(১০৪)
মায়াজাল
বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি। ঘুম নাই চোখে। দুইটা কারণে— মাথা যন্ত্রণা, সাথে পোলার বাপের কথা। মা এসে ঘন্ঠা খানেক মাথা টিপে দিলো। অসুধ দিলো। তবুও যেইসেই অবস্থা।
রাত কয়টা বাজে?
ও মাই গড!! ৩টা। হুদাই চোখ বন্ধ থেকে চোখে ব্যাথা শুরু হয়ে গেসে।
ফোনটা হাতে নিলাম। প্রোফাইলে ঢুকলাম। নাহ। পোলার বাপে আর মেসেজ দেইনি। হয়তো অপমানিত হয়ে গেসে আর মেসেজ না পেয়ে। আমি অজান্তেই কি তাকে হার্ট করে ফেললাম!
কিছু একটা উত্তর তখন দেওয়া দরকার ছিলো। আমারি ভুল। ভদ্রতার খাতিরে হলেও হ্যা ওর না একটা উত্তর দিলেই চুকে যেত। এতো টেনশানের দরকার ছিলোনা।
এখন কি উত্তর দিব? দিলেই বা কি দিব? সে তো প্রেম প্রোপোজাল দেইনি। বন্ধু করবে তাই বলেছে। তার জীবনে না মেয়ে ফ্রেন্ড নাই। তাই।
ওয়েট এ মিনিট! সে তো বিবাহিতা। তাহলে আর মেয়ে ফ্রেন্ড লাগবে কেন! লুচ্চা বেটা!!!
দাড়াও তোমার বিধি করছি আমি।
“আছেন?” দেখি আগে লাইনে আছে কিনা। থাকতে তাকে কয়টা কথা শুনাবো। বলবো, শুনুন, ঘরে যার বউ থাকে তার আবার কিসের মেয়ে বন্ধু লাগবে শুনি!??
ওমাহ, সাথে সাথেই উত্তর দিলো! এ মানুষ তো! নাকি AI???
“ওগো বন্ধু আমার, তুমি চলে যেওনা। কি দোস করেছি আমি, একবার বলে যাওনা……”
“শুনুন, গান রাখেন আপনার। একটা কথা বলার জন্য আসলাম। নয়তো আসতাম না।”
“জি বলিয়ে ম্যাডাম।”
“আগে ভালো ভাবে কথা বলুন।”
“ওকে মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। বলেন।”
“না। আমি আপনার বন্ধু না। সেটা ছারাই বলুন।”
“আচ্ছা আচ্ছা। জ্বি বলেন, কি বলার জন্য এতো রাতে আপনাকে লাইনে আসতে হলো? বান্দা ঝাড়ি খাওয়ার জন্য রেডি।”
“আপনি একটু বেশিই কথা বলেন। আপনাকে আমি ঝাড়ি মারবো, কখন বললাম?”
“না মানে, এতো রাইতে কোনো রমনি, আমার মত অপরিচিত একজন দু:খিকে তো আর প্রেম নিবেদন করতে আসবেনা। তাই। আসলে আসবে ঝাড়ি মারতে। ঠিক বলিনি?”
“যান, বলবুই না। বাই।”
“ম্যাডাম, ম্যাডাম, যাবেন না প্লিজ। ৫ ঘন্ঠা ধরে অপেক্ষা করছি। আর অপেক্ষা করাবেন না প্লিজ। দয়া করে আমার বন্ধুত্বের অফারটিকে “না” বলে চলে যান, তবুও অন্তত মনে শান্তনা পাবো যে, কিছুতো একটা পেয়েছি।”
লোকটা সত্যিই বেশি কথা বলে। তবে খারাপ তো আর বলেনা। মজা করছে। উলটো আমিই হুদাই মেজাজ দেখাচ্ছি। সেই সকাল থেকে আমার মেজাজ যে সে সহ্য করছে সেটাই তো আমার ভাগ্য। আমার এতো বাড়াবাড়ি না করলেও হত।
“আপনি ‘না’ ই কেন বলতে যাবো আপনাকে?”
“তাহলে কি ধরে নিব হ্যা?”
“কিছুই ধরতে হবেনা। যান এখন ঘুমান। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে আছেন। আমিও ঘুমাবো।”
“শুউউউ, যেওনা প্লিজ। একটু কথা বলো।”
হঠাৎ আমার বুক কেপে উঠলো। শরীর যেন কেমন করে উঠলো আমার। এইভাবে আমার স্বামিই আমাকে ডাকতো। এই নামে। এই সুরে। এইভাবেই। আজ আমার স্বামি নাই। ৩৫দিন হলো এই নামে আর কেউ ডাকেনা। আজি প্রথম কেউ একজন ডাকলো। লোকটা আসলেই খুউউব খারাপ। আমার এখন প্রচুর কান্না পাচ্ছে।
আমি কাদবো। চিৎকার দিয়ে কাদবো। কাদতে কাদতে আমার মৃত্যু হলে কতটা যে খুশি হতাম। কিন্তু আল্লাহ আমার মৃত্যু দেইনা। সবাই বলে মৃত্যু অনেক সহজ, যখন তখন হয়ে যেতে পারে। আমার জন্যেই কেন কঠিন হলো মৃত্যু?
**********+++*************
যখন ঘুম ভাঙ্গে, চোখ খুলিনি, বুঝতে পারি কাউকে যেন জড়িয়ে ধরে আছি। বুকের ভেতর ধুক করে উঠলো। তড়িৎ চোখ খুলে দেখি, মা। আমি মাকে ঝড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিলাম। আল্লাহ তো অনেক সময় বান্দাদের সাথে মিরাক্কেল ও ঘটান। আমার সাথে কেন ঘটান না! হঠাৎ কোনো এক সকালে উঠে দেখবো, পাশে রাব্বীল শুয়ে আছে আমাকে জড়িয়ে ধরে। আল্লাহ তুমি আমার বেলাতেই কেন এতো নিষ্ঠুর!
সকাল হয়ে গেছে তবুও মা উঠেনি, কাহিনি কি! আমি মাকে উঠাই দিলাম। অনেক খুদা পেয়েছে। নাস্তা বানাতে বললাম। লাস্ট কবে খেয়েছি মনে নেই।
মা উঠে চলে গেলো। আমি চোখ ডলতে ডলতে ফোনটা হাতে নিলাম। মনে পরলো পোলার বাপের লাস্ট মেসেজের কথা—“শুউউউ, যেওনা প্লিজ। একটু কথা বলো।”---।
আমি প্রোফাইলে ঢুকলাম। তাকে বলে দেওয়া দরকার—-এই শুনুন, শু নামটা শুধু মাত্র আমার স্বামির জন্য। এই নামে আপনি ডাকবেন না। বুঝেছেন? এই ভাবে বলে দিব পোলার বাপকে।
প্রোফাইলে ঢুকেই দেখি কোনো মেসেজ নেই। আমিই নিজ থেকে মেসেজ করলাম।
“হাই।”
দুই মিনিটের মাথাই উত্তর আসলো— “শুভ সকাল।”
“জেগেই ছিলেন নাকি?”
“শুভ সকাল দিয়েছি।”
“শুভ সকাল।”
“ঘুম ভাঙলো?”
হ্যাঁ। আপনি জেগেই ছিলেন নাকি?”
“না। আপনার মেসেজে ঘুম ভাঙলো। এখনি উঠলাম।”
“অহ, স্যরি।”
“স্যরি হবার দরকার নাই। উঠিয়ে ভালোই করলেন।”
“কিভাবে?”
“উঠালেন বিধাই আজ সকালটা এতো সুন্দর।”
“ফ্লাট করছেন?”
“মোটেও না। আমি কত দিন পর এতো সকালে উঠলাম, মনে নেই। সকাল যে এতো সুন্দর হয়, জানতাম না। থ্যাংক্স।”
“কি করবেন এখন?”
“আপাতত এই সুন্দর সকালে সুন্দর মনের মানুষটির সাথে দুচারটা কথা বললো। তারপর বাইরে যাবো। উঠেই যখন গেছি, সুন্দর প্রকৃতিটা ভালো মতই উপভোগ করবো। আচ্ছা, সকালের প্রকৃতি আপনার কেমন লাগে?”
“আমার ছোট্ট থেকেই সকালেই উঠা লাগে। প্রাইভেট থাকে, বারো মাস। তাই আলদা করে আপনার মত প্রকৃতি প্রেমি হতে হয়না।”
“আপনি কিন্তু দারুন কথা বলেন, নিশ্চিত অনেকেই এই কথা আপনাকে বহুবার বলেছে।”
নাহ। প্রথম আজেকেই শুনলাম।”
“তাহলেই আমিই সেই লাকি চাম্প।”
“মানে?”
“উহুহ। তো ম্যাডাম, এখন কি করবেন?”
“কিছুনা। আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবো। আম্মুর নাস্তা হলে উঠে গিয়ে খাবো।”
“অহ হো, একটা প্রশ্ন তো করতেই ভুলে গেছি—-আন্টি কেমন আছেন?”
“ভালো।”
“আর আপনি?”
“আমিও।”
লোকটি বকরবকর করতেই আছে। একটা মানুষ এতো কথা কেমনে বলে! কথা বলতে বলতে দেড় ঘণ্ঠা পার করে দিয়েছি বুঝতেই পারিনি। হয়তো আরো কথা হতো,যদি মা ডাক না দিত। মায়ের ডাকেই হুস ফিরলো, আমায় যেতে হবে। শেষ মেস পোলার বাপকে বাই বলে প্রোফাইল থেকে বের হলাম। বের হবার সময় তার শেষ মেসেজ ছিলো— “ওকে ম্যাডাম, নাস্তা করেন, আবার দুপুরে কথা হবে।”
আমার সত্যিই নিজেকে অবিশ্বাস লাগছে, কিভাবে দেড় ঘণ্ঠা ধরে টানা কথা বললাম, তাও অপরিচিত কারো সাথে? আমার জীবনে বোধায় এটাই প্রথম, কোনো ছেলের সাথে টানা এতক্ষণ কথা বলা। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে—- আমার কেন জানি বিরক্ত লাগেনি। বের হয়েই রাব্বীলের কথা মনে পড়লো। সে কি তাহলে এখানে এসে কারো সাথে চ্যাটিং করতো? চ্যাটিং করেই সময় পার করতো? আর তাই আমার সাথে সময় দিতনা?
কিন্তু সেদিন যে সেবহান আংকেল বললেন, রাব্বীল নাকি নিজেই নিজের সাথে কথা বলতো অন্য একটা ফেইক প্রোফাইল খুলে। আচ্ছা, রাব্বীল এটা কেন করতো! এখানে তো কথা বলার জন্য অনেকেই থাকে। চাইলেই তো অন্যের সাথেও কথা বলতে পারতো। অহ হ্যাঁ, মনে পরেছে, আংকেল বলছিলেন, রাব্বীল একটা গ্রুপে কথা বলতো সবার সাথে।
যাহোক, পোলার বাপ মানুষ হিসেবে খারাপ না।
যাই খেয়ে আসি। খেয়েদেয়ে এবার আমিই নিজ থেকে নক দিব। একটা মানুষকে এতটা অবহেলা করা ঠিক হয়নি। খারাপ কিছুতো চাইনি, বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে শুধু।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)