19-03-2026, 04:19 AM
গল্প: বিপদের বন্ধু
পর্ব ৭
অধ্যায়: ভোরের আলো
রাতের গভীর অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
টিনের ছাদের ছোট ছোট ফাঁক গলে সূর্যের প্রথম আলো নিঃশব্দে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতরে। সেই আলো এসে পড়ল রাহার মুখে—নরম, কাঁচা, নতুন দিনের মতো।
ধীরে ধীরে তার চোখ খুলল।
কিছুক্ষণ সে স্থির হয়ে শুয়ে রইল।
পাশে ঘুমিয়ে আছে সাব্বির… ক্লান্ত মুখ, তবুও শান্ত। আর তার বুকের কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট রাফা।
রাহা তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে।
তার চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা।
লন্ডনের সেই ব্যস্ত জীবন… আলো ঝলমলে রাস্তা… স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা—সবকিছু যেন দূরের কোনো গল্প।
কিন্তু আজ—
এই ছোট, ভাঙাচোরা ঘরে শুয়েও সে নিজেকে একেবারে একা মনে করছে না।
কারণ তার সবকিছু—তার স্বামী, তার সন্তান—তার পাশেই আছে।
ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে রাফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“আমার ছোট্ট পৃথিবী…”—মনে মনে বলল সে।
হঠাৎ—
কুঁকড়ুঁ কুঁ…!
মোরগের তীব্র ডাক ভেঙে দিল সকালের সেই নীরবতা।
রাহা চমকে উঠল।
মনে পড়ল—
মুরগি ছাড়ার কথা।
সে আস্তে করে উঠে বসল, যাতে সাব্বির বা রাফার ঘুম না ভাঙে।
চুপচাপ দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এল।
ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি এখনো।
মাটিতে শিশির, বাতাস ঠান্ডা, চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি।
রাহা মুরগির খাঁচার দিকে এগিয়ে গেল।
খাঁচা খুলতেই মুরগি আর মোরগগুলো এক এক করে বের হয়ে এল, ডানা ঝাপটাতে লাগল।
সে নিচু হয়ে খাবার ছড়িয়ে দিল।
মুরগিগুলো ঠুকরাতে শুরু করল।
সবকিছু খুব স্বাভাবিক…
খুব শান্ত…
হঠাৎ—
পেছন থেকে কেউ শক্ত করে তার গলা চেপে ধরল।
রাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে টেনে পিছনে নিতে লাগল।
তার শরীর জমে গেল।
সে দু’হাত দিয়ে সেই হাত সরানোর চেষ্টা করল।
“কি করছেন আপনি… ছাড়ুন!”—তার গলা আটকে যাচ্ছে,
“বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে আছে…”
ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—একটা গাছের দিকে।
রামু।
তার চোখে আগুন।
“তুই… তুই আমাকে ফাঁসাইছিস!”—সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুইই ছিলি সবকিছুর পেছনে!”
তার গলায় রাগ, ঘৃণা… আর জমে থাকা অপমানের বিষ।
“মাগি! তুই আমার সব শেষ কইরা দিছিস!”—তার কণ্ঠ আরও কর্কশ হয়ে উঠল।
রাহা শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছে, তবুও নিজেকে সামলে বলল,
“আমি কিছু করি নি… আপনি আপনার কাজের ফল পাইছেন!”
রামু হঠাৎ থেমে গেল।
তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
“আর তোরা?”—সে ধীরে ধীরে বলল,
“তোরা কি পাইতেছিস এখন?”
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এল রাহার শরীরের দিকে।
রাহা স্থির হয়ে গেল।
ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী—
ক্লান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
তার অবয়বে ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য—যেটা চোখে পড়লে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তার শরীরের গড়ন ছিল সুষম, নরম আর জীবন্ত—কোনো সাজানো সৌন্দর্য নয়, বরং একেবারে বাস্তব, স্বতঃস্ফূর্ত।
রামু তাকিয়ে রইল।
তার দৃষ্টিতে ছিল এক ধরনের অশান্ত লোভ, যা সে লুকানোর চেষ্টাও করছে না।
তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
যেন তার ভেতরের জমে থাকা রাগ আর অন্য এক অদ্ভুত আকর্ষণ একসাথে মিশে গেছে।
রাহার শরীর খুবই কামুক। তার দুগ্ধ দুটি যেন বরফের পাহার। রামু উপর থেকে দেখছে। তাই সে খাঁচ খুব ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছে। এখানে তার হারিয়ে যাবার ইচ্ছা।
ঠিক তখনই—
“রামু! মোরগ-মুরগি ছাড়ছিস নাকি?”
রিনা বেগমের গলা ভেসে এল।
মুহূর্তেই রামুর হাত ঢিলে হয়ে গেল।
রাহা হঠাৎ মুক্ত হয়ে কাশতে লাগল।
“খঁ… খঁ…”
সে গলা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
“জি মা…”—সে কষ্টে বলল,
“ছাড়ছি…”
রিনা এগিয়ে এলেন।
“আরেহ রামু, তুই কাজে যাস নাই?”
রামু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
“না… আজ যামু না। ভাবতেছি, আপনাদের জন্য রান্না করতে হইবো…”
তার গলায় আবার সেই স্বাভাবিক সুর, যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু তার চোখ—
একবার তাকাল রাহার দিকে।
ক্রোধে ভরা।
চাপা হুমকি।
রাহাও তাকাল।
সরাসরি।
ভয় নেই—
শুধু কঠিন প্রতিরোধ।
কিছুক্ষণ পর পরিবেশটা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
রিনা বেগম বললেন,
“ঘুম কেমন হইছে তোমার, মা?”
রাহা ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“ভালোই, মা… নতুন জায়গা তো… একটু সময় লাগবে।”
“হ, লাগবেই”—রিনা মাথা নাড়লেন।
দূরে সূর্য একটু একটু করে উপরে উঠছে।
নতুন দিন শুরু হলো—
কিন্তু এই ভোরের নরম আলোয় যে অন্ধকার লুকিয়ে আছে,
তা এখনো কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
সকালের আলো তখন পুরো উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে, ভাতের গন্ধ, ডালের উষ্ণতা—সব মিলিয়ে এক গ্রামীণ সকালের পরিচিত আবহ।
রামু সকাল থেকেই ব্যস্ত ছিল।
রান্না শেষ করে সে সবাইকে ডাকল।
“আসেন, খাবার রেডি।”
এক এক করে সবাই এসে বসলো।
রিনা বেগম, সাব্বির—সবাই থালার সামনে।
কিন্তু—
রাফা বসে আছে মুখ গোমড়া করে।
“আমি খাবো না!”—সে গম্ভীরভাবে বলল।
রাহা একটু অবাক,
“কেন খাবে না?”
রাফা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আমি ঘোড়ায় চড়ে খাব… আমার ঘোড়া কই?”
রাফার একটা অভ্যাস আছে, সে সকালে খেলনা ঘোড়ায় চড়ে ব্রেকফাস্ট করত।
এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ।
এই গ্রামে… এখন… খেলনা ঘোড়া?
অসম্ভব।
ঠিক তখনই রামু হেসে উঠল।
“এইটা আবার সমস্যা নাকি?”—সে বলল,
“আমি আছি না?”
সবাই তার দিকে তাকাল।
রামু নিচু হয়ে হাত-পা মাটিতে রেখে বলল—
“এই যে, আমি ঘোড়া হই। দাদুভাই, ওঠো।”
রিনা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“কি বলছিস রামু! তুই এত কষ্ট করবি কেন?”
রামু হেসে বলল,
“এইটুকু কষ্ট কিসের? দাদুভাই খাইলে আমারই ভালো লাগে।”
রাফার চোখ চকচক করে উঠল।
“ঘোড়া!”—সে খুশিতে চিৎকার করে উঠে রামুর পিঠে চড়ে বসল।
“চল আমার ঘোড়া… টুক টুক!”
রামু ধীরে ধীরে উঠোনজুড়ে ঘুরতে শুরু করল।
এই দৃশ্য দেখে সবাই হালকা হেসে ফেলল।
কিন্তু—
রাহা হাসল না।
তার চোখ স্থির।
মুখ শক্ত।
ভেতরে জমে থাকা রাগ যেন ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করেছে।
রিনা বেগম খেয়াল করলেন।
“কি হইছে রাহা? কোথায় তোমার মন? রাফাকে খাওয়াবে না”
রাহা চমকে উঠে বলল,
“জ্বি মা… এই তো যাচ্ছি…”
তার গলায় একধরনের দ্বিধা।
সে একটু ইতস্তত করল, তারপর থালা নিয়ে উঠোনের দিকে গেল।
উঠোনে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
একদিকে—
একটি ছোট শিশু আনন্দে মেতে আছে।
“চল! দৌড়াও!”—রাফা হেসে বলছে।
আর অন্যদিকে—
রামু, ঘোড়ার ভঙ্গিতে হাঁটছে।
কিন্তু তার চোখ…
তার চোখ একবারও স্থির নেই।
রাহা কাছে যেতেই রামুর দৃষ্টি বদলে গেল।
সে মাথা নিচু করে থাকলেও, মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছে—
সরাসরি।
অস্বস্তিকরভাবে।
রাহা রাফাকে খাওয়াতে বসলো।
চামচে করে ভাত তুলে ধরছে—
“মুখ খোলো, মামনি…”
রাফা হাসতে হাসতে খাচ্ছে।
আর সেই সময়—
রামুর চোখ বারবার চলে যাচ্ছে রাহার দিকে।
সে যেন ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে,
যেন সময় বাড়াতে চাইছে।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে রাহার মুখে… তারপর নেমে আসে ধীরে ধীরে—
একটা অশান্ত, অস্বস্তিকর দৃষ্টি।
যেন সে শুধু তাকাচ্ছে না—
পরখ করছে।
গিলে খাচ্ছে চোখ দিয়ে।
রাহা তা বুঝতে পারছে।
প্রতিটি মুহূর্ত। প্রতিটি দৃষ্টি।
তার হাত শক্ত হয়ে গেল।
চামচ ধরা আঙুল কেঁপে উঠল সামান্য।
তার ভেতরে রাগ জমছে—
নীরব, কিন্তু তীব্র।
রামু হালকা হাসল।
একটা অদ্ভুত হাসি—
যার ভেতরে কোনো সরলতা নেই।
রাহা হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল।
সরাসরি। দৃঢ়ভাবে।
দুইজনের চোখ এক হলো।
এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল।
রাহার চোখে ছিল—
স্পষ্ট সতর্কতা।
একটা নীরব বার্তা—
“আর এক পা এগোলে, আমি চুপ থাকব না।”
রামু দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সেই চাপা হাসি রয়ে গেল।
উঠোনে তখনো রাফার হাসির শব্দ—
“টুক টুক… আমার ঘোড়া!”
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে—
একটা অদৃশ্য উত্তেজনা,
একটা অঘোষিত সংঘাত,
ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
? চলবে…
পর্ব ৭
অধ্যায়: ভোরের আলো
রাতের গভীর অন্ধকার ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
টিনের ছাদের ছোট ছোট ফাঁক গলে সূর্যের প্রথম আলো নিঃশব্দে ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতরে। সেই আলো এসে পড়ল রাহার মুখে—নরম, কাঁচা, নতুন দিনের মতো।
ধীরে ধীরে তার চোখ খুলল।
কিছুক্ষণ সে স্থির হয়ে শুয়ে রইল।
পাশে ঘুমিয়ে আছে সাব্বির… ক্লান্ত মুখ, তবুও শান্ত। আর তার বুকের কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট রাফা।
রাহা তাকিয়ে রইল দুজনের দিকে।
তার চোখে এক অদ্ভুত কোমলতা।
লন্ডনের সেই ব্যস্ত জীবন… আলো ঝলমলে রাস্তা… স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা—সবকিছু যেন দূরের কোনো গল্প।
কিন্তু আজ—
এই ছোট, ভাঙাচোরা ঘরে শুয়েও সে নিজেকে একেবারে একা মনে করছে না।
কারণ তার সবকিছু—তার স্বামী, তার সন্তান—তার পাশেই আছে।
ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে রাফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“আমার ছোট্ট পৃথিবী…”—মনে মনে বলল সে।
হঠাৎ—
কুঁকড়ুঁ কুঁ…!
মোরগের তীব্র ডাক ভেঙে দিল সকালের সেই নীরবতা।
রাহা চমকে উঠল।
মনে পড়ল—
মুরগি ছাড়ার কথা।
সে আস্তে করে উঠে বসল, যাতে সাব্বির বা রাফার ঘুম না ভাঙে।
চুপচাপ দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে এল।
ভোরের আলো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি এখনো।
মাটিতে শিশির, বাতাস ঠান্ডা, চারপাশে এক অদ্ভুত শান্তি।
রাহা মুরগির খাঁচার দিকে এগিয়ে গেল।
খাঁচা খুলতেই মুরগি আর মোরগগুলো এক এক করে বের হয়ে এল, ডানা ঝাপটাতে লাগল।
সে নিচু হয়ে খাবার ছড়িয়ে দিল।
মুরগিগুলো ঠুকরাতে শুরু করল।
সবকিছু খুব স্বাভাবিক…
খুব শান্ত…
হঠাৎ—
পেছন থেকে কেউ শক্ত করে তার গলা চেপে ধরল।
রাহা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে টেনে পিছনে নিতে লাগল।
তার শরীর জমে গেল।
সে দু’হাত দিয়ে সেই হাত সরানোর চেষ্টা করল।
“কি করছেন আপনি… ছাড়ুন!”—তার গলা আটকে যাচ্ছে,
“বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে আছে…”
ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—একটা গাছের দিকে।
রামু।
তার চোখে আগুন।
“তুই… তুই আমাকে ফাঁসাইছিস!”—সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তুইই ছিলি সবকিছুর পেছনে!”
তার গলায় রাগ, ঘৃণা… আর জমে থাকা অপমানের বিষ।
“মাগি! তুই আমার সব শেষ কইরা দিছিস!”—তার কণ্ঠ আরও কর্কশ হয়ে উঠল।
রাহা শ্বাস নিতে কষ্ট পাচ্ছে, তবুও নিজেকে সামলে বলল,
“আমি কিছু করি নি… আপনি আপনার কাজের ফল পাইছেন!”
রামু হঠাৎ থেমে গেল।
তার মুখে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
“আর তোরা?”—সে ধীরে ধীরে বলল,
“তোরা কি পাইতেছিস এখন?”
তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এল রাহার শরীরের দিকে।
রাহা স্থির হয়ে গেল।
ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী—
ক্লান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
তার অবয়বে ছিল এক ধরনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য—যেটা চোখে পড়লে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তার শরীরের গড়ন ছিল সুষম, নরম আর জীবন্ত—কোনো সাজানো সৌন্দর্য নয়, বরং একেবারে বাস্তব, স্বতঃস্ফূর্ত।
রামু তাকিয়ে রইল।
তার দৃষ্টিতে ছিল এক ধরনের অশান্ত লোভ, যা সে লুকানোর চেষ্টাও করছে না।
তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত।
যেন তার ভেতরের জমে থাকা রাগ আর অন্য এক অদ্ভুত আকর্ষণ একসাথে মিশে গেছে।
রাহার শরীর খুবই কামুক। তার দুগ্ধ দুটি যেন বরফের পাহার। রামু উপর থেকে দেখছে। তাই সে খাঁচ খুব ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছে। এখানে তার হারিয়ে যাবার ইচ্ছা।
ঠিক তখনই—
“রামু! মোরগ-মুরগি ছাড়ছিস নাকি?”
রিনা বেগমের গলা ভেসে এল।
মুহূর্তেই রামুর হাত ঢিলে হয়ে গেল।
রাহা হঠাৎ মুক্ত হয়ে কাশতে লাগল।
“খঁ… খঁ…”
সে গলা চেপে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
“জি মা…”—সে কষ্টে বলল,
“ছাড়ছি…”
রিনা এগিয়ে এলেন।
“আরেহ রামু, তুই কাজে যাস নাই?”
রামু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।
“না… আজ যামু না। ভাবতেছি, আপনাদের জন্য রান্না করতে হইবো…”
তার গলায় আবার সেই স্বাভাবিক সুর, যেন কিছুই হয়নি।
কিন্তু তার চোখ—
একবার তাকাল রাহার দিকে।
ক্রোধে ভরা।
চাপা হুমকি।
রাহাও তাকাল।
সরাসরি।
ভয় নেই—
শুধু কঠিন প্রতিরোধ।
কিছুক্ষণ পর পরিবেশটা আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
রিনা বেগম বললেন,
“ঘুম কেমন হইছে তোমার, মা?”
রাহা ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“ভালোই, মা… নতুন জায়গা তো… একটু সময় লাগবে।”
“হ, লাগবেই”—রিনা মাথা নাড়লেন।
দূরে সূর্য একটু একটু করে উপরে উঠছে।
নতুন দিন শুরু হলো—
কিন্তু এই ভোরের নরম আলোয় যে অন্ধকার লুকিয়ে আছে,
তা এখনো কেউ পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
সকালের আলো তখন পুরো উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে, ভাতের গন্ধ, ডালের উষ্ণতা—সব মিলিয়ে এক গ্রামীণ সকালের পরিচিত আবহ।
রামু সকাল থেকেই ব্যস্ত ছিল।
রান্না শেষ করে সে সবাইকে ডাকল।
“আসেন, খাবার রেডি।”
এক এক করে সবাই এসে বসলো।
রিনা বেগম, সাব্বির—সবাই থালার সামনে।
কিন্তু—
রাফা বসে আছে মুখ গোমড়া করে।
“আমি খাবো না!”—সে গম্ভীরভাবে বলল।
রাহা একটু অবাক,
“কেন খাবে না?”
রাফা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
“আমি ঘোড়ায় চড়ে খাব… আমার ঘোড়া কই?”
রাফার একটা অভ্যাস আছে, সে সকালে খেলনা ঘোড়ায় চড়ে ব্রেকফাস্ট করত।
এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ।
এই গ্রামে… এখন… খেলনা ঘোড়া?
অসম্ভব।
ঠিক তখনই রামু হেসে উঠল।
“এইটা আবার সমস্যা নাকি?”—সে বলল,
“আমি আছি না?”
সবাই তার দিকে তাকাল।
রামু নিচু হয়ে হাত-পা মাটিতে রেখে বলল—
“এই যে, আমি ঘোড়া হই। দাদুভাই, ওঠো।”
রিনা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“কি বলছিস রামু! তুই এত কষ্ট করবি কেন?”
রামু হেসে বলল,
“এইটুকু কষ্ট কিসের? দাদুভাই খাইলে আমারই ভালো লাগে।”
রাফার চোখ চকচক করে উঠল।
“ঘোড়া!”—সে খুশিতে চিৎকার করে উঠে রামুর পিঠে চড়ে বসল।
“চল আমার ঘোড়া… টুক টুক!”
রামু ধীরে ধীরে উঠোনজুড়ে ঘুরতে শুরু করল।
এই দৃশ্য দেখে সবাই হালকা হেসে ফেলল।
কিন্তু—
রাহা হাসল না।
তার চোখ স্থির।
মুখ শক্ত।
ভেতরে জমে থাকা রাগ যেন ধীরে ধীরে জ্বলতে শুরু করেছে।
রিনা বেগম খেয়াল করলেন।
“কি হইছে রাহা? কোথায় তোমার মন? রাফাকে খাওয়াবে না”
রাহা চমকে উঠে বলল,
“জ্বি মা… এই তো যাচ্ছি…”
তার গলায় একধরনের দ্বিধা।
সে একটু ইতস্তত করল, তারপর থালা নিয়ে উঠোনের দিকে গেল।
উঠোনে তখন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
একদিকে—
একটি ছোট শিশু আনন্দে মেতে আছে।
“চল! দৌড়াও!”—রাফা হেসে বলছে।
আর অন্যদিকে—
রামু, ঘোড়ার ভঙ্গিতে হাঁটছে।
কিন্তু তার চোখ…
তার চোখ একবারও স্থির নেই।
রাহা কাছে যেতেই রামুর দৃষ্টি বদলে গেল।
সে মাথা নিচু করে থাকলেও, মাঝে মাঝে চোখ তুলে তাকাচ্ছে—
সরাসরি।
অস্বস্তিকরভাবে।
রাহা রাফাকে খাওয়াতে বসলো।
চামচে করে ভাত তুলে ধরছে—
“মুখ খোলো, মামনি…”
রাফা হাসতে হাসতে খাচ্ছে।
আর সেই সময়—
রামুর চোখ বারবার চলে যাচ্ছে রাহার দিকে।
সে যেন ইচ্ছে করেই ধীরে চলছে,
যেন সময় বাড়াতে চাইছে।
তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে রাহার মুখে… তারপর নেমে আসে ধীরে ধীরে—
একটা অশান্ত, অস্বস্তিকর দৃষ্টি।
যেন সে শুধু তাকাচ্ছে না—
পরখ করছে।
গিলে খাচ্ছে চোখ দিয়ে।
রাহা তা বুঝতে পারছে।
প্রতিটি মুহূর্ত। প্রতিটি দৃষ্টি।
তার হাত শক্ত হয়ে গেল।
চামচ ধরা আঙুল কেঁপে উঠল সামান্য।
তার ভেতরে রাগ জমছে—
নীরব, কিন্তু তীব্র।
রামু হালকা হাসল।
একটা অদ্ভুত হাসি—
যার ভেতরে কোনো সরলতা নেই।
রাহা হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল।
সরাসরি। দৃঢ়ভাবে।
দুইজনের চোখ এক হলো।
এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল।
রাহার চোখে ছিল—
স্পষ্ট সতর্কতা।
একটা নীরব বার্তা—
“আর এক পা এগোলে, আমি চুপ থাকব না।”
রামু দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে সেই চাপা হাসি রয়ে গেল।
উঠোনে তখনো রাফার হাসির শব্দ—
“টুক টুক… আমার ঘোড়া!”
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে—
একটা অদৃশ্য উত্তেজনা,
একটা অঘোষিত সংঘাত,
ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
? চলবে…


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)