Thread Rating:
  • 32 Vote(s) - 3 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
[Image: Gemini-Generated-Image-cvopojcvopojcvop.png]

সামিনা বিছানায় শুয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। এই একটা মেসেজেই তার সারাদিনের অপেক্ষা যেন সার্থক হলো।


সামিনা মেসেজটা পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মনের কোণে জমে থাকা মেঘগুলো পুরোপুরি সরেনি। সে টাইপ করল
এত রাতে ফেরার সময় পেলেন? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন যে কাউকে একটা মেসেজ করার কথা ছিল। আমার খোঁজ না নিলেও চলত, আমি তো আর আপনার কেউ নই।
মোর্শেদের রিপ্লাই এল দ্রুত।

মোর্শেদ: অভিমানটা কি একটু বেশি হয়ে গেল না? আমি কিন্তু ইচ্ছে করে দেরি করিনি। আর আপনিকেউ নন’— কথাটা কি মন থেকে বললেন? যাই হোক, আজ শরীরটা খুব ক্লান্ত লাগছে সামিনা। এই ছোট স্ক্রিনে টাইপ করতে আর ইচ্ছে করছে না। কিন্তু আপনার সাথে একটু কথা বলতে খুব ইচ্ছে করছে। একটা ফোন দেব কি?”

সামিনা একটু থমকাল। এত রাতে ফোন! মা পাশের ঘরেই ঘুমোচ্ছেন। যদিও দেয়াল বেশ পুরু, তবুও একটা সংকোচ কাজ করছে। সে একটু কঠোর হওয়ার ভান করে লিখল
সামিনা: ক্লান্ত লাগলে শুয়ে পড়ুন, কাল কথা হবে। অযথা জেগে থাকার দরকার নেই।

মোর্শেদ: শুয়ে তো আছিই, কিন্তু ঘুমানোর জন্য তো চোখে ঘুম আসতে হবে। কালকের সেই রাইডের পর আজ সারাদিন আপনার কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। অবশ্য আপনার যদি খুব সমস্যা থাকে বা কথা বলতে ইচ্ছে না করে, তবে থাক। আমি জোরাজুরি করব না। ভালো থাকবেন।

মোর্শেদের এইভালো থাকবেনবলাটা সামিনার বুকে গিয়ে বিঁধল। সে বুঝল লোকটা হয়তো সত্যিই ক্লান্ত এবং কিছুটা হতাশ। সামিনা এক মিনিট কোনো রিপ্লাই দিল না। সে বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রয়ার থেকে তার নীল রঙের হেডফোনটা বের করল। ফোনের ভলিউম কমিয়ে সে আবার কম্বলের নিচে ঢুকে পড়ল।
তারপর টাইপ করল— হেডফোনটা আনতে গিয়েছিলাম। এবার ফোন করুন।

মেসেজটাসিনহওয়ার পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল।মোর্শেদনামটা কাঁপছে। সামিনা বুকটা একবার দুরুদুরু করে উঠল। সে রিসিভ করে হেডফোনটা কানে গুজে দিল। ওপাশ থেকে কেবল একটা গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

সামিনা একটু অধিকারের সুরে, গলা নামিয়ে বলল— হ্যালো? কই, চুপ করে আছেন কেন? এবার বলুন, সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরলেন যে মেসেজ করার সময়টুকুও পেলেন না?”

সামিনা বিছানায় একপাশে কাত হয়ে শুয়ে হেডফোনটা কানের সাথে আরও চেপে ধরল। মোর্শেদের গলার স্বরটা শোনার জন্য সে যেন তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল।

ওপাশ থেকে মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর খুব ধীরলয়ে, একদম খাদের দিকের গলায় বলল— সামিনা, আজকে একটু টঙ্গি গিয়েছিলাম।

মোর্শেদের মুখ থেকে নিজের নামটা এভাবে শোনা মাত্রই সামিনার বুকের ভেতরটা কেমন জানি ধক করে উঠল। হেডফোনের ওপার থেকে ভেসে আসা সেই গভীর, পুরুষালি কণ্ঠস্বরটা যেন বিদ্যুতের মতো সামিনার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মোর্শেদের গলার স্বরের সেই সূক্ষ্ম কম্পন হেডফোনের তার বেয়ে সরাসরি সামিনার মগজে আঘাত করতে লাগল।

সামিনা অনুভব করল, মোর্শেদের কণ্ঠটা ঠিক তার মেটিওর ৩৫০ বাইকটার ইঞ্জিনের মতোই গম্ভীর আর ছন্দময়। সেই স্বরে এক ধরণের আদিম মাদকতা আছে, যা শুনলে মনে হয় কোনো শক্তিশালী পুরুষ খুব কাছ থেকে তার কানের কাছে ফিসফিস করছে। সামিনার মনে হলো, এই স্বরটা যেন তাকে সম্মোহিত করে ফেলছে।

সে কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তার নিজের নিশ্বাসের শব্দও যেন তার কাছে ভারী মনে হচ্ছে। সে মোর্শেদের সেই কণ্ঠের রেশটুকু নিজের ভেতরে অনুভব করার চেষ্টা করল।

সামিনা: (একটু থতমত খেয়ে, গলাটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে) টঙ্গি? আজকে আবার টঙ্গি গেলেন কেন? বাইকে করেই গেছিলেন নিশ্চয়ই?

মোর্শেদ: (মৃদু হেসে) হ্যাঁ, বাইক ছাড়া তো আমার গতি নেই। তবে টঙ্গির সেই ঘিঞ্জি রাস্তায় বাইক চালাতে চালাতে বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছিলকাল যে মানুষটা আমার পেছনে বসে আমার কাঁধ খামচে ধরেছিল, সে পাশে থাকলে এই ধুলোবালিগুলোও বোধহয় আমার কাছে সুগন্ধি মনে হতো। আপনি কি খুব রাগ করেছেন সামিনা? আমি সত্যিই আজ সময় পাইনি।

মোর্শেদের এই সরাসরি ‘আপনি পাশে থাকলে’ বলার ভঙ্গিটা সামিনাকে আবার সেই কালকের রাইডের স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। সে অনুভব করতে পারল, কালকের সেই বাইকের কম্পন আর আজকের মোর্শেদের গলার স্বরের কম্পন যেন একই সূত্রে গাঁথা।

সামিনা: (মৃদু স্বরে) রাগ করার অধিকার কি আমাকে দিয়েছেন আপনি? আমি তো ভাবলাম, আপনার সেই মেটিওর আর আপনিআপনারা দুজনেই বুঝি আমাকে ভুলে গিয়ে অন্য কোথাও হারিয়ে গেছেন। অত রাতে ফিরলেন, পথে কি খুব কষ্ট হয়েছে আপনার?”

মোর্শেদ: কষ্ট হয়নি সামিনা। তবে ফিরতি পথে যখন হাইওয়েতে ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো পেছন দিকে সরে যাচ্ছিল, তখন খুব একা লাগছিল। মনে হচ্ছিল, পেছনের সিটটা বড্ড বেশি খালি। আপনি কি জানেন সামিনা, আপনার ওই হালকা নিশ্বাসের শব্দটা যেটা কাল আমার পিঠে লাগছিল, সেটা আমি আজও মিস করছি।

সামিনা একদম চুপ হয়ে গেল। তার ফর্সা গাল দুটো অন্ধকারের মধ্যেও লাল হয়ে উঠেছে। মোর্শেদ যে এতটা অকপটে তার অনুভূতির কথা বলবে, সেটা সে ভাবেনি। এই পুরুষালী কণ্ঠের অতল গহ্বরে সে যেন ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে।

মোর্শেদের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর এবার আরও খানিকটা নিচু হয়ে এল। হেডফোনের ওপার থেকে তার প্রতিটি শব্দ যেন সামিনার কানের লতিতে উষ্ণ পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে।

মোর্শেদ: সামিনা, একটা কথা ভাবছিলাম। এই যে আমরা এত কথা বলছি, এত কাছে আসছি... এখনো কি ওইআপনি-আজ্ঞে দেয়ালটা রাখা খুব জরুরি? আমি কি তোমাকেতুমিকরে ডাকতে পারি?”

সামিনা একটু চমকাল, যদিও মনে মনে সে এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে চট করে ধরা দিল না, একটু ছলনা মিশিয়ে উত্তর দিল।

সামিনা: আরে! আপনি তো দেখি খুব সুযোগ সন্ধানী। এক দিনের আলাপেইতুমিতে নেমে আসতে চাইছেন? আমি তো আর্ট টিচার, আমার ছাত্রছাত্রীরাও আমাকে আপনি বলে। আপনাকে এত সহজ অনুমতি কেন দেব?”

মোর্শেদ: (মৃদু হেসে) অনুমতি তো মনের ভেতর থেকে অনেক আগেই দিয়ে দিয়েছেন, শুধু মুখে বলতে বাধা দিচ্ছে ওই আভিজাত্য। শোনো সামিনা, এইতুমিশব্দটার মধ্যে যে অদ্ভুত একটা টান আছে, সেটাআপনিতে নেই। আমি চাই আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব না থাকুক।

সামিনা: আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। আজ থেকে না হয়তুমি হলো। কিন্তু শর্ত একটাইবেশি প্রশ্রয় পাওয়া যাবে না।

মোর্শেদ: ধন্যবাদ। তাহলে তুমিও আমাকেতুমিকরেই বলবে এখন থেকে। কেমন?”

সামিনা: (একটু অপ্রস্তুত হয়ে) উমম... ওটা এখনই পারব না। আমি অত সহজে কাউকে তুমি বলতে অভ্যস্ত নই। আমার একটু সময় লাগবে, মোর্শেদ সাহেব।

মোর্শেদ: ঠিক আছে, আমি অপেক্ষা করব। আচ্ছা, তোমার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তো কিছুই জানা হলো না। যেমন ধরোতোমার কী বেশি পছন্দ? পড়ন্ত বিকেল নাকি মায়াবী সন্ধ্যা?”

সামিনা একটু ভাবল। সে সোজাসুজি উত্তর দিতে পছন্দ করে না, তার শিল্পমনা মন সবকিছুর মধ্যেই সৌন্দর্য খোঁজে।

সামিনা: আসলে সরাসরি কোনো একটা বলা কঠিন। আমার বিকেল পছন্দ কারণ তখন সূর্যটা বিদায়ের আগে আকাশটাকে আবিরের রঙে রাঙিয়ে দেয়। আবার সন্ধ্যাও প্রিয় কারণ তখন এক অদ্ভুত নির্জনতা নামে। আর রাত? রাত তো আমার সবচেয়ে প্রিয়, কারণ তখন ডায়েরির পাতায় বা ক্যানভাসে নিজের সাথে নিজে কথা বলা যায়। তাই আমার কাছে সময়টা বড় নয়, ওই সময়ের অনুভূতিটাই আসল।

মোর্শেদ: দারুণ বলেছ! তোমার উত্তরটা ঠিক তোমার আঁকা ছবির মতোই গভীর। এবার তোমার পালা, কিছু জিজ্ঞেস করবে?”

সামিনা: আচ্ছা, আপনার তো সারাক্ষণ ওই সিগারেট আর বাইক নিয়ে কারবার। এই সিগারেট ছাড়া আপনার আর কী খেতে সবচেয়ে পছন্দ?”

মোর্শেদ: তোমাকে।

সামিনা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার কান ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। এই একটা শব্দে যেন পৃথিবীর সব স্পন্দন থেমে গেছে। সে থতমত খেয়ে অস্ফুট স্বরে বলল—
সামিনা: মানে? আপনি... আপনি এসব কী বলছেন মোর্শেদ?”

কৌতুকের সুরে মোর্শেদ বলল—
মোর্শেদ: তুমি তো আমাকে কথাটাই শেষ করতে দিলে না সামিনা। আমি বলতে যাচ্ছিলাম— ‘তোমাকেও এই কথাটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম’, মানে তোমার কী খেতে পছন্দ সেটা। কিন্তু আমিতোমাকেবলার পরেই তুমি একদম চমকে গিয়ে মাঝপথে থামিয়ে দিলে! তাই বাক্যটা আধো রয়ে গিয়ে ওরকম শুনিয়েছে।

সামিনা এবার বিছানায় বালিশে মুখ গুঁজে হাসতে লাগল। তারা দুজনেই ঠাট্টাটা বুঝেছিল একদম প্রথমেই।

সামিনা: (হাসতে হাসতে) আপনি একটা আস্ত শয়তান!

মোর্শেদ: (হেসে কুটিপাটি হয়ে) হা হা হা! তোমার ওইমানে?’ বলাটা শুনলে তুমি নিজেই হাসতে। বিশ্বাস করো সামিনা, তোমাকে ওভাবে ঘাবড়ে দেওয়ার মজাই আলাদা।

দুজনই কিছুক্ষণ একসাথে ফোনে হাহাহা করে হাসতে লাগল। রাতের সেই স্তব্ধতা তাদের হাসির শব্দে যেন এক অন্যরকম উৎসবে রূপ নিল। হাসির রেশ কাটলে সামিনা একটা তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

সামিনা: অনেক রাত হলো মোর্শেদ। কাল আবার কলেজে যেতে হবে। আজকে আর না, কাল আবার কথা হবে আমাদের। এবার কিন্তু সত্যি ঘুমোতে যান।

মোর্শেদ: ঠিক আছে। তুমিও ঘুমাও। কালকের ভোরের মেসেজটার অপেক্ষায় থাকব কিন্তু। শুভ রাত্রি, সামিনা।

সামিনা: শুভ রাত্রি।

সামিনা ফোনটা রেখে হেডফোনটা খুলল। তার ঠোঁটের কোণে হাসিটা তখনো লেপ্টে আছে। মোর্শেদ মানুষটা তাকে মুহূর্তের মধ্যে হাসাতেও পারে, আবার ভাবাতেও পারে। সে জানালার দিকে তাকিয়ে ভাবল— ‘তুমি’ বলাটা হয়তো খুব একটা কঠিন হবে না।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 9 users Like KaminiDevi's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে) - by KaminiDevi - 13-02-2026, 12:43 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)