Thread Rating:
  • 40 Vote(s) - 3.4 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Erotic Thriller মরীচিকা ও মোহময়ী
#38
অয়ন কেবিন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর বিদিশা বেশ কিছুক্ষণ নিজের ডেস্কে স্থির হয়ে বসে রইলেন। জানলার বাইরের পড়ন্ত রোদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক চিরে। অয়নের চোখের ওই তীব্র, উগ্র আবেগ তাকে ভাবাচ্ছিল। 

ওটা কি শুধুই একজন ছেলের তার মায়ের প্রতি পজেসিভনেস? নাকি তার চেয়েও গভীর কিছু? বিদিশা বিষয়টা নিয়ে আর বেশি ভাবতে চাইলেন না, আজকের দিনটা তার নিজের। তিনি ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন।

কলকাতার ব্যস্ত ট্র্যাফিক পেরিয়ে যখন বিদিশা গড়িয়াতে নিজের বাড়িতে পৌঁছালেন, তখন সন্ধে নেমে গেছে।

বাড়ির সদর দরজা খুলে ভেতরে পা রাখতেই কলেজের সেই গমগমে, প্রাণবন্ত পৃথিবীটা যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল। চারপাশটা কেমন নিস্তব্ধ, হিমশীতল। যেন কোনো মানুষের বাড়ি নয়, একটা সাজানো গোছানো মিউজিয়াম।

রাতের খাবার খাওয়ার সময় ডাইনিং টেবিলে সেই চিরপরিচিত, দমবন্ধ করা পরিবেশ। অরুণ প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে খেয়ে চলেছেন। টিভির পর্দায় নিউজ চ্যানেলের মিউট করা দৃশ্যগুলো শুধু ঘরের নীরবতাটাকে আরও প্রকট করে তুলছে।

বিদিশা নিজের প্লেটের খাবার নাড়াচাড়া করতে করতে একবার মুখ তুলে অরুণের দিকে তাকালেন। আজ জীবনে প্রথমবার তিনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, বাইরের পৃথিবীতে একটা সম্মানজনক পেশায় যোগ দিয়েছেন। যেকোনো স্বাভাবিক বিবাহিত সম্পর্কে স্বামী অন্তত একটা প্রশ্ন করত।

"আজ আমার প্রথম দিন ছিল কলেজে," বিদিশা নীরবতা ভেঙে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন। অরুণ ভাত মাখানো হাতটা এক মুহূর্তের জন্য থামালেন। তারপর মুখ না তুলেই একটা যান্ত্রিক, নির্লিপ্ত গলায় বললেন, "ওহ। ভালো।"

ব্যস, ওইটুকুই। "কেমন কাটল?", "স্টুডেন্টরা কেমন?", "পরিবেশ কেমন?"—কোনো প্রশ্নেরই উদয় হলো না অরুণের মনে। সে আবার নিজের খাবারে মন দিল।

বিদিশার বুকের ভেতর কোনো কষ্ট হলো না। না, কোনো অভিমানও হলো না। শুধু একটা শীতল শূন্যতা গ্রাস করল তাকে। এই মানুষটির কাছে তার কোনো মূল্য নেই। তার নারীত্ব, তার মেধা, তার রূপ, সবকিছু অরুণের কাছে এখন অর্থহীন। বিদিশার হঠাৎ স্টাফরুমের সেই মুহূর্তটার কথা মনে পড়ে গেল। রাহুল বোসের চোখের ওই মুগ্ধ দৃষ্টি, তার ওই সূক্ষ্ম প্রশংসা। আর তার ঠিক বিপরীতে বসে থাকা তার নিজের স্বামী, যার কাছে সে যেন এক অদৃশ্য আসবাবপত্র মাত্র। বিদিশা নিঃশব্দে নিজের খাওয়া শেষ করে উঠে পড়লেন।

রাত এগারোটা বাজে। অরুণের স্টাডির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বিদিশা নিজের শোওয়ার ঘরে, বিছানার একপাশের সাইড-টেবিলে বসে ল্যাপটপ আর কিছু বইপত্র খুলে আগামীকালের লেকচার নোট তৈরি করছিলেন।

কিন্তু অঙ্কের জটিল সমীকরণগুলোর মাঝে তার মনে বারবার একটা মুখ ভেসে উঠছিল। 
অয়ন।

করিডোরে অয়নের ওই রাগে লাল হয়ে থাকা মুখ, তার চোখের ওই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। বিদিশা যখন তাকে 'মিস্টার চ্যাটার্জী' বলে সম্বোধন করেছিলেন, তখন অয়নের চোখে যে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা ফুটে উঠেছিল, সেটা বিদিশার মাতৃহৃদয়ে একটু হলেও আঁচড় কেটেছিল ঠিকই। 

কিন্তু তাকে কঠোর হতেই হতো। অয়নকে বুঝতে হবে, সে আর ছোট নেই। হঠাৎ বাইরে একটা দমকা হাওয়া দিল। জানলার পর্দাগুলো সজোরে উড়ে এল ঘরের ভেতর। ল্যাপটপের স্ক্রিনের আলোয় বিদিশা দেখলেন, বাইরে বেশ মেঘ করে এসেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। কলকাতার ভ্যাপসা গরমের পর এই রাতের বৃষ্টি যেন এক অদ্ভুত শান্তির বার্তা নিয়ে এল।

বিদিশা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ল্যাপটপটা বন্ধ করে তিনি ধীরে ধীরে গিয়ে দাঁড়ালেন ব্যালকনিতে। বৃষ্টির ছাঁট সোজা এসে পড়ল তার মুখে। তিনি চোখ বুজে ফেললেন। ঠান্ডা, ভিজে হাওয়া তার ফ্রেঞ্চ রোল করা চুলগুলোকে অবাধ্য করে তুলল। তার পরনের সেই মেরুন রঙের কটন সিল্কের শাড়িটা ক্রমশ ভিজে শরীরের সাথে সেঁটে যেতে শুরু করল। কালো স্লিভলেস ব্লাউজের ভেতর দিয়ে তার উষ্ণ, টানটান শরীরটা বৃষ্টির শীতল জলের স্পর্শে এক অদ্ভুত শিহরণে কেঁপে উঠল। ভিজে কাপড়ের আবরণ তার শরীরের নিখুঁত, পরিণত ভাঁজগুলোকে যেন আরও বেশি স্পষ্ট করে তুলছিল।

মাটির সোঁদা গন্ধ আর বৃষ্টির একটানা আওয়াজ। বিদিশা গ্রিল ধরে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার মনে কী চলছিল, তা ওই রাতের অন্ধকারের মতোই রহস্যময়। তিনি কি অরুণের উদাসীনতার জন্য দুঃখ পাচ্ছিলেন? নাকি, রাহুল বোসের চোখের সেই প্রশংসা তার মনে কোনো সুপ্ত বাসনার জন্ম দিচ্ছিল ? নাকি, তার ছেলের ওই উগ্র দৃষ্টি কথা মনে করে অস্বস্তিতে ভুগছিলেন ?

বিদিশা শুধু বৃষ্টিতে ভিজতে লাগলেন।

অন্যদিকে, কয়েক কিলোমিটার দূরে, কলেজের ডর্মের একটা অন্ধকার ঘরে বসে ছিল অয়ন।

তার জানলার বাইরের কাঁচ বেয়েও বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতর কোনো আলো নেই, শুধু স্ট্রিটলাইটের একটা ম্লান, হলুদ আভা জানলার কাঁচ ভেদ করে মেঝেতে এসে পড়েছে।

অয়ন নিজের বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। তার বাঁ হাতে ধরা সেই শিফন শাড়ি পরা বিদিশার ছবিটা।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি, আর অয়নের নিজের বুকের ভেতরটাও যেন যন্ত্রণার এক ভারী মেঘে ঢেকে আছে। তার চোখদুটো জ্বলছে। কিন্তু একটা অদ্ভুত বিষয় সে খেয়াল করল। জানলার ফাঁক দিয়ে আসা বৃষ্টির ছাঁট, বা তার নিজের চোখের কোণে জমে ওঠা জলের বিন্দু, কোনোকিছুই ওই ছবিটাকে ভেজাতে পারছে না। ছবিটা যেন তার ধরাছোঁয়ার বাইরে এক পবিত্র, শুষ্ক দ্বীপ। ঠিক যেমন বাস্তবে তার মা, মিস বিদিশা গাঙ্গুলি, আজ তার সমস্ত অধিকারের গণ্ডি পার করে এক ধরাছোঁয়ার বাইরের জগতে চলে গেছেন।

অয়ন একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ছবিটা সযত্নে নিজের পকেটে রেখে দিল। তারপর ডান হাত দিয়ে নিজের মোবাইলটা তুলে নিল।

স্ক্রিনের নীল আলোটা তার ঘামে ভেজা, রুক্ষ মুখের ওপর পড়ল। সে কলেজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটটা খুলল। তার আঙুলগুলো কাঁপছিল। সে সোজা চলে গেল 'ফ্যাকাল্টি' সেকশনে। তারপর 'ডিপার্টমেন্ট অফ ম্যাথমেটিক্স'।

স্ক্রিনটা একটু স্ক্রল করতেই তার হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।

পর্দায় জ্বলজ্বল করছে বিদিশার একটা অত্যন্ত সুন্দর, প্রফেশনাল ছবি। পরনে একটা হালকা রঙের শাড়ি, মুখে একটা স্মিত, আত্মবিশ্বাসী হাসি। 

ছবির নিচেই বড় বড় করে লেখা—
Name: Miss Bidisha Ganguly.
Designation: Lecturer, Advanced Mathematics.

অয়ন আরও একটু নিচে স্ক্রল করল। ফ্যাকাল্টিদের বেসিক প্রোফাইল ডিটেইলস দেওয়া আছে। সেখানে চোখ পড়তেই অয়নের মনে হলো কেউ যেন তার বুকের ভেতর একটা ধারালো বর্শা ঢুকিয়ে দিয়েছে।

Marital Status: Single.

'সিঙ্গেল'। শব্দটা স্ক্রিনের ওপর থেকে অয়নকে যেন উপহাস করে ভেংচি কাটছিল। কলেজের খাতায়, সমাজের চোখে তার মা এখন একজন 'সিঙ্গেল' নারী। তার নামের আগে 'মিস' শব্দটা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন, দায়মুক্ত।

অয়নের কানে ক্যাফেটেরিয়ায় কবীরের মুখে শোনা বিক্রম মালহোত্রার সেই নোংরা কথাগুলো আবার বাজতে শুরু করল। 'শাড়ির ভাঁজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আগুন... এক মাসের মধ্যে আমার বাইকের পেছনে...' এই 'সিঙ্গেল' আর 'মিস' লেখাটা অয়নকে ক্রমাগত খোঁচা মারতে লাগল। এর মানে হলো, কলেজের যেকোনো পুরুষ ফ্যাকাল্টি বা কলেজের ওই বিক্রমের মতো লোলুপ ছেলেরা, সবাই আইনত এবং সামাজিকভাবে বিদিশার দিকে এগোতে পারে। বিদিশাকে ডেট করতে পারে। তাকে বিছানায় তোলার স্বপ্ন দেখতে পারে। কারণ তিনি তো কারো স্ত্রী নন, তিনি তো এক 'সিঙ্গেল' উওম্যান।

সবাই তার দিকে হাত বাড়াতে পারে।

তার নিজেরই জন্মদাত্রী মা, যাকে সে একজন দেবীর মতো পুজো করে, রাতের অন্ধকারে নিজের কল্পনায় যার মতো একজন স্ত্রী সে কামনা করে, সেই নারী আজ সবার জন্য উন্মুক্ত।

স্ক্রিনের ওই 'সিঙ্গেল' লেখাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অয়নের চোয়ালের পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠল। সে কোনো রূপান্তর বা হঠাৎ কোনো বিস্ফোরণ ঘটাল না। সে শুধু অন্ধকারে বসে নিজের এই অসহায়তার অনুভূতিটাকে নীরবে হজম করতে লাগল।

কিন্তু, তার ভেতরের আগুনটা নিভল না, বরং ওই বৃষ্টির রাতের অন্ধকারে সেটা তুষের আগুনের মতো আরও ধিকিধিকি করে জ্বলতে শুরু করল।
[+] 10 users Like RockyKabir's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: মরীচিকা ও মোহময়ী - by RockyKabir - 08-03-2026, 01:09 AM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)