(১০৯)
মায়াজাল
সকাল সকাল উঠেই পোলার বাপ, আই মিন আরাফাতের একটা মেসেজ পেয়ে হাসি পেলো। ছেলেটা সত্যিই অনেক সোজাসরল মনের। সে লিখেছে— “মিম, গত কালের জন্য আমি স্যরি গো। আমার উচিৎ হয়নি ওমন ছবি তোমাকে পাঠানো। জানিনা তুমি আমাকে খারাপ ভেবেছো। তাই আবারো স্যরি। আসলেই আমার মাথা কাজ করছিলোনা তখন। আর আরেকটা কথা, আমাকে শান্তনা দেবার জন্য থ্যাংক্স।”
চ্যাট হিস্ট্রি স্ক্রল করে পোলার বাপের পাঠানো ছবিটা আবারো দেখলাম এক পলক। হি হি হি। পোলার বাপ স্যরি বলে ঠিক ই করেছে---এমন ছবি কেউ কাউকে দেখাই! ছেলেটা যে কতটা কস্টের মধ্যে গেসে তার পাঠানো ছবিটাই তা প্রমাণ।
আমি তাকে কোনোই উত্তর দিলাম না। যাস্ট হাসির একটা ইমোজি পাঠিয়ে ফোন রেখে উঠে গেলাম। ফ্রেস হবো। মা চিল্লাইতে চিল্লাইতে গলা ব্যাথা করে দিয়েছে।
নাহ। কিছুটা একটা লিখি। পোলার বাপের সাথে একটু দুষ্টামি করি।
“আমি তোমাদের যা দেখার দেখে ফেলেছি। আর স্যরি বলে কি লাভ।” মেসেজটা দিয়েই হা হা ইমোজি পাঠিয়ে লাইন থেকে বের হয়ে গেলাম।
আমার নিজেরি হাসি পাচ্ছে। ছেলেটা সত্যি অনেক ভালো। এমন ভালো ছেলেকে মেয়েটা কিভাবে এভাবে ঠকালো!
উঠেই ফ্রেস হতে গিয়ে মায়ের রুমে সেবহান আংকেলের কণ্ঠ পেলাম। এত্ত সকাল সকাল উনি এসেছেন!!!
বাথরুমে না ঢুকে দরজায় আড়ি পাতলাম। যদিও এসবে আমার অভ্যাস নাই। কিন্তু লোকটি রাব্বীলের কেস নিয়ে লড়ছেন। তাই আগ্রহ কাজ করলো।
আংকেল—ভাবি, আমার মনে হয় ওরা এলাকার টোকাই হবে। এই নিয়ে টেনশান করিয়েন না। আমি দেখতেছি।
মা—না ভাইয়া। ওরা টোকাই না। আমি ওদের চিনি। এরা দলীয় লোকজন। নতুন ক্ষমতা পেয়েছে। এখন মানুষের জান-মাল নিয়ে লুটে খাবে।
“তার মানে আপনি এখানকার যুবদলের লোকদের সন্দেহ করছেন?”
“সন্দেহ করছিনা। ওরাই ছিলো। কত্তবড় সাহস, এসে বলে কিনা এই জায়গায় মার্কেট তুলবে। অমানুষের বাচ্চারা, জায়গা কি তোদের বাপের যে, মার্কেট তুলবি!!”
“শান্ত হন ভাবি। আমি দেখছি।এখানকার বি এন পির ছেলেপুলেরা তো এতোবড় অন্যায় কাজ করার সাহস করতে পারেনা। আমি কথা বলছি ওদের সাথে।”
“আপনি জানেন না ভাইয়া, পাশের গলির একটা ফাকা জায়গা ছিলো। জায়গাটা একজন ডাক্তারের। খুউব সাধারন মানুষ। এই যুবদলের লোকেরাই এসে দখল করে নিয়েছে।”
“কিইইই!! সত্যিই এরা একাজ করছে?”
“সেই জন্যেই আপনাকে ডাকা ভাইয়া। আজ রাব্বীল থাকলে আমার এতো চিন্তা করা লাগতোনা। জামাইটা যতদিন আমাদের বাসায় ছিলো, কেউ গলা উচিয়ে কথা বলার সাহস পাইনি। এখন অমানুষগুলা আমাদের একা পেয়েছে। সুযোগ নিচ্ছে।”
রাব্বীলের কথা উঠতেই মনটা ভারি হয়ে গেলো আমার। সত্যিই, রাব্বীল যতদিন বাসায় ছিলো, এবাসা নিরাপদ ছিলো। আব্বু মারা যাবার পর অনেকেই এবাসার উপর কুনজর দিয়েছে। অনেকেই ঝামেলাও করেছে। সেই জন্যেই রাব্বীলকে ঘর জামাই হিসেবেই রাখা। রাব্বীল যে ৩মাস আমাদের সাথে ছিলো, আমরা ছিলাম নিরাপদ। আজ রাব্বীল আমাদের ছেরে বহুদুরে। আমরা একা। কেউ নেই আর আমাদের পাশে থাকার। আমরা বড় একা।
ওয়াসরুম আর গেলাম না। খুউব কান্না পাচ্ছে। নিজেকে বড্ড একা লাগছে। রাব্বীল ছাড়া আমি নিশ্ব–---আসতে ধিরে তা টের পাচ্ছি।
চললাম সোজা রুমে। আমার কান্না দরকার। খুউউব জোরে। অনেকক্ষন।
রুমে ঢুকেই বালিশে মুখ চাপা দিয়ে পড়ে গেলাম।
রাব্বীল, তুমি আমাদের এভাবে একা ফেলে কেন চলে গেলে! তুমি জানতে না, তুমি ছাড়া এই পরিবারটা বড় অসহাই।
—Hellow Boss, you have new message—
ফোনে মেসেজ আসলো। চোখের পানি মুছে ফোন চেক করলাম। আরাফাত মেসেজ করেছে।
মেসেজটা পেয়ে যেন কান্না আরো বেরে গেলো। এই মুহুর্তে আরাফাতকে সামনে পেলে তাকে জড়িয়ে ধরে কাদতাম।
সে লিখেছে— “কেমন আছো মিম?”
আমি কি লিখবো? ভালো আছি? নাকি মিত্থা বলবো?
“আমার খুউব কান্না পাচ্ছে আরাফাত।”
জানিনা কেন এটা করলাম। অপরিচিত একজন ছেলেকে নিজের কান্নার কথা অকপটে বলে দিলাম। এই মুহুর্তে দুনিয়ায় আমি একা। গভীর সমুদ্রে অথৈ পানিতে ভাসছি। নেই কোনো কুল কিনারা। রাব্বীল ই ছিলো আমাদের একমাত্র ভরসা।
“কেন? কি হয়েছে? রাত্রে আমার ব্যাপারে রাগ করেছো? স্যরি মিম? বিশ্বাস করো আমার তখন মাথা ঠিক ছিলোনা। কি করতে কি করেছি জানিনা। আমার ঐ ছবিগুলা দেওয়া ঠিক হয়নি। প্লিজ কান্না করোনা। আমায় ক্ষমা করো। প্লিইইইজ মিম।”
পাগল ছেলে একটা। আমি মরছি আমার জালাই। আর সে পড়ে আছে রাতের ঘটনাই। ধ্যাৎ!!!
“আমি তোমার কথায় কান্না করছিনা। বুদ্ধু।”
“তাহলে? কি হয়েছে, বলো তো?”
“জানিনা। খুউব একা লাগছে নিজেকে। যেন বিশাল এই দুনিয়ায়, আমি বড্ড একা। কেউ নেই চারিপাশে।”
“মিম, জানিনা কি জন্যে তোমার মন খারাপ। তবে এটা তো সত্য মিম, অন্তত আমি বিশ্বাস করি, এই দুনিয়ায় আমার বিশ্বস্ত বন্ধু বলতে কেউ যদি থেকে থাকে, তবে সেটা তুমি। যে বন্ধু আমাকে গত রাতে যাস্ট কথা বলেই মৃত্যুর হাত থেকে বাচিয়েছে। জানো মিম, এই মুহুর্তে তোমার যেই অনুভুতি হচ্ছে, গত কাল আমারো সেম হচ্ছিলো। তুমিই আমার হাত ধরেছিলে। আজ তোমার বন্ধু তোমার পাশে দাঁড়িয়ে সাহসের হাত, বিশ্বস্তের হাত, জীবনে চলার শক্তির হাত এগিয়ে দিয়েছে। তুমি এই হাতকে বিশ্বাস করলে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। অন্তত একটা কথাই বলবো, তোমার বন্ধু থাকতে, নিজেকে একা ভেবোনা মিম।”
যেন পাশে থেকে কেউ কথা গুলো বলছে আমায়। স্ক্রিনে তাকিয়ে আছি। কথাগুলো বারবার পড়ছি। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
“..........”
“মিম?”
“হু।”
“উনার কথা মনে পড়ছে? নাকি অন্য ইস্যু?”
“দুটোই। জানো আরাফাত, আমাদের পরিবারটা রাব্বীলের উপর ভরসাই ছিলো। সে আমাদের পরিবারের কর্তা ছিলো। সে চলে যাওয়াতে আমি আর মা একদম একা হয়ে পড়েছি। দুর্বল পেলে পিপড়াও হাতিকে লাত্থি দেই–-এমনটা হইসে আমাদের বর্তমান অবস্থা। পাশের কিছু দলীয় টোকাই বাসাই এসে ঝামেলা করছে। রাব্বীল ছাড়া আমাদের পরিবারের কেউ ছিলোনা। আজ……”
আর লিখতে পারলাম না। চোখ আবছা হয়ে গেছে জলে। ফোনের স্ক্রিন দেখতে পাচ্ছিনা। দুচোখ মুছলাম। সাথে সাথে আরাফাত মেসেজ দিলো।
“মিম, নিজেকে একা ভেবোনা প্লিজ। সারাজীবন তোমার বন্ধু হয়ে তোমার পাশে থাকবো আমি। জানি আমরা আমাদের প্রিয়জনকে হারানোর অপুর্নতা কখনো পুরন করতে পারবোনা।”
“আরাফাত একটু পর মেসেজ দিচ্ছি। মা ডাকছে।”
দরজায় মা ধাক্কা দিচ্ছে। মনে হয় সেবহান চাচা চলে গেছেন। লোকটি আসতে আসতে আমার অপছন্দের লিষ্টে চলে যাচ্ছে। দুই মাস হতে চললো, এখনো নাকি রাব্বীলের কেসের কোনো সুরাহা করতে পারলোনা। বালের পুলিশ হয়েছে। কিছু করতেই যদি না পারবে তাহলে এত ঘন ঘন বাসাই আসার কি দরকার! বাল আমার।
দরজা খুললাম। দেখি মা আর সেবহান চাচা দুজনেই দাঁড়িয়ে।
“আসসালামু অলাইকুম আংকেল। ভালো আছেন?”
“আছি মা। তুমি ভালো আছো তো মা?”
মা বললো, “ভেতরে চল, কথা আছে।”
আমি উনাদের রুমের ভেতরে আনলাম। আমি আর মা বেডে বসলাম। আংকেল আমার পড়ার চেয়ারে। মা বলা শুরু করলেন।
“রাব্বীল তোর সাথে কখনো এলাকার টোকাইদের ব্যাপারে কোনো গল্প করতোনা?”
রাব্বীল তো বিয়ের ৩মাসে তেমন গল্পই করতোনা। ২৪ঘণ্ঠা ল্যাপটপ নিয়ে পড়ে থাকতো।
“না। কেন?”
আংকেল বললেন, “গত রাতে নাকি এলাকার টোকাই এসে তোমার মাকে থ্রেট দিয়ে গেসে।”
গত রাতে সারারাত ই তো আমি আরাফাতের সাথে চ্যাট করছিলাম। টোকাই কখন বাসাই আসলো মা তো জানাইনি আমাকে।
“কেন কি বলেসে তারা?”
মা বললো, “এমনিই উল্টাপাল্টা কথাবার্তা। আচ্ছা, রাব্বীলকে ভয়ভীতি দেখাতো কেউ— এমন কথা রাব্বীল তোর সাথে শেয়ার করেনি?”
বুঝলাম, মা আমার থেকে গত রাতের ব্যাপার লুকাতে চাচ্ছে। যদিও একটু আগেই আমি আড়িপেতে সব শুনেছি।
“না। অমন কিছুই শেয়ার করেনি সে।”
সত্যি বলতে আমার এখন এসব নিয়ে কথা বলতেই খারাপ লাগছে। এর চেয়ে আরাফাতের সাথে দুচারটা কথা বললেই মনটা হালকা লাগে। ছেলেটা ভালোই। মানুষের দু:খ বোঝে।
আংকেল বললেন, “ভাবি রাব্বীল আর কিই শেয়ার করবে। ছিলো তো ঘরকুনো একটা।”
আংকেলের কথায় কেমন জানি একটা তাচ্ছিল্যের টোন পেলাম। সাথে সাথে গা জলে উঠলো আমার। মনে হচ্ছে এক্ষনি গিয়ে উনার দুই গালে দুইটা চর মেরে দিই। সাহস কি করে হয়, আমার স্বামিকে তাচ্ছিল্য করে বলার!!!
“মা, তোমরা এখন যাও। আমার মাথা ব্যাথা করছে। কিছুক্ষণ সুয়ে থাকবো।”
“এত সকালে আবার শুবি কেন? ফ্রেস হয়ে খেয়ে নে আগে।”
আমি আর কিছুই বললাম না। ওরা রুম থেকে চলে গেলো। আমার মন এখনো ওই লোকের উপর গিজগিজ করছে। আমার স্বামি ছিলো সেরা স্বামি। আমার স্বামির ব্যাপারে কেউ টু শব্দ করলে তার গলা কেটে দিব আমি। হুম।
এই লোককে আমার এখন আর সহ্যই হচ্ছেনা। পুলিশ নামের কলংক সে। আব্বু বেচে থাকলে, আর আব্বুর হাতে এমন কেস পরলে, ৫দিনেই সলভ করে ফেলতো। দেড় মাস পেরিয়ে যাচ্ছে, অথচ এই লোক আসামির কোনো কিছুই করতে পাচ্ছেনা।
কিছুই যদি করতে পারবিনা, তাহলে আমাদের আশ্বাস দিচ্ছিস কেন? কেনই বা ঘন ঘন আলগা পিরিত দেখাতে আসিস! মেজাজ তিরতিরে হয়ে গেলো আংকেলের প্রতি। অথচ এই লোককে এক সময় বাবার স্থান দিয়েছিলাম। সে আমাকে মেয়ে বানিয়েছিলো। আমি তার মেয়ে হলে রাব্বীল তো তার জামাই হবার কথা। তাহলে জামাইকে কেউ এভাবে কটুক্তি করতে, তাচ্ছিল্য করতে পারে! পারেনা। তবুও তিনি করলেন। কেন? সত্য বলতে রাগে আমার শরীর গিজগিজ করছে। এক্ষনি এই লোককে কিছু কথা শুনিয়ে দেওয়া দরকার। তাকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার, আমার স্বামিকে তাচ্ছিল্য করার পরিনাম ভালো না।
যেই ভাবা সেই কাজ। বেড থেকে উঠে দাড়ালাম। দ্রুত বেগে রুম থেকে বেরোলাম। ডাইনিং ফাকা। চলে গেলো নাকি? নাকি মায়ের রুমে? নাহ, মায়ের রুমে দরজা ভেজা। দরজা ভেজা অবস্থায় বাইরের লোককে নিয়ে মা রুমে থাকবেনা। তাহলে কি চলে গেলো! আমার মুখে উচিৎ শিক্ষা না নিয়েই চলে গেলো! দৌড় দিলাম সিড়ির দিকে। সিড়ির পাশেই বাড়ির গেইট।
হাই আল্লাহ! একি দেখলাম আমি!!! আমাকে দেখেই ওরা দুজনেই হকচকিয়ে গেছে। মা দ্রুতই আংকেলকে এক ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়েই সিড়ির নিচ থেকে বেরিয়ে এলো। মুখে কোনোই কথা নাই। আচলে মুখ ঢেকে চুপচাপ দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো মা। আর সেবহান আংকেল সিড়ির নিচেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি উনার মুখের সামনেই ‘ছিঃ’ বলেই মায়ের পেছন পেছন ভেতরে ঢুকে গেলাম।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)