Thread Rating:
  • 5 Vote(s) - 3.2 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Adultery ২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল...
#7
Star 
পর্ব ২
চুরির ঘটনার পর পাড়ার বাতাস কখনও আগের মতো স্বাভাবিক হলো না। বাইরে তাকালে মনে হয় সব আগের মতো—চা দোকানে ভিড়, মুদি দোকানের কাঁচের জানালায় ঝলক, বিকেলের ছাদে কাপড় শুকানো। কিন্তু মানুষের চোখে এক ধরণের হিসাব ঢুকে গেছে। কেউ কারও বাড়িতে ঢোকার সময় একটু খেয়াল করে, কেউ হাসে, কিন্তু মনে মনে ভাবে—এটা কি সত্যি হাসি, নাকি শুধু ভান। এই অদৃশ্য হিসাবের মধ্যে নীলা সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে। ছোটবেলায় সে ছিল কথা বলার মানুষ, হাসির মানুষ, কখনও কাঁদতেও দ্বিধা হতো না। মা মারা যাওয়ার পর তার হাসি ধীরে ধীরে কমে গেছে। কাঁদতে গিয়ে মনে হয়, চোখের জল পড়ে না—অভ্যাস হয়ে গেছে।

নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েছে, অথচ সে জানে আকাশ তার কথাগুলো শুনবে না। ভোরের আলো আসার আগে আকাশ সবসময় ধূসর, আকাশের দিকে তাকালেই মনে হয়, কোন জায়গায় সময় থেমে গেছে। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ, যেন সব কিছু ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু কেউ তা দেখছে না। রাফি তিনদিন ধরে দেখা হয়নি। ইন্টারভিউর কথা মনে আছে, ফোন আসেনি। সে নিজেই ফোন করতে সাহস পায় না, কারণ স্পষ্ট “না” শুনতে ভয় পায়। ভয় একটা অদৃশ্য ছায়া, যা তাকে ছাদে দাঁড় করায়, বারান্দায় দাঁড় করায়, নিজেকে একাকী অনুভব করতে বাধ্য করে।

তার বাবা, সাদেক সাহেব, এখনও প্রতিদিন সকালে পত্রিকা পড়েন। ব্যাংকে কাজ করতেন এক সময়, হিসাবরক্ষক ছিলেন। এখন অবসরপ্রাপ্ত। প্রতিদিন পত্রিকা পড়ে চাকরির বিজ্ঞাপন ঘিরে রাখেন, কিন্তু ছেলেকে বলেন না—“এইটায় আবেদন কর।” ভেতরে ভাঙা একটি গ্লাসের মতো। ছেলের স্বপ্নকে জোরে চাপ দিতে চান না, কিন্তু ভিতরে ভেঙে যাচ্ছে। পাড়ায় চুরি হয়েছে—তাও শুধু আলমারির নয়। বিশ্বাসও চুরি হয়েছে।


চা দোকানেই রহিম চাচা বসে আছেন। আজকাল বাপ্পি কম কথা বলে। চোখে অপরাধবোধ, কিন্তু এখনও তার হাতে আছে ছোট্ট সোনার চেইন। মা অসুস্থ। বাপ্পি জানে—ধরা পড়লে সমস্যা। কিন্তু এখন সময় আছে। রহিম চাচা বুঝতে পারছেন। মানুষের ভাঙা শব্দ সবসময় শব্দের মধ্যে থাকে না। অনেক সময় মানুষ ভাঙে নীরবভাবে, নিজের ভেতরে।

এদিকে ছোট কাকা গ্রাম থেকে এসেছে। হঠাৎ আগমন পাড়ার মধ্যে হাহাকার তৈরি করছে। সে বলল, “একটা ভালো সম্বন্ধ আছে। ছেলেটা ব্যাংকে চাকরি করছে। এখনই কথা বললে ভালো।” কাদের সাহেব চুপ করে শুনলেন। মাথায় হিসাব চলছে। ব্যাংকের চাকরি মানে স্থায়িত্ব, স্থায়িত্ব মানে নিরাপত্তা। ভেতরের শান্তি নেই, কিন্তু অস্থিরতাও শুয়ে নেই। নীলা ঘরে চুপচাপ। বুকের ভেতর ব্যথা। জানে, তার জীবনের উপর কথা হচ্ছে, কিন্তু তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে না।
নীলা ডায়েরি খুলল। লিখতে পারল না। শুধু কলম ধরে রাখল। শব্দগুলো লিখে ফেলার আগেই হারিয়ে যাচ্ছে। বাইরে বাতাস বইছে, ভেতরের চুপচাপ শব্দ ভেঙে পড়ছে না। বুকের অদ্ভুত অস্থিরতা। মনে হচ্ছে, যা হারানো হয়েছে তা শুধুই জিনিস নয়, বিশ্বাস, নিরাপত্তা, স্বপ্ন—সব মিলিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করেছে।

রাত হলে নীলা সাদা সালোয়ার পরে আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের মুখ দেখল,  কোথাও যেন একটা ফাটল আছে। ছাদে এলো সাইফ। ভদ্র, শান্ত। খুব মেপে কথা বলে। “আপনি কী পড়েন?” সে জিজ্ঞেস করল।
নীলা - “বাংলা।”
“ভালো। সাহিত্য মানুষকে গভীর করে।” নীলার মনে হলো—সে কি সত্যিই বোঝে?
কিছুক্ষণ পরে সবাই একা বসে আছে। সাইফ বলল, “আমি খুব সাধারণ জীবন চাই। ঝামেলা পছন্দ করি না।”
নীলা জিজ্ঞেস করল, “ঝামেলা মানে?”
সে হেসে বলল, “অপ্রয়োজনীয় আবেগ।” বাতাসে ঝুলে থাকা বাক্য।

নীলার মনে হলো, তার আবেগ কি অপ্রয়োজনীয়? সে কিছু বলল না।
রাফি খবরটা শুনে ছাদে উঠল। নীলা এলো না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে নিচে নেমে গেল। রাতে বাবার ঘরে ঢুকল। বাবা পত্রিকা পড়ছিলেন। “বাবা,” সে বলল, “চাকরি পেলে কি সব ঠিক হয়ে যায়?” বাবা চশমা খুলে তাকালেন। “সব না। কিন্তু অনেক কিছু সহজ হয়।”
এই উত্তর অর্ধেক। অর্ধেকের ভেতর দুশ্চিন্তা। 
কাদের সাহেব রাতের অন্ধকারে একা। ভাঙা আলমারির দিকে তাকিয়ে। জানেন—পাড়ায় চুরি হয়েছে, মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা আছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা মেয়ের জীবন শ্বাসরুদ্ধ করতে পারে।

নীলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আকাশে চাঁদ নেই। মনে হলো—সে যেন দুই দিক থেকে টানছে। একদিকে প্রেম, একদিকে নিরাপত্তা। জানে না কোনটা বেছে নিলে কম ভাঙবে। বাতাস স্থির, কিন্তু ভেতরের বাতাস বইছে। অপূর্ণ অপেক্ষা চাপা আতঙ্ক।
পাড়ার অন্য প্রান্তে হাসেম কাকু বসে। পাড়ার ঘটনাগুলো একদম খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। তার চোখে গোপন খবর পড়ে, কিন্তু মুখে কিছু আসে না। জানে—ভয়ের শুরু, আগের মতো নয়, মানুষের ভেতরে।
রাত্রি গভীর। দোকান বন্ধ। পাড়ার অন্ধকার। তবে বাতাসে শব্দ। কখনও চুপচাপ, কখনও হালকা কন্ঠ। রাস্তায় কারও পদচাপ, কোথাও একটি দরজার চিল। এই শব্দগুলোর ভেতর মানুষ নিজের ভেতরের গল্পে ডুবে।
রাফি একা বসে ছাদে। মনে মনে ভাবছে—চাকরি, নীলা, বিশ্বাস, নিরাপত্তা। তার ভেতরে সব মিলিয়ে একটা জটিলতা তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, একটি ভুল পদক্ষেপ পুরো জীবনকে ভেঙে দিতে পারে।
নীলা ঘরে। তার চোখে নিঃশব্দ কষ্ট। মনে হয়, জীবনের সব সম্ভাব্য আশা একটি ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর চাপ। মনে হয়, যদি কেউ জানতে চায়, সে বলতে পারবে না।

ছোট কাকার কথার আওয়াজ এখনও বাতাসে। “এটা ভালো সম্বন্ধ। স্থায়িত্ব।” কিন্তু নীলা জানে, স্থায়িত্বের সঙ্গে প্রেম কখনও একসাথে চলে না।


চা দোকানের পেছনে বাপ্পি বসে। চোখে অপরাধবোধ। পকেটে সোনার চেইন। মনে হচ্ছে, যা হচ্ছে, তার সবই অদৃশ্য।
পাড়ায় বাতি একে একে নিভে যায়। মানুষ ঘরে ফিরে যায়। কিন্তু ভিতরে বাতাস বইছে। ধীরে ধীরে। গভীরভাবে। অপূর্ণ।
এই ফাঁক আর শান্ত নয়। দুজনের ভেতরের ফাঁক, পাড়ার ফাঁক, ভবিষ্যতের ফাঁক—সব মিলেছে। কেউ এখনও বুঝতে পারছে না—এই নীরবতার ভেতরেই আসল ভাঙন তৈরি হচ্ছে।
একজন বড় মিথ্যাবাদী, একজন বড় জাদুকরও
[+] 2 users Like Dead people's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: ২টি ছাদ ও কয়েকটি বিকেল... - by Dead people - 02-04-2026, 01:07 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)