Thread Rating:
  • 3 Vote(s) - 2.33 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
নিষিদ্ধ সমর্পণ
#2
দ্বিতীয় অধ্যায়: আয়নার সামনে এক অন্য পৃথিবী

বিকেলের সেই ম্লান আলো কখন যে সন্ধ্যার নরম অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়েছে, মীরা আর আয়ান তা টেরই পায়নি। জানলার বাইরে কাকের দল তাড়াহুড়া করে উড়ে গেল, যেন তাদেরও ঘরে ফেরার তাড়া। ঘরের কোণের পুরনো ল্যাম্পশেডটা জ্বালিয়ে দিতেই পুরো ঘরটা এক মায়াবী হলুদ আলোয় ভরে উঠল। সেই আলোটা ঠিক যেন মীরার বুকের ভেতরকার ভালোবাসার রঙ—উষ্ণ আর আলতো। আলোটা এসে পড়ল আয়ানের কমলা রঙের কামিজের ওপর। মনে হলো নীল লতাগুলো যেন এই হলুদ আলোয় হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে নড়াচড়া শুরু করেছে।

আয়ান চুপচাপ বসে ছিল। তার মাথাটা তখনো মায়ের কাঁধে এলানো। কিন্তু মীরার হাতের ছোঁয়ায় সে কিছুটা যেন নিজেকে গুছিয়ে নিল। আলতো করে মায়ের হাতের ওপর থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল সে। তারপর ধীর পায়ে উঠে গেল। গিয়ে দাঁড়াল ড্রেসিং টেবিলের পাশে রাখা সেই বড় আয়নাটার সামনে। এই আয়নাটাই যেন আয়ানের কাছে একমাত্র জায়গা যেখানে সে বিচারহীন।

আয়নায় নিজেকে দেখে সে নিজেই যেন একটু থতমত খেয়ে গেল। সত্যি বলতে কি, নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে মুগ্ধ হয়েই তাকিয়ে রইল। তার পরনের এই বিশেষ সালোয়ার কামিজটা আসলে কেবল দুই হাতের কাপড় না, এটা যেন তার সাহসের পতাকা। এই কামিজের সুতোর বুননে তার মায়ের ভালোবাসা আর তার নিজের আত্মপরিচয় একাকার হয়ে আছে।

তার মনে হলো, এই কুঁচিগুলোই তাকে সমাজের সমান করে চাপ দিয়ে বসিয়ে দেওয়া লোহার খাঁচাটার থেকে আলাদা করেছে। এই ফোলানো হাতা, এই নরম সুতি কাপড়ের স্পর্শ তাকে জানান দেয় যে সে কারো পুরুষত্বের ছাঁচে ঢালা নেওয়া কোনো মূর্তি নয়।

মীরা আয়নার প্রতিফলনে ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। এই হাসিটা জেতার হাসি না, বরং একজন মায়ের স্বস্তির হাসি যে দেখতে পায় তার সন্তান নিজেকে চিনতে পারছে। তিনি উঠে এসে আয়ানের পাশে দাঁড়ালেন। আয়নায় এখন পাশাপাশি দুটি প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল—একজনের পরনে শান্ত নীল, অন্যজনের পরনে দুরন্ত কমলা। কিন্তু তাদের চোখের চাহনিতে একই রকম জেদ আর ভালোবাসার ছাপ।

"জানো মা," আয়ান আয়নার দিকে চোখ রেখেই বলল, তার কণ্ঠে একটা অদ্ভুত নেশার সুর, "যখন আমি এই জামাটা পড়ি, তখন আমার মনে হয় যেন আমার শরীরের প্রতিটা ভাঁজ কেউ বুঝতে পারে। এই পাফ-স্লীভ হাতাটা আমার কাঁধের শক্ত হয়ে থাকা হাড়গুলোকে ঢেকে দিচ্ছে, অথচ বাহুগুলারে কী নরম করে দেখাচ্ছে দেখো। যেন আমি কোনো যুদ্ধে যাওয়া সৈন্য না। আমি যেন এক টুকরো শান্তি।"

মীরা আয়ানের কাঁধে হাত রাখলেন। তার ছোঁয়ায় আয়ানের কমলা কামিজের কাপড়টা একটু দেবে গেল। তিনি বললেন, "কারণ তুই তো আসলেই প্রতিবাদী রে। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াতেও যে সাহস লাগে, এই সালোয়ারের ভাঁজগুলো তার সাক্ষী। "

আয়ান ড্রেসিং টেবিলের ওপর পড়ে থাকা মায়ের সেই সোনার ঘড়িটা আবার হাতে তুলে নিল। সে তার এক কানের ঝুমকো দুলটা একটু নেড়ে দিতেই সেটা থেকে মৃদু 'রিনঝিন' শব্দ বেরুলো। সেই শব্দটা ঘরের সব নিস্তব্ধতাকে যেন চুর্ণ করে দিল। আয়ান যেন একটা স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল।

"আগামীকাল সুমনার বিয়ে।" কথাটা বলার সময় আয়ানের গলাটা কেমন যেন ধরে এলো। "আমি কি... আমি কি এটা পরেই যাব মা? ওরা সবাই তো থাকবে। সুমনাও থাকবে।"

মীরার চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। তিনি জানেন, এই প্রশ্নটা শুধু একটা বিয়ের দাওয়াতের নয়। এই প্রশ্নটা আয়ানের জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার। তার চোখে কাঠিন্যের ছায়া নেমে এলেও পরক্ষণেই সেটা গলে গিয়ে মমতার বন্যায় ভেসে গেল। তিনি আয়ানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার মুখটা দুহাতে তুলে ধরলেন। তার হাতের তালুতে আয়ানের গালের নরম ত্বকের স্পর্শ লাগল।

"আয়ান, এই সালোয়ার কামিজটা তুই কেন পড়িস? লোক দেখানোর জন্য, নাকি নিজের জন্য?"

"নিজের জন্য মা। এটা পরলে আমি নিজের ভেতরকার মানুষটারে খুঁজে পাই। নইলে মনে হয় আমি দম বন্ধ হয়ে যাই।" আয়ানের উত্তর ছিল বিন্দুমাত্র ইতস্তত ছাড়া।

"তাহলে কারো চোখের ভয়ে নিজেরে লুকাইতে যাবি ক্যান? তুই যখন এই পোশাকে আয়নার সামনে দাঁড়াস, তখন তোর চোখে যে আনন্দ আমি দেখি, সেই আনন্দের কাছে সুমনা আর তার বর-সংসার কোনো ছার নয়। তুই কাল এইটাই পরবি। সাথে আমি তোরে আমার গয়নার বাক্স থেকে নতুন গয়না দিব।"

আয়ান মায়ের দিকে তাকাল। মায়ের ওই নীল সালোয়ার কামিজের শান্ত নীলিমা তাকে এক অদ্ভুত শক্তি দিল। সে বুঝতে পারল, তার যুদ্ধটা আসলে বাইরের মানুষগুলার সাথে নয়, এই যুদ্ধ তার নিজের ভেতরের 'লজ্জা' নামক শয়তানটার সাথে। আর এই যুদ্ধে তার মা তার পাশে বর্ম হয়ে দাঁড়াবে।

রাত বাড়তে লাগল। আয়ান শুয়ে আছে কিন্তু তার ঘুম আসছে না। তার মনে পড়ছে সুমনার মুখ। একসময় সুমনা তাকে বলেছিল, "তোমার বুকের মধ্যে মাথা রাখলে আমার মনে হয় যেন পাথরের পাহাড়ে হেলান দিছি।" আয়ান তখন হাসত। সে জানত না, তার সেই বুকের পাঁজরের নিচে এত কোমল একটা মন লুকিয়ে আছে। আজ যখন সে শক্ত পাঁজরের উপর কুঁচি দেওয়া জামা পরেছে, তখন সে যেন সেই কোমল মনটারে সবার সামনে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু সুমনা কি সেটা বুঝবে? নাকি তার চোখে আয়ান হবে এক জোকার?

জানলার বাইরে রাতের জোনাকি ডাকছে। আয়ান তার ভাঁজ করা সালোয়ারের দিকে তাকিয়ে রইল। চাঁদের আলোয় তার ঘিয়ে রঙটা যেন সাদা চাদরের মতো লাগছে। এই রাতটা পেরোলেই কাল সকালের সেই পরীক্ষা।
[+] 2 users Like bithibr's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: নিষিদ্ধ সমর্পণ - by bithibr - 11-04-2026, 03:57 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)