20-04-2026, 08:04 PM
Chapter 5
❝ দ্বৈত নৈতিকতা ❞
Morality Has Two Faces
ব্যথা কমানোর প্রথম চেষ্টার সাথেই জন্ম নিয়েছিল চিকিৎসা শাস্ত্র। আর সেই মুহূর্ত থেকেই কিছু মানুষ সমাজের ভিড় থেকে আলাদা হয়ে গেল—যাদের আমরা আজ চিনি ‘চিকিৎসক’ নামে। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, জ্ঞান আর ক্ষমতার মাঝখানে ঝুলে আছে এক অতি সূক্ষ্ম রেখা।
পঁচিশ শতাব্দী আগে হিপোক্রেটিস এক পবিত্র শপথের জন্ম দিয়েছিলেন— 'Primum non nocere' (প্রথমে কোনো ক্ষতি করো না)। এক কোমল উপদেশ, যতক্ষণ না তুমি বুঝতে পারছ যে একই হাত কাউকে স্পর্শ দিয়ে সারিয়ে তুলতে পারে, আবার সেই হাতই কারো টুঁটি টিপে ধরতে পারে। হাতের এই চলনকে নিয়ন্ত্রণ করে এক অদৃশ্য শক্তি— যার নাম 'অভিপ্রায়'।
জ্ঞান যত বাড়ে, ক্ষমতা বাড়ে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে। আর ক্ষমতা যখন অসীম হয়ে যায়, তখন নীতি আর আদর্শের সেই সরু সুতোটা এক নিমেষে ছিঁড়ে যায়। একজন আদর্শ চিকিৎসকের কাছে রোগী হলো ঈশ্বরের সৃষ্টি—সেবা যার শেষ কথা। কিন্তু সেই একই হাসপাতালের করিডোরে, অন্য একজোড়া চোখের কাছে রোগী স্রেফ এক টুকরো মাংস; এক জীবন্ত পরীক্ষাগার। একজন ডাক্তার জানে কীভাবে থমকে যাওয়া হার্ট চালু করতে হয়, আবার সে-ই জানে কোন ওষুধের সামান্য হেরফেরে একটা সচল প্রাণ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।
জ্ঞান যখন বিকৃত লালসা আর মন্দ উদ্দেশ্যের সাথে হাত মেলায়, তখন জন্ম নেয় এক 'মেডিক্যাল মনস্টার'।
মেঘলার ঘরের দরজা বন্ধ, কিন্তু বাইরের ড্রয়িংরুম থেকে বাবার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর দরজার ফাঁক গলে ভেতরে আসছিল। সায়ক সিনহার সেই চিরচেনা মেডিক্যাল ফিলোসফি। মেঘলা সেদিকে কান দিল না; তার চোখ তখন ল্যাপটপের নীলচে আলোয় ডুবে ছিল। টেবিলের ওপর নিজের বানানো সকালের কড়া চা-টা রাখা, ধোঁয়া উড়ছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র মন নেই।
সে তখন ব্যস্ত ‘সিংহ রায় কনগ্লোমারেট’-এর চেয়ারম্যান ব্রিজেশ সিংহ রায়ের আজকের পুরো শিডিউলিং ফিক্স করতে। কার সাথে কখন মিটিং হবে, কোন প্রজেক্টগুলো আজ ফার্স্ট প্রায়োরিটি পাবে আর কোনগুলোকে ডিলিট বা ডিলে লিস্টে পাঠিয়ে দেওয়া হবে—সবটা নিজের আঙুলের ডগায় সাজিয়ে নিল সে। কাজটা শেষ করে ল্যাপটপটা সশব্দে বন্ধ করল মেঘলা।
জানলার বাইরে সকালের আকাশের দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে এক গভীর গর্বের হাসি খেলে গেল তার মুখে।
ঘর থেকে বেরোতেই দেখল ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছে বাবা আর পাশে সার্থক। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে মেঘলা স্বস্তি পেল—এখনো অনেকটা সময় হাতে আছে, দেরি হয়নি। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসল। সার্থকের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতেই ছোট ভাই দিদির দিকে তাকিয়ে হাসল।
সার্থক: "গুড মর্নিং দিদি!"
মেঘলা: "গুড মর্নিং ভাই...গুড মর্নিং বাবা। মা কোথায়?"
সায়ক: (কফির কাপে চুমুক দিয়ে) "আজ তোর মায়ের কলেজে কোনো প্রোগ্রাম আছে, তাই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেছে।"
সার্থকের মনটা তখনো বাবার সেই আগের কথাগুলোতে আটকে ছিল। সে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে সায়কের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল— "বাবা, আমি কি পারব এই দায়িত্ব পালন করতে?"
সায়ক সিনহা খুব গম্ভীরভাবে সার্থকের চোখে চোখ রেখে বললেন, "মনে রাখিস সার্থক, ডাক্তার হওয়া মানে শুধু একটা ডিগ্রি পাওয়া নয়। হিপোক্রেটিসের সেই শপথের মর্যাদা যদি তুই জীবন দিয়ে রাখতে না পারিস, তবে এই পড়াশোনা তোর জন্য নয়..."
মেঘলা পাশে বসে সার্থকের কাধ জড়িয়ে ধরল। বাবার দিকে তাকিয়ে খুব সহজ গলায় বলল, "আমার ভাই যদি না পারে, তবে আর কে পারবে বাবা? ও তো মেঘলা সিনহার ভাই! আর আমাদের বাবা হলো শহরের সবথেকে বেস্ট ডাক্তার। বাবা যেভাবে এথিক্যাল আর অনেস্ট ডাক্তার, আমাদের সার্থকও ঠিক তেমনই হবে। কী রে, হবে না? যা এবার, অনেক হয়েছে, পড়তে বস। নাহলে কিন্তু কোনো লাভ হবে না।"
সার্থক একটা হাসি দিয়ে নিজের বইপত্র গুছিয়ে ভেতরে চলে গেল। সায়ক মেঘলার দিকে তাকিয়ে একবার হাসলেন। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
সায়ক কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "তা মেঘলা, তোর অফিস কেমন চলছে রে? সব ভালো তো?"
মেঘলা কয়েক মুহূর্ত কিছু একটা ভাবল, তারপর মুখে একটা উজ্জ্বল হাসি ফুটিয়ে বলল, "হ্যাঁ বাবা, অফিস খুব ভালো চলছে। আর ব্রিজেশ স্যার তো অনেক হেল্পফুল। এমনকি অফিসে জয়েন করার পর মাত্র কয়েক দিন হলো, তাতেও..." মেঘলা কথা বলতে বলতে একটু থেমে গেল, যেন কিছু একটা আড়াল করতে চাইল। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলল, "আসলে বাবা, অফিসের কালচার বলো বা ব্রিজেশ স্যারের কথা বলো—সবাই খুব ভালো।"
সায়কের মনে একটা গর্বের অনুভূতি হলো। মেয়ে আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, স্বাবলম্বী হয়েছে। তিনি আগে ভাবেননি যে মেঘলা এত তাড়াতাড়ি ব্রিজেশ সিংহ রায়ের মতো মানুষের নজর কাড়তে পারবে বা এত নাম করবে।
সায়ক ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, "আজ তো তোর তাড়াতাড়ি অফিসে যাওয়ার কথা ছিল না?"
মেঘলা খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল, "হ্যাঁ বাবা, এই তো বেরিয়ে যাচ্ছি। আসলে ব্রিজেশ স্যারের একটা খুব জরুরি শিডিউল আর ফাইল দেখছিলাম।"
সায়ক সিনহা: (কফির কাপটা নামিয়ে রেখে) "মেঘলা, তুই তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। আজও আমি তোকে অফিসে ছেড়ে দেব।"
মেঘলা: (মিষ্টি হেসে) "ওকে বাবা, আমি জাস্ট পাঁচ মিনিটে আসছি।"
মেঘলা নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। সে চলে যেতেই সায়ক একবার মেঘলার যাওয়ার পথের দিকে তাকালেন। মেঘলাকে পেছন থেকে যেতে দেখে তার নজরটা আস্তে করে নিচে নামিয়ে আনলেন তিনি।
সায়কের মনের ভেতরে তখন এক কুটিল সংঘাত চলছে।
নিজের মনেই বিড়বিড় করলেন সায়ক— "এথিক্যাল, অনেস্ট... এগুলো নিয়েই তো থাকতে পারতাম মা। কিন্তু তোদের লাইফটাকে আমি স্ট্রাগলের মধ্যে রাখতে চাই না। তাই..."
একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে তিনি নিজের ল্যাপটপটা খুললেন। দ্রুত হাতে একটা মেডিক্যাল জার্নাল সার্চ করতে লাগলেন। কিন্তু না, কোথাও সেই আগের রিপোর্টের মতো কোনো 'Pervert Sexual Act' বা বিকৃত কোনো কেস স্টাডি নেই। সায়কের মুখে একটা চরম হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। তার সেই বিকৃত কৌতূহল আজ মিটছে না।
বিরক্তি নিয়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করলেন তিনি। একবার ফোনের স্ক্রিনটা দেখে নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠলেন। নিজের ঘরে গিয়ে দ্রুত তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলেন ড্রয়িংরুমে।
বাইরে দেখল মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে একটা সুন্দর নীল রঙের চুড়িদার। মেঘলার সেই শান্ত আর স্নিগ্ধ রূপটা দেখে সায়ক এক মুহূর্ত থমকালেন।
মেঘলা: (বাবার দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বল হাসিতে) "চলো বাবা!"
লেকচার হলের সেন্ট্রাল এসি-র মৃদু গুঞ্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। পডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে ডঃ রুদ্রাণী চ্যাটার্জি।
পডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকা প্রফেসরের চশমার কাঁচে রিফ্লেক্ট হচ্ছে সামনের সারির আতঙ্কিত মুখগুলো।
"ফার্স্ট ইয়ারে আমি এই কথাগুলো বলি না..." প্রফেসরের গলায় এক অদ্ভুত খসখসে কাঠিন্য। "কারণ তখনো তোমরা কাঁচা। অনেকেরই রক্তের গন্ধে বমি পায়, ফরমালিনের ঝাজে চোখ জ্বলে। কিন্তু...আজ তোমরা সেকেন্ড ইয়ার। তোমরা এখন মানুষের মৃতদেহ কাটতে শিখে গেছ, ক্যাডাভারের ঠান্ডা চামড়া স্পর্শ করতে তোমাদের আর হাত কাঁপে না।”
ডিন রুদ্রাণী চ্যাটার্জি পডিয়াম থেকে সরে এসে স্টেজটার একদম কিনারায় দাঁড়ালেন। তাঁর সিল্কের শাড়ির খসখসে শব্দটা হলের নিস্তব্ধতায় তলোয়ারের মতো ধারালো শোনাচ্ছে। তিনি একবার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে ক্লাসরুমের শেষ সারির দিকে তাকালেন।
তিনি ক্লাসরুমের অলিগলি দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। তাঁর জুতোর শব্দটা প্রতিটা ছাত্রের হার্টবিটের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।
"মনে রাখবে, MSIAME তোমাদের শুধু ডাক্তার বানাতে চায় না, তোমাদের বানাতে চায় এক-একজন শার্প শ্যুটার। যার লক্ষ্য হবে অব্যর্থ, আর যার মনে দয়া নামের কোনো ভাইরাস থাকবে না। আজ এই ক্লাসের পর তোমাদের এক বিশেষ প্র্যাকটিক্যাল সেশনে নিয়ে যাওয়া হবে... যেখানে তোমরা শিখবে মানুষের শরীর নিয়ে খেলা করার আসল আনন্দ।"
ক্লাসের সবাই মন দিয়ে শুনছে। ফার্স্ট বেঞ্চে বসে আছে দীক্ষিত। সে কলেজের ডিন রুদ্রাণী চ্যাটার্জির লেকচার খুব মন দিয়ে শুনছে, একদম ফোকাসড হয়ে।
তখন রুদ্রাণী চ্যাটার্জি বললেন, “দিস ইজ দ্য মোস্ট প্রেস্টিজিয়াস মেডিক্যাল কলেজ... আর তোমরাই হলে এই কলেজের গর্ব।”
দীক্ষিত ফার্স্ট বেঞ্চে বসে দেখছিল ডিন ম্যাম তখন হাঁটতে হাঁটতে একটা মেয়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। রুদ্রাণী চ্যাটার্জি বললেন, “অনন্যা, ওঠো।”
অনন্যা উঠে দাঁড়াতেই রুদ্রাণী তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “দিস ইজ অনন্যা বসু... ফ্রম মিডল ক্লাস ফ্যামিলি। বাবা ক্লিনারের কাজ করেন, কিন্তু আজ অনন্যার ট্যালেন্ট আর ওর ইচ্ছে দেখে এই কলেজের সবথেকে বড় স্কলারশিপ ও পেয়েছে। সো প্লিজ এভরিওয়ান, গিভ আ বিগ অ্যাপ্লজ ফর হার!”
পুরো লেকচার হল হাততালিতে ভরে উঠল। অনন্যা মাথা হালকা নিচু করে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রুদ্রাণী বললেন, “গ্রেট! সত্যি, এই ব্যাচটা এবার খুব ভালো এসেছে।” তারপর অনন্যার দিকে তাকিয়ে বললেন, “অনন্যা, মেক ইওর ফ্যামিলি অ্যান্ড আস প্রাউড।”
অনন্যা নিচু স্বরে “ইয়েস ম্যাম” বলে বসে পড়ল।
দীক্ষিত একটু ভ্রু কুঁচকে মেয়েটাকে দেখল। মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দর। পরনে একটা সুন্দর কুর্তি আর টাইট লেগিংস। দেখে মনে হচ্ছে একটা আভিজাত্য আর গর্ব যেন তার মুখে মাখানো আছে, কিন্তু দীক্ষিত লক্ষ্য করল—মেয়েটা কেমন যেন একটু ভয় পাচ্ছে।
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজায় একটা টোকা পড়ল। বাইরে থেকে দুজন বলল, “ম্যাম, আসবো?”
ডঃ রুদ্রাণী চ্যাটার্জি দরজার দিকে ইশারা করতেই দু’জন যুবক ভেতরে ঢুকল। দুজনেই দীর্ঘকায়, পরনে ঝকঝকে সাদা অ্যাপ্রন, গলায় স্টেথোস্কোপ... আর চোখে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস।
রুদ্রাণী স্মিত হেসে বললেন, “কাম দিব্যেন্দু অ্যান্ড অর্ণব...”
তারা দুজনেই ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রুদ্রাণী চ্যাটার্জির দুই পাশে দাঁড়াল। লেকচার হলটা তখন পিনপতন নিস্তব্ধ। ডিন ম্যাম সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে গভীর কণ্ঠে বললেন, “তোমরা এখন সেই স্টেজে পৌঁছেছো, যেখানে বইয়ের বাইরের বাস্তব মেডিসিন বুঝতে শুরু করছো। তাই আজ আমি তোমাদের বিশেষ কাউকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই...”
তিনি প্রথমজনের দিকে হাত ইশারা করলেন।
“এই হলেন ডঃ দিব্যেন্দু। নিউরোসার্জারিতে তাঁর দক্ষতা ইতিমধ্যেই সিনিয়রদের নজরে এসেছে।”
তারপর দ্বিতীয়জনের দিকে ঘুরলেন—
“আর এই হলেন ডঃ অর্ণব... আমাদের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে প্রতিভাবান নতুন ডাক্তারদের একজন।”
পুরো ক্লাসে একটা হালকা গুঞ্জন শুরু হলো। স্টুডেন্টদের চোখে বিস্ময় আর সমীহ। প্রফেসর আবার বললেন—
“এরা শুধু ভালো ছাত্রই ছিল না... এরা ছিল এই কলেজের Best ever graduates-দের মধ্যে।”
একটু থামলেন রুদ্রাণী, কণ্ঠটা যেন হঠাৎ অনেক বেশি নরম আর আবেগপ্রবণ হয়ে গেল—
“আর একটা কথা মনে রেখো— এরা কেউ ধনী পরিবার থেকে আসেনি। এদের বাবা-মা অসীম কষ্ট করে পড়িয়েছেন... আর এরা নিজেদের মেধা দিয়ে স্কলারশিপ অর্জন করেছে।”
পুরো ক্লাস এবার একদম চুপ। রুদ্রাণীর কণ্ঠে গর্ব স্পষ্ট ফুটে উঠল—
“আজ এরা শুধু ডাক্তার না... এরা এখন সরাসরি কাজ করবে এই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর— ডঃ মেঘাদিত্য সেন-এর সাথে।”
সবাই সেই দুই নতুন ডাক্তারের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। ছাত্রদের চোখেও এখন বড় বড় স্বপ্ন—তারাও চায় একদিন ডিন ম্যাম এভাবেই তাদের পরিচয় করিয়ে দেবেন।
ডঃ দিব্যেন্দু বিনীতভাবে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম... আপনি না থাকলে আমাদের জার্নিটা এতো ইজি হতো না।”
ডঃ অর্ণব এগিয়ে এসে রুদ্রাণী চ্যাটার্জিকে প্রণাম করল। “ম্যাম, এই সবকিছুই আপনার জন্য পসিবল হয়েছে।”
রুদ্রাণী সস্নেহে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলেন। “আশীর্বাদ সবসময় তোমাদের সাথে আছে। আর স্টুডেন্টস... ঠিক ডঃ দিব্যেন্দু আর ডঃ অর্ণবের মতো, তোমাদের ফাইনাল ইয়ার শেষ হলে আমি যেন তোমাদেরও এভাবেই সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি।”
অর্ণব আর দিব্যেন্দুর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর টাইম অ্যান্ড কনগ্রাচুলেশনস ফর ইয়োর জার্নি।”
লেকচার শেষ করে রুদ্রাণী চ্যাটার্জি করিডোর দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন পেছন থেকে একটা মেয়ের মিনতিভরা আওয়াজ এল— “ম্যাম... ম্যাম! একটু শুনবেন?”
রুদ্রাণী থামলেন। করিডোরের ঠান্ডা আলোয় তাঁর হিল জুতোর শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে থেমে গেল। তিনি ঘুরে দাঁড়াতেই দেখলেন অনন্যা দ্রুত পায়ে হেঁটে আসছে তাঁর দিকে। কাছে আসতেই রুদ্রাণী মুখে এক কৃত্রিম মায়াবী হাসি ফুটিয়ে বললেন, “ইয়েস অনন্যা... এনি প্রবলেম বেটা?”
অনন্যার হাত দুটো একে অপরের সাথে ঘষছে সে, স্নায়বিক উত্তেজনায় আঙুলগুলো কাঁপছে। সে নিচু স্বরে বলল, “অ্যাকচুয়ালি ম্যাডাম... আমি একটা ভুল করেছি।”
রুদ্রাণীর চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তিনি সতর্কভাবে একবার চারদিকে তাকিয়ে নিলেন, করিডোরে কোনো স্টুডেন্ট বা স্টাফ তাদের কথা শুনছে কি না দেখে নিলেন। তারপর খুব নিচু কিন্তু আদেশসূচক গলায় বললেন, “অনন্যা, কাম টু মাই অফিস।”
নিচতলায় ‘VELVET BREW’—শহরের সবথেকে দামী কফি শপ, যেখানে এক কাপ কফির দাম সাধারণ মানুষের সারা দিনের রোজগারের সমান। আর ওপরের তলাগুলোতে ‘D’ORO COUTURE’—দেবারতি সিংহ রায়ের নিজস্ব সাম্রাজ্য। এক্সক্লুসিভ ফ্যাশন হাউস আর লাক্সারি স্পা-ম্যাসাজ সেন্টার। কিন্তু এই বিল্ডিংয়ের চারতলায় সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সেখানে যাওয়ার জন্য আলাদা লিফট আছে, যার কোড কেবল দেবারতির বিশ্বস্ত মানুষদের কাছেই থাকে।
দেবারতি সিংহ রায় তাঁর দামী লেদার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন। অফিসের এসি-র ঠান্ডা আবহে হালকা জ্যাসমিন পারফিউমের গন্ধ। তাঁর হাতে একটা লেটেস্ট ফোন, যার স্ক্রিনে সিসিটিভি ফুটেজের একটা ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট ফিড চলছে। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে, যে ড্রাগ আর লালসার নেশায় চুর হয়ে পড়ে আছে স্পা-র কোনো এক গোপন কুঠুরিতে।
দেবারতির ঠোঁটের কোণে একটা ক্রূর হাসি খেলে গেল। তিনি খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করলেন, “যতই বড় বাঘ হও না কেন, মাংসের লোভে খাঁচায় তো আসতেই হবে... গতকাল রাতে এসেছ, এখনো ঘোর কাটেনি? বাঃ!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ইন্টারকমে একটা বিপ শব্দ হলো। দেবারতি ফোনটা উল্টে টেবিলের ওপর রাখলেন। স্টাফের গলা শোনা গেল, “ম্যাম, এক্সকিউজ মি। নিচে ‘আলোয়ন ফাউন্ডেশন’ থেকে অনিকেত চ্যাটার্জি নামে একজন যুবক আপনার জন্য ওয়েট করছে। ও বলছে তনুশ্রী সেন ম্যামের একটা পার্সেল আছে।"
দেবারতি ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবলেন, তারপর বললেন, “ওয়েট... ওকে নিচে থাকতে বলো। আমি কনফার্ম করে নিচ্ছি।”
দেবারতি মনিটরে একবার সিসিটিভি ফুটেজটা চেক করলেন। সেখানে লিফটের সামনে একটা সুঠাম চেহারার যুবক দাঁড়িয়ে আছে—অনিকেত। অনিকেতের সেই চওড়া কাঁধ আর রুক্ষ লুকটা দেখে দেবারতি আস্তে করে নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসলেন। তাঁর চোখে তখন এক অন্য শিকারির ঝিলিক।
তিনি ফোন বের করে সরাসরি তনুশ্রী সেনকে কল করলেন। ওপাশ থেকে ফোন ধরতেই দেবারতি রহস্যময় গলায় বললেন, “হ্যালো তনুশ্রী... কী ব্যাপার? এরকম জোয়ান ছেলে তোমার অফিসে আছে আর তোমার ‘মেশিন’ লাগবে?”
একটু থেমে ফোনের ওপাশের কথাগুলো শুনলেন দেবারতি। তারপর চিলতে হেসে বললেন, “আচ্ছা ওকে, আমি ওর হাতেই দিয়ে দিচ্ছি।”
ফোনটা রেখে দেবারতি ইন্টারকমটা তুলে কড়া গলায় বললেন, “স্টোর রুম থেকে একটা বড় প্যাকেট প্যাক করা আছে... ওটা ওই ছেলেটাকে দিয়ে দাও।”
অনিকেত নিচে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। তার তীক্ষ্ণ নজর খুঁজছিল সেই সরু সিঁড়ি বা লিফটের লুপহোলটা। সে কয়েকবার পা বাড়িয়েও দেখল, কিন্তু লাভ হলো না। কড়া সিকিউরিটি আর ডিজিটাল পাসের বেষ্টনী ভেদ করে ওপরে ওঠার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হলো তার। অনিকেত মনে মনে একটু বিরক্ত হলো, কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ পেতে দিল না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ওপর থেকে একটা লিফট নিচে নেমে এল। লিফটের দরজা খুলতেই বেরিয়ে এলেন একজন অত্যন্ত সুন্দরী মহিলা—পরনে ‘D’ORO COUTURE’-এর এক্সক্লুসিভ ইউনিফর্ম, চোখেমুখে এক পেশাদার আভিজাত্য। তাঁর হাতে একটা বেশ বড়সড় কার্ডবোর্ডের বাক্স, যা খুব যত্ন করে প্যাক করা।
মহিলাটি ধীর পায়ে অনিকেতের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অনিকেতের সুঠাম শরীরের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি হালকা হাসলেন, তারপর বাক্সটা অনিকেতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ম্যাম এটা আপনার হাতে দিতে বলেছেন। খুব সাবধানে নিয়ে যাবেন, তনুশ্রী ম্যামকে বলবেন ওনার জিনিস পাঠানো হয়েছে।”
অনিকেত এক মুহূর্ত মহিলার চোখের দিকে তাকাল, তারপর খুব শান্তভাবে বাক্সটা নিজের শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরল। বক্সটার ওজন বেশ ভালোই।
অনিকেত হালকা মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
মহিলাটি আবার সেই রহস্যময় হাসি হেসে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। অনিকেত আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। বগলে শক্ত করে প্যাকেটটা চেপে ধরে সে কফি শপের কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এল।
বাইরে তখন রোদের তেজ আরও বেড়েছে। অনিকেত হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছনে ফিরে তাকাল সেই সাদা অট্টালিকাটার দিকে।
একটু দূরে গিয়ে একটা নির্জন গলির মোড়ে দাঁড়াল সে। চারপাশটা একবার দেখে নিল কেউ নজর রাখছে কি না।
সে প্যাকেটটা খুলে দেখবে কি না ভাবছে... এত সুন্দরভাবে প্যাকিং করা যে একবার খুললে খুব সহজেই বোঝা যাবে কেউ হাত দিয়েছে। কিন্তু ওর ভেতরের ছটফটে কৌতূহল ওকে শান্ত হতে দিল না। তনুশ্রী সেন এর গোপন কারবার দেখার লোভ সে সামলাতে পারল না।
অনিকেত দাঁত দিয়ে প্যাকেটের টাইট স্টিকারটা এক টানে ছিঁড়ে ফেলল। স্টিকারটা ছিঁড়তেই ওর চোখ দুটো অবাক বিস্ময়ে আর এক অদ্ভুত উত্তেজনায় বড় বড় হয়ে গেল।
প্যাকেটটার ভেতর থেকে সে একটা মেশিন বের করল... মেশিনটা দেখতে হুবহু একটা হিউম্যান পেনিস-এর মতো, কিন্তু কুচকুচে কালো (Jet Black)। ওটা সাধারণ কোনো খেলনা নয়, ওটার গায়ের টেক্সচার আর ফিনিশিং দেখে বোঝা যাচ্ছে এটা অত্যন্ত দামী আর উন্নত প্রযুক্তির।
অনিকেত একটা ক্রূর হাসি হাসল। সে মনে মনে ভাবল, “তনুশ্রী ম্যাডাম, আপনার আভিজাত্যের তলায় এই সব চলে তাহলে?” সে দেখলো প্যাকেটের ভেতরে এরকম আরও অনেক মেশিন আর অ্যাক্সেসরিজ আছে। সে এক পলক দেখে নিয়ে মেশিনটা আবার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখল।
কিন্তু এখন আসল বিপদটা টের পেল সে। একবার স্টিকার ছেঁড়ার পর প্যাকেটটা আর আগের মতো করে লাগানো পসিবল হচ্ছে না। যতবারই সে টেপটা জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছে, ততবারই সেটা আলগা হয়ে যাচ্ছে।
অনিকেত দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, “ধুর বাড়া! এবার কী করব? উফফফ...”
অনিকেত গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ওই ছেঁড়া প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে কপালে ঘাম মুছল। এই প্যাকেটটা এই অবস্থায় তনুশ্রী সেনের হাতে দেওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মারা। সে আর দেরি না করে পকেট থেকে ফোনটা বের করল এবং দ্রুত কাদের সাহেবের নাম্বারটা ডায়াল করল।
অনিকেত এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিচু স্বরে কিন্তু খুব দ্রুত বলল, "কাদের সাহেব, প্রবলেম হয়ে গেছে। তনুশ্রী সেনের একটা প্রাইভেট প্যাকেট চেক করতে গিয়ে স্টিকারটা ছিঁড়ে ফেলেছি... এটা এখন আর কোনোভাবেই আগের মতো করে জোড়া লাগানো যাচ্ছে না। তনুশ্রী ম্যাম এটা দেখলে আমাদের প্ল্যান আগেই শেষ হয়ে যাবে!"
অনিকেত ওপাশে কাদের সাহেবের কথাগুলো খুব মন দিয়ে চুপ করে শুনল। ওপাশ থেকে কাদের সাহেব হয়তো কিছু একটা ইনস্ট্রাকশন দিলেন। অনিকেত ঘড়ি দেখে একটু থমকে গিয়ে বলল, "ওকে... আমি এখনই আসছি। কিন্তু লেট করলে অনেক প্রবলেম হয়ে যাবে, তনুশ্রী ম্যাম হয়তো জেনে যাবে যে আমি দেরি করছি।"
করিডোরের সেই ভারী নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে রুদ্রাণী চ্যাটার্জির হিল জুতোর শব্দ অনন্যার কানে হাতুড়ির মতো বাজছিল। রুদ্রাণীর কেবিনে ঢোকার পর অনন্যা দেখল সেখানে আগে থেকেই একজন বসে আছেন—প্রফেসর নয়নিকা সেনগুপ্ত।
রুদ্রাণী নিজের চেয়ারে বসে খুব শান্ত গলায় বললেন, "বসো অনন্যা। ভয় পেও না। তুমি বললে তুমি কী একটা ভুল করে ফেলেছো? শুনি কী ভুল?"
অনন্যা সেন্ট্রাল এসি-র কনকনে ঠান্ডাতেও দাঁড়িয়ে ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। কিন্তু প্রফেসর নয়নিকা সেনগুপ্তকে ঘরে দেখে সে মনের কোণে একটু আশার আলো দেখতে পেল। প্রফেসর সেনগুপ্ত তাকে ক্লাসে একদম নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করেন, তাঁর শাসন আর ভালোবাসার ওপর অনন্যার অগাধ বিশ্বাস। অনন্যা মাথা নিচু করে নিজের এক হাতের তালু অন্য হাতের ওপর ঘষছিল, স্নায়বিক চাপে আঙুলগুলো আড়ষ্ট হয়ে আসছে।
অনন্যা মাথা তুলে কিছু বলার আগেই প্রফেসর নয়নিকা সেনগুপ্ত খুব নরম কিন্তু গম্ভীর গলায় বললেন, "ম্যাম, অনন্যা অত্যন্ত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। ডঃ মেঘাদিত্য সেনের নজরে ও ফার্স্ট ইয়ার থেকেই আছে। মেঘাদিত্য স্যার নিজে ওকে স্পেশাল স্কলারশিপ দিয়েছেন, এমনকি ওর ফ্যামিলির অর্থনৈতিক অবস্থার কথা ভেবে অনেক সাহায্যও করেছেন।"
নয়নিকা রুদ্রাণীর দিকে তাকিয়ে অনন্যার গুণগান করতে থাকলেন, "এই স্কলারশিপটা শুধু মেডিকেল কলেজে চান্স পাওয়ার পর শুরু হয়নি ম্যাম। যখন ও কলেজে পড়ত, যখন ও মেডিকেল এন্ট্রান্সের প্রিপারেশন নিচ্ছিল, তখন থেকেই মেঘাদিত্য স্যার অনন্যার পড়াশোনার যাবতীয় খরচ আর ওর বাবাকে নিয়মিত টাকা পাঠিয়েছেন—যাতে অনন্যা কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়া পড়াশোনা করতে পারে। অনন্যা একজন ভীষণ ট্যালেন্টেড স্টুডেন্ট। ওর কিউরিওসিটি আর অজানাকে জানার ইচ্ছে ওকে এই কলেজের ইন ফিউচার ওয়ান অফ দ্য বেস্ট স্টুডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু..."
নয়নিকা কথা শেষ না করে একটু থামলেন। রুদ্রাণী একবার অনন্যার কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন, তারপর প্রফেসর সেনগুপ্তের দিকে ফিরলেন। নয়নিকা নিঃশব্দে টেবিলের ওপর দিয়ে একটা ভারী ফাইল পুশ করে দিলেন রুদ্রাণীর দিকে।
ফাইলের কভারে বড় বড় অক্ষরে লেখা— "NEW BATCH DOCTOR: PROJECT FUND"।
রুদ্রাণী খুব ধীরে সুস্থে ফাইলের পাতাগুলো ওল্টাতে লাগলেন। প্রতিটা পাতায় নতুন নতুন ডাক্তার আর মেডিকেল স্টুডেন্টদের একটা লম্বা লিস্ট। এরা সবাই সেই সব ছেলেমেয়ে, যাদের মেধা আকাশছোঁয়া কিন্তু আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়; টাকার অভাবে যাদের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন হয়তো মাঝপথেই থমকে যেত। ফাইলের কয়েকটা পাতা ওল্টানোর পর নজর পড়ল শেষ দিকের দুটো নামের ওপর— ডঃ দিব্যেন্দু আর ডঃ অর্ণব। আজ সকালেই যাদের সবার সামনে আইডল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
আরেকটা পাতা ওল্টাতেই অনন্যার ছবিটা দেখতে পেল। ওর পুরো প্রোফাইল, ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, এমনকি ওর বাবার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মেঘাদিত্য সেনের পাঠানো প্রতিটা টাকার হিসেব সেখানে নিখুঁতভাবে লেখা আছে।
রুদ্রাণী হঠাৎ একটা শব্দ করে ফাইলটা বন্ধ করে দিলেন। কেবিনের ভেতরে আবার সেই ভারী নিস্তব্ধতা ফিরে এল। রুদ্রাণী তাঁর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে অনন্যার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন। তাঁর চোখে এখন কোনো মায়া নেই, আছে এক অদ্ভুত শীতলতা।
তিনি খুব নিচু অথচ ধারালো গলায় বললেন, “তাহলে অনন্যা... আমাদের প্রজেক্টের সবথেকে ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট তুমি। এবার বলো, তুমি কী ভুল করেছো? কোন জিনিসটা তোমার চোখে পড়েছে যেটা দেখার অধিকার তোমার ছিল না?”
ফাইলের ওপরের সেই 'প্রজেক্ট ফান্ড' শব্দটা যেন অনন্যাকে বিদ্রূপ করছিল।
অনন্যা কাঁপা গলায় বলতে শুরু করল, "ম্যাম আসলে..."
কিন্তু ওকে কথা শেষ করতে না দিয়েই প্রফেসর নয়নিকা সেনগুপ্ত মাঝপথে বলে উঠলেন, "ম্যাম, আসলে গতকাল ল্যাবের জন্য একটা নতুন ব্যাচ এসেছে আর অনন্যা রেস্ট্রিক্টেড এরিয়াতে (Restricted Area) রাত্রে ঘুরতে যায়... আর অনন্যা সেটা দেখে ফেলেছে। বাট থ্যাঙ্ক গড যে অনন্যা আমাকে সেটা বলেছে আর আমি ওকে সবটা বুঝিয়ে দিয়েছি। ও শুধু ভুল করেনি ম্যাম, অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে। এই ভুলের জন্য ওর স্কলারশিপ পর্যন্ত চলে যেতে পারে!"
অনন্যা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ডিন ডঃ রুদ্রাণী চ্যাটার্জির পায়ে লুটিয়ে পড়ল। কান্নায় ভেঙে পড়ে সে বলতে লাগল, "সরি ম্যাডাম... আমি আর কোনোদিন স্টুডেন্ট রেস্ট্রিক্টেড এরিয়াতে যাব না। আমি জানতাম না যে কিছু একটা দেখাতে... আর ম্যাম, ওগুলো নরমাল ছিল না! এক ট্রাক লোক ছিল... মেয়ে, ছেলে, বুড়ো সব ছিল। যেন ওদের কেউ মেডিসিন দিয়ে পুরো ঘোর করিয়ে দিয়েছিলো। আমি রাত্রে বেলা ওদিকে এমনি ঘুরতে গিয়েছিলাম আর দেখে ফেলেছিলাম... ম্যাম আমার কোনো দোষ নেই! প্লিজ ম্যাম, আমি কাউকে কিছু বলব না। আমি ডাক্তার হতে এসেছি, পড়াশোনা করে চলে যাব... ম্যাম সরি ম্যাম!"
অনন্যার কথাগুলো শুনে রুদ্রাণীর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তাঁর চোখের মণি স্থির হয়ে গেছে—ভাবছেন এই মেয়েটা ঠিক কতটা দেখে ফেলেছে! তিনি নয়নিকা সেনগুপ্তের দিকে এক চরম আক্রোশ আর রাগে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "সেনগুপ্ত! তুমি কি মরতে চাও নাকি?"
নয়নিকা ভয়ে কুঁকড়ে গেলেন। রুদ্রাণী এবার নিজের গম্ভীর রূপটা ফিরিয়ে আনলেন। তিনি অনন্যাকে উঠে বসতে বললেন। অনন্যা কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারে গিয়ে বসল।
রুদ্রাণী তাঁর কণ্ঠস্বর একদম নরম করে আনলেন, যেন এক বিষাক্ত সাপ শিকারের আগে শান্ত হয়। তিনি বললেন, "অনন্যা, রিল্যাক্স... শোনো, তুমি একজন ফিউচার ডাক্তার হতে পারতে। তুমি প্রফেসর সেনগুপ্তের মতো এই কলেজের একজন প্রফেসর হতে পারতে... এখনো হতে পারবে। বাট..."
ঠিক সেই মুহূর্তেই রুদ্রাণীর টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা নাম— ‘M. SEN’।
রুদ্রাণীর চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তিনি অনন্যার দিক থেকে নজর সরিয়ে ফোনের দিকে তাকালেন। নয়নিকা সেনগুপ্তও ফোনটার দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলেন, যেন ওই নামটা ঘরে একটা অদৃশ্য হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিয়েছে।ঘরের এসি-র তাপমাত্রা যেন এক ধাক্কায় আরও কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল।
রুদ্রাণী অনন্যার দিকে তাকিয়ে তর্জনী তুলে চুপ থাকার ইশারা করলেন। তারপর কলটা রিসিভ করে খুব নিচু আর ফরমাল গলায় বললেন, “ইয়েস স্যার.. সে আমার কেবিনেই আছে।”
ওপাশ থেকে ডঃ মেঘাদিত্য সেনের সেই গম্ভীর আর যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শোনা গেল। ওপাশ থেকে নির্দেশটা শুনে রুদ্রাণী একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। জানলার দিকে তাকিয়ে রুদ্রাণী মনে মনে ভাবলেন—
আজ স্যার অনেকদিন পরে নিজে ‘ভলকান কেমিক্যালস’-এ গিয়েছেন। তার মানে নিশ্চয়ই কারও অনেক বড় বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। মেঘাদিত্য সেন যখন নিজে মাঠে নামেন, তখন কারও অস্তিত্বের চিহ্নটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না।
রুদ্রাণী কিছুক্ষণ খুব মন দিয়ে শুনলেন, তাঁর চোয়াল একবার শক্ত হলো আবার শিথিল হলো। নয়নিকা সেনগুপ্তের দিকে একবার তীক্ষ্ণ নজর হানলেন তিনি।
শেষে রুদ্রাণী শুধু বললেন, “ওকে স্যার। আই উইল হ্যান্ডেল দিস। নয়নিকা ম্যামকেও আমি ইনস্ট্রাকশন দিয়ে দিচ্ছি।”
ফোনটা কেটে রুদ্রাণী অনন্যার চোখের দিকে সরাসরি তাকালেন।
রুদ্রাণী খুব শীতল গলায় বললেন, “অনন্যা, মেঘাদিত্য স্যার তোমার ওপর খুব খুশি হয়েছেন। তোমার এই ‘কিউরিওসিটি’র জন্য তিনি তোমাকে একটা স্পেশাল প্রজেক্টে সুযোগ দিতে চান। কিন্তু আপাতত তুমি নয়নিকা ম্যামের সাথে ওঁনার রুমে যাও। ওখানে তোমার কিছু সাইকোলজিক্যাল টেস্ট আর পেপারওয়ার্ক হবে। আমাদের ইনস্টিটিউটের নিয়ম অনুযায়ী এই সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সগুলো ম্যান্ডেটরি।”
অনন্যা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোল না। নয়নিকা সেনগুপ্ত এগিয়ে এসে অনন্যার হাতটা ধরলেন।
সেই ছোঁয়াটা আজ আর মায়ের মতো স্নেহের লাগল না, বরং মনে হলো কোনো লোহার শিকল ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
অনন্যা দেখল নয়নিকার চোখে কোনো মায়া নেই, আছে শুধু এক গভীর অপরাধবোধ আর এক ভয়ংকর নিরুপায়তা।
Chapter 5: Morality Has Two Faces | Continue...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)