Thread Rating:
  • 31 Vote(s) - 2.94 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
বুধবারে যে অস্থিরতা ছিল বিষাদমাখা, বৃহস্পতিবারের সেই একই অস্থিরতা যেন এক রঙিন প্রজাপতি হয়ে সামিনার মনে ডানা ঝাপটাতে লাগল। সকাল থেকেই তার সমস্ত মনোযোগ কেবল একটা অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটার দিকে। কলেজে ক্লাস নেওয়ার সময় সে বারবার নিজের অজান্তেই জানালার ওপাশে আকাশের নীল রং দেখছিল।

দুজনেই দুজনের সময়ের একটা অলিখিত ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সামিনা জানে, মোর্শেদ এখন তাকে বিরক্ত করবে না; আর মোর্শেদ জানে, চারটের পর সামিনা তার একান্ত নিজের। এই যে একে অপরের রুটিনকে নিঃশব্দে চিনে নেওয়া—এটাও যেন এক ধরণের অদৃশ্য মায়ার সুতো।

কলেজ ছুটি হতেই সামিনা দ্রুত বাসায় ফেরার জন্য রিকশা নিল। প্রতিদিন জ্যামে বসে মেজাজ খিটখিটে হলেও আজ তার মোটেও বিরক্তি লাগছে না। বাসায় ঢোকার পর মায়ের সাথে দু-একটা দায়সারা কথা বলে সে দ্রুত নিজের ঘরে চলে এল। কোনোমতে কয়েক লোকমা খেয়েই সে হাতমুখ ধুয়ে সতেজ হয়ে নিল। মনের ভেতর তখন ঢাকের শব্দ বাজছে।
বিকেল চারটে বাজার ঠিক কয়েক মিনিট আগে সামিনা ফোনটা হাতে নিল। বুকের ভেতর এক ধরণের তীব্র কম্পন অনুভব করছে সে। মেসেঞ্জারে গিয়ে ছোট করে টাইপ করল—

সামিনা: “আমি ফিরেছি। বাসায় এখন একাই আছি রুমে।”

মেসেজটা ‘সিন’ হওয়ার জন্য তাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। মোর্শেদ অনলাইনে আগে থেকেই ছিল, যেন সেও এই সংকেতটার জন্যই ওপাশে বসে প্রহর গুনছিল।

মোর্শেদ: “আমি জাস্ট একটা কাজ শেষ করছি। ঠিক দশ মিনিট পর আমি ফোন দিচ্ছি তোমাকে।”

সামিনা ফোনটা পাশে রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার গাল দুটো কেন জানি আজ একটু বেশিই লাল হয়ে আছে। সে অপেক্ষা করতে লাগল। দশ মিনিট সময়টা যেন দশ ঘণ্টার মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে। ঠিক দশম মিনিট মাথায় ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। মোর্শেদের সেই চিরচেনা গম্ভীর নামটা ভেসে উঠেছে। সামিনা একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে কলটা রিসিভ করল।

ফোনের ওপাশে মোর্শেদের গলার স্বরটা আসতেই সামিনা যেন এক মুহূর্তের জন্য সব ভুলে গেল। মোর্শেদের গলার সেই ভরাট টেক্সচার, যা কিছুটা রুক্ষ অথচ ভীষণ আপন।

মোর্শেদ: "উফ্, এই দশটা মিনিট মনে হচ্ছিল কোনো ট্রাফিক সিগন্যালে অনন্তকাল ধরে আটকে আছি। কী করছো ম্যাডাম? কলেজের ডাস্ট আর ব্ল্যাকবোর্ডের চকের গুঁড়ো কি সব ঝেড়ে ফেলেছো শরীর থেকে?"

সামিনা: (একটু হেসে) "আপনার কি ধারণা আমি কলেজে শুধু ব্ল্যাকবোর্ডই মুছি? আজ তো বাচ্চাদের পড়া ধরতে গিয়ে তিনবার আপনার কথা মনে করে ভুল করে ফেলেছি। তার ওপর বাসায় ফিরতে ফিরতে মনে হচ্ছিল আজকের রোদটা যেন আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।"

মোর্শেদ: "রোদের দোষ দিয়ে লাভ নেই সামিনা। ওটা আসলে কাল রাতের সেই কথোপকথনের রেশ। তবে আমি কিন্তু অফিসে আজ খুব লক্ষ্মী ছেলে হয়ে ছিলাম। কলিগরা জিজ্ঞেস করছিল—মোর্শেদ ভাই, আজ কি কোনো বড় ডিল ক্লোজ হচ্ছে নাকি? আপনার মুখে তো বিজয়ীর হাসি!"

সামিনা: "মিথ্যেবাদী! আপনি যে কী পরিমাণ অভিনয় করতে পারেন, তা আমার জানা হয়ে গেছে। আচ্ছা, আজ দুপুরের লাঞ্চে কী খেয়েছেন? আপনার তো আবার দামী রেস্টুরেন্ট ছাড়া গলা দিয়ে কিছু নামে না।"

মোর্শেদ: "আজ কিন্তু একদম উল্টো। তোমার কথা ভাবতে ভাবতে অফিসের ক্যাফেটেরিয়ার সেই বিস্বাদ স্যান্ডউইচটাই অমৃত মনে হয়েছে। তবে খেতে খেতে হঠাৎ মনে পড়ছিল আমাদের সেই টঙ্গী যাত্রার কথা। মনে আছে?

সামিনা: (লাজুক হেসে) "উফ্, মনে করাবেন না ওসব। আমার এখনো মনে আছে, আপনি যখন বাইকটা সেই অন্ধকার রাস্তায় ঝড়ের বেগে চালাচ্ছিলেন, আমি তখন চোখ বন্ধ করে কার কার নাম জপ করছিলাম আপনি জানেন না। আমার তো মনে হচ্ছিল আপনি আমার হাড়গোড় আস্ত রাখবেন না।"

মোর্শেদ: "আরে না! ওটা তো ছিল মেটিয়রের আসল ক্যারেক্টার। তুমি তো ভয়ে আমার জ্যাকেটটা এমনভাবে জাপ্টে ধরেছিলে, যেন আমি কোনো বড়সড় চোর আর তুমি আমাকে পাহারা দিচ্ছ। সত্যি বলো তো, সেদিন কি আসলেও খুব ভয় পেয়েছিলে? নাকি আমাকে ধরার একটা অজুহাত খুঁজছিলে?"

সামিনা: "অসভ্য! আপনার স্পর্ধা তো কম না! আমি ভয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম আর আপনি ভাবছেন আমি আপনাকে ধরার অজুহাত খুঁজছিলাম? তবে..."

মোর্শেদ: "তবে কী? থেমে গেলে কেন?"

সামিনা: (গলাটা একটু খাদে নামিয়ে) "তবে ওই বাতাসের ঝাপটা আর আপনার ওই জ্যাকেটের গন্ধটা... কেমন যেন একটা অদ্ভুত ঘোরের মতো ছিল। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই রাস্তাটা যদি শেষ না হতো, তবে হয়তো ভালোই হতো।"

মোর্শেদ: (মৃদু স্বরে) "রাস্তা তো শেষ হয় না সামিনা, আমরা আসলে গন্তব্য খুঁজে থামতে চাই। কাল রাতে তুমি যখন জিজ্ঞেস করলে— সারাদিন কোথায় ছিলেন? বিশ্বাস করো, আমার মনে হচ্ছিল আমি বুঝি আমার বাড়ির ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। তোমার ওই শাসনের মধ্যে যে দাবি ছিল, সেটা আমার কয়েক কোটি টাকার ডিলের চেয়েও বেশি দামী।"

সামিনা: "বেশি আবেগ দেখাবেন না তো! আপনি তো কাল রাতে আমাকে কাঁদিয়েছেন। আজ অন্তত একটু হাসতে দিন। আচ্ছা, আপনি কি এখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন?"

মোর্শেদ: "না, এখন শুধু তোমার কন্ঠস্বরটা গিলছি। আজ সিগারেটের ধোঁয়া তোমার গলার স্বরের চেয়ে বেশি নেশা ধরছে না। তোমার ওই একঘেয়ে কলেজ জীবনের গল্পগুলো বলো না শুনি, আজ আমি খুব মন দিয়ে তোমার সাধারণ দিনলিপি শুনতে চাই।"

সামিনা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পা নাচাতে নাচাতে বলতে লাগল তার ছোটখাটো সব কথা—কোন ছাত্রীটা আজ পড়া পারেনি, মা আজ কী রান্না করেছে, আর রিকশায় বসে সে মোর্শেদের কথা ভেবে কীভাবে অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। তাদের কথার পিঠে কথা জমছে, যেন এক জন্ম ধরে তারা একে অপরের জন্য এই কথাগুলো জমিয়ে রেখেছিল।

ফোনের ওপাশে মোর্শেদের গলার স্বরটা হঠাতই একটু খাদে নেমে এল। হাসাহাসির মাঝখানে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে দুজনেই মধ্যে। মোর্শেদ জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বিকেলের মরা রোদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

মোর্শেদ: “শোনো সামিনা, অনেক তো হলো ফোনের ওপাশে বসে খুনসুটি। সেদিন টঙ্গী নিয়ে গিয়েছিলাম হুট করে, ওটা আসলে কোনো গোছানো ব্যাপার ছিল না। আমি চাচ্ছি কাল শুক্রবার বিকেলে তোমাকে একটা ‘অফিশিয়াল ডেট’-এ নিয়ে যেতে। একদম প্রপার একটা ডেট। আসবে আমার সাথে?”

সামিনা বুকের ভেতর একটা ধাক্কা অনুভব করল। সে বিছানা থেকে উঠে বসে নিজের ওড়নাটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে একটু কৌতুক মেশানো স্বরে বলল—
সামিনা: “অফিশিয়াল ডেট? মানে কী? ডেট তো সাধারণত প্রেমিক-প্রেমিকারা করে। আমাদের কি তেমন কোনো পরিচয় আছে? আমরা কি সেই পর্যায়ের কিছু যে ‘ডেট’-এ যেতে হবে?”

মোর্শেদ: (মৃদু হেসে) “পরিচয় কি সব সময় শুরুতেই স্ট্যাম্প দিয়ে হতে হয়? আচ্ছা, তোমার ওই সংজ্ঞায় যদি আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা না-ও হই, তবে ক্ষতি কী? চলো না, কাল বিকেলে ডেট করতে করতে না হয় আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে যাই। কোনো একটা সম্পর্ক তো শুরু করতে হবে, তাই না?”

সামিনা: “আপনি বড় ভয়ানক মানুষ! একদম সোজা সাপ্টা কথা বলে মানুষকে অপ্রস্তুতে ফেলে দেন। আমি ভাবলাম আপনি হয়তো বলবেন— না না, ফ্রেন্ডলি হ্যাংআউট। আর আপনি তো দেখি একদম সিলমোহর মেরে দিচ্ছেন!”

মোর্শেদ: “ফ্রেন্ডলি হ্যাংআউট করার মতো বয়স বা ধৈর্য কোনোডাই আমার নেই সামিনা। আমি তোমাকে নিয়ে বের হতে চাই কারণ তোমাকে আমার পাশে দেখতে আমার ভালো লাগে। তোমার ওই শান্ত চেহারার পাশে আমার এই রুক্ষতাটা বেশ মানিয়ে যায়। তো, কাল বিকেল চারটেয় কি আমি মেটিয়র নিয়ে তোমার গলির মোড়ে থাকব?”

সামিনা ফোনের ওপাশে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তার বুকটা ধক ধক করছে, যেন এক কিশোরী প্রথমবার কেউ তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পর যে রকম কাঁপন অনুভব করে। সে দোটানায় পড়ার একটা মৃদু ভান করল, নিজের ওড়নার খুঁটটা আঙুলে বারবার প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল—
সামিনা: “বিকেল চারটে? এতো তাড়াতাড়ি? মা আবার কী ভাববে কে জানে। আর শুক্রবার তো বাসায় মেহমান আসার কথা থাকতে পারে। আপনি বড্ড হুটহাট সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন।”

মোর্শেদ: (চাপা হাসির স্বরে) “মেহমানদের কাল ছুটি দিয়ে দাও সামিনা। আর দোটানা রেখে লাভ নেই। আমি জানি তোমার ভেতরের সেই অবাধ্য মেয়েটা এখন ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হচ্ছে। শুধু শুধু নাখুর নুখুর করে সময় নষ্ট কোরো না।”

সামিনা: “উফ্, আপনি খুব জেদি! আচ্ছা ঠিক আছে, আসব। কিন্তু একদম গলির মুখে দাঁড়াবেন না, একটু দূরে পপুলারের সামনে থাকবেন। আমি চারটের মধ্যেই চলে আসব। তবে বেশিক্ষণ কিন্তু থাকা যাবে না, সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে।”

মুখে ‘সন্ধ্যার আগে ফিরব’ বললেও সামিনার মনের ভেতর তখন খুশির এক বিশাল ফোয়ারা ছুটছে। এই দিনটার জন্য, এই একটা প্রস্তাবের জন্য সে যেন গত কয়েক বছর ধরে একঘেয়ে জীবনের ঘানি টেনেছে। ফোনের ওপাশে মোর্শেদের সম্মতিসূচক এক গভীর ‘হুম’ শুনে সে সংযোগটা কেটে দিল।

ফোনের সংযোগটা কেটে দেওয়ার পর মোর্শেদ আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। তার ভেতরে এখন এক ধরণের অস্থির তৎপরতা কাজ করছে। আলমারি থেকে রাইডিং গ্লাভস জোড়া টেনে নিয়ে সে দ্রুত নিচে নেমে এল। বনানীর পার্কিং লটে রাখা রয়্যাল এনফিল্ড মেটিয়রের দিকে তাকিয়ে সে একবার মনে মনে হাসল।

ইঞ্জিন স্টার্ট দিতেই সেই পরিচিত গম্ভীর আওয়াজটা গ্যারেজে প্রতিধ্বনি তুলল। সে বাইক নিয়ে সোজা রওনা হলো মোহাম্মদপুরের দিকে। হারুনের দোকানের সামনে যখন সে পৌঁছাল, তখন বিকেলের শেষ আলোটা ঢাকার ধুলোমাখা রাস্তায় এক অদ্ভুত মায়া ছড়িয়েছে।

মেটিয়রটাকে স্ট্যান্ড করিয়ে মোর্শেদ হেলমেট খুলল। হারুন তখন অন্য একটা বাইকের চেইন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। মোর্শেদকে দেখেই সে কাজ রেখে এগিয়ে এল।

মোর্শেদ: “হারুন, এই ধর মার্লবরো। আগে একটা ধরা। তারপর আমার বাইকটা নিয়ে বোস। চেইনটা লুব করবি, ব্রেক আর ক্লাচ একদম নিখুঁত অ্যাডজাস্ট করবি। কাল অনেক দূরে যাব, কোনো খুত থাকা চলবে না।”

হারুন দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল, “বুঝছি মোর্শেদ ভাই। কাল কি তলে তলে কোনো প্রোগ্রাম আছে নাকি? বাইক তো একদম চকচক করতাছে।”

মোর্শেদ উত্তর দিল না। সে একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বাইকের দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ তার মনে পড়ল সেই প্রথম রাইডের কথা। টঙ্গী যাওয়ার সময় আয়নায় দেখা সেই দৃশ্যটা—সামিনা যখন তার পেছনে বসল, তার সেই বিশাল ভরাট নিতম্ব মেটিয়রের ছোট পিলিয়ন সিটটাতে ঠিকঠাক ধরছিল না। সামিনা আড়ষ্ট হয়ে বসেছিল, তার সেই শারীরিক গঠন আর বাইকের সিটের অসমতা মোর্শেদের চোখে এক চরম এরোটিক দৃশ্য তৈরি করেছিল ঠিকই, কিন্তু সে বুঝতে পেরেছিল সামিনা খুব কষ্ট পাচ্ছে।

মোর্শেদ সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে হারুনকে ডাকল।

মোর্শেদ: “শোন হারুন, এই ব্যাকসিটটা এখনই খোল। আমার স্টোরে একটা এক্সটেনডেড ওয়াইড পিলিয়ন সিট রাখা ছিল না? ওইটা নিয়ে আয়। কালকের রাইডে আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। পেছনের সিটটা যেন একদম আরামদায়ক আর চওড়া হয়।”

হারুন অবাক হয়ে তাকাল। মেটিয়রের মতো বাইকে সাধারণত কেউ হুট করে চওড়া সিট লাগাতে চায় না লুক নষ্ট হবে বলে। কিন্তু মোর্শেদের চোখের ভাষা সে চেনে। সে দ্রুত স্টোর থেকে সেই চওড়া কুশন সিটটা নিয়ে এল।

সিটটা লাগানোর সময় মোর্শেদের মনে একটা অদ্ভুত সুরসুরি খেলে গেল। সে কল্পনা করতে পারছে, কাল এই প্রশস্ত সিটে সামিনা যখন তার বিশাল লাবণ্য নিয়ে বসবে, তখন সে আর আগের মতো আড়ষ্ট থাকবে না। সে আরাম করে বসবে, আর মোর্শেদের পিঠের ওপর নিজের শরীরটা ছেড়ে দেবে। সামিনার এই ‘কষ্ট’টুকু সে লাঘব করতে চায়, কারণ কালকের দিনটা হবে শুধু উপভোগের।

বাইকের সিট লাগানো শেষ করে মোর্শেদ একবার হাত দিয়ে সিটের নরম কুশনটা অনুভব করল। মনে মনে ভাবল— “কালকের বিকেলটা তোমার জন্য সারপ্রাইজ হয়ে থাকবে সামিনা। তুমি ভাবতেও পারোনি আমি তোমার ওই অস্বস্তিটুকুও মনে রেখেছি।”

হারুনের দোকানে যখন বাইকের কাজ চলছে, ওদিকে সামিনার ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটা যেন আজ এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। রুমের দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে সামিনা তার আলমারির পাল্লাটা হাট করে খুলে ধরল।
শাড়ির ভাঁজগুলো একটা একটা করে নামাতে লাগল সে। কোনটা পরবে? মেরুন রঙের জামদানিটা? নাকি সেই আসমানি রঙের শিফনটা, যেটা পরলে তাকে অনেকটা মেঘের মতো লাগে? সামিনা একেকটা শাড়ি নিজের শরীরের ওপর ধরে আয়নায় দেখছে। আজ তার বিচারবুদ্ধি ঠিক কাজ করছে না। যে মানুষটা বাইকের সিট বদলে ফেলার মতো সূক্ষ্ম ডিটেইল নিয়ে ভাবছে, তার সামনে নিজেকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করার এক অদ্ভুত দায়বদ্ধতা সে অনুভব করছে।

সে বিছানার ওপর শাড়ি, ব্লাউজ আর ম্যাচিং অন্তর্বাসগুলো সাজিয়ে রাখল। হাত দিয়ে শাড়ির জমিনটা অনুভব করতে করতে সে এক ধরণের ঘোরের মধ্যে চলে গেল। কাল যখন সে মোর্শেদের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, মোর্শেদ কি তার ওই অভিজ্ঞ চোখে প্রথম দেখাতেই সামিনাকে পড়ে ফেলবে? সামিনা কল্পনা করল, মোর্শেদের সেই গভীর দৃষ্টি তার কপালে থাকা টিপ আর ঘাড়ের কাছে আলগা হয়ে থাকা চুলের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে।

সে তার ড্রয়ার থেকে একটা নতুন কাজলের কৌটা বের করল। কাল সে চোখ জোড়াকে একটু বেশিই গভীর করে সাজাবে। যে চোখ দেখে মোর্শেদ বারবার দিক হারায়, সেই চোখে সে কাল মোহিনী মায়া মাখাবে। গয়নার বক্সটা খুলে সে তার প্রিয় রুপোর ঝুমকো জোড়া বের করে কানের পাশে ধরল। আয়নাই আজ তার একমাত্র সখী।

সামিনা আলতো করে নিজের পেটে আর কোমরে হাত বোলালো। তার শরীরের ভরাট গঠন নিয়ে সে সব সময় একটু হীনম্মন্যতায় ভুগত, কিন্তু মোর্শেদের সেই রাতের কথাগুলো— "তোমার ওই রুক্ষতা আমার পাশে মানিয়ে যায়"— তাকে এক অন্যরকম আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। সে ভাবল, কাল যখন সে মোর্শেদের বাইকের সেই নতুন প্রশস্ত সিটে বসবে, মোর্শেদের পিঠে হাত রাখবে, তখন কি শহরের বাতাস তাদের এই গোপন অভিসারের সাক্ষী থাকবে?

রাত বাড়ছে, কিন্তু সামিনার চোখে ঘুম নেই। সে শাড়িগুলো আবার ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখল, যেন কালকের প্রস্তুতির এই সামান্য খুঁতটুকুও মোর্শেদের চোখে ধরা না পড়ে। তার সারা শরীরে এখন শুক্রবার বিকেলের সেই আসন্ন রোমাঞ্চের শিহরন।

রাত গভীর হয়েছে। পুরো ঢাকা শহর যখন ঝিমিয়ে পড়েছে, সামিনা তখন বিছানায় শুয়ে সিলিং ফ্যানের ঘূর্ণি দেখছিল। তার সমস্ত চিন্তাজুড়ে কালকের সেই চারটে বেজে এক মিনিট। ঠিক তখনই তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। মোর্শেদের মেসেজ।

মোর্শেদ: "হারুনের দোকান থেকে ফিরলাম। বাইকটা একদম তোমার মনের মতো করে সাজিয়ে এনেছি। কাল বিকেল চারটেয় কিন্তু ঠিক চারটেই। দেরি করে মেটিয়রকে আর আমাকে—কাউকেই রাগিয়ে দিও না যেন।"

সামিনা একটা মুচকি হাসি চেপে টাইপ করল—
সামিনা: "বাইক সাজানোর কী আছে? আর আমি তো বলেছিই চারটেয় আসব। এতো তাড়াহুড়ো কিসের?"

কয়েক সেকেন্ড পর মোর্শেদের পাল্টা মেসেজ এল—
মোর্শেদ: "তাড়াহুড়ো আছে সামিনা। কাল আমাদের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার একটা বিচার হতে হবে। তোমার চুলের গন্ধ আর মেটিয়রের ইঞ্জিনের আওয়াজ—দুটো একসাথে মিশিয়ে কাল আমি শহর ছাড়তে চাই। এখন ঘুমাও, কালকের জন্য কিছুটা এনার্জি বাঁচিয়ে রাখা দরকার।"

সামিনার বুকটা আবার সেই চেনা ছন্দে ধড়ফড় করে উঠল। সে আর কোনো উত্তর দিল না। ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। মোর্শেদের ওই একটা মেসেজ—"তোমার চুলের গন্ধ"—সামিনাকে যেন এখনই কালকের সেই বিকেলটাতে নিয়ে গেল।

ওদিকে মোর্শেদ তার বারান্দায় দাঁড়িয়ে শেষ সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে টিপে নিভালো। সে জানে, কালকের পর সামিনা আর আগের মতো থাকতে পারবে না। সে তাকে এমন এক ঘোরের মধ্যে নিয়ে যাবে, যা থেকে ফেরার কোনো মানচিত্র সামিনার জানা নেই।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
Like Reply


Messages In This Thread
RE: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে) - by KaminiDevi - 24-02-2026, 10:22 AM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)