11-02-2026, 09:30 AM
মোর্শেদ যখন তার বনানীর সুপরিসর ফ্ল্যাটে ফিরল, চারপাশ তখন নিঝুম। আভিজাত্যমাখা এই নিস্তব্ধতা আজ তার কাছে কেমন যেন পানসে ঠেকছে। যাত্রাবাড়ীর সেই ধুলোবালি, থানার গুমোট আর সামিনার গায়ের সেই বুনো সুবাসই যেন তার অস্তিত্বে বেশি বাস্তব হয়ে ধরা দিচ্ছে।
বাইকটা গ্যারেজে রেখে সে সোজা নিজের বেডরুমে চলে এল। গত কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তি আর উত্তেজনার ছাপ তার শরীরে। জ্যাকেটটা খুলে ছুড়ে মারল সোফায়। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারটা ছেড়ে দিয়ে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল পানির নিচে। গরম পানির ধারা যখন তার পিঠ বেয়ে নামছে, মোর্শেদের মনে পড়ে গেল সামিনার সেই ‘পিষ্ট হওয়ার’ অনুভূতি। বাইকের গতির ঝাপটায় সামিনার ভরাট বুকগুলো বারবার তার পিঠে লেপ্টে যাচ্ছিল—সেই স্পর্শের একটা অদৃশ্য ছাপ যেন এখনো মোর্শেদের শরীরে গেঁথে আছে।
শাওয়ার শেষ করে হালকা কিছু খেয়ে নিল সে। খুব একটা খিদে নেই, কেবল শরীরটা সচল রাখার জন্য খাওয়া। এরপর একটা বড় গ্লাসে আইস কিউব দিয়ে হুইস্কি ঢেলে সে গিয়ে দাঁড়াল তার বারান্দায়। হাতে জ্বলন্ত মার্লবরো রেড।
সামনের রাস্তাটা জনশূন্য, সোডিয়ামের আলোয় বনানীর রাতটা বড় বেশি কৃত্রিম লাগে। ধোঁয়ার একটা দীর্ঘ কুণ্ডলী ছেড়ে মোর্শেদ ভাবতে বসল সেই পড়ন্ত বিকেলের কথা। সেই ছোট্ট হোটেল, ইলিশ মাছ আর ভাতের সেই অদ্ভুত তৃপ্তিদায়ক ‘লাঞ্চ ডেট’। সামিনা যখন নিচু হয়ে খাচ্ছিল, মোর্শেদের বারবার নজর কেড়ে নিচ্ছিল তার ঘাড়ের কাছে ঝুলে থাকা সেই বিশাল আকৃতির ঝোলা খোঁপাটা।
মোর্শেদ মনে মনে সেই খোঁপাটার আয়তন আর গুরুত্ব মাপার চেষ্টা করল। পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে সে অনেক আধুনিক চুলের সাজ দেখেছে, কিন্তু সামিনার এই অবাধ্য চুলের স্তূপ যেন এক রাজকীয় আভিজাত্য বয়ে বেড়াচ্ছে। সে কল্পনা করল, ওই খোঁপাটা যদি একবার হাতের টানে খুলে দেওয়া হয়, তবে চুলের সেই আদিম কালো নদী কোথা থেকে কোথায় বয়ে যাবে? হয়তো সামিনার সেই গভীর পিঠের বাঁক ছাপিয়ে তা তার উত্তাল ও ভারী নিতম্বের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়বে।
সামিনার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ মোর্শেদের চোখে এখনো ভাসছে। তার ভরাট বুকের সেই মাদকতা আর শরীরের সেই মাংসল পূর্ণতা মোর্শেদকে এক ধরণের আদিম তৃষ্ণা দিচ্ছে। সে যতবার ভাবছে ওই খোঁপাটা খুলে সামিনাকে সম্পূর্ণ নগ্নাবস্থায় দেখার কথা, ততবারই তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র শিহরণ খেলে যাচ্ছে। সিগারেটের ফিল্টারে শেষ টান দিয়ে সে মনে মনে এক অদ্ভুত পুলক অনুভব করল। সামিনা কেবল এক নারী নয়, সে যেন এক রহস্যময়ী অরণ্য—যেখানে মোর্শেদ বারবার হারিয়ে যেতে চায়।
রাত বাড়ছে। আকাশের এককোণে বাঁকা চাঁদ। মোর্শেদ জানে, আজকের রাতটা কেবল কল্পনায় কাটবে না। সে ফোনটা হাতে নিল। রাত এখন বারোটা ছুঁইছুঁই। সামিনা কি অনলাইনে আসবে?
মোর্শেদ আজ রাতে নিজেকে সংবরণ করার এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। ফোনটা হাতে নিয়েও সে মেসেজ অপশনে গেল না। সে চায় না সামিনা তাকে সহজলভ্য ভাবুক, কিংবা এই তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে কোনো আলগা শব্দ খরচ করে সে সামিনার চোখে তার আভিজাত্য ক্ষুণ্ণ করুক।
বারান্দার আরামকেদারায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে মোর্শেদ গ্যালারি থেকে সামিনার সেই আগে পাঠানো ছবিটা বের করল। গতদিন এই ছবিটাই ছিল মোর্শেদের একমাত্র অবলম্বন। ছবিতে সামিনা টেবিলের ওপাশে বসে আছে। মোর্শেদ জুম করে ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
কী অপরূপ সেই মুখচ্ছবি! ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই ম্লান হাসির আড়ালে কত না বলা কথা। মোর্শেদ নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “কী সুন্দর চেহারা! কী মোহময়ী এই ঠোঁট দুটো!” কিন্তু তার বিস্ময় কাটছে না সামিনার কেশরাশি নিয়ে। ছবিতে সামিনা তার চুলগুলোকে এমনভাবে গুছিয়ে রেখেছে যে মোর্শেদ টেরই পায়নি এর পেছনে এত বড় এক আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। আজকের সেই ঝোলা খোঁপার বিশালত্ব দেখার পর এই ছবির সামিনাকে তার কাছে রহস্যময়ী মনে হলো। সে ভাবল, “আচ্ছা, সামিনা তার এই দুর্লভ কেশ-সম্পদ এত সুন্দর করে লুকিয়ে রাখল কী করে? এমন রেশমি অবাধ্যতা কি সত্যি গোপন রাখা সম্ভব?”
সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে পিষে মোর্শেদ চোখ বন্ধ করল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বিকেলের সেই দৃশ্য— বাইকের ওপর সামিনা যখন নড়েচড়ে বসছিল, তখন তার ব্লাউজের নিচ দিয়ে শাড়ির সরু পাড় আর কোমরের সেই অনাবৃত অংশটুকু। পিঠের মেরুদণ্ড বরাবর যে গভীর খাঁজ বা ভাঁজটা নিচে নেমে গেছে, সেই জ্যামিতিক কারুকাজ মোর্শেদকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল।
মোর্শেদের মনে হলো, ওই মেরুদণ্ডের ভাঁজ ধরে আঙুল নামিয়ে নিয়ে যাওয়া আর বনানীর দশতলার ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপ দেওয়া—দুটোর পরিণাম একই। এক চরম ও অবধারিত পতন। এই পতন ধ্বংসের নয়, বরং এক আদিম অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার। সামিনার ওই পিঠের ভাঁজ যেন এক অনন্ত সুড়ঙ্গ, যার শেষ কোথায় মোর্শেদ জানে না, কিন্তু সে সেখানে স্বেচ্ছায় বারবার আছড়ে পড়তে চায়।
মোর্শেদ যখন তার আইপ্যাডের বড় স্ক্রিনে সামিনার সেই ভরাট পিঠ আর মেরুদণ্ডের রহস্যময় ভাঁজটা নিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন, ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘর কাঁপিয়ে তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। অন্ধকার ঘরে ফোনের নীল আলোটা সামিনার নামের ওপর নাচছে।
সামিনা মেসেজ করেছে:
"জেগে আছেন? নাকি বাইকের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন?"
মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:
"ক্লান্তি কোথায়? আমি তো এখনো সেই মেটিয়রের থরথরানি অনুভব করছি। আপনি ঘুমোননি?"
সামিনা উত্তর দিতে দেরি করল না:
"না, চুল শুকাচ্ছি। আজকের দিনটার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মোর্শেদ। আমি সত্যিই আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। এই ঋণ হয়তো কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
'ঋণ' শব্দটা দেখে মোর্শেদ একটু নড়েচড়ে বসল। সে চায় না তাদের এই সম্পর্কের মাঝে কোনো দায়বদ্ধতা বা কৃতজ্ঞতার দেয়াল থাকুক। সে কিবোর্ডে আঙুল চালাল:
"ঋণ? এই শব্দটা বলে আমাকে ছোট করবেন না সামিনা। বন্ধুত্বের মাঝে আবার পাওনা-গণ্ডা কিসের? বরং আমাকে যদি আপনার একটুও কাছের মানুষ ভাবেন, তবে এই ঋণ শব্দটা ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলুন। এটা আমাকে পর করে দিচ্ছে।"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু সময় নিল। তারপর লিখল:
"পর করে দেওয়ার সাধ্য কি আমার আছে? আপনি তো আজ জোর করে আমার অনেক গভীরে জায়গা করে নিয়েছেন। ওই যে, বাইকের পেছনে বসার সময় বারবার আপনার কাঁধ খামচে ধরছিলাম... আমি বোধহয় একটু বেশিই ভয় পাচ্ছিলাম।"
মোর্শেদ এবার একটু দুষ্টুমি মিশিয়ে লিখল:
"ভয় পাচ্ছিলেন? নাকি ওটা একটা অজুহাত ছিল আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার? সত্যি করে বলুন তো, আমার জ্যাকেটটা কি আপনার নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়নি?"
সামিনা একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল:
"অজুহাত তো আপনিই তৈরি করেছিলেন ওই হার্ড ব্রেকগুলো কষে! আমি তো কয়েকবার আপনার গায়ের ওপর ছিটকেই পড়েছিলাম। ইচ্ছে করেই অমন করছিলেন না তো?"
মোর্শেদ এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে পালটা উত্তর দিল:
"আমি কি অতটা খারাপ? তবে হ্যাঁ, আপনার ওই হাতের চাপ আর পিঠের ওপর আপনার উষ্ণ উপস্থিতি আমাকে বাইক চালানো ভুলিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বনানী না গিয়ে যদি রাস্তাটা অনন্তকালের জন্য লম্বা হতো, তবে মন্দ হতো না।"
সামিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে এবার একটু গাঢ় স্বরে লিখল:
"আপনার সাহস তো কম না! এত রাতে একজন ভদ্রমহিলাকে এসব বলতে আপনার বুক কাঁপে না?"
মোর্শেদ হাসল। তার ভেতরের পুরুষালি দম্ভটা আজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সে লিখল:
"বুক তো আজ দুপুরে আপনার ভরাট উপস্থিতিতেই কাঁপছিল সামিনা। এখন তো কেবল তার প্রতিধ্বনি হচ্ছে। আর ভদ্রমহিলা? আমার চোখে আপনি কেবল এক মায়াবী অরণ্য, যার গভীরে আমি আজ হারিয়ে গিয়েছি।"
সামিনা আর কিছু লিখল না। কিছুক্ষণ কেবল 'Typing...' লেখাটা দেখা যাচ্ছিল। মোর্শেদ বুঝতে পারল, ওপাশে সামিনা এখন লজ্জায় রাঙা হয়ে নিজের সেই ভেজা চুলগুলো নিয়ে খেলা করছে। পরিবেশটা এখন মদির, দুই হৃদয়ের মাঝখানের সেই অদৃশ্য সুতোগুলো এখন বেশ টানটান।
মোর্শেদ যখন সামিনার ‘মোর্শেদ’ ডাকের রেশটুকু উপভোগ করছিল, ঠিক তখনই ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠল সেই কাঙ্ক্ষিত ছবিটা। সামিনা সকালেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই মিরর সেলফিটা তুলেছিল।
ছবিতে সামিনাকে দেখে মোর্শেদের মনে হলো সময় যেন থমকে গেছে। সকালের সেই কাঁচা রোদ জানালার পর্দা গলে সামিনার ওপর পড়েছে। পরনে সেই চেনা সবুজ শাড়ি আর কালো ব্লাউজ। কিন্তু ছবিতে সামিনা এক অন্যরকম দেবী। তার ফর্সা মুখে ভোরের স্নিগ্ধতা, চোখে এক অদ্ভুত চপলতা। তবে মোর্শেদের চোখ আটকে গেল তার উন্মুক্ত চুলে। সামিনা তখনো তার কেশরাশি বাঁধেনি। কাজলকালোর মতো সেই এক রাশ ঘন চুল তার দু’কাঁধ বেয়ে সামনে নেমে এসেছে, কিন্তু যেহেতু ছবিটি সামনে থেকে তোলা, তাই পিঠের ওপর বয়ে যাওয়া চুলের সেই দীর্ঘ নদীটি মোর্শেদের চোখের আড়ালেই রয়ে গেল।
মোর্শেদ স্ক্রিন জুম করে দেখল। সামিনার ভরাট শরীরটা ওই কালো ব্লাউজ আর সবুজ শাড়ির ভাঁজে যেন ফেটে পড়ছে। মোর্শেদের মনে এক তীব্র আক্ষেপ মোচড় দিয়ে উঠল—ইশ! সামিনা যদি পেছন ফিরে ছবিটা তুলত, তবে চুলের সেই আদিম দৈর্ঘ্য আর কোমরের সেই গভীর ভাঁজটা তৃপ্তিভরে দেখা যেত।
সামিনা নিচে মেসেজ পাঠাল:
"সকালেই তুলেছিলাম। কিন্তু তখন আপনাকে পাঠানোর মতো সাহস বা পরিস্থিতি কোনোটাই ছিল না। ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম, এখন ছবিটা গ্যালারিতে দেখে মনে হলো আপনাকে দেই।"
মোর্শেদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো টাইপ করল:
"সামিনা, আপনি কি জানেন আপনি কী করেছেন? এই ছবিটা দেখার পর বনানীর এই ফ্ল্যাটে আমার অক্সিজেন কমে যাচ্ছে। আপনার এই রূপ... এটা কেবল সৌন্দর্য নয়, এটা একটা নেশা। ছবিতে আপনি ঠিক যেন এক টুকরো ভোরের আলো, কিন্তু আপনার ওই চুলগুলো... ওরা তো আমার সাথে প্রতারণা করছে।"
সামিনা লিখল:
"প্রতারণা? কেন? কী দোষ করল আমার চুল?"
মোর্শেদ তার মনের আক্ষেপটা চেপে রাখতে পারল না:
"দোষ তো আপনার। ছবিটা সামনে থেকে তুলে চুলের অর্ধেক রহস্যই তো আড়াল করে রাখলেন। আমি তো জানি ওই কালো মেঘের দল আপনার পিঠ ছাপিয়ে কোথায় গিয়ে নেমেছে। ছবির সামনে থেকে তো আর সেই গভীরতা মাপা যাচ্ছে না।"
সামিনা ওপাশে বোধহয় একটু হাসল, তারপর লিখল:
"সব রহস্য কি একদিনেই ফাঁস করতে হয়? কিছুটা না হয় আক্ষেপ হয়েই থাক। আক্ষেপ থাকলে তৃষ্ণা বাড়ে।"
মোর্শেদ এবার বাঁধভাঙা প্রশংসা শুরু করল:
"আপনার তৃষ্ণা বাড়ানোর কৌশলটা দারুণ। এই সবুজ শাড়িতে আপনাকে জ্যান্ত কোনো বনলতা সেন মনে হচ্ছে। আর আপনার এই শরীর... সামিনা, আপনার এই ভরাট রূপ দেখার পর কোনো পুরুষের পক্ষে স্বাভাবিক থাকা অসম্ভব। আমি বারবার ছবিটা দেখছি আর ভাবছি, সামনাসামনি আপনাকে দেখার সময় আমি ঠিক কতটা সামলে ছিলাম নিজেকে!"
সামিনা শুধু একটা লজ্জার ইমোজি পাঠাল। মোর্শেদ ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনার সেই না পাঠানো ছবি আর তার এই নতুন ‘মোর্শেদ’ সম্বোধন—সব মিলিয়ে বনানীর এই বিলাসপুরী ফ্ল্যাটটি আজ মোর্শেদের কাছে এক মদির বন্দিশালা মনে হতে লাগল।
মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। সামিনার সেই সবুজ শাড়িতে মোড়ানো ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক যেন তার চোখের মণি হয়ে তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে। সিগারেটের ধোঁয়া শেষবার লম্বা করে টেনে সে এবার নিজের মনের লাগাম আলগা করে দিল। আজ আর আভিজাত্যের মুখোশ পরে থাকা সম্ভব নয়।
সে দ্রুত টাইপ করল:
"সামিনা, আপনাকে এই রূপে দেখার পর আমি একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আছি। আপনাকে হয়তো বলা হয়নি, কিন্তু আজকের এই সারাটা দিন আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনের সব হিসেব ওলটপালট করে দিয়েছে। আমি কেবল আপনার সাহায্যকারী হয়ে থাকতে আসিনি... কেন জানি মনে হচ্ছে, আপনি আমার সেই মরা গাঙে জোয়ার এনে দিয়েছেন। আমি বোধহয় আপনার মায়ার জালে খুব বাজেভাবে জড়িয়ে পড়েছি।"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু সময় নিয়ে লিখল:
"জড়িয়ে পড়া কি এতই সহজ? আপনি তো অভিজ্ঞ মানুষ, আপনি মোহ আর মায়ার পার্থক্য ভালোই জানেন।"
মোর্শেদ এবার আরও সোজাসুজি আঘাত করল:
"মোহ হলে সেটা বিকেলের রোদেই ফুরিয়ে যেত। কিন্তু এটা তো আমাকে দহন করছে। সামিনা, আমার কেন জানি এখনই আপনার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। আপনার ওই ভেজা চুলের ঘ্রাণ সরাসরি নেওয়ার জন্য আমি এই মাঝরাতে আবার বাইক স্টার্ট দিতে পারি। আমি আপনার সাথে খুব দ্রুত দেখা করতে চাই। কাল কি সম্ভব?"
সামিনা মোর্শেদের এই সরাসরি প্রেম নিবেদন আর অস্থিরতার জবাব সরাসরি দিল না। সে জানত কীভাবে পুরুষকে তৃষ্ণার্ত রাখতে হয়। সে রহস্যময়ভাবে লিখল:
"ছুটে আসতে চাইলেই কি আসা যায় মোর্শেদ? মাঝরাতের এই আবদারগুলো বড় বিপজ্জনক। আর দেখা করা? সময় সব বলে দেবে। তবে এখনই সব পাওয়ার জেদ করলে কিন্তু হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে।"
মোর্শেদ মরিয়া হয়ে লিখল:
"আপনি আমাকে ধাঁধায় ফেলছেন। আপনি কি জানেন না আপনার এই না-বলা কথাগুলো আমাকে কতটা অস্থির করছে? একবার অন্তত বলুন, আপনার মনেও কি আমার জন্য সামান্যতম দোলা লেগেছে?"
সামিনা এবার খুব কৌশলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে লিখল:
"দোলা তো নদীর জলেও লাগে, তাই বলে কি নদী তার কুল ছাড়ে? রাত অনেক হয়েছে মোর্শেদ। আপনার চোখে এখন ঘুম নামা দরকার, না হলে কাল সকালে আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারবেন না। আজকের এই ছবিটা আর আমাদের কথাগুলো না হয় বালিশের নিচে চাপা থাক।"
মোর্শেদ বুঝতে পারল সামিনা তাকে এক সুনিপুণ ছলনায় আটকে দিয়েছে। সে তাকে কাছেও টানছে না, আবার দূরেও ঠেলে দিচ্ছে না। মোর্শেদ টাইপ করল:
"আপনি খুব কঠিন মানুষ সামিনা। আমার ঘুম কাড়লেন আপনি, আবার আপনিই বলছেন ঘুমোতে!"
সামিনা এবার শেষ মেসেজটি পাঠাল:
"কঠিন না হলে কি আর আপনার মতো মানুষকে কাবু করা যেত? আজকের মতো বিদায় মোর্শেদ। স্বপ্নের অরণ্যে বেশি ঘুরবেন না, পথ হারিয়ে ফেলবেন। শুভরাত্রি।"
সামিনা অফলাইনে চলে গেল। মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা তাকে উত্তর দেয়নি, কিন্তু তার এই 'ছলনাময়ী' আচরণই মোর্শেদকে আরও বেশি করে তার প্রতি আসক্ত করে তুলল। বনানীর নির্জন ফ্ল্যাটে একা দাঁড়িয়ে মোর্শেদ অনুভব করল, সে এক গভীর মায়ার খেলায় মেতে উঠেছে—যেখানে জেতা বা হারা বড় কথা নয়, এই অপেক্ষাটুকুই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ।
বাইকটা গ্যারেজে রেখে সে সোজা নিজের বেডরুমে চলে এল। গত কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তি আর উত্তেজনার ছাপ তার শরীরে। জ্যাকেটটা খুলে ছুড়ে মারল সোফায়। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারটা ছেড়ে দিয়ে সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল পানির নিচে। গরম পানির ধারা যখন তার পিঠ বেয়ে নামছে, মোর্শেদের মনে পড়ে গেল সামিনার সেই ‘পিষ্ট হওয়ার’ অনুভূতি। বাইকের গতির ঝাপটায় সামিনার ভরাট বুকগুলো বারবার তার পিঠে লেপ্টে যাচ্ছিল—সেই স্পর্শের একটা অদৃশ্য ছাপ যেন এখনো মোর্শেদের শরীরে গেঁথে আছে।
শাওয়ার শেষ করে হালকা কিছু খেয়ে নিল সে। খুব একটা খিদে নেই, কেবল শরীরটা সচল রাখার জন্য খাওয়া। এরপর একটা বড় গ্লাসে আইস কিউব দিয়ে হুইস্কি ঢেলে সে গিয়ে দাঁড়াল তার বারান্দায়। হাতে জ্বলন্ত মার্লবরো রেড।
সামনের রাস্তাটা জনশূন্য, সোডিয়ামের আলোয় বনানীর রাতটা বড় বেশি কৃত্রিম লাগে। ধোঁয়ার একটা দীর্ঘ কুণ্ডলী ছেড়ে মোর্শেদ ভাবতে বসল সেই পড়ন্ত বিকেলের কথা। সেই ছোট্ট হোটেল, ইলিশ মাছ আর ভাতের সেই অদ্ভুত তৃপ্তিদায়ক ‘লাঞ্চ ডেট’। সামিনা যখন নিচু হয়ে খাচ্ছিল, মোর্শেদের বারবার নজর কেড়ে নিচ্ছিল তার ঘাড়ের কাছে ঝুলে থাকা সেই বিশাল আকৃতির ঝোলা খোঁপাটা।
মোর্শেদ মনে মনে সেই খোঁপাটার আয়তন আর গুরুত্ব মাপার চেষ্টা করল। পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনে সে অনেক আধুনিক চুলের সাজ দেখেছে, কিন্তু সামিনার এই অবাধ্য চুলের স্তূপ যেন এক রাজকীয় আভিজাত্য বয়ে বেড়াচ্ছে। সে কল্পনা করল, ওই খোঁপাটা যদি একবার হাতের টানে খুলে দেওয়া হয়, তবে চুলের সেই আদিম কালো নদী কোথা থেকে কোথায় বয়ে যাবে? হয়তো সামিনার সেই গভীর পিঠের বাঁক ছাপিয়ে তা তার উত্তাল ও ভারী নিতম্বের ওপর গিয়ে আছড়ে পড়বে।
সামিনার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ মোর্শেদের চোখে এখনো ভাসছে। তার ভরাট বুকের সেই মাদকতা আর শরীরের সেই মাংসল পূর্ণতা মোর্শেদকে এক ধরণের আদিম তৃষ্ণা দিচ্ছে। সে যতবার ভাবছে ওই খোঁপাটা খুলে সামিনাকে সম্পূর্ণ নগ্নাবস্থায় দেখার কথা, ততবারই তার শিরদাঁড়া বেয়ে এক তীব্র শিহরণ খেলে যাচ্ছে। সিগারেটের ফিল্টারে শেষ টান দিয়ে সে মনে মনে এক অদ্ভুত পুলক অনুভব করল। সামিনা কেবল এক নারী নয়, সে যেন এক রহস্যময়ী অরণ্য—যেখানে মোর্শেদ বারবার হারিয়ে যেতে চায়।
রাত বাড়ছে। আকাশের এককোণে বাঁকা চাঁদ। মোর্শেদ জানে, আজকের রাতটা কেবল কল্পনায় কাটবে না। সে ফোনটা হাতে নিল। রাত এখন বারোটা ছুঁইছুঁই। সামিনা কি অনলাইনে আসবে?
মোর্শেদ আজ রাতে নিজেকে সংবরণ করার এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। ফোনটা হাতে নিয়েও সে মেসেজ অপশনে গেল না। সে চায় না সামিনা তাকে সহজলভ্য ভাবুক, কিংবা এই তীব্র উত্তেজনার মুহূর্তে কোনো আলগা শব্দ খরচ করে সে সামিনার চোখে তার আভিজাত্য ক্ষুণ্ণ করুক।
বারান্দার আরামকেদারায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে মোর্শেদ গ্যালারি থেকে সামিনার সেই আগে পাঠানো ছবিটা বের করল। গতদিন এই ছবিটাই ছিল মোর্শেদের একমাত্র অবলম্বন। ছবিতে সামিনা টেবিলের ওপাশে বসে আছে। মোর্শেদ জুম করে ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
কী অপরূপ সেই মুখচ্ছবি! ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই ম্লান হাসির আড়ালে কত না বলা কথা। মোর্শেদ নিজের মনেই বিড়বিড় করল, “কী সুন্দর চেহারা! কী মোহময়ী এই ঠোঁট দুটো!” কিন্তু তার বিস্ময় কাটছে না সামিনার কেশরাশি নিয়ে। ছবিতে সামিনা তার চুলগুলোকে এমনভাবে গুছিয়ে রেখেছে যে মোর্শেদ টেরই পায়নি এর পেছনে এত বড় এক আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। আজকের সেই ঝোলা খোঁপার বিশালত্ব দেখার পর এই ছবির সামিনাকে তার কাছে রহস্যময়ী মনে হলো। সে ভাবল, “আচ্ছা, সামিনা তার এই দুর্লভ কেশ-সম্পদ এত সুন্দর করে লুকিয়ে রাখল কী করে? এমন রেশমি অবাধ্যতা কি সত্যি গোপন রাখা সম্ভব?”
সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে পিষে মোর্শেদ চোখ বন্ধ করল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বিকেলের সেই দৃশ্য— বাইকের ওপর সামিনা যখন নড়েচড়ে বসছিল, তখন তার ব্লাউজের নিচ দিয়ে শাড়ির সরু পাড় আর কোমরের সেই অনাবৃত অংশটুকু। পিঠের মেরুদণ্ড বরাবর যে গভীর খাঁজ বা ভাঁজটা নিচে নেমে গেছে, সেই জ্যামিতিক কারুকাজ মোর্শেদকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল।
মোর্শেদের মনে হলো, ওই মেরুদণ্ডের ভাঁজ ধরে আঙুল নামিয়ে নিয়ে যাওয়া আর বনানীর দশতলার ছাদ থেকে নিচে ঝাঁপ দেওয়া—দুটোর পরিণাম একই। এক চরম ও অবধারিত পতন। এই পতন ধ্বংসের নয়, বরং এক আদিম অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার। সামিনার ওই পিঠের ভাঁজ যেন এক অনন্ত সুড়ঙ্গ, যার শেষ কোথায় মোর্শেদ জানে না, কিন্তু সে সেখানে স্বেচ্ছায় বারবার আছড়ে পড়তে চায়।
মোর্শেদ যখন তার আইপ্যাডের বড় স্ক্রিনে সামিনার সেই ভরাট পিঠ আর মেরুদণ্ডের রহস্যময় ভাঁজটা নিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন, ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘর কাঁপিয়ে তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। অন্ধকার ঘরে ফোনের নীল আলোটা সামিনার নামের ওপর নাচছে।
সামিনা মেসেজ করেছে:
"জেগে আছেন? নাকি বাইকের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন?"
মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত টাইপ করল:
"ক্লান্তি কোথায়? আমি তো এখনো সেই মেটিয়রের থরথরানি অনুভব করছি। আপনি ঘুমোননি?"
সামিনা উত্তর দিতে দেরি করল না:
"না, চুল শুকাচ্ছি। আজকের দিনটার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ মোর্শেদ। আমি সত্যিই আপনার কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। এই ঋণ হয়তো কোনোদিন শোধ করতে পারব না।"
'ঋণ' শব্দটা দেখে মোর্শেদ একটু নড়েচড়ে বসল। সে চায় না তাদের এই সম্পর্কের মাঝে কোনো দায়বদ্ধতা বা কৃতজ্ঞতার দেয়াল থাকুক। সে কিবোর্ডে আঙুল চালাল:
"ঋণ? এই শব্দটা বলে আমাকে ছোট করবেন না সামিনা। বন্ধুত্বের মাঝে আবার পাওনা-গণ্ডা কিসের? বরং আমাকে যদি আপনার একটুও কাছের মানুষ ভাবেন, তবে এই ঋণ শব্দটা ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলুন। এটা আমাকে পর করে দিচ্ছে।"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু সময় নিল। তারপর লিখল:
"পর করে দেওয়ার সাধ্য কি আমার আছে? আপনি তো আজ জোর করে আমার অনেক গভীরে জায়গা করে নিয়েছেন। ওই যে, বাইকের পেছনে বসার সময় বারবার আপনার কাঁধ খামচে ধরছিলাম... আমি বোধহয় একটু বেশিই ভয় পাচ্ছিলাম।"
মোর্শেদ এবার একটু দুষ্টুমি মিশিয়ে লিখল:
"ভয় পাচ্ছিলেন? নাকি ওটা একটা অজুহাত ছিল আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার? সত্যি করে বলুন তো, আমার জ্যাকেটটা কি আপনার নখের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়নি?"
সামিনা একটা হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল:
"অজুহাত তো আপনিই তৈরি করেছিলেন ওই হার্ড ব্রেকগুলো কষে! আমি তো কয়েকবার আপনার গায়ের ওপর ছিটকেই পড়েছিলাম। ইচ্ছে করেই অমন করছিলেন না তো?"
মোর্শেদ এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে পালটা উত্তর দিল:
"আমি কি অতটা খারাপ? তবে হ্যাঁ, আপনার ওই হাতের চাপ আর পিঠের ওপর আপনার উষ্ণ উপস্থিতি আমাকে বাইক চালানো ভুলিয়ে দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বনানী না গিয়ে যদি রাস্তাটা অনন্তকালের জন্য লম্বা হতো, তবে মন্দ হতো না।"
সামিনা কিছুক্ষণ চুপ থেকে এবার একটু গাঢ় স্বরে লিখল:
"আপনার সাহস তো কম না! এত রাতে একজন ভদ্রমহিলাকে এসব বলতে আপনার বুক কাঁপে না?"
মোর্শেদ হাসল। তার ভেতরের পুরুষালি দম্ভটা আজ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। সে লিখল:
"বুক তো আজ দুপুরে আপনার ভরাট উপস্থিতিতেই কাঁপছিল সামিনা। এখন তো কেবল তার প্রতিধ্বনি হচ্ছে। আর ভদ্রমহিলা? আমার চোখে আপনি কেবল এক মায়াবী অরণ্য, যার গভীরে আমি আজ হারিয়ে গিয়েছি।"
সামিনা আর কিছু লিখল না। কিছুক্ষণ কেবল 'Typing...' লেখাটা দেখা যাচ্ছিল। মোর্শেদ বুঝতে পারল, ওপাশে সামিনা এখন লজ্জায় রাঙা হয়ে নিজের সেই ভেজা চুলগুলো নিয়ে খেলা করছে। পরিবেশটা এখন মদির, দুই হৃদয়ের মাঝখানের সেই অদৃশ্য সুতোগুলো এখন বেশ টানটান।
মোর্শেদ যখন সামিনার ‘মোর্শেদ’ ডাকের রেশটুকু উপভোগ করছিল, ঠিক তখনই ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠল সেই কাঙ্ক্ষিত ছবিটা। সামিনা সকালেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই মিরর সেলফিটা তুলেছিল।
ছবিতে সামিনাকে দেখে মোর্শেদের মনে হলো সময় যেন থমকে গেছে। সকালের সেই কাঁচা রোদ জানালার পর্দা গলে সামিনার ওপর পড়েছে। পরনে সেই চেনা সবুজ শাড়ি আর কালো ব্লাউজ। কিন্তু ছবিতে সামিনা এক অন্যরকম দেবী। তার ফর্সা মুখে ভোরের স্নিগ্ধতা, চোখে এক অদ্ভুত চপলতা। তবে মোর্শেদের চোখ আটকে গেল তার উন্মুক্ত চুলে। সামিনা তখনো তার কেশরাশি বাঁধেনি। কাজলকালোর মতো সেই এক রাশ ঘন চুল তার দু’কাঁধ বেয়ে সামনে নেমে এসেছে, কিন্তু যেহেতু ছবিটি সামনে থেকে তোলা, তাই পিঠের ওপর বয়ে যাওয়া চুলের সেই দীর্ঘ নদীটি মোর্শেদের চোখের আড়ালেই রয়ে গেল।
মোর্শেদ স্ক্রিন জুম করে দেখল। সামিনার ভরাট শরীরটা ওই কালো ব্লাউজ আর সবুজ শাড়ির ভাঁজে যেন ফেটে পড়ছে। মোর্শেদের মনে এক তীব্র আক্ষেপ মোচড় দিয়ে উঠল—ইশ! সামিনা যদি পেছন ফিরে ছবিটা তুলত, তবে চুলের সেই আদিম দৈর্ঘ্য আর কোমরের সেই গভীর ভাঁজটা তৃপ্তিভরে দেখা যেত।
সামিনা নিচে মেসেজ পাঠাল:
"সকালেই তুলেছিলাম। কিন্তু তখন আপনাকে পাঠানোর মতো সাহস বা পরিস্থিতি কোনোটাই ছিল না। ব্যস্ততায় ভুলেই গিয়েছিলাম, এখন ছবিটা গ্যালারিতে দেখে মনে হলো আপনাকে দেই।"
মোর্শেদ মন্ত্রমুগ্ধের মতো টাইপ করল:
"সামিনা, আপনি কি জানেন আপনি কী করেছেন? এই ছবিটা দেখার পর বনানীর এই ফ্ল্যাটে আমার অক্সিজেন কমে যাচ্ছে। আপনার এই রূপ... এটা কেবল সৌন্দর্য নয়, এটা একটা নেশা। ছবিতে আপনি ঠিক যেন এক টুকরো ভোরের আলো, কিন্তু আপনার ওই চুলগুলো... ওরা তো আমার সাথে প্রতারণা করছে।"
সামিনা লিখল:
"প্রতারণা? কেন? কী দোষ করল আমার চুল?"
মোর্শেদ তার মনের আক্ষেপটা চেপে রাখতে পারল না:
"দোষ তো আপনার। ছবিটা সামনে থেকে তুলে চুলের অর্ধেক রহস্যই তো আড়াল করে রাখলেন। আমি তো জানি ওই কালো মেঘের দল আপনার পিঠ ছাপিয়ে কোথায় গিয়ে নেমেছে। ছবির সামনে থেকে তো আর সেই গভীরতা মাপা যাচ্ছে না।"
সামিনা ওপাশে বোধহয় একটু হাসল, তারপর লিখল:
"সব রহস্য কি একদিনেই ফাঁস করতে হয়? কিছুটা না হয় আক্ষেপ হয়েই থাক। আক্ষেপ থাকলে তৃষ্ণা বাড়ে।"
মোর্শেদ এবার বাঁধভাঙা প্রশংসা শুরু করল:
"আপনার তৃষ্ণা বাড়ানোর কৌশলটা দারুণ। এই সবুজ শাড়িতে আপনাকে জ্যান্ত কোনো বনলতা সেন মনে হচ্ছে। আর আপনার এই শরীর... সামিনা, আপনার এই ভরাট রূপ দেখার পর কোনো পুরুষের পক্ষে স্বাভাবিক থাকা অসম্ভব। আমি বারবার ছবিটা দেখছি আর ভাবছি, সামনাসামনি আপনাকে দেখার সময় আমি ঠিক কতটা সামলে ছিলাম নিজেকে!"
সামিনা শুধু একটা লজ্জার ইমোজি পাঠাল। মোর্শেদ ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনার সেই না পাঠানো ছবি আর তার এই নতুন ‘মোর্শেদ’ সম্বোধন—সব মিলিয়ে বনানীর এই বিলাসপুরী ফ্ল্যাটটি আজ মোর্শেদের কাছে এক মদির বন্দিশালা মনে হতে লাগল।
মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। সামিনার সেই সবুজ শাড়িতে মোড়ানো ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক যেন তার চোখের মণি হয়ে তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে। সিগারেটের ধোঁয়া শেষবার লম্বা করে টেনে সে এবার নিজের মনের লাগাম আলগা করে দিল। আজ আর আভিজাত্যের মুখোশ পরে থাকা সম্ভব নয়।
সে দ্রুত টাইপ করল:
"সামিনা, আপনাকে এই রূপে দেখার পর আমি একটা অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে আছি। আপনাকে হয়তো বলা হয়নি, কিন্তু আজকের এই সারাটা দিন আমার পঁয়তাল্লিশ বছরের জীবনের সব হিসেব ওলটপালট করে দিয়েছে। আমি কেবল আপনার সাহায্যকারী হয়ে থাকতে আসিনি... কেন জানি মনে হচ্ছে, আপনি আমার সেই মরা গাঙে জোয়ার এনে দিয়েছেন। আমি বোধহয় আপনার মায়ার জালে খুব বাজেভাবে জড়িয়ে পড়েছি।"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু সময় নিয়ে লিখল:
"জড়িয়ে পড়া কি এতই সহজ? আপনি তো অভিজ্ঞ মানুষ, আপনি মোহ আর মায়ার পার্থক্য ভালোই জানেন।"
মোর্শেদ এবার আরও সোজাসুজি আঘাত করল:
"মোহ হলে সেটা বিকেলের রোদেই ফুরিয়ে যেত। কিন্তু এটা তো আমাকে দহন করছে। সামিনা, আমার কেন জানি এখনই আপনার কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে। আপনার ওই ভেজা চুলের ঘ্রাণ সরাসরি নেওয়ার জন্য আমি এই মাঝরাতে আবার বাইক স্টার্ট দিতে পারি। আমি আপনার সাথে খুব দ্রুত দেখা করতে চাই। কাল কি সম্ভব?"
সামিনা মোর্শেদের এই সরাসরি প্রেম নিবেদন আর অস্থিরতার জবাব সরাসরি দিল না। সে জানত কীভাবে পুরুষকে তৃষ্ণার্ত রাখতে হয়। সে রহস্যময়ভাবে লিখল:
"ছুটে আসতে চাইলেই কি আসা যায় মোর্শেদ? মাঝরাতের এই আবদারগুলো বড় বিপজ্জনক। আর দেখা করা? সময় সব বলে দেবে। তবে এখনই সব পাওয়ার জেদ করলে কিন্তু হারিয়ে ফেলার ভয় থাকে।"
মোর্শেদ মরিয়া হয়ে লিখল:
"আপনি আমাকে ধাঁধায় ফেলছেন। আপনি কি জানেন না আপনার এই না-বলা কথাগুলো আমাকে কতটা অস্থির করছে? একবার অন্তত বলুন, আপনার মনেও কি আমার জন্য সামান্যতম দোলা লেগেছে?"
সামিনা এবার খুব কৌশলে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিয়ে লিখল:
"দোলা তো নদীর জলেও লাগে, তাই বলে কি নদী তার কুল ছাড়ে? রাত অনেক হয়েছে মোর্শেদ। আপনার চোখে এখন ঘুম নামা দরকার, না হলে কাল সকালে আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারবেন না। আজকের এই ছবিটা আর আমাদের কথাগুলো না হয় বালিশের নিচে চাপা থাক।"
মোর্শেদ বুঝতে পারল সামিনা তাকে এক সুনিপুণ ছলনায় আটকে দিয়েছে। সে তাকে কাছেও টানছে না, আবার দূরেও ঠেলে দিচ্ছে না। মোর্শেদ টাইপ করল:
"আপনি খুব কঠিন মানুষ সামিনা। আমার ঘুম কাড়লেন আপনি, আবার আপনিই বলছেন ঘুমোতে!"
সামিনা এবার শেষ মেসেজটি পাঠাল:
"কঠিন না হলে কি আর আপনার মতো মানুষকে কাবু করা যেত? আজকের মতো বিদায় মোর্শেদ। স্বপ্নের অরণ্যে বেশি ঘুরবেন না, পথ হারিয়ে ফেলবেন। শুভরাত্রি।"
সামিনা অফলাইনে চলে গেল। মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা তাকে উত্তর দেয়নি, কিন্তু তার এই 'ছলনাময়ী' আচরণই মোর্শেদকে আরও বেশি করে তার প্রতি আসক্ত করে তুলল। বনানীর নির্জন ফ্ল্যাটে একা দাঁড়িয়ে মোর্শেদ অনুভব করল, সে এক গভীর মায়ার খেলায় মেতে উঠেছে—যেখানে জেতা বা হারা বড় কথা নয়, এই অপেক্ষাটুকুই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)