17-02-2026, 06:08 PM
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (চ)
কেবিন যেন এখন পারিবারিক মিলনমেলা। অ্যান্টিসেপটিকের হালকা ঝাঁঝালো গন্ধের ভেতরেও একধরনের ঘরোয়া উষ্ণতা মিশে আছে। রহিম আধশোয়া হয়ে বেডে হেলান দেওয়া। রানী পাশে বসে আছে। জয়নাল অপর পাশে। জয় রহিমের পায়ের কাছে বসে। আয়শা একটা চেয়ার বেডের কাছে টেনে এনে বসেছে। আর রাজিব সোফায়। জয়নাল, রহিম আর রাজিব খাচ্ছে। প্লাস্টিকের কন্টেইনার খুলে ভাত–তরকারির হালকা বাষ্প উঠছে।
অনুপস্থিত শুধু একজন—সে হচ্ছে জান্নাত। রহিম একবার ওর কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আয়শা বলেছে, বিকেলের দিকে আসবে।
কথাগুলো এখন আর নিচু স্বরে হচ্ছে না। হাসপাতালের নিয়মের চেয়ে কিছুটা উঁচুতেই চলছে। তার সঙ্গে মাঝেমাঝেই জয়নালের হা-হা করে হাসি যোগ হচ্ছে, শব্দটা সাদা দেওয়ালে ঠেকে ফিরে আসছে। একমাত্র চুপচাপ রাজিব। গত রাতের ক্লান্তি আর গতদিনের মানসিক ধকল এখনো পুরো কাটিয়ে ওঠেনি। চোখের নিচে হালকা কালি, কাঁধের পেশিতে টান। তবে সেটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না—নিজের চিরচেনা অদৃশ্য বর্মটা পরে নিয়েছে যেন।
এর মাঝেই নার্স চলে এলো। কেবিনের অবস্থা দেখে নার্সের চোখ কপালে উঠল। কড়া গলায় জানিয়ে দিল—এটা হাসপাতাল, বাসা নয়। রহিমের ভাইটাল চেক আর ওষুধগুলো বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার বলে গেল, এত মানুষ একসাথে থাকা যাবে না।
নার্স চলে যেতেই কেবিন আবার গমগমে হয়ে উঠল আলোচনায়। তবে এবার বাদ সাধল আয়শা—যেন নার্সেরই প্রতিনিধি হয়ে। জয়নালকে কয়েকবার নিচু স্বরে কথা বলতে বলল। তার কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণও আছে।
রাজিবের খাওয়া শেষ হতেই আয়শা ওকে বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হতে আর একটু রেস্ট নিতে বলল। কারণ রাজিবের শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আঙুলের ফাঁকে চামচটা কয়েক সেকেন্ড স্থির ছিল। প্রথমে রাজিব রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আয়শা নাছোড়—একপ্রকার ধমকেই রাজিবকে রাজি করাল।
রহিমও একবার নরম করে বলল। ঠিক বাবার নির্দেশ নয়, বরং অনেকটা অনুরোধের সুরে। যেন ছেলেকে কিছু বলতে গিয়ে রহিম নিজেই একটু সংকোচ বোধ করছে। গলার স্বর নিচু, তবু ভারী।
রহিমের কথা শুনে রাজিব একবার কেবিনের দিকে তাকায়। রহিম, রানী, আয়শা—সবার দিকে চোখ যায়। রানীর দিকে দৃষ্টিটা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়; সেখানে একঝলক নীরব বোঝাপড়া। কিন্তু জয়কে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। তারপর ধীরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোয়। পেছন থেকে শরীরটা দেখে বোঝা যায়, সামান্য সামনে ঝুঁকে আছে—ক্লান্তি আর অবসন্নতার ওজন কাঁধে নিয়ে। হাঁটার সময় জুতোর তলায় মেঝের হালকা ঘষাঘষির শব্দ শোনা যায়।
আয়শা রানী আর জয়কেও থাকতে দিল না। ওদের পাঠাল ক্লাস করতে। রানী এক–দু’বার প্রতিবাদ করল। কথার ফাঁকে সে ঠোঁট চেপে ধরে এক মুহূর্তের জন্য; আঙুলগুলো ওড়নার কিনারায় শক্ত হয়ে ওঠে, তারপর আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়।
কিন্তু জয় সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল। কথা বলার সময় সে এক ফাঁকে রানীর দিকে তাকায়—তাকানোটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে যেন কিছু ঠিক করে নেওয়ার তাড়াহুড়া আছে। ওর চেহারা এখনো হাস্যোজ্জ্বল। তবে সেই হাসির স্তরের নিচে একটা দৃঢ় সংকল্পের উপস্থিতি চোখে পড়ে—চোয়ালটা অল্প শক্ত, চোখের দৃষ্টি স্থির।
গত রাতে নিজের সঙ্গে করা সংকল্পের দ্বিতীয় ধাপের জন্য রানীকে একা পাওয়া এখন ওর কাছে খুব জরুরি।
*****
হাসপাতালের বাইরে বেরুতেই রাজীবের চোখে সূর্যের আলো সুঁইয়ের মতো বিধল। গতকাল থেকে আর সূর্য দেখা হয়নি। আলো নাকি শক্তির উৎস। কিন্তু রাজীবের বেলায় উল্টো হলো। বাইরে পা দিতেই মনে হলো শরীরের সব শক্তি যেন একসাথে ঝরে গেছে। কপালে হালকা ঘাম চিকচিক করছে, তবু ভেতরটা ঠান্ডা।
হাঁটার সময় পায়ে জোর নেই। মাথা ধরেছে। চোখ জ্বালা করছে ঘুমের অভাবে। শরীরটা হালকা টলছে। হাঁটুর ভেতরে যেন ফাঁপা শব্দ, পায়ের তলায় মাটি একটু নরম হয়ে আসছে।
বাইকটা হাসপাতালের বাইরেই পড়ে আছে। গতকাল সকালে রেখে গিয়েছিল, তারপর আর খেয়াল করা হয়নি। সিটে ধুলো জমেছে, পাখির মল শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে। রোদে গরম হয়ে চামড়াটা কড়া। বসার মতো অবস্থাও নেই। তবে পরিষ্কার থাকলেও রাজীব হয়তো উঠতে পারত না। বাইকের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছাই হলো না হাত দেওয়ার। রিকশা নেওয়াই সহজ মনে হলো।
রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে রইল। সামনে তিন–চারটা রিকশা। কেউ যাবে না। রাজীব আর জোর করল না। শরীরের অবসাদ ওকে মাধ্যাকর্ষণের মতো টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। কাঁধ দুটো একটু একটু করে ঝুলে পড়ছে।
গতকাল সে ভয় পেয়েছিল। সত্যিকারের ভয়। বুকের ভেতরটা তখন কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আগে আব্বুর উপস্থিতির মূল্য বুঝত না। অবহেলা করেনি কোনোদিন, কিন্তু গুরুত্বও পুরোপুরি বোঝেনি। গতকালের ধাক্কা তাকে বুঝিয়েছে—কিছু না করেও রহিম ওর আর রানীর জন্য কত বড় আশীর্বাদ। বাবা হারানোর মুখে গিয়েই সে বুঝেছে, আসলে কতটা নির্ভর করে আছে।
হাসপাতালে থাকতে এই অবসাদ টের পায়নি। তখন স্নায়ু টানটান ছিল। মন শুধু একটা দিকেই কাজ করছিল—আব্বুর কী দরকার, কখন কী লাগবে। দায়িত্ব ওকে ধরে রেখেছিল। হাত ব্যস্ত থাকলে ভেতরের শূন্যতা বোঝা যায় না।
কিন্তু এখন দায়িত্ব থেকে কয়েক কদম দূরে আসতেই শরীর আর মন দুটোই ভেঙে পড়ছে। বুকের মাঝখানে হালকা চাপ অনুভব হচ্ছে, নিঃশ্বাস একটু ভারী।
হঠাৎ রাজীবের মনে একটা প্রশ্ন জাগল। প্রশ্ন না, অনুধাবন।
এই অবসাদ কি নতুন?
নাকি এটা সবসময়ই ছিল?সম্ভবত ছিল।
কিন্তু দায়িত্বগুলো সেটাকে ঢেকে রাখত।
কারও না কারও দরকার ছিল বলে সে টিকে ছিল।
দায়িত্ব ছাড়া রাজীব ঠিক কে?
যদি একদিন দায়িত্বগুলোর অবসান হয়—
যদি আশেপাশের মানুষদের কাছে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়—
তাহলে কি এই অবসাদই তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে থাকবে?
এই ভাবনাটা এই মুহূর্তে রাজীবকে একটা আয়নার সামনে এনে দাঁড় করায়—যে আয়নায় নিজের চোখের ভেতরের শূন্যতা দেখতে রাজীব ভয় পায়।
*****
রাজীব যখন এসব ভাবছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের গেট থেকে জয় আর রানী বেরিয়ে এলো। দুজনেই হাসিমুখে কথা বলতে বলতে। দুপুরের রোদে তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। রাজীবের দিকে প্রথম দৃষ্টি যায় রানীর। ওদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজীব। রোদে তার শার্টের কাপড়টা একটু ফিকে দেখাচ্ছে।
রানীর হাসিমুখটা একটু নরম হয়ে যায়। ম্লান নয় ঠিক, তবে একটা অন্যরকম ভাব—যেন সে চাইছে না রাজীব ওর হাসিটা দেখুক। ঠোঁটের কোণ একটু থেমে যায়।
ব্যাপারটা জয়ের চোখ এড়ায় না। রানীর দৃষ্টি লক্ষ করে জয় তাকায় রাজীবের দিকে। চোয়ালটা সামান্য শক্ত হয়ে যায়। ইচ্ছাকৃত নয়, যেন স্বাভাবিক রিফ্লেক্স। আঙুলগুলো চাবির রিমে অল্প চাপ দেয়।জয় বলে,“তুই দাঁড়া, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।”এই বলে সে পার্কিং লটের দিকে চলে যায়। তার পায়ের শব্দ কংক্রিটে ঠকঠক করে ওঠে।
রানী ছোট্ট করে একটা হাসি দেয়। জয় চলে গেলে আবার রাজীবের পিঠের দিকে তাকায়। রাজীব সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধ দুটো একটু নুয়ে। শারীরিক অবসাদটা বোঝা যাচ্ছে। রানী টের পায়। মনে মনে ভাবে—সারারাত হাসপাতালে ছিল, ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই।
রানী এগিয়ে যায়। পেছনে দাঁড়িয়ে বলে,“ভাইয়া, এখনো দাড়িয়ে আছিস কেনো?”
রাজীবের চিন্তার সুতো কেটে যায়। পেছনে ফিরে তাকায়। রানী দাঁড়িয়ে আছে, কপালের উপর হাত দিয়ে রোদ থেকে চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করছে। রোদের আলোয় ওর চোখ চিকচিক করছে।
“তুই আবার এই রোদে বেরিয়ে এলি কেন?”রাজীব জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞাসায় অভিভাবকসুলভ শাসনের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি। গতকাল রানীর উপর খুব চাপ গেছে। এখন আবার রোদে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে যায় কিনা সেই চিন্তা মাথায় ঘুরছে।
রানী বলে,“বড় আম্মু পাঠালো। বলল এখানে থেকে রুমে ভিড় না বাড়াতে। নার্স বেশি লোক থাকতে দিচ্ছে না। তাই ক্লাসে যাচ্ছি।”
“ক্লাস করতে পারবি? না হলে আমার সাথে চল। আজ রোদ খুব বেশি।”
রাজীব বলে। তার কণ্ঠে ক্লান্তির ভেতরেও টান আছে।
“না না, সমস্যা হবে না। আমি জয়… এর সাথে যাচ্ছি। ও গাড়ি নিয়ে আসতে গেছে।”
জয়ের নাম নিতে গিয়ে রানীর মুখ একটু নিচু হয়ে যায়। গালের পাশ দিয়ে চুলের গোছা নড়ে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য “জয় ভাইয়া” প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নেয়। কোনোদিন জয়কে ভাই ডাকেনি সে। বললে হয়তো অন্যরকম হয়ে যেত।
“সত্যি পারবি তো? এখন শরীর কেমন লাগছে? আয়, একটু ছায়ায় দাঁড়া।”
রাজীব ছায়ার দিকে সরে গিয়ে রানীর জন্য জায়গা করে দেয়। গরম বাতাসের মধ্যে ছায়াটা একটু ঠান্ডা লাগে।
রানী ছায়ায় এসে দাঁড়ায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,“তোর বাইক কই? রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“বাইকের অবস্থা খারাপ। ময়লা হয়ে আছে। আর ঘুম পেয়েছে। বাইক চালানোর অবস্থায় নেই।”নির্লিপ্তভাবে বলে রাজীব। চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে আসে আবার ওঠে।
রানী ভালো করে একবার রাজীবের দিকে তাকালো। এলোমেলো চুল, চোখ দুটো হালকা লাল হয়ে আছে। বারবার হাই তুলছে, চোখে পানি জমছে। রানীর চোখের দৃষ্টি একটু নরম হলো। বুকের ভেতর হালকা কেমন একটা টান অনুভব করে।সকালে একবার ফোনে কথা হয়েছিল। হাসপাতালে এসে আর কথা হয়নি রাজীবের সাথে। ওর শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস করার সময় হয়নি। এখনো করলো না। আসলে কেমন যেন একটা বাধা কাজ করছে ভেতরে। শুধু ছোট করে একটা শ্বাস বের হলো বুক থেকে।তারপর ইতস্তত করে বলল,“তুইও চল আমাদের সাথে। গাড়িতে। জয় তোকে নামিয়ে দেবে।”
রাজীব হেসে বলল,“আরে না, রিকশা নিলেই হবে। তুই যা।”
রানী জানে জয়ের সাথে রাজীবের সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। আগের মতো নেই তো নয়ই, উল্টো আগের ঠিক বিপরীত হয়ে গেছে। কী কারণে হয়েছে সেটা রানী জানে না। রাজীব কোনোদিন বলেনি। রানীও জিজ্ঞেস করার সাহস করেনি।
রানীর মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজীবের সামনে জয়কে নিয়ে বেশি কথা বললেই হয়তো রাজীব ওর মনের কিছু ধরে ফেলবে। আর রানীও সেই সময় পুরো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। জয়কে নিয়ে ঝামেলা, রাজীবের সাথে সম্পর্কের শীতলতা—সব মিলিয়ে একটা চাপা টান তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। অন্তত রানীর দিক থেকে।
রাজীবও আজকাল মেপে কথা বলে। যেন ভয় পায়—কিছু বেশি না হয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে অর্ধেক কথা এসে থেমে থাকে।
এমন সময় গাড়ি নিয়ে আসে জয়। হর্ন দেয়। শব্দটা একটু তীক্ষ্ণ শোনায়। সরাসরি তাকায় না রাজীব আর রানীর দিকে।
রানী একবার রাজীবের দিকে তাকায়, একবার জয়ের দিকে। কী যেন ভাবে। চোখে এক মুহূর্তের দ্বিধা। তারপর বলে,“ঠিক আছে, তুই বাসায় গিয়ে রেস্ট নে। আমি বিকেলে আবার হাসপাতালে আসবো। তুই আসিস না।”
রাজীব কিছু বলে না। রানীর চলে যাওয়া দেখে। গাড়ির সামনে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবে রানী, একবার পেছনে তাকিয়ে রাজীবকে দেখে, তারপর পেছনের দরজা খুলে পেছনের সিটে বসে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শুকনো। গাড়ি ছেড়ে দেয়। ধুলো একটু উড়ে উঠে আবার বসে যায়।রাজীব বুঝতেই পারে না—কিছুক্ষণ আগের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে করা ভাবনাগুলো কোথায় মিলিয়ে গেছে।
এখন তার চিন্তা একটাই—রানী ক্লাস আর হাসপাতালের চাপে আবার অসুস্থ হয়ে যায় কিনা। বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জমে থাকে।
তার সঙ্গে আরেকটা চিন্তা। সে গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু সরিয়েও রাখতে পারে না।
জয়ের কাছ থেকে রানীকে দূরে রাখা উচিত কি না।
কিছুদিন আগে যেদিন জয় তাকে মেরেছিল, সেদিন রানী নিয়ে খুব খারাপ ইঙ্গিত করেছিল। কথাগুলো এখনো কানের ভেতর বাজে। জয়কে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। তবু আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়—সবকিছু কি আগের মতো আছে?
মনটা যেন ইচ্ছে করেই সেই প্রশ্নটা আঁকড়ে ধরে আছে। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে।
*****
কিছুদূর যেতেই জয় গাড়ি ব্রেক করল। রানী একটু আনমনা ছিল বলে এই হঠাৎ ব্রেকে চমকে উঠল, শরীরটা সামান্য সামনে দুলে গিয়ে আবার সোজা হলো, সামনে তাকাল।
“ম্যাডাম আপনি কই যাইবেন সেইটা তো বললেন না” জয় ইয়ার্কি করে ড্রাইভারের ভাষায় বলল, ওদের বাড়ির ড্রাইভারও ঠিক এরকম করেই কথা বলে। গলায় বাড়তি ভণিতা, ঠোঁটে টানা হাসি।
রানী প্রথমে বুঝতে পারে না, জিজ্ঞাসা করে, “এই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? ড্রাইভার চাচার মতো?”
“তুই তো আমাকে ড্রাইভারই বানিয়ে দিয়েছিস, আমি সামনে গাড়ি চালাচ্ছি তুই পেছনে বসে ম্যাডাম সেজেছিস” জয় রাগত স্বরে বলল। কিন্তু রাগের ভেতরেও খুনসুটির রেশ স্পষ্ট।
জয়ের কথা শুনে রানী হেসে ওঠে, হাসির শব্দে গাড়ির ভেতরটা হালকা হয়ে যায়। মজা করে বলে, “ড্রাইভার, ক্যাম্পাসে যাও” একদম গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে, ঠোঁট চেপে গাম্ভীর্য ধরার চেষ্টা করে।
“দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা, একা পেয়ে নেই আবার তোকে” জয় কপট রাগ দেখিয়ে বলে, চোখ দুটো সরু করে তাকায়।
“কি করবে একা পেলে, হ্যা?” রানীও দুষ্টুমি করে জিজ্ঞাসা করে, ভ্রু সামান্য তুলে।
“তুই কি সামনে আসবি? নাকি আমি গাড়ি নিয়ে এক টানে হাইওয়ে ধরবো?” জয় হুমকি দেয়, স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকঠুক করে।
“আসছি বাবা আসছি” রানী পেছনের দরজা খুলে সামনে এসে বসে, কারণ জয়ের পক্ষে এই পাগলামি করা অসম্ভব কিছু নয়, তারপর বলে, “এই যে হলো” সিটবেল্ট টানতে টানতে তার চুলের গোছা কাঁধে পড়ে।
জয় হাসে, তারপর রানীর হাত ধরে বলে, “এই যে এখন হলো”। দুজনের চোখ একত্র হয়, কয়েক সেকেন্ড স্থির। জয়ের ঠোঁটে মুচকি হাসি, কিন্তু চোখের হাসিটা অনেক বেশি ঝলমলে। রানী হালকা করে নিজের চোখ নামিয়ে নেয়, গাড়ির ভেতরে এসির ঠাণ্ডা বাতাসেও গালে হালকা উষ্ণতা অনুভূত হয়, আঙুলের ডগায় কেমন একটা কাঁপুনি লাগে।
কিন্তু পরক্ষণেই জয় নিজের স্বভাবে ফিরে যায়, বলে, “এর চেয়ে বেশি ভালো হত তুই যদি আমার কোলে বসতি, হা হা হা” বলে নিজেই হেসে ওঠে।
রানী দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জয়ের বাহুতে প্লেফুলি আঘাত করে, বলে, “সব সময় তুমি এমন করো কেন?” আঘাতটা নরম, কিন্তু স্পর্শটা টের পাওয়া যায়।
রানীর গালে উষ্ণতার সাথে লালিমাও যোগ হয়, চোখে একসাথে লজ্জা আর হাসির ঝিলিক খেলে যায়।
*****
অনুপস্থিত শুধু একজন—সে হচ্ছে জান্নাত। রহিম একবার ওর কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আয়শা বলেছে, বিকেলের দিকে আসবে।
কথাগুলো এখন আর নিচু স্বরে হচ্ছে না। হাসপাতালের নিয়মের চেয়ে কিছুটা উঁচুতেই চলছে। তার সঙ্গে মাঝেমাঝেই জয়নালের হা-হা করে হাসি যোগ হচ্ছে, শব্দটা সাদা দেওয়ালে ঠেকে ফিরে আসছে। একমাত্র চুপচাপ রাজিব। গত রাতের ক্লান্তি আর গতদিনের মানসিক ধকল এখনো পুরো কাটিয়ে ওঠেনি। চোখের নিচে হালকা কালি, কাঁধের পেশিতে টান। তবে সেটা এখন আর বোঝা যাচ্ছে না—নিজের চিরচেনা অদৃশ্য বর্মটা পরে নিয়েছে যেন।
এর মাঝেই নার্স চলে এলো। কেবিনের অবস্থা দেখে নার্সের চোখ কপালে উঠল। কড়া গলায় জানিয়ে দিল—এটা হাসপাতাল, বাসা নয়। রহিমের ভাইটাল চেক আর ওষুধগুলো বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার বলে গেল, এত মানুষ একসাথে থাকা যাবে না।
নার্স চলে যেতেই কেবিন আবার গমগমে হয়ে উঠল আলোচনায়। তবে এবার বাদ সাধল আয়শা—যেন নার্সেরই প্রতিনিধি হয়ে। জয়নালকে কয়েকবার নিচু স্বরে কথা বলতে বলল। তার কণ্ঠে ক্লান্তি, কিন্তু নিয়ন্ত্রণও আছে।
রাজিবের খাওয়া শেষ হতেই আয়শা ওকে বাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হতে আর একটু রেস্ট নিতে বলল। কারণ রাজিবের শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। আঙুলের ফাঁকে চামচটা কয়েক সেকেন্ড স্থির ছিল। প্রথমে রাজিব রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু আয়শা নাছোড়—একপ্রকার ধমকেই রাজিবকে রাজি করাল।
রহিমও একবার নরম করে বলল। ঠিক বাবার নির্দেশ নয়, বরং অনেকটা অনুরোধের সুরে। যেন ছেলেকে কিছু বলতে গিয়ে রহিম নিজেই একটু সংকোচ বোধ করছে। গলার স্বর নিচু, তবু ভারী।
রহিমের কথা শুনে রাজিব একবার কেবিনের দিকে তাকায়। রহিম, রানী, আয়শা—সবার দিকে চোখ যায়। রানীর দিকে দৃষ্টিটা কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয়; সেখানে একঝলক নীরব বোঝাপড়া। কিন্তু জয়কে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। তারপর ধীরে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগোয়। পেছন থেকে শরীরটা দেখে বোঝা যায়, সামান্য সামনে ঝুঁকে আছে—ক্লান্তি আর অবসন্নতার ওজন কাঁধে নিয়ে। হাঁটার সময় জুতোর তলায় মেঝের হালকা ঘষাঘষির শব্দ শোনা যায়।
আয়শা রানী আর জয়কেও থাকতে দিল না। ওদের পাঠাল ক্লাস করতে। রানী এক–দু’বার প্রতিবাদ করল। কথার ফাঁকে সে ঠোঁট চেপে ধরে এক মুহূর্তের জন্য; আঙুলগুলো ওড়নার কিনারায় শক্ত হয়ে ওঠে, তারপর আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়।
কিন্তু জয় সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে গেল। কথা বলার সময় সে এক ফাঁকে রানীর দিকে তাকায়—তাকানোটা খুব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে যেন কিছু ঠিক করে নেওয়ার তাড়াহুড়া আছে। ওর চেহারা এখনো হাস্যোজ্জ্বল। তবে সেই হাসির স্তরের নিচে একটা দৃঢ় সংকল্পের উপস্থিতি চোখে পড়ে—চোয়ালটা অল্প শক্ত, চোখের দৃষ্টি স্থির।
গত রাতে নিজের সঙ্গে করা সংকল্পের দ্বিতীয় ধাপের জন্য রানীকে একা পাওয়া এখন ওর কাছে খুব জরুরি।
*****
হাসপাতালের বাইরে বেরুতেই রাজীবের চোখে সূর্যের আলো সুঁইয়ের মতো বিধল। গতকাল থেকে আর সূর্য দেখা হয়নি। আলো নাকি শক্তির উৎস। কিন্তু রাজীবের বেলায় উল্টো হলো। বাইরে পা দিতেই মনে হলো শরীরের সব শক্তি যেন একসাথে ঝরে গেছে। কপালে হালকা ঘাম চিকচিক করছে, তবু ভেতরটা ঠান্ডা।
হাঁটার সময় পায়ে জোর নেই। মাথা ধরেছে। চোখ জ্বালা করছে ঘুমের অভাবে। শরীরটা হালকা টলছে। হাঁটুর ভেতরে যেন ফাঁপা শব্দ, পায়ের তলায় মাটি একটু নরম হয়ে আসছে।
বাইকটা হাসপাতালের বাইরেই পড়ে আছে। গতকাল সকালে রেখে গিয়েছিল, তারপর আর খেয়াল করা হয়নি। সিটে ধুলো জমেছে, পাখির মল শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে। রোদে গরম হয়ে চামড়াটা কড়া। বসার মতো অবস্থাও নেই। তবে পরিষ্কার থাকলেও রাজীব হয়তো উঠতে পারত না। বাইকের দিকে তাকিয়ে ইচ্ছাই হলো না হাত দেওয়ার। রিকশা নেওয়াই সহজ মনে হলো।
রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে রইল। সামনে তিন–চারটা রিকশা। কেউ যাবে না। রাজীব আর জোর করল না। শরীরের অবসাদ ওকে মাধ্যাকর্ষণের মতো টেনে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। কাঁধ দুটো একটু একটু করে ঝুলে পড়ছে।
গতকাল সে ভয় পেয়েছিল। সত্যিকারের ভয়। বুকের ভেতরটা তখন কেমন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আগে আব্বুর উপস্থিতির মূল্য বুঝত না। অবহেলা করেনি কোনোদিন, কিন্তু গুরুত্বও পুরোপুরি বোঝেনি। গতকালের ধাক্কা তাকে বুঝিয়েছে—কিছু না করেও রহিম ওর আর রানীর জন্য কত বড় আশীর্বাদ। বাবা হারানোর মুখে গিয়েই সে বুঝেছে, আসলে কতটা নির্ভর করে আছে।
হাসপাতালে থাকতে এই অবসাদ টের পায়নি। তখন স্নায়ু টানটান ছিল। মন শুধু একটা দিকেই কাজ করছিল—আব্বুর কী দরকার, কখন কী লাগবে। দায়িত্ব ওকে ধরে রেখেছিল। হাত ব্যস্ত থাকলে ভেতরের শূন্যতা বোঝা যায় না।
কিন্তু এখন দায়িত্ব থেকে কয়েক কদম দূরে আসতেই শরীর আর মন দুটোই ভেঙে পড়ছে। বুকের মাঝখানে হালকা চাপ অনুভব হচ্ছে, নিঃশ্বাস একটু ভারী।
হঠাৎ রাজীবের মনে একটা প্রশ্ন জাগল। প্রশ্ন না, অনুধাবন।
এই অবসাদ কি নতুন?
নাকি এটা সবসময়ই ছিল?সম্ভবত ছিল।
কিন্তু দায়িত্বগুলো সেটাকে ঢেকে রাখত।
কারও না কারও দরকার ছিল বলে সে টিকে ছিল।
দায়িত্ব ছাড়া রাজীব ঠিক কে?
যদি একদিন দায়িত্বগুলোর অবসান হয়—
যদি আশেপাশের মানুষদের কাছে তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়—
তাহলে কি এই অবসাদই তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে থাকবে?
এই ভাবনাটা এই মুহূর্তে রাজীবকে একটা আয়নার সামনে এনে দাঁড় করায়—যে আয়নায় নিজের চোখের ভেতরের শূন্যতা দেখতে রাজীব ভয় পায়।
*****
রাজীব যখন এসব ভাবছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের গেট থেকে জয় আর রানী বেরিয়ে এলো। দুজনেই হাসিমুখে কথা বলতে বলতে। দুপুরের রোদে তাদের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে। রাজীবের দিকে প্রথম দৃষ্টি যায় রানীর। ওদের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাজীব। রোদে তার শার্টের কাপড়টা একটু ফিকে দেখাচ্ছে।
রানীর হাসিমুখটা একটু নরম হয়ে যায়। ম্লান নয় ঠিক, তবে একটা অন্যরকম ভাব—যেন সে চাইছে না রাজীব ওর হাসিটা দেখুক। ঠোঁটের কোণ একটু থেমে যায়।
ব্যাপারটা জয়ের চোখ এড়ায় না। রানীর দৃষ্টি লক্ষ করে জয় তাকায় রাজীবের দিকে। চোয়ালটা সামান্য শক্ত হয়ে যায়। ইচ্ছাকৃত নয়, যেন স্বাভাবিক রিফ্লেক্স। আঙুলগুলো চাবির রিমে অল্প চাপ দেয়।জয় বলে,“তুই দাঁড়া, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি।”এই বলে সে পার্কিং লটের দিকে চলে যায়। তার পায়ের শব্দ কংক্রিটে ঠকঠক করে ওঠে।
রানী ছোট্ট করে একটা হাসি দেয়। জয় চলে গেলে আবার রাজীবের পিঠের দিকে তাকায়। রাজীব সামান্য কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁধ দুটো একটু নুয়ে। শারীরিক অবসাদটা বোঝা যাচ্ছে। রানী টের পায়। মনে মনে ভাবে—সারারাত হাসপাতালে ছিল, ঘুম হয়নি নিশ্চয়ই।
রানী এগিয়ে যায়। পেছনে দাঁড়িয়ে বলে,“ভাইয়া, এখনো দাড়িয়ে আছিস কেনো?”
রাজীবের চিন্তার সুতো কেটে যায়। পেছনে ফিরে তাকায়। রানী দাঁড়িয়ে আছে, কপালের উপর হাত দিয়ে রোদ থেকে চোখ বাঁচানোর চেষ্টা করছে। রোদের আলোয় ওর চোখ চিকচিক করছে।
“তুই আবার এই রোদে বেরিয়ে এলি কেন?”রাজীব জিজ্ঞেস করে। জিজ্ঞাসায় অভিভাবকসুলভ শাসনের চেয়ে উৎকণ্ঠাই বেশি। গতকাল রানীর উপর খুব চাপ গেছে। এখন আবার রোদে দাঁড়িয়ে মাথা ঘুরে যায় কিনা সেই চিন্তা মাথায় ঘুরছে।
রানী বলে,“বড় আম্মু পাঠালো। বলল এখানে থেকে রুমে ভিড় না বাড়াতে। নার্স বেশি লোক থাকতে দিচ্ছে না। তাই ক্লাসে যাচ্ছি।”
“ক্লাস করতে পারবি? না হলে আমার সাথে চল। আজ রোদ খুব বেশি।”
রাজীব বলে। তার কণ্ঠে ক্লান্তির ভেতরেও টান আছে।
“না না, সমস্যা হবে না। আমি জয়… এর সাথে যাচ্ছি। ও গাড়ি নিয়ে আসতে গেছে।”
জয়ের নাম নিতে গিয়ে রানীর মুখ একটু নিচু হয়ে যায়। গালের পাশ দিয়ে চুলের গোছা নড়ে ওঠে। এক মুহূর্তের জন্য “জয় ভাইয়া” প্রায় বেরিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সামলে নেয়। কোনোদিন জয়কে ভাই ডাকেনি সে। বললে হয়তো অন্যরকম হয়ে যেত।
“সত্যি পারবি তো? এখন শরীর কেমন লাগছে? আয়, একটু ছায়ায় দাঁড়া।”
রাজীব ছায়ার দিকে সরে গিয়ে রানীর জন্য জায়গা করে দেয়। গরম বাতাসের মধ্যে ছায়াটা একটু ঠান্ডা লাগে।
রানী ছায়ায় এসে দাঁড়ায়। তারপর জিজ্ঞেস করে,“তোর বাইক কই? রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
“বাইকের অবস্থা খারাপ। ময়লা হয়ে আছে। আর ঘুম পেয়েছে। বাইক চালানোর অবস্থায় নেই।”নির্লিপ্তভাবে বলে রাজীব। চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে আসে আবার ওঠে।
রানী ভালো করে একবার রাজীবের দিকে তাকালো। এলোমেলো চুল, চোখ দুটো হালকা লাল হয়ে আছে। বারবার হাই তুলছে, চোখে পানি জমছে। রানীর চোখের দৃষ্টি একটু নরম হলো। বুকের ভেতর হালকা কেমন একটা টান অনুভব করে।সকালে একবার ফোনে কথা হয়েছিল। হাসপাতালে এসে আর কথা হয়নি রাজীবের সাথে। ওর শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস করার সময় হয়নি। এখনো করলো না। আসলে কেমন যেন একটা বাধা কাজ করছে ভেতরে। শুধু ছোট করে একটা শ্বাস বের হলো বুক থেকে।তারপর ইতস্তত করে বলল,“তুইও চল আমাদের সাথে। গাড়িতে। জয় তোকে নামিয়ে দেবে।”
রাজীব হেসে বলল,“আরে না, রিকশা নিলেই হবে। তুই যা।”
রানী জানে জয়ের সাথে রাজীবের সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। আগের মতো নেই তো নয়ই, উল্টো আগের ঠিক বিপরীত হয়ে গেছে। কী কারণে হয়েছে সেটা রানী জানে না। রাজীব কোনোদিন বলেনি। রানীও জিজ্ঞেস করার সাহস করেনি।
রানীর মাঝে মাঝে মনে হয়, রাজীবের সামনে জয়কে নিয়ে বেশি কথা বললেই হয়তো রাজীব ওর মনের কিছু ধরে ফেলবে। আর রানীও সেই সময় পুরো স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। জয়কে নিয়ে ঝামেলা, রাজীবের সাথে সম্পর্কের শীতলতা—সব মিলিয়ে একটা চাপা টান তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। অন্তত রানীর দিক থেকে।
রাজীবও আজকাল মেপে কথা বলে। যেন ভয় পায়—কিছু বেশি না হয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে অর্ধেক কথা এসে থেমে থাকে।
এমন সময় গাড়ি নিয়ে আসে জয়। হর্ন দেয়। শব্দটা একটু তীক্ষ্ণ শোনায়। সরাসরি তাকায় না রাজীব আর রানীর দিকে।
রানী একবার রাজীবের দিকে তাকায়, একবার জয়ের দিকে। কী যেন ভাবে। চোখে এক মুহূর্তের দ্বিধা। তারপর বলে,“ঠিক আছে, তুই বাসায় গিয়ে রেস্ট নে। আমি বিকেলে আবার হাসপাতালে আসবো। তুই আসিস না।”
রাজীব কিছু বলে না। রানীর চলে যাওয়া দেখে। গাড়ির সামনে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবে রানী, একবার পেছনে তাকিয়ে রাজীবকে দেখে, তারপর পেছনের দরজা খুলে পেছনের সিটে বসে। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা শুকনো। গাড়ি ছেড়ে দেয়। ধুলো একটু উড়ে উঠে আবার বসে যায়।রাজীব বুঝতেই পারে না—কিছুক্ষণ আগের নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে করা ভাবনাগুলো কোথায় মিলিয়ে গেছে।
এখন তার চিন্তা একটাই—রানী ক্লাস আর হাসপাতালের চাপে আবার অসুস্থ হয়ে যায় কিনা। বুকের ভেতর হালকা অস্বস্তি জমে থাকে।
তার সঙ্গে আরেকটা চিন্তা। সে গুরুত্ব দিতে চায় না। কিন্তু সরিয়েও রাখতে পারে না।
জয়ের কাছ থেকে রানীকে দূরে রাখা উচিত কি না।
কিছুদিন আগে যেদিন জয় তাকে মেরেছিল, সেদিন রানী নিয়ে খুব খারাপ ইঙ্গিত করেছিল। কথাগুলো এখনো কানের ভেতর বাজে। জয়কে সে ছোটবেলা থেকে চেনে। তবু আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়—সবকিছু কি আগের মতো আছে?
মনটা যেন ইচ্ছে করেই সেই প্রশ্নটা আঁকড়ে ধরে আছে। বুকের ভেতর অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে জমাট বাঁধে।
*****
কিছুদূর যেতেই জয় গাড়ি ব্রেক করল। রানী একটু আনমনা ছিল বলে এই হঠাৎ ব্রেকে চমকে উঠল, শরীরটা সামান্য সামনে দুলে গিয়ে আবার সোজা হলো, সামনে তাকাল।
“ম্যাডাম আপনি কই যাইবেন সেইটা তো বললেন না” জয় ইয়ার্কি করে ড্রাইভারের ভাষায় বলল, ওদের বাড়ির ড্রাইভারও ঠিক এরকম করেই কথা বলে। গলায় বাড়তি ভণিতা, ঠোঁটে টানা হাসি।
রানী প্রথমে বুঝতে পারে না, জিজ্ঞাসা করে, “এই তুমি এভাবে কথা বলছো কেন? ড্রাইভার চাচার মতো?”
“তুই তো আমাকে ড্রাইভারই বানিয়ে দিয়েছিস, আমি সামনে গাড়ি চালাচ্ছি তুই পেছনে বসে ম্যাডাম সেজেছিস” জয় রাগত স্বরে বলল। কিন্তু রাগের ভেতরেও খুনসুটির রেশ স্পষ্ট।
জয়ের কথা শুনে রানী হেসে ওঠে, হাসির শব্দে গাড়ির ভেতরটা হালকা হয়ে যায়। মজা করে বলে, “ড্রাইভার, ক্যাম্পাসে যাও” একদম গম্ভীর ভাব নিয়ে বলে, ঠোঁট চেপে গাম্ভীর্য ধরার চেষ্টা করে।
“দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা, একা পেয়ে নেই আবার তোকে” জয় কপট রাগ দেখিয়ে বলে, চোখ দুটো সরু করে তাকায়।
“কি করবে একা পেলে, হ্যা?” রানীও দুষ্টুমি করে জিজ্ঞাসা করে, ভ্রু সামান্য তুলে।
“তুই কি সামনে আসবি? নাকি আমি গাড়ি নিয়ে এক টানে হাইওয়ে ধরবো?” জয় হুমকি দেয়, স্টিয়ারিংয়ে আঙুল ঠুকঠুক করে।
“আসছি বাবা আসছি” রানী পেছনের দরজা খুলে সামনে এসে বসে, কারণ জয়ের পক্ষে এই পাগলামি করা অসম্ভব কিছু নয়, তারপর বলে, “এই যে হলো” সিটবেল্ট টানতে টানতে তার চুলের গোছা কাঁধে পড়ে।
জয় হাসে, তারপর রানীর হাত ধরে বলে, “এই যে এখন হলো”। দুজনের চোখ একত্র হয়, কয়েক সেকেন্ড স্থির। জয়ের ঠোঁটে মুচকি হাসি, কিন্তু চোখের হাসিটা অনেক বেশি ঝলমলে। রানী হালকা করে নিজের চোখ নামিয়ে নেয়, গাড়ির ভেতরে এসির ঠাণ্ডা বাতাসেও গালে হালকা উষ্ণতা অনুভূত হয়, আঙুলের ডগায় কেমন একটা কাঁপুনি লাগে।
কিন্তু পরক্ষণেই জয় নিজের স্বভাবে ফিরে যায়, বলে, “এর চেয়ে বেশি ভালো হত তুই যদি আমার কোলে বসতি, হা হা হা” বলে নিজেই হেসে ওঠে।
রানী দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিয়ে জয়ের বাহুতে প্লেফুলি আঘাত করে, বলে, “সব সময় তুমি এমন করো কেন?” আঘাতটা নরম, কিন্তু স্পর্শটা টের পাওয়া যায়।
রানীর গালে উষ্ণতার সাথে লালিমাও যোগ হয়, চোখে একসাথে লজ্জা আর হাসির ঝিলিক খেলে যায়।
*****
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)