24-02-2026, 09:42 PM
(This post was last modified: 24-02-2026, 09:57 PM by RockyKabir. Edited 1 time in total. Edited 1 time in total.)
সপ্তম অধ্যায়
মায়ের সেই তীব্র, নীরব কান্না। যা বালিশের নরম কাপড়ের স্তরে স্তরে শুষে যাচ্ছিল। অয়নের কানে বাজছিল যেন এক তীক্ষ্ণ শঙ্খধ্বনি।
এতোক্ষণ ধরে এক বিকৃত, অন্ধকার ঘোরের মধ্যে ছিল সে, যেখানে তার আদিম প্রবৃত্তি যেন এক নিচু তলার দর্শক হয়ে তার মায়ের সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা দেখছিল। এখন বনগানি ঘর ছেড়ে চলে যেতেই সেই ঘোরটা যেন এক ঝলকে ভেঙে গেল। মাথার ভেতরে চলতে থাকা দৃশ্যের রিলটা হঠাৎই ছিঁড়ে গেল।
অয়ন বুঝতে পারল সে কী ভয়ানক ভুল করেছে। সে চেয়েছিল তার মায়ের চারিত্রিক সতীত্বের পরীক্ষা, কিন্তু সেই পরীক্ষার ফলস্বরূপ তার মা শারীরিক ও মানসিকভাবে যে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটা তাকে এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো।
অয়ন উপলব্ধি করল, তার মা, বিদিশা চ্যাটার্জী, শুধুই একজন নারী নন; তিনি তার কাছে সাক্ষাৎ দেবী। সে আজীবন নিজের মায়ের মতো একজন স্ত্রী কামনা করে এসেছে, যে হবে শান্ত, স্নিগ্ধ, আর যার ভেতরের গভীরতা হবে অফুরন্ত। আর আজ সেই দেবী এক নরকের কীটের হাতে নির্যাতিতা হচ্ছেন, আর সে কিনা নিজেকে একজন নীরব দর্শক হিসেবে রেখেছিল! ধিক্কার তার এই পুরুষত্বকে! ধিক্কার তার এই বিকৃত মানসিকতাকে!
নিজের ওপর রাগ, মায়ের জন্য সীমাহীন দুঃখ, তাঁর অসহ্য কষ্টের জন্য বনগানির ওপর এক চরম, উন্মত্ত প্রতিশোধের স্পৃহা। সবকিছু একসাথে মিশে অয়নের শিরায় শিরায় ফুটন্ত লাভা বইয়ে দিলো। এই নরকের কীট, যে তার মাকে কষ্ট দিয়েছে, যে তাঁর পবিত্র দেহকে অপবিত্র করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তার শাস্তি চাই। কেবল শাস্তি নয়, এমন শাস্তি, যা দেখে তার আত্মা পর্যন্ত ভয়ে কেঁপে উঠবে। প্রতিশোধের আগুন তার সমস্ত দ্বিধা, ভয়, আর সঙ্কোচকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই সুযোগ এসে গেল।
বনগানি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে করিডর ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, তার মন তখন চরম অপমানে ফুটছে। এই সামান্য ভারতীয় নারী তার পুরুষত্বের ওপর আঘাত হানার সাহস দেখালো! তার সমস্ত অহংকার, তার সমস্ত দম্ভ মুহূর্তে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল, সম্ভবত তার অনুচরদের কাছে গিয়ে তার রাগ ঝাড়বে, অথবা পানীয়ের মাধ্যমে নিজেকে শান্ত করবে।
অয়ন তখনো লুকানো ছিল পাশের সেই আবর্জনার ঘরে, যেখানে দেওয়ালের গর্তটা তাকে পাশের ঘরের সব দৃশ্যের সাক্ষী করেছিল। বনগানিকে দ্রুত সিঁড়ির দিকে যেতে দেখে অয়ন বুঝতে পারল এটাই সুযোগ। সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, তার চোখ তখন হিংস্রতা আর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। বনগানি দ্রুত হাঁটছিল, কিন্তু তার বিশাল দেহের কারণে তার চলার শব্দ বেশ জোরালো ছিল।
সিঁড়ির অর্ধেকটা নামতেই অয়ন তার পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বনগানি এত দ্রুত আক্রমণ আশা করেনি, সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়ন তার বিশাল পিঠে লাফিয়ে উঠে তার গলায় বাহু দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরলো যেন সেটা এক বিষধর সাপের ফাঁস। অয়ন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে, সমস্ত রাগ দিয়ে, তার মায়ের প্রতি হওয়া অত্যাচারের সমস্ত ক্রোধ দিয়ে সেই ফাঁস চেপে ধরলো।
বনগানি গোঁ গোঁ করে উঠলো। তার বিশাল দেহটা ছটফট করতে লাগলো। সে হাত দিয়ে অয়নের বাহু ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু অয়ন যেন আজ মানুষ নয়, সে যেন সাক্ষাৎ কালান্তক যম। তার শিরায় শিরায় এখন কেবল প্রতিশোধের উন্মাদনা। বনগানি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে অয়নকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু অয়ন যেন আঠার মতো সেঁটে ছিল তার পিঠে।
শ্বাসরোধের যন্ত্রণা যখন বনগানি'র চোখ কোটর থেকে ঠেলে বের করে আনছিল, তখন অয়ন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল। কণ্ঠস্বর তার অচেনা, রুক্ষ এবং ভয়ানক:
“এই তোর শাস্তি, বনগানি! আমার সতী মাকে তুই স্পর্শ করার সাহস করেছিলি? তোর এই নোংরা, কদাকার ধোন দিয়ে তুই আমার মায়ের শরীর অপবিত্র করার চেষ্টা করেছিলি? তুই আমার বাবাকে নেশার ওষুধ খাইয়ে বেহুঁশ করেছিস? তোর মতো নরকের কীটের জীবনে থাকার কোনো অধিকার নেই! এই শাস্তি আমার মায়ের প্রতি তোর অত্যাচারের জন্য! এই শাস্তি আমার বাবার অপমানের জন্য! আর এই শাস্তি তোর অহংকারের জন্য!”
অয়ন তার হাতের ফাঁস আরও শক্ত করলো, তার বাহুর পেশীগুলো পাথরের মতো কঠিন হয়ে উঠলো। বনগানি'র চোখের সামনে পৃথিবীটা তখন দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছিল। তার বিশাল দেহটা ধপ করে সিঁড়ির ধাপের ওপর লুটিয়ে পড়লো, একটা বিকট শব্দ হলো। অয়ন তখনো তার গলা চেপে ধরেছিল, যতক্ষণ না বনগানি'র শরীরটা সম্পূর্ণ নিস্তেজ, নিথর হয়ে গেল।
অয়ন দ্রুত তার পিঠ থেকে নেমে এলো। বনগানি'র মুখটা হাঁ হয়ে ছিল, চোখদুটো খোলা, যেন কোনো এক অজানা ত্রাসে স্থির হয়ে আছে। তার নাক দিয়ে এবং মুখ দিয়ে সামান্য রক্ত গড়িয়ে সিঁড়ির ওপর পড়ছিল। অয়ন হাঁপাচ্ছিল, তার বুকটা তখনো ধড়ফড় করছিল, কিন্তু তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুন কিছুটা হলেও শান্ত হয়েছিল।
তবে, বনগানি কি মরে গেছে? অয়ন ঝুঁকে তার নাকের কাছে কান নিয়ে গেল। একটা ক্ষীণ, দুর্বল নিঃশ্বাস পড়ছে। না, সে মরেনি, কিন্তু সে এখন মৃত্যুর কাছাকাছি।
এই রক্তাক্ত, বেহুঁশ দৈত্যকে দেখে অয়নের সম্বিৎ ফিরল। সে একা এই পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না। গার্ডরা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। তার মাকে এখনই তার দরকার। বনগানি'র এই দশা দেখে তার মা-কে আর একা ঘরে রাখা ঠিক হবে না।
অয়ন দ্রুত পায়ে তিনতলার করিডর ধরে ছুটলো। মায়ের ঘরের দরজায় গিয়ে সে দুটো মৃদু টোকা দিলো—ঠক... ঠক...
ভেতরের ঘরে বিদিশা তখনো বালিশে মুখ গুঁজে পড়েছিলেন। বনগানি চলে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সমস্ত ভেতরের বাঁধন ভেঙে গেছে। বাইরে তিনি যে ইস্পাত-কঠিন তেজ দেখিয়েছিলেন, ভেতরে তিনি ততটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
তাঁর মনে তখন এক তীব্র ঝড় বইছে। তাঁর শরীরটা তখনো বনগানি'র নোংরা স্পর্শে যেন জ্বলে যাচ্ছিল। কাল সকালে তাঁর স্বামী অরুণ আর তাঁর সন্তান অয়ন চলে যাবে। এই কথা ভাবতেই তাঁর হৃদয়ে যেন এক অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হলো। তিনি স্বামীকে ভালোবাসেন, নিজের এই ছোট্ট পরিবারটিকে ভালোবাসেন।
তাদের জীবন বাঁচাতে তিনি নিজের সবথেকে মূল্যবান সতীত্বকে আহুতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কি পারবেন এই নরকের কীটের সাথে থাকতে? প্রতিদিন তার প্রেমিকা সেজে, তার যৌনসঙ্গী হয়ে? সে তো তাকে বলেছে, সে আর অত্যাচার করবে না, সে তার সঙ্গে প্রেম করবে। কিন্তু বনগানি'র মতো এক হিংস্র, পৈশাচিক ব্যক্তির সাথে প্রেম! সে কি সম্ভব?
তাঁর মনে হলো, এভাবে বাঁচার চাইতে মরে যাওয়া কি ভালো নয়? কেন তিনি বনগানি'র শর্ত মেনে নিলেন? তিনি যদি মারা যেতেন, তবে তাঁর স্বামী-সন্তান হয়তো কিছুদিন কষ্ট পেতেন, কিন্তু তাঁকে এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না। মরতে তিনি ভয় পান না, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বনগানি যদি তাঁর স্বামী-সন্তানের কোনো ক্ষতি করে? এই ভয়টাই তাকে আটকে রেখেছিল। তিনি মরতে চান না, তিনি বাঁচতে চান। তাঁর স্বামী-সন্তানকে নিরাপদে রাখার জন্য।
বিদিশা ধীরে ধীরে বালিশ থেকে মাথা তুললেন। তাঁর চোখদুটো ফোলা, গাল বেয়ে লবণের জল শুকিয়ে গেছে। তিনি অস্ফুটে নিজের মনেই বললেন, "হে কৃষ্ণ, তুমি জানো আমি তোমার কত বড় ভক্ত। তুমি আমার পতিব্রতা ধর্ম রক্ষা করো, প্রভু।"
ঠিক সেই সময়েই দরজায় সেই মৃদু আওয়াজটা হলো—ঠক... ঠক...
বিদিশা চমকে উঠলেন। তাঁর হৃদস্পন্দন দ্রুত হলো। তাঁর মনে এক শীতল স্রোত বইল। কে হতে পারে? বনগানি ফিরে এলো? এত তাড়াতাড়ি! তবে কি তাঁর চুক্তির সময় শেষ? তবে কি তাঁর সর্বনাশের সময় উপস্থিত?
তিনি তাঁর আকর্ষণীয় ঠোঁট কামড়ালেন। এবার বুঝি আর রক্ষা নেই। বনগানি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে মানে নিশ্চয়ই সে তার রাগ মেটাতে এসেছে, বা হয়তো তার শরীর ভোগ করতে।
হঠাৎই দরজার ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সেটা তাঁর চেনা, অত্যন্ত চেনা!
“মা, দরজা খোলো। আমি অয়ন।”
বিদিশার চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। অয়ন! সে এখানে কী করছে? বনগানি তো বলেছিল সে ম্যানশন ছেড়ে পালিয়েছিল! এক তীব্র ভয় তাঁর বুকে চেপে বসলো। অয়নকে যদি বনগানি বা তার অনুচরেরা দেখে ফেলে, তবে তো বনগানি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করবে না। সে তাদের দু'জনকেই মেরে ফেলবে!
বিদিশা যেন এক বিদ্যুতের ঝলকে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। তাঁর মনে পড়ল, তিনি এখন নগ্ন! তাঁর গায়ে কোনো পোশাক নেই! দ্রুত তিনি পাশে রাখা বিছানার চাদরটা টেনে নিয়ে কোনোমতে তাঁর শরীরে জড়িয়ে নিলেন।
চাদরটা বুকে আঁকড়ে ধরে তিনি দ্রুত পায়ে দরজার কাছে গেলেন, সাবধানে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিলেন। অয়ন তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখেমুখে উত্তেজনা আর উদ্বেগের ছাপ।
“বাবা! তুই এখানে কী করছিস?” বিদিশা ফিসফিস করে বললেন, তাঁর কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক। তিনি অয়নকে হাত দিয়ে ইশারা করলেন যেন সে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। “জলদি পালা বাবা! বনগানি যদি তোকে দেখে ফেলে, তবে তো...”
অয়ন গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো। তার চোখে সেই একই তেজ, যা কিছুক্ষণ আগে বিদিশার চোখেও ছিল, কিন্তু এখন তাতে এক শীতল সংকল্পের ছাপ।
“আমি পালাবো না, মা,” অয়ন শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল। “বনগানি আর কাউকে দেখতে পাবে না। আমি ওকে শাস্তি দিয়েছি।”
বিদিশা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। “কী বলছিস তুই! কী করেছিস তুই?”
অয়ন সংক্ষেপে বলল যে সে সিঁড়ির ওপর বনগানিকে শ্বাসরোধ করে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে এসেছে। তার এখন জ্ঞান নেই, নিঃশ্বাস চলছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।
বিদিশা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এইটুকু ছেলে তার(বনগানির চেহারা অয়নের চেয়ে তিনগুণ বড়), সে এমন এক বিশাল, হিংস্র দৈত্যের ওপর এমন ভয়ংকর আক্রমণ করেছে! তাঁর চোখে অবিশ্বাস, ভয়, কিন্তু তার সাথে মিশে ছিল এক চাপা গর্বের ঝলক।
“মা, ও এখন নিচে সিঁড়ির ওপর পড়ে আছে,” অয়ন বলল, তার কণ্ঠে এবার দ্রুততা। “আমাদের দ্রুত কিছু একটা করতে হবে। ওকে সরানো দরকার। আমার সাহায্য দরকার, মা।”
বিদিশা দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মাথা ঘুরছে। এতোক্ষণে তাঁর সমস্ত প্রতিরোধ, সমস্ত বুদ্ধি যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই মুক্তি! এভাবে, তাঁর ছেলের হাতে?
“আমাকে একটু সময় দে, বাবা,” বিদিশা দুর্বলভাবে বললেন। তিনি চাদরটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন।
অয়ন বুঝতে পারল তার মা এখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। তাছাড়া, সে শেষবার তার মাকে নগ্ন দেখেছিল। এখন চাদরের নিচে তাঁর কোনো পোশাক নেই। মা পোশাক পরার জন্য সময় চাইছেন। সেই মুহূর্তে অয়নের মনে আবার বনগানি'র ওপর এক বন্য রাগ জেগে উঠলো। তার মায়ের এমন অসহায় অবস্থা, তার মায়ের এই মানসিক বিপর্যস্ততা—সবকিছুর জন্য দায়ী ওই পিশাচটা! অয়ন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো: সে আর কখনো তার মাকে কষ্ট পেতে দেবে না। কখনো নয়!
অয়ন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর রাখতে লাগলো। সে বুঝতে পারছিল, সময় চলে যাচ্ছে।
বিদিশা দ্রুত ঘরে চোখ বোলালেন। ওয়ারড্রোব! হ্যাঁ, ঘরের কোণে একটা বড় ওয়ারড্রোব আছে। তিনি চাদরটা এক হাতে ধরে রেখে দ্রুত ওয়ারড্রোবের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর মন এখন চরম উত্তেজনায় কাঁপছে। এক মুহূর্ত আগে তিনি আত্মহত্যার কথা ভাবছিলেন, আর এখন তাঁর ছেলে তাঁকে এমন এক অপ্রত্যাশিত মুক্তি এনে দিয়েছে। ছেলের ওপর তাঁর গর্ব হচ্ছিল, আবার এই গোপন, ভয়ংকর কাজের জন্য এক চাপা লজ্জাও অনুভব হচ্ছিল।
ওয়ারড্রোবের পাল্লা ধরে টানতেই সেটা খুলে গেল। ভেতরে নানা ধরনের পোশাক রাখা, সম্ভবত বনগানি'র বিভিন্ন সঙ্গিনীদের জন্য। বিদিশা ভাবলেন, ভেতরে যা আছে, তাই দিয়েই কাজ চালাতে হবে। এখন শালীনতা বা পছন্দের কোনো প্রশ্ন নেই, এখন শুধু বাঁচার প্রশ্ন।
খুঁজতে খুঁজতে তাঁর হাতে বেশ কিছু পোশাক উঠে এলো। সেগুলো সবই ছিল পশ্চিমা ধাঁচের, কোনো শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ নেই। একটা হাতে উঠে এলো টাইট ফিটিং ডেনিম জিনসের প্যান্ট, তার সাথে একটি ছোট, লাল রঙের ক্রপ টপ। টপটা এতো ছোট যে তাঁর নির্মেদ পেট অনেকটা দেখা যাবে।
“হায় ঈশ্বর!” বিদিশা অস্ফুটে বললেন। এই ধরনের পোশাক তিনি জীবনেও পরেননি! তাঁর সংস্কৃতি, তাঁর রুচি। কোনোটাই এই পোশাককে সমর্থন করে না। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। এটা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। এই পোশাক পরেই তাকে দৌড়াতে হতে পারে, কাজ করতে হতে পারে।
তিনি দ্রুত হাতে সেই টাইট জিনসের প্যান্ট এবং ক্রপ টপ পরে নিলেন। তাঁর সুগঠিত, ভরাট নিতম্ব জিনসের মধ্যে যেন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠলো, আর ক্রপ টপের নিচে তাঁর নির্মেদ পেটটা সামান্য দেখা যাচ্ছিল। আয়নায় নিজের এই নতুন, সাহসী রূপ দেখে তিনি এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে পড়ল তাঁর স্বামীর বিপদ, তাঁর সন্তানের আত্মত্যাগ।
অয়ন তখন বাইরে অপেক্ষা করছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন অনেকগুলো ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, যদিও আসলে তা ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। এমন সময় দরজার পাল্লাটা নড়ে উঠলো।
সে একটু অবাক হলো। মা এত তাড়াতাড়ি পোশাক খুঁজে পেয়ে গেলেন?
বিদিশা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
অয়ন মায়ের দিকে তাকালো, আর তার চোখদুটো যেন অবিশ্বাস্যকরভাবে বড় বড় হয়ে গেল। এই কি তার সেই শাড়ি-পরা, স্নিগ্ধ, লাজুক মা? টাইট জিনস আর লাল টপে তাঁর উন্নত, ভরাট শরীরটা যেন এক নতুন মূর্তিতে উদ্ভাসিত হয়েছে। এক মুহূর্তে তাঁকে মনে হলো কোনো সিনেমার অ্যাকশন হিরোইন বা ফ্যাশন মডেল।
বিদিশা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য লজ্জা পেলেন। অয়নের চোখে যে বিস্ময় এবং মুগ্ধতা, তা তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু অয়ন তো তাঁরই সন্তান। তাঁর এই অবস্থার জন্য অয়নের কোনো দোষ নেই।
“চলো বাবা,” বিদিশা আর দেরি করলেন না। তাঁর কণ্ঠে এখন কোনো দুর্বলতা নেই, আছে এক শীতল, দৃঢ় সংকল্প। “ওদের ব্যবস্থা করার আগে অরুণকে এখান থেকে সরাতে হবে।”
তাঁরা দুজনে তাড়াতাড়ি করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এলেন। বনগানি তখনো সেখানেই নিথর হয়ে পড়ে ছিল। অয়নের কাজটা একদম নিখুঁত ছিল। সে শুধু শাস্তি দেয়নি, সে একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বনগানি'র বিশাল, কদাকার দেহটা সিঁড়ির ওপর পড়ে ছিল, তার মুখ থেকে সামান্য রক্ত শুকিয়ে গেছে। বিদিশার মুখে ঘৃণা ফুটে উঠলো। এই সেই নরকের কীট, যে তাঁর স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাঁর সতীত্ব নষ্ট করতে চেয়েছিল।
বিদিশা নিচু হলেন। তাঁর টাইট জিনসের প্যান্টে তাঁর সুডৌল পাছা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। তিনি বনগানি'র নাকের কাছে কান নিয়ে গেলেন। ক্ষীণ নিঃশ্বাস চলছে। সে মরেনি।
বিদিশার চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। সে মরেনি, কিন্তু তাকে মরতে হবে। আর মরার আগে সে এমন শাস্তি পাবে, যা সে কোনোদিনও ভুলবে না!
তিনি এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। নিজের ডান পা তুলে নিলেন, তাঁর সমস্ত ক্রোধ, সমস্ত ঘৃণা আর সমস্ত অপমান এক করে তিনি সজোরে বনগানি'র লিঙ্গে লাথি মারলেন!
ধুপ করে একটা চাপা শব্দ হলো। বনগানি'র শরীরটা কেঁপে উঠলো, আর তার মুখ থেকে এক তীব্র, চাপা গোঙানি বেরিয়ে এলো।
বিদিশা থামলেন না। তার পায়ের পর পা, লাথির পর লাথি মারতে লাগলেন সেই নিথর দেহের ওপর পড়ে থাকা বনগানি'র নোংরা লিঙ্গে।
“তুই আমার স্বামী-সন্তানের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলি? তুই আমার শরীর নিয়ে খেলা করতে চেয়েছিলি, শুয়োরের বাচ্চা? তোর ওই ধোন আমি কেটে দেবো! তোর পুরুষত্ব আমি নষ্ট করে দেবো! নে, নে, নে, তোর এই পাপের ফল ভোগ কর!”
বিদিশার এই তেজিয়ান রূপ দেখে অয়ন যেন পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। এই নারী! এই কি তার সেই শান্ত, ধীর স্থির মা? এখন তিনি যেন এক ভয়ঙ্কর রুদ্রাণী।
আস্তে আস্তে বনগানি নিস্তেজ হয়ে পড়লো। তার লিঙ্গ থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল। সে তখন যন্ত্রণায় কেবল গোঙাচ্ছিল। কিন্তু বিদিশার রাগ একটুও কমেনি।
তিনি তখনো বনগানিকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে চলেছেন।
“হারামজাদা! কুত্তার বাচ্চা! তুই ভেবেছিলি তুই আমার স্বামী-সন্তানকে মেরে ফেলবি? তুই ভেবেছিলি তুই আমার সতীত্ব নষ্ট করবি? তোর মতো কীট নরকেরও অযোগ্য! তোর সাত পুরুষের পাপের ফল তোকে ভোগ করতে হবে!”
অয়ন আবার অবাক হলো। সে কখনো মাকে গালাগাল দিতে শোনেনি। এই মুহূর্তে তার মা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ।
বনগানি'র অত্যাচার আর নিজের পরিবারের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসাই তাঁর ভেতরের এই রুদ্র শক্তিকে জাগিয়ে তুলেছে।
অয়ন আস্তে আস্তে বিদিশাকে ডাকলো, “মা! মা! যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামো!”
বিদিশার সম্বিৎ ফিরল। তিনি হাঁপাচ্ছিলেন, তাঁর চোখদুটো ক্রোধে জ্বলছিল। তিনি পায়ের লাথি থামালেন।
অয়ন বিদিশাকে তাঁদের কর্তব্যের কথা মনে করাল।
“মা, আগে বাবাকে নিয়ে বেরোতে হবে। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। বনগানি'র নিঃশ্বাস চলছে, কিন্তু ও আর নড়তে পারবে না। কিন্তু গার্ডরা...”
বিদিশা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর সমস্ত শরীরে যেন এক শীতলতা ফিরে এলো। তিনি মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ, অরুণ। আগে অরুণ।”
তাঁরা দুজনে মিলে বনগানি'র বিশাল দেহটা টেনেহিঁচড়ে সিঁড়ির নিচে একটি আড়াল করা স্টোররুমে ফেলে তালা দিয়ে দিল। বনগানি'র কোনো নড়াচড়া করার ক্ষমতা ছিল না।
এবার গার্ড।
অয়ন বলল, “মা, গার্ডরা নিচে আছে। ওদের না সরালে বাবাকে নিয়ে বেরোনো অসম্ভব। বনগানি'র ড্রিংকেও তো ওষুধ মেশানো ছিল। আমরা হয়তো ওদেরও...”
বিদিশা মাথা নাড়লেন। “না, বাবা। রক্তপাত আর নয়। তোর কাজটা তোকে করতেই হতো। কিন্তু বাকিদের ওপর আর আক্রমণ নয়। বুদ্ধি দিয়ে কাজ করতে হবে।”
বিদিশা এবার অয়নকে নিয়ে দোতলার হলঘরে এলেন। অরুণ তখনো বেহুঁশ হয়ে সোফার ওপর পড়েছিলেন। গার্ড দুজন তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তাদের চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছিল তারাও কিছুটা অস্বাভাবিক।
বিদিশা দ্রুত সেই আফ্রিকান মেয়েটার কাছে গেলেন, যে মেয়েটা তাকে ড্রিংক খাইয়েছিল আর বনগানি'র সঙ্গে হেসেছিল। বিদিশার মনে পড়ল, এই মেয়েটাও ওই নরকের কীটের সঙ্গী। এই মেয়েটারও প্রতিশোধ চাই।
বিদিশা মেয়েটার কাছে গিয়ে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। মেয়েটা হাসি মুখে তাকালো। বিদিশা এবার তার কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন। আফ্রিকান মেয়েটা চোখ বড় বড় করে বিদিশার দিকে তাকালো।
বিদিশা এবার জোরে হেসে উঠলেন। সেই হাসি ছিল তীব্র, ভয়ানক। অয়ন শুনতে না পেয়ে কৌতূহলী হয়ে কাছে যেতে বিদিশার আংশিক কথা ওর কানে এল।
“...নয়তো কাল সকালে তোমার কপালে কী আছে, তা আমি জানি না, বোন।”
আফ্রিকান মেয়েটার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সে ভয় পেয়েছে। সে দ্রুত বিদিশার হাত ধরলো।
বিদিশা মেয়েটাকে নিয়ে গার্ড দুটির কাছে গেলেন। তাদের ড্রিংকেও ওষুধ মেশানোর পরিকল্পনা করলেন। মেয়েটাকে দিয়ে তাদের ড্রিংকে ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দুটো গার্ডও বেহুঁশ হয়ে পড়লো।
এবার পথ পরিষ্কার। অয়ন আর বিদিশা মিলে কোনোমতে অরুণকে ধরে বাইরে গাড়িতে উঠালেন। লিমুজিনটা তখনো বাইরেই ছিল। ড্রাইভারকে বিদিশা দ্রুত হোটেলের দিকে যেতে বললেন, তার কণ্ঠস্বরে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে ড্রাইভার কোনো প্রশ্ন করতে সাহস পেল না।
হোটেলে পৌঁছে টাকাপয়সা আর অল্প জামাকাপড় নিয়ে ওরা সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টের পথে রওনা দিলেন। বনগানি বলেছিল, পুলিশ ওদের পকেটে থাকে। তাই এক মুহূর্তও ইতালি বা আব্রুজ্জিতে থাকা নিরাপদ নয়।
মায়ের সেই তীব্র, নীরব কান্না। যা বালিশের নরম কাপড়ের স্তরে স্তরে শুষে যাচ্ছিল। অয়নের কানে বাজছিল যেন এক তীক্ষ্ণ শঙ্খধ্বনি।
এতোক্ষণ ধরে এক বিকৃত, অন্ধকার ঘোরের মধ্যে ছিল সে, যেখানে তার আদিম প্রবৃত্তি যেন এক নিচু তলার দর্শক হয়ে তার মায়ের সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা দেখছিল। এখন বনগানি ঘর ছেড়ে চলে যেতেই সেই ঘোরটা যেন এক ঝলকে ভেঙে গেল। মাথার ভেতরে চলতে থাকা দৃশ্যের রিলটা হঠাৎই ছিঁড়ে গেল।
অয়ন বুঝতে পারল সে কী ভয়ানক ভুল করেছে। সে চেয়েছিল তার মায়ের চারিত্রিক সতীত্বের পরীক্ষা, কিন্তু সেই পরীক্ষার ফলস্বরূপ তার মা শারীরিক ও মানসিকভাবে যে অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, সেটা তাকে এক নির্মম সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলো।
অয়ন উপলব্ধি করল, তার মা, বিদিশা চ্যাটার্জী, শুধুই একজন নারী নন; তিনি তার কাছে সাক্ষাৎ দেবী। সে আজীবন নিজের মায়ের মতো একজন স্ত্রী কামনা করে এসেছে, যে হবে শান্ত, স্নিগ্ধ, আর যার ভেতরের গভীরতা হবে অফুরন্ত। আর আজ সেই দেবী এক নরকের কীটের হাতে নির্যাতিতা হচ্ছেন, আর সে কিনা নিজেকে একজন নীরব দর্শক হিসেবে রেখেছিল! ধিক্কার তার এই পুরুষত্বকে! ধিক্কার তার এই বিকৃত মানসিকতাকে!
নিজের ওপর রাগ, মায়ের জন্য সীমাহীন দুঃখ, তাঁর অসহ্য কষ্টের জন্য বনগানির ওপর এক চরম, উন্মত্ত প্রতিশোধের স্পৃহা। সবকিছু একসাথে মিশে অয়নের শিরায় শিরায় ফুটন্ত লাভা বইয়ে দিলো। এই নরকের কীট, যে তার মাকে কষ্ট দিয়েছে, যে তাঁর পবিত্র দেহকে অপবিত্র করার দুঃসাহস দেখিয়েছে, তার শাস্তি চাই। কেবল শাস্তি নয়, এমন শাস্তি, যা দেখে তার আত্মা পর্যন্ত ভয়ে কেঁপে উঠবে। প্রতিশোধের আগুন তার সমস্ত দ্বিধা, ভয়, আর সঙ্কোচকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিলো।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই সুযোগ এসে গেল।
বনগানি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে করিডর ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, তার মন তখন চরম অপমানে ফুটছে। এই সামান্য ভারতীয় নারী তার পুরুষত্বের ওপর আঘাত হানার সাহস দেখালো! তার সমস্ত অহংকার, তার সমস্ত দম্ভ মুহূর্তে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল, সম্ভবত তার অনুচরদের কাছে গিয়ে তার রাগ ঝাড়বে, অথবা পানীয়ের মাধ্যমে নিজেকে শান্ত করবে।
অয়ন তখনো লুকানো ছিল পাশের সেই আবর্জনার ঘরে, যেখানে দেওয়ালের গর্তটা তাকে পাশের ঘরের সব দৃশ্যের সাক্ষী করেছিল। বনগানিকে দ্রুত সিঁড়ির দিকে যেতে দেখে অয়ন বুঝতে পারল এটাই সুযোগ। সে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, তার চোখ তখন হিংস্রতা আর প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। বনগানি দ্রুত হাঁটছিল, কিন্তু তার বিশাল দেহের কারণে তার চলার শব্দ বেশ জোরালো ছিল।
সিঁড়ির অর্ধেকটা নামতেই অয়ন তার পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লো। বনগানি এত দ্রুত আক্রমণ আশা করেনি, সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই অয়ন তার বিশাল পিঠে লাফিয়ে উঠে তার গলায় বাহু দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরলো যেন সেটা এক বিষধর সাপের ফাঁস। অয়ন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে, সমস্ত রাগ দিয়ে, তার মায়ের প্রতি হওয়া অত্যাচারের সমস্ত ক্রোধ দিয়ে সেই ফাঁস চেপে ধরলো।
বনগানি গোঁ গোঁ করে উঠলো। তার বিশাল দেহটা ছটফট করতে লাগলো। সে হাত দিয়ে অয়নের বাহু ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু অয়ন যেন আজ মানুষ নয়, সে যেন সাক্ষাৎ কালান্তক যম। তার শিরায় শিরায় এখন কেবল প্রতিশোধের উন্মাদনা। বনগানি তার সমস্ত শক্তি দিয়ে অয়নকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু অয়ন যেন আঠার মতো সেঁটে ছিল তার পিঠে।
শ্বাসরোধের যন্ত্রণা যখন বনগানি'র চোখ কোটর থেকে ঠেলে বের করে আনছিল, তখন অয়ন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল। কণ্ঠস্বর তার অচেনা, রুক্ষ এবং ভয়ানক:
“এই তোর শাস্তি, বনগানি! আমার সতী মাকে তুই স্পর্শ করার সাহস করেছিলি? তোর এই নোংরা, কদাকার ধোন দিয়ে তুই আমার মায়ের শরীর অপবিত্র করার চেষ্টা করেছিলি? তুই আমার বাবাকে নেশার ওষুধ খাইয়ে বেহুঁশ করেছিস? তোর মতো নরকের কীটের জীবনে থাকার কোনো অধিকার নেই! এই শাস্তি আমার মায়ের প্রতি তোর অত্যাচারের জন্য! এই শাস্তি আমার বাবার অপমানের জন্য! আর এই শাস্তি তোর অহংকারের জন্য!”
অয়ন তার হাতের ফাঁস আরও শক্ত করলো, তার বাহুর পেশীগুলো পাথরের মতো কঠিন হয়ে উঠলো। বনগানি'র চোখের সামনে পৃথিবীটা তখন দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসছিল। তার বিশাল দেহটা ধপ করে সিঁড়ির ধাপের ওপর লুটিয়ে পড়লো, একটা বিকট শব্দ হলো। অয়ন তখনো তার গলা চেপে ধরেছিল, যতক্ষণ না বনগানি'র শরীরটা সম্পূর্ণ নিস্তেজ, নিথর হয়ে গেল।
অয়ন দ্রুত তার পিঠ থেকে নেমে এলো। বনগানি'র মুখটা হাঁ হয়ে ছিল, চোখদুটো খোলা, যেন কোনো এক অজানা ত্রাসে স্থির হয়ে আছে। তার নাক দিয়ে এবং মুখ দিয়ে সামান্য রক্ত গড়িয়ে সিঁড়ির ওপর পড়ছিল। অয়ন হাঁপাচ্ছিল, তার বুকটা তখনো ধড়ফড় করছিল, কিন্তু তার ভেতরের প্রতিশোধের আগুন কিছুটা হলেও শান্ত হয়েছিল।
তবে, বনগানি কি মরে গেছে? অয়ন ঝুঁকে তার নাকের কাছে কান নিয়ে গেল। একটা ক্ষীণ, দুর্বল নিঃশ্বাস পড়ছে। না, সে মরেনি, কিন্তু সে এখন মৃত্যুর কাছাকাছি।
এই রক্তাক্ত, বেহুঁশ দৈত্যকে দেখে অয়নের সম্বিৎ ফিরল। সে একা এই পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না। গার্ডরা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। তার মাকে এখনই তার দরকার। বনগানি'র এই দশা দেখে তার মা-কে আর একা ঘরে রাখা ঠিক হবে না।
অয়ন দ্রুত পায়ে তিনতলার করিডর ধরে ছুটলো। মায়ের ঘরের দরজায় গিয়ে সে দুটো মৃদু টোকা দিলো—ঠক... ঠক...
ভেতরের ঘরে বিদিশা তখনো বালিশে মুখ গুঁজে পড়েছিলেন। বনগানি চলে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সমস্ত ভেতরের বাঁধন ভেঙে গেছে। বাইরে তিনি যে ইস্পাত-কঠিন তেজ দেখিয়েছিলেন, ভেতরে তিনি ততটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন।
তাঁর মনে তখন এক তীব্র ঝড় বইছে। তাঁর শরীরটা তখনো বনগানি'র নোংরা স্পর্শে যেন জ্বলে যাচ্ছিল। কাল সকালে তাঁর স্বামী অরুণ আর তাঁর সন্তান অয়ন চলে যাবে। এই কথা ভাবতেই তাঁর হৃদয়ে যেন এক অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হলো। তিনি স্বামীকে ভালোবাসেন, নিজের এই ছোট্ট পরিবারটিকে ভালোবাসেন।
তাদের জীবন বাঁচাতে তিনি নিজের সবথেকে মূল্যবান সতীত্বকে আহুতি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কি পারবেন এই নরকের কীটের সাথে থাকতে? প্রতিদিন তার প্রেমিকা সেজে, তার যৌনসঙ্গী হয়ে? সে তো তাকে বলেছে, সে আর অত্যাচার করবে না, সে তার সঙ্গে প্রেম করবে। কিন্তু বনগানি'র মতো এক হিংস্র, পৈশাচিক ব্যক্তির সাথে প্রেম! সে কি সম্ভব?
তাঁর মনে হলো, এভাবে বাঁচার চাইতে মরে যাওয়া কি ভালো নয়? কেন তিনি বনগানি'র শর্ত মেনে নিলেন? তিনি যদি মারা যেতেন, তবে তাঁর স্বামী-সন্তান হয়তো কিছুদিন কষ্ট পেতেন, কিন্তু তাঁকে এই নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হতো না। মরতে তিনি ভয় পান না, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর বনগানি যদি তাঁর স্বামী-সন্তানের কোনো ক্ষতি করে? এই ভয়টাই তাকে আটকে রেখেছিল। তিনি মরতে চান না, তিনি বাঁচতে চান। তাঁর স্বামী-সন্তানকে নিরাপদে রাখার জন্য।
বিদিশা ধীরে ধীরে বালিশ থেকে মাথা তুললেন। তাঁর চোখদুটো ফোলা, গাল বেয়ে লবণের জল শুকিয়ে গেছে। তিনি অস্ফুটে নিজের মনেই বললেন, "হে কৃষ্ণ, তুমি জানো আমি তোমার কত বড় ভক্ত। তুমি আমার পতিব্রতা ধর্ম রক্ষা করো, প্রভু।"
ঠিক সেই সময়েই দরজায় সেই মৃদু আওয়াজটা হলো—ঠক... ঠক...
বিদিশা চমকে উঠলেন। তাঁর হৃদস্পন্দন দ্রুত হলো। তাঁর মনে এক শীতল স্রোত বইল। কে হতে পারে? বনগানি ফিরে এলো? এত তাড়াতাড়ি! তবে কি তাঁর চুক্তির সময় শেষ? তবে কি তাঁর সর্বনাশের সময় উপস্থিত?
তিনি তাঁর আকর্ষণীয় ঠোঁট কামড়ালেন। এবার বুঝি আর রক্ষা নেই। বনগানি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছে মানে নিশ্চয়ই সে তার রাগ মেটাতে এসেছে, বা হয়তো তার শরীর ভোগ করতে।
হঠাৎই দরজার ওপার থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। সেটা তাঁর চেনা, অত্যন্ত চেনা!
“মা, দরজা খোলো। আমি অয়ন।”
বিদিশার চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। অয়ন! সে এখানে কী করছে? বনগানি তো বলেছিল সে ম্যানশন ছেড়ে পালিয়েছিল! এক তীব্র ভয় তাঁর বুকে চেপে বসলো। অয়নকে যদি বনগানি বা তার অনুচরেরা দেখে ফেলে, তবে তো বনগানি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করবে না। সে তাদের দু'জনকেই মেরে ফেলবে!
বিদিশা যেন এক বিদ্যুতের ঝলকে বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন। তাঁর মনে পড়ল, তিনি এখন নগ্ন! তাঁর গায়ে কোনো পোশাক নেই! দ্রুত তিনি পাশে রাখা বিছানার চাদরটা টেনে নিয়ে কোনোমতে তাঁর শরীরে জড়িয়ে নিলেন।
চাদরটা বুকে আঁকড়ে ধরে তিনি দ্রুত পায়ে দরজার কাছে গেলেন, সাবধানে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে বাইরে উঁকি দিলেন। অয়ন তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তার চোখেমুখে উত্তেজনা আর উদ্বেগের ছাপ।
“বাবা! তুই এখানে কী করছিস?” বিদিশা ফিসফিস করে বললেন, তাঁর কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক। তিনি অয়নকে হাত দিয়ে ইশারা করলেন যেন সে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায়। “জলদি পালা বাবা! বনগানি যদি তোকে দেখে ফেলে, তবে তো...”
অয়ন গম্ভীর মুখে মাথা নাড়লো। তার চোখে সেই একই তেজ, যা কিছুক্ষণ আগে বিদিশার চোখেও ছিল, কিন্তু এখন তাতে এক শীতল সংকল্পের ছাপ।
“আমি পালাবো না, মা,” অয়ন শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল। “বনগানি আর কাউকে দেখতে পাবে না। আমি ওকে শাস্তি দিয়েছি।”
বিদিশা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন। “কী বলছিস তুই! কী করেছিস তুই?”
অয়ন সংক্ষেপে বলল যে সে সিঁড়ির ওপর বনগানিকে শ্বাসরোধ করে পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে এসেছে। তার এখন জ্ঞান নেই, নিঃশ্বাস চলছে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।
বিদিশা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এইটুকু ছেলে তার(বনগানির চেহারা অয়নের চেয়ে তিনগুণ বড়), সে এমন এক বিশাল, হিংস্র দৈত্যের ওপর এমন ভয়ংকর আক্রমণ করেছে! তাঁর চোখে অবিশ্বাস, ভয়, কিন্তু তার সাথে মিশে ছিল এক চাপা গর্বের ঝলক।
“মা, ও এখন নিচে সিঁড়ির ওপর পড়ে আছে,” অয়ন বলল, তার কণ্ঠে এবার দ্রুততা। “আমাদের দ্রুত কিছু একটা করতে হবে। ওকে সরানো দরকার। আমার সাহায্য দরকার, মা।”
বিদিশা দরজার পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মাথা ঘুরছে। এতোক্ষণে তাঁর সমস্ত প্রতিরোধ, সমস্ত বুদ্ধি যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এই মুক্তি! এভাবে, তাঁর ছেলের হাতে?
“আমাকে একটু সময় দে, বাবা,” বিদিশা দুর্বলভাবে বললেন। তিনি চাদরটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন।
অয়ন বুঝতে পারল তার মা এখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। তাছাড়া, সে শেষবার তার মাকে নগ্ন দেখেছিল। এখন চাদরের নিচে তাঁর কোনো পোশাক নেই। মা পোশাক পরার জন্য সময় চাইছেন। সেই মুহূর্তে অয়নের মনে আবার বনগানি'র ওপর এক বন্য রাগ জেগে উঠলো। তার মায়ের এমন অসহায় অবস্থা, তার মায়ের এই মানসিক বিপর্যস্ততা—সবকিছুর জন্য দায়ী ওই পিশাচটা! অয়ন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো: সে আর কখনো তার মাকে কষ্ট পেতে দেবে না। কখনো নয়!
অয়ন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর রাখতে লাগলো। সে বুঝতে পারছিল, সময় চলে যাচ্ছে।
বিদিশা দ্রুত ঘরে চোখ বোলালেন। ওয়ারড্রোব! হ্যাঁ, ঘরের কোণে একটা বড় ওয়ারড্রোব আছে। তিনি চাদরটা এক হাতে ধরে রেখে দ্রুত ওয়ারড্রোবের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর মন এখন চরম উত্তেজনায় কাঁপছে। এক মুহূর্ত আগে তিনি আত্মহত্যার কথা ভাবছিলেন, আর এখন তাঁর ছেলে তাঁকে এমন এক অপ্রত্যাশিত মুক্তি এনে দিয়েছে। ছেলের ওপর তাঁর গর্ব হচ্ছিল, আবার এই গোপন, ভয়ংকর কাজের জন্য এক চাপা লজ্জাও অনুভব হচ্ছিল।
ওয়ারড্রোবের পাল্লা ধরে টানতেই সেটা খুলে গেল। ভেতরে নানা ধরনের পোশাক রাখা, সম্ভবত বনগানি'র বিভিন্ন সঙ্গিনীদের জন্য। বিদিশা ভাবলেন, ভেতরে যা আছে, তাই দিয়েই কাজ চালাতে হবে। এখন শালীনতা বা পছন্দের কোনো প্রশ্ন নেই, এখন শুধু বাঁচার প্রশ্ন।
খুঁজতে খুঁজতে তাঁর হাতে বেশ কিছু পোশাক উঠে এলো। সেগুলো সবই ছিল পশ্চিমা ধাঁচের, কোনো শাড়ি বা সালোয়ার কামিজ নেই। একটা হাতে উঠে এলো টাইট ফিটিং ডেনিম জিনসের প্যান্ট, তার সাথে একটি ছোট, লাল রঙের ক্রপ টপ। টপটা এতো ছোট যে তাঁর নির্মেদ পেট অনেকটা দেখা যাবে।
“হায় ঈশ্বর!” বিদিশা অস্ফুটে বললেন। এই ধরনের পোশাক তিনি জীবনেও পরেননি! তাঁর সংস্কৃতি, তাঁর রুচি। কোনোটাই এই পোশাককে সমর্থন করে না। কিন্তু এখন আর উপায় নেই। এটা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। এই পোশাক পরেই তাকে দৌড়াতে হতে পারে, কাজ করতে হতে পারে।
তিনি দ্রুত হাতে সেই টাইট জিনসের প্যান্ট এবং ক্রপ টপ পরে নিলেন। তাঁর সুগঠিত, ভরাট নিতম্ব জিনসের মধ্যে যেন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠলো, আর ক্রপ টপের নিচে তাঁর নির্মেদ পেটটা সামান্য দেখা যাচ্ছিল। আয়নায় নিজের এই নতুন, সাহসী রূপ দেখে তিনি এক মুহূর্তের জন্য চমকে উঠলেন, কিন্তু পরক্ষণেই তাঁর মনে পড়ল তাঁর স্বামীর বিপদ, তাঁর সন্তানের আত্মত্যাগ।
অয়ন তখন বাইরে অপেক্ষা করছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন অনেকগুলো ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, যদিও আসলে তা ছিল মাত্র কয়েক মিনিট। এমন সময় দরজার পাল্লাটা নড়ে উঠলো।
সে একটু অবাক হলো। মা এত তাড়াতাড়ি পোশাক খুঁজে পেয়ে গেলেন?
বিদিশা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
অয়ন মায়ের দিকে তাকালো, আর তার চোখদুটো যেন অবিশ্বাস্যকরভাবে বড় বড় হয়ে গেল। এই কি তার সেই শাড়ি-পরা, স্নিগ্ধ, লাজুক মা? টাইট জিনস আর লাল টপে তাঁর উন্নত, ভরাট শরীরটা যেন এক নতুন মূর্তিতে উদ্ভাসিত হয়েছে। এক মুহূর্তে তাঁকে মনে হলো কোনো সিনেমার অ্যাকশন হিরোইন বা ফ্যাশন মডেল।
বিদিশা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য লজ্জা পেলেন। অয়নের চোখে যে বিস্ময় এবং মুগ্ধতা, তা তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন। কিন্তু অয়ন তো তাঁরই সন্তান। তাঁর এই অবস্থার জন্য অয়নের কোনো দোষ নেই।
“চলো বাবা,” বিদিশা আর দেরি করলেন না। তাঁর কণ্ঠে এখন কোনো দুর্বলতা নেই, আছে এক শীতল, দৃঢ় সংকল্প। “ওদের ব্যবস্থা করার আগে অরুণকে এখান থেকে সরাতে হবে।”
তাঁরা দুজনে তাড়াতাড়ি করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে এলেন। বনগানি তখনো সেখানেই নিথর হয়ে পড়ে ছিল। অয়নের কাজটা একদম নিখুঁত ছিল। সে শুধু শাস্তি দেয়নি, সে একটা সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
বনগানি'র বিশাল, কদাকার দেহটা সিঁড়ির ওপর পড়ে ছিল, তার মুখ থেকে সামান্য রক্ত শুকিয়ে গেছে। বিদিশার মুখে ঘৃণা ফুটে উঠলো। এই সেই নরকের কীট, যে তাঁর স্বামীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাঁর সতীত্ব নষ্ট করতে চেয়েছিল।
বিদিশা নিচু হলেন। তাঁর টাইট জিনসের প্যান্টে তাঁর সুডৌল পাছা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। তিনি বনগানি'র নাকের কাছে কান নিয়ে গেলেন। ক্ষীণ নিঃশ্বাস চলছে। সে মরেনি।
বিদিশার চোখে আগুন জ্বলে উঠলো। সে মরেনি, কিন্তু তাকে মরতে হবে। আর মরার আগে সে এমন শাস্তি পাবে, যা সে কোনোদিনও ভুলবে না!
তিনি এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। নিজের ডান পা তুলে নিলেন, তাঁর সমস্ত ক্রোধ, সমস্ত ঘৃণা আর সমস্ত অপমান এক করে তিনি সজোরে বনগানি'র লিঙ্গে লাথি মারলেন!
ধুপ করে একটা চাপা শব্দ হলো। বনগানি'র শরীরটা কেঁপে উঠলো, আর তার মুখ থেকে এক তীব্র, চাপা গোঙানি বেরিয়ে এলো।
বিদিশা থামলেন না। তার পায়ের পর পা, লাথির পর লাথি মারতে লাগলেন সেই নিথর দেহের ওপর পড়ে থাকা বনগানি'র নোংরা লিঙ্গে।
“তুই আমার স্বামী-সন্তানের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা করেছিলি? তুই আমার শরীর নিয়ে খেলা করতে চেয়েছিলি, শুয়োরের বাচ্চা? তোর ওই ধোন আমি কেটে দেবো! তোর পুরুষত্ব আমি নষ্ট করে দেবো! নে, নে, নে, তোর এই পাপের ফল ভোগ কর!”
বিদিশার এই তেজিয়ান রূপ দেখে অয়ন যেন পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেল। এই নারী! এই কি তার সেই শান্ত, ধীর স্থির মা? এখন তিনি যেন এক ভয়ঙ্কর রুদ্রাণী।
আস্তে আস্তে বনগানি নিস্তেজ হয়ে পড়লো। তার লিঙ্গ থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল। সে তখন যন্ত্রণায় কেবল গোঙাচ্ছিল। কিন্তু বিদিশার রাগ একটুও কমেনি।
তিনি তখনো বনগানিকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে চলেছেন।
“হারামজাদা! কুত্তার বাচ্চা! তুই ভেবেছিলি তুই আমার স্বামী-সন্তানকে মেরে ফেলবি? তুই ভেবেছিলি তুই আমার সতীত্ব নষ্ট করবি? তোর মতো কীট নরকেরও অযোগ্য! তোর সাত পুরুষের পাপের ফল তোকে ভোগ করতে হবে!”
অয়ন আবার অবাক হলো। সে কখনো মাকে গালাগাল দিতে শোনেনি। এই মুহূর্তে তার মা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক মানুষ।
বনগানি'র অত্যাচার আর নিজের পরিবারের প্রতি তাঁর সীমাহীন ভালোবাসাই তাঁর ভেতরের এই রুদ্র শক্তিকে জাগিয়ে তুলেছে।
অয়ন আস্তে আস্তে বিদিশাকে ডাকলো, “মা! মা! যথেষ্ট হয়েছে। এবার থামো!”
বিদিশার সম্বিৎ ফিরল। তিনি হাঁপাচ্ছিলেন, তাঁর চোখদুটো ক্রোধে জ্বলছিল। তিনি পায়ের লাথি থামালেন।
অয়ন বিদিশাকে তাঁদের কর্তব্যের কথা মনে করাল।
“মা, আগে বাবাকে নিয়ে বেরোতে হবে। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। বনগানি'র নিঃশ্বাস চলছে, কিন্তু ও আর নড়তে পারবে না। কিন্তু গার্ডরা...”
বিদিশা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর সমস্ত শরীরে যেন এক শীতলতা ফিরে এলো। তিনি মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ, অরুণ। আগে অরুণ।”
তাঁরা দুজনে মিলে বনগানি'র বিশাল দেহটা টেনেহিঁচড়ে সিঁড়ির নিচে একটি আড়াল করা স্টোররুমে ফেলে তালা দিয়ে দিল। বনগানি'র কোনো নড়াচড়া করার ক্ষমতা ছিল না।
এবার গার্ড।
অয়ন বলল, “মা, গার্ডরা নিচে আছে। ওদের না সরালে বাবাকে নিয়ে বেরোনো অসম্ভব। বনগানি'র ড্রিংকেও তো ওষুধ মেশানো ছিল। আমরা হয়তো ওদেরও...”
বিদিশা মাথা নাড়লেন। “না, বাবা। রক্তপাত আর নয়। তোর কাজটা তোকে করতেই হতো। কিন্তু বাকিদের ওপর আর আক্রমণ নয়। বুদ্ধি দিয়ে কাজ করতে হবে।”
বিদিশা এবার অয়নকে নিয়ে দোতলার হলঘরে এলেন। অরুণ তখনো বেহুঁশ হয়ে সোফার ওপর পড়েছিলেন। গার্ড দুজন তখনো সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তাদের চোখদুটো দেখে মনে হচ্ছিল তারাও কিছুটা অস্বাভাবিক।
বিদিশা দ্রুত সেই আফ্রিকান মেয়েটার কাছে গেলেন, যে মেয়েটা তাকে ড্রিংক খাইয়েছিল আর বনগানি'র সঙ্গে হেসেছিল। বিদিশার মনে পড়ল, এই মেয়েটাও ওই নরকের কীটের সঙ্গী। এই মেয়েটারও প্রতিশোধ চাই।
বিদিশা মেয়েটার কাছে গিয়ে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলেন। মেয়েটা হাসি মুখে তাকালো। বিদিশা এবার তার কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন। আফ্রিকান মেয়েটা চোখ বড় বড় করে বিদিশার দিকে তাকালো।
বিদিশা এবার জোরে হেসে উঠলেন। সেই হাসি ছিল তীব্র, ভয়ানক। অয়ন শুনতে না পেয়ে কৌতূহলী হয়ে কাছে যেতে বিদিশার আংশিক কথা ওর কানে এল।
“...নয়তো কাল সকালে তোমার কপালে কী আছে, তা আমি জানি না, বোন।”
আফ্রিকান মেয়েটার চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সে ভয় পেয়েছে। সে দ্রুত বিদিশার হাত ধরলো।
বিদিশা মেয়েটাকে নিয়ে গার্ড দুটির কাছে গেলেন। তাদের ড্রিংকেও ওষুধ মেশানোর পরিকল্পনা করলেন। মেয়েটাকে দিয়ে তাদের ড্রিংকে ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দুটো গার্ডও বেহুঁশ হয়ে পড়লো।
এবার পথ পরিষ্কার। অয়ন আর বিদিশা মিলে কোনোমতে অরুণকে ধরে বাইরে গাড়িতে উঠালেন। লিমুজিনটা তখনো বাইরেই ছিল। ড্রাইভারকে বিদিশা দ্রুত হোটেলের দিকে যেতে বললেন, তার কণ্ঠস্বরে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে ড্রাইভার কোনো প্রশ্ন করতে সাহস পেল না।
হোটেলে পৌঁছে টাকাপয়সা আর অল্প জামাকাপড় নিয়ে ওরা সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টের পথে রওনা দিলেন। বনগানি বলেছিল, পুলিশ ওদের পকেটে থাকে। তাই এক মুহূর্তও ইতালি বা আব্রুজ্জিতে থাকা নিরাপদ নয়।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)