(১০৫)
মায়াজাল
“হাই পোলার বাপ।”
জানি সে এখন লাইনে নাই। তবুও মেসেজ দিলাম। সে বলেছিলো এখন হাটতে বের হবে।
“ওয়েট। একটা জিনিস দেখাই তোমায়।”
ওমা, সে তো লাইনে? হাটতে বের হয়নি নাকি?
“কিভাবে পোলার বাপের, প্রকৃতি দেখতে যায়নি নাকি!?”
“-----------------”
পোলার বাপ একটা ছবি পাঠিয়েছে। দুইজন পিচ্চি বাচ্চা খাচ্ছে। দেখে গরিব ই লাগছে। গায়ে কিছু নেই। তারা প্যাকেট দেখে পরাটা খাচ্ছে। রাস্তায় বসে বসে।
“এরা কারা?”
“এরা দুজন আমার বন্ধু। হাটতে গিয়ে দেখা। দুইদিন খাইনি বলছে। তাই খেতে দিলাম। সাথে আমিও খাচ্ছি। সেই স্বাদ। ভাবছি আজ থেকে প্রতিদিন সকালে এই দুই বন্ধুর সাথেই এসে নাস্তা করবো। কেমন হবে?”
“ভালো তো।”
“ম্যাডাম, একটু ওয়েট। ওদের খাওয়া শেষ হলেই নক দিচ্ছি।”
আমি আর মেসেজ দিলাম না। তার উপরের মেসেজে চোখ আটকে আছে। সে হাটতে বেরিয়ে গরিব বাচ্চাদের দেখতে পেয়ে তাদের খাওয়াচ্ছে। সাথে সে নিজেও খাচ্ছে। ইন্টারেসটিং।
১০ মিনিট হয়ে গেলো। সে এখনো নক দিচ্ছেনা। নিজেই নক করবো নাকি? নাকি এখনো ওদের খাওয়া হয়নি? নাহ আর কিছুক্ষণ ওয়েট করি। হয়তো বাচ্চাদের সাথে কথা বলছে। পোলার বাপের মনটা অনেক ভালো। নয়তো রাস্তার ছেলেপুলেদের কেউ খাওয়াই? তাও তাদের সাথে খাইসে সে নিজেই। মন ভালো না হলে কেউ এমন কাজ করবেনা।
“ম্যাডাম।”
“জ্বি। হলো?”
“যাবার সময় ২জনের হাতে ৫০টাকা করে দিসি। ওরা এতটাই খুশি হইসে, কি বলবো। খুশিতে দিসে এক দৌড়। হা হা হা।”
“ভালো কাজ করেছেন। ছেলে গুলোকে খাওয়ার বদৌলে আল্লাহ আপনার ভাল করবেন।”
“তা, ম্যাডামের খাওয়া হলো?”
“আমাকে ম্যাডাম ডাকছেন কেন? কখন পড়িয়েছি আপনাকে?”
“বন্ধু ডাকবো যে, সেই সুযোগ দিলে না। তাই…..”
“ওরে বাপরেহ, তাই ম্যাডামে চলে গেলেন?”
“তাহলে কি শু বলেই ডাকবো?”
“নাহ। ঐটা শুধু মাত্র আমার স্বামিই ডাকে। অন্য কেউ না।”
“তাহলে একটা কিছুতো দাও যেটা ধরে নদী সাতরাই। নয়তো কূল খুযে পাবোনা তো।”
“হি হি হি। আমার নাম ধরে ডাকতে পারেন।”
“প্লিজ……”
“আমি মিম। আর আপনি?”
“আমি ডিম। হা হা হা।”
“এবার রাগ করবো কিন্তু।”
“ওকে বাবাহ ওকে। আমি আরাফাত।”
“আয়া? আরাফাত তো আমার…….!”
এ ছি ছি, বলেই ফেলছিলাম আরেকটুর জন্য। আরাফাত আমার শ্বশুরের নাম। রাব্বীলের বাবার নাম।
“কি?”
“না না কিছুনা। সুন্দর নাম।”
“কিছু একটা বলতে গিয়ে আটকে গেলে!”
“আরেহ না। এখন কোথায়? বাসা যাবেন না?”
কথা ঘুরানো দরকার।
“মিম বোধায় এখনো আমার সাথে কথা বলতে সংকোচবোধ করছে। তাই না?”
আসলেই সংকোচ না। কিভাবেই বলি আরাফাত আমার শ্বশুরের নাম! মুখ ফসকে বলেই ফেলছিলাম। আটকে গেছি। নাকি বলেই দিব!
“আরে না না। কি বলেন। সেটা না।”
“তাহলে? না ফ্রি কথা বলছো, না আপনি থেকে তুমিতে আসছো। আমিই তুমি তুমি করছি।”
“আসলেই আমার কখনো অপরিচিত কারো সাথে কথা বলে অভ্যাস নাই। বলতে পারেন এই প্রথম কারো সাথে কথা বলছি। তাও এত্ত এত্র কথা। নিজের ই মাঝে মাঝে অবিশ্বাস লাগছে।”
“মিম শুনো, যদি তোমার কাছে খারাপ লাগে, কিংবা বিবেকে বাধা দেই আমার সাথে কথা বলতে, তাহলে মনের জোরে কিছু করোনা। কথাই তো বলছি দুজনে। কেউ কারো জমি লিখে নিচ্ছি না তো!”
“স্যরি, আমার কোনো ব্যাপারে দু:খ পেলে।”
“আবার স্যরিও বলছে! দেখো মিম, তুমি আমায় কি ভাবো না ভাবো জানিনা, কিন্তু আমি বন্ধুত্বের উদ্দেশ্যেই তোমাকে মেসেজ দিয়েছি। তাই রাখঢাক ছাড়াই আমার মনের কথা বলে দিয়েছি। তোমাকে জোড় করে না, তোমার ভালো লাগাকেই আমি সম্মান করবো। চাইলেই তুমি আমার সাথে কথা নাও বলতে পারো।”
“না না। আমি তো কথা বলছিই। আসলেই কদিন থেকে মন ভালো নেই। তাই……!”
হাই হাই, আমি কিসব বলতে যাচ্ছি!!! রাব্বীলের কথা বলাটা কি ঠিক হবে তাকে!
“তাই..?”
সে তো অপরিচিত কেউ। আর জীবনেও তার সাথে আমার দেখাও হবেনা। সে জানবেও না আমি কে। তাকে আর গোপন করেই কি করবো?
“আজ ৩৬দিন হলো আমার স্বামি ট্রাক এক্সিডেন্টে মারা গেছে।”
“অহ স্যরি স্যরি। আল্লাহ উনাকে জান্নাত বাসি করুন।”
“........……”
আমার গলার কাছ ভারি হয়ে আসলো। যেন কান্না আসতে চাচ্ছে, গলার চাপে আটকে আছে। আমার খুউউউব কান্না পাচ্ছে। রাব্বীল তুমি আমায় একা ফেলে কেন চলে গেছো! আমি এ জীবনে একা কিভাবে বাচবো!
“মিম? আছো? দুনিয়ায় আমরা কেউ থাকতে আসিনি। দুনিয়াটা হচ্ছে দুই দিনের সফর। আজ হোক কাল, আমাদের যেতেই হবে। আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ আসন দান করেন, সেই দুয়াই করি।”
“..............”
জানিই তো, দুনিয়ায় কেউ থাকার জন্য আসেনি। তাই বলে সে আমায় ছেরে একা কেন চলে যাবে? আমি না তার অর্ধাঙ্গিনী! তার স্ত্রী। তার জীবন। তাহলে আমায় কেন রেখে গেলো! সে কি জানতোনা আমি তাকে ছাড়া একা থাকতে পারবোনা। কতটা কস্ট হয় থাকতে সে কি জানে এখন! আমি যে এখন এক অসহাই নারি।
“মিম? আমার কথা শুনো। আমি জানি তুমি আমাকে শুনছো। মিম একটিবার কি এই ছোট্ট বাচ্চাদের কথা ভেবেছো? তাদের না আছে বাবা মা, না আছে শোবার জায়গা, কিংবা না আছে দিনের খাবারের নিশ্চয়তা। অথচ দেখেছো, তারা দুইদিন পর যাস্ট দুইটা করে পরাটা খেলো, তাতেই মনে হলো দুনিয়া জয় করে ফেলেছে। এতো খুশিই আমিই আমার জীবনে হয়নি। মিম, এই দুইদিনের দুনিয়ায় আমরা সবাই মুশাফির। মেহমান। সবাই চলে যাবো। নিজের দুঃখ কস্ট লাঘব করার জন্য এই জন্যে খোদাতালা বলেছেন, তোমরা সব সময় তোমাদের চেয়ে নিচ অবস্থানের মানুষের দিকে তাকাবে। দেখবে তোমরা কত ভালো আছো। মিম তুমি আমাকে শুনছো?”
“হু।”
“আমি আমার বন্ধুর চোখে জল দেখতে চাইনা। বরং আমি চাই আমার বন্ধু চোখের জলের পরিবর্তে অন্তর থেকে দুয়া করবে। দুয়া করলে উনি ওপারে থেকেও খুশি হবেন। আর কেদে কোনো লাভ হবে, বলো? জানি, যার কস্ট সে বুঝে। মিম জানো, আমি জানিই না আমার মা দেখতে কেমন ছিলো? তার কন্ঠ কেমন ছিলো? আমি জন্মের পর মাকে মা বলে ডাকার সৌভাগ্য হয়নি। তাই বলে কি দুনিয়া আমার জন্য দুর্বিসহ হয়ে গেছে? না। আল্লাহ আমাদের একটার অভাব, অন্যটা দানের মাধ্যমে পুরণ করে দেন। তাছারা তো আল্লাহ বলেইছেন, তোমরা দুনিয়ায় যেটার অভাবে থাকবে, জান্নাতে তোমাদের সব পুরন করে দেওয়া হবে। তোমরা যা চাইবে। মিম? শুনছো আমার কথা?”
“হু।”
“পাগলি একটা। চোখের জল ফেলবানা আজ থেকে। বুঝেছো?”
“হুম।”
“দেখি, এদিকে মাথাটা নিয়ে আসো তো। তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দুয়া পড়ে দিই।”
হিহিহিহিহ, পোলার বাপ বলে কি! দুঃখের সময় হাসাতেও পারে। এতো দূর থেকে নাকি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে। হি হি হি।
“.........”
“কি হলো, মাথাটা এদিকে দাও বলছি! আমার দাদি এই কাজ করতো, যখনি দাদির সামনে যেতাম, দাদি আমাদের মাথাটা ধরে লম্বা ফু ফিয়ে দিত। আর বলতো, যা দুয়া করে দিলাম। আসলেই খালি খালি ফু ই দিত দাদি। হা হা হা।”
“তোমার দাদির মতই খালি খালি ফু দিতে চাচ্ছো নাকি?”
“আরে নাহ। আমার স্টকে অনেক দুয়া আছে। দুয়া করেই লম্বা ফু দিয়ে দিবনি।”
“বুঝেছি। আর দাদির ভূমিকা পালন করতে হবেনা। যান বাসাই গিয়ে ফ্রেস হন। সকাল থেকেই বাইরে আছেন।”
“তোমার কি মনে হয়, আমি এখনো বাইরেই আছি? কথা বলতে বলতে বাসাই পৌছে গেছি ম্যাডাম।”
“ওকে, এখন ফ্রেস হন। পরে কথা হবে।”
“ওকে ওকে। জোড় করে ঠেলে দিচ্ছো কেন? বন্ধুর ফু ভালো লাগছেনা বুঝি?”
কিভাবে বলি, তোমার সাথে কথা বলতে ভালোই লাগছে পোলার বাপ। বললে উলটাপালটা ভাব্বে। বলা যাবেনা। আমার এই দুর্বিসহ মুহুর্তে পোলার বাপ যেন আশির্বাদ। কিভাবে যেন সময় চলে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম লোকটাকে কেমন অদ্ভোত লাগছিলো। এখন অবশ্য সেইরকম লাগছেনা। ভালোই। ভালো না হলে কেউ পথেঘাটে পথশিশুদের খাওয়াতো না।
যাই, ছাদে হেটে আসি কিছুক্ষণ। এসেই গোসল করবো। লাস্ট ৪দিন গোসল করিনি। রাব্বীল থাকলে আমায় ঘর থেকে বের করে দিত—-৪দিন গোসল না করে কেউ থাকে!!


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)