Thread Rating:
  • 12 Vote(s) - 3.33 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি
#30
(আগের অংশের পর থেকে...)


লিফটের ভেতরে অনুশ্রী তখন সম্পূর্ণ একা। গোল্ডেন আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজেই শিউরে উঠছে। এক তীব্র অপরাধবোধ তার কলিজা ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে। সে নীরবকে মিথ্যে বলেছে যে বইটা পড়ে তার শরীর 'রিঅ্যাক্ট' করেনি। অথচ সে জানে, ওই অন্ধকার লাইনের প্রতিটি শব্দ তার শরীরের শিরায় শিরায় আগুনের স্রোত বইয়ে দিয়েছিল। শরীরের প্রতিটি রোমকূপ থেকে শুরু করে ব্লাউজের নিচে তার স্তনের বোঁটাগুলো তখন এতটাই শক্ত আর খাড়া হয়েছিল যে মনে হচ্ছিল তখনই কাপড়ের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে।

অনুশ্রী মনে মনে স্বীকার করল— নীরবের স্পর্শে তার শরীর যতটা না সাড়া দেয়, আজ তার এই অতৃপ্ত কামনায় ভরা অবাধ্য শরীর তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি আলোড়িত হয়েছে। ওই বইটা পড়ার সময় যদি যে কেউ—এমনকি ওই ড্রাইভার আলমও যদি তাকে একটু স্পর্শ করত, তবে তার দীর্ঘদিনের জমানো আভিজাত্য এক মুহূর্তে ধুয়ে মুছে যেত। যোনিদ্বার থেকে বেরোনো সেই উষ্ণ রসের বিস্ফোরণ যেন কোনো সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা, যা সে বহু দিন ধরে নিজের ভেতরে চেপে রেখেছে।
পরক্ষণেই আলমের কথা মাথায় আসতেই সে শিউরে উঠল। "ছিঃ ছিঃ! আলম আমায় টাচ করবে?" নিজেরই এই নোংরা ভাবনার ওপর তার ঘৃণা হলো। তার মাথা ঘুরছে; মনে হচ্ছে মগজের ভেতর হাজার হাজার পোকা কিলবিল করছে। সে কিছুতেই সোজাভাবে ভাবতে পারছে না।

সবচেয়ে বড় ভয় এখন আলমকে নিয়েই। যে ছেলেটা ইংলিশে অনার্স করেছে, সে নিশ্চয়ই অনুশ্রীর প্রতিটি গোপন নিঃশ্বাসের মানে বুঝে গেছে। অনুশ্রী নিজেকেই ধিক্কার দিল— যখন নীরব বলেছিল এক নতুন ড্রাইভার তাকে আনতে যাবে, তখন কেন সে আলমের ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি? কেন একজন মালকিন হিসেবে সে তার ইতিহাস জানার প্রয়োজন মনে করেনি?

লিফটটা গ্রাউন্ড ফ্লোরে থামতেই অনুশ্রী প্রায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে বেরোল। তার এখন একটু একলা হওয়া দরকার, একটু শীতল জলের স্পর্শ দরকার।

 উত্তেজনার আতিশয্যে সে লক্ষ্যই করল না যে গ্রাউন্ড ফ্লোরের কমন ওয়াশরুমের দরজায় একটা বড় বোর্ড ঝুলছে— "Don't Use Now: Cleaning is Going On"।
সে ঝড়ের বেগে সেই ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। বেসিনের সামনে গিয়ে আয়নায় নিজের অবাধ্য রূপটা দেখল আর জোরে জোরে হাঁপাতে লাগল। তার বুকের সেই দ্রুত ওঠানামা আর গালের সিঁদুরে আভা যেন বাইরের সেই গুমোট পরিবেশের সাথে একাত্ম হয়ে যেতে চাইছে। তার কানে তখন নিজের হৃদস্পন্দন ছাড়া আর কিছুই পৌঁছাচ্ছে না।

ভেতরটা প্রথম দেখায় ফাঁকা মনে হলেও, পর্দাঘেরা সার্ভিস এরিয়া থেকে জলের ঝাপটার শব্দ আর দুজন পুরুষের চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছিল।
ভেতরে থাকা সেই দুই ক্লিনার জানত না যে তাদের মালিকের ঘরের বউ আজ দরজার সেই 'Cleaning' বোর্ডটা না দেখেই ভেতরে ঢুকে পড়েছে।




শীতল জলের ঝাপটা মুখে পড়তেই অনুশ্রীর সেই ঘোর কাটল। সে আয়নায় নিজেকে দেখল—তার ফর্সা মুখ, রাঙা ঠোঁট আর বারগান্ডি ব্লাউজের ওপরে জলের হালকা হালকা বিন্দু ফুটে আছে। সে তার দামী ব্যাগ থেকে একটি রেশমি এমব্রয়ডারি করা রোমান্টিক রুমাল বের করল, যার সুগন্ধে এক আভিজাত্যের ছোঁয়া। রুমাল দিয়ে সে পরম মমতায় মুখটা মুছে নিল। মনে হলো, এই শীতল জলের স্পর্শে তার শরীরের সেই অবাধ্য কামনার আগুন, যা ওই বইটা জ্বালিয়েছিল, তা যেন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে।
অনুশ্রীর মাথা আস্তে আস্তে ঠান্ডা হলো। সে মেকআপ বক্স বের করে হালকা টাচ-আপ করল। আয়নায় নিজেকে আবার দেখল। শিফন শাড়িতে জলের ছিটে লাগাতে সেটা তার পেটের সাথে লেপ্টে গেছে, আর তার গোল গভীর নাভিটা আরও বেশি উন্মুক্ত আর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। শাড়িটা যেন তার ফর্সা ধবধবে পেট আর নাভিকে এক নিষিদ্ধ হাতছানিতে জড়িয়ে ধরেছে। অনুশ্রী শাড়িটা হাত দিয়ে একটু সরিয়ে নিল। তার মুখে সেই চিরচেনা নিষ্পাপ হাসি। আয়নায় নিজের সেই রাজকীয় গাম্ভীর্য আর মার্জিত রূপলাবণ্য ফেরত পেয়ে সে মনে মনে একটু আশ্বস্ত হলো।
সে ঘুরে দাঁড়াল, ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল। ঠিক তখনই, পর্দাঘেরা সার্ভিস এরিয়ার আড়াল থেকে কয়েকটা চাপা ফিসফাস—তাও আবার পুরুষের গলার আওয়াজ—শুনে সে থমকে গেল। "এটা তো মেয়েদের ওয়াশরুম! ছেলেরা কী করছে এখানে?" অনুশ্রী ভুরু কুঁচকাল। তার মনের ভেতরের আভিজাত্য জেগে উঠল। সে ভাবল, এখনই গিয়ে তাদের ধরবে আর এই কাজের জন্য আজই ফায়ার্ড করে দেবে।
সে কড়া পায়ে সার্ভিস এরিয়ার পর্দার দিকে এগিয়ে গেল। পর্দাটার খুব কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে শুনতে পেল...!

সার্ভিস এরিয়ার সেই নীল পর্দার একদম কাছাকাছি আসতেই অনুশ্রীর কানে এল সেই তপ্ত সিসার মতো শব্দগুলো। ভেতরে থাকা সেই দুই ক্লিনার জানত না যে তাদের মালিকের ঘরের বউ পর্দার ওপারেই দাঁড়িয়ে নিজের আভিজাত্যের চিতা দেখছে।

ক্লিনার ১: (জলের ঝাপটার শব্দের মাঝেই একটা খ ফ্যাসফেসে গলায়) "কিরে লতিফ, দেখলি তো ম্যাডামকে? ওই যে লাল শাড়িটা পরে যখন নামল... শালার ওরে দেখলে তো ইবলিশেরও ইমান নষ্ট হয়া যায় রে!"

লতিফ (ক্লিনার ২): (একটা কুৎসিত হাসি দিয়ে) "আরে ওই শাড়ি তো নামকাওয়াস্তে! লিফটে দেখলাম ভাই... উফফ, আমার চউখের সামনে যখন খাড়াইলো... শালার ওই ফরসা কোমর আর ডাগর ডাগর পাছা! উফফ ভাই, মনটা চাইতাছিল লিফটের ভিতরেই পিছন থিকা জাপ্টাইয়া ধরি..."

অনুশ্রী স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল সেই ১৯ তলায় ওঠার সময়কার কথা। সেই ময়লা ইউনিফর্ম পরা বৃদ্ধ ক্লিনারটা তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। লিফটের গোল্ডেন আয়নায় অনুশ্রী দেখেছিল, লোকটা কীভাবে জানোয়ারের মতো জিব চাটছিল আর তার শরীরের ভাঁজগুলোকে চোখের চাউনি দিয়ে খুবলে খুবলে খাচ্ছিল। তখন অস্বস্তিতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, আর এখন সেই একই লোকের মুখে নিজের শরীরের এই কদর্য বর্ণনা শুনে তার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বয়ে গেল।
ক্লিনার ১: "আলো যখন ওনার উরুর খাঁজে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল এখনই শাড়িটা ছিঁড়ে হাত দিই। শুনলাম বড় সাহেবের এই পোলা নাকি সারাদিন কাম নিয়া পইড়া থাকে। অত বড় ডাগর ডাগর দুধ আর ওই কোমরের ভাঁজ কি আর ওই সাহেব সামলাইতে পারে? আমাগো মতো জোয়ান মরদ পাইলে তবেই না ওই মাগীর আগ্নেয়গিরি শান্ত হইতো!"

'মাগী' শব্দটা শোনার সাথে সাথে অনুশ্রীর কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। অপমানে তার রক্ত টগবগ করে ফুটছে; মনে হচ্ছিল এখনই পর্দা সরিয়ে লোকদুটোর গালে সজোরে থাপ্পড় বসিয়ে দেবে। কিন্তু তার পা দুটো যেন কোনো পুরনো গাছের শিকড়ের মতো মেঝের সাথে আটকে গেছে। সে নড়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। ঘেন্নায় নিজের শরীরটাকে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে, অথচ আশ্চর্যের বিষয়—তার শরীরের সেই 'গোপন লাভা' এই পৈশাচিক অপমানে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

লতিফ (ক্লিনার ২): "ঠিক কইছস! ওই ডাগর বুক দুইটারে যদি একবার নিঙড়াইতে পারতাম, শালার জীবন ধন্য হয়া যাইত। দেখলি না, হাঁটার সময় কেমনে পাছাটারে দোলাইতেছিল? মনে হইতেছিল পিছন থিকা গিয়া..."


অনুশ্রী আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা হারাল। তার মনে হচ্ছে ওয়াশরুমের এই চারদিকের দেওয়ালগুলো জীবন্ত হয়ে তাকে গিলে ফেলবে। সে টলতে টলতে ভারী দরজাটা ঠেলে করিডোরে বেরিয়ে এল। তার মাথা ঘুরছে, পৃথিবীটা যেন দুলছে। 




ওয়াশরুমের সেই নরক গুলজার থেকে বেরিয়ে অনুশ্রী একবার গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল।
করিডোরের ঠান্ডা হাওয়ায় সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস নিল। বাইরের আয়নায় মেকআপটা শেষবারের মতো ঠিক করে নিয়ে সে তার মুখে এক চিলতে অমলিন হাসি ফুটিয়ে তুলল।
মেইন গেট দিয়ে বেরোনোর সময় অনুশ্রীর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক রাজকীয় দর্প প্রকাশ করছে। সে প্রমাণ করতে চায়—ভেতরের সেই নীচু স্তরের লোকেদের 'মাগি' সম্বোধন তাকে স্পর্শ করতে পারেনি; সে এখনো সেই ধরাছোঁয়ার বাইরের সিংহ রায় পরিবারের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী পুত্রবধূ।

মেইন গেটের সিকিউরিটি গার্ড সসম্ভ্রমে মাথা ঝুঁকিয়ে স্যালুট দিয়ে গাড়িটার পেছনের দরজাটা খুলে ধরল। অনুশ্রী অতি মার্জিত ভঙ্গিতে ভেতরে গিয়ে বসল। বাইরের কাঠফাটা রোদ আর গুমোট গরম থেকে বাঁচতে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইল। কিন্তু ভারী দরজাটা সশব্দে বন্ধ হতেই সে এক অদ্ভুত ধাক্কা খেল।

বন্ধ গাড়ির ওই তপ্ত বাতাসে অনুশ্রীর নাকে এসে লাগল এক নোংরা, ভ্যাপসা, উগ্র, নোনা আর বুনো পুরুষালি গন্ধ । 

অনুশ্রীর দামী পারফিউমের সুগন্ধকে ছাপিয়ে এই ঘামাচি আর পুরুষের জান্তব গন্ধটা তার মগজে গিয়ে আঘাত করল। তার মনে হলো, এই গন্ধটা যেন অদৃশ্য হাতের মতো তার গলার কাছে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে, তার নাকেমুখে ঢুকে তার আভিজাত্যের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিতে চাইছে। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু পরক্ষণেই তার আভিজাত্যের রক্ত টগবগ করে উঠল। ওই বইয়ের পাতায় পড়া কামনার নেশা বা ওয়াশরুমের ক্লিনারদের নোংরা সংলাপ—সবই যেন এক লহমায় কর্পূরের মতো উড়ে গেল।

সে নিজেকে শক্ত করে মনে করিয়ে দিল—সে অনুশ্রী সিংহ রায়। এই শহরের সবথেকে বড় আর বিত্তশালী 'সিংহ রায়' পরিবারের পুত্রবধূ সে। তার নিজের পরিচয়ও কম নয়; সে 'সেন জেনিক্স গ্লোবাল সলিউশন'-এর মালিক মেঘাদিত্য সেনের কন্যা। এই আভিজাত্য তার রক্তে, তার অহংকারে। আর তার সামনে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা ওই ঘর্মাক্ত শরীরটা? ওটা তাদের নির্দেশ পালনকারী এক সামান্য বেতনভুক্ত কর্মচারী ছাড়া আর কিছুই নয়।

অনুশ্রী তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি দামী সুগন্ধি টিস্যু বের করে আলতো করে নাকের কাছে ধরল। তারপর অত্যন্ত শীতল আর কর্কশ গলায়, একদম কমান্ডিং টোনে ফেটে পড়ল।
"আলম! এসি-টা অন করো। ইমিডিয়েটলি!"
আলম রিয়ার-ভিউ মিররে একবার তাকাল, তার চোখে তখনো সেই অবাধ্য চাউনি। কিন্তু অনুশ্রীর কণ্ঠস্বরের সেই রাজকীয় তেজ তাকে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দিল।
"সরি ম্যাডাম, আমি আসলে খেয়াল করি নাই..." আলম বিড়বিড় করে বলতে চাইল।

"শাট আপ আলম!" অনুশ্রী তাকে কথা শেষ করার সুযোগই দিল না। তার শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠস্বর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। "একজন ড্রাইভারের বেসিক ম্যানারস কী, সেটা কি তোমাকে আলাদা করে শেখাতে হবে? বন্ধ গাড়িতে এসি না চালিয়ে রাখাটা তোমার ধৃষ্টতা নাকি চরম অযোগ্যতা? ডন্ট ফরগেট ইওর লিমিটস, আলম!"

অনুশ্রীর এই তীক্ষ্ণ ধমকটা আলমের পৌরুষে গিয়ে তপ্ত শলার মতো বিঁধল। তার সেই অনুশ্রীকে নিয়ে দেখা কামনার স্বপ্নগুলো এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল। আলম নিঃশব্দে এসি-র নবটা ঘুরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে বরফশীতল হাওয়া বের হতে শুরু করল, যা আলমের শরীরের সেই বুনো গন্ধটাকে কোণঠাসা করে ফেলল।

অনুশ্রী জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। 



আলম রিয়ার-ভিউ মিররে একবার অত্যন্ত সন্তর্পণে অনুশ্রীর দিকে তাকাল। তার গলায় এখন এক অদ্ভুত জড়তা, যেন একটু আগের সেই রাজকীয় তেজে সে একদম কুঁকড়ে গেছে।

"ম্যাডাম... এখন কোথায় যাবেন?" আলম খুব কাঁপাকাঁপা গলায় প্রশ্নটা করল। তার চোখেমুখে এক ধরণের অপরাধীর ছায়া, যেন সে জানে তার এক মুহূর্তের ভুলেই সিংহ রায় পরিবারের পুত্রবধূর মেজাজ বিগড়ে গেছে।

অনুশ্রী বিরক্তিতে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়েই শীতল স্বরে বলল, "ঘরে চলো।"
গাড়ির এসি এখন ফুল স্পিডে চলছে। বরফশীতল হাওয়া অনুশ্রীর উত্তপ্ত মগজটাকে কিছুটা শান্ত করে আনল। সে সিটে পিঠ ঠেকিয়ে নিজেকে একটু আলগা করল, কিন্তু মনের ভেতরের ঝড়টা তখনো থামেনি। সে মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করল—সে কেন আলমের ওপর ওভাবে ফেটে পড়ল? সে তো কখনো কর্মচারীদের সাথে এভাবে মেজাজ হারায় না।
অনুশ্রীর অবচেতন মন তাকে কড়া উত্তর দিল। সে জানে, আলম সব দেখে ফেলেছে। আলম দেখেছে তার সেই উন্মত্তভাবে বই পড়া, দেখেছে উত্তেজনায় তার নাকের পাতা ফুলে ওঠা, আর ঘ্রাণের টানে তার বুকের সেই দ্রুত ওঠা-নামা। অনুশ্রী নিজের এই 'দুর্বলতা' আলম জেনে ফেলেছে বলেই এতটা বিচলিত হয়ে পড়েছিল। সে আসলে আলমের ওপর নয়, বরং নিজের ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয়েই ওই আক্রমণাত্মক রূপটা নিয়েছিল।

আলম আয়নায় আরও একবার অনুশ্রীকে লক্ষ্য করল। সে দেখল ম্যাডাম জানালার দিকে তাকিয়ে গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন। সে খুব ধীরস্থিরভাবে, অত্যন্ত বিনীত আর অপরাধী কণ্ঠে কথা শুরু করল।
"জি ম্যাডাম, আসলে ওই পার্কিং এ দাঁড়ানোর পর থেকেই কম্প্রেসরে একটা বিকট শব্দ হইতেছিল। আমি ভাবলাম ইঞ্জিনের কোনো ক্ষতি না হয়, তাই অফ করে রাখছিলাম। আর ম্যাডাম, এসির ভল্টে বোধহয় অনেক ময়লা জমছে... ওই ভ্যাপসা পচা গন্ধটা সেই জন্য হইতেছে। ফিল্টারটা সাফা না করা পর্যন্ত এসি অফ করলেই আবার গন্ধটা ফিরে আসবে।"

অনুশ্রী চরম বিরক্তি আর ঘেন্নায় মুখ কুঁচকে ফেলল। আলমের সেই 'নোংরা গন্ধের' যুক্তিটা তাকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিল। সে রুক্ষ স্বরে বলল—
"উফ! এক গাদা টাকা খরচ করা হয় সার্ভিসিংয়ে, আর তোমরা গাড়িটার এই অবস্থা করে রাখো? কালই গ্যারেজে নিয়ে ফিল্টার পরিষ্কার করাবে।"
আলম আর কোনো উত্তর দিল না। 

গাড়িটা চলছে। এসির ঠান্ডা হাওয়া গাড়ির ভেতরটা ভরিয়ে দিলেও আলমের শরীর থেকে এখনো সেই আদিম উত্তেজনা পুরোপুরি যায়নি। তার সেই নোংরা হাতটা—যা কিছুক্ষণ আগেই নিজের উত্তপ্ত লিঙ্গ আঁকড়ে ধরেছিল—এখনো চটচটে আর আঠালো হয়ে আছে। ড্যাশবোর্ডের হালকা আলোয় স্টিয়ারিংয়ের ওপর আলমের হাতটা অদ্ভুতভাবে চকচক করছে। সেই নিষিদ্ধ রস হাতের তালু আর আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে স্টিয়ারিংয়ের চামড়ায় লেপ্টে যাচ্ছে।

এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে আলম অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে পকেট থেকে নিজের সস্তা স্মার্টফোনটা বের করল। অনুশ্রী জানালার বাইরে তাকিয়ে অন্যমনস্ক, তাই পেছনের সিট থেকে ড্রাইভারে হাতের এই সূক্ষ্ম নড়াচড়া ধরা পড়ার কথা নয়।
আলম দ্রুত একটা আনসেভড নম্বরে মেসেজ টাইপ করল। তার আঙুলের সেই চটচটে রস ফোনের স্ক্রিনেও একটা ঘোলাটে দাগ রেখে গেল।


"Plan abort! ম্যাডাম রিজেন্সি গ্রাউন্ডে যাচ্ছে না ফাউন্ডার্স কাপ-এর ম্যাচ দেখতে... আমরা সোজা ঘরে ফিরছি।"


যখন শহরের রাজকীয় রাস্তায় মার্সিডিজের চাকা ধুলো উড়িয়ে সিংহা রায় প্যালেসের দিকে ছুটছে, ঠিক তখনই কয়েক মাইল দূরে অনিকেত চ্যাটার্জি দাঁড়িয়ে আছে একটা জরাজীর্ণ দোতলা ঘরের জানলার পাশে। ট্রেনের সেই সাধারণ ভিড় ঠেলে রক্তনগরীতে পা রাখার আগে বাবা সাহেবের দেওয়া সেই চিরকুটটা সে ছিঁড়ে কুচিকুচি করে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছিল। ঠিকানাটা এখন তার মগজে খোদাই করে নিয়েছিল — ‘কাদের আলির মেসবাড়ি, কালোঘাট লেন, রক্ত নগর’।

এই বস্তিতে যে হাতেগোনা ১০-১২টা পুরনো আমলের দোতলা ঘর আছে, তাদের মধ্যেই একটা হলো এই কাদের আলির বাড়ি। ঘরটার নোনা ধরা দেওয়াল থেকে প্লাস্টার চটা উঠে ইঁটগুলো কঙ্কালের মতো বেরিয়ে আছে। দোতলায় একটাই বড় ঘর, যেখানে দুটো লোহার বেড আর একটা ভাঙাচোরা কাঠের টেবিল ছাড়া আর কিছুই নেই।

অনিকেত জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখল রক্তনগরীর সেই বিখ্যাত দুই স্তম্ভ— SRC টাওয়ার আর SGGS টাওয়ার। দুপুরের কড়া রোদে নীলচে কাঁচের সেই স্তম্ভ দুটোকে দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন দুটো বিশালাকার হীরে। শহরবাসী বলে ওরাই নাকি এই শহরের ভাগ্য আর আভিজাত্যের শেষ কথা। কিন্তু অনিকেতের নাকে তখন ঝাপটা মারছে এক তীব্র পচা গন্ধ।

রক্তনগরীর রাজকীয় সীমানা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে এই শহরের ‘অন্ত্র’—এক বিশাল খোলা ক্যানাল। এই শহরের ওপরের রাস্তাগুলো যতটা ঝকঝকে, তার মাটির নিচে ঠিক ততটাই ভয়ংকর বিশাল বিশাল সুয়ারেজ টানেল (Sewerage Tunnels) কয়েক মাইল লম্বা কংক্রিটের পাইপলাইন বিছানো আছে। শহরের প্রতিটি লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট, দামী দামী অফিস আর রাজকীয় প্রাসাদের যত নোংরা বর্জ্য—সবই এক অদৃশ্য ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ওই গভীর টানেল দিয়ে বয়ে চলে। কিন্তু শহরের থেকে দূরে শহরের পেছনেই ঢাকা টানেলগুলো হঠাৎ হা করে মুখ খোলে। ঠিক সেই বিন্দু থেকেই শুরু হয় এক বিশাল ওপেন ক্যানাল (Open Canal)।
এই ক্যানালের দু-পাশ ঘিরেই গড়ে উঠেছে— কালোঘাট বস্তি।


ঘরের একদিকের দেওয়ালটা এখন কোনো সাধারণ মেসবাড়ির দেওয়াল নয়, ওটা যেন একটা জীবন্ত অপরাধের মানচিত্র। অর্কদেব ঘরটাকে একদম পুলিশ ইনভেস্টিগেশন বোর্ডের মতো সাজিয়ে ফেলেছে। মাঝখানে বড় বড় হরফে লেখা— Singha Ray Conglomerate (SRC) এবং Sen Genix Global Solution (SGGS)।



বোর্ডের ওপর পিন দিয়ে আটকানো আছে প্রতিটি চরিত্রের ছবি। ব্রিজেশ সিংহ রায়—যার চোখের চাউনিতে ক্ষমতার দম্ভ; দেবারতি—যার আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য; নীরব—সিংহাসনের উত্তরাধিকারী; আর অনুশ্রী (সেন)—যার সৌন্দর্যের পেছনে অর্কদেব লাল কালি দিয়ে একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে রেখেছে। অন্যপাশে সেন পরিবারের ডিটেইলস— মেঘাদিত্য, তনুশ্রী আর দীক্ষিত।

অর্কদেব একটা মার্কার পেন হাতে নিয়ে দেয়ালে শেষ ছোঁয়াটা দিয়ে বলল, "দাদা, এই বোর্ডে কি আরও কিছু অ্যাড করা বাকি আছে?"
অনিকেত জানলা থেকে চোখ সরিয়ে ঘরের ভেতরটা একবার মেপে নিল। ডার্ক শেডের আলোয় অর্কদেবের সাজানো বোর্ডটাকে কোনো ব্রহ্মাস্ত্রের মতো লাগছে। অনিকেত ধীরপায়ে বোর্ডের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
"সাবাস অর্ক! তুই তো পুরো নাড়িনক্ষত্র বের করে ফেলেছিস।" অনিকেত আঙুল দিয়ে বোর্ডের নিচের দিকের কয়েকটা বক্সে টোকা দিল। সেখানে লেখা— ‘আলোয়ন ফাউন্ডেশন’ (NGO), যার মালকিন তনুশ্রী সেন। ঠিক তার পাশেই— ‘D’ORO COUTURE & VELVET BREW’, দেবারতি সিংহ রায়ের সেই লাক্সারি ফ্যাশন হাউস আর ক্যাফে।

"সাবাস অর্ক! তুই তো পুরো নাড়িনক্ষত্র বের করে ফেলেছিস।" অনিকেত আঙুল দিয়ে বোর্ডের নিচের দিকের কয়েকটা বক্সে টোকা দিল। সেখানে লেখা— ‘আলোয়ন ফাউন্ডেশন’ (NGO), যার মালকিন তনুশ্রী সেন। ঠিক তার পাশেই— ‘D’ORO COUTURE & VELVET BREW’, দেবারতি সিংহ রায়ের সেই লাক্সারি ফ্যাশন হাউস আর ক্যাফে।
অনিকেতের গলাটা একটু গম্ভীর হয়ে এল, "কিন্তু অর্ক, আমাদের কাছে এখনও কোনো সলিড প্রমাণ নেই যে তনুশ্রীর এই সোশ্যাল ওয়ার্ক আর দেবারতির এই কফি-স্পা জগতটা ঠিক কীভাবে সিংহ রায় বা সেনদের ডার্ক মানি-র সাথে যুক্ত। আর সবথেকে বড় রহস্য হলো ওই— PRISM BIOSCIENCE LABS। মেঘাদিত্য সেন কেন একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ল্যাব চালাচ্ছে, সেটার উত্তর আমাদের খুঁজতেই হবে।"

অনিকেত পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ গভীর হলো। কোনো একটা জরুরি মেসেজ বা ডেটা পড়ার পর সে বিড়বিড় করে বলল, "শিট!"
সে মোবাইলের স্ক্রিনটা অফ করে অর্কদেবের দিকে তাকিয়ে বলল, "আচ্ছা অর্ক, আমি একবার বেরোচ্ছি। এই অভিজাতদের শহরটা একটু ভেতর থেকে ঘুরে দেখা দরকার। দেখি, আভিজাত্যের আড়ালে আর কী কী পচন লুকিয়ে আছে।"
অর্কদেব মাথা নাড়িয়ে সায় দিল, "আচ্ছা দাদা, সাবধানে যা। আমি এখানে বাকি ডিটেইলসগুলো একবার মিলিয়ে নিচ্ছি।"

অনিকেত ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর অর্কদেব আবার ল্যাপটপ আর ফোনের স্ক্রিনে ডুবে গেল। সে বারবার একটা প্রোফাইল চেক করছে— ব্রিজেশ সিংহ রায়। সিংহা রায় সাম্রাজ্যের অধিপতি, যার হাতের ইশারায় পুরো রক্তনগরী চলে।
অর্কদেব অবাক হয়ে দেখল, ব্রিজেশ সিংহ রায় তার নিজের ফ্যামিলি বিজনেস বা কোম্পানির বড় বড় হর্তাকর্তা—কাউকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ফলো করেন না। এমনকি তার নিজের ছেলে নীরবকেও না। তার ফলোয়িং লিস্টে নাম আছে মাত্র একজনের— অনুশ্রী সিংহ রায়।

অর্কদেব ভ্রু কুঁচকে একা ঘরে বিড়বিড় করে উঠল, "বুড়ো হাড়ের ভেতর এখনও এত খিদে? নিজের সাম্রাজ্য বা নিজের রক্ত—কাউকেই চোখে পড়ে না, শুধু নজরে থাকে ঘরের লক্ষ্মী? এই 'ফলো' করাটা কি শুধু আদর, নাকি....?"

সে অনুশ্রীর ছবির সেই লাল প্রশ্নবোধক চিহ্নটার দিকে তাকাল। কালোঘাট বস্তির ভ্যাপসা গন্ধটা যেন ঘরের ভেতর আরও অসহ্য হয়ে উঠল।
[+] 5 users Like Vritra Shahryar's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: ??? ???? ???????? ?? ?? ??? - by Saj890 - 01-04-2026, 08:22 AM
RE: নিষিদ্ধ নগরের পাণ্ডুলিপি - by Vritra Shahryar - 03-04-2026, 10:15 AM



Users browsing this thread: Kimo1, 7 Guest(s)