Thread Rating:
  • 12 Vote(s) - 3.33 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি
#64
Chapter 3
   
              ❝ মাকড়সার জাল ❞
    The Spider Web



কালোঘাট বস্তির কেদার আলী মেস বাড়ির ছাদ থেকে রক্তনগরীর সকালটা আজ বড় বেশি সুন্দর লাগছে। অনেক দূরে সূর্য উঠেছে, সেই মিষ্টি রোদ এসে পড়ছে আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোর কাঁচের গায়ে। কিন্তু সেই আভিজাত্য অনিকেতের চোখে বিঁধছে। সে প্যান্টের চেইন খুলে ছাদের এক কোণে সজোরে প্রস্রাব করতে লাগল—যেন ওই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিল্ডিংগুলোর ওপর সে তার ঘেন্না উগরে দিচ্ছে।
রুমে ফিরে এসে দেখল অর্কদেব তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। অনিকেত টি-শার্টটা পরে নিচে নেমে এল। নিচ থেকে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ার আওয়াজ আর সাথে মেশিনের একনাগাড়ে চলা ঘড়ঘড় শব্দ ভেসে আসছে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই একপাশে রান্নাঘর, আর মাঝখানের বারান্দায় কজন ছেলে একমনে পড়ছে। অনিকেতকে দেখে তারা একবার তাকাল, তারপর আবার বইয়ে মুখ গুঁজল। বারান্দার এক কোণে একটা নোংরা পর্দা দিয়ে আলাদা করা ঘর থেকে সেলাই মেশিনের শব্দটা আসছে। অনিকেত পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকেই থমকে গেল। এক অদ্ভুত ভ্যাপসা গন্ধ—ভিজে দেওয়াল, ঘাম আর কিসের একটা তিতকুটে রাসায়নিকের মিশ্রণ।
ঘরের এক কোণে টুলে বসে ছিলেন কাদের সাহেব,সমানে তার সেলাই এর মেশিনে দুটো পা সমানে চালিয়ে শাড়ি তেকারুকার্য করছে। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মুখে সাদা দাড়ি।

 অনিকেতকে দেখে তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "ভেতরে এসো অনিকেত।"

"গুড মর্নিং কাদের সাহেব," অনিকেত একটা কাঠের টুলে বসে পড়ল।

"গুড মর্নিং," কাদের সাহেবের গলায় এক অদ্ভুত মায়াভরা প্রশান্তি।

অনিকেত চুপচাপ সেলাই মেশিনের কাজ দেখতে লাগল। তার নজর গেল ঘরের তাকে রাখা বড় বড় কাঁচের শিশিগুলোর দিকে। দুটো শিশির ভেতরে থকথকে সাদা ঘোলাটে তরল—দেখলে কেমন গা ঘিনঘিন করে। 
মেশিনের নিচে একটা মাকড়সা খুব নিপুণভাবে তার জাল বুনছে। অনিকেত অপলক চোখে সেটা দেখতে লাগল। কী নিঁখুত জ্যামিতি!

কাদের সাহেব তার চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে দাড়ি চুলকালেন। তারপর অনিকেতের একাগ্রতা দেখে গম্ভীর অথচ নিচু স্বরে ইংরেজিতে বললেন:

"A spider does not chase its prey; it only weaves a web of desire and waits for the foolish to walk into it. Like a spider’s web, human desire looks delicate, yet it is strong enough to imprison the soul. The prey rarely sees the spider; it only feels the web tightening around its own desires. A spider’s web is honest; it reveals the trap. Human webs are far crueler—they disguise themselves as lust, dominance, and destruction."

অনিকেত অবাক হয়ে তাকাল। সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, "সরি কাদের সাহেব... কি বললেন?"

কাদের সাহেব ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে বাংলায় বুঝিয়ে বললেন—

"এর মানে খুব সোজা অনিকেত। মাকড়সা কখনো তার শিকারকে তাড়া করে ধরে না; সে শুধু কামনার একটা জাল বোনে আর বোকাদের সেই জালে পা দেওয়ার অপেক্ষা করে। মাকড়সার জালের মতোই মানুষের লালসা দেখতে খুব নরম আর সুন্দর হতে পারে, কিন্তু সেই সুতোর বাঁধন এতটাই শক্ত যে তা আত্মাকে পর্যন্ত বন্দি করে ফেলে। শিকার যখন জালে পড়ে, সে কিন্তু মাকড়সাকে দেখে না; সে শুধু অনুভব করে যে তার নিজের কামনাগুলোই তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে।"
কাদের সাহেব একটু থামলেন, তারপর চশমার কাঁচটা মুছে আবার বলতে লাগলেন—

"মাকড়সার জাল অন্তত সৎ, সে যে একটা ফাঁদ তা সে লুকিয়ে রাখে না। কিন্তু মানুষের বোনা জালগুলো অনেক বেশি নিষ্ঠুর। সেগুলো নিজেদের আড়াল করে রাখে—কখনো শরীরী যৌনতা, কখনো ক্ষমতা, আবার কখনো ধ্বংসের মুখোশ পরে।"

অনিকেত চুপ করে রইল। 






ইতিহাস সাক্ষী আছে—যেখানে অট্টালিকা যত উঁচুতে উঠেছে, তার ছায়া ততটাই দীর্ঘ আর অন্ধকার হয়েছে। রক্তনগরীর এই আকাশচুম্বী জৌলুস এক মায়াবী আকর্ষণে টেনে আনে হাজার হাজার মানুষকে। কেউ আসে ক্ষমতার লোভে, আর কেউ আসে শুধু একটু ভালো থাকার তাগিদে। এই ভিড়ের মধ্যেই মিশে থাকে এমন কিছু মানুষ, যারা প্রতিদিন এক অদৃশ্য যুদ্ধে লড়ে যায়—শুধু নিজের পরিবারকে একটা সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য। তাদের কাছে স্বপ্ন মানে দামি গাড়ি নয়, স্বপ্ন মানে সন্তানের সেরা পড়াশোনা আর স্ত্রীর মুখে এক চিলতে নিশ্চিন্ত হাসি।

ডঃ সায়ক সিনহা ছিলেন তেমনই এক সৈনিক। 'সেন কিউওর' (Sen Cure) হাসপাতালের বিখ্যাত সেক্সোলজিস্ট হিসেবে আজ তার নাম ডাক যথেষ্ট। কিন্তু এই ১৫ বছরের কেরিয়ারে তার আয়নার সামনে দাঁড়ানো মুখটা বদলে গেছে। চোখের তলায় কালচে ছোপ আর কপালে ভাঁজ পড়া রেখাগুলো বলে দেয়, এই শহরে টিকে থাকার মাশুল কতটা চড়া।

নিজের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে বসে সায়ক আজ এক মুহূর্তের জন্য আনমনা হলেন। সামনে রাখা কাঁচের টেবিলের ওপর তার স্ত্রী আর মেয়ের একটা হাসিমুখের ছবি। তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করলেন—ওরা কি সুখী? এই ইঁদুর দৌড়ে শামিল হয়ে তিনি কি তাদের সেই শান্তিটা দিতে পেরেছেন? একজন সেক্সোলজিস্ট হিসেবে তিনি প্রতিদিন মানুষের শরীরের সবচেয়ে গোপন আর লজ্জিত দিকগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, কিন্তু নিজের মনের ভেতরের এই হীনমন্যতা সারানোর কোনো প্রেসক্রিপশন তার জানা নেই।

ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা পড়ল। 
 তিনি চশমাটা ঠিক করে নিয়ে পেশাদারী মুখচ্ছবি ফিরিয়ে আনলেন। চেম্বারের বাইরে নীলচে আলোয় জ্বলছে তার নাম— 'Dr. S. Sinha, Sexologist'।

দরজাটা সামান্য ফাঁক হতেই একটা মোলায়েম সুগন্ধ চেম্বারের এসি-র ঠান্ডা বাতাসের সাথে মিশে গেল। সায়ক মুখ তুলে তাকাতেই এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা আর কেউ নন, এই হাসপাতালের মালিক মেঘাদিত্য সেনের স্ত্রী—তনুশ্রী সেন।
বয়স যেন তার কাছে হার মেনেছে। পরনের দামী শিফন শাড়িটা তার শরীরে এমনভাবে লেপ্টে আছে, যেন তার আভিজাত্য আর যৌবনকে সযত্নে আগলে রেখেছে।

তনুশ্রী সেন মানেই রক্তনগরীর ক্ষমতার এক অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
সায়ক তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমতা আমতা করে বললেন, "ম্যাডাম! আপনি? ভেতরে আসুন... প্লিজ বসুন।"

তনুশ্রী ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদ্ভুত দাপট আর কমনীয়তা। সোফায় বসতে বসতে তিনি মৃদু স্বরে বললেন, "ডক্টর সিনহা, আপনার কাছে আসার একটা বিশেষ কারণ আছে। সত্যি বলতে, কথাটা কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না।"

সায়কের বুকের ভেতরটা একটু ধক করে উঠল। তিনি জানেন, তনুশ্রী সেন শুধু মেঘাদিত্যের স্ত্রী নন, তিনি নীরব সিংহ রায়ের শাশুড়িও বটে। ক্ষমতার এত কাছাকাছি থাকা মানুষেরা যখন 'সেক্সোলজিস্ট'-এর চেম্বারে আসে, তখন বুঝতে হবে জল অনেক দূর গড়িয়েছে।

সায়ক নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, "বলুন ম্যাডাম, আমি কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?"

তনুশ্রী তার ভ্যানিটি ব্যাগটা কোলের ওপর রেখে একটু নড়েচড়ে বসলেন। চেম্বারের ভেতরে তার দামী পারফিউমের কড়া গন্ধটা এখন ডমিনেট করছে। কথা বলার সময় সায়ক লক্ষ্য করলেন, তনুশ্রীর নাকের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে সায়ক জানেন, এটা কোনো শারীরিক অসুস্থতা নয়—এটা তীব্র মানসিক উত্তেজনা বা কোনো গোপন ভয়ের বহিঃপ্রকাশ।

তনুশ্রী বলতে শুরু করলেন, "আপনি তো জানেন ডক্টর, আমার 'আলোয়ন ফাউন্ডেশন' সবসময় সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এনজিও-র কাজে আমাকে অনেক সময় এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় যা ভাবনার বাইরে। কিন্তু কিছু জিনিস যখন নিজের চোখের সামনে ঘটে... তখন নিজের বিশ্বাসটাই নড়বড়ে হয়ে যায়।"

সায়ক কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইলেন। তনুশ্রী ব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা, অর্ধেক ছেঁড়া মেডিকেল রিপোর্ট বের করে সায়কের দিকে এগিয়ে দিলেন। তার হাতটা সামান্য কাঁপছে।

ডঃ সায়ক সিনহা হাতের আধছেঁড়া রিপোর্টটার ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে অনুভব করলেন, চেম্বারের ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও তার কপালে ঘামের সূক্ষ্ম বিন্দু জমছে। চশমার কাঁচটা ঝাপসা হয়ে আসছিল, তিনি একবার সেটা খুলে কোটের পকেটে থাকা মাইক্রোফাইবার দিয়ে মুছে আবার নাকের ওপর শক্ত করে বসিয়ে নিলেন।
সামনে বসে থাকা তনুশ্রী সেনের আভিজাত্যমাখা নিস্তব্ধতা এখন সায়কের কাছে এক শ্বাসরোধকারী চাপের মতো মনে হচ্ছে। সায়ক একবার নড়েচড়ে বসলেন। রিপোর্টের প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা ধারালো কাঁটা হয়ে তার মগজে বিঁধছে। সাধারণ কোনো মানুষ এই রিপোর্ট পড়লে হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে যেত, কিংবা ভাবত এটা কোনো সস্তা ডার্ক ফ্যান্টাসি উপন্যাসের পাতা। কিন্তু সায়ক জানেন, ফরেনসিক টার্মিনোলজি কখনো মিথ্যে বলে না।

তিনি কাঁপা হাতে রিপোর্টের লাইনগুলো আবার পড়লেন।

বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ (External Examination)

মৃতদেহের বাইরের অংশে কোনো ধস্তাধস্তি, আঘাত বা লড়াইয়ের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ত্বক অস্বাভাবিকভাবে মসৃণ ও উজ্জ্বল, যেন মৃত্যুর ঠিক আগে তাকে দীর্ঘক্ষণ স্নান করিয়ে তেল-মালিশ করা হয়েছে।
তবে শরীরের গড়ন উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত। স্তনযুগল অস্বাভাবিক রকমের স্ফীত, টানটান ও ভারী হয়ে উঠেছে। নীলচে শিরার জাল ত্বকের নিচ দিয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। উভয় স্তনের বোঁটা (Nipples) অত্যধিক ফোলা ও লালচে, যেন দীর্ঘক্ষণ ধরে কেউ চুষে চুষে তাদের আকার বদলে দিয়েছে। সামান্য চাপ দিলেই স্তন থেকে ঘন, আঠালো তরল বেরিয়ে আসছে।

অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা (Internal Findings)

১. জরায়ু ও পেলভিক অঞ্চল
জরায়ুতে কোনো গর্ভাবস্থা নেই। কিন্তু জরায়ুর অভ্যন্তরীণ দেওয়ালে এক ঘন, কালচে-সাদা আস্তরণ পাওয়া গেছে। এটি কোনো সাধারণ বীর্য নয়। ল্যাব টেস্টে ধরা পড়েছে এটি এক প্রকার কৃত্রিম, অত্যন্ত আঠালো ও তপ্ত সিরাম — যা জরায়ুকে কৃত্রিমভাবে “প্রস্তুত” করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে।

২. যোনিপথ (Vaginal Canal)
যোনিপথ অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত ও ঢিলা। ভিতরে ঘন, সাদাটে-আঠালো সিরামে ভর্তি। এই সিরামের তাপমাত্রা মৃত্যুর পরও অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ ছিল। যোনিপথের দেওয়ালে সূক্ষ্ম ছেঁড়া ও প্রসারণের চিহ্ন রয়েছে — যেন মৃত্যুর আগে অত্যধিক ও দীর্ঘক্ষণ যৌন ব্যবহার করা হয়েছে। মৃত্যুর পরও এই প্রসারণের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

৩. সূক্ষ্ম আঘাত
শরীরের বাইরে কোনো দাগ না থাকলেও, উরুর ভেতরের নরম অংশে এবং স্তনের নিচে অসংখ্য সূক্ষ্ম কামড়ের দাগ ও নখের আঁচড় পাওয়া গেছে। এগুলো কোনো সাধারণ মানুষের নয়। মনে হয় কোনো বিকৃত যৌন আসক্তির শিকার হয়েছে মেয়েটি।
ফরেনসিক মন্তব্য (Forensic Comment)

এটি কোনো সাধারণ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়। মেয়েটির শরীরে এমন এক অজানা রাসায়নিক সিরাম প্রয়োগ করা হয়েছে যা তার কামনাকে হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন যৌন উত্তেজনায় জ্বলছিল। এরপর তার ওপর চালানো হয়েছে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
বাহ্যিকভাবে কোনো আঘাত না থাকলেও, তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো যেন একটি নিষ্ঠুর যৌন পরীক্ষার শিকার হয়েছে। জরায়ু, যোনিপথ ও স্তনের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখে মনে হয় — মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে দীর্ঘক্ষণ ধরে এক অত্যন্ত বিকৃত ও নোংরা যৌন খেলায় ব্যবহার করা হয়েছে।


 একজন অভিজ্ঞ সেক্সোলজিস্ট হিসেবে তিনি মানুষের কামনার অনেক অন্ধকার গলি দেখেছেন, কিন্তু এই রিপোর্টে যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা কোনো মানুষের কাজ হতে পারে না। এটা স্রেফ লালসা নয়, এটা এক নারকীয় উন্মাদনা—এক পৈশাচিক নরকের শয়তানের নরকীয় বিকৃত কামলীলা-র অংশ। 



রিপোর্টটা টেবিলে রাখার আগে নিজের ড্রয়ার থেকে মোবাইলটা বের করে খুব সাবধানে কয়েকটা ছবি তুলে নিলেন তিনি।
 তারপর রিপোর্টটা নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে তনুশ্রীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "ম্যাডাম... এই রিপোর্টটা যতটা সহজ ভাবছেন, ততটা নয়। কুহকপুরের ওই লোকাল মেডিকেল টিম পর্যন্ত ধরতে পারেনি এই মেয়েটার ওপর ঠিক কী প্রয়োগ করা হয়েছিল। এটা স্রেফ কোনো সেক্সুয়াল টর্চার নয়, এটা এক নারকীয় এক্সপেরিমেন্ট।"

তনুশ্রী রিপোর্টটা হাতে নিয়ে ব্যাগে ভরলেন। তার মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা, যখন কুহকপুর হেলথ সেন্টারে প্রথম এই রিপোর্টটা তার হাতে এসেছিল। পড়ার সময় তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল। দিনের পর দিন এই কাগজটা সে নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছে। সে বুঝেছিল এর পরতে পরতে কোনো পৈশাচিক যৌন লালসা (Pervert Sexual Act) আর বিকৃতি লুকিয়ে আছে। কিন্তু এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তার জানা নেই। সেই সূত্রেই তার মনে পড়েছিল ‘সেন কিউওর’ হাসপাতালের নামী সেক্সোলজিস্ট ডঃ সায়ক সিনহার কথা।
তনুশ্রী সোফায় বসে শান্ত স্বরে বললেন, "আমি জানি ডক্টর, এই রিপোর্টটা কোনো স্বাভাবিক মৃত্যুর খবর নয়। এটা একটা বিকৃত নরকের নীল নকশা। মেডিকেল রিপোর্ট পর্যন্ত যা ধরতে পারেনি, আমি চাই আপনি একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আমায় দিন। আমি অনেক খুঁজেছি, কিন্তু কোনো সাধারণ মেডিকেল বা সেক্সুয়াল টেক্সট বুকে এই ধরণের সিনটম বা সিরামের উল্লেখ পাইনি।"

সায়ক সিনহা একটু ঝুঁকে বসে নিচু স্বরে বললেন, "ম্যাডাম, একটা কথা মাথায় রাখবেন—এই রিপোর্ট যেন কোনোভাবে পাবলিক না হয়। কুহকপুরের মানুষ যদি ঘুণাক্ষরেও জানতে পারে তাদের ঘরের মেয়েদের ওপর ঠিক কী নারকীয় অত্যাচার চলছে, তবে তারা পুরো শহর জ্বালিয়ে দেবে।"

তনুশ্রী ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে মনে মনে ভাবলেন—'একদম ঠিক জায়গায় এসেছি। এই লোকটা শুধু ডাক্তার নয়, বুদ্ধিতেও বেশ দড়।' মুখে হাসি বজায় রেখে তিনি বললেন, "ডক্টর সায়ক, সে ভয় নেই। কুহকপুরের লোক জানে যে তাদের মেয়েরা ‘সেন জেনিক্স গ্লোবাল সলিউশন’-এর ওষুধের ওভারডোজের কারণে এই মৃত্যু হয়েছে। আমি নিজে সেই চারটে পরিবারকে বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করিয়ে এসেছি। তাই আপনার এই হাসপাতাল, আর তার মালিক মেঘাদিত্য সেন—সবাই এখনো মাথা উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।"

সায়ক সিনহা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ভাবলেন। তারপর চশমাটা ঠিক করে বললেন, "ঠিক আছে ম্যাডাম। আমাকে কয়েকটা দিন সময় দিন। আমি সব ধরণের রেয়ার মেডিকেল জার্নাল আর বইপত্র ঘেঁটে একটা ডিটেইল ফাইল বানিয়ে আপনাকে পাঠিয়ে দেব।"

তনুশ্রী উঠে দাঁড়ালেন। তার ডার্ক পারফিউমের গন্ধটা আবারও চেম্বারে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি এবার আর ‘ডক্টর সিনহা’ বললেন না, বরং মায়াভরা হাসিতে শুধু বললেন, "ধন্যবাদ সায়ক! এটা আপনার পরিশ্রমের পারিশ্রমিক, নিজের কাছে রাখুন। আশা করি আপনার কাজে লাগবে।"

তিনি টেবিলের নিচে একটা কালো চামড়ার স্যুটকেস রেখে দিলেন। তনুশ্রী যখন ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, সায়ক সিনহা একবার তার চলে যাওয়ার দিকে তাকালেন। শাড়ির ভাঁজে তনুশ্রীর সেই নিয়ন্ত্রিত শরীর আর নিতম্বের ছন্দময় দুলুনি দেখে সায়ক এক মুহূর্তের জন্য আনমনা হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন, ওই আভিজাত্যের বর্মের নিচে কত শত কামনার হাতছানি লুকিয়ে আছে কে জানে!

তনুশ্রী বেরিয়ে যেতেই সায়ক সিনহা কাঁপাকাঁপা হাতে স্যুটকেসটা খুলে দেখলেন। তার চোখ কপালে উঠল। থরে থরে সাজানো টাকার বান্ডিল! প্রায় ১০০টা বান্ডিল, প্রতিটাতে ১ লাখ করে টাকা। ১ কোটি টাকা!
সায়ক সিনহা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি হাসলেন। টাকার গন্ধে তার নীতিবোধ যেন এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন, "রিচ ক্লায়েন্টস ক্রিয়েট মানি...।"

তিনি স্যুটকেসটা বন্ধ করে আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে সেই ছবির রিপোর্টটা পড়তে লাগলেন। 



রক্তনগরীর বুকে ২০ তলার এই কাঁচের কফিন—'এসআরসি (SRC) টাওয়ার্স'—আজ যেন এক মৌচাকের মতো থমথম করছে। 
ঠিক ১০টা।
পাঁচতলার করিডোরে এখন প্রায় ৩০ জন তরুণীর লম্বা লাইন। সবার পরনে সাদা শার্ট, কুচকুচে কালো ব্লেজার আর শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা টাইট ফর্মাল প্যান্ট। হাই হিল জুতোর খটখট শব্দে করিডোরটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তাদের চোখেমুখে স্বপ্ন, কিন্তু ভেতরে এক অব্যক্ত ভয়।

পদটা সাধারণ কিছু নয়— Executive Personal Secretary (EPS) to the Founder & Group Chairman (SRC)।

এই ৩০ জনের ভিড় থেকে আজ ছেঁকে তোলা হবে মাত্র তিনজন। সেই ভাগ্যবান তিনজন সুযোগ পাবে ২০ তলার সেই সোনালী লিফটে চড়ে খোদ চেয়ারম্যান ব্রিজেশ সিংহ রায়ের কেবিনে গিয়ে ফাইনাল রাউন্ড দেওয়ার। প্রতি বছর নিয়ম করে এই ভ্যাকান্সি বের হয়।

ইঞ্জিনিয়ারিং বা এমবিএ পাস করা মেধাবী মেয়েরা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকে এই পদের দিকে। কারণ এখানে স্যালারি যত আকাশছোঁয়া, তার পার্কস আর সুযোগ-সুবিধা তার চেয়েও দ্বিগুণ।

ঠিক সেই মুহূর্তে এসআরসি টাওয়ার্সের পোর্টিকোতে এসে থামল একটা কুচকুচে কালো গ্লসি মার্সিডিজ। গাড়ির দরজা খুলতেই বেরিয়ে এলেন খোদ চেয়ারম্যান ব্রিজেশ সিংহ রায়।
উন্নত শির, চওড়া কাঁধ আর এই বয়সেও শরীরের প্রতিটি ভাঁজে এক অবিশ্বাস্য তেজ। তার উপস্থিতিমাত্রই যেন আশেপাশের বাতাসের দখল নিয়ে নেয়। চিবুকে নিখুঁতভাবে ট্রিম করা গ্রে-কালার শেডের দাড়ি, চোখে দামী এভিয়েটর ফ্রেম। হাতে রোলেক্সের ঝকঝকে ঘড়ি আর পরনে কয়েক লাখ টাকার ইতালিয়ান স্যুট। প্রতিটি পদক্ষেপের সাথে তার জুতো থেকে বেরোচ্ছে এক অদ্ভুত দাম্ভিক শব্দ।
গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডরা তড়িৎগতিতে স্যালুট ঠুকল। ব্রিজেশ কারো দিকে তাকালেন না। তিনি সময়ের বড্ড পাক্কা। সরাসরি এগিয়ে গেলেন রিভার্স গোল্ড কালারের সেই প্রাইভেট লিফটের দিকে। লিফট খুলতেই দেখা গেল এক বৃদ্ধ ক্লিনার এক কোণে বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিজেশকে দেখেই লোকটা সিঁটিয়ে গেল, ভয়ে মুখ থেকে প্রায় অস্ফুটে বেরোল, "গুড... গুড মর্নিং স্যার!"

ব্রিজেশ তার চোখের মণি একটু ঘুরিয়ে লোকটার নেমপ্লেটের দিকে তাকালেন—'লতিফ'। 
ব্রিজেশ কোনো উত্তর দিলেন না, তার নির্বিকার চাহনিটাই লতিফের হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
লিফট নিঃশব্দে উঠে এল ২০ তলায়। দরজা খুলতেই পায়ের নিচে নরম কার্পেট বিছানো সুদীর্ঘ করিডোর। ব্রিজেশ ধীর পায়ে হেঁটে ঢুকলেন তার রাজকীয় গ্লাস কেবিনে।


১৯ তলার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে বসে ছিলেন নিরব সিংহ রায়। বাইরে কাঁচের ওপারে রক্তনগরীর আকাশ দেখা যাচ্ছে, কিন্তু নিরবের চোখের সামনে ভাসছে একরাশ অন্ধকার। ১ বছর হতে চলল অনুশ্রীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে, অথচ তাদের যৌন জীবন এক করুণ মরুভূমি। দীর্ঘদিনের কুঅভ্যাস আর হস্তমৈথুনের ফলে আজ সে শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। ডঃ সায়ক সিনহার সেই শব্দগুলো কানের ভেতর তপ্ত সিসার মতো বিঁধছে— "পেনিস হাইপারসেনসিটিভ (Hypersensitive)"। 
মাত্র ১০-১২ সেকেন্ডের স্পর্শেই সব শেষ। অনুশ্রীর জায়গায় অন্য কোনো মেয়ে হলে হয়তো এতদিনে ডিভোর্স দিয়ে চলে যেত, কিন্তু অনুশ্রী অদ্ভুতভাবে শান্ত। সে বারবার বলে— "ইম্প্রুভ হবে।" কিন্তু নিরব জানে, এই অক্ষমতা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

ঠিক তখনই দরজায় হালকা টোকা পড়ল। নিরবের পার্সোনাল সেক্রেটারি টিয়া ভেতরে ঢুকল। টিয়া দেখতে বেশ ছিপছিপে, তার ফর্মাল ড্রেসের নিখুঁত ভাঁজ আর প্রফেশনাল অ্যাটিটিউড নিরবের অফিসের অনেকটা কাজ সহজ করে দেয়। কিন্তু আজ নিরবের মাথায় শরীরী নেশার চেয়েও বেশি কাজ করছে নিজের ব্যর্থতার গ্লানি।

"স্যার, চেয়ারম্যান স্যার এসে গেছেন। আপনাকে ওঁর কেবিনে যেতে বলেছেন,"

টিয়া নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় জানাল।
নিরব নিজেকে সামলে নিয়ে চেয়ার ছাড়ল। "ওকে। টিয়া, অহিরাজপুরের ফাইলটা দাও তো। সব কিছু তো ডান, তাই না? শুধু ওই লোকাল ট্রাইবাল ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন (Land Acquisition) নিয়েই তো প্রবলেমটা হচ্ছে?"

টিয়া ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, "ইয়েস স্যার। অহিরাজপুর রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট অনেক আগেই অন-বোর্ড হয়ে যেত, যদি না ওই স্থানীয় আদিবাসীরা মাঝখানে নিজেদের নাক গলাত। ওরা জমি ছাড়তে নারাজ।"

ফাইলের ফোল্ডারটা বগলে চেপে নিরব ২০ তলার সেই গোল্ডেন লিফটে করে ওপরে উঠে এল। ২০ তলার করিডোরের গাম্ভীর্য আলাদা। দরজার কাঁচের ওপর সোনালী অক্ষরে খোদাই করা— 'Founder & Group Chairman'।
নিরব ধীর হাতে গ্লাসের দরজাটা সামান্য ঠেলে ভেতরে উঁকি দিল। দেখল বিশাল জানলার দিকে পিঠ করে ব্রিজেশ সিংহ রায় নিজের রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন। পুরো ঘর দামী চুরুটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
"বাবা, আসব?" নিরব খুব নিচু স্বরে অনুমতি চাইল।

"এসো নিরব। বসো," ব্রিজেশ সামনের দামী চামড়ার সোফাটার দিকে ইশারা করলেন।


নিরব গুটিয়ে গিয়ে বসল। ফাইলের ফোল্ডারটা টেবিলের ওপর রেখে নিচু স্বরে বলল, "বাবা, অহিরাজপুরের ফাইলটা। টিয়া সব রেডি করে দিয়েছে। কিন্তু সমস্যা সেই ট্রাইবাল ল্যান্ড নিয়ে। স্থানীয় আদিবাসীরা কিছুতেই জমি ছাড়তে চাইছে না।"


ব্রিজেশ সিংহ রায় চুরুটের ধোঁয়াটা খুব ধীরলয়ে ছাড়লেন। তার গলার স্বর এখন অস্বাভাবিক নরম, কিন্তু সেই নরমেও এক অদ্ভুত শীতলতা আছে। তিনি নিরবের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "অহিরাজপুরের ওই আদিবাসীরা... বুঝলে নিরব, ওদের কাছে ওই জমিটা শুধু মাটি নয়। ওরা ওটাকে মন্দির ভেবে পুজো করে। দীর্ঘদিনের শিকড় উপড়ানো অত সহজ নয়।"

নিরব সোফায় কুঁকড়ে বসে বাবার প্রতিটি শব্দ গিলছিল। সে একটু আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, "তাহলে বাবা... সরি স্যার, তাহলে ওদের ওই ল্যান্ড আমরা নেব কী করে? ওরা তো কিছুতেই রাজি হচ্ছে না।"

ব্রিজেশ চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বললেন, "দেখো নিরব, এই প্রজেক্টটা আমি তোমার হাতে তুলে দিয়েছি। এটা এখন তোমার। তোমাকে ভাবতে হবে ওই জমিটা আমাদের জন্য কতটা ইম্পর্ট্যান্ট। তোমার কাছে ক্ষমতা আছে, টাকা আছে। তুমি কোনটা ব্যবহার করবে সেটা তোমার সিদ্ধান্ত।"

নিরব কিছুটা চিন্তিত হয়ে বলল, "পাওয়ার বা জোর খাটালে তো চারদিকে আওয়াজ হবে বাবা। নিউজ রিপোর্টাররা জেনে গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।"

ব্রিজেশ ঠোঁটের কোণে একটা ক্রুর হাসি ফুটিয়ে বললেন, "সাব্বাশ! একদম ঠিক ধরেছ। তাহলে আমাদের হাতে থাকল ‘ম্যানিপুলেশন’। ওদের সাথে পার্সোনালি কথা বলতে হবে, ওদের বোঝাতে হবে যে আমরা ওদের ভালো চাইছি।"

বাবার কথায় সায় দিয়ে নিরবের মাথায় হঠাত একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে উত্তেজিত হয়ে বলল, "স্যার, আমার কাছে একটা আইডিয়া আছে। অনুশ্রীর মা তো ‘আলোয়ন ফাউন্ডেশন’-এর ওনার। ওনার এনজিও-র মাধ্যমে যদি ওই আদিবাসীদের বোঝানো যায়? ওরা তো এনজিও-র লোকেদের বিশ্বাস করে।"

ব্রিজেশ উচ্চস্বরে না হাসলেও তার চোখে এক ধরণের সন্তুষ্টি দেখা গেল। ছেলে যে তার মতোই কুটিল পথে ভাবতে শিখছে, এতে তিনি খুশি। তিনি বললেন, "গুড। এমনিতেও তনুশ্রী আর ওর এনজিও বরাবর আমাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সাহায্য করে এসেছে। এটা একটা মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে।"

বাবার মুখে নিজের প্রশংসা শুনে নিরবের বুকটা গর্বে ফুলে উঠল। যে ছেলেটা একটু আগে নিজের শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগছিল, সে এখন ক্ষমতার দাপটে আত্মহারা। 
ব্রিজেশ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, "আজ রাতে মেঘাদিত্য, তনুশ্রী, দীক্ষিত—সবাই ‘সিংহ রায় প্যালেস’-এ ডিনারে আসছে। তখনই এই নিয়ে চূড়ান্ত কথা হবে।"

ব্রিজেশ এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, "এখন তুমি যাও নিরব। আমাকে কয়েকটা ইন্টারভিউ নিতে হবে। ওগুলোর ফাইনাল রাউন্ড আজই শেষ করতে চাই।"

এসআরসি (SRC) টাওয়ার্সের পাঁচতলার সেই এইচআর (HR) রুমের বাইরে পিনপতন নিস্তব্ধতা। দীর্ঘ তিনটে রাউন্ডের হাড়ভাঙা খাটুনির পর ৩০ জন থেকে ছিটকে এসে টিকেছে মাত্র তিনটে মেয়ে। তারা এখন দরজার বাইরে রাখা দামী সোফায় বসে একে অপরের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। প্রত্যেকের পরনেই সেই একই ইউনিফর্ম—সাদা শার্ট আর শরীরের সাথে লেপ্টে থাকা কালো টাইট ফর্মাল প্যান্ট।

ঠিক তখনই দরজাটা খুলে গেল। ভেতর থেকে একজন স্টাফ বেরিয়ে এসে যান্ত্রিক স্বরে বলল, "আপনারা তিনজন ভেতরে আসুন।"

তিন জোড়া হাই হিলের খটখট শব্দে কেবিনটা কেঁপে উঠল। ভেতরে বিশাল টেবিলের ওপাশে এইচআর ম্যানেজার একা বসে ছিলেন। 
তিনি একবার মাথা তুলে মেয়ে তিনটিকে দেখলেন, তারপর নিজের দামী স্মার্টফোনটা হাতে নিয়ে বললেন, "আপনারা একটা সোজা লাইনে দাঁড়ান। আপনাদের প্রোফাইল চেয়ারম্যান স্যারের কাছে পাঠানো হবে। মনে রাখবেন, আপনাদের মধ্যে থেকে আজ মাত্র একজনই সিলেক্ট হবেন।"

ম্যানেজার উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ফোনটা তাক করে বললেন, "সামনের দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান।"
একটা ক্লিক। তিনজনের মুখের ছবি বন্দি হলো লেন্সে। এরপর ম্যানেজার গম্ভীর গলায় নির্দেশ দিলেন, "এবার আপনারা একটু ঘুরে দাঁড়িয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাবেন। ব্যাক প্রোফাইলটা দরকার।"
বাকি দুজন অভিজ্ঞ ইন্টারভিউয়ারের মতো চট করে ঘুরে দাঁড়ালেও, মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি থমকে গেল। সে টাইট প্যান্টে অভ্যস্ত নয়। তার সেই প্যান্টের কাপড়ের ওপর দিয়ে তার শরীরের ভাঁজ আর সুগঠিত নিতম্বের রেখাগুলো জঘন্যভাবে ফুটে উঠছে। সে বুঝতে পারছিল তাকে এখন এক অদ্ভুত পণ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। লজ্জায় তার ফর্সা কান দুটো লাল হয়ে উঠল। কিন্তু কোনো উপায় না দেখে সে-ও ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়াল। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে তাদের তিনজনের শরীরের সেই অবাধ্য জ্যামিতি বন্দি হয়ে গেল।

ম্যানেজার ফোনের স্ক্রিনে কয়েকবার আঙুল চালিয়ে ছবি দুটো হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দিলেন চেয়ারম্যান ব্রিজেশ সিংহ রায়ের পার্সোনাল নম্বরে।

২০ তলা: চেয়ারম্যানের কেবিন

ব্রিজেশ সিংহ রায় নিজের রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে মোবাইলটা হাতে নিলেন। ছবিগুলো জুম করে করে দেখতে লাগলেন তিনি। প্রথম দুজন বেশ আত্মবিশ্বাসী, প্রফেশনাল। কিন্তু তিন নম্বর ছবিটার কাছে আসতেই তার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। মেয়েটার ব্যাক প্রোফাইলে এক অদ্ভুত আড়ষ্টতা। সে যে এই পোশাকে একদমই অভ্যস্ত নয় এবং লজ্জিত, সেটা তার কুঁকড়ে থাকা কাঁধ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
ব্রিজেশের ঠোঁটের কোণে সেই চেনা নিষ্ঠুর হাসিটা ফুটে উঠল। তিনি ওই ছবিটাকে মার্ক করে রিপ্লাই দিলেন— "একে আমার কেবিনে পাঠিয়ে দাও।"

৫ তলা: এইচআর রুম

ম্যানেজার ফোনের নোটিফিকেশন দেখে একবার সেই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে নিলেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত এক লোভী দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে তিনি বললেন, "অভিনন্দন। আপনি ২০ তলায় যান, চেয়ারম্যান স্যার আপনার জন্য ওয়েট করছেন। ওখানেই ফাইনাল রাউন্ড হবে।"

বাকি দুজনকে বিদায় জানিয়ে দেওয়া হলো। যে মেয়েটি সিলেক্ট হলো, তার বুকের ভেতরটা তখন কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার বাবা-মা মানা করেছিলেন কোনো জব করতে। সে নিজের কিছু করতে চেয়েছিলো,সে শুধু একটা সুযোগের আশায় এসেছিল, কিন্তু এত দূর চলে আসবে ভাবেনি। তার শরীর কাঁপছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে।

ম্যানেজার ফাইলটা এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনার নামটা কী যেন, মিস?"

মেয়েটা কোনোমতে নিজের কম্পিত স্বর সামলে নিয়ে বলল, "মেঘলা সিনহা।"


বিকেলের রোদের তেজ কমে আসছে। 'সেন কিউওর' (Sen Cure) হাসপাতালের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বারে বসে সায়ক সিনহা বাইরের আকাশচুম্বী ইমারতগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আলমারিতে রাখা তনুশ্রী সেনের দেওয়া সেই ১ কোটি টাকার স্যুটকেসটা এখন শান্ত হয়ে পড়ে আছে, কিন্তু তার উত্তাপ সায়কের নীতিবোধকে তপ্ত সিসার মতো পুড়িয়ে দিচ্ছে।

সায়ক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকেই সান্ত্বনা দিলেন, "এই শহরে একটু-আধটু হাত নোংরা না করলে পরিবারকে মাথা উঁচু করে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব। নীতি দিয়ে তো আর মেয়েকে দামী কলেজে পড়াতে পারতাম না, বা স্ত্রীকে এই শহরে এমন আলিশান ফ্ল্যাট কিনে দিতে পারতাম না।"

সায়কের স্ত্রী, ছেলে বা মেয়ে—কেউ জানে না এই জৌলুসের পেছনের অন্ধকার। তাদের কাছে সায়ক সিনহা একজন অভিজ্ঞ, অত্যন্ত সম্মানীয় ডাক্তার। এই মিথ্যে সম্মানের বর্মটাই এখন তার সবথেকে বড় পুঁজি।

ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখনো সেই বীভৎস 'Pervert Sexual Act'-এর রিপোর্টটা খোলা। প্রতিটি লাইন যেন একেকটা ধারালো নখ হয়ে তার মগজে আঁচড় কাটছে। 
কুহকপুরের সেই নাম না জানা মেয়েটার ওপর যা হয়েছে, তা কোনো সুস্থ মানুষের কল্পনাতেও আসে না। সায়ক টেবিলের ওপর রাখা ফ্যামিলি ফটোর দিকে তাকালেন। হাসিখুশি স্ত্রী আর দুই আদরের সন্তান। তার ৮ বছরের ছোট মেয়েটার নিষ্পাপ মুখটা দেখে সায়কের বুকটা একবার কেঁপে উঠল। তিনিও তো একজন বাবা!

জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন সায়ক। রক্তনগরীর ওই গ্লাস টাওয়ারগুলো যেন একেকটা ক্ষুধার্ত দানব। তার মনে পড়ে গেল আজ সকালে ডাইনিং টেবিলে মেয়ের সাথে হওয়া সেই তপ্ত বাক্যবিনিময়।

মেঘলার জেদ ছিল অটুট। এমবিএ টপার মেয়েটা আজ তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সপাটে বলেছিল, "বাবা, তোমার পরিচয়ে আর কতদিন? লোকে আমাকে ডঃ সায়ক সিনহার মেয়ে হিসেবে চেনে। আমি চাই লোকে আমাকে আমার কাজে চিনুক। SRC টাওয়ার্সে ইন্টারভিউটা আমার কেরিয়ারের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট। আমি ওখানে অন্তত এক বছর কাজ করে কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট আর স্ট্যাটেজিক ডিলিংয়ের স্কিলগুলো শিখতে চাই। প্লিজ বাধা দিও না।"
সায়ক বারবার বারণ করেছিলেন। বলেছিলেন, "মা, এখন জব করার কী দরকার? তুই বরং কোনো সরকারি চাকরির চেষ্টা কর, বা তোর মায়ের মতো টিচিং প্রফেশনে যা। এই কর্পোরেট লাইফ বড্ড কঠিন। এখানে অসম প্রতিযোগিতা, নিজের জন্য একটুও সময় পাবি না।"

কিন্তু মেঘলা শোনেনি। সে শিক্ষিত, এমবিএ টপার। তার আত্মবিশ্বাস ছিল আকাশছোঁয়া। সে ভেবেছিল তার বাবার টাকা বা প্রতিপত্তি নয়, তার মেধা তাকে এই শহরে একটা আলাদা পরিচয় দেবে। তার চোখে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন।

তিনি আবার মেঘলার নম্বরটা ডায়াল করলেন। আবারও সেই একঘেয়ে যান্ত্রিক আওয়াজ— "The number you are calling is currently switched off."

সায়ক ড্রয়ার থেকে মেঘলার ছোটবেলার একটা আবছা ছবি বের করলেন। মেঘলা সবসময়ই খুব শান্ত আর ভদ্র স্বভাবের ছিল। ছবিটার দিকে তাকিয়ে সায়ক বিড়বিড় করে উঠলেন, "তুই কি পারবি মা ওই কর্পোরেট জগতের ইঁদুর দৌড়ে টিকে থাকতে?"




(Chapter 3 - Continued....) 
[+] 3 users Like Vritra Shahryar's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: ??? ???? ???????? ?? ?? ??? - by Saj890 - 01-04-2026, 08:22 AM
RE: নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি - by Vritra Shahryar - 11 hours ago



Users browsing this thread: Kimo1, 6 Guest(s)