04-04-2026, 05:04 AM
(আগের অংশের পর থেকে...)
রাত তখন গভীরে। রক্তনগরীর আকাশছোঁয়া কাঁচের বিল্ডিংগুলো আর নিয়ন আলোর জৌলুসকে পেছনে ফেলে একটা কালো বাইক ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে। শহরের চকচকে আভিজাত্য যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে নর্দমার দুর্গন্ধ আর অন্ধকারের রাজত্ব। ক্যানেলের ধারের ভাঙাচোরা রাস্তায় বাইকটা নামার আগে আরোহী একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের মায়াবী শহরটার দিকে তাকাল। যেন এক দানব তার শিকারের দিকে শেষবার দেখে নিচ্ছে।
বাইক থামিয়ে হেলমেটের কাঁচটা তুলল অনিকেত। পকেট থেকে একটা বিড়ি জ্বালিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখল। ঠিক তখনই স্ক্রিনে ভেসে উঠল নামটা— 'বাবা সাহেব'।
অনিকেত কলটা রিসিভ করে গভীর স্বরে বলল, "হ্যাঁ বাবা সাহেব... না না..... হাঁ হাঁ....আমরা পৌঁছে গেছি। আপনার দেওয়া ঠিকানা...ওই বুড়ো...মানে..কাদের আলির মেস বাড়িতেই উঠেছি। আচ্ছা আচ্ছা.....ওকে... আপনি ইমেজ দুটো পাঠিয়ে দিন, আমি কাল সকালেই স্পট ভিজিট করব।"
ফোনে ওপাশ থেকে আসা নির্দেশগুলো মন দিয়ে শুনে অনিকেত কলটা কেটে দিল। ততক্ষণে হোয়াটসঅ্যাপে দুটো পুরনো ঝাপসা ছবি চলে এসেছে। ক্যানেলের ধারের সরু ৬ ফুটের রাস্তা দিয়ে বাইকটা চালিয়ে সে এসে থামল সেই নোনা ধরা মেস বাড়ির সামনে। দরজায় প্রথমে দুটো হালকা টোকা, তারপর অধৈর্য হয়ে জোরে কয়েকটা ধাক্কা মারল সে।
ভেতর থেকে দরজা খুলল কাদের আলি। পরনে লুঙ্গি আর ময়লা সাদা গেঞ্জি, ভুঁড়িটা একটু বেরিয়ে আছে। মুখে গালভর্তি লম্বা দাড়ি আর চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। উচ্চতায় অনিকেতের থেকে কিছুটা খাটো। সে কোনো কথা না বলে নিঃশব্দে সরে দাঁড়িয়ে অনিকেতকে ভেতরে ঢোকার পথ করে দিল।
দোতলার সেই ঘরটায় প্লাস্টার চটে গিয়ে ইঁটগুলো কঙ্কালের মতো বেরিয়ে আছে।
অনিকেত ভেতরে ঢুকতেই অর্ক দরজাটা বন্ধ করে দিল। ঘরে ঢুকে অনিকেত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জানালার কাছে একটা বিদঘুটে দেখতে কালো অ্যান্টেনা তার দিয়ে সেট করা। টেবিলের ওপর দুটো ল্যাপটপ খোলা, যেগুলোর ফ্যানগুলো একটানা গোঁ গোঁ শব্দে চলছে। চারিদিকে তারের জঞ্জাল, আর তার মাঝে অর্ক খালি গায়ে বসে ঘামছে।
অনিকেত জানালার পাশে দাঁড়িয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল, "বুঝতে পারছি না রে অর্ক, প্ল্যানটা কীভাবে এগোবে। আজ সারাদিন শহরটা চষে ফেললাম, কিন্তু কোনো ক্লু নেই। সিংহ রায় আর সেন ফ্যামিলিকে এখানকার লোক যমের মতো ভয় পায়, আবার ভগবানের মতো ভক্তিও করে।"
সে একটু থেমে বিড়িতে টান দিয়ে বলল, "একটা চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিলাম, লোকগুলো এমনভাবে আমায় ঘিরে ধরল যেন আমি কোনো ভিনগ্রহের প্রাণী। জেরা শুরু করে দিল উল্টে।"
অর্ক ঘরের মাঝে বসে ঘামছিল। সে ক্লান্ত গলায় বলল, "দাদা, একটা বিড়ি দে তো... মাথাটা ধরে গেছে এগুলো সেট আপ করতে।"
অনিকেত একটা বিড়ি ধরিয়ে ওর দিকে এগিয়ে দিল।
অর্ক বিড়িতে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে ধীর স্বরে বলল, "হবে না কেন দাদা? এরা যতটা পাওয়ারফুল, ততটাই ধূর্ত। পুরো সিটি যেমন ওদের ভয় পায়, তেমনই আবার মাথায় করে রাখে। সিংহ রায়রা হাজার হাজার ব্রিলিয়ান্ট ছেলেমেয়েকে—যারা স্রেফ অভাবের জন্য পড়তে পারে না—নিজেদের প্রাইভেট কলেজে স্কলারশিপ দিয়ে পড়ায়। তারপর তাদেরই নিজেদের কোম্পানিতে চাকরি দেয়।এক ঢিলে দুই পাখি দাদা—শহরের মানুষের চোখে এরা ত্রাতা, আর নিজেদের জন্য একদল অন্ধ অনুগত গোলাম তৈরি করে রাখা। এই আড়ালে কী হচ্ছে, সেটা দেখা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব।"
অনিকেত ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকালো। সে অবাক হয়ে বলল, "এত কিছু করছিস, তবু ওদের ধরা একটু কষ্ট আছে অর্ক ভাই। আজ দুপুরে যখন SRC Building-এর সামনে গেলাম... ভাই, আমাদের মতো লোকেদের এন্ট্রি পাওয়া ইম্পসিবল। সিংহ রায় প্যালেস বা সেন ভিলা—সেগুলোয় সহজে ঢোকা সম্ভব না।"
অর্ক ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই জিজ্ঞেস করল, "বাবা সাহেব কবে আসবে?"
অনিকেত একবার ওর দিকে তাকিয়ে বলল, "আসবে আসবে... আগে আমাদের কিছুটা পথ সোজা করে নিতে হবে। ভাই, মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে হবে। আর বাবা সাহেবের একটা কথা মনে রাখবি— পেশেন্স! পেশেন্স! পেশেন্স!"
সে জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলতে লাগল, "প্রতিশোধ নেওয়া সহজ কাজ নয় অর্ক। প্রতিশোধ একটা ধীরগতির বিষ, যা নিজের রক্তে মিশিয়ে রাখতে হয়। প্রতিশোধ মানে শুধু কাউকে মেরে ফেলা নয়, প্রতিশোধ মানে তিলে তিলে তাদের সেই সাম্রাজ্য ধুলোয় মেশানো। এর জন্য লাগে আত্মত্যাগ, অটুট ফোকাস আর বরফের মতো ঠান্ডা মস্তিষ্ক। প্রতিশোধ কোনো হুজুগ নয়, এটা একটা সাধনা। যারা তাড়াহুড়ো করে, তারা নিজেরাই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যারা অপেক্ষা করতে জানে, তারা ইতিহাস লেখে। রিভেঞ্জ ইজ আ ডিশ, দ্যাট ইজ বেস্ট সার্ভড কোল্ড।"
বাবা সাহেবের কথা মনে পড়তেই অনিকেত দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, "পেশেন্স! অর্ক... পেশেন্স! আমরা ওদের দুর্বল জায়গাটা ঠিক খুঁজে পাব। আমাদের মেইন গোল হলো ওদের আরও কাছে পৌঁছানো।"
ঠিক তখনই দরজায় হালকা কিন্তু স্পষ্ট তিনটে টোকা পড়ল। দুজনেই চমকে উঠল। কারণ বাবা সাহেব বলেছিলেন, এই ঘরে তাদের অনুমতি ছাড়া কেউ কোনোদিন আসবে না। তবে কি ওরা ধরা পড়ে গেল?
অনিকেত মুহূর্তের মধ্যে ব্যাগ থেকে একটা গান (Gun) বের করল। সে নিঃশব্দে দরজার কাছে গিয়ে গানটা দরজার দিকে তাক করে একটা সেফ ডিসট্যান্স বজায় রেখে ধীরে ধীরে পাল্লাটা খুলল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে মেস মালিক কাদের আলি। তার চশমার কাঁচটা হলদেটে আলোয় রহস্যময়ভাবে চকচক করছে। সে হাতে একটা ছোট কাগজের টুকরো নিয়ে দাঁড়িয়ে।
দরজাটা খুলে কাদের আলি ভেতরে ঢুকল। কিন্তু তার চোখেমুখে কোনো ভয় বা উদ্বেগ নেই। সে একদৃষ্টিতে টেবিলে রাখা বিড়ির প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের খসখসে হাতে একটা বিড়ি তুলে নিয়ে শান্তভাবে সেটা ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে এক গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় সে বলল, "অনিকেত, এখানে এসে বসো। এটা কালোঘাট। এই শহরের অভিজাত পরিবারগুলোর অনুগত লোকজন (Loyalists) এখানেই গিজগিজ করে। তারা অলরেডি তোমাকে দেখেছে... রাতের অন্ধকারে ওভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে।"
অনিকেত আর অর্ক স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইল। কাদের আলির বয়সটা বাবা সাহেবের মতোই হবে। তার দুচোখে এক অদ্ভুত শীতলতা, কিন্তু কণ্ঠস্বরে এমন একটা মোলায়েম আমেজ (Soothing tone) আছে যা শুনলে মনে হয় চারপাশের অশান্তি এক নিমেষে থিতিয়ে যাবে। গত তিন দিন ধরে তারা এখানে আছে, কিন্তু কাদের আলি একটাও কথা বলেনি। আজ যখন সে কথা বলছে, মনে হচ্ছে এক বিশাল অভিজ্ঞ কোনো পাহাড় কথা বলছে।
পেশায় কাদের আলি একজন ভেষজ ডাক্তার। এই বস্তি এলাকার মানুষ তাকে অসম্ভব সম্মান করে। অনিকেত দেখেছে, সকালে এই মেস বাড়ির সামনেই সে বস্তির ছোট ছোট ছেলেদের পড়তে বসায়। আর বাকি সময়টা কাটে তার সেলাই মেশিনের একটানা ঘরঘর আওয়াজের মাঝে।
অনিকেত বন্দুকটা ব্যাগে রেখে একটা ছোট কাঠের টুলে কাদের আলির সামনে এসে বসল। "বলুন কাদের সাহেব। আপনি আমাদের চেনেন?"
কাদের আলি বিড়িতে শেষ টান দিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। "ওভাবে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ো না। এই শহর রাতে ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে ঠিকই, কিন্তু এখানকার রাতগুলো বড় অভিশপ্ত। সময় আসবে... যখন সত্যিই বেরোতে হবে, তখনই বেরিয়ো।"
অর্ক আর অনিকেত একে অপরের দিকে তাকাল। কাদের আলি তাদের হতভম্ব চেহারা দেখে ঈষৎ হাসল। "আমি তোমাদের বাবা সাহেবের এক সময়ের পুরনো বন্ধু। আশা করি এইটুকু জানলেই তোমাদের জন্য যথেষ্ট। ওই অ্যান্টেনাটা সকাল হলেই সরিয়ে ফেলবে, ওভাবে জানালার বাইরে রেখো না। লোকের নজরে পড়তে পারে। আমি এই এলাকায় গত ১৫ বছর ধরে আছি, আমি জানি দেওয়ালেরও কান থাকে।"
কথাটা শেষ করে কাদের আলি তার ফতুয়ার পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা পুরনো হলদেটে কাগজ বের করে অনিকেতকে দিল। অনিকেত কাগজটা খুলে দেখল সেটা একটা পুরনো সংবাদপত্রের কাগজের টুকরো। সেখানে বড় বড় অক্ষরে দুটো নাম লেখা: 'AALOYAN FOUNDATION (NGO)' এবং 'D’ORO COUTURE & VELVET BREW'।
কাদের আলি নিচু স্বরে বলল, "এই দুটো কোম্পানির ডিটেইলস তোমরা জানো, কিন্তু এর নিচের খবরটা তোমরা জানতে না। এই কোম্পানিগুলোর নামে এক সময় একটা বড় 'Money Laundering'-এর কেস হয়েছিল। যে রাতে এই নিউজটা পাবলিশ হয়েছিল, সেই রাতেই শহরের সব নিউজ পেপার গুদাম থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল। এই একটা টুকরো আমি অনেক কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম।"
অনিকেত কাগজের সেই টুকরোটার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। তার মানে এই লড়াইটা শুধু রিভেঞ্জ এর নয়, এটা একটা বিশাল অর্থনৈতিক দুর্নীতিরও।
কাদের আলি উঠে দাঁড়াল। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষবারের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, "কাল এই কাগজটা পুড়িয়ে দিও। স্মৃতি যেন শুধু মগজে থাকে, কাগজে নয়।"
মেস বাড়ির সেই স্যাঁতসেঁতে ঘর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই অন্য এক জগত। সেখানে রাস্তার ধারের অন্ধকার গাছটার নিচে নিজের দামি বাইকটা নিয়ে মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীক্ষিত। তার চোখে এখন আগুনের শিখা। সে গত কয়েক মাসে অন্তত ৩০-৪০ বার নোটিশ করেছে—মধুশ্রীর মোবাইলে কোনো একটা টেক্সট এলেই সে যেকোনো বাহানা দিয়ে সেখান থেকে সরে পড়ে। আজ দীক্ষিত তাকে নিঃশব্দে ধাওয়া করেছে।
দীক্ষিত দেখল, মধুশ্রী একটা নির্জন ফার্ম হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে ছটফট করছে। একটু পরেই ফার্ম হাউসের গেটের আলো জ্বলে উঠল। গেটের নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে নামটা— 'মিঃ শর্মা'। দীক্ষিত এই নামটা আগে কখনও শোনেনি। মধুশ্রী তাকে বলেছিল অফিসের একটা জরুরি প্রাইভেট মেইল চেক করতে হবে, অথচ সে এখন এই মাঝরাতে এক অজানা মানুষের ফার্ম হাউসে!
রাগে আর অভিমানে দীক্ষিতের হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এল। সে আর অপেক্ষা করল না। বাইকটা লুকিয়ে রেখে নিঃশব্দে পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বাগানের অন্ধকার দিয়ে সে এগিয়ে এল ড্রয়িং রুমের জানালার কাছে।
ভেতরের দৃশ্যটা দেখে দীক্ষিতের মাথায় রক্ত চড়ে গেল। একটা দামী সোফায় মধুশ্রী বসে আছে, গরমে আর আতঙ্কে সে দরদর করে ঘামছে। তার পাশেই বসে আছে এক মাঝবয়সী মোটা চেহারার লোক। লোকটা মধুশ্রীর একদম ঘেঁষে বসল, যেন তার ওপর নিজের দখলদারি কায়েম করছে।
দীক্ষিত আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। জানালার কাঁচ সরিয়ে সে ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ল। সামনে বসা লোকটার বয়সের কোনো তোয়াক্কা না করে, সমস্ত ঘৃণা আর শক্তি দিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল লোকটার গালে। থাপ্পড়টা এতটাই জোরালো ছিল যে লোকটা সোফায় ছিটকে পড়ে গোঙাতে লাগল। দীক্ষিতকে এভাবে সেখানে দেখে লোকটা পুরোপুরি বিমূঢ় হয়ে গেছে—তার চোখমুখে কথা বলার শক্তিটুকুও যেন কেড়ে নিয়েছে আতঙ্ক।
মধুশ্রী চিৎকার করে উঠল, "দীক্ষিত! তুমি এখানে?"
দীক্ষিত থামল না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। যে হাতটা দিয়ে লোকটা একটু আগে মধুশ্রীর কাঁধ ছুঁয়েছিল, সেই হাতের ওপর নিজের ভারী বুটটা দিয়ে সজোরে চাপ দিল সে। বুটের তলায় লোকটার আঙুলগুলো মুচড়ে যেতে লাগল, যন্ত্রণায় সে ককিয়ে উঠল। নির্জন এই ফার্ম হাউসে কোনো গেট-কিপার বা পাহারাদার নেই, তাই লোকটার গোঙানি শোনার মতোও কেউ ছিল না।
ঠিক সেই সময় বাথরুমের দরজার আড়ালে থাকা সেই মানুষটা রাগ আর বিস্ময় নিয়ে মধুশ্রীর দিকে তাকাল। মধুশ্রীও সেই চোখের ভাষা পড়তে পারল। সে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল, তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করে বলল, "দীক্ষিত! প্লিজ ওকে ছেড়ে দাও! লিভ হিম!"
দীক্ষিত মধুশ্রীর কথা শুনে পা সরিয়ে নিল। কিন্তু সে যখন মধুশ্রীর দিকে ফিরল, সেই চাহনিতে আর সেই চিরচেনা কিউট আর চার্মিং দীক্ষিত ছিল না। তার চোখে এখন কেবল এক জমাট বাঁধা বরফ আর তীব্র বিতৃষ্ণা। মধুশ্রী সেই চাহনি দেখে নিজের অজান্তেই পিছিয়ে গেল।
দীক্ষিত কোনো কথা না বলে মধুশ্রীর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। হিড়হিড় করে তাকে টেনে ফার্ম হাউসের বাইরে নিয়ে এসে নিজের বাইকের পেছনে বসতে বলল। পুরো রাস্তা দীক্ষিত কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি বা ঝগড়া করল না—এক অদ্ভুত হিমশীতল নিস্তব্ধতা বজায় রেখে সে বাইক চালিয়ে মধুশ্রীর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
বাইক থামতেই মধুশ্রী নেমে আর্তনাদ করে উঠল, "দীক্ষিত, যেও না! ঘরে চলো... অনেক কথা আছে, অনেক কিছু তোমায় বলার আছে। প্লিজ শোনো!"
দীক্ষিত একবার মধুশ্রীর দিকে তাকাল। তার ভেতরে এক আকাশ প্রত্যাশা ছিল যে, পৃথিবীর সবাই মিথ্যে বললেও অন্তত এই একটা মেয়ে তাকে সত্যি ভালোবাসবে। সে শান্ত কিন্তু ভাঙা গলায় শুধু একটা কথাই বলল, "You lied to me!"
কথাটা শেষ করেই সে বাইকের এক্সেলেটর ঘুরিয়ে দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাইকটা ঝড়ের গতিতে মধুশ্রীর চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল। মধুশ্রী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ঠিক তখনই তার ফোনে আবার সেই আননোন নম্বর থেকে একটা টেক্সট ভেসে উঠল:
"Congratulations, you are finally free. Your secrets are now ghosts, and I have burned the evidence of your shame to ashes. But tell me, as you stand in the wreckage of his broken trust—do you truly feel liberated? you have betrayed the only heart that was ever yours. You are no longer my prisoner, Madhushree, but you are now a captive of your own guilt. Fly away if you can... but remember, a traitor’s wings are always heavy with the weight of the souls they’ve cheated."
বাইকের স্পিড যত বাড়ছে, রক্তনগরীর সেই আভিজাত্যমাখা বাতাসটা তত সজোরে আছড়ে পড়ছে দীক্ষিতের চোখে-মুখে। কিন্তু সেই ঠান্ডা হাওয়াও ওর ভেতরের আগুন নেভাতে পারছে না। ও সত্যিই ভালোবেসেছিল মধুশ্রীকে—হয়তো এই বিষাক্ত শহরে মধুশ্রীই ছিল ওর একমাত্র আশ্রয়। সেই বিশ্বাসের মূলে আজ কুঠারাঘাত লেগেছে। মধুশ্রীর সেই মিথ্যে কথা, সেই নির্জন ফার্ম হাউস, আর সেই অচেনা লোকটার নোংরা হাতের স্পর্শ—সবকিছু বারবার ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
রাগে আর যন্ত্রণায় দীক্ষিত বাইকের এক্সেলেটরটা আরও জোরে মুচড়ে ধরল। ইঞ্জিনের গর্জন যেন ওর মনের আর্তনাদকে ছাপিয়ে যেতে চাইছে। ওর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, কোনো গন্তব্য নেই। ও তো শুধু একটু নিখাদ ভালোবাসা চেয়েছিল, অথচ বদলে পেল চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
শহরের একটা নামী পানশালার (Bar) সামনে এসে সজোরে ব্রেক কষল সে। টলতে টলতে ভেতরে ঢুকে সোজা কাউন্টারে গিয়ে বসল। দুচোখ রক্তবর্ণ, চোয়াল শক্ত। ওয়েটারের দিকে না তাকিয়েই সে একটা কড়া ড্রিঙ্ক অর্ডার করল। গ্লাসটা আসতেই এক চুমুকে সেটা গিলে নিল সে। গলার ভেতর দিয়ে সেই তরল আগুন নেমে গেল, কিন্তু তাতেও শান্তি নেই। সে আবার অর্ডার করল—আরেকটা, তারপর আরও একটা।
পাব-এর ভেতরে চলা সেই চড়া মিউজিক, লোকজনের হাসাহাসি আর আলোর ঝিলিক—আজ কিছুই ওর ভালো লাগছে না। এক অদ্ভুত অস্থিরতা ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ড্রিঙ্কস শেষ করে সে আবার বেরিয়ে এল পার্কিং-এ। নেশার ঘোরেও ওর শরীরের ওপর অদ্ভুত এক নিয়ন্ত্রণ। সে আবার বাইকে উঠে এক্সেলেটর মোচড় দিল। ইঞ্জিনের সেই তীব্র আওয়াজটাই এখন ওর একমাত্র সঙ্গী। সে জানে না সে কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু এই রক্তনগরীর অন্ধকার ওকে গ্রাস করার আগেই ও আজ নিজেকে শেষ করে দিতে চায়।
End of Chapter 2
To be continued...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)