(১০৩)
মায়াজাল
“স্বামি, আজ কেমন আছো তুমি? আমার কথা তোমার একবারো মনে পড়েনা? তাহলে আমাকেও তুমি চিঠি লিখোনা কেন? সারাদিন তোমার চিঠির অপেক্ষায় বসে থাকি। আজ সকালে কি হইসে শুনবা?
তোমাকে না বলেই তোমার গোপন দুনিয়ায় প্রোফাইল খুলে ফেলেছি। হি হি হি। কিগো, রাগ করলা নাকি? শুনো, আমি শুধুই প্রোফাইল খুলেছি। আর কিচ্ছুই করিনি। হুম। তবে একটা গোপন কথা আছে। শুনবা? শুনলে তুমি হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাবা! হি হি হি। আমার তো এখনো মনে পড়লে হাসি পাচ্ছে।
তাহলে শুনো বলি---প্রোফাইল খুলার পরপরই একজন আমাকে একটা মেসেজ করেছে। কি লিখেছে জানো?---আপনার নামটা সুন্দর---শু। নাইস নেম–--- হি হি হি। তোমার দেওয়া নাম দিয়েই আমি প্রোফাইল খুলেছি। আর কেউ একজন এসে বলে কিনা আমার নামটা নাকি নাইস! হি হি হি। তোমার হাসি পাচ্ছেনা? আমি তো তখন থেকেই হেসেই যাচ্ছি।
আরেকটা জিনিস বলি, এইবার তুমি নিশ্চিত হাসবা। যে এই মেসেজটা পাঠিয়েছে, তার নাম কি ছিলো জানো???
Polar Bap. হি হি হি। নাম দেখেছো?
আচ্ছা স্বামি, তুমি এমন হাস্যকর দুনিয়ায় কি করতা সারাদিন বলো তো! আমি তো কিছুই দেখছিনা ঐ Polar Bap এর মেসেজ ছাড়া। হি হি হি। অথচ সেবহান আংকেলের সেদনের কথায় তোমাকে নিয়ে কত কি যে ভেবেছিলাম, আল্লাহ!!! এখন আমার মনে হচ্ছে, আংকেল না বুঝে শুনে হুদাই উলটাপালটা বকছিলো। তোমায় নিয়ে কি বলছিলো জানো?
নাহ। বলবোনা। রাগ করবে তুমি। বাদ দাও সেসব কথা। আমি জানি আমার স্বামি কখনোই অস্বাভাবিক কিছুই করতে পারেনা। আল্লাহ তোমায় যদি আমার সাথে রাখতো, তবে আজ এটাই প্রমাণ হতো, আমার স্বামি ঠিক। স্বাভাবিক। পার্ফেক্ট।
……Hello Boss, You have a new message….
স্বামি স্বামি, থাকো, আর তোমাকে লিখে হবেনা। অনেক রাত হয়েছে। ঘুমাও তুমি। আর শুনো, নিজের খেয়াল রেখো কিন্তু।”
আমার ফোনে আবারো মেসেজ। নিশ্চিত BDhome.com থেকেই হবে। ফোন চেক করে দেখলাম, ঠিকই। Polar Bap আবারো মেসেজ করেছে। সকালে তার মেসেজের উত্তর দিইনি। লোকটা ভালই ছ্যাছড়া আছে। কেউ একজন মেসেজের উত্তর না দিলে তাকে যে আর মেসেজ দেওয়া যায়না সেই ভদ্রটা টুকু শিখেনি। আর আমি তো তাকে চিনিই না। উত্তর কেনই বা দিব!
তবুও মন মানলোনা। কি মেসেজ করেছে, একটু চেক করি।
“এদিকে পোলার মায়ের সাথে ঝগড়া করে মনটা খারাপ, ভাবলাম মনটা ভালো করার জন্য কোনো হ্রদয়বান ব্যক্তির সাথে দুমিনিট কথা বলে মনট ভালো করবো, কিন্তু তা আর হলোনা। আচ্ছা, স্যরি ডিস্টার্ব করার জন্য।”
লোকটার কথা শুনে দুঃখ পাবো নাকি হাসবো বুঝছিনা। জানা নেই শোনা নেই, হুট করে মেসেজ দিয়েই বলে কিনা, তার নাকি পোলার মায়ের সাথে ঝগড়া হইসে তাই মন ভালো করতে এখানে এসেছে। হি হি হি।আবার মেসেজ দিলো!
“জানি আমার দুঃখি মন আর ভালো হবেনা।কিন্ত আপনারো কি মন দুঃখি করে দিলাম, মেসেজ দিয়ে?”
“আরেহ না না।”
হাই আল্লাহ, মেসেজ দিয়েই দিলাম!!! আবার মেসেজ দিলো।লোকটা কি ফোন ধরেই বসে আছে নাকি!
“যাক, অন্তত সিউর হলাম, যে আমার মেসেজে কস্ট পান নি।”
“কস্ট কেন পাবো? কস্ট পাওয়ার মত কিছু বলেছেন কি?”
“তা না। আসলেই নিজের মন খারাপ হয়ে আছে তো, তাই ভাবলাম, যাকে মেসেজ দিচ্ছি, তার মন ও যদি খারাপ হয়ে থাকে তখন ঝামেলা!”
লোকটা একটু বেশিই কথা বলে নাকি! আমার মেসেজ যেতে না যেতেই উত্তর চলে আসছে।
“তা আপনার মন খারাপ ভালো হয়েছে?”
“জানেন, গত কাল থেকেই ভালো করার চেস্টা করছি। হচ্ছেইনা।শেষ মেস আপনাকে মেসেজ দিলাম।অবশ্য আপনাকে আমি চিনিইনা। শুনেছি, দুমিনিট অপরিচিত কারো সাথে মন খুলে কথা বললেই মন ভালো হয়ে যাই। এটা নাকি প্রকৃতির নিয়ম। জানিনা ঠিক।”
“তা কে বলেছে এই কথা?”
“কত জনই তো বলে। যার সাথে আত্মিক কোনো সম্পর্ক নাই, তার সাথে মন খুলে দুমিনিট কথা মানেই, আত্মাকে শান্তি দেওয়া।”
“উল্টোটাতেও হতে পারে?”
“তা পারে। তবে যেহেতু আমার মন ভালো করা দরকার, তাই যদি শুরুতেই নেগেটিভ মনোভাব দিয়ে কথোপকথন শুরু হয়, তবে শুরুতেই সালাম। হা হা হা।”
“হু। বুঝলাম।”
“ম্যাডামের কি আমার মতই মন খারাপ?”
মন খারাপ? আমার? বালে মনটাই আছে কিনা জানিনা। আল্লাহ না করুক, সাত দুশমনকেও এমন পরিস্থিতে পড়তে না হয়।
“না না। আমি ঠিক আছি।”
“চাইলে আমার সাথে শেয়ার করতে পারেন।”
“কি শেয়ার করবো?”
“এই যে, একটা কলার দাম ৪টাকা হলে ধরুন আপনি এক সাথেই ৫ ছোড়ি কলা খেয়ে ফেলেছেন। এখন হিসেব মিলাতে পারছেন না, কত টাকার কলা আসলে আপনি খেয়ে ফেলছেন। এইসব আর কি।”
“হি হি হি। মোটেই না। আমি জীবনেও এত কলা খাইনি।”
“ধরুন না, খেয়েছেন।”
“কেন ধরতে যাবো, যেখানে আমি এত কলা খাইতেই পারবোনা।”
“ওকে, ধরুন আপনি আপনার হাসবেন্ড এর সাথে কোথাও ঘুরতে গেলেন। গিয়ে আপনার ফুচকা খেতে মন চাইলো। আপনার হাসবেন্ড দুই প্লেট ফুচকা আনলো। প্রতি প্লেটে ১৫টি করে ফুচকা আছে। আপনি খাওয়া শেষে দেখলেন, আপনি ১৬টি ফুচকা খেয়ে ফেলেছেন। এখন হিসেব মিলাতে পাচ্ছেন না কিভাবে এটা হলো।”
রাব্বীলের সাথে ফুচকা? রাব্বীল তো আমায় কোনোদিন ও বাইরে নিয়ে যায়নি। ফুচকা খাওয়া তো দুরকি বাথ। জীবনের প্রথম বার কক্সবাজার গেলাম, তাও রাব্বীল রুমেই থাকলো বেশিরভাগ। ঐ কপাল আমার হয়নি।
“নাহ। এতো কিছু ধরতে পারবোনা। বুঝছেন?”
“প্লিজ ধরে দেখেন না একবার, দেখবেন মজা পাবেন।”
“এসব ধরাতে মজা কিসের? তাহলে তো হাই কলেজের বাচ্চারা অংক ক্লাশ করতে মজাই পেতো। কিন্তু পাইনা তো।”
“কি বলেন ম্যাডাম! ধরাতে মজা নেই বলছেন! এর চাইতে মজা দুনিয়ায় আর কিছু আছে?”
লোকটার মাথা কি গেছে নাকি? অংকের ধরাতেও নাকি মজা। এই কারনেই সে Polar Bap । হি হি হি। আমার তো কোনো কালেও অংক করতে ভালো লাগতোনা।
“আপনার অংক ভালো লাগে?”
“সবচেয়ে অংকতেই বেশি মজা পেতাম। শান্তিও পেতাম। কেন জিজ্ঞেস করেন?”
“কেন?”
“কারণ এখানে ধরতে হয় তাই। হা হা হা।”
“হি হি হি। এই জন্যেই আপনি Polar Bap । অদ্ভোত লোক।”
“ম্যাডাম, আমার মেয়ের নাম শুনলে তো ডাবল অদ্ভোত বলবেন তাহলে!”
“আপনার মেয়েও আছে?”
“জ্বি।”
“অহ।”
“মন খারাপ হলো?”
“আমার কেন মন খারাপ হবে?”
“এই যে কেমন জানি হোপ্প মেরে গেলেন।”
“তা কি বলছিলেন যেন, আপনার মেয়ের নাম।”
“আমার মন বলছে, আপনার মুড কোনো কারনে অফ।”
ঠিক ই বলেছে। আমার আর কথা বলতে ভালো লাগছেনা। ফুচকার কথা তুলে মুডটা অফ হয়ে গেলো। আমার জীবনে বিয়ের পর সখ আহলাদ বলতে কিছুই করিনি। না ঘোরা, না বাইরে খাওয়া। এমনকি আমাদের রুমের অবস্থান দেখে মা বারবার বলতো, বাইরে কোথাও ঘুরে আসতে, কিন্তু রাব্বীলে সেই কাজের চাপ। যাওয়া হতোনা। আমি সারাদিন বসে বসে খালি সাজতাম। রাত হলে রাব্বীল আমার সাজুগুজু শরীর জড়িয়েই ঘুমাতো। এটা অবশ্য আমার ভালোই লাগতো। প্রথম প্রথম কেন জানি অসস্থি লাগতো—নতুন পোশাক, তাও আবার কোনো কোনো দিন শাড়ি পড়েই ঘুমাতে হতো। আসতে ধিরে অভ্যাস হয়ে গেসিলো।
“কি হলো ম্যাডাম, মন খারাপ কেন? দূর দেশের অচীন বন্ধুকে চাইলে শেয়ার করতে পারেন। হয়তো আপনাকে হেল্প করতে পারবোনা। কিন্তু দেখবেন, শেয়ার করার কারণে আপনার মন অনেকটাই হালকা লাগছে।”
জীবনের প্রথমবার কেউ একজন আমার দুঃখ জানতে চাইলো। তাও যাকে আমি চিনিইনা। আসলেই সে মানুষ না অন্যকিছু তাও জানিনা। ফ্রেন্ডের মুখে শুনেছি, এখন নাকি AI এর সাথেও চ্যাট করা যাই। সে নাকি অবিকল মানুষের মতই কথা বলতে পারে। কখনো আমি নিজে AI এর সাথে চ্যাট করিনি। আমি এখন যার সাথে চ্যাট করছিস, সে আবার AI নাতো!
“টুকি। টুকি টুকি টুকিইইই।”
“হি হি হি। কি লিখছেন আপনি এসব?”
“ভাবলাম হারিয়ে গেলেন। তাই টুকি মারলাম। আছেন কিনা জানতে। যাক বাবা, অন্তত হারিয়ে জাননি।”
আমার সত্যিই কথা বলতে ইচ্ছা করছেনা। লোকটাও পিছু ছারছেনা। একটার পর একটা মেসেজ দিয়েই যাচ্ছে। উত্তর না দেওয়াই খারাপ ও লাগছে। নাজানি আমাকে নিয়ে বাজে কিছু ভাবে কিনা! অহংকারি টাইপ কিছু। কিংবা আমার উত্তর না পেয়ে মন খারাপ করছে কিনা! তাতে আমার কি! আমি কি আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেছি! সে ই নিজে এসেছে কথা বলতে। সে তো আর জানেনা, আমার জীবনের উপর দিয়ে কি যাচ্ছে। আমার এখান থেকে বেরোনো দরকার। চোখের সামনে ফোন ধরে রাখতে আর ভাল্লাগছেনা। বিগার লাগছে। সবকিছুই বিগার লাগছে। সামনে কিছু পেলে ভাঙতাম। কিছু ভাঙলে মনটা ভালো হত মনে হচ্ছে। কি ভাঙবো এখন, এই রাতে! রুমে তেমন কিছু নেই। নিজের ফোনটাকে এক আছাড় দিলে হয়। নাহ সেটা করা যাবেনা। এখন এই ফোনটাই আমার একমাত্র ভরসা। জীবন সঙ্গি।
প্রোফাইল থেকে বেরোতে যাবো, আবারো মেসেজ—-- “বন্ধু হবি? আমার জীবনে কখনো মেয়ে বন্ধু ছিলোনা। বাস্তবে বন্ধু করবো এই সাহস ও ছিলোনা। বলতে পারিস এখনো নাই। তাই অন্ধকার জগতে তোর কাছে বন্ধুত্বের হাত বাড়ালাম। চাইলে ‘না’ করে দিতেও পারিস।”
মেসেজটা পুরোই মাথার উপর দিয়ে গেলো। একেতে শুরুতেই ‘তুই’ সম্মন্ধ। সাথে ডিরেক্ট বন্ধুত্বের প্রোপোজাল। মাত্র কটা কথা হলো তার সাথে। তাও কেউ কাউকে দেখিনি, জানিওনা। আর সেকিনা ডিরেক্ট বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিলো!!!
আমি কি উত্তর দিব? কিই বা দেওয়া উচিৎ? আমারো তো কোনো ছেলে ফ্রেন্ড কখনোই ছিলোনা। ছেলে সঙ্গ বলতো একমাত্র আমার স্বামিই।
মনের মধ্যে দোটানা ভাব শুরু হইসে। কোনোই সমাধান পাচ্ছিনা। এই মুহুর্তে মাহি থাকলে ভালো হতো। সে চমৎকার একটা সলুইশান দিয়ে দিত। মাহি আমার জীবনের একমাত্র বান্ধবি। তাও ক্লাশ চলাকালিন এবং যতক্ষণ বাইরে থাকি ততক্ষণের বান্ধবি। বাসাই আসলে আমরা কেউ কারো যোগাযোগে থাকিনা। কারণ মাহির বাপ অনেক গরিব। তাকে ফোন কিনে দিতে পারেনি।
আবার মাথা ব্যাথা শুরু হলো। এবার মনে হচ্ছে মাথা ছিরে যাবে। মাকে ডাকা লাগবে। এ যেন মৃত্যুর যন্ত্রণা। মাআআআআআআআআ………।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)