Today, 09:02 AM
পর্ব ১
ঢাকার সীমান্তলগ্নে, যেখানে শহরের কংক্রিট আর কিছু সবুজ একসাথে মিশে যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাড়িটার বাইরের দেয়াল হালকা ক্রিম রঙের, কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কোথাও কোথাও খয়েরি ছোপ ধরেছে। সামনের ছোট্ট বাগানে কয়েকটা আম আর কাঁঠালের গাছ, তার নিচে পড়ে আছে কিছু শুকনো পাতা। সকালের আলো এখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি, কুয়াশা আর ধুলো মেশানো হালকা একটা আভা চারদিকে।
দোতলার গোলাপি রুমটায় সকালের নরম আলো এসে পড়েছে জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে। রুমের ভেতরটা গোলাপি আর সাদায় মোড়া। বিছানায় শুয়ে আছে রিয়া। তার পাশে একটা বড়, সুন্দর পুতুল—চোখ বড় বড়, চুল কোঁকড়ানো। রিয়া ঘুমের মধ্যে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, তার কপালে, গলায় ঘামের ফোঁটা জমেছে। শরীরটা অস্থিরভাবে নড়ছে।
“রিয়া... রিয়া... এই রিয়া! কী হচ্ছে তোর? তুই কি অসুস্থ?”
রিয়ার মা আরজুদা বেগমের গলা ভেসে আসছে দরজার বাইরে থেকে। অনেকবার ডাকার পরেও যখন কোনো সাড়া মিলল না, তিনি ভেতরে ঢুকে রিয়ার শরীরে হালকা ধাক্কা দিলেন।
রিয়ার চোখ খুলে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল, তারপর বুঝতে পারল—এটা শুধুই স্বপ্ন ছিল। সে উঠে বসে তার মাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
আরজুদা বেগম তার একমাত্র সন্তানের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে তোর? ভয় পাচ্ছিস নাকি?”
রিয়া কিছু বলল না। শুধু মাকে আরও জোরে জড়িয়ে রইল। আরজুদা তার মেয়ের পিঠে, কাঁধে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। তাঁর চোখে মায়ের সেই অদ্ভুত ভয়—একমাত্র সন্তানকে সব খারাপ শক্তি, সব দুঃস্বপ্ন থেকে রক্ষা করার অসহায় ইচ্ছে।
প্রায় পাঁচ মিনিট জড়িয়ে থাকার পর আরজুদা আস্তে আস্তে বললেন,
“রিয়া, যা মুখ ধুয়ে আয়। খাবার বানাচ্ছি, খেয়ে নে।”
বলে তিনি উঠে নিচতলার রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
.....
মা চলে যাওয়ার পরেও রিয়ার শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। এসির ঠান্ডা হাওয়া সত্ত্বেও তার কপাল ভিজে উঠছিল। বড় ঘর, বাবা-মা, নিরাপদ আশ্রয়—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সে যেন একা, নিরুপায়। স্বপ্নটা এখনো তার বুকের ভেতর কাঁপছিল। কী দেখেছে সে যে এত ভয়? রিয়া চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নিল, কিন্তু স্বস্তি পেল না।
রিয়া ক্লান্ত শরীরটা টেনে বাথরুমে গেল। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাল। তার চেহারা এখনো নাদান, প্রায় কিশোরীর মতো সরল। চোখ দুটো বড় বড়, গালে হালকা লাল আভা। ২৩ বছর বয়সে সে দেখতে এত সুন্দর যে পাড়ার অনেকেই তাকে “পুতুলের মতো” বলে ডাকে। চঞ্চল স্বভাবের এই মেয়েটা বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের ধন। লেখাপড়ায়ও সে ছিল দুরন্ত—হাই সিজিপিএ নিয়ে বিএসসি কমপ্লিট করেছে। কিন্তু আজ সকালে সেই চঞ্চল রিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিচতলায় ডাইনিং টেবিলে রহমান মিয়া বসে ছিলেন, খবরের কাগজ খুলে কিন্তু চোখটা বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল। আরজুদা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “তুমি খেয়ে নাও।” কাজের লোক মমতা বেগম চুপচাপ খাবার বেড়ে দিতে লাগল।
রহমান মিয়া চিন্তিত গলায় বললেন, “বলেছিলাম ওই বাড়িতে বিয়ে দিব না। তুমি কী বললে? রাতুলের মতো ছেলে হয় না।”
আরজুদা একটু বিরক্ত হয়ে জবাব দিলেন, “তুমি শুধু রাতুলের দোষই ধরো। রাতুল এখন তোমার মেয়ের স্বামী।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই বাড়ি গিয়েই আমার মেয়ের সমস্যা হয়েছে,” রহমান গলা তুলে বললেন।
আরজুদা শান্ত কণ্ঠে বললেন, “তোমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর। দেড় মাস আগে অসুস্থ হয়ে বাসায় এসেছে। ঠিক হয়ে গেলে আবার স্বামীর বাসায় চলে যাবে।”
রহমান দৃঢ় গলায় বললেন, “আমার মেয়েকে আর পাঠাচ্ছি না। বলে রাখলাম।”
আরজুদা হালকা হেসে বললেন, “তা দেখা যাবে।”
ঠিক তখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল রিয়া। রহমান মিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে মা, শরীর এখনো খারাপ?”
রিয়া মৃদু হেসে বলল, “না বাবা, আমি ঠিক আছি।”
সে বাবাকে টেনশন দিতে চায়নি। কারণ একবার কথা উঠলেই বাবা রাতুলকে দোষারোপ করতে শুরু করবেন।
এরেঞ্জ ম্যারেজ হলেও রিয়া আর রাতুলকে দেখলে মনে হয় যেন লাভ ম্যারেজ। রাতুল আরজুদা বেগমের চাচাতো বোনের ছেলে—খুব ভালো চাকরি করে, বাবা-মায়ের প্রতি অগাধ সম্মান, আর রিয়াকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে। রিয়া তার শ্বশুরবাড়ি যেতে চায়, কিন্তু সেখানে কেন যেন একটা অজানা ভয় তাকে আটকে রাখে। সেই ভয়টা কীসের—সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না। শুধু মনে হয়, ওই বাড়িতে কিছু একটা আছে যা তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
....
আরজুদা বেগম নরম গলায় বললেন, “তুই খেয়ে নে তো মা, ঠিকমত খাস না, তাই এত দুর্বল লাগে।”
রিয়ার সামনে রাখা ছিল দুটো টোস্ট আর একটা ডিম সেদ্ধ। কাজের মহিলা মমতা বেগম আলতো করে বলল, “ছোট মালকিন, আরো লাগলে জানাবেন।” রিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। আরজুদা তাড়া দিয়ে বললেন, “খা, নে খেয়ে নিয়ে বাকি কিছু।”
রিয়া হাত বাড়িয়ে খাবার তুলতে গেল। হঠাৎ তার মাথা ঘুরে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। সে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মমতা বেগম দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
রহমান মিয়া উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কী হলো রিয়া মা?”
রিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আরজুদা বেগম তার মেয়ের হাত মালিশ করতে করতে অস্থির হয়ে পড়লেন। রহমান মিয়া তড়িঘড়ি করে এম্বুলেন্স ডেকে মেয়েকে ঢাকার সেরা হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
সন্ধ্যা বেলা।
হাসপাতালের সাদা বেডে শুয়ে আছে রিয়া। তার দুপাশে বাবা আর মা। রুমের আলোটা নরম, কিন্তু বাতাসে উদ্বেগের গন্ধ।
রহমান মিয়া মেয়ের কপালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “মা, এখন কেমন লাগছে?”
আরজুদা বেগম ফোনটা হাতে নিয়ে বললেন, “রাতুল আমাকে ফোন দিয়েছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। তোকে দেখতে আসছে।”
রহমান মিয়া রাগত গলায় বললেন, “ওই শয়তানের নাম আমার মেয়ের সামনে নিবা না।”
রিয়া ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “বাবা প্লিজ, এভাবে কেন বলো তুমি সবসময়? ও তো এ ঘরের জামাই।”
“জামাই? আমি মানি না,” রহমান মিয়া মুখ ফিরিয়ে বললেন।
রিয়া চোখে জল এনে বলল, “বাবা প্লিজ, তুমি যদি ওর নামে আরেকটা খারাপ কথা বলো, আমি আমার শ্বশুরবাড়ি চলে যাব।”
রিয়ার এই হুমকিতে রহমান মিয়া চুপ করে গেলেন। ঘরে আর কোনো কথা হলো না।
একটু পরেই একজন মহিলা ডাক্তার ঘরে ঢুকলেন। তাঁর মুখে মুচকি হাসি। তিনি রহমান সাহেবের পারিবারিক ডাক্তার।
আরজুদা বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “ডাক্তার, কোনো দুঃসংবাদ নাকি? ও দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।”
ডাক্তার হেসে বললেন, “দুর্বল হবে কেন? এখন তো আগত মেহমানের চিন্তাও করতে হবে, তাই না রিয়া?”
পুরো রুম নিশ্চুপ হয়ে গেল।
রিয়া হা করে অবাক দৃষ্টিতে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছিল।
আরজুদা বেগম বিস্ময়ে বলে উঠলেন, “কী বলছেন ডাক্তার? কিছু বুঝছি না।”
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, “রিয়া মা হতে চলেছে। ছয় সপ্তাহ বয়স।”
পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রিয়া কী শুনল? সত্যি সে মা হবে? কিন্তু…… তার চোখে এক অদ্ভুত ভয় আর বিস্ময় মিশে গেল।
ঢাকার সীমান্তলগ্নে, যেখানে শহরের কংক্রিট আর কিছু সবুজ একসাথে মিশে যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাড়িটার বাইরের দেয়াল হালকা ক্রিম রঙের, কিন্তু বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কোথাও কোথাও খয়েরি ছোপ ধরেছে। সামনের ছোট্ট বাগানে কয়েকটা আম আর কাঁঠালের গাছ, তার নিচে পড়ে আছে কিছু শুকনো পাতা। সকালের আলো এখনো পুরোপুরি ছড়ায়নি, কুয়াশা আর ধুলো মেশানো হালকা একটা আভা চারদিকে।
দোতলার গোলাপি রুমটায় সকালের নরম আলো এসে পড়েছে জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে। রুমের ভেতরটা গোলাপি আর সাদায় মোড়া। বিছানায় শুয়ে আছে রিয়া। তার পাশে একটা বড়, সুন্দর পুতুল—চোখ বড় বড়, চুল কোঁকড়ানো। রিয়া ঘুমের মধ্যে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, তার কপালে, গলায় ঘামের ফোঁটা জমেছে। শরীরটা অস্থিরভাবে নড়ছে।
“রিয়া... রিয়া... এই রিয়া! কী হচ্ছে তোর? তুই কি অসুস্থ?”
রিয়ার মা আরজুদা বেগমের গলা ভেসে আসছে দরজার বাইরে থেকে। অনেকবার ডাকার পরেও যখন কোনো সাড়া মিলল না, তিনি ভেতরে ঢুকে রিয়ার শরীরে হালকা ধাক্কা দিলেন।
রিয়ার চোখ খুলে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে বিছানায় চুপ করে শুয়ে রইল, তারপর বুঝতে পারল—এটা শুধুই স্বপ্ন ছিল। সে উঠে বসে তার মাকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
আরজুদা বেগম তার একমাত্র সন্তানের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে তোর? ভয় পাচ্ছিস নাকি?”
রিয়া কিছু বলল না। শুধু মাকে আরও জোরে জড়িয়ে রইল। আরজুদা তার মেয়ের পিঠে, কাঁধে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। তাঁর চোখে মায়ের সেই অদ্ভুত ভয়—একমাত্র সন্তানকে সব খারাপ শক্তি, সব দুঃস্বপ্ন থেকে রক্ষা করার অসহায় ইচ্ছে।
প্রায় পাঁচ মিনিট জড়িয়ে থাকার পর আরজুদা আস্তে আস্তে বললেন,
“রিয়া, যা মুখ ধুয়ে আয়। খাবার বানাচ্ছি, খেয়ে নে।”
বলে তিনি উঠে নিচতলার রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
.....
মা চলে যাওয়ার পরেও রিয়ার শরীর থেকে ঘাম ঝরছিল। এসির ঠান্ডা হাওয়া সত্ত্বেও তার কপাল ভিজে উঠছিল। বড় ঘর, বাবা-মা, নিরাপদ আশ্রয়—সবকিছু থাকা সত্ত্বেও সে যেন একা, নিরুপায়। স্বপ্নটা এখনো তার বুকের ভেতর কাঁপছিল। কী দেখেছে সে যে এত ভয়? রিয়া চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নিল, কিন্তু স্বস্তি পেল না।
রিয়া ক্লান্ত শরীরটা টেনে বাথরুমে গেল। ঠান্ডা পানিতে মুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাল। তার চেহারা এখনো নাদান, প্রায় কিশোরীর মতো সরল। চোখ দুটো বড় বড়, গালে হালকা লাল আভা। ২৩ বছর বয়সে সে দেখতে এত সুন্দর যে পাড়ার অনেকেই তাকে “পুতুলের মতো” বলে ডাকে। চঞ্চল স্বভাবের এই মেয়েটা বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের ধন। লেখাপড়ায়ও সে ছিল দুরন্ত—হাই সিজিপিএ নিয়ে বিএসসি কমপ্লিট করেছে। কিন্তু আজ সকালে সেই চঞ্চল রিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিচতলায় ডাইনিং টেবিলে রহমান মিয়া বসে ছিলেন, খবরের কাগজ খুলে কিন্তু চোখটা বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছিল। আরজুদা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “তুমি খেয়ে নাও।” কাজের লোক মমতা বেগম চুপচাপ খাবার বেড়ে দিতে লাগল।
রহমান মিয়া চিন্তিত গলায় বললেন, “বলেছিলাম ওই বাড়িতে বিয়ে দিব না। তুমি কী বললে? রাতুলের মতো ছেলে হয় না।”
আরজুদা একটু বিরক্ত হয়ে জবাব দিলেন, “তুমি শুধু রাতুলের দোষই ধরো। রাতুল এখন তোমার মেয়ের স্বামী।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই বাড়ি গিয়েই আমার মেয়ের সমস্যা হয়েছে,” রহমান গলা তুলে বললেন।
আরজুদা শান্ত কণ্ঠে বললেন, “তোমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর। দেড় মাস আগে অসুস্থ হয়ে বাসায় এসেছে। ঠিক হয়ে গেলে আবার স্বামীর বাসায় চলে যাবে।”
রহমান দৃঢ় গলায় বললেন, “আমার মেয়েকে আর পাঠাচ্ছি না। বলে রাখলাম।”
আরজুদা হালকা হেসে বললেন, “তা দেখা যাবে।”
ঠিক তখন সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল রিয়া। রহমান মিয়া উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কিরে মা, শরীর এখনো খারাপ?”
রিয়া মৃদু হেসে বলল, “না বাবা, আমি ঠিক আছি।”
সে বাবাকে টেনশন দিতে চায়নি। কারণ একবার কথা উঠলেই বাবা রাতুলকে দোষারোপ করতে শুরু করবেন।
এরেঞ্জ ম্যারেজ হলেও রিয়া আর রাতুলকে দেখলে মনে হয় যেন লাভ ম্যারেজ। রাতুল আরজুদা বেগমের চাচাতো বোনের ছেলে—খুব ভালো চাকরি করে, বাবা-মায়ের প্রতি অগাধ সম্মান, আর রিয়াকে সত্যিই অনেক ভালোবাসে। রিয়া তার শ্বশুরবাড়ি যেতে চায়, কিন্তু সেখানে কেন যেন একটা অজানা ভয় তাকে আটকে রাখে। সেই ভয়টা কীসের—সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারে না। শুধু মনে হয়, ওই বাড়িতে কিছু একটা আছে যা তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
....
আরজুদা বেগম নরম গলায় বললেন, “তুই খেয়ে নে তো মা, ঠিকমত খাস না, তাই এত দুর্বল লাগে।”
রিয়ার সামনে রাখা ছিল দুটো টোস্ট আর একটা ডিম সেদ্ধ। কাজের মহিলা মমতা বেগম আলতো করে বলল, “ছোট মালকিন, আরো লাগলে জানাবেন।” রিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। আরজুদা তাড়া দিয়ে বললেন, “খা, নে খেয়ে নিয়ে বাকি কিছু।”
রিয়া হাত বাড়িয়ে খাবার তুলতে গেল। হঠাৎ তার মাথা ঘুরে উঠল। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। সে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মমতা বেগম দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
রহমান মিয়া উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কী হলো রিয়া মা?”
রিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আরজুদা বেগম তার মেয়ের হাত মালিশ করতে করতে অস্থির হয়ে পড়লেন। রহমান মিয়া তড়িঘড়ি করে এম্বুলেন্স ডেকে মেয়েকে ঢাকার সেরা হাসপাতালে নিয়ে গেলেন।
সন্ধ্যা বেলা।
হাসপাতালের সাদা বেডে শুয়ে আছে রিয়া। তার দুপাশে বাবা আর মা। রুমের আলোটা নরম, কিন্তু বাতাসে উদ্বেগের গন্ধ।
রহমান মিয়া মেয়ের কপালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “মা, এখন কেমন লাগছে?”
আরজুদা বেগম ফোনটা হাতে নিয়ে বললেন, “রাতুল আমাকে ফোন দিয়েছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। তোকে দেখতে আসছে।”
রহমান মিয়া রাগত গলায় বললেন, “ওই শয়তানের নাম আমার মেয়ের সামনে নিবা না।”
রিয়া ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “বাবা প্লিজ, এভাবে কেন বলো তুমি সবসময়? ও তো এ ঘরের জামাই।”
“জামাই? আমি মানি না,” রহমান মিয়া মুখ ফিরিয়ে বললেন।
রিয়া চোখে জল এনে বলল, “বাবা প্লিজ, তুমি যদি ওর নামে আরেকটা খারাপ কথা বলো, আমি আমার শ্বশুরবাড়ি চলে যাব।”
রিয়ার এই হুমকিতে রহমান মিয়া চুপ করে গেলেন। ঘরে আর কোনো কথা হলো না।
একটু পরেই একজন মহিলা ডাক্তার ঘরে ঢুকলেন। তাঁর মুখে মুচকি হাসি। তিনি রহমান সাহেবের পারিবারিক ডাক্তার।
আরজুদা বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, “ডাক্তার, কোনো দুঃসংবাদ নাকি? ও দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।”
ডাক্তার হেসে বললেন, “দুর্বল হবে কেন? এখন তো আগত মেহমানের চিন্তাও করতে হবে, তাই না রিয়া?”
পুরো রুম নিশ্চুপ হয়ে গেল।
রিয়া হা করে অবাক দৃষ্টিতে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁট কাঁপছিল।
আরজুদা বেগম বিস্ময়ে বলে উঠলেন, “কী বলছেন ডাক্তার? কিছু বুঝছি না।”
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন, “রিয়া মা হতে চলেছে। ছয় সপ্তাহ বয়স।”
পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রিয়া কী শুনল? সত্যি সে মা হবে? কিন্তু…… তার চোখে এক অদ্ভুত ভয় আর বিস্ময় মিশে গেল।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)