26-03-2026, 07:46 PM
১দশমীর বিকেল। সমগ্র কলকাতা বাসির আজ মন খারাপের দিন। দুর্গতিনাশিনী আজ চলে যাবে। কত দিনের অপেক্ষা, কত পরিকল্পনা, কত আনন্দের আয়োজন, আজ সবকিছুর সমাপ্তি। পথে-ঘাটে, বাসে-ট্রামে আর গলিতে গলিতে, বাতাসে বাতাসে দেবির বিদায়ের করুন সুর। লোকজনের মুখ ভার হয়ে আছে, বাচ্চারাও আজ হইহল্লা-ছুটোছুটি কমিয়ে দিয়েছে। প্যান্ডেল গুলোতে আর সাউন্ড সিস্টেম বাজছে না। পুজোর দিনগুলোতে রাস্তার ধারে ব্যবসা করা দোকানদারেরাও দোকান গুটিয়ে নিচ্ছে। মাইকে এখন বিদায়ের সুর। সবার মুখ ভার।
এই কষ্টের মধ্যেও কোথাও যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব আছে। বাঙালিরা দুঃখকেও উৎযাপন করে।
দেবী মহিষাশুরমর্দীনি চলে যাচ্ছেন। তিনি বাঙালির নিজের ঘরের মেয়ে। কলকাতাবাসী তাকে মুখ ভার করে বিদায় দিতে চায় না। বুকে কষ্ট চেপে, মুখে হাসি ফুটিয়ে, নেচে গিয়ে ঢাক ঢোল কাশর বাজিয়ে দেবীকে বিদায় দিতে কাতারে কাতারে লোক নিজেদের দেবী মূর্তিকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে এসেছে। বাগবাজারের ঘাটে আজ তিল ধরার ঠাঁই নেই।
রিতম বন্ধুদের সাথে ভাসান দেখতে এসেছে। আজ সারাদিন ও পথে পথে থেকেছে। বাগবাজার, শ্যামবাজার, আহিরিটোলা, নিমতলার বিভিন্ন মন্ডপ ঘুরে ঘুরে দেখেছে। কৌতূহল হচ্ছিল, আজ অনেক বছর পর দশমী দেখছে।
এই দিনটা রিতমের কখনোই পছন্দের নয়। ছোটবেলায় ওর খুব কষ্ট হতো। কাউকে না দেখিয়ে কাদতো লুকিয়ে লুকিয়ে। এক বছরের প্রতীক্ষা যে উৎসবের জন্য এত দ্রুত শেষ হওয়ার কি দরকার? তার ওপর শেষ হয় কি না দশমীর মত একটা দিনে! কি বিচ্ছিরি একটা দিন। দিনটা কি না থাকলেই হতো না? ছোটবেলা এমনটা ভাবতো রিতম। এখন এগুলো মনে পড়লে হাসি পায়। ও কি বোকা আর আবেগপ্রবণ ছিল আগে। ও এখনো যথেষ্ট আবেগপ্রবণ।
সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিমে। বেলা বেশি নেই। অন্ধকার নামবে একটু পর। শরতের হলদে বিকেল সোনালী আলোয় মাখানো।
রিতমের সামনে গঙ্গা বয়ে চলেছে, নিশ্চুপ নিঃস্বব্দে। কলকাতার সব কটি ঘাটে আজ ভিড়। নদীতে ভেসে যাচ্ছে একের পর এক প্রতিমার কাঠামো, ফুলের মালা, সাথে বিভিন্ন ময়লা আবর্জনা। রিতম মনে মনে বলল, "আজ তোমাকে অনেক সইতে হবে নদী.”
নদী যেন মৃদু হাসলো। বলল, আজ আমার কথা ভেবো না রিতম। হাজার বছর ধরে সহ্য করছি আমি। আজ তোমাদের উৎসবের দিন। তোমরা আনন্দ করো।
ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে মাটির তৈরি প্রতিমা গুলো। মানুষের হর্ষ ধ্বনি, উলুধ্বনি, জয় মা জয় মা রব পরিবেশে এক অনাবিল ভব্যতা দান করেছে।। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অভিভূত হতে হয়।
জলে মিশে গলে যাচ্ছে প্রতিমা গুলো। মাটি মিশে যাচ্ছে গঙ্গায়। এই গঙ্গার মাটি দিয়েই মূর্তিগুলো বানানো হয়েছিল। সেগুলোই এখন গঙ্গায় মিশে যাচ্ছে। পরের বছর আবার এই গঙ্গার থেকেই মাটি তুলে আবার মূর্তি করবে কুমারেরা। কালের পরিক্রমায় দশমী আসবে, আবার জলে ভেসে যাবে মূর্তি। কি মহিমা এই নদীর। নদী তুমি ধন্য। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালীদের পূজো পেয়ে আসছো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, তুমি বাঙ্গালীদের আবেগের, তুমি বাঙ্গালীদের ভক্তির, তুমি বাঙালির শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছ, তুমি ভক্তি পেয়ে হয়েছো মহিমান্বিত।
রিতম নদীর ধারে বসে সারা সন্ধ্যা কাটালো। ওর সাথে ছিল বন্ধুরা। আড্ডা দিচ্ছিলো। রিতমের মন চলে গেছিলো অনেক দূরে, হয়তো দেবির সাথে ভেসে ভেসে হিমালয়ে। রহস্যে ঘেরা সেই দেশ, স্নিগ্ধ শুভ্র, তুষারাবৃত। হিমালয়ের কোনো এক পাহাড়েই তো নদীর উৎপত্তি, সেখানে থাকে মহাদেব! স্ত্রী পুত্রদের জন্য হয়তো অপেক্ষা করছেন তিনি।
কোন সে দেশ? কেমন দেখতে? নিশ্চয়ই সুন্দর, রহস্যময়? রিতম এক দিন যাবে সেখানে।
ঘাটতলা ফাঁকা হয়ে এলে পরও আরো অনেকক্ষণ বসে ছিল রিতম।
নদী তেমনি শান্ত, তেমনি নিশ্চুপভাবে বয়ে যাচ্ছিল। ভেসে আসছিলো শীতল বাতাস। সারাদিনের কোলাহলের পর এই ঘাট এখন নিস্তব্ধ, শুনশান। শরশর করে গাছের পাতাগুলো নড়ছিলো। কারা যেন ফিসফিস করছিল। ঘোর লেগে যাচ্ছিল। রিতমের বড্ড ঘুম পাচ্ছিল, সাথে কেউ না থাকলে এখানে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারতো।
তারপর ওরা চলে গিয়েছিল বাগবাজারের সার্বজনীন পুজোর প্যান্ডেলে। সেখানে আজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।সারা সন্ধ্যে কাটিয়ে বাড়ি ফিরবে এমন সময় বন্ধুরা ধরে আড্ডার আসরে বসিয়ে দিয়েছিলো, আড্ডা দিতে দিতে পরিবেশন করা হয়েছিল মদ আর মাটন কসা। খেয়ে নিয়েছিলো রিতম। কিভাবে যে সময় চলে গেলো, তাই ফিরতে রিতমের রাত হলো। একলা রাস্তায় এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে মনে পরল মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে ও। মধুমিতা আজ দ্রুত বাড়ি ফিরতে বলেছিল, বিকেলে একসাথে সিঁদুর খেলতে যাবে বলে। কিন্তু রিতম কথাটা ভুলেই গেছিল। এমনকি সারাদিনে মধুমিতার কথা, বাড়ির কথাও তেমন মনে পড়েনি। ওর চোখ জুড়ে দেবীর প্রতিমা, শরীরে নদীর বাতাস, প্রথম যৌন মিলনের পর শিহরণের মতো জড়িয়ে রয়েছে ওর শরীর জুড়ে।
কারো কথা মনে ছিল না আজ, যেন ও কোন মুসাফির, গায়ে উদাসীনতার চাদর জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সারাবেলা। মাঝে মাঝে ওর ভেতর এত আত্মমগ্নতা এসে ভর করে যে শেষে নিজের উপর রাগ লাগে।
হাঁটতে হাঁটতে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে হাতে নিল। ফোন চেক করে দেখলো মধুমিতা বিকেলের দিকে চারবার ফোন করেছিল। হোয়াটসঅ্যাপে বেশ কতগুলো মেসেজ, সেগুলো বিকেলে দিকে পাঠানো। এখন বোধ হল যে, মধুমিতা ষষ্ঠীর দিন গল্প করেছিল স্বামীকে সাথে নিয়ে সিঁদুর খেলার অনেক শখ। ওর বয়সী পাড়ার সব বউয়েরা নাকি নিজেদের বরকে নিয়ে এসে সিঁদুর খেলে, ধুনুচি নাচে, কত আনন্দ করে! মধুমিতার নাকি সব মিস হয়েছে এত বছর। ও সব কিছু জমিয়ে রেখেছিল কবে ওর বর আসবে আর সেগুলো ও পূরণ করবে। মধুমিতা বলেছিল, এবার দশমীতে ও অনেক আনন্দ করবে। কিন্তু দেখো রিতম মধুমিতার সেই আনন্দে কিভাবে জল ঢেলে দিল।
দ্রুত পা চালালো। আজকে আছে ওর কপালে, বউটা নিশ্চয়ই ওর উপর ক্ষেপে গেছে।
সেদিনেরই সকালবেলা। বেলা দশটা হবে হয়তো। বাইরে নীল আকাশ, আকাশ ভরা টকটকে রোদ, এর মধ্যেই বেশ গরম পড়ে গেছে। শাশুড়ি মা কমোলিনি দেবীকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল মধুমিতা। গরম ভাত, ঘি দিয়ে আলু সেদ্ধ আর কালোজিরা দিয়ে ডাল পাতুরি।
কাল সারারাত বাতের ব্যথায় ভালো ঘুমাতে পারেননি কমলিনী দেবী। তাই আজ একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছেন। রিতেশ বাবু তখন বাড়ি ছিলেন না। বাজার করতে বেরিয়েছিলেন।
কমলিনি দেবী ভাত মাখতে মাখতে বললেন, বাবু কোথায় বৌমা? ওকে যে দেখছি না।
সে আপনার ছেলেই জানে, মা। মধুমিতা নিরস কাঠকাঠ গলায় জবাব দিল। আমাকে তো কোনদিন বলে কিছু করেনা। কতবার বললাম আজকের দিনটা ঘরে থাকো। একটা কথাও যদি আমার শোনে।
এখনো ছেলেমানুষই রয়ে গেল বাবুটা। কমলিনি জানে সংসারিক ব্যাপারে কত সজাগ তার পুত্রবধূ। রিতম সকাল সকাল না খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে, এটা মধুমিতা হতে দেবে না। তারপরও কথাটা জিজ্ঞেস করলেন, খেয়ে বেরিয়েছে তো?
খেয়েছে. না খাওয়ার মতোই বলতে গেলে। ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে যাচ্ছিল। এরপর মধুমিতা কণ্ঠে বিরক্তি এনে বলল, কি যে এতো তারা আপনার ছেলের! কি রাজকার্য করছে কে জানে?
বাগ বাজারে গেছে?
তাইতো বলে গেল।
ওখানেই বড় হয়েছে যে। টান, বুঝেছ বৌমা?
শাশুড়িকে খাবার বেড়ে দিয়ে মধুমিতা তার পাশের চেয়ারেই ছুরি আর চপিং বোর্ড নিয়ে বসে গেছিলো সবজি কাটতে। পাশেই ঝুড়িতে একগাদা সবজি। কেটে কেটে একটা বাটিতে রাখছিল, আর কথা বলছিলো।
মধুমিতা বলল, যাই বলুন মা। আমার এগুলো মোটেই ভালো লাগেনা। অষ্টমীর দিন গিয়েছিলাম সেখানে ঠাকুর দেখতে। বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো আপনার ছেলে। ছোটলোক টাইপ একেকটা বন্ধু। তারউপর ময়লা জামা কাপড়, শরীর দিয়ে ভুসভুস করে গন্ধ বেরোচ্ছিল। নেশাটেশাও করে হয়তো। কিভাবে যে ওদের সাথে মেশে ও, আমি ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। আনকালচার্ড সব কটা।
ওর বন্ধুরা তো সবাই খুব ভালো বৌমা।
এরা ওর ওই বন্ধু নয় মা, ওর বন্ধুদের তো আমি চিনিই।
কি জানি, মা। আমি তোকে সবসময় ভদ্র ছেলেদের সাথেই মিশতে দেখেছি। কারো কারো আর্থিক অবস্থা ততো ভালো নয়, এটা সত্যি। ভাল পোশাক হয় তো পড়তে পারে না। কিন্তু ওরা বেশ ভালো ছেলে। পোশাক দিয়ে কি মানুষ চেনা যায়, মা?
মা, আপনার বড় বয়স হয়েছে, আর আপনি আজকালকার মানুষদের চেনেন না।
তাই হবে হয়তো। আসলে বাবুটা ছোটবেলার থেকেই এমন সরল। যাকে ভালো মনে করে তার সাথেই বন্ধুত্ব করে ফেলে। সভ্যতা ভদ্রতা দেখে না।
সেটাই। ও খুব বোকা, মা। ওই ছেলেরা না আবার জোর করে নেশা করিয়ে দেয় ওকে।
নেশা! রায় প্রায় আঁতকে উঠলেন কমলিনি দেবী।
হ্যাঁ মা। তাইতো আমার এত চিন্তা। সারাদিন ওদের সাথেই তো থাকছে।
না বাবা, দরকার নেই। তুমি ফোন দিয়ে ওকে চলে আসতে বলো, বৌমা।
কাজ করতে করতে এমনই কথা বলছিল ওরা। কিন্তু এখানে বলে রাখা দরকার যে রিতমের বন্ধুরা প্রকৃতই ভালো ছেলে। এটা ঠিক যে, ওদের আর্থিক অবস্থা ততটা ভালো নয়, ময়লা কাপড় পরে, দেখতেও সুশ্রী নয় (মধুমিতার মতে), বেকার-ভবঘুরে টাইপ, কিন্তু তাতে ওদের দোষ কম, সমাজব্যবস্থার দোষ বেশি। তার মধ্যেও কয়েকজন আছে যারা মাধ্যমিক পাসও করতে পারে নি, মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ করে একজন। ভদ্র শিক্ষিত বন্ধুও রিতমের কম নেই, মধুমিতা ওদেরই বেশি চেনে। কিন্তু এ দুই শ্রেণির মানুষদের সাথেই সমান তালে মিশতে পারে রিতম, ব্যবধান যতই বেশি থাকুক না কেন। উল্টো এদের কাছে এলে ও একটু বেশি সমাদর পায়, সবাই ওকে খাতির করে, ওর কথা শুনে লোভীর মতো।
বিকেল বেলা। সূর্যের তেজ ম্রিয়মাণ হতে শুরু করেছে। ঘনিয়ে আসছে দেবীর প্রস্থানের সময়। ঠাকুর বরণ করতে যাবে বলে মধুমিতা সেজেটেজে রেডি। সকালেই রিতমকে বলে রেখেছিল ও যেন বিকেলে উপস্থিত থাকে। একসাথে স্বামীকে নিয়ে সিঁদুর খেলতে যাবে। মধুমিতা অপেক্ষা করছিল লাল পার সাদা শাড়ি পড়ে, হাতে ঠাকুর বরণের ডালা নিয়ে। বেশ কয়েকবার ফোন দিল রিতমকে, বেজে বেজে কেটে গেল। মধুমিতা অনেকক্ষণ বসে থাকলো। বাইরে থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছিল। কান্না পাচ্ছিল ওর। সময় বয়ে যাচ্ছিলো। এত বছর পর স্বামী আসলো, তারপরেও ওকে আজ পাশে পাচ্ছে না। কি ভাগ্য ওর। আরো ফোন করলো, রিতম ধরলো না, মধুমিতা অপেক্ষা করতে লাগলো।
এরপর মধুমিতা একসময় উঠে দাঁড়ালো। শাশুড়ি মায়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ডাকল, মা?
কমলিনি দেবী বিছানার হেঁডে হেলান দিয়ে একটা বাংলা রম্য উপন্যাসের বই পড়ছিল। চোখে চশমা আটা। বাতের ব্যথা কয়েকদিন ধরে ভোগাচ্ছিল অনেক। তার ওপর অষ্টমীর দিন সাধ করে স্বামী রিতেশ বাবুর সাথে বেরিয়েছিল ঠাকুর দেখতে। হাঁটতে হয়েছে প্রচুর। ফলে বাতের ব্যথাটা আরো বেড়েছে। প্রতিবার ঠাকুর বরণ করতে পুত্রবধূর সাথে তিনিও যান। আজ যেহেতু ছেলে আছে আর তার ওপর তিনি পায়ের ব্যথায় ভুগছিলেন, তাই মধুমিতাকে আগেই বলে রেখেছিলেন যে এবার আর উনি বের হবেন না।
নিজের মনে বই পড়ছিলেন, এমন সময় মধুমিতা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলো। কমলিনী দেবী মুখ তুলে ঠিক দেবী দুর্গার মূর্তির মতই টুকটুকে সুন্দরী পুত্রবধুকে দেখতে পেলেন। ছেলে-বউ এখনোও বের হয়নি দেখে ভ্রু কুচকালেন তিনি, কি ব্যাপার বৌমা? এখনো বের হওনি যে?
মা, আপনি আমার সাথে চলুন। মধুমিতার কণ্ঠস্বর থমথমে, গম্ভীর, তির তির করে কাপছিলোও হয়তো। একা একা যেতে ভালো লাগেনা। আপনি চলুন।
কমলিনী দেবীর ভ্রু আরো কুঞ্চিত হলো। উনি বই বন্ধ করে বললেন, সে কি বৌমা! একা যাবে কেন? বাবু আছে না?
না। বলে ঠোঁট কামড়ে ধরলো মধুমিতা।
কমলিনী দেবী দেখলেন ওর মুখ কষ্টে লাল হয়ে উঠেছে। হয়তো এখনই কেঁদে ফেলবে। কমলিনী দেবী জিজ্ঞেস করলো, কোথায় ও? ফোন দাও নি? বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছিলেন তিনি।
ওর কথা বাদ দিন। আপনি একটু তৈরি হয়ে নিন, মা কষ্ট করে।
কমিনি দেবী ছেলের উপর রুষ্ট হলো। গাধা ছেলে। এত সুন্দর বউটাকে কিভাবে কষ্ট দিচ্ছে। মধুমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনিও যেন সমব্যথিত হলেন। এতগুলো বছর মেয়েটা অপেক্ষা করলো তোর জন্য, আর তুই কিনা দূরে দূরে থাকছিস। নিজের ছেলেকে বুঝতে পারেন না, সেই ছোটবেলার থেকেই। অন্য সব ছেলেদের থেকে রিতম আলাদা। ওর চিন্তাভাবনা, কথা বলা, জীবন দর্শন সবকিছু আলাদা। রিতম ছোটবেলাও ঠিক এমন করত। একা একা উদাসীর মতো ঘুরে বেড়াতো, না হলে বসে থাকতো খোলা ছাদে, নদীর পাড়ে।
সে না হয় তিনি মানলেন। আগে ছোট ছিলো করেছে। এখন তো শুধরে যাবি। নিজের দায়িত্বটা পালন করবি ঠিক করে।
বিয়ের পর তো রিতম মোটামুটি ঠিক ছিলো। লন্ডন থেকে ফিরে এসে আবার পাগলামো শুরু করলো। না, বুঝাতে হবে ছেলেকে। কথা বলতে হবে ওর সাথে। মধুমিতাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখতে তিনি কোনোভাবেই পারবেন না।
নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে সদর দরজা খুলে চুপি চুপি ঘরে প্রবেশ করেছিল রিতম। রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। মধুমিতাও নিজের ঘরে। রিতম ঘরের সামনে এসে দেখলো ঘর অন্ধকার, সব লাইট বন্ধ। অ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে ঘন অমানিশা, সবকিছু নিস্তব্ধ। যেন সুনসান ঘুমন্ত পুরী। ঘরগুলো এক একটা খোয়ার, চার দেয়ালে আবদ্ধ।
লোকজন এখানে থাকে কি করে? রিতমের তো দম বন্ধ লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে আমাজনের জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে গাছ আর গাছ যেদিকে তাকাও সবুজ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।
নাহলে আফ্রিকা, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ যেখানে দিকচক্র বাল রেখায় এসে মেশে। সেখানে গেলে হয়তো নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে। খোলা মাঠে শুয়ে থাকবে। চোখের সামনে থাকবে অনন্ত খোলা আকাশ, হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকা তারারা, সাথে নানান জন্তু জানোয়ার আর গা শিউরে দেওয়া বিভিন্ন শ্বাপদের রহস্যময় সব আর্তনাদ। মাঝে মাঝে রিতমের নাবিক হয়ে যেতে মনে চায়। বিশাল জাহাজের ডেকে যেখানে ও রাতের নক্ষত্র দেখতে দেখতে রাত জাগতে পারবে, লাল নীল গোলাপি সব তারারা ওর দিকে মিটিমিটি চাইবে। সেসব জায়গায়ইতো প্রকৃত রোমান্স, রিতমের স্বপ্নের জগত। সেখানে রিতম খুব ভালো ঘুম দেবে। এরা যে এখানে কিভাবে ঘুমায়, তা ওরাই জানে। রিতম একদিন নিশ্চয়ই সেসব জায়গায় চলে যাবে।
কিন্তু মা বাবা? মধুমিতা? এরা যে ওকে কি বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে! এদের ছাড়তেও পারবে না। মধুমিতা যদি ওকে একবিন্দু বুঝতো!
রিতম চোরের মত পা টিপে টিপে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। ঘর অন্ধকার, বেড সাইড টেবিলে থাকা টেবিল ল্যাম্পটা মৃদু হলদে আলো ছড়াচ্ছে শুধু। বিছানার এক কোনায় মধুমিতা শুয়েছিল গুটিসুটি মেরে। অন্ধকারে আবছা দেখা যাচ্ছিল ওর দেহাবয়ব। রিতম চুপচাপ বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে জামা কাপড় পরিবর্তন করে বিছানায় এসেছিল শুতে। ভেবেছিল মধুমিতা ঘুমিয়ে গেছে, ওকে আর ঘুম থেকে উঠাবে না। কিন্তু মধুমিতা ঘুমায়নি, জেগেই ছিলো। রিতমের ফেরার জন্য জন্য প্রতীক্ষা করছিল। তাই ও কাছে এসে শুতেই মধুমিতা কথা বললো, এতক্ষনে ফেরার সময় হল তোমার?
রিতম চমকে উঠলো। মধুমিতা ঘুমিয়ে আছে দেখে স্বস্তি পাচ্ছিলো। এখন কি বলবে প্রথমে তা ভেবে পেলো না। তারপর ঢোক গিলে বললো, তুমি জেগে আছো?
ঘুমিয়ে থাকলে খুশি হতে না? আমি না থাকলেই তোমার সুখ। আমি থাকায় তোমার অনেক সমস্যা তাই না?
মিতা না....
তাহলে সারাদিনও আসলে না কেন? মধুমিতার কন্ঠ হিমশীতল।
আমি আসলে....
তুমি কি?
এমন সময় রিতমের মুখ থেকে মদের গন্ধ ভেসে এলো মধুমিতার দিকে। মধুমিতা আর একপাশে ঘুরে গেলো, তুমি মদ খেয়ে এসেছো? ছি! তুমি মাতাল!
বন্ধুদের জড়াজড়িতে কয়েক পেগ হুইস্কি খেয়েছিল রিতম। কিন্তু মাতাল হবার মতো কড়া তো ছিলো না। তবে মধুমিতা যেভাবে বলল নিজের উপর সত্যিই ঘৃণা হলো রিতমের। মনের ভেতর নিজের উপর ঘৃণা নিয়েই রিতম শেষবারের মতো ডাকলো, মিতা?
মধুমিতা আর ওর দিকে ফিরল না, কথাও বললো না। উত্তর না পেয়ে রিতম বেহায়ার মতো জিজ্ঞেস করলো, আমার সাথে কথা বলবে না?
আমি ঘুমাবো। রিতম আর জোর করল না নিজের উপর ঘৃণা হতে লাগলো। নিজের দোষ বিচার করতেও গেল না। শুধু ঘৃণা হতে লাগলো।
এই কষ্টের মধ্যেও কোথাও যেন একটা উৎসব উৎসব ভাব আছে। বাঙালিরা দুঃখকেও উৎযাপন করে।
দেবী মহিষাশুরমর্দীনি চলে যাচ্ছেন। তিনি বাঙালির নিজের ঘরের মেয়ে। কলকাতাবাসী তাকে মুখ ভার করে বিদায় দিতে চায় না। বুকে কষ্ট চেপে, মুখে হাসি ফুটিয়ে, নেচে গিয়ে ঢাক ঢোল কাশর বাজিয়ে দেবীকে বিদায় দিতে কাতারে কাতারে লোক নিজেদের দেবী মূর্তিকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে এসেছে। বাগবাজারের ঘাটে আজ তিল ধরার ঠাঁই নেই।
রিতম বন্ধুদের সাথে ভাসান দেখতে এসেছে। আজ সারাদিন ও পথে পথে থেকেছে। বাগবাজার, শ্যামবাজার, আহিরিটোলা, নিমতলার বিভিন্ন মন্ডপ ঘুরে ঘুরে দেখেছে। কৌতূহল হচ্ছিল, আজ অনেক বছর পর দশমী দেখছে।
এই দিনটা রিতমের কখনোই পছন্দের নয়। ছোটবেলায় ওর খুব কষ্ট হতো। কাউকে না দেখিয়ে কাদতো লুকিয়ে লুকিয়ে। এক বছরের প্রতীক্ষা যে উৎসবের জন্য এত দ্রুত শেষ হওয়ার কি দরকার? তার ওপর শেষ হয় কি না দশমীর মত একটা দিনে! কি বিচ্ছিরি একটা দিন। দিনটা কি না থাকলেই হতো না? ছোটবেলা এমনটা ভাবতো রিতম। এখন এগুলো মনে পড়লে হাসি পায়। ও কি বোকা আর আবেগপ্রবণ ছিল আগে। ও এখনো যথেষ্ট আবেগপ্রবণ।
সূর্য ঢলে গেছে পশ্চিমে। বেলা বেশি নেই। অন্ধকার নামবে একটু পর। শরতের হলদে বিকেল সোনালী আলোয় মাখানো।
রিতমের সামনে গঙ্গা বয়ে চলেছে, নিশ্চুপ নিঃস্বব্দে। কলকাতার সব কটি ঘাটে আজ ভিড়। নদীতে ভেসে যাচ্ছে একের পর এক প্রতিমার কাঠামো, ফুলের মালা, সাথে বিভিন্ন ময়লা আবর্জনা। রিতম মনে মনে বলল, "আজ তোমাকে অনেক সইতে হবে নদী.”
নদী যেন মৃদু হাসলো। বলল, আজ আমার কথা ভেবো না রিতম। হাজার বছর ধরে সহ্য করছি আমি। আজ তোমাদের উৎসবের দিন। তোমরা আনন্দ করো।
ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে মাটির তৈরি প্রতিমা গুলো। মানুষের হর্ষ ধ্বনি, উলুধ্বনি, জয় মা জয় মা রব পরিবেশে এক অনাবিল ভব্যতা দান করেছে।। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অভিভূত হতে হয়।
জলে মিশে গলে যাচ্ছে প্রতিমা গুলো। মাটি মিশে যাচ্ছে গঙ্গায়। এই গঙ্গার মাটি দিয়েই মূর্তিগুলো বানানো হয়েছিল। সেগুলোই এখন গঙ্গায় মিশে যাচ্ছে। পরের বছর আবার এই গঙ্গার থেকেই মাটি তুলে আবার মূর্তি করবে কুমারেরা। কালের পরিক্রমায় দশমী আসবে, আবার জলে ভেসে যাবে মূর্তি। কি মহিমা এই নদীর। নদী তুমি ধন্য। যুগ যুগ ধরে বাঙ্গালীদের পূজো পেয়ে আসছো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম, তুমি বাঙ্গালীদের আবেগের, তুমি বাঙ্গালীদের ভক্তির, তুমি বাঙালির শিল্পের বিকাশ ঘটিয়েছ, তুমি ভক্তি পেয়ে হয়েছো মহিমান্বিত।
রিতম নদীর ধারে বসে সারা সন্ধ্যা কাটালো। ওর সাথে ছিল বন্ধুরা। আড্ডা দিচ্ছিলো। রিতমের মন চলে গেছিলো অনেক দূরে, হয়তো দেবির সাথে ভেসে ভেসে হিমালয়ে। রহস্যে ঘেরা সেই দেশ, স্নিগ্ধ শুভ্র, তুষারাবৃত। হিমালয়ের কোনো এক পাহাড়েই তো নদীর উৎপত্তি, সেখানে থাকে মহাদেব! স্ত্রী পুত্রদের জন্য হয়তো অপেক্ষা করছেন তিনি।
কোন সে দেশ? কেমন দেখতে? নিশ্চয়ই সুন্দর, রহস্যময়? রিতম এক দিন যাবে সেখানে।
ঘাটতলা ফাঁকা হয়ে এলে পরও আরো অনেকক্ষণ বসে ছিল রিতম।
নদী তেমনি শান্ত, তেমনি নিশ্চুপভাবে বয়ে যাচ্ছিল। ভেসে আসছিলো শীতল বাতাস। সারাদিনের কোলাহলের পর এই ঘাট এখন নিস্তব্ধ, শুনশান। শরশর করে গাছের পাতাগুলো নড়ছিলো। কারা যেন ফিসফিস করছিল। ঘোর লেগে যাচ্ছিল। রিতমের বড্ড ঘুম পাচ্ছিল, সাথে কেউ না থাকলে এখানে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারতো।
তারপর ওরা চলে গিয়েছিল বাগবাজারের সার্বজনীন পুজোর প্যান্ডেলে। সেখানে আজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।সারা সন্ধ্যে কাটিয়ে বাড়ি ফিরবে এমন সময় বন্ধুরা ধরে আড্ডার আসরে বসিয়ে দিয়েছিলো, আড্ডা দিতে দিতে পরিবেশন করা হয়েছিল মদ আর মাটন কসা। খেয়ে নিয়েছিলো রিতম। কিভাবে যে সময় চলে গেলো, তাই ফিরতে রিতমের রাত হলো। একলা রাস্তায় এলোমেলো হাঁটতে হাঁটতে মনে পরল মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে ও। মধুমিতা আজ দ্রুত বাড়ি ফিরতে বলেছিল, বিকেলে একসাথে সিঁদুর খেলতে যাবে বলে। কিন্তু রিতম কথাটা ভুলেই গেছিল। এমনকি সারাদিনে মধুমিতার কথা, বাড়ির কথাও তেমন মনে পড়েনি। ওর চোখ জুড়ে দেবীর প্রতিমা, শরীরে নদীর বাতাস, প্রথম যৌন মিলনের পর শিহরণের মতো জড়িয়ে রয়েছে ওর শরীর জুড়ে।
কারো কথা মনে ছিল না আজ, যেন ও কোন মুসাফির, গায়ে উদাসীনতার চাদর জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সারাবেলা। মাঝে মাঝে ওর ভেতর এত আত্মমগ্নতা এসে ভর করে যে শেষে নিজের উপর রাগ লাগে।
হাঁটতে হাঁটতে প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে হাতে নিল। ফোন চেক করে দেখলো মধুমিতা বিকেলের দিকে চারবার ফোন করেছিল। হোয়াটসঅ্যাপে বেশ কতগুলো মেসেজ, সেগুলো বিকেলে দিকে পাঠানো। এখন বোধ হল যে, মধুমিতা ষষ্ঠীর দিন গল্প করেছিল স্বামীকে সাথে নিয়ে সিঁদুর খেলার অনেক শখ। ওর বয়সী পাড়ার সব বউয়েরা নাকি নিজেদের বরকে নিয়ে এসে সিঁদুর খেলে, ধুনুচি নাচে, কত আনন্দ করে! মধুমিতার নাকি সব মিস হয়েছে এত বছর। ও সব কিছু জমিয়ে রেখেছিল কবে ওর বর আসবে আর সেগুলো ও পূরণ করবে। মধুমিতা বলেছিল, এবার দশমীতে ও অনেক আনন্দ করবে। কিন্তু দেখো রিতম মধুমিতার সেই আনন্দে কিভাবে জল ঢেলে দিল।
দ্রুত পা চালালো। আজকে আছে ওর কপালে, বউটা নিশ্চয়ই ওর উপর ক্ষেপে গেছে।
সেদিনেরই সকালবেলা। বেলা দশটা হবে হয়তো। বাইরে নীল আকাশ, আকাশ ভরা টকটকে রোদ, এর মধ্যেই বেশ গরম পড়ে গেছে। শাশুড়ি মা কমোলিনি দেবীকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল মধুমিতা। গরম ভাত, ঘি দিয়ে আলু সেদ্ধ আর কালোজিরা দিয়ে ডাল পাতুরি।
কাল সারারাত বাতের ব্যথায় ভালো ঘুমাতে পারেননি কমলিনী দেবী। তাই আজ একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছেন। রিতেশ বাবু তখন বাড়ি ছিলেন না। বাজার করতে বেরিয়েছিলেন।
কমলিনি দেবী ভাত মাখতে মাখতে বললেন, বাবু কোথায় বৌমা? ওকে যে দেখছি না।
সে আপনার ছেলেই জানে, মা। মধুমিতা নিরস কাঠকাঠ গলায় জবাব দিল। আমাকে তো কোনদিন বলে কিছু করেনা। কতবার বললাম আজকের দিনটা ঘরে থাকো। একটা কথাও যদি আমার শোনে।
এখনো ছেলেমানুষই রয়ে গেল বাবুটা। কমলিনি জানে সংসারিক ব্যাপারে কত সজাগ তার পুত্রবধূ। রিতম সকাল সকাল না খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে, এটা মধুমিতা হতে দেবে না। তারপরও কথাটা জিজ্ঞেস করলেন, খেয়ে বেরিয়েছে তো?
খেয়েছে. না খাওয়ার মতোই বলতে গেলে। ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে যাচ্ছিল। এরপর মধুমিতা কণ্ঠে বিরক্তি এনে বলল, কি যে এতো তারা আপনার ছেলের! কি রাজকার্য করছে কে জানে?
বাগ বাজারে গেছে?
তাইতো বলে গেল।
ওখানেই বড় হয়েছে যে। টান, বুঝেছ বৌমা?
শাশুড়িকে খাবার বেড়ে দিয়ে মধুমিতা তার পাশের চেয়ারেই ছুরি আর চপিং বোর্ড নিয়ে বসে গেছিলো সবজি কাটতে। পাশেই ঝুড়িতে একগাদা সবজি। কেটে কেটে একটা বাটিতে রাখছিল, আর কথা বলছিলো।
মধুমিতা বলল, যাই বলুন মা। আমার এগুলো মোটেই ভালো লাগেনা। অষ্টমীর দিন গিয়েছিলাম সেখানে ঠাকুর দেখতে। বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো আপনার ছেলে। ছোটলোক টাইপ একেকটা বন্ধু। তারউপর ময়লা জামা কাপড়, শরীর দিয়ে ভুসভুস করে গন্ধ বেরোচ্ছিল। নেশাটেশাও করে হয়তো। কিভাবে যে ওদের সাথে মেশে ও, আমি ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। আনকালচার্ড সব কটা।
ওর বন্ধুরা তো সবাই খুব ভালো বৌমা।
এরা ওর ওই বন্ধু নয় মা, ওর বন্ধুদের তো আমি চিনিই।
কি জানি, মা। আমি তোকে সবসময় ভদ্র ছেলেদের সাথেই মিশতে দেখেছি। কারো কারো আর্থিক অবস্থা ততো ভালো নয়, এটা সত্যি। ভাল পোশাক হয় তো পড়তে পারে না। কিন্তু ওরা বেশ ভালো ছেলে। পোশাক দিয়ে কি মানুষ চেনা যায়, মা?
মা, আপনার বড় বয়স হয়েছে, আর আপনি আজকালকার মানুষদের চেনেন না।
তাই হবে হয়তো। আসলে বাবুটা ছোটবেলার থেকেই এমন সরল। যাকে ভালো মনে করে তার সাথেই বন্ধুত্ব করে ফেলে। সভ্যতা ভদ্রতা দেখে না।
সেটাই। ও খুব বোকা, মা। ওই ছেলেরা না আবার জোর করে নেশা করিয়ে দেয় ওকে।
নেশা! রায় প্রায় আঁতকে উঠলেন কমলিনি দেবী।
হ্যাঁ মা। তাইতো আমার এত চিন্তা। সারাদিন ওদের সাথেই তো থাকছে।
না বাবা, দরকার নেই। তুমি ফোন দিয়ে ওকে চলে আসতে বলো, বৌমা।
কাজ করতে করতে এমনই কথা বলছিল ওরা। কিন্তু এখানে বলে রাখা দরকার যে রিতমের বন্ধুরা প্রকৃতই ভালো ছেলে। এটা ঠিক যে, ওদের আর্থিক অবস্থা ততটা ভালো নয়, ময়লা কাপড় পরে, দেখতেও সুশ্রী নয় (মধুমিতার মতে), বেকার-ভবঘুরে টাইপ, কিন্তু তাতে ওদের দোষ কম, সমাজব্যবস্থার দোষ বেশি। তার মধ্যেও কয়েকজন আছে যারা মাধ্যমিক পাসও করতে পারে নি, মোটরসাইকেলের গ্যারেজে কাজ করে একজন। ভদ্র শিক্ষিত বন্ধুও রিতমের কম নেই, মধুমিতা ওদেরই বেশি চেনে। কিন্তু এ দুই শ্রেণির মানুষদের সাথেই সমান তালে মিশতে পারে রিতম, ব্যবধান যতই বেশি থাকুক না কেন। উল্টো এদের কাছে এলে ও একটু বেশি সমাদর পায়, সবাই ওকে খাতির করে, ওর কথা শুনে লোভীর মতো।
বিকেল বেলা। সূর্যের তেজ ম্রিয়মাণ হতে শুরু করেছে। ঘনিয়ে আসছে দেবীর প্রস্থানের সময়। ঠাকুর বরণ করতে যাবে বলে মধুমিতা সেজেটেজে রেডি। সকালেই রিতমকে বলে রেখেছিল ও যেন বিকেলে উপস্থিত থাকে। একসাথে স্বামীকে নিয়ে সিঁদুর খেলতে যাবে। মধুমিতা অপেক্ষা করছিল লাল পার সাদা শাড়ি পড়ে, হাতে ঠাকুর বরণের ডালা নিয়ে। বেশ কয়েকবার ফোন দিল রিতমকে, বেজে বেজে কেটে গেল। মধুমিতা অনেকক্ষণ বসে থাকলো। বাইরে থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছিল। কান্না পাচ্ছিল ওর। সময় বয়ে যাচ্ছিলো। এত বছর পর স্বামী আসলো, তারপরেও ওকে আজ পাশে পাচ্ছে না। কি ভাগ্য ওর। আরো ফোন করলো, রিতম ধরলো না, মধুমিতা অপেক্ষা করতে লাগলো।
এরপর মধুমিতা একসময় উঠে দাঁড়ালো। শাশুড়ি মায়ের ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে ডাকল, মা?
কমলিনি দেবী বিছানার হেঁডে হেলান দিয়ে একটা বাংলা রম্য উপন্যাসের বই পড়ছিল। চোখে চশমা আটা। বাতের ব্যথা কয়েকদিন ধরে ভোগাচ্ছিল অনেক। তার ওপর অষ্টমীর দিন সাধ করে স্বামী রিতেশ বাবুর সাথে বেরিয়েছিল ঠাকুর দেখতে। হাঁটতে হয়েছে প্রচুর। ফলে বাতের ব্যথাটা আরো বেড়েছে। প্রতিবার ঠাকুর বরণ করতে পুত্রবধূর সাথে তিনিও যান। আজ যেহেতু ছেলে আছে আর তার ওপর তিনি পায়ের ব্যথায় ভুগছিলেন, তাই মধুমিতাকে আগেই বলে রেখেছিলেন যে এবার আর উনি বের হবেন না।
নিজের মনে বই পড়ছিলেন, এমন সময় মধুমিতা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলো। কমলিনী দেবী মুখ তুলে ঠিক দেবী দুর্গার মূর্তির মতই টুকটুকে সুন্দরী পুত্রবধুকে দেখতে পেলেন। ছেলে-বউ এখনোও বের হয়নি দেখে ভ্রু কুচকালেন তিনি, কি ব্যাপার বৌমা? এখনো বের হওনি যে?
মা, আপনি আমার সাথে চলুন। মধুমিতার কণ্ঠস্বর থমথমে, গম্ভীর, তির তির করে কাপছিলোও হয়তো। একা একা যেতে ভালো লাগেনা। আপনি চলুন।
কমলিনী দেবীর ভ্রু আরো কুঞ্চিত হলো। উনি বই বন্ধ করে বললেন, সে কি বৌমা! একা যাবে কেন? বাবু আছে না?
না। বলে ঠোঁট কামড়ে ধরলো মধুমিতা।
কমলিনী দেবী দেখলেন ওর মুখ কষ্টে লাল হয়ে উঠেছে। হয়তো এখনই কেঁদে ফেলবে। কমলিনী দেবী জিজ্ঞেস করলো, কোথায় ও? ফোন দাও নি? বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছিলেন তিনি।
ওর কথা বাদ দিন। আপনি একটু তৈরি হয়ে নিন, মা কষ্ট করে।
কমিনি দেবী ছেলের উপর রুষ্ট হলো। গাধা ছেলে। এত সুন্দর বউটাকে কিভাবে কষ্ট দিচ্ছে। মধুমিতার মুখের দিকে তাকিয়ে তিনিও যেন সমব্যথিত হলেন। এতগুলো বছর মেয়েটা অপেক্ষা করলো তোর জন্য, আর তুই কিনা দূরে দূরে থাকছিস। নিজের ছেলেকে বুঝতে পারেন না, সেই ছোটবেলার থেকেই। অন্য সব ছেলেদের থেকে রিতম আলাদা। ওর চিন্তাভাবনা, কথা বলা, জীবন দর্শন সবকিছু আলাদা। রিতম ছোটবেলাও ঠিক এমন করত। একা একা উদাসীর মতো ঘুরে বেড়াতো, না হলে বসে থাকতো খোলা ছাদে, নদীর পাড়ে।
সে না হয় তিনি মানলেন। আগে ছোট ছিলো করেছে। এখন তো শুধরে যাবি। নিজের দায়িত্বটা পালন করবি ঠিক করে।
বিয়ের পর তো রিতম মোটামুটি ঠিক ছিলো। লন্ডন থেকে ফিরে এসে আবার পাগলামো শুরু করলো। না, বুঝাতে হবে ছেলেকে। কথা বলতে হবে ওর সাথে। মধুমিতাকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখতে তিনি কোনোভাবেই পারবেন না।
নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে সদর দরজা খুলে চুপি চুপি ঘরে প্রবেশ করেছিল রিতম। রাত গভীর। সবাই ঘুমিয়ে গিয়েছিল। মধুমিতাও নিজের ঘরে। রিতম ঘরের সামনে এসে দেখলো ঘর অন্ধকার, সব লাইট বন্ধ। অ্যাপার্টমেন্ট জুড়ে ঘন অমানিশা, সবকিছু নিস্তব্ধ। যেন সুনসান ঘুমন্ত পুরী। ঘরগুলো এক একটা খোয়ার, চার দেয়ালে আবদ্ধ।
লোকজন এখানে থাকে কি করে? রিতমের তো দম বন্ধ লাগে। মাঝে মাঝে মনে হয় সবকিছু ছেড়েছুড়ে আমাজনের জঙ্গলে চলে যায়। সেখানে গাছ আর গাছ যেদিকে তাকাও সবুজ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না।
নাহলে আফ্রিকা, দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ যেখানে দিকচক্র বাল রেখায় এসে মেশে। সেখানে গেলে হয়তো নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারবে। খোলা মাঠে শুয়ে থাকবে। চোখের সামনে থাকবে অনন্ত খোলা আকাশ, হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকা তারারা, সাথে নানান জন্তু জানোয়ার আর গা শিউরে দেওয়া বিভিন্ন শ্বাপদের রহস্যময় সব আর্তনাদ। মাঝে মাঝে রিতমের নাবিক হয়ে যেতে মনে চায়। বিশাল জাহাজের ডেকে যেখানে ও রাতের নক্ষত্র দেখতে দেখতে রাত জাগতে পারবে, লাল নীল গোলাপি সব তারারা ওর দিকে মিটিমিটি চাইবে। সেসব জায়গায়ইতো প্রকৃত রোমান্স, রিতমের স্বপ্নের জগত। সেখানে রিতম খুব ভালো ঘুম দেবে। এরা যে এখানে কিভাবে ঘুমায়, তা ওরাই জানে। রিতম একদিন নিশ্চয়ই সেসব জায়গায় চলে যাবে।
কিন্তু মা বাবা? মধুমিতা? এরা যে ওকে কি বাঁধনে বেঁধে ফেলেছে! এদের ছাড়তেও পারবে না। মধুমিতা যদি ওকে একবিন্দু বুঝতো!
রিতম চোরের মত পা টিপে টিপে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। ঘর অন্ধকার, বেড সাইড টেবিলে থাকা টেবিল ল্যাম্পটা মৃদু হলদে আলো ছড়াচ্ছে শুধু। বিছানার এক কোনায় মধুমিতা শুয়েছিল গুটিসুটি মেরে। অন্ধকারে আবছা দেখা যাচ্ছিল ওর দেহাবয়ব। রিতম চুপচাপ বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে জামা কাপড় পরিবর্তন করে বিছানায় এসেছিল শুতে। ভেবেছিল মধুমিতা ঘুমিয়ে গেছে, ওকে আর ঘুম থেকে উঠাবে না। কিন্তু মধুমিতা ঘুমায়নি, জেগেই ছিলো। রিতমের ফেরার জন্য জন্য প্রতীক্ষা করছিল। তাই ও কাছে এসে শুতেই মধুমিতা কথা বললো, এতক্ষনে ফেরার সময় হল তোমার?
রিতম চমকে উঠলো। মধুমিতা ঘুমিয়ে আছে দেখে স্বস্তি পাচ্ছিলো। এখন কি বলবে প্রথমে তা ভেবে পেলো না। তারপর ঢোক গিলে বললো, তুমি জেগে আছো?
ঘুমিয়ে থাকলে খুশি হতে না? আমি না থাকলেই তোমার সুখ। আমি থাকায় তোমার অনেক সমস্যা তাই না?
মিতা না....
তাহলে সারাদিনও আসলে না কেন? মধুমিতার কন্ঠ হিমশীতল।
আমি আসলে....
তুমি কি?
এমন সময় রিতমের মুখ থেকে মদের গন্ধ ভেসে এলো মধুমিতার দিকে। মধুমিতা আর একপাশে ঘুরে গেলো, তুমি মদ খেয়ে এসেছো? ছি! তুমি মাতাল!
বন্ধুদের জড়াজড়িতে কয়েক পেগ হুইস্কি খেয়েছিল রিতম। কিন্তু মাতাল হবার মতো কড়া তো ছিলো না। তবে মধুমিতা যেভাবে বলল নিজের উপর সত্যিই ঘৃণা হলো রিতমের। মনের ভেতর নিজের উপর ঘৃণা নিয়েই রিতম শেষবারের মতো ডাকলো, মিতা?
মধুমিতা আর ওর দিকে ফিরল না, কথাও বললো না। উত্তর না পেয়ে রিতম বেহায়ার মতো জিজ্ঞেস করলো, আমার সাথে কথা বলবে না?
আমি ঘুমাবো। রিতম আর জোর করল না নিজের উপর ঘৃণা হতে লাগলো। নিজের দোষ বিচার করতেও গেল না। শুধু ঘৃণা হতে লাগলো।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)