19-03-2026, 04:17 AM
গল্প: বিপদের বন্ধু
অধ্যায় ৫: নতুন ঠিকানা
কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে তারা পৌঁছাল রামুর বাড়িতে।
বাড়ি বললেও যেন ঠিক মানায় না—একটা পুরনো, ভাঙাচোরা টিনের ঘর। চারপাশে ঝোপঝাড়, মাটির উঠান, আর কোথাও কোথাও ফেটে যাওয়া দেওয়াল।
রামু দরজা খুলে বলল,
“আসেন… এইটাই আমার ঘর।”
ভেতরে ঢুকতেই একটা অগোছালো, অস্বস্তিকর পরিবেশ।
এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জিনিসপত্র—পুরনো কাপড়, কিছু ভাঙা আসবাব, আর মাটির গন্ধে ভরা একটা ভারী বাতাস।
রামু একটু লজ্জিত হাসি দিয়ে বলল,
“আসলে… আমি একা মানুষ তো… তাই ঠিকমতো গুছাতে পারি নাই।”
ঘরটা পুরনো টিনের।
দেখেই বোঝা যায়—অনেক বছর ধরে একই অবস্থায় আছে।
এই ঘরেই রামুর বাবা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন।
আর শহরের চাকরি চলে যাওয়ার পর—এখানে ফিরে আসা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
ঘরের গঠনটা খুব সাধারণ।
বারান্দার মতো অংশে একটা খাট।
ভেতরে দুইটা ছোট রুম—প্রতিটাতে একটা করে খাট।
বাইরে আলাদা করে একটা ছোট রান্নাঘর।
সব মিলিয়ে—একটা খুবই সাধারণ, প্রায় ভাঙাচোরা বাসস্থান।
সফিক ইসলাম ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালেন।
তার চোখে লজ্জা, কষ্ট, আর অসহায়ত্ব।
হঠাৎ তিনি এগিয়ে এসে রামুর হাত ধরলেন।
“আমি… নিঃস্ব হয়ে গেছি, রামু…”—তার গলা কাঁপছে,
“তোকে কি দিব এই সাহায্যের বিনিময়ে?”
রামু তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
“আমার কিছু লাগবে না, বড় সাহেব…”—সে শান্ত গলায় বলল,
“আপনি আমাকে ভাই বানাইছেন… বিপদে পাশে না থাকলে সেই ভাই হইলাম কেমনে?”
রিনা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
“হ্যাঁ রে রহমত… আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নাই…”
রামু হালকা হেসে বলল,
“আপনারা হয়তো আমাকে এখনো পর ভাবেন… তাই এই কথা কইতেছেন।”
তারপর ভেতরের দিকে ইশারা করে বলল,
“দুইটা রুম আছে, দুইটা খাট। আপনারা ভেতরে যান।”
এই সময় তার চোখ গিয়ে থামল রাফার উপর।
“এই যে দাদু ভাই…”—রামু এগিয়ে এসে বলল।
রাফা তখন রাহার কোলে।
রামু হাত বাড়াল—রাফাকে কোলে নেওয়ার জন্য।
কিন্তু রাফা ভয়ে সরে গেল।
তার চোখে আতঙ্ক।
এই গ্রাম… এই পরিবেশ…
আর এই মানুষ—যার চেহারা, পোশাক—সবই তার কাছে অচেনা। রাফা এর আগে রামুকে দেখেছে, কিন্তু শার্ট প্যান্টে। এভাবে ছেড়া গেঞ্জি আর লুংগিতে না।
সে জোরে রাহাকে জড়িয়ে ধরল।
রাহা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তারপর রাহা শান্ত গলায় বলল,
“গ্রামে নতুন তো… তাই একটু ভয় পাচ্ছে।”
কথাটা বলার সময় সে সরাসরি তাকাল রামুর চোখে।
রামু একটু হেসে উঠল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ… ভয় পাবেই তো…”
তার হাসিটা ছিল অদ্ভুত—কেমন যেন ভেতরে অন্য কিছু লুকানো।
“হা হা…”
রাহার ভেতরটা হঠাৎ করে অস্বস্তিতে ভরে উঠল।
এই হাসি… এই দৃষ্টি—
সে সহ্য করতে পারছে না।
রামু ঘর থেকে বের হতে হতে বলল,
“আপনারা ফ্রেশ হন… আমি রান্নার ব্যবস্থা করি।”
সে বাইরে চলে গেল—চুলা ধরানো, পানি আনা, চাল ধোয়া—এইসব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ভেতরে রাহা, সাব্বির আর রাফা ঢুকল শেষ রুমটায়।
রুমে ঢুকতেই রাহা থেমে গেল।
দেয়ালে ময়লা দাগ, কোণায় জাল, বিছানার চাদর পুরনো আর ধুলায় ভরা।
একটা অদ্ভুত গন্ধ—যেন অনেকদিন কেউ ঠিকমতো পরিষ্কার করেনি।
রাফা নাক কুঁচকে বলল,
“মা… এখানে গন্ধ…”
রাহা হালকা হাসল,
“কিছু না মামনি… আমরা ঠিক করে নেব।”
সাব্বির চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে অপরাধবোধ—
সে জানে, এই অবস্থায় আসার পেছনে অনেক কিছুই তার হাতের বাইরে ছিল।
কিন্তু তবুও—
সে নিজেকে দোষী ভাবছে।
রাহা ধীরে ধীরে হাতা গুটিয়ে নিল।
“চলো… আগে রুমটা পরিষ্কার করি।”
সে নিজেই কাজ শুরু করল।
বিছানার চাদর ঝাড়ল, জানালা খুলল, মেঝে একটু পরিষ্কার করল।
একজন বিদেশে বড় হওয়া মেয়ের জন্য এটা সহজ না—
কিন্তু তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু একটা দৃঢ়তা।
সাব্বির ধীরে বলল,
“তুমি কষ্ট পাচ্ছ?”
রাহা একটু থামল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
“কষ্ট তো আছেই… কিন্তু এখন সেটা ভাবার সময় না।”
সে তাকাল সাব্বিরের দিকে।
“আমাদের বাঁচতে হবে আগে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।
রামু একা বসে চুলার আগুনে ফুঁ দিচ্ছে।
তার চোখে আগুনের প্রতিফলন।
কিন্তু সেই আগুনের ভেতরে—
আরো কিছু আছে।
একটা অপেক্ষা।
একটা হিসেব।
একটা প্রতিশোধের শুরু।
? চলবে…
গল্প: বিপদের বন্ধু
অধ্যায় ৬: নতুন পরিবেশ
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে। গ্রামের আকাশে অন্ধকার নামছে, দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। শহরের মতো কোনো শব্দ নেই—না গাড়ির হর্ন, না মানুষের কোলাহল। সবকিছু যেন অচেনা, নিস্তব্ধ।
বাইরের রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ ভেসে আসছে।
“খাবার রেডি!”—রামুর গলা ভেসে এল।
এক এক করে সবাই বাইরে এসে বসল।
মাটির ওপর পাটি পাতা, তার ওপর থালা সাজানো।
রিনা বেগম একটু ইতস্তত করে বললেন,
“তুই এসে বস না রহমত… রাহা দিয়ে দিবে।”
রামু তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল,
“না না, এইটা কিভাবে হয়! আপনারা বসেন… আমি দিতেছি।”
রাহা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ভেতরে একটু খারাপ লাগল—
এই বাড়িতে এসে সে যেন হঠাৎ করেই অতিথি থেকে দায়িত্বশীল একজন হয়ে গেছে।
কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, কিছু বলার সুযোগ নেই।
সে এগিয়ে এসে এক এক করে সবার প্লেটে ভাত, ডাল, মাছ তুলে দিতে লাগল।
রাফা পাশে বসে কৌতূহলী চোখে সব দেখছে।
মাটিতে বসে খাওয়ার অভ্যাস তার নেই।
“মা… আমরা এখানে এভাবে খাব?”—সে আস্তে জিজ্ঞেস করল।
রাহা হেসে বলল,
“আজকে আমরা নতুনভাবে খাওয়া শিখব, ঠিক আছে?”
রাফা মাথা নাড়ল, কিন্তু তার চোখে এখনো অচেনা ভাব।
সবাই খেতে শুরু করল।
খাবার ছিল খুবই সাধারণ—ভাত, ডাল, একটা ভাজা মাছ, আর ডিমের তরকারি।
কিন্তু সেই খাবারের ভেতর একটা গ্রাম্য স্বাদ, এক ধরনের সতেজতা।
রিনা বেগম খেতে খেতে বললেন,
“মন্দ না… বরং ভালোই লাগতেছে।”
সফিক চুপচাপ খাচ্ছেন।
মাঝে মাঝে চোখ তুলে চারপাশে তাকাচ্ছেন—এই নতুন জীবনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
সবাই খাওয়া শেষ করার পর রাহা বসল খেতে।
এখন চারপাশে একটু শান্ত।
সাব্বির পাশে এসে বসে বলল,
“তুমি আগে খেতে পারতে…”
রাহা হালকা হাসল,
“সবাই আগে খাক… তাতেই ভালো লাগে।”
রাত নেমে এল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ, সবাই ধীরে ধীরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাইরে আকাশে তারা ভরা।
গ্রামের রাত—শহরের মতো আলোর ঝলকানি নেই, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি আছে।
ডিনারের সময় রামু আবার বলেছিল,
“আপনারা কোনো টেনশন করেন না। যতদিন ইচ্ছা থাকেন… এখানে কোনো কষ্ট নাই। শহরের মতো খাবারের চিন্তা নাই—গোলাভরা ধান, নদীর মাছ… মুরগি তো আছেই।”
তার গলায় আন্তরিকতা ছিল, কিন্তু কোথাও যেন একটা চাপা কিছু লুকানো।
সাব্বির তখন মাথা তুলে বলেছিল,
“না রহমত কাকা… আমরা বেশি দিন থাকব না। দেখি বাবা-মায়ের ভিসা হোক… তারপর আমরা চলে যাব।”
কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গিয়েছিল।
রামুর মুখে হাসি ছিল, কিন্তু চোখে সেটা পৌঁছায়নি।
একটা ক্ষীণ পরিবর্তন—যেটা কেউ খেয়াল করল না, শুধু রাহা ছাড়া।
হঠাৎ রামু রাহার দিকে তাকাল।
“ছোট সাহেবা…”—সে একটু থেমে বলল,
“যদি কিছু মনে না করেন… সকালে ভোরে মুরগিগুলা ছেড়ে দিবেন? আমার মনটা আর থাকে না এইসব কাজে। তাড়াতাড়ি মাঠে যেতে হয়”
রিনা বেগম সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“এইটা আমি করমু… তুই চিন্তা করিস না।”
রাহা দ্রুত বলল,
“না মা… আপনার শরীর ভালো না। আপনি কেন করবেন?”
সে রামুর দিকে তাকাল,
“আমি করে দিব সকাল হলে।”
রামু কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তার চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি—যেন সে এই উত্তরের অপেক্ষায় ছিল।
তারপর হালকা হেসে বলল,
“ঠিক আছে… তাহলে আপনার কষ্ট করতে হবে।”
রাত গভীর হলো।
সবাই নিজ নিজ ঘরে শুয়ে পড়েছে।
রাফা মায়ের পাশে ঘুমিয়ে গেছে।
রিনা বেগম আর সফিক ক্লান্ত শরীরে নিঃশব্দে শুয়ে আছেন।
সাব্বিরও চোখ বন্ধ করেছে, কিন্তু ঘুম আসছে না।
আর রাহা—
সে জেগে আছে।
তার চোখে ঘুম নেই।
এই নতুন জায়গা…
এই মানুষ…
এই নীরবতা।
সবকিছু তার ভেতরে একটা অজানা অস্বস্তি তৈরি করছে।
আর সবচেয়ে বেশি—
রামুর দৃষ্টি।
বাইরে, অন্ধকারের মধ্যে—
রামু একা বসে আছে।
তার সামনে মুরগির খাঁচা।
সে ধীরে ধীরে বলল,
“ভোরে… দেখা যাক…”
তার ঠোঁটে এক হালকা হাসি।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরে—
কিছু একটা শুরু হতে যাচ্ছে।
? চলবে…
অধ্যায় ৫: নতুন ঠিকানা
কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে অবশেষে তারা পৌঁছাল রামুর বাড়িতে।
বাড়ি বললেও যেন ঠিক মানায় না—একটা পুরনো, ভাঙাচোরা টিনের ঘর। চারপাশে ঝোপঝাড়, মাটির উঠান, আর কোথাও কোথাও ফেটে যাওয়া দেওয়াল।
রামু দরজা খুলে বলল,
“আসেন… এইটাই আমার ঘর।”
ভেতরে ঢুকতেই একটা অগোছালো, অস্বস্তিকর পরিবেশ।
এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে জিনিসপত্র—পুরনো কাপড়, কিছু ভাঙা আসবাব, আর মাটির গন্ধে ভরা একটা ভারী বাতাস।
রামু একটু লজ্জিত হাসি দিয়ে বলল,
“আসলে… আমি একা মানুষ তো… তাই ঠিকমতো গুছাতে পারি নাই।”
ঘরটা পুরনো টিনের।
দেখেই বোঝা যায়—অনেক বছর ধরে একই অবস্থায় আছে।
এই ঘরেই রামুর বাবা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছিলেন।
আর শহরের চাকরি চলে যাওয়ার পর—এখানে ফিরে আসা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
ঘরের গঠনটা খুব সাধারণ।
বারান্দার মতো অংশে একটা খাট।
ভেতরে দুইটা ছোট রুম—প্রতিটাতে একটা করে খাট।
বাইরে আলাদা করে একটা ছোট রান্নাঘর।
সব মিলিয়ে—একটা খুবই সাধারণ, প্রায় ভাঙাচোরা বাসস্থান।
সফিক ইসলাম ধীরে ধীরে চারপাশে তাকালেন।
তার চোখে লজ্জা, কষ্ট, আর অসহায়ত্ব।
হঠাৎ তিনি এগিয়ে এসে রামুর হাত ধরলেন।
“আমি… নিঃস্ব হয়ে গেছি, রামু…”—তার গলা কাঁপছে,
“তোকে কি দিব এই সাহায্যের বিনিময়ে?”
রামু তার হাতটা শক্ত করে ধরল।
“আমার কিছু লাগবে না, বড় সাহেব…”—সে শান্ত গলায় বলল,
“আপনি আমাকে ভাই বানাইছেন… বিপদে পাশে না থাকলে সেই ভাই হইলাম কেমনে?”
রিনা বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন,
“হ্যাঁ রে রহমত… আমাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নাই…”
রামু হালকা হেসে বলল,
“আপনারা হয়তো আমাকে এখনো পর ভাবেন… তাই এই কথা কইতেছেন।”
তারপর ভেতরের দিকে ইশারা করে বলল,
“দুইটা রুম আছে, দুইটা খাট। আপনারা ভেতরে যান।”
এই সময় তার চোখ গিয়ে থামল রাফার উপর।
“এই যে দাদু ভাই…”—রামু এগিয়ে এসে বলল।
রাফা তখন রাহার কোলে।
রামু হাত বাড়াল—রাফাকে কোলে নেওয়ার জন্য।
কিন্তু রাফা ভয়ে সরে গেল।
তার চোখে আতঙ্ক।
এই গ্রাম… এই পরিবেশ…
আর এই মানুষ—যার চেহারা, পোশাক—সবই তার কাছে অচেনা। রাফা এর আগে রামুকে দেখেছে, কিন্তু শার্ট প্যান্টে। এভাবে ছেড়া গেঞ্জি আর লুংগিতে না।
সে জোরে রাহাকে জড়িয়ে ধরল।
রাহা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
তারপর রাহা শান্ত গলায় বলল,
“গ্রামে নতুন তো… তাই একটু ভয় পাচ্ছে।”
কথাটা বলার সময় সে সরাসরি তাকাল রামুর চোখে।
রামু একটু হেসে উঠল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ… ভয় পাবেই তো…”
তার হাসিটা ছিল অদ্ভুত—কেমন যেন ভেতরে অন্য কিছু লুকানো।
“হা হা…”
রাহার ভেতরটা হঠাৎ করে অস্বস্তিতে ভরে উঠল।
এই হাসি… এই দৃষ্টি—
সে সহ্য করতে পারছে না।
রামু ঘর থেকে বের হতে হতে বলল,
“আপনারা ফ্রেশ হন… আমি রান্নার ব্যবস্থা করি।”
সে বাইরে চলে গেল—চুলা ধরানো, পানি আনা, চাল ধোয়া—এইসব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ভেতরে রাহা, সাব্বির আর রাফা ঢুকল শেষ রুমটায়।
রুমে ঢুকতেই রাহা থেমে গেল।
দেয়ালে ময়লা দাগ, কোণায় জাল, বিছানার চাদর পুরনো আর ধুলায় ভরা।
একটা অদ্ভুত গন্ধ—যেন অনেকদিন কেউ ঠিকমতো পরিষ্কার করেনি।
রাফা নাক কুঁচকে বলল,
“মা… এখানে গন্ধ…”
রাহা হালকা হাসল,
“কিছু না মামনি… আমরা ঠিক করে নেব।”
সাব্বির চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখে অপরাধবোধ—
সে জানে, এই অবস্থায় আসার পেছনে অনেক কিছুই তার হাতের বাইরে ছিল।
কিন্তু তবুও—
সে নিজেকে দোষী ভাবছে।
রাহা ধীরে ধীরে হাতা গুটিয়ে নিল।
“চলো… আগে রুমটা পরিষ্কার করি।”
সে নিজেই কাজ শুরু করল।
বিছানার চাদর ঝাড়ল, জানালা খুলল, মেঝে একটু পরিষ্কার করল।
একজন বিদেশে বড় হওয়া মেয়ের জন্য এটা সহজ না—
কিন্তু তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই।
শুধু একটা দৃঢ়তা।
সাব্বির ধীরে বলল,
“তুমি কষ্ট পাচ্ছ?”
রাহা একটু থামল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
“কষ্ট তো আছেই… কিন্তু এখন সেটা ভাবার সময় না।”
সে তাকাল সাব্বিরের দিকে।
“আমাদের বাঁচতে হবে আগে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।
রামু একা বসে চুলার আগুনে ফুঁ দিচ্ছে।
তার চোখে আগুনের প্রতিফলন।
কিন্তু সেই আগুনের ভেতরে—
আরো কিছু আছে।
একটা অপেক্ষা।
একটা হিসেব।
একটা প্রতিশোধের শুরু।
? চলবে…
গল্প: বিপদের বন্ধু
অধ্যায় ৬: নতুন পরিবেশ
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেছে। গ্রামের আকাশে অন্ধকার নামছে, দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। শহরের মতো কোনো শব্দ নেই—না গাড়ির হর্ন, না মানুষের কোলাহল। সবকিছু যেন অচেনা, নিস্তব্ধ।
বাইরের রান্নাঘর থেকে ভাতের গন্ধ ভেসে আসছে।
“খাবার রেডি!”—রামুর গলা ভেসে এল।
এক এক করে সবাই বাইরে এসে বসল।
মাটির ওপর পাটি পাতা, তার ওপর থালা সাজানো।
রিনা বেগম একটু ইতস্তত করে বললেন,
“তুই এসে বস না রহমত… রাহা দিয়ে দিবে।”
রামু তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল,
“না না, এইটা কিভাবে হয়! আপনারা বসেন… আমি দিতেছি।”
রাহা চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ভেতরে একটু খারাপ লাগল—
এই বাড়িতে এসে সে যেন হঠাৎ করেই অতিথি থেকে দায়িত্বশীল একজন হয়ে গেছে।
কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে, কিছু বলার সুযোগ নেই।
সে এগিয়ে এসে এক এক করে সবার প্লেটে ভাত, ডাল, মাছ তুলে দিতে লাগল।
রাফা পাশে বসে কৌতূহলী চোখে সব দেখছে।
মাটিতে বসে খাওয়ার অভ্যাস তার নেই।
“মা… আমরা এখানে এভাবে খাব?”—সে আস্তে জিজ্ঞেস করল।
রাহা হেসে বলল,
“আজকে আমরা নতুনভাবে খাওয়া শিখব, ঠিক আছে?”
রাফা মাথা নাড়ল, কিন্তু তার চোখে এখনো অচেনা ভাব।
সবাই খেতে শুরু করল।
খাবার ছিল খুবই সাধারণ—ভাত, ডাল, একটা ভাজা মাছ, আর ডিমের তরকারি।
কিন্তু সেই খাবারের ভেতর একটা গ্রাম্য স্বাদ, এক ধরনের সতেজতা।
রিনা বেগম খেতে খেতে বললেন,
“মন্দ না… বরং ভালোই লাগতেছে।”
সফিক চুপচাপ খাচ্ছেন।
মাঝে মাঝে চোখ তুলে চারপাশে তাকাচ্ছেন—এই নতুন জীবনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
সবাই খাওয়া শেষ করার পর রাহা বসল খেতে।
এখন চারপাশে একটু শান্ত।
সাব্বির পাশে এসে বসে বলল,
“তুমি আগে খেতে পারতে…”
রাহা হালকা হাসল,
“সবাই আগে খাক… তাতেই ভালো লাগে।”
রাত নেমে এল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ, সবাই ধীরে ধীরে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাইরে আকাশে তারা ভরা।
গ্রামের রাত—শহরের মতো আলোর ঝলকানি নেই, কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি আছে।
ডিনারের সময় রামু আবার বলেছিল,
“আপনারা কোনো টেনশন করেন না। যতদিন ইচ্ছা থাকেন… এখানে কোনো কষ্ট নাই। শহরের মতো খাবারের চিন্তা নাই—গোলাভরা ধান, নদীর মাছ… মুরগি তো আছেই।”
তার গলায় আন্তরিকতা ছিল, কিন্তু কোথাও যেন একটা চাপা কিছু লুকানো।
সাব্বির তখন মাথা তুলে বলেছিল,
“না রহমত কাকা… আমরা বেশি দিন থাকব না। দেখি বাবা-মায়ের ভিসা হোক… তারপর আমরা চলে যাব।”
কথাটা বলেই সে চুপ হয়ে গিয়েছিল।
রামুর মুখে হাসি ছিল, কিন্তু চোখে সেটা পৌঁছায়নি।
একটা ক্ষীণ পরিবর্তন—যেটা কেউ খেয়াল করল না, শুধু রাহা ছাড়া।
হঠাৎ রামু রাহার দিকে তাকাল।
“ছোট সাহেবা…”—সে একটু থেমে বলল,
“যদি কিছু মনে না করেন… সকালে ভোরে মুরগিগুলা ছেড়ে দিবেন? আমার মনটা আর থাকে না এইসব কাজে। তাড়াতাড়ি মাঠে যেতে হয়”
রিনা বেগম সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“এইটা আমি করমু… তুই চিন্তা করিস না।”
রাহা দ্রুত বলল,
“না মা… আপনার শরীর ভালো না। আপনি কেন করবেন?”
সে রামুর দিকে তাকাল,
“আমি করে দিব সকাল হলে।”
রামু কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তার চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি—যেন সে এই উত্তরের অপেক্ষায় ছিল।
তারপর হালকা হেসে বলল,
“ঠিক আছে… তাহলে আপনার কষ্ট করতে হবে।”
রাত গভীর হলো।
সবাই নিজ নিজ ঘরে শুয়ে পড়েছে।
রাফা মায়ের পাশে ঘুমিয়ে গেছে।
রিনা বেগম আর সফিক ক্লান্ত শরীরে নিঃশব্দে শুয়ে আছেন।
সাব্বিরও চোখ বন্ধ করেছে, কিন্তু ঘুম আসছে না।
আর রাহা—
সে জেগে আছে।
তার চোখে ঘুম নেই।
এই নতুন জায়গা…
এই মানুষ…
এই নীরবতা।
সবকিছু তার ভেতরে একটা অজানা অস্বস্তি তৈরি করছে।
আর সবচেয়ে বেশি—
রামুর দৃষ্টি।
বাইরে, অন্ধকারের মধ্যে—
রামু একা বসে আছে।
তার সামনে মুরগির খাঁচা।
সে ধীরে ধীরে বলল,
“ভোরে… দেখা যাক…”
তার ঠোঁটে এক হালকা হাসি।
কিন্তু সেই হাসির ভেতরে—
কিছু একটা শুরু হতে যাচ্ছে।
? চলবে…


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)