Thread Rating:
  • 3 Vote(s) - 2.33 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
নিষিদ্ধ সমর্পণ
#3
তৃতীয় অধ্যায়: লজ্জার লাল সিঁদুর আর আত্মার বিদ্রোহ

ভোর হতে না হতেই পাড়ার মসজিদের আজানের সুর ভেসে এলো। আজ সুমনার বিয়ে। শিউলি তলায় কুড়ানো ফুলের গন্ধটা আজ যেন আর মিষ্টি না, বরং এক অদ্ভুত তিক্ততায় ভরা। আয়ান অনেক ভোরেই উঠে পড়েছিল। তার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। সে সারা রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। বিছানার পাশে চেয়ারের ওপর সযত্নে রাখা আছে তার আজকের যুদ্ধের সাজ—উজ্জ্বল কমলা রঙের সালোয়ার কামিজ। ইস্ত্রি করার পর জামার সেই পাফ-স্লীভ হাতাগুলো যেন গোলাপ ফুলের মতো ফুলে আছে। পাশে রাখা ঘিয়ে রঙের সালোয়ারটা এক শান্ত বরফাবৃত পাহাড়ের মতো।

মীরা ঘরে ঢুকলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন আয়ান স্থির হয়ে বসে আছে নিজের পোশাকটার দিকে তাকিয়ে। মীরা জানেন, এই স্থিরতা আসলে ঝড়ের আগের ভয়ংকর স্তব্ধতা। তিনি এগিয়ে গিয়ে আয়ানের পিঠে হাত রাখলেন। তার ছোঁয়ায় আয়ান চমকে উঠল।

"সালোয়ারের কুঁচিগুলো আজ ঠিক যেন কোনো ধ্রুপদী নাচের পায়ের ছন্দের মতো দেখাচ্ছে, তাই না?" মীরা খুব নিচু স্বরে বললেন।

আয়ান মুখ না ঘুরিয়েই বলল, "মা, সবাই কি শুধু পোশাকটাই দেখবে? ওরা কি আমারে দেখবেই না? আমি যে ভেতরে কী, সেটা কি ওরা বুঝবেই না?"

মীরা আলতো করে আয়ানের চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন। "মানুষ যা দেখতে চায়, তা-ই দেখে আয়ান। কিন্তু তুই কী দেখাতে চাস, সেটা তোর সাহস।

আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৈরি হতে শুরু করল। খুব ধীরে তার সেই কমলা রঙের কামিজটা গায়ে চড়াল। কামিজের ভেতর দিয়ে তার পুরো শরীরটা ঢুকে গেল। পাফ-স্লীভ হাতাগুলো যখন তার কাঁধের ওপর এসে বসলো, সে চোখ বুজে রইল। এই হাতাগুলো যেন তাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, "ভয় নেই।" ঘিয়ে রঙের সালোয়ারটা পায়ে গলাতেই তার পায়ের লোমশ অংশটা ঢাকা পড়ে গেল নরম কাপড়ে। সালোয়ারের ভাঁজগুলো তার পায়ের কাছে আছড়ে পড়ল এক নিপুণ সজ্জায়। মনে হলো যেন কোনো স্থপতি তার শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্যের শেষ প্রলেপ দিচ্ছে।

মীরা আয়ানের সামনে বসে তার পায়ে আলতো করে ছোট্ট রুপোর নূপুর পরিয়ে দিলেন। সেই নূপুরের রিনঝিন শব্দ যখন ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙল, আয়ান এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজল। সে অনুভব করল এই নূপুরের শব্দ যেন তার নাড়ির সাথে বাঁধা। মীরা তার নিজের গয়নার বাক্স থেকে বের করলেন সোনার একটি চেইন আর আয়ানের প্রিয় সেই ঝুমকো জোড়া।

"মা, তুমি কি আজ সেই নীল কামিজটাই পরবা?" আয়ান জিজ্ঞাসা করল।

মীরা হাসলেন।

বিয়েবাড়ির গেটে পা রাখতেই কানের পর্দা ফাটানো সানাই আর হাসির কোলাহল যেন আয়ানের বুকের ভেতরটা মুচড়ে দিল। বাতাসে রজনীগন্ধা আর ঘামের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত আমেজ তৈরি হয়েছে। চারপাশের সবাই আয়ান আর মীরাকে দেখে প্রথমে থামল, তারপর ফিসফিস করে কী যেন বলাবলি করতে লাগল। কিন্তু আয়ানের চোখ কেবল একজনকেই খুঁজছিল—সুমনাকে।

সুমনা মঞ্চের পাশের সোফায় বসা। লাল বেনারসি শাড়িতে তাকে অপার্থিব লাগছে। তার গালে সিঁদুর, কপালে চন্দনের ফোঁটা। পাশে বসে আছে তার হবু বর—এক বলিষ্ঠ পুরুষ। তার চওড়া বুক, গোঁফের নিচে লেগে থাকা আত্মতৃপ্তির হাসি। সমাজ যাকে 'আসল পুরুষ' বলে চেনে।

আয়ান যখন মীরার হাত ধরে সুমনার সামনে এসে দাঁড়াল, সুমনার হাতের মেহেদি রাঙা আঙুলগুলো কেঁপে উঠল যেন সাপের ফণা নড়ছে। সে প্রথমে আয়ানের মুখ দেখল, তারপর তার পরনের কমলা রঙের জামাটার দিকে তাকাল। একসময় এই আয়ানের কাছেই তো সে নিজের মন উজাড় করে দিয়েছিল। ভেবেছিল এই বুকেই সে মাথা রাখবে। আজ দেখছে সেই বুকে কোনো পাঞ্জাবি নেই, বরং এক মেয়েলি সালোয়ার কামিজ। সুমনার চোখের মণি যেন সংকুচিত হয়ে এলো। তার মুখটা লজ্জায় কালো হয়ে গেল, যেন কেউ তার মুখে কালি মেখে দিয়েছে।

সুমনা মনে মনে ভাবতে লাগল, "হায় আল্লাহ! এই মানুষটারে নিয়াই তো আমি জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখছিলাম! ওর পায়ের কাছে মাথা রাখতে চাইছিলাম। আর আজ ও নিজেই মেয়েদের মতো পায়ে নূপুর পড়ছে, কানে দুল পড়ছে। আমার বর পাশে বসা। উনি যদি জানতে পারেন যে আমি এমন একটা মানুষের প্রেমে পড়ছিলাম, যারে দেখলে মনে হয় কোনো নাচনেওয়ালি...!" সুমনার গলা শুকিয়ে গেল। সে তার বরের দিকে চোখ ফেরাল। সুমনার নিজেকে ছোট আর অসহায় লাগছিল।

আয়ানের মনে তখন অন্য ঝড়। সে দেখল সুমনার সেই পেশীবহুল বর এক হাত সুমনার কাঁধে রেখেছে। এক অদ্ভুত মালিকানার ভঙ্গি। আয়ানের কল্পনার জগতে যেন বিদ্যুৎ চমকালো। সে ভাবল, আজ রাতে সুমনা এই পুরুষের কাছে এক টুকরো মাংসে পরিণত হবে। তার শরীর ভোগ করবে এই বলিষ্ঠ পুরুষ। কিন্তু আয়ানের কি ইচ্ছে করে না এমন কোনো পুরুষের বাহুতে ধরা দিতে? যেখানে তার এই পাফ-স্লীভ জামাটাকে কেউ দুর্বলতা ভাববে না, বরং এই জামাটাকে ওপরে তুলে তার নগ্ন শরীরে ঠোঁট বুলাবে? আয়ানের শরীরটা শিউরে উঠল। এটা লজ্জার শিহরণ না, এটা এক নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষার কাঁপন।

"কেমন আছো সুমনা?" আয়ানের কণ্ঠস্বর ছিল বড়ই শান্ত।

সুমনা মুখ তুলল। তার চোখে পানি, কিন্তু সেই পানি ভালোবাসার নয়—অপমানের। সে প্রায় হিসহিস করে বলল, "তুমি এহন চলে যাও আয়ান। প্লিজ, আমার মানসম্মান রাখো। এই অবস্থায় তুমি এখানে আসছ ক্যান? মানুষ কী বলবো?"

মীরা এবার কথা বললেন। তার গলার স্বর কঠিন, কিন্তু চোখ শান্ত। "সম্মান কি কেবল কাপড়ের কাটছাঁটে থাকে সুমনা? তুমি যারে একসময় ভালোবাসছিলা, সে একটা মুখোশ ছিল। আজ যারে দেখতেছো, এইটা আসল আয়ান।"

আয়ান কিছু বলল না। সে তার হাতের সেই কুঁচি দেওয়া হাতাটার ওপর হাত বোলাল। সে সুমনার বরের দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু হাসি দিল। সেই পুরুষের চোখে ঘৃণা ছিল, কিন্তু আয়ানের চোখে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। সে বুঝে গেছে, সুমনা আজ অন্য কারো দাসী হবে, কিন্তু আয়ান নিজে আজ মুক্ত। তার এই সালোয়ার কামিজের প্রতিটি সুতো তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সেও হয়তো একদিন কারো বুকে মাথা রাখবে। সেই বুকে তার এই মেয়েলি সাজের কোনো বাধা হবে না, বরং তার লাবণ্য বাড়াবে।

আয়ান মায়ের হাতটা ধরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। তার নূপুরের শব্দ যেন সেই বিয়েবাড়ির সবাইকে জানান দিচ্ছিল—"আমি আছি, আর থাকব।"
[+] 2 users Like bithibr's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: নিষিদ্ধ সমর্পণ - by bithibr - 11-04-2026, 04:03 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)