01-04-2026, 09:55 PM
(আগের অংশের পর থেকে...)
রক্তনগরীর আকাশচুম্বী অহংকার হলো ২০ তলার এই নীল কাঁচের স্তম্ভ— সিংহ রায় কনগ্লোমারেট (SRC)। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এক দুর্ভেদ্য দুর্গ, যার চারপাশের কয়েক একর এলাকা জুড়ে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। এসআরসি-র এই ব্যক্তিগত সাম্রাজ্যে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ। সেন্ট্রাল এসি-র কনকনে ঠান্ডার সাথে এখানে মিশে থাকে এক দামী ওল্ড স্পাইস আর ইতালিয়ান লেদার সোফার আভিজাত্যমাখা রাজকীয় গন্ধ।
বিল্ডিংয়ের সর্বোচ্চ তলায় ব্রিজেশ সিংহ রায়ের অফিস কক্ষ। ঘরটি বিশাল, দেওয়াল জুড়ে থাকা প্যানোরামিক গ্লাসের ওপারে পুরো রক্তনগরীকে একটা খেলনা শহরের মতো মনে হয়। অফিসের ঠিক মাঝখানে একটি বিশাল স্বচ্ছ গ্লাসের টেবিল, যার নিচে কয়েকটা দামী পার্সিয়ান কার্পেট বিছানো। টেবিলের ওপারে এক অমোঘ নির্লিপ্ততায় বসে আছেন ব্রিজেশ সিংহ রায়। পরনে নিখুঁত ইতালিয়ান ডার্ক গ্রে স্যুট, কব্জিতে আভিজাত্যের স্মারক হয়ে জ্বলজ্বল করছে কয়েক কোটি টাকার ঘড়ি। তাঁর ট্রিম করা ধূসর-সাদা চাপ দাড়ি আর পাথরের মতো ঠান্ডা চোখ দুটোতে এক আদিম স্থিরতা—ঠিক যেন এক শিকারী বাঘ তার পরবর্তী শিকারের অপেক্ষায়।
টেবিলের পেছনের দেওয়ালে খোদাই করা এসআরসি-র লেগ্যাসি—বড় বড় সোনালী অক্ষরে লেখা 'SRC'। তার ঠিক পাশেই তাঁর বাবা, এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা অবিনাশ সিংহ রায়ের এক বিশাল পোর্টেট। সেই ছবিতে অবিনাশ বাবুর চোখ যেন এখনও তাঁর উত্তরসূরির প্রতিটি পদক্ষেপ খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছে।
ব্রিজেশের ঠিক উল্টো দিকে বসে আছেন গ্রামীণ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী রুদ্রনীল গাঙ্গুলী। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট আর ধুতি। মাথায় পাতলা চুল আর একটু থলথলে ভুঁড়ি নিয়ে তাঁকে দেখে কোনো ধুরন্ধর পলিটিশিয়ান মনে হয় না—মনে হয় এক নিরীহ বৃদ্ধ। কিন্তু তাঁর চোখের কোণে লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির ইতিহাস।
ব্রিজেশ টেবিলের ওপর রাখা সেই কনফিডেনশিয়াল ফাইলের দিকে একবার তাকালেন। অহিরাজপুর মডেল ট্রাইবাল করিডোর—৫,০০০ কোটির এই প্রজেক্টের নীল নকশা এখন তাঁর হাতের নিচে।
? GOVERNMENT OF WEST BENGAL: AHIRAJPUR MODEL TRIBAL CORRIDOR
?️ GOVERNMENT OF WEST BENGAL
DEPARTMENT OF RURAL DEVELOPMENT & AGRICULTURE
NABANNA, HOWRAH
MEMO NO: WRD/2026/AP-PROJ/442
DATE: FEBRUARY..
OFFICIAL PROJECT ANNOUNCEMENT: AHIRAJPUR MODEL TRIBAL CORRIDOR
1. PROJECT OVERVIEW:
The State Government, in collaboration with Central Authorities, hereby announces the "Ahirajpur Rural Transformation Project." With a sanctioned budget of ₹5,000 Crores, this project aims to develop the border region between West Bengal and Odisha into a premier agricultural and logistics zone.
2. WHY AHIRAJPUR?
Ahirajpur has been selected due to its unique geographical and climatic advantages:
• Soil Fertility: The virgin soil of the Ahirajpur plains is highly suitable for high-yield medicinal plants and organic farming.
• Climatic Conditions: The stable subtropical climate provides a 365-day growing season, ideal for a "Green Revolution" in the tribal belt.
• Water Resources: Proximity to natural river basins ensures year-round irrigation for large-scale cultivation.
3. SCOPE OF DEVELOPMENT:
• Infrastructure: Construction of a 4-lane "Connectivity Expressway" linking the Odisha mines to the West Bengal border.
• Agriculture: Establishment of state-of-the-art cold storage and herbal processing units.
• Healthcare: Setting up of Rural Health Centers to be supported by empanelled NGOs.
4. EXECUTION PARTNER:
Following a high-level review, SRC NEOPOLIS INFRA (Singha Ray Corporation) has been appointed as the lead infrastructure partner for Phase-1.
BY ORDER:
Secretary, Department of Rural Development
Government of West Bengal
ফাইলটা পড়তে পড়তে ব্রিজেশের ঠোঁটের কোণে এক শীতল হাসি ফুটে উঠল। তিনি জানেন, এই টেন্ডারে 'SRC NEOPOLIS INFRA'-এর নামটা আসা কোনো ভাগ্য নয়, বরং এটা একটা সুপরিকল্পিত মাস্টারস্টোক।
রুদ্রনীল গাঙ্গুলী একটু ঘামছিলেন। এসি-র ঠান্ডাতেও তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। তিনি জানেন, ব্রিজেশ সিংহ রায় শুধু একজন ব্যবসায়ী নন, তিনি এক জীবন্ত 'ডেটা ব্যাংক'। ব্রিজেশের পার্সোনাল ভল্টে শুধু টাকার বান্ডিল নেই, আছে রক্তনগরীর প্রতিটি প্রভাবশালী নেতার অন্ধকার ইতিহাসের ফাইল। কার কতগুলো বেনামী সম্পত্তি, কে কার খুনের সাথে জড়িত, কার কোন নিষিদ্ধ রক্ষিতা আছে—সব ব্রিজেশের নখদর্পণে। এমনকি রুদ্রনীল বাবুর নিজেরও কয়েকটা হাড়হিম করা 'ডার্ক সিক্রেট' ওই ফাইলে বন্দি।
ব্রিজেশ ফাইলটা আলতো করে বন্ধ করে অত্যন্ত শান্ত অথচ ভারী গলায় বললেন—
"রুদ্রনীল বাবু, অহিরাজপুরের এই মাটি নাকি খুব উর্বর? ঔষধি গাছ আর গ্রিন রেভোলিউশনের নামে যে ৫,০০০ কোটির স্বপ্ন আপনি সাধারণ মানুষকে দেখাচ্ছেন, তার পেছনের আসল সত্যটা কি সবাই জানে?"
রুদ্রনীল বাবু একটু কাঁচুমাচু হয়ে হাসলেন। নিজের ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির হাতাটা ঠিক করতে করতে নিচু স্বরে বললেন, "আরে ব্রিজেশ বাবু, ফাইল তো বলছে ওটা চাষের জমি। কিন্তু আমরা তো জানি ওই মাটির তলায় কী আছে। আপনার করিডোর নির্মাণ শুরু হলেই তো খনির আসল কাজ শুরু হবে। কয়লা আর বক্সাইটের খনি থেকে যে পরিমাণ সোনা ফলবে, তার কাছে এই ৫,০০০ কোটির বাজেট তো নস্যি!"
ব্রিজেশ তাঁর রাজকীয় চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বাবার পোর্টেটের দিকে তাকালেন। তিনি জানেন, এই মন্ত্রীরা কেন তাঁর ইশারায় ওঠবোস করে। তিনি তাঁদের শুধু টাকা দিয়ে কেনেন না, বরং তাঁদের পাপের দলিল দিয়ে তাঁদের গলায় এক অদৃশ্য ফাঁস ঝুলিয়ে রাখেন। ব্রিজেশ মনে মনে ভাবলেন— "পলিটিশিয়ানদের ব্ল্যাকমেইল করার চেয়ে বড় কোনো বিজনেস পৃথিবীতে নেই।"
ব্রিজেশ সিংহ রায়ের ড্রয়ার থেকে বেরিয়ে এল তাঁর ব্যক্তিগত ‘Montblanc Meisterstück’ ফাউন্টেন পেনটি। সোনার নিব আর কালো বডির এই কলমটি দিয়েই তিনি রক্তনগরীর বড় বড় ডিল ফাইনাল করেন। তিনি ফাইলটা আবার খুললেন। রুদ্রনীল গাঙ্গুলী তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন কোনো এক যজ্ঞের শেষ আহুতির অপেক্ষা করছেন।
ব্রিজেশ শান্তভাবে কলমটা খুলে ফাইলের শেষ পাতার 'Lead Partner Signature' কলামের ওপর একবার চোখ বোলালেন। সেখানে কিছু বিশেষ শর্ত (Terms & Conditions) ছোট অক্ষরে টাইপ করা আছে, যা ব্রিজেশ নিজে ড্রাফট করিয়েছিলেন।
? এক্সক্লুসিভ টার্মস (Exclusive Terms):
• অপারেশনাল টাইমলাইন: প্রজেক্টের গ্রাউন্ডব্রেকিং সেরিমনি এবং হেভি মেশিনারি ডেপ্লয়মেন্ট আগামী ৬০ দিন (২ মাস) পর শুরু হবে। (যাতে এই সময়ের মধ্যে খনি খননের প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক ও ড্রিলিং রগ গোপনে অহিরাজপুর সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া যায়)।
• সিকিউরিটি অটোনমি: এই করিডোর এলাকার সম্পূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ‘SRC প্যাট্রিয়ট গার্ডস’ (ব্রিজেশের নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। সরকারি পুলিশ বা সিআরপিএফ-এর প্রবেশ এখানে সংরক্ষিত থাকবে।
• আন্ডারগ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স: করিডোর নির্মাণের সময় মাটির নিচে কোনো খনিজ বা প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু পাওয়া গেলে, তার সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকবে ‘SRC NEOPOLIS INFRA’-এর ওপর।
ব্রিজেশ একটু হাসলেন। তারপর খুব সাবলীল ভঙ্গিতে ফাইলের ওপর নিজের সইটা করলেন— "Brijesh Singha Ray"। সইয়ের প্রতিটি টান যেন এক একটা ক্ষমতার রেখা।
কলমের মুখটা বন্ধ করে তিনি রুদ্রনীল গাঙ্গুলীর দিকে ফাইলটা এগিয়ে দিলেন।
"রুদ্রনীল বাবু, সই তো করে দিলাম। কিন্তু মনে রাখবেন, আজ থেকে ঠিক ৬০ দিন পর যখন আমার বুলডোজারগুলো অহিরাজপুরের মাটিতে প্রথম আঘাত করবে, তখন যেন কোনো লোকাল পলিটিশিয়ান বা পরিবেশবাদী সেখানে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস না পায়। আমি প্রজেক্টের দেরি হওয়া পছন্দ করি না।"
রুদ্রনীল গাঙ্গুলী কাঁপাকাঁপা হাতে ফাইলটা নিজের ব্যাগে ভরলেন। তাঁর মনে হলো, তিনি শুধু ৫,০০০ কোটির প্রজেক্টে সই করলেন না, বরং রক্তনগরীর একটা বিশাল এলাকার চাবিকাঠি ব্রিজেশের হাতে তুলে দিলেন।
ব্রিজেশ নিজের চেয়ার থেকে উঠে জানালার কাঁচের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনে প্রসারিত শহরটা এখন তাঁর পায়ের নিচে। তিনি খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করলেন—
"৬০ দিন... ঠিক দুই মাস। তারপর অহিরাজপুর আর শুধু চাষের জমি থাকবে না, ওটা হবে সিংহ রায় সাম্রাজ্যের সোনার খনি।"
কুহকপুর—বীরভূম আর মেদিনীপুর সীমান্তের এক পরিত্যক্ত কয়লা খনির ঠিক ওপরেই এই ছোট্ট গ্রাম। বাইরে থেকে দেখলে গ্রামটা শান্ত, চারিদিকে সবুজ শালের জঙ্গল আর আদিম নিস্তব্ধতা। এখানকার মাটি অস্বাভাবিক রকমের কালো। লোকাল হসপিটাল বলতে একটা ভাঙাচোরা হেলথ সেন্টার, যার কাঁচগুলো এখন ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের ইঁটের আঘাতে চুরমার। দেওয়াল জুড়ে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ আর ওষুধ-পত্র সব তছনছ করা।
গত একটা মাস এই কুহকপুরের ইতিহাসে এক বীভৎস অধ্যায় হয়ে থাকবে। মাত্র তিরিশ দিনে চারজন তরতাজা তরুণীর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এক অজানা যম। মৃত্যুর প্যাটার্নটা ছিল হুবহু এক—অত্যন্ত নিখুঁত এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর।
শুরুটা হতো খুব সাধারণভাবে। মেয়েগুলো হঠাৎ করেই ঝিমিয়ে পড়ত। প্রথমে একটা তীব্র 'ব্রেইন ফগ'—তারা সহজ কথা ভুলে যেত, পরিচিত মুখ চিনতে সময় নিত। তারপর শুরু হতো আসল তান্ডব। অসহ্য পেট যন্ত্রণা, যেন কেউ পেটের ভেতরে হাজারটা গরম লোহার শিক চালিয়ে দিচ্ছে। লোকাল হেলথ সেন্টারে যখন তাদের নিয়ে আসা হতো, তারা তখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আমানুষিক চিৎকার করত। তারপর এক সময় সেই চিৎকার থেমে যেত এক ভয়ানক রক্তবমির সাথে।
কিন্তু তারপরই ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। ঠিক এক সপ্তাহ আগে, যখন সবাই আরও একটা মৃত্যুর প্রহর গুনছিল, তখন হঠাৎ করেই থেমে গেল এই মারণ-খেলা। গত সাত দিনে আর কোনো তরুণী অসুস্থ হয়নি, কারো পেট যন্ত্রণায় কোনো আর্তনাদ শোনা যায়নি।
গ্রামের বুড়োরা এখন গাছের তলায় বসে ফিসফিস করে কথা বলে। তারা বিশ্বাস করে, এ সব সেই 'রহস্যময় মানুষের' কৃপা। যখন গ্রামটা শ্মশান হতে বসেছিল, তখন নাকি এক ছায়ার মতো দীর্ঘদেহী মানুষের দেখা মিলেছিল খনির কাছাকাছি। তারপর থেকেই সব শান্ত। সেই লোকটা কে, কোথা থেকে এসেছিল—কেউ জানে না। কেউ বলে সে কোনো সাধু, কেউ বলে সে স্বয়ং যমদূত যে নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে ফিরে গেছে।
রক্তনগরীর ব্যস্ততার মাঝেও এই সাদা দোতলা বিল্ডিংটা এক অদ্ভুত প্রশান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গেটের ওপর বড় বড় রুপোলি অক্ষরে লেখা:
"আলোয়ন ফাউন্ডেশন" > —অন্ধকারে আলোর ছোঁয়া, সেবায় পরম মমতা।
ভেতরে সেন্ট্রাল এসি-র হালকা শব্দ আর দামী লিলি ফুলের সুগন্ধ। করিডোর পেরিয়ে একদম শেষ মাথায় তনুশ্রী সেনের ব্যক্তিগত চেম্বার। ঘরের দরজাটা অল্প ফাঁক করা, যেখান দিয়ে বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে দামী সেগুন কাঠের টেবিলের ওপর।
ভেতরে তনুশ্রী আজ একা। পরনে একখানা ধবধবে সাদা ঢাকাই জামদানি, যার ওপর সুক্ষ্ম সাদা সুতোর কাজ করা। তনুশ্রীর রূপ যেন আজ সেই সাদার শুভ্রতায় আরও বেশি রুপময় হয়ে উঠেছে। তাঁর লম্বা কালো চুলগুলো পিঠের ওপর আলগা করে ছড়ানো, যা তাঁর ফর্সা ঘাড়ের ভাঁজগুলোকে মাঝেমধ্যেই ঢেকে দিচ্ছে।
তনুশ্রী টেবিলের ওপর কিছুটা ঝুঁকে পড়ে একটা স্থানীয় ছোট সংবাদপত্র পড়ছিলেন। তিনি যখনই ঝোঁকেন, তাঁর বডি-হাগিং ব্লাউজের আঁটসাঁট বাঁধন ছাপিয়ে তাঁর উদ্ধত স্তনযুগলের ওপর সাদা শাড়ির পাতলা আবরণটা টানটান হয়ে যায়। শাড়ির সেই স্বচ্ছ ভাঁজের আড়াল থেকে তনুশ্রীর গভীর নাভি আর পেটের সেই ফরসা মসৃণ অংশটা উঁকি দিচ্ছে। পেটের ওপর জমে থাকা যৎসামান্য মেদ বা 'লাভ হ্যান্ডেল' তাঁর আভিজাত্যকে যেন এক আদিম নারীত্বের ছোঁয়া দিয়েছে। চেয়ারে বসার ভঙ্গিতে তাঁর শাড়িটা নিতম্বের সাথে এমনভাবে লেপ্টে আছে যে তাঁর শরীরের প্রতিটি কার্ভ এক অসহ্য সুন্দর স্থাপত্যের মতো ফুটে উঠেছে।
তিনি একা বলেই হয়তো আজ আঁচলটা একটু অবিন্যস্ত। টেবিলের ওপর রাখা সেই নিউজ পেপারের একটা ছোট কোণায় তাঁর নজর আটকে গেল। কোনো বড় হেডিং নয়, জাস্ট একটা খবরের বিজ্ঞাপনের মতো অংশ:
"কুহকপুর: থামল মৃত্যুর মিছিল, কিন্তু রহস্য কী?" বিগত এক মাসে চারজন তরুণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে উত্তাল কুহকপুর। পেটে অসহ্য যন্ত্রণা আর রক্তবমি—সবটাই যেন এক অদ্ভুত প্যাটার্ন। গ্রামবাসীরা হসপিটাল ভাঙচুর করলেও বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত।
তনুশ্রী এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেলেন। তাঁর দুধে-আলতা কপালে হালকা ভাঁজ পড়ল। কুহকপুর গ্রামটা তাঁর চেনা—ওখানেই তো মেঘাদিত্যের Prism Labs-এর কিছু স্যাম্পল ডিস্ট্রিবিউশন হওয়ার কথা ছিল। ৪ জন মেয়ের মৃত্যু, একই প্যাটার্ন, রক্তবমি... লক্ষণগুলো তাঁর মেডিকেল মগজকে সজাগ করে তুলল।
তিনি নিজের ফরসা আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কোণটা একটু চুলকালেন। তাঁর মনে হলো, এই 'শান্ত' হয়ে যাওয়াটা আসলে কোনো স্বস্তি নয়, বরং ঝড়ের আগের স্তব্ধতা।
তনুশ্রী চেয়ার থেকে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে গেলেন। জানালার কাঁচে নিজের প্রতিফলন দেখে তিনি শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে নিলেন। তাঁর চোখে এখন ইনোসেন্সের আড়ালে এক তীব্র কৌতূহল।
"কুহকপুর... আমাকে ওখানে যেতেই হবে। আলোয়ন ফাউন্ডেশনের হয়ে নয়, বরং মেঘাদিত্যের স্ত্রী হয়ে। আমাকে জানতে হবে ওই শান্ত মাটির নিচে কোন বিষ লুকিয়ে আছে।"
তিনি টেবিলের বেলটা টিপলেন। তাঁর ম্যানেজার ঢোকার আগেই তিনি নিজেকে আবার সেই 'আভিজাত্যের দেবীর' মতো গুছিয়ে নিলেন।
রক্তনগরীর রাজপথ পেরিয়ে দুটো সাদা এসইউভি (SUV) ঝড়ের গতিতে ছুটে চলেছে। শহরের কোলাহল পিছনে ফেলে গাড়ি দুটো যখন মেদিনীপুর সীমান্তে পৌঁছাল, দুপাশের ল্যান্ডস্কেপ তখন বদলে গেছে। মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল, আর এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা। রাস্তার দুপাশের গাছগুলো যেন হাতছানি দিয়ে এক অজানা বিপদের বার্তা দিচ্ছে।
পিছনের সিটে পাথরের মতো শান্ত হয়ে বসে আছেন তনুশ্রী সেন। পাশে তাঁর পার্সোনাল সেক্রেটারি কাম ম্যানেজার রাজীব বোস। রাজীব কিছুটা অবাক; ম্যাডাম হঠাৎ কেন এত তাড়াহুড়ো করে এই অজপাড়াগাঁয়ে আসছেন, সেটা তার মাথায় খেলছে না। কয়েকদিন পরে এলেও তো চলত। কিন্তু তনুশ্রীর চোখের সেই তীক্ষ্ণতা দেখে প্রশ্ন করার সাহস তার হলো না।
গাড়ি এসে থামল কুহকপুর হেলথ সেন্টারের সামনে। এখানকার নতুন ডাক্তার দিব্যেন্দু কর আসলে সেন জেনিক্স (SGGS)-এরই সৃষ্টি।আলোয়ন ফাউন্ডেশনের টাকায় পড়াশোনা করে আজ সে ডাক্তার। কৃতজ্ঞতার পাশেই সে আজ দায়বদ্ধ। দিব্যেন্দুই খবরটা দিয়েছিল— "ম্যাডাম, নিউজ পেপারে যা দেখছেন তার চেয়েও ভয়ঙ্কর তথ্য আজ আমার হাতে এসেছে। আপনার একবার আসা উচিত।"
তনুশ্রী গাড়ি থেকে নেমেই সরাসরি ঢুকলেন দিব্যেন্দুর চেম্বারে। বাইরে ততক্ষণে রাজীব বোস ক্যাম্প বানানোর তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে। দিব্যেন্দু কাঁপাকাঁপা হাতে একটা ফাইল তনুশ্রীর দিকে এগিয়ে দিল।
? মেডিকেল ময়নাতদন্ত রিপোর্ট
ভিকটিম: ৪ জন তরুণী (বয়স ১৮-২২)
লক্ষণ: তীব্র ব্রেইন ফগ, স্মৃতিভ্রম, এরপর অসহ্য উদর যন্ত্রণা এবং রক্তবমি।
বিশ্লেষণ: মৃতদের রক্তে 'নিমেসুলাইড-বি' এবং 'হেপাটোটক্সিক' কেমিক্যালের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০০% বেশি পাওয়া গেছে।
উপসংহার: এই বিষক্রিয়া কোনো ভাইরাস নয়, বরং সেন জেনিক্স গ্লোবাল সলিউশন-এর সরবরাহ করা সাম্প্রতিক ব্যাচের (Batch #SG202-L) ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। লিভার এবং কিডনি এই ওষুধের ডোজ সহ্য করতে না পেরে বিকল হয়ে গেছে।
(রিপোর্টের নিচের দিকে আরও কিছু অস্বাভাবিক শারীরিক বিকৃতির নোট ছিল, যা সাধারণ ওষুধের প্রতিক্রিয়ার বাইরে। তনুশ্রী সেই অংশটা পড়ার সময় স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি অবিশ্বাস্য চোখে দিব্যেন্দুর দিকে তাকালেন, যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছেন না। তনুশ্রী খুব সন্তর্পণে রিপোর্টের সেই নির্দিষ্ট কিছু অংশ ছিঁড়ে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে ফেললেন।)
রিপোর্টটা পড়ে তনুশ্রী এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইলেন। নিজের শিক্ষিত মেডিকেল মগজ দিয়ে বুঝলেন—এটা স্রেফ ভুল নয়, এটা অপরাধ। কিন্তু তাঁর মুখে কোনো অনুশোচনা নেই। তিনি বাকি রিপোর্টটা দিব্যেন্দুর দিকে ঠেলে দিলেন।
তনুশ্রী: "এই রিপোর্টের কথা যেন কাকপক্ষীতেও না জানে। পুড়িয়ে ফেলো এটা দিব্যেন্দু। এখনই।"
দিব্যেন্দু এক দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে দেশলাই জ্বালিয়ে দিল। সেন জেনিক্স-এর পাপ আগুনের শিখায় ছাই হতে লাগল। তনুশ্রীর ব্যাগে রয়ে গেল সেই ভয়ংকর সত্যের অর্ধেক টুকরো।
বাইরে বেরোতেই এক বিশাল ভিড়। গ্রামবাসী উত্তেজিত, কিন্তু তনুশ্রী তাঁদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এক মর্ত্যের দেবীর মতো। মুখে সেই চিরাচরিত মায়াবী হাসি।
তনুশ্রী: "নমস্কার, আমরা আলোয়ন ফাউন্ডেশন থেকে এসেছি। খবরটা শুনে আমি থাকতে পারলাম না। একজন মেয়ে হয়ে অন্য মেয়েদের এই কষ্ট আমি বুঝি। আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, আমাদের স্পেশাল টিম আপনাদের টেস্ট করে একদম নতুন ওষুধ দেবে। আলোয়ন সবসময় আপনাদের পাশে আছে।"
গ্রামবাসীরা প্রথমে কিছুটা সন্দিহান থাকলেও তনুশ্রীর সেই আভিজাত্য মাখানো রূপ আর আশ্বাসে গলে গেল। এদিকে রাজীব বোস আড়ালে গিয়ে গ্রাম প্রধানের সাথে ডিল ফাইনাল করে ফেলেছে। পকেটে মোটা টাকার খাম পেতেই প্রধান দাঁত বের করে হাসল। রাজীবকে আশ্বস্ত করে সে বলল, "আপনি নিশ্চিন্তে ক্যাম্প করুন স্যার, আমি যা বলব গ্রামে সেটাই আইন।"
তনুশ্রী আড়চোখে রাজীবের দিকে একবার তাকালেন। ডিল যে হয়ে গেছে, সেটা বুঝতে তাঁর দেরি হলো না। তিনি শান্ত স্বরে বললেন, "আপনারা ক্যাম্প থেকে ওষুধ নিন, আমি ওই চারটে পরিবারের সাথে একটু দেখা করে আসি।"
মৃত মেয়েগুলোর ঘরে ঢুকে তনুশ্রী কোনো কান্নাকাটি করলেন না। বদলে প্রত্যেক পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকার চেক আর নগদ অর্থ দিয়ে বললেন, "আমাদের ফাউন্ডেশন আপনাদের এই ক্ষতি পূরণ করতে পারবে না, কিন্তু এই সাহায্যটুকু গ্রহণ করুন। আর মনে রাখবেন, কেস-পুলিশ করলে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে।"
সন্ধ্যা নামার মুখে ক্যাম্প শেষ হলো। গাড়িতে ওঠার আগে তনুশ্রী একবার পিছন ফিরে কুহকপুরের দিকে তাকালেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। সেন জেনিক্স গ্লোবাল সলিউশন-এর গায়ে যে কলঙ্কটা লাগতে পারত, তা কয়েকটা চেক আর কিছু মিথ্যে আশ্বাসে ধামাচাপা পড়ে গেল।
গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার শব্দে বনের পাখিরা ডানা ঝাপটে উঠল। তনুশ্রী মনে মনে ভাবলেন— "ইতিহাস এভাবেই জয়ীদের গল্প লেখে, বিজিতদের রক্ত তো কালকের বৃষ্টির জলেই ধুয়ে যাবে।"
রক্তনগরীর উপকণ্ঠে কয়েকশ একর জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাইভেট প্রপার্টি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এক টুকরো স্বর্গ। দিগন্তের আকাশটা এখন অস্তগামী সূর্যের লাল আভায় এক মায়াবী ক্যানভাস সাজিয়েছে। চারদিকে কৃত্রিম জঙ্গল আর মাঝখানে বয়ে চলা কৃত্রিম ছোট খাল—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা। এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ শুধু অসম্ভব নয়, নিষিদ্ধ। কারণ, এই ঘাস আর বাতাসের মালিক স্বয়ং ব্রিজেশ সিংহ রায়।
ব্রিজেশ সিংহ রায় তাঁর দামী সাদা টি-শার্ট আর পোলো ট্রাউজারে একদম ফিট। এই বয়সেও তাঁর হাতের গ্রিপ পাথরের মতো শক্ত। তিনি গলফ স্টিকটা দিয়ে বলটার দিকে নিখুঁত লক্ষ্য স্থির করে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে মেঘাদিত্য সেন। মেঘাদিত্যের চোখে আজ এক অদ্ভুত তৃপ্তি, কারণ তাঁর Sen Genix (SGGS) আজ সাফল্যের শিখরে।
ব্রিজেশ: (গলফ স্টিকটা ক্যাডিকে ধরিয়ে দিয়ে) "কংগ্রাচুলেশনস আদিত্য! দিল্লির DGHS-এর সাথে কাল রাতে আমার ডিনারের পর সব পলিটিক্যাল হার্ডলস ক্লিয়ার হয়ে গেছে। তোমার SGGS-এর কোয়ালিটি নিয়ে ওরা একটু জল ঘোলা করছিল, কিন্তু আমি আমার 'Personal Lobbying' দিয়ে ওদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছি।"
মেঘাদিত্য: (অবাক হয়ে) "বলো কী ব্রিজেশ! ওরা তো বলছিল আমাদের GMP (Good Manufacturing Practice) সার্টিফিকেটটা ব্যাকডেটেড। তুমি হ্যান্ডেল করলে কীভাবে?"
ব্রিজেশ: (একটু আভিজাত্যের হাসি হেসে) "সিম্পল। আমি ওদের বুঝিয়ে দিয়েছি যে এই ন্যাশনাল ইমার্জেন্সিতে 'Single Source Procurement' ছাড়া ওদের গতি নেই। আমি মিনিস্ট্রির সেই 'High-Level Committee'-কে আমার SRC (Singha Ray Conglomerate)-এর লজিস্টিক গ্যারান্টি দিয়েছি। বলেছি, মেঘাদিত্যের ওষুধ যদি তোমাদের গুদামে না পৌঁছায়, তবে আমার ৩,০০০ কোটির কনস্ট্রাকশন চেইন থমকে যাবে। ব্যস, ওরা আর 'Technical Compliance' চেক করার সাহস পায়নি।"
মেঘাদিত্য: (চোখে উজ্জ্বলতা নিয়ে) "তার মানে ওই ২,০০০ কোটির ডিলটা এখন অফিশিয়ালি আমাদের?"
ব্রিজেশ: "একদম। ওরা তোমায় 'Proprietary Article Certificate' (PAC) ইস্যু করে দিচ্ছে। এর মানে হলো, এখন শুধু তোমার কোম্পানিই এই সাপ্লাইটা দিতে পারবে, কোনো কম্পিটিশন নেই।"
খেলা শেষ করে দুজনে ঘাসের ওপর রাখা আরামদায়ক চেয়ারে গিয়ে বসলেন। সামনে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ লন। মেঘাদিত্য গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললেন—
মেঘাদিত্য: "তোমার লজিস্টিকসের লিস্টটা পাঠিয়ে দিও ব্রিজেশ। ওই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই আমি সব মেডিসিন বের করব। আগামী এক মাসের মধ্যেই আমাকে পুরো ২,০০০ কোটির সাপ্লাই কমপ্লিট করতে হবে।"
ব্রিজেশ: "ওকে, আমার লজিস্টিকস ম্যানেজারের সাথে একবার কথা বলে নিও। ও সব গুছিয়ে দেবে।"
ব্রিজেশ একটু থামলেন। তারপর আকাশের লাল আভার দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন— "এগুলো তো হয়ে যাবে আদিত্য। আজ কেন জানি না একটু নতুন 'হরিণ মাংস' খেতে ইচ্ছে করছে। অনেকদিন শিকার করা হয়নি।"
মেঘাদিত্য অর্থবহ এক হাসি দিয়ে বললেন— "বুঝতে পারছি ব্রিজেশ।"
(কুহকপুরের সেই চারজন অসহায় তরুণীর চিতা যে বিষাক্ত ওষুধের আগুনে জ্বলেছে, সেই একই বিভীষিকা এখন ২,০০০ কোটির এক দানবীয় রূপে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। সাধারণ মানুষ ভাবছে তারা 'জীবনদায়ী' ওষুধ পাচ্ছে, অথচ তারা আসলে নিজেদের মৃত্যু পরোয়ানা গিলে ফেলছে। মেঘাদিত্য সেন হয়তো এই সাপ্লাই চেইনের সামনে, কিন্তু তাঁর পেছনে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর স্ত্রী— তনুশ্রী সেন।
তনুশ্রী এখানে কেবল এক ঘরনী নন, তিনি এক কুশলী কারিগর। তাঁর 'আলোয়ন ফাউন্ডেশন' (Aaloyan Foundation) সমাজের চোখে এক পবিত্র সেবাশ্রম, কিন্তু পর্দার আড়ালে এটি মেঘাদিত্যের যাবতীয় পাপ ধুয়ে ফেলার এক বিশাল লন্ড্রি।
যেখানে মেঘাদিত্য অন্ধকারের বীজ বপন করেন, তনুশ্রী সেখানে তাঁর ফাউন্ডেশনের 'আলো' নিয়ে হাজির হন—যাতে সেই আলোর তীব্রতায় সাধারণ মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায় এবং তারা পেছনের গভীর অন্ধকারটা আর দেখতে না পায়। তিনি একজন দক্ষ 'পার্সোনাল পিআর'-এর মতো প্রতিটি আইনি জট আর নৈতিক প্রশ্নকে তাঁর আভিজাত্য আর মিথ্যে আশ্বাসের চাদরে ঢেকে দিচ্ছেন।
ক্ষমতার এই দাবার বোর্ডে সাধারণ মানুষের জীবন স্রেফ একটা তুচ্ছ ঘুঁটি। তনুশ্রী জানেন, সত্য জানাজানি হলে সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশবে, তাই তিনি তাঁর পবিত্রতার মুখোশটা আরও শক্ত করে এঁটে নিয়েছেন। দেশের হাজার হাজার মানুষের শরীরে যখন সেই বিষাক্ত ড্রাগের ড্রপ পড়বে, তনুশ্রী তখন হয়তো কোনো এক রেড-কার্পেটে দাঁড়িয়ে মানবতার ভাষণ দেবেন।)
এপ্রিল মাসের শেষ দিক। নেপালের আকাশটা এখন অদ্ভুত পরিষ্কার, কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল। দূরে হিমালয়ের চূড়াগুলোতে বরফ গলতে শুরু করেছে, তাই বাতাসটা একদম হাড়কাঁপানো না হলেও একটা শিরশিরে ঠান্ডা ভাব আছে। চারদিকে রডোডেনড্রন ফুলগুলো লাল হয়ে ফুটে আছে, যেন পাহাড়ের গায়ে কেউ চাপ চাপ তাজা রক্ত ছিটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে এক গভীর নিস্তব্ধতা। নেপাল যেন এক শান্ত অথচ রহস্যময় দেশ, যার প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে আছে কোনো প্রাচীন অভিশাপ—যেন বহু যুগ ধরে এই দেশ সেই অভিশপ্তকে পরম আদরে নিজের বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে।
কাঠমান্ডুর ব্যস্ত বাস স্ট্যান্ড। পর্যটকদের ভিড় আর হর্ন-এর আওয়াজ ছাপিয়ে একটা সরু গলি চলে গেছে ভেতরের দিকে। সেই ঘিঞ্জি গলির একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে এক জীর্ণ, পুরনো হোটেল— ‘অন্নপূর্ণা লজ’। হোটেলের দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কাঠের সিঁড়িগুলো দিয়ে হাঁটলে মনে হয় এই বুঝি ভেঙে পড়বে।
কাউন্টারের ধুলো জমা রেজিস্টার খাতাটা টেনে নিল দুই যুবক। তাদের পরনে সাধারণ জিন্স আর জ্যাকেট, কিন্তু চোখের চাউনিতে এক অদ্ভুত জেদ। কাউন্টারে বসা বুড়ো নেপালি মানুষটা তাদের দিকে একবার সন্দেহের চোখে তাকিয়ে খাতাটা এগিয়ে দিল। যুবকটি কলম তুলে নিয়ে ধীরস্থিরভাবে দুটো নাম লিখল:
১. অনিকেত চ্যাটার্জি ২. অর্কদেব চ্যাটার্জি
দুজনেরই দীর্ঘদেহী, চওড়া শরীর দেখলে মনে হয় একেকটা বুনো ষাঁড় (Ox Bull)। ফর্সা গায়ের রঙ আর ঘন চাপ দাড়ি তাদের চেহারায় এক রুক্ষ আভিজাত্য এনেছে। ১১১ নম্বর রুমে ঢুকেই অনিকেত নিজের শার্টটা খুলে ফেলল। চওড়া লোমশ বুক আর পাথরের মতো শক্ত পেশীগুলোই বলে দিচ্ছে তারা সাধারণ ট্যুরিস্ট নয়। অর্কদেব বিছানায় গিয়ে বসল, তার চোখে এক ভীষণ বুনো তেজ। যখন সে তাকায়, মনে হয় চারপাশের সবকিছু সে নিখুঁতভাবে জরিপ (Observation) করে নিচ্ছে। বড় দাদা অনিকেতের কাছেই তার যত বডি বিল্ডিং আর কমব্যাট ট্রেনিং—সবই হয়েছে তাদের বাবা সাহেবের নির্দেশে। এক অদৃশ্য মিশনের নীল নকশা যেন তাদের মগজে গেঁথে আছে।
অনিকেত একটা কালো টি-শার্ট গলিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগুলো। বেরোনোর আগে অর্কদেবকে লক্ষ্য করে গম্ভীর গলায় বলল, "পুরু ডিটেইলস সব কিছু মোবাইলে কপি করে একটা ফাইল বানিয়ে রাখ। অনেক কাজে লাগবে।"
অর্কদেব মাথা নাড়ল। তার আঙুলগুলো ক্ষিপ্র গতিতে স্ক্রিনে চলতে শুরু করল। অনিকেত লজ থেকে বেরিয়ে সোজাসুজি কাঠমান্ডু বাস স্ট্যান্ডে এসে পৌঁছাল। ভিড় ঠেলে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল— "জলপাইগুড়ির দুটো টিকিট দিন।"
অন্নপূর্ণা লজের জরাজীর্ণ দেওয়ালে নোনা ধরা গন্ধ, কিন্তু ১১১ নম্বর রুমের ভেতরটা এখন একটা মিনি কন্ট্রোল রুম। সে গত কয়েক মাসের হাড়ভাঙা রিসার্চের সমস্ত ডেটা আজ রাতে ফাইনাল টাচ দিচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজায় সঙ্কেত মেনে তিনটা টোকা পড়ল। অনিকেত ঘরে ঢুকেই গম্ভীর গলায় বলল, "আমাদের আগামীকাল ভোরবেলা বেরোতে হবে। রাত ৩টের সময় বাস, সেখান থেকে ট্রেন।"
অনিকেত এগিয়ে এসে ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাল। সেখানে একটা বিশাল ম্যাপের মতো ডায়াগ্রাম খোলা। ওপরের দিকে বড় বড় হরফে লেখা— Singha Ray Conglomerate (SRC) এবং Sen Genix Global Solution (SGGS)।
ডায়াগ্রামের চারপাশে ছোট ছোট বক্সে সাজানো আছে প্রতিটি ফ্যামিলি মেম্বারের ডিটেইলস। ব্রিজেশ সিংহ রায় থেকে শুরু করে মেঘাদিত্য আর তনুশ্রী সেন , নীরব সিংহ রায়, দেবারতি সিংহ রায়, অনুশ্রী সেন, দীক্ষিত সেন —কার কোড নাম কী, কার লজিস্টিক রুট কোথায়, এমনকি তনুশ্রীর ‘আলোয়ন ফাউন্ডেশন’-এর আড়ালে কোন কোন নেতা যুক্ত, সব ডিটেইলস অর্কদেব নিঁখুতভাবে সাজিয়ে রেখেছে।
অনিকেত ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল, "সাবাস অর্ক। এই ডেটাগুলোই আমাদের ব্রহ্মাস্ত্র।"
পরদিন ভোরবেলা। আবছা অন্ধকারে দুই ভাই তৈরি হয়ে নিল। দুজনের পরনেই দামি ট্র্যাক স্যুট। বাবা সাহেব এর নির্দেশ হাওড়াতে এখন ভ্যাপসা গরম বাড়ছে, তাই হালকা আরামদায়ক পোশাকই সেরা। তারা নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে নিল। বাবা সাহেবের কড়া নির্দেশ—কোনো বিলাসিতা নয়, সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে হবে। তাই তারা ট্রেনের জেনারেল বগি-র টিকিট কেটেছে।
সকাল ৮টা। জলপাইগুড়ি স্টেশনে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। ভিড় ঠেলে জেনারেল বগিতে সিট দখল করে বসল দুই ভাই। ট্রেনটা যখন ছাড়ল, অর্কদেব জানলার বাইরে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, "দাদা, বাবা সাহেব কোথায়? ওনাকে আমি সেই নভেম্বরে লাস্ট দেখেছি।"
অনিকেত এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। মনে মনে ভাবলো যে বাবা সাহেব সেই নভেম্বর এই পাড়ি দিয়েছে, সে জানলার কাঁচটা তুলে দিয়ে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করল— "কুহকপুর।"
ট্রেনটা তখন ঝকঝক শব্দে কলকাতার দিকে এগোচ্ছে। তাদের টিকিট হয়তো হাওড়া স্টেশনের, কিন্তু তাদের আসল গন্তব্য— "রক্তনগর"।
? End of Chapter 1
ঘরের দেওয়ালের ইটগুলো শক্ত।
কিন্তু ভিতটা ফাঁপা।
এবার...
খেলা শুরু।
To be continued...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)