাম রিয়া মনি, আপনি আমাকে দেখে এভাবেই চেঁচাবেন। তাই আগে থেকেই ব্যবস্থা করে এসেছি।” পুলিশ দুজনের দিকে ইশারা করে বলল, “উকিল সাহেব, আপনিই বরং ম্যাডামকে বুঝিয়ে বলুন।”
কোট-টাই পরা উকিলটা একটা ফাইল খুলে এগিয়ে এল। রিয়ার দিকে একটা স্ট্যাম্প পেপার বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ম্যাডাম, এই বাড়িতে হরিশ সাহেবের আইনগত অংশ আছে। আপনার বাবা, মরহুম রহমান মিয়া, মৃত্যুর আগে এই উইল করে গেছেন। এখানে স্পষ্ট লেখা আছে—বাড়ির একটা অংশ হরিশ সাহেব পাবেন, আর বাকি অংশ আপনার, মানে তার একমাত্র মেয়ের।”
কথাটা শুনে রিয়ার মাথায় যেন বাজ পড়ল। সে কাঁপা হাতে দলিলটা নিল। চোখ বুলাতে লাগল লাইনগুলোর উপর। পাশ থেকে আরজুদা বেগম ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “কী লেখা রে রিয়া? উনি কি সত্যি বলছে?”
দলিলটা পড়া শেষ করে রিয়ার চোখে আগুন জ্বলে উঠল। সে কাগজটা উকিলের দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, “এটা মিথ্যা! পুরোপুরি মিথ্যা! এই লোক আমার বাবাকে ঠকিয়ে, নেশা করিয়ে জোর করে এই বাড়ি লিখিয়ে নিয়েছে!”
উকিল শান্ত কিন্তু কঠিন গলায় বলল, “ম্যাডাম, আবেগ দিয়ে আইন চলে না। এটা রেজিস্ট্রি করা দলিল, আপনার বাবার সই আর টিপসই আছে। আপনি যদি এটা অস্বীকার করেন, তবে সেটা আদালত অবমাননার শামিল হবে।”
আসলে রহমান মিয়া শেষের দিকে হরিশের সাথে মদ খেতে খেতে একেবারে বশ হয়ে গিয়েছিলেন। জামাই রাতুলকে তিনি মন থেকে কখনোই পছন্দ করেননি, বিশ্বাসও করতেন না। তার চেয়ে হরিশকে তিনি নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন, ভরসা করতেন। সেই দুর্বল মুহূর্তেই হরিশ কৌশলে এই দলিলে সই করিয়ে নিয়েছিল।
রিয়া আবার হরিশের দিকে তাকিয়ে ঘৃণায় থুথু ফেলার মতো করে বলল, “আপনি একটা প্রতারক! আমার বাবাকে নেশায় ডুবিয়ে, ঠকিয়ে আমাদের বাড়িটা লিখে নিয়েছেন!”
উকিল এবার গলার স্বর আরও কঠিন করল, “ম্যাডাম, আপনাকে শেষবারের মতো সাবধান করছি। আপনি যদি এই নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন, আদালতের রায় আপনার বিরুদ্ধে যেতে পারে। তখন আপনার পুরো বাড়িটাই হরিশ সাহেবের নামে চলে যেতে পারে। কারণ হরিশ সাহেব আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে আইনি পথে এসেছেন, আর আপনি তাকে অপমান করছেন।”
উকিলের কথাগুলো যেন চাবুকের মতো রিয়ার গায়ে লাগল। রাগে, অপমানে, অসহায়ত্বে তার সারা শরীর কাঁপছে। চিৎকার করে সব ফাঁস করে দিতে ইচ্ছে করছে—এই লোকটা তার সন্তানের বাবা, এই লোকটা তার বাবার খুনি। কিন্তু সে জানে, এখন মুখ খুললে নিজের সংসার, নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ সব শেষ হয়ে যাবে।
রিয়ার চোখে পানি টলমল করছে, কিন্তু গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না। সে শুধু ঘৃণা ভরা চোখে হরিশের দিকে তাকিয়ে রইল। বুকের ভেতর জমা রাগটা পাথর হয়ে চেপে বসল।
হরিশ চশমার ফাঁক দিয়ে রিয়াকে দেখছে। তার ঠোঁটে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসি। সে জানে, এই দানে সে জিতে গেছে।
রাত তখন প্রায় নয়টা।
অফিস থেকে ফিরেই রাতুল সব শুনেছে। রিয়ার ভাঙা গলা, আরজুদা বেগমের ফ্যাকাশে মুখ—সবকিছু দেখে সে বুঝে গেছে পরিস্থিতি কতটা জটিল। সে আর দেরি করেনি।
এখন ড্রয়িং রুমে মুখোমুখি বসে আছে চারজন। রাতুল, রিয়া, আরজুদা বেগম, আর সোফার এক কোণায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে হরিশ। মমতা দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের বাতাস ভারী, থমথমে। বেডরুমে দোলনায় অর্ক ঘুমাচ্ছে।
রাতুল সবার দিকে একবার তাকাল। তারপর শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় কথা শুরু করল, “দেখুন, আমরা সবাই এখন এক ছাদের নিচে। ভবিষ্যতেও থাকতে হবে। তাই আমাদের মধ্যে কোনো রাখঢাক থাকা উচিত না। কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার।”
সে হরিশের দিকে তাকাল, “হরিশ কাকা, আইন অনুযায়ী আপনি এই বাড়ির আংশিক মালিক। এটা আমরা মানতে বাধ্য। আপনাকে নিয়েই আমাদের থাকতে হবে। এটা নিয়ে আমরা কিছু করতে পারব না, আর করতেও চাই না।”
তারপর রিয়ার দিকে ফিরল রাতুল, “কিন্তু হরিশ কাকা, আপনাকেও মনে রাখতে হবে—রিয়াও এই বাড়ির আংশিক মালিক। শুধু মালিক না, এই বাড়ির মেয়ে। আমার স্ত্রী।”
রাতুলের গলাটা এবার একটু শক্ত হলো, “আমার শ্বশুর, রহমান মিয়া, এখন আর আমাদের মাঝে নেই। আমরা যদি সত্যিই তাকে সম্মান করি, তার আত্মার শান্তি চাই—তবে এই সম্পত্তি নিয়ে আর কোনো বিবাদ, কোনো অশান্তি করব না। এটাই আমি আপনাদের দুজনের কাছে আশা করি।”
একটু থেমে রাতুল বলল, “এবার আপনারা দুজন বলুন। আপনাদের যা বলার আছে, খোলাখুলি বলুন। আমি সব মিটমাট করে নিতে চাই।”
ঘরে পিনপতন নীরবতা।
হরিশ ধীরে ধীরে রিয়ার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা শয়তানি হাসিটা খেলে গেল। চশমার কাচের পেছনে চোখ দুটো চকচক করছে। সে এমনভাবে মাথা ঝাঁকাল যেন কত বড় ত্যাগ স্বীকার করছে।
“আমি সব মেনে নিয়েছি, রাতুল। বড় সাহেবের বাড়ি, বড় সাহেবের মেয়ে... আমি আর কী বলব? আমি শান্তি চাই।”
রিয়া হরিশের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে আগুন জ্বলছে। মনে হচ্ছে এখনই ছুটে গিয়ে লোকটার গলা টিপে ধরবে। এই লোকটার জন্য তার বাবা মারা গেছে। এই লোকটাই তার শরীরটাকে নোংরা করেছে। এই লোকটাই তার সন্তানের বাবা।
কিন্তু রিয়া জানে, চিৎকার করে লাভ নেই। আইন, সমাজ, সংসার, সন্তান—সবকিছু তার হাত-পা বেঁধে রেখেছে। রাতুলের সামনে, মায়ের সামনে সে কিছুই ফাঁস করতে পারবে না।
রিয়া বুকের ভেতর সব ঘৃণা, সব রাগ চেপে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “আমিও... আমিও সব মেনে নিয়েছি।”
কথাটা বলার সময় তার গলাটা একটু কেঁপে গেল। আরজুদা বেগম মেয়ের পাশে বসে শুধু আঁচলে মুখ ঢাকলেন।
রাতুল দুজনের দিকে তাকিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে ভাবল, ঝামেলা বুঝি মিটে গেল।
সে জানে না, এই ‘মেনে নেওয়া’র আড়ালে কী ঝড় জমা হচ্ছে। রিয়ার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ যা করে, রিয়াও তাই করল—আপাতত মাথা নিচু করল।
কিন্তু হরিশের চোখের ভাষা রিয়া ঠিকই পড়তে পারছে। এই যুদ্ধ সবে শুরু।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)