3 hours ago
পর্ব ৪
সকাল ১০টা।
রিয়ার মা আরজুদা বেগম নিচ থেকে ডাক দিলেন, “রিয়া... রিয়া! ওঠ মা, অনেক বেলা হয়ে গেছে।”
রিয়া বিছানায় পাশ ফিরে চোখ মেলল। ঘুম ভাঙতেই প্রথম কথাটা তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “মা, রাতুল কি চলে গেছে?”
আরজুদা দরজার বাহির থেকে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, অনেক সকালে উঠে অফিস চলে গেছে। তুই ঘুম থেকে উঠবি না, উঠে খেয়ে নে।”
রিয়া আস্তে করে বলল, “আমি আসছি মা। পাঁচ মিনিট।”
“আচ্ছা আয়,” বলে আরজুদা চলে গেলেন।
রিয়া ধীরে ধীরে উঠে বসল। শরীরটা এখনো ভারী লাগছিল। সে ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে চোখ-মুখ ভালো করে ধুল। তারপর যখন হাত মুছছিল, তার চোখটা নিজের পেটের দিকে চলে গেল। হালকা গোলাপি নাইটির উপর থেকে সে আলতো করে হাত রাখল পেটে।
আমার পেটে বাচ্চা... কার?
রিয়ার হৃদয়টা দুরুদুরু করে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল।
রাতুলের বাচ্চা তো? নিশ্চয়ই রাতুলেরই। কিন্তু... না। রাতুলের সাথে যতবার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে, প্রতিবারই সে পরে ইমার্জেন্সি পিল খেয়েছে। সে কখনো চায়নি এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা হোক। রাতুলও জানত না। সে সবসময় সাবধানে থাকত।
কিন্তু একবার... শুধু একবার সে ঔষধ খেতে ভুলে গিয়েছিল।
সেই ভয়ংকর রাতে। যেদিন হরিশ তাকে জোর করে...
রিয়ার শরীরটা শিউরে উঠল। তার হাতটা পেটের উপর থেকে সরে গেল না।
তবে কি... ওই দুষ্ট লোকটার বাচ্চাই আমার কোলে আসছে?
সময় মিলে যাচ্ছে। ছয় সপ্তাহ। ঠিক সেই রাতের পর থেকে তার শরীরে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ঘুমের মধ্যে ঘাম, বমি ভাব, দুর্বলতা—সবকিছু বলছে একই কথা।
রিয়ার চোখে জল এসে গেল।
আমি কী করব? বাচ্চাটা নষ্ট করে দেব?
আমার বয়স তো মাত্র ২৩। একটা বাচ্চা ফেলে দিলে কী আর এমন হবে? রাতুলকে আমি মানিয়ে নিতে পারব। বলব, শরীর খারাপ ছিল, ডাক্তার বলেছে... কিন্তু আমার বাবা-মা? রাতুলের বাবা-মা? তাঁরা তো এখন খুশিতে আত্মহারা। নাতি-নাতনির স্বপ্ন দেখছেন। আমি কী করে তাঁদের খুশিটা কেড়ে নেব?
না... না...
বাচ্চা নষ্ট করা তো ঘোর অপরাধ। অনেক বড় গুনাহ। আর বাচ্চাটা কী দোষ করেছে? সে তো কোনো অন্যায় করেনি। সে শুধু আমার পেটে এসেছে।
রিয়া দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল দুটো পথের মাঝে সে আটকে গেছে।
যদি রাতুল না মানে? যদি সে জানতে পারে বাচ্চাটা তার নয়? তাহলে কী হবে?
তবে কি আমি পালিয়ে যাব? আমার নামে বড় হবে বাচ্চাটা? একা একা লড়ব?
ঠিক তখনই নিচ থেকে আরজুদা বেগম আবার ডাক দিলেন, “রিয়া! কী করছিস মা? খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
রিয়া চমকে উঠল। সে দ্রুত চোখ মুছে আয়নায় নিজের মুখ দেখল। চোখ লাল হয়ে আছে। সে গভীর করে শ্বাস নিয়ে আজেবাজে চিন্তাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। তারপর ধীর পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে খেতে নিচে চলে গেল।
কিন্তু তার হাতটা এখনো অজান্তেই পেটের উপর চলে যাচ্ছিল।
ভেতরে একটা ছোট প্রাণ... যার বাবা কে, সে নিজেও এখনো নিশ্চিত নয়।
রিয়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিচতলায় খাবারের টেবিলে এসে মায়ের পাশে চুপচাপ বসে পড়ল। তার চোখ দুটো এখনো লাল, মুখটা ফ্যাকাশে।
রহমান মিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী খেতে মন চায় তোর, মা? বল, আমি এনে দিই।”
রিয়া মাথা নিচু করে হালকা হেসে বলল, “বাবা, এভাবে বলার কী আছে? সবই তো তুমি এনে দাও।”
রহমান মিয়া আরজুদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শোনো রিয়ার মা, বাচ্চা হওয়ার পর বাচ্চা আর মা দুজনেই এই বাসায় থাকবে। আমি আর ওই বাড়িতে পাঠাব না।”
আরজুদা বেগম একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “কেন? আমাদের ছোট্ট নানুভাইয়ের কি বাবার বাসা নেই? ওখানে তার দাদা-দাদি আছে, সবাই আছে।”
“না,” রহমান মিয়া দৃঢ় গলায় বললেন, “ওই ঘরে আমার মেয়ে আর যাবে না। যা হয়েছে, হয়েছে। এখন থেকে আমার মেয়ে আর নাতি এখানেই থাকবে।”
দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। আরজুদা বেগম রাতুলের পক্ষ নিয়ে কথা বলছিলেন, আর রহমান মিয়া একের পর এক যুক্তি দিয়ে বলছিলেন যে রিয়াকে আর শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো যাবে না। রিয়া চুপচাপ বসে সব শুনছিল, কিন্তু কিছুই বলছিল না। তার মাথার ভেতর তখন অন্য চিন্তা ঘুরছিল।
সকালের খাওয়ার পর রিয়া উপরের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
দুপুর বেলা
জানালা দিয়ে নরম রোদ এসে পড়ছিল। সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল, কিন্তু ঘুম আসছিল না। হঠাৎ তার রুমের দরজায় টোকা পড়ল।
রিয়া চোখ না খুলেই বলল, “মা, আমি পরে খেতে আসব। একটু শুয়ে থাকি।”
কিন্তু টোকা থামল না। বারবার, জোরে জোরে টোকা পড়তে লাগল।
বিরক্ত হয়ে রিয়া উঠে দরজা খুলল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হরিশ।
রিয়ার সারা শরীর যেন হিম হয়ে গেল। সেই ভয়ংকর রাতের স্মৃতি এক মুহূর্তে ঝড়ের মতো ফিরে এল। তার কপালে তৎক্ষণাৎ ঘাম জমতে শুরু করল। পা দুটো কাঁপতে লাগল।
“তুমি... তুমি এখানে? তুমি এখানে কেন এসেছ?” রিয়ার গলা কাঁপছিল।
হরিশ দ্রুত ভেতরে ঢুকে পেছন থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। তার চোখে সেই চেনা লোভী দৃষ্টি নয়, বরং একটা তীক্ষ্ণ, জিজ্ঞাসু ভাব। আবারো সেই দরজা বন্ধ ক্ল্রার দৃশ্য রিয়ার সামনে।
রিয়া পিছিয়ে গিয়ে বলল, “চলে যাও... এখান থেকে চলে যাও তুমি!”
হরিশ নিচু কিন্তু ধমকের সুরে বলল, “চুপ! একদম চুপ!”
রিয়া ভয়ে একেবারে চুপ হয়ে গেল। তার গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না।
হরিশ একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “শুনলাম, তুমি প্রেগন্যান্ট। তাই রাতুলের বাবা-মা তোমাকে দেখতে এসেছে। আমি শুধু একটা কথা জানতে এসেছি... এই বাচ্চা কি রাতুলের?”
রিয়া ভীত, কাঁপা গলায় বলল, “রাতুলের হবে না তো কার হবে?”
হরিশ তার চোখে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
“চলে যাও এখান থেকে!” রিয়া প্রায় কান্নার সুরে বলল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মমতা বেগমের গলা ভেসে এল, “রিয়া ম্যাডাম! আপনাকে ডাকছে। আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন।”
মমতা কথাটা বলেই চলে গেল।
হরিশ বুঝতে পারল যে যেকোনো সময় কেউ উপরে চলে আসতে পারে। সে আর কথা বাড়াল না। একটা শেষবার রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দরজা খুলে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
রিয়া দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার বুকটা হাঁফাচ্ছিল। সে অনেকক্ষণ ধরে হাঁফ ছাড়ল। কিন্তু স্বস্তি পেল না।
তাকে এখনই নিচে যেতে হবে।
শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে।
যাঁরা এখন তার পেটের বাচ্চাটাকে নিয়ে খুব খুশি।
রিয়ার পা দুটো যেন আর সরছিল না।
খানিক বাদে রিয়া সিঁড়ি দিয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার শাশুড়ি রিনা বেগম এগিয়ে এসে তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন।
"কেমন আছো মা? শরীরটা এখন কেমন?" রিনা বেগমের কণ্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ।
রিয়া মৃদু হেসে বলল, "আমি ভালো আছি মা। আপনি কেমন আছেন? আসার সময় কোনো অসুবিধা হয়নি তো?"
কুশল বিনিময়ের মাঝেই রিনা বেগম তার সাথে আনা ব্যাগ থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স বের করলেন। বাক্স খুলতেই ঝিলিক দিয়ে উঠল একটি চমৎকার কোমরবন্দ বা বিছা, যা নিখাদ সোনার তৈরি। তিনি অতি যত্ন করে রিয়ার কোমরে সেটি পরিয়ে দিলেন। বললেন, "এটা আমাদের বংশের রীতি মা, বংশের প্রদীপ আসার আগে হবু মাকে এটা পরিয়ে দিতে হয়।"
রিয়াকে এতে অনেক সুন্দর লাগতে ছিল, হরিশ তার কোমরের দিকে চেয়েই রয়।
গহনা পরানোর সেই মুহূর্তে রিয়ার নজর গেল ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা হরিশের দিকে। মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। হরিশের সেই অদ্ভুত চাউনি দেখে রিয়া অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেল, তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল সে।
এরপর সবাই মিলে দুপুরের খাবার টেবিলে বসল। খাবারের মাঝেই রিনা বেগম আর রিয়ার মা আরজুদার মধ্যে আলাপ জমে উঠল।
**রিনা বেগম:** "দেখুন বেয়াইন সাহেব, রিয়া এখন ৬ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। এই সময়টা খুব সাবধানে থাকতে হয়। কিন্তু আপনার তো একা হাতে সব সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রিয়ার পাশে সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো থাকা দরকার এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে?"
**আরজুদা:** "আমিও তো সেই চিন্তাই করছি। আমাদের মমতা আছে, ওকে বলেছিলাম একটু দেখাশোনা করতে। কিন্তু মমতা তো সাফ জানিয়ে দিল— 'ওরে বাবা! বাচ্চা পালার ঝুকি আমি নিতে পারবো না, অনেক কষ্ট মাইরি!' এখন ভালো বিশ্বাসী কাউকে তো দেখছি না।"
মমতার সোজাসাপ্টা কথা শুনে টেবিলে হাসির রোল উঠলেও চিন্তার ভাঁজ কাটল না। ঠিক তখনই রিনা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা হরিশের দিকে তাকালেন। হরিশ তাদের বাড়িতে অনেকদিন ধরে কাজ করে, বেশ বিশ্বস্ত।
**রিনা বেগম:** "আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়? হরিশকে যদি এখানে কয়েকদিনের জন্য রাখি? ও খুব কর্মঠ আর দায়িত্বশীল।"
পাশে থাকা রিয়া কথা শুনেই গাঁ শিউরে উঠল।
আরজুদা কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, "কিন্তু রিনা আপা, রিয়া তো মেয়ে মানুষ। একজন পুরুষ মানুষকে ওর দেখভালের দায়িত্ব দেব, এটা কেমন দেখায় না? আমার একটু সংকোচ হচ্ছে।"
**রিনা বেগম:** "আরে না না, সংকোচের কিছু নেই। হরিশকে আমি এত দিন যে দেখছি। ও শুধু কাজের লোক না, আমাদের পরিবারেরই একজন। ওর হাতের কাজ যেমন পরিষ্কার, তেমনি ও খুব যত্নশীল। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, হরিশ থাকলে আপনার অর্ধেক চিন্তা কমে যাবে।"
রিনা বেগমের প্রশংসা শুনে আরজুদা কিছুটা সাহস পেলেন। রিয়া পাশ থেকে সব শুনছিল। তার ভেতরটা অজান আশঙ্কা আর বিরক্তিতে ভরে উঠল। সে বাধা দিয়ে বলল, "না মা, কাউকে লাগবে না তো। আমি নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারব।"
রিনা বেগম জেদ ধরে বললেন, "একদম না রিয়া! এটা তোমার জেদ করার সময় নয়। তোমার আর তোমার অনাগত সন্তানের জন্য এটা অবশ্যই জরুরি।"
সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। রিয়া লক্ষ্য করল, দায়িত্ব পাওয়ার কথা শুনে হরিশের নিস্প্রাণ চোখে যেন হঠাৎ এক অলৌকিক আলো ফুটে উঠেছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা অস্পষ্ট হাসি। রিয়া জানত, হরিশ তাকে অন্য নজরে দেখে, যা রিয়াকে চরম বিরক্ত করে। সেই মানুষটাই এখন তার ঘরের ভেতরে সর্বক্ষণ থাকবে ভাবতেই তার গা রি রি করে উঠল।
রিনা বেগম খাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার আগে হরিশকে ডেকে বললেন, "হরিশ, আজ তো আর হবে না। তুই কাল সকালে তোর জরুরি কিছু পোশাক-আশাক নিয়ে এখানে চলে আসিস। কাল থেকে তুই এখানেই থাকবি আর রিয়ার সবকিছুর খেয়াল রাখবি। বুঝলি?"
হরিশ বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বলল, "জি মেমসাব। আপনি চিন্তা করবেন না।"
হরিশের সেই বিনীত ভঙ্গির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে, তা কেবল রিয়াই কিছুটা আঁচ করতে পারছিল। কিন্তু বড়দের সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার শক্তি এই মুহূর্তে তার নেই।
সকাল ১০টা।
রিয়ার মা আরজুদা বেগম নিচ থেকে ডাক দিলেন, “রিয়া... রিয়া! ওঠ মা, অনেক বেলা হয়ে গেছে।”
রিয়া বিছানায় পাশ ফিরে চোখ মেলল। ঘুম ভাঙতেই প্রথম কথাটা তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “মা, রাতুল কি চলে গেছে?”
আরজুদা দরজার বাহির থেকে জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, অনেক সকালে উঠে অফিস চলে গেছে। তুই ঘুম থেকে উঠবি না, উঠে খেয়ে নে।”
রিয়া আস্তে করে বলল, “আমি আসছি মা। পাঁচ মিনিট।”
“আচ্ছা আয়,” বলে আরজুদা চলে গেলেন।
রিয়া ধীরে ধীরে উঠে বসল। শরীরটা এখনো ভারী লাগছিল। সে ওয়াশরুমে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে চোখ-মুখ ভালো করে ধুল। তারপর যখন হাত মুছছিল, তার চোখটা নিজের পেটের দিকে চলে গেল। হালকা গোলাপি নাইটির উপর থেকে সে আলতো করে হাত রাখল পেটে।
আমার পেটে বাচ্চা... কার?
রিয়ার হৃদয়টা দুরুদুরু করে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল।
রাতুলের বাচ্চা তো? নিশ্চয়ই রাতুলেরই। কিন্তু... না। রাতুলের সাথে যতবার শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে, প্রতিবারই সে পরে ইমার্জেন্সি পিল খেয়েছে। সে কখনো চায়নি এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা হোক। রাতুলও জানত না। সে সবসময় সাবধানে থাকত।
কিন্তু একবার... শুধু একবার সে ঔষধ খেতে ভুলে গিয়েছিল।
সেই ভয়ংকর রাতে। যেদিন হরিশ তাকে জোর করে...
রিয়ার শরীরটা শিউরে উঠল। তার হাতটা পেটের উপর থেকে সরে গেল না।
তবে কি... ওই দুষ্ট লোকটার বাচ্চাই আমার কোলে আসছে?
সময় মিলে যাচ্ছে। ছয় সপ্তাহ। ঠিক সেই রাতের পর থেকে তার শরীরে পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ঘুমের মধ্যে ঘাম, বমি ভাব, দুর্বলতা—সবকিছু বলছে একই কথা।
রিয়ার চোখে জল এসে গেল।
আমি কী করব? বাচ্চাটা নষ্ট করে দেব?
আমার বয়স তো মাত্র ২৩। একটা বাচ্চা ফেলে দিলে কী আর এমন হবে? রাতুলকে আমি মানিয়ে নিতে পারব। বলব, শরীর খারাপ ছিল, ডাক্তার বলেছে... কিন্তু আমার বাবা-মা? রাতুলের বাবা-মা? তাঁরা তো এখন খুশিতে আত্মহারা। নাতি-নাতনির স্বপ্ন দেখছেন। আমি কী করে তাঁদের খুশিটা কেড়ে নেব?
না... না...
বাচ্চা নষ্ট করা তো ঘোর অপরাধ। অনেক বড় গুনাহ। আর বাচ্চাটা কী দোষ করেছে? সে তো কোনো অন্যায় করেনি। সে শুধু আমার পেটে এসেছে।
রিয়া দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হচ্ছিল দুটো পথের মাঝে সে আটকে গেছে।
যদি রাতুল না মানে? যদি সে জানতে পারে বাচ্চাটা তার নয়? তাহলে কী হবে?
তবে কি আমি পালিয়ে যাব? আমার নামে বড় হবে বাচ্চাটা? একা একা লড়ব?
ঠিক তখনই নিচ থেকে আরজুদা বেগম আবার ডাক দিলেন, “রিয়া! কী করছিস মা? খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”
রিয়া চমকে উঠল। সে দ্রুত চোখ মুছে আয়নায় নিজের মুখ দেখল। চোখ লাল হয়ে আছে। সে গভীর করে শ্বাস নিয়ে আজেবাজে চিন্তাগুলো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল। তারপর ধীর পায়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে খেতে নিচে চলে গেল।
কিন্তু তার হাতটা এখনো অজান্তেই পেটের উপর চলে যাচ্ছিল।
ভেতরে একটা ছোট প্রাণ... যার বাবা কে, সে নিজেও এখনো নিশ্চিত নয়।
রিয়া ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে নিচতলায় খাবারের টেবিলে এসে মায়ের পাশে চুপচাপ বসে পড়ল। তার চোখ দুটো এখনো লাল, মুখটা ফ্যাকাশে।
রহমান মিয়া মেয়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী খেতে মন চায় তোর, মা? বল, আমি এনে দিই।”
রিয়া মাথা নিচু করে হালকা হেসে বলল, “বাবা, এভাবে বলার কী আছে? সবই তো তুমি এনে দাও।”
রহমান মিয়া আরজুদা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শোনো রিয়ার মা, বাচ্চা হওয়ার পর বাচ্চা আর মা দুজনেই এই বাসায় থাকবে। আমি আর ওই বাড়িতে পাঠাব না।”
আরজুদা বেগম একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “কেন? আমাদের ছোট্ট নানুভাইয়ের কি বাবার বাসা নেই? ওখানে তার দাদা-দাদি আছে, সবাই আছে।”
“না,” রহমান মিয়া দৃঢ় গলায় বললেন, “ওই ঘরে আমার মেয়ে আর যাবে না। যা হয়েছে, হয়েছে। এখন থেকে আমার মেয়ে আর নাতি এখানেই থাকবে।”
দুজনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। আরজুদা বেগম রাতুলের পক্ষ নিয়ে কথা বলছিলেন, আর রহমান মিয়া একের পর এক যুক্তি দিয়ে বলছিলেন যে রিয়াকে আর শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো যাবে না। রিয়া চুপচাপ বসে সব শুনছিল, কিন্তু কিছুই বলছিল না। তার মাথার ভেতর তখন অন্য চিন্তা ঘুরছিল।
সকালের খাওয়ার পর রিয়া উপরের রুমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল।
দুপুর বেলা
জানালা দিয়ে নরম রোদ এসে পড়ছিল। সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল, কিন্তু ঘুম আসছিল না। হঠাৎ তার রুমের দরজায় টোকা পড়ল।
রিয়া চোখ না খুলেই বলল, “মা, আমি পরে খেতে আসব। একটু শুয়ে থাকি।”
কিন্তু টোকা থামল না। বারবার, জোরে জোরে টোকা পড়তে লাগল।
বিরক্ত হয়ে রিয়া উঠে দরজা খুলল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে হরিশ।
রিয়ার সারা শরীর যেন হিম হয়ে গেল। সেই ভয়ংকর রাতের স্মৃতি এক মুহূর্তে ঝড়ের মতো ফিরে এল। তার কপালে তৎক্ষণাৎ ঘাম জমতে শুরু করল। পা দুটো কাঁপতে লাগল।
“তুমি... তুমি এখানে? তুমি এখানে কেন এসেছ?” রিয়ার গলা কাঁপছিল।
হরিশ দ্রুত ভেতরে ঢুকে পেছন থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। তার চোখে সেই চেনা লোভী দৃষ্টি নয়, বরং একটা তীক্ষ্ণ, জিজ্ঞাসু ভাব। আবারো সেই দরজা বন্ধ ক্ল্রার দৃশ্য রিয়ার সামনে।
রিয়া পিছিয়ে গিয়ে বলল, “চলে যাও... এখান থেকে চলে যাও তুমি!”
হরিশ নিচু কিন্তু ধমকের সুরে বলল, “চুপ! একদম চুপ!”
রিয়া ভয়ে একেবারে চুপ হয়ে গেল। তার গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না।
হরিশ একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “শুনলাম, তুমি প্রেগন্যান্ট। তাই রাতুলের বাবা-মা তোমাকে দেখতে এসেছে। আমি শুধু একটা কথা জানতে এসেছি... এই বাচ্চা কি রাতুলের?”
রিয়া ভীত, কাঁপা গলায় বলল, “রাতুলের হবে না তো কার হবে?”
হরিশ তার চোখে সরাসরি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি?”
“চলে যাও এখান থেকে!” রিয়া প্রায় কান্নার সুরে বলল।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে মমতা বেগমের গলা ভেসে এল, “রিয়া ম্যাডাম! আপনাকে ডাকছে। আপনার শ্বশুর-শাশুড়ি এসেছেন।”
মমতা কথাটা বলেই চলে গেল।
হরিশ বুঝতে পারল যে যেকোনো সময় কেউ উপরে চলে আসতে পারে। সে আর কথা বাড়াল না। একটা শেষবার রিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে দরজা খুলে দ্রুত বেরিয়ে গেল।
রিয়া দরজা বন্ধ করে দিয়ে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তার বুকটা হাঁফাচ্ছিল। সে অনেকক্ষণ ধরে হাঁফ ছাড়ল। কিন্তু স্বস্তি পেল না।
তাকে এখনই নিচে যেতে হবে।
শ্বশুর-শাশুড়ির সামনে।
যাঁরা এখন তার পেটের বাচ্চাটাকে নিয়ে খুব খুশি।
রিয়ার পা দুটো যেন আর সরছিল না।
খানিক বাদে রিয়া সিঁড়ি দিয়ে ধীরপায়ে নিচে নেমে এল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার শাশুড়ি রিনা বেগম এগিয়ে এসে তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন।
"কেমন আছো মা? শরীরটা এখন কেমন?" রিনা বেগমের কণ্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ।
রিয়া মৃদু হেসে বলল, "আমি ভালো আছি মা। আপনি কেমন আছেন? আসার সময় কোনো অসুবিধা হয়নি তো?"
কুশল বিনিময়ের মাঝেই রিনা বেগম তার সাথে আনা ব্যাগ থেকে একটি ছোট মখমলের বাক্স বের করলেন। বাক্স খুলতেই ঝিলিক দিয়ে উঠল একটি চমৎকার কোমরবন্দ বা বিছা, যা নিখাদ সোনার তৈরি। তিনি অতি যত্ন করে রিয়ার কোমরে সেটি পরিয়ে দিলেন। বললেন, "এটা আমাদের বংশের রীতি মা, বংশের প্রদীপ আসার আগে হবু মাকে এটা পরিয়ে দিতে হয়।"
রিয়াকে এতে অনেক সুন্দর লাগতে ছিল, হরিশ তার কোমরের দিকে চেয়েই রয়।
গহনা পরানোর সেই মুহূর্তে রিয়ার নজর গেল ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে থাকা হরিশের দিকে। মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলো। হরিশের সেই অদ্ভুত চাউনি দেখে রিয়া অস্বস্তিতে কুঁকড়ে গেল, তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল সে।
এরপর সবাই মিলে দুপুরের খাবার টেবিলে বসল। খাবারের মাঝেই রিনা বেগম আর রিয়ার মা আরজুদার মধ্যে আলাপ জমে উঠল।
**রিনা বেগম:** "দেখুন বেয়াইন সাহেব, রিয়া এখন ৬ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। এই সময়টা খুব সাবধানে থাকতে হয়। কিন্তু আপনার তো একা হাতে সব সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। রিয়ার পাশে সার্বক্ষণিক ছায়ার মতো থাকা দরকার এমন কাউকে কি পাওয়া যাবে?"
**আরজুদা:** "আমিও তো সেই চিন্তাই করছি। আমাদের মমতা আছে, ওকে বলেছিলাম একটু দেখাশোনা করতে। কিন্তু মমতা তো সাফ জানিয়ে দিল— 'ওরে বাবা! বাচ্চা পালার ঝুকি আমি নিতে পারবো না, অনেক কষ্ট মাইরি!' এখন ভালো বিশ্বাসী কাউকে তো দেখছি না।"
মমতার সোজাসাপ্টা কথা শুনে টেবিলে হাসির রোল উঠলেও চিন্তার ভাঁজ কাটল না। ঠিক তখনই রিনা বেগম কিছুক্ষণ চুপ থেকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা হরিশের দিকে তাকালেন। হরিশ তাদের বাড়িতে অনেকদিন ধরে কাজ করে, বেশ বিশ্বস্ত।
**রিনা বেগম:** "আচ্ছা, একটা কাজ করলে কেমন হয়? হরিশকে যদি এখানে কয়েকদিনের জন্য রাখি? ও খুব কর্মঠ আর দায়িত্বশীল।"
পাশে থাকা রিয়া কথা শুনেই গাঁ শিউরে উঠল।
আরজুদা কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, "কিন্তু রিনা আপা, রিয়া তো মেয়ে মানুষ। একজন পুরুষ মানুষকে ওর দেখভালের দায়িত্ব দেব, এটা কেমন দেখায় না? আমার একটু সংকোচ হচ্ছে।"
**রিনা বেগম:** "আরে না না, সংকোচের কিছু নেই। হরিশকে আমি এত দিন যে দেখছি। ও শুধু কাজের লোক না, আমাদের পরিবারেরই একজন। ওর হাতের কাজ যেমন পরিষ্কার, তেমনি ও খুব যত্নশীল। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, হরিশ থাকলে আপনার অর্ধেক চিন্তা কমে যাবে।"
রিনা বেগমের প্রশংসা শুনে আরজুদা কিছুটা সাহস পেলেন। রিয়া পাশ থেকে সব শুনছিল। তার ভেতরটা অজান আশঙ্কা আর বিরক্তিতে ভরে উঠল। সে বাধা দিয়ে বলল, "না মা, কাউকে লাগবে না তো। আমি নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারব।"
রিনা বেগম জেদ ধরে বললেন, "একদম না রিয়া! এটা তোমার জেদ করার সময় নয়। তোমার আর তোমার অনাগত সন্তানের জন্য এটা অবশ্যই জরুরি।"
সিদ্ধান্ত হয়ে গেল। রিয়া লক্ষ্য করল, দায়িত্ব পাওয়ার কথা শুনে হরিশের নিস্প্রাণ চোখে যেন হঠাৎ এক অলৌকিক আলো ফুটে উঠেছে। তার ঠোঁটের কোণে একটা অস্পষ্ট হাসি। রিয়া জানত, হরিশ তাকে অন্য নজরে দেখে, যা রিয়াকে চরম বিরক্ত করে। সেই মানুষটাই এখন তার ঘরের ভেতরে সর্বক্ষণ থাকবে ভাবতেই তার গা রি রি করে উঠল।
রিনা বেগম খাওয়ার পর বিদায় নেওয়ার আগে হরিশকে ডেকে বললেন, "হরিশ, আজ তো আর হবে না। তুই কাল সকালে তোর জরুরি কিছু পোশাক-আশাক নিয়ে এখানে চলে আসিস। কাল থেকে তুই এখানেই থাকবি আর রিয়ার সবকিছুর খেয়াল রাখবি। বুঝলি?"
হরিশ বিনীতভাবে মাথা নিচু করে বলল, "জি মেমসাব। আপনি চিন্তা করবেন না।"
হরিশের সেই বিনীত ভঙ্গির আড়ালে কী লুকিয়ে আছে, তা কেবল রিয়াই কিছুটা আঁচ করতে পারছিল। কিন্তু বড়দের সিদ্ধান্তের ওপর কথা বলার শক্তি এই মুহূর্তে তার নেই।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)