10-02-2026, 03:11 PM
মোর্শেদ বাইকটা নিয়ে একদম সামিনার পায়ের কাছে এসে থামল। হেলমেটের ভাইজরটা তুলে সে এক ধরণের সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকাল সামিনার দিকে।
মোর্শেদ যখন বাইকটা নিয়ে একদম সামিনার সামনে এসে থামল, তখন সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সামিনার মধ্যে এক ধরণের অস্থির ও সাহসী পরিবর্তন। সামিনা আর আগের মতো মোর্শেদের অনুমতির অপেক্ষা করল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে বাইকের পেছনের হুকে ঝোলানো মোর্শেদের দামী গ্লসি হেলমেটটা আনহুক করে খুলে নিল। চুলে সেই রাজকীয় ঝোলা খোঁপা থাকার পরেও হেলমেটটা মাথায় পরতে আহামরি কোনো সমস্যা হলো না তার।
সামিনা এবার বাইকে ওঠার প্রস্তুতি নিল। আগেরবার বাইকে ওঠার সময় যে জড়তাটুকু ছিল, এবার তা অনেকটা কেটে গেছে। সে তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে তার সেই নরম ও কোমল হাত দিয়ে মোর্শেদের চওড়া কাঁধটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এরপর এক ধরণের ছন্দময় ভঙ্গিতে তার শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে মেটিয়রের পেছনের সিটে পাশ ফিরে চড়ে বসল। সামিনার রাজকীয় শরীরের ভারে বাইকটা আগের মতোই হালকা দেবে গেল, যা মোর্শেদের শরীরের প্রতিটি কোষে এক ধরণের রোমাঞ্চকর জানান দিল।
মোর্শেদ তখন তার ডান পাশের লুকিং মিররে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে জানে, সামিনা যখন পা উঁচিয়ে বাইকের সিটে নিজেকে থিতু করতে যায়, তখন তার নিতম্বের সেই উত্তাল ঢেউ এক নিপুণ কামনার দৃশ্য তৈরি করে। মোর্শেদ সেই দৃশ্যের এক বিন্দুও মিস করতে রাজি নয়। আয়নার প্রতিবিম্বে সে দেখতে পেল সামিনার ঘামে ভেজা পিঠের ওপর ঝুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটা। হেলমেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে থাকা ওই খোঁপাটায় মুখ গুঁজে দিয়ে সামিনার শরীরের সেই বুনো কামজ ঘ্রাণ বুক ভরে শুঁকে দেখতে ইচ্ছে করছিল মোর্শেদের। এক তীব্র কামনা মোর্শেদের রক্তে যেন হাহাকার করে উঠল।
সামিনা সিটে স্থির হয়ে বসতেই মোর্শেদ আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিল। সে নিজেকে কিছুটা সংযত করে মুচকি হেসে বলল, "ভালো করে ধরে বসুন মিস সামিনা জাহান। হাইওয়েতে কিন্তু আমি কাউকে করুণা করি না।"
কথাটা শেষ করেই মোর্শেদ বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। ৩৫০ সিসির সেই ভরাট গর্জন বিকেলের শান্ত বাতাসকে চিরে দিয়ে যেন এক নতুন যাত্রার ঘোষণা করল। মোর্শেদ ক্লাচ ছেড়ে এক্সিলারেটর ঘুরাতেই বাইকটা শিকারী চিতার মতো সামনের দিকে লাফিয়ে উঠল।
মেটিয়রের ভরাট গর্জন তুলে মোর্শেদ এক্সপ্রেসওয়ের ওপরের উড়ালপথে না উঠে নিচের রাস্তা ধরল। বিকেলের পাতলা ভিড় ঠেলে বাইকটা রাজকীয় ভঙ্গিতে এগোতে শুরু করল। অফিস-আদালত এখনো পুরোপুরি ছুটি হয়নি, তাই এয়ারপোর্ট রোডে চিরচেনা সেই স্থবির জ্যামটা এখনো জেঁকে বসেনি। রাস্তার ধারের গাছগুলো বিকেলের মরা আলোয় কেমন এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে।
সামিনা লক্ষ্য করল মোর্শেদ এয়ারপোর্টের দিকে না গিয়ে উত্তরার ভেতরের দিকে এগোচ্ছে। হেলমেটের ভেতর থেকে বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দ ছাপিয়ে সামিনা মোর্শেদের কানের কাছে মুখ নিয়ে একটু চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, "কই যাচ্ছেন মোর্শেদ সাহেব? এই রাস্তা তো আমার বাসার দিকে না। কোথায় যাচ্ছেন আপনি?"
মোর্শেদ আয়নায় সামিনার হেলমেট পরা মুখটা একবার দেখল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি। সে বাইকের গতি একটুও না কমিয়ে পালটা জবাব দিল, "আপনাকে নিয়ে পালাচ্ছি সামিনা জাহান! এই শহর, এই জ্যাম, এই থানা-পুলিশের দুনিয়া ছেড়ে অনেক দূরে পালাচ্ছি।"
সামিনা হুট করে এমন কথা শুনে থমকে গেল। তার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। সে হাসি লুকানোর চেষ্টা করে বলল, "পালিয়ে যাবেন কোথায়? বনানীর রাজপুত্র কি আমার মতো এক সাধারণ কলেজ শিক্ষিকাকে নিয়ে পালানোর সাহস রাখে?"
মোর্শেদ এবার একটু গম্ভীর হলো, কিন্তু তার স্বরে মাদকতা কমল না। সে বলল, "সাহস তো জন্মগত, সামিনা। কিন্তু পালাবার মতো সঙ্গী পাওয়াটাই ছিল কঠিন। আজ যখন পেয়েছি, তখন আর ফেরার পথ খুঁজতে চাইছি না। এই যে বিকেলের বাতাসটা আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, এর কি কোনো গন্তব্য আছে? আমাদেরও না হয় আজ কোনো গন্তব্য না থাকুক।"
সামিনা আশ্চর্যের সাথে মোর্শেদের এই দার্শনিক রূপটা দেখল। সে নরম গলায় বলল, "গন্তব্যহীন যাত্রা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন মোর্শেদ সাহেব। রাত হলে কিন্তু ঠিকই আমাদের যার যার ইকোসিস্টেমে ফিরতে হবে।"
"তাহলে রাত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সময়টুকু না হয় আমাদের একার হোক," মোর্শেদের এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে সামিনা আর কোনো তর্ক করল না।
রাস্তার ছোটখাটো ঝাঁকুনিতে সামিনা নিজেকে সামলাতে বারবার মোর্শেদের চওড়া কাঁধটা আরও শক্ত করে খামচে ধরছিল। মোর্শেদ তার পিঠের ওপর সামিনার সেই নরম অথচ উত্তাল শরীরের প্রতিটি কম্পন অনুভব করছিল। সামিনার শরীরের ভার আর সেই বিকেলের উষ্ণতা মোর্শেদের স্নায়ুতে এক অদ্ভুত নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা যদি কোনোদিন শেষ না হতো!
পথ চলতে চলতে মোর্শেদ উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের এক ছিমছাম, আভিজাত্যমাখা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে বাইক থামাল। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশটা হঠাৎ খুব শান্ত হয়ে গেল।
মোর্শেদ হেলমেট খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল। "নামুন ম্যাডাম। চলুন ভেতরে যাওয়া যাক।"
সামিনা অবাক হয়ে চারপাশটা দেখল। মোর্শেদ তার দ্বিধা কাটিয়ে দিতে বলল, "থানায় বসে দুশ্চিন্তা করতে করতে ভুলেই গেছেন যে আজ আমাদের লাঞ্চ করা হয়নি। খালি পেটে অন্তত পালানো যায় না। চলুন!"
সামিনা নামতে নামতে ভাবল, এই লোকটা শুধু শরীর আর মন নয়, তার ক্ষুধার খবরও কেমন করে যেন ঠিকই জানে।
রেস্টুরেন্টে ঢুকেই এসি-র হিমেল স্পর্শে দুজনের শরীর জুড়িয়ে গেল। মোর্শেদ সামিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সারাদিন তো অনেক ধকল গেল, আগে ওয়াশরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি এখানেই বসছি।”
সামিনা গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। হেলমেটের ভেতর গরমে মুখটা লাল হয়ে আছে, কপালের কয়েকটা অবাধ্য চুল ঘামে লেপ্টে। মুখে পানির ঝাপটা দিতেই এক অদ্ভুত স্বস্তি পেল সে। মোর্শেদও ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে বসল। সামিনা ফিরে আসতেই মোর্শেদ মেনু কার্ডটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “অর্ডারটা আজ আপনিই দিন। আমাদের প্রথম ডেট, আপনার পছন্দটাই আগে চলুক।”
সামিনা মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখল। চাইনিজ বা কন্টিনেন্টাল খাবারের ভিড়ে সে খুঁজছিল একদম দেশীয় কিছু। অবশেষে মুখ তুলে মৃদু হেসে বলল, “আমি আসলে পুরোপুরি মাছে-ভাতে বাঙালি। দুপুরের খাবারে এই ভাত-মাছ বা মাংস না হলে আমার ঠিক জমে না।”
মোর্শেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বনানীর দামী রেস্টুরেন্টগুলোতে সে অভ্যস্ত স্টেক বা পাস্তায়, কিন্তু সামিনার এই সারল্য তাকে মুগ্ধ করল। সে বলল, “চমৎকার! তাহলে আমিও আজ আপনার সাথেই মাছে-ভাতে বাঙালি হয়ে যাই। দিন, ভাতেরই অর্ডার দিন।”
অর্ডার দেওয়ার পর ওয়েটার চলে যেতেই সামিনা একটু লাজুক হেসে বলল, “আসলে আমি সাধারণত বাইরে খাই না। নিজের হাতের রান্নাই বেশি পছন্দ। বিনয় করছি না, কিন্তু আমি সত্যি খুব ভালো রাঁধতে পারি।”
মোর্শেদ এবার সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে সামিনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “তাই নাকি? তাহলে তো একদিন আপনার হাতের রান্নার দাওয়াত নিতেই হয়। এমন একজন রাঁধুনীর খাবার না খেলে জীবনটাই বৃথা।”
সামিনা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে এক ধরণের প্রশ্রয় ছিল। সে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, কোনো একদিন চলে আসুন আমার সেই যাত্রাবাড়ীর আস্তানায়। নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াবো। তবে সাবধান! খাবারের মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে আপনাকে কিন্তু একদম কালো জাদু করে ফেলব।”
মোর্শেদ একটুও না দমে সামিনার আরও কাছে ঝুঁকে এল। কণ্ঠস্বরটা খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জাদু কি আর করতে বাকি রেখেছেন নাকি সামিনা? জাদু তো আপনি সেই প্রথম যেদিন মেসেজ দিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই করে বসে আছেন। এখন শুধু বাকি আছে আপনার হাতের ওই রান্নার নেশায় পড়া।”
সামিনা এবার মোর্শেদের কথার ধার দেখে একটু থমকাল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, “আপনি না পারেনও বটে! লোকে ঠিকই বলে— যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে।”
মোর্শেদ সামিনার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রসিকতা করে বলল, “চুল তো আপনার সেই শুরু থেকেই বাঁধা অবস্থাতেই দেখলাম। বাঁধতে আর দেখলাম কই? ওটা কি কখনো খোলে না?”
সামিনা ঠোঁট উল্টে পাল্টা জবাব দিল, “চুল বাঁধতে দেখেননি বলে আক্ষেপ করছেন? এদিকে যে বললেন রান্না করি, সেই রান্না করতেই বা আমাকে কবে দেখলেন?”
মোর্শেদ হাসল। এক গভীর এবং রহস্যময় হাসি। সে বুঝতে পারছে, এই নারীর কথার জাদুতে সে এখন পুরোপুরি বন্দি। রেস্টুরেন্টের মৃদু আলো আর সুস্বাদু খাবারের সুবাসে তাদের প্রথম ডেটটা যেন এক নিষিদ্ধ কিন্তু সুন্দর কাব্যে রূপ নিল।খাবার আসার অপেক্ষায় থাকা সেই মুহূর্তটিতে মোর্শেদ সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে আগের কথার খেই ধরল। তার গলার স্বরে এবার এক ধরণের গভীর মুগ্ধতা। সে খুব নরম গলায় বলল, "ঠাট্টা করছি না সামিনা, সত্যিই আপনার চুলগুলো অসম্ভব সুন্দর। সেই দুপুর থেকে আমি আপনার এই রাজকীয় চুলের প্রেমে পড়ে গেছি। একটা মানুষের চুল এতটা মায়াবী হতে পারে, আপনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।"
সামিনা মোর্শেদের এমন সরাসরি প্রশংসা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে সামিনা জবাব দিল, "বাহ! চুলের প্রেমে পড়েছেন শুনে ভালো লাগল। চুলের প্রেমেই সীমাবদ্ধ থাকুন মোর্শেদ সাহেব, আমার প্রেমে না পড়লেই হলো। আমার প্রেমে পড়া কিন্তু বড্ড বিপজ্জনক!"
মোর্শেদ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ওয়েটার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর ভাজি-ভর্তার বাটিগুলো নিয়ে হাজির হলো। খাবারের সুবাসে টেবিলটা মুহূর্তেই ম ম করে উঠল। তারা দুজন আর কথা না বাড়িয়ে ঝটপট খাওয়া শুরু করল। থানার ধকল আর বিকেলের ক্ষিধেয় যেন দুজনেরই ভাতের থালার দিকে পূর্ণ মনোযোগ।
খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মোর্শেদ একবার মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা সামিনা, রুবানা আপা তো খুব করে বলছিলেন ওনাদের বাসায় যেতে। টঙ্গী খুব একটা দূরেও ছিল না, গেলে হয়তো ওনারা খুশি হতেন। আপনি গেলেন না কেন?"
সামিনা এক লোকমা ভাত মুখে তুলে চিবিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "এখন দরকার নেই আপার বাসায় যাওয়ার। পরে কোনো একদিন যাওয়া যাবে। তাছাড়া সজল মাত্র ওসব থেকে ছাড়া পেল, এখন গেলে আপা কান্নাকাটি করে একাকার করবেন। আমার এখন আর ওসব ভালো লাগছে না।"
সামিনা আসলে আসল সত্যটা মোর্শেদের কাছে গোপনই রাখল। সে মনে মনে চাচ্ছিল না এই প্রথম দেখার দিনে মোর্শেদকে নিয়ে বড় বোনের বাসায় গিয়ে নতুন কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে। মোর্শেদের সাথে কাটানো এই একান্ত সময়টুকু সে নিজের মতো করে উপভোগ করতে চেয়েছিল, যা কারো পারিবারিক বলয়ে গিয়ে নষ্ট হোক তা তার কাম্য ছিল না।
মোর্শেদ সামিনার কথার ভেতরে থাকা সেই প্রচ্ছন্ন এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিটা লক্ষ্য করল। সে মনে মনে হাসল। সে বুঝতে পারল সামিনা কেবল তার 'ইকোসিস্টেম' নয়, তার ব্যক্তিগত সীমানা নিয়েও খুব সচেতন। আর এই সচেতনতাই মোর্শেদকে সামিনার প্রতি আরও বেশি কৌতূহলী করে তুলছে।
খাওয়া শেষ করে তারা যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে বের হলো, ততক্ষণে আকাশের গোধূলি রঙ মুছে গিয়ে সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নেমেছে। শহরের বাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে, আর সেই কৃত্রিম আলো-আঁধারিতে চারপাশটা অন্যরকম এক মায়ায় ঢেকে গেছে।
মোর্শেদ তার মেটিয়র ৩৫০-এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সামিনা তার পাশে আসতেই মোর্শেদের শিকারী চোখগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। সে বাইকের ওপর উঠে বসে লুকিং মিররটা এমনভাবে সেট করে নিল যাতে পেছনের প্রতিটি দৃশ্য তার নজরে থাকে।
সামিনা যখন বাইকে ওঠার জন্য পা বাড়াল, মোর্শেদ অপলক চোখে আয়নায় সেই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগল। সামিনার শরীরের সেই রাজকীয় গঠন, তার ভারী নিতম্বের ছন্দময় দুলুনি আর বাইকে ওঠার সময় তার শরীরের যে মোচড়—সবকিছুই মোর্শেদের মনে এক ধরণের আদিম উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সামিনার শরীরের প্রতিটি খাঁজ আর শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা তার সেই ভরাট অবয়ব মোর্শেদের কামনার অনলকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
শুধু শরীর নয়, মোর্শেদের নজর আটকে রইল সামিনার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটার দিকেও। বিকেলের রোদে যা তাকে মুগ্ধ করেছিল, রাতের এই মায়াবী অন্ধকারে তা যেন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মোর্শেদ অনুভব করল, সামিনার শরীরের ঘ্রাণ আর তার এই সজীব উপস্থিতি তার সবটুকু যৌক্তিক চিন্তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
সামিনা যখন মোর্শেদের কাঁধে হাত রেখে পেছনের সিটে থিতু হয়ে বসল, তখন মোর্শেদ অনুভব করল তার পিঠের ওপর সামিনার স্তনের মৃদু স্পর্শ। সেই নরম ও উষ্ণ অনুভূতিটা মোর্শেদের শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শিহরণ বইয়ে দিল। মোর্শেদ বুঝতে পারল, এই নারীর সান্নিধ্য তাকে এমন এক গোলকধাঁধায় নিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই।
মোর্শেদ বাইকের স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের সেই ভারী গুমগুম শব্দের সাথে সাথে মোর্শেদের হৃদস্পন্দনও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। সে ভাইজরটা নামিয়ে দিয়ে বাইকটা গতির দিকে নিয়ে গেল।
রাতের ঢাকা যেন এক মায়াবী অরণ্য, আর সেই অরণ্যের বুক চিরে মোর্শেদের মেটিয়র ৩৫০ যেন ডানা মেলা এক শিকারী পাখি। এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে বাইকটা যখন মালিবাগের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন চিরচেনা সেই যানজট তাদের গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। শত শত গাড়ির হেডলাইটের আলো আর হর্নের শব্দের মাঝে মোর্শেদ বাইকটা থিতু করল।
দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর দুপুরের ধকলের পর সামিনা যেন এখন অনেকটা ভারমুক্ত। সে মোর্শেদের পিঠের ওপর শরীরের ওপরের অংশের পুরো ভার ছেড়ে দিয়ে একরকম আয়েশ করে বসে আছে। ভ্যাপসা গরমে সামিনার শরীর ঘামে ভেজা, আর সেই ভেজা শাড়ি আর শরীর যেন আঠার মতো মোর্শেদের শার্টের সাথে লেপ্টে আছে। সামিনার শরীরের সেই উত্তাপ আর ভারী ওজনটা মোর্শেদের কাছে মোটেও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না, বরং সে প্রতিটা মুহূর্ত হাড় দিয়ে উপভোগ করছে। একজন নারীর শরীরের এমন নিবিড় সান্নিধ্য মোর্শেদকে এক ধরণের অদ্ভুত পুরুষালী অহংকারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
জ্যামে স্থবির হয়ে বসে থাকতে থাকতে মোর্শেদের চোখ গেল লুকিং মিররের ওপর। আয়নায় দেখল তাদের ঠিক পেছনেই একটা সাদা রঙের প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে একজন মধ্যবয়সী লোক একা বসে—পোশাক আর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে নির্ঘাত কোনো উবার ড্রাইভার। মোর্শেদ লক্ষ্য করল, লোকটা ড্রাইভ করার বদলে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সামিনার দিকে। আয়নার ফ্রেমে মোর্শেদ স্পষ্ট দেখল, লোকটা যেন সামিনার পেছনের সেই রাজকীয় সৌন্দর্য আর স্তূপীকৃত খোঁপাটা চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে।
ড্রাইভারের চোখের সেই তৃষ্ণার্ত চাহনি দেখে মোর্শেদ পরিষ্কার বুঝতে পারল—লোকটা মনে মনে মোর্শেদের ভাগ্য নিয়ে চরম ঈর্ষা করছে। মোর্শেদের মতো একজন মানুষের পেছনে এমন একজন ভরাট এবং মোহময়ী নারীকে দেখে ড্রাইভারের অবদমিত কামনা যেন হিংসায় রূপ নিয়েছে।
দৃশ্যটা দেখে মোর্শেদ নিজের মনেই একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। সে ভাবল, এই সামিনা যদি তার বাইকের ব্যাকসিটের স্থায়ী সঙ্গী হয়, তবে আজ শুধু এই ড্রাইভার কেন, পথের প্রতিটি মোড়ে শত শত পুরুষ তার দিকে এভাবেই ঈর্ষার চোখে তাকাবে। একজন পুরুষের কাছে এর চেয়ে বড় জয় আর কী হতে পারে—যখন তার অর্জিত সৌন্দর্যের দিকে পুরো পৃথিবী লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের একমাত্র মালিকানা থাকবে শুধু তার হাতে।
মালিবাগের জ্যামটা একটু কমতেই মোর্শেদ এক্সিলারেটরে মোচড় দিল। সে জানত, এই ঈর্ষাগুলোই তার গতির জ্বালানি।
মালিবাগের জ্যাম পেরিয়ে মোর্শেদ যখন যাত্রাবাড়ীর সেই পরিচিত ঘিঞ্জি গলিতে এসে থামল, তখন রাতের আঁধার আরও ঘনীভূত হয়েছে। সামিনার বাসার সামনেটা বেশ অন্ধকার। এটা একটা সস্তা দরের পুরনো চারতলা বাড়ি, যার দোতলার ছোট একটি ফ্ল্যাটে সামিনারা থাকে। বনানীর বিলাসবহুল প্রাসাদের বাসিন্দা মোর্শেদের কাছে এই পরিবেশটা একদমই বেমানান, তবু আজ এই গলির বাতাসও তার কাছে মায়াবী মনে হচ্ছে।
সামিনা বাইক থেকে নামার সময় মোর্শেদ স্থির হয়ে বসে রইল। হেলমেটের ভাইজরের ফাঁক দিয়ে সে শেষবারের মতো আজকের এই দীর্ঘ ভ্রমণের পূর্ণতাটুকু দেখে নিতে চাইল। সামিনা যখন সিট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচে দাঁড়াল, তখন তার শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই ভরাট সৌন্দর্য আর ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া শরীরটা মোর্শেদের পুরুষালী লালসাকে আবার উসকে দিল। মোর্শেদের চোখের মনিতে তখন এক ধরণের তৃষ্ণা—যা কেবল শরীর নয়, বরং এই রহস্যময়ী নারীকে পুরোপুরি জয় করার আকাঙ্ক্ষায় জ্বলছে।
সামিনা হেলমেটটা খুলে মোর্শেদের হাতে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আজ আমার জন্য আপনি অনেক করেছেন মোর্শেদ সাহেব। অনেক রাত হয়েছে, ওপরে আসবেন কি? এক কাপ চা খেয়ে যেতেন অন্তত।"
মোর্শেদ সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তার সেই হাসিতে যেমন আভিজাত্য ছিল, তেমনি ছিল এক ধরণের গভীর টান। সে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, "আজ আর নয় সামিনা। আপনারও অনেক বিশ্রাম দরকার। আপনার হাতের সেই কালো জাদুর চা না হয় অন্য কোনোদিন এসে খেয়ে যাব। আজ শুধু এই সুন্দর মুহূর্তগুলো নিয়ে ফিরে যাই।"
অন্যদিন আসার এই মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোর্শেদ তার বাইকের স্টার্ট দিল। সামিনা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মোর্শেদের চলে যাওয়া দেখছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল।
মোর্শেদ বাইক ছাড়ার আগে তার নিজের মাথায় থাকা হেলমেটটা খুলে পেছনের হুকে ঝোলাল, আর এতক্ষণ সামিনা যে হেলমেটটা পরে ছিল, সেটা সে নিজের মাথায় পরে নিল। সামিনার শরীরের ঘ্রাণ আর চুলের স্পর্শ লেগে থাকা সেই হেলমেটটা মোর্শেদ পরম মমতায় নিজের মাথায় জড়িয়ে নিল।
মোর্শেদ যখন গতির সাথে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন সামিনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা শুধু তাকে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, বরং তার অস্তিত্বের একটা অংশ নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদের এই নীরব পাগলামিটুকু সামিনার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণের জন্ম দিল।
মোর্শেদ যখন বাইকটা নিয়ে একদম সামিনার সামনে এসে থামল, তখন সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সামিনার মধ্যে এক ধরণের অস্থির ও সাহসী পরিবর্তন। সামিনা আর আগের মতো মোর্শেদের অনুমতির অপেক্ষা করল না। সে নিজেই এগিয়ে গিয়ে বাইকের পেছনের হুকে ঝোলানো মোর্শেদের দামী গ্লসি হেলমেটটা আনহুক করে খুলে নিল। চুলে সেই রাজকীয় ঝোলা খোঁপা থাকার পরেও হেলমেটটা মাথায় পরতে আহামরি কোনো সমস্যা হলো না তার।
সামিনা এবার বাইকে ওঠার প্রস্তুতি নিল। আগেরবার বাইকে ওঠার সময় যে জড়তাটুকু ছিল, এবার তা অনেকটা কেটে গেছে। সে তার শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করে তার সেই নরম ও কোমল হাত দিয়ে মোর্শেদের চওড়া কাঁধটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। এরপর এক ধরণের ছন্দময় ভঙ্গিতে তার শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে মেটিয়রের পেছনের সিটে পাশ ফিরে চড়ে বসল। সামিনার রাজকীয় শরীরের ভারে বাইকটা আগের মতোই হালকা দেবে গেল, যা মোর্শেদের শরীরের প্রতিটি কোষে এক ধরণের রোমাঞ্চকর জানান দিল।
মোর্শেদ তখন তার ডান পাশের লুকিং মিররে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে জানে, সামিনা যখন পা উঁচিয়ে বাইকের সিটে নিজেকে থিতু করতে যায়, তখন তার নিতম্বের সেই উত্তাল ঢেউ এক নিপুণ কামনার দৃশ্য তৈরি করে। মোর্শেদ সেই দৃশ্যের এক বিন্দুও মিস করতে রাজি নয়। আয়নার প্রতিবিম্বে সে দেখতে পেল সামিনার ঘামে ভেজা পিঠের ওপর ঝুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটা। হেলমেটের নিচ দিয়ে বেরিয়ে থাকা ওই খোঁপাটায় মুখ গুঁজে দিয়ে সামিনার শরীরের সেই বুনো কামজ ঘ্রাণ বুক ভরে শুঁকে দেখতে ইচ্ছে করছিল মোর্শেদের। এক তীব্র কামনা মোর্শেদের রক্তে যেন হাহাকার করে উঠল।
সামিনা সিটে স্থির হয়ে বসতেই মোর্শেদ আয়না থেকে চোখ সরিয়ে নিল। সে নিজেকে কিছুটা সংযত করে মুচকি হেসে বলল, "ভালো করে ধরে বসুন মিস সামিনা জাহান। হাইওয়েতে কিন্তু আমি কাউকে করুণা করি না।"
কথাটা শেষ করেই মোর্শেদ বাইকের ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। ৩৫০ সিসির সেই ভরাট গর্জন বিকেলের শান্ত বাতাসকে চিরে দিয়ে যেন এক নতুন যাত্রার ঘোষণা করল। মোর্শেদ ক্লাচ ছেড়ে এক্সিলারেটর ঘুরাতেই বাইকটা শিকারী চিতার মতো সামনের দিকে লাফিয়ে উঠল।
মেটিয়রের ভরাট গর্জন তুলে মোর্শেদ এক্সপ্রেসওয়ের ওপরের উড়ালপথে না উঠে নিচের রাস্তা ধরল। বিকেলের পাতলা ভিড় ঠেলে বাইকটা রাজকীয় ভঙ্গিতে এগোতে শুরু করল। অফিস-আদালত এখনো পুরোপুরি ছুটি হয়নি, তাই এয়ারপোর্ট রোডে চিরচেনা সেই স্থবির জ্যামটা এখনো জেঁকে বসেনি। রাস্তার ধারের গাছগুলো বিকেলের মরা আলোয় কেমন এক রহস্যময় রূপ নিয়েছে।
সামিনা লক্ষ্য করল মোর্শেদ এয়ারপোর্টের দিকে না গিয়ে উত্তরার ভেতরের দিকে এগোচ্ছে। হেলমেটের ভেতর থেকে বাতাসের শাঁ শাঁ শব্দ ছাপিয়ে সামিনা মোর্শেদের কানের কাছে মুখ নিয়ে একটু চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, "কই যাচ্ছেন মোর্শেদ সাহেব? এই রাস্তা তো আমার বাসার দিকে না। কোথায় যাচ্ছেন আপনি?"
মোর্শেদ আয়নায় সামিনার হেলমেট পরা মুখটা একবার দেখল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি। সে বাইকের গতি একটুও না কমিয়ে পালটা জবাব দিল, "আপনাকে নিয়ে পালাচ্ছি সামিনা জাহান! এই শহর, এই জ্যাম, এই থানা-পুলিশের দুনিয়া ছেড়ে অনেক দূরে পালাচ্ছি।"
সামিনা হুট করে এমন কথা শুনে থমকে গেল। তার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। সে হাসি লুকানোর চেষ্টা করে বলল, "পালিয়ে যাবেন কোথায়? বনানীর রাজপুত্র কি আমার মতো এক সাধারণ কলেজ শিক্ষিকাকে নিয়ে পালানোর সাহস রাখে?"
মোর্শেদ এবার একটু গম্ভীর হলো, কিন্তু তার স্বরে মাদকতা কমল না। সে বলল, "সাহস তো জন্মগত, সামিনা। কিন্তু পালাবার মতো সঙ্গী পাওয়াটাই ছিল কঠিন। আজ যখন পেয়েছি, তখন আর ফেরার পথ খুঁজতে চাইছি না। এই যে বিকেলের বাতাসটা আমাদের পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, এর কি কোনো গন্তব্য আছে? আমাদেরও না হয় আজ কোনো গন্তব্য না থাকুক।"
সামিনা আশ্চর্যের সাথে মোর্শেদের এই দার্শনিক রূপটা দেখল। সে নরম গলায় বলল, "গন্তব্যহীন যাত্রা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন মোর্শেদ সাহেব। রাত হলে কিন্তু ঠিকই আমাদের যার যার ইকোসিস্টেমে ফিরতে হবে।"
"তাহলে রাত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সময়টুকু না হয় আমাদের একার হোক," মোর্শেদের এই সংক্ষিপ্ত উত্তরে সামিনা আর কোনো তর্ক করল না।
রাস্তার ছোটখাটো ঝাঁকুনিতে সামিনা নিজেকে সামলাতে বারবার মোর্শেদের চওড়া কাঁধটা আরও শক্ত করে খামচে ধরছিল। মোর্শেদ তার পিঠের ওপর সামিনার সেই নরম অথচ উত্তাল শরীরের প্রতিটি কম্পন অনুভব করছিল। সামিনার শরীরের ভার আর সেই বিকেলের উষ্ণতা মোর্শেদের স্নায়ুতে এক অদ্ভুত নেশা ধরিয়ে দিচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই রাস্তা যদি কোনোদিন শেষ না হতো!
পথ চলতে চলতে মোর্শেদ উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের এক ছিমছাম, আভিজাত্যমাখা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে বাইক থামাল। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশটা হঠাৎ খুব শান্ত হয়ে গেল।
মোর্শেদ হেলমেট খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে আলতো হাসল। "নামুন ম্যাডাম। চলুন ভেতরে যাওয়া যাক।"
সামিনা অবাক হয়ে চারপাশটা দেখল। মোর্শেদ তার দ্বিধা কাটিয়ে দিতে বলল, "থানায় বসে দুশ্চিন্তা করতে করতে ভুলেই গেছেন যে আজ আমাদের লাঞ্চ করা হয়নি। খালি পেটে অন্তত পালানো যায় না। চলুন!"
সামিনা নামতে নামতে ভাবল, এই লোকটা শুধু শরীর আর মন নয়, তার ক্ষুধার খবরও কেমন করে যেন ঠিকই জানে।
রেস্টুরেন্টে ঢুকেই এসি-র হিমেল স্পর্শে দুজনের শরীর জুড়িয়ে গেল। মোর্শেদ সামিনাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সারাদিন তো অনেক ধকল গেল, আগে ওয়াশরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি এখানেই বসছি।”
সামিনা গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। হেলমেটের ভেতর গরমে মুখটা লাল হয়ে আছে, কপালের কয়েকটা অবাধ্য চুল ঘামে লেপ্টে। মুখে পানির ঝাপটা দিতেই এক অদ্ভুত স্বস্তি পেল সে। মোর্শেদও ফ্রেশ হয়ে এসে টেবিলে বসল। সামিনা ফিরে আসতেই মোর্শেদ মেনু কার্ডটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “অর্ডারটা আজ আপনিই দিন। আমাদের প্রথম ডেট, আপনার পছন্দটাই আগে চলুক।”
সামিনা মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ উল্টেপাল্টে দেখল। চাইনিজ বা কন্টিনেন্টাল খাবারের ভিড়ে সে খুঁজছিল একদম দেশীয় কিছু। অবশেষে মুখ তুলে মৃদু হেসে বলল, “আমি আসলে পুরোপুরি মাছে-ভাতে বাঙালি। দুপুরের খাবারে এই ভাত-মাছ বা মাংস না হলে আমার ঠিক জমে না।”
মোর্শেদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। বনানীর দামী রেস্টুরেন্টগুলোতে সে অভ্যস্ত স্টেক বা পাস্তায়, কিন্তু সামিনার এই সারল্য তাকে মুগ্ধ করল। সে বলল, “চমৎকার! তাহলে আমিও আজ আপনার সাথেই মাছে-ভাতে বাঙালি হয়ে যাই। দিন, ভাতেরই অর্ডার দিন।”
অর্ডার দেওয়ার পর ওয়েটার চলে যেতেই সামিনা একটু লাজুক হেসে বলল, “আসলে আমি সাধারণত বাইরে খাই না। নিজের হাতের রান্নাই বেশি পছন্দ। বিনয় করছি না, কিন্তু আমি সত্যি খুব ভালো রাঁধতে পারি।”
মোর্শেদ এবার সুযোগটা হাতছাড়া করল না। সে সামিনার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “তাই নাকি? তাহলে তো একদিন আপনার হাতের রান্নার দাওয়াত নিতেই হয়। এমন একজন রাঁধুনীর খাবার না খেলে জীবনটাই বৃথা।”
সামিনা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে এক ধরণের প্রশ্রয় ছিল। সে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, কোনো একদিন চলে আসুন আমার সেই যাত্রাবাড়ীর আস্তানায়। নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াবো। তবে সাবধান! খাবারের মধ্যে ওষুধ মিশিয়ে আপনাকে কিন্তু একদম কালো জাদু করে ফেলব।”
মোর্শেদ একটুও না দমে সামিনার আরও কাছে ঝুঁকে এল। কণ্ঠস্বরটা খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “জাদু কি আর করতে বাকি রেখেছেন নাকি সামিনা? জাদু তো আপনি সেই প্রথম যেদিন মেসেজ দিয়েছিলেন, সেদিন থেকেই করে বসে আছেন। এখন শুধু বাকি আছে আপনার হাতের ওই রান্নার নেশায় পড়া।”
সামিনা এবার মোর্শেদের কথার ধার দেখে একটু থমকাল, তারপর সামলে নিয়ে বলল, “আপনি না পারেনও বটে! লোকে ঠিকই বলে— যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে।”
মোর্শেদ সামিনার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রসিকতা করে বলল, “চুল তো আপনার সেই শুরু থেকেই বাঁধা অবস্থাতেই দেখলাম। বাঁধতে আর দেখলাম কই? ওটা কি কখনো খোলে না?”
সামিনা ঠোঁট উল্টে পাল্টা জবাব দিল, “চুল বাঁধতে দেখেননি বলে আক্ষেপ করছেন? এদিকে যে বললেন রান্না করি, সেই রান্না করতেই বা আমাকে কবে দেখলেন?”
মোর্শেদ হাসল। এক গভীর এবং রহস্যময় হাসি। সে বুঝতে পারছে, এই নারীর কথার জাদুতে সে এখন পুরোপুরি বন্দি। রেস্টুরেন্টের মৃদু আলো আর সুস্বাদু খাবারের সুবাসে তাদের প্রথম ডেটটা যেন এক নিষিদ্ধ কিন্তু সুন্দর কাব্যে রূপ নিল।খাবার আসার অপেক্ষায় থাকা সেই মুহূর্তটিতে মোর্শেদ সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে আগের কথার খেই ধরল। তার গলার স্বরে এবার এক ধরণের গভীর মুগ্ধতা। সে খুব নরম গলায় বলল, "ঠাট্টা করছি না সামিনা, সত্যিই আপনার চুলগুলো অসম্ভব সুন্দর। সেই দুপুর থেকে আমি আপনার এই রাজকীয় চুলের প্রেমে পড়ে গেছি। একটা মানুষের চুল এতটা মায়াবী হতে পারে, আপনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।"
সামিনা মোর্শেদের এমন সরাসরি প্রশংসা শুনে একটু থতমত খেয়ে গেল, পরক্ষণেই খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে সামিনা জবাব দিল, "বাহ! চুলের প্রেমে পড়েছেন শুনে ভালো লাগল। চুলের প্রেমেই সীমাবদ্ধ থাকুন মোর্শেদ সাহেব, আমার প্রেমে না পড়লেই হলো। আমার প্রেমে পড়া কিন্তু বড্ড বিপজ্জনক!"
মোর্শেদ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ওয়েটার ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর ভাজি-ভর্তার বাটিগুলো নিয়ে হাজির হলো। খাবারের সুবাসে টেবিলটা মুহূর্তেই ম ম করে উঠল। তারা দুজন আর কথা না বাড়িয়ে ঝটপট খাওয়া শুরু করল। থানার ধকল আর বিকেলের ক্ষিধেয় যেন দুজনেরই ভাতের থালার দিকে পূর্ণ মনোযোগ।
খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মোর্শেদ একবার মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা সামিনা, রুবানা আপা তো খুব করে বলছিলেন ওনাদের বাসায় যেতে। টঙ্গী খুব একটা দূরেও ছিল না, গেলে হয়তো ওনারা খুশি হতেন। আপনি গেলেন না কেন?"
সামিনা এক লোকমা ভাত মুখে তুলে চিবিয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, "এখন দরকার নেই আপার বাসায় যাওয়ার। পরে কোনো একদিন যাওয়া যাবে। তাছাড়া সজল মাত্র ওসব থেকে ছাড়া পেল, এখন গেলে আপা কান্নাকাটি করে একাকার করবেন। আমার এখন আর ওসব ভালো লাগছে না।"
সামিনা আসলে আসল সত্যটা মোর্শেদের কাছে গোপনই রাখল। সে মনে মনে চাচ্ছিল না এই প্রথম দেখার দিনে মোর্শেদকে নিয়ে বড় বোনের বাসায় গিয়ে নতুন কোনো প্রশ্নের মুখে পড়তে। মোর্শেদের সাথে কাটানো এই একান্ত সময়টুকু সে নিজের মতো করে উপভোগ করতে চেয়েছিল, যা কারো পারিবারিক বলয়ে গিয়ে নষ্ট হোক তা তার কাম্য ছিল না।
মোর্শেদ সামিনার কথার ভেতরে থাকা সেই প্রচ্ছন্ন এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গিটা লক্ষ্য করল। সে মনে মনে হাসল। সে বুঝতে পারল সামিনা কেবল তার 'ইকোসিস্টেম' নয়, তার ব্যক্তিগত সীমানা নিয়েও খুব সচেতন। আর এই সচেতনতাই মোর্শেদকে সামিনার প্রতি আরও বেশি কৌতূহলী করে তুলছে।
খাওয়া শেষ করে তারা যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বাইরে বের হলো, ততক্ষণে আকাশের গোধূলি রঙ মুছে গিয়ে সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নেমেছে। শহরের বাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে, আর সেই কৃত্রিম আলো-আঁধারিতে চারপাশটা অন্যরকম এক মায়ায় ঢেকে গেছে।
মোর্শেদ তার মেটিয়র ৩৫০-এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সামিনা তার পাশে আসতেই মোর্শেদের শিকারী চোখগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠল। সে বাইকের ওপর উঠে বসে লুকিং মিররটা এমনভাবে সেট করে নিল যাতে পেছনের প্রতিটি দৃশ্য তার নজরে থাকে।
সামিনা যখন বাইকে ওঠার জন্য পা বাড়াল, মোর্শেদ অপলক চোখে আয়নায় সেই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগল। সামিনার শরীরের সেই রাজকীয় গঠন, তার ভারী নিতম্বের ছন্দময় দুলুনি আর বাইকে ওঠার সময় তার শরীরের যে মোচড়—সবকিছুই মোর্শেদের মনে এক ধরণের আদিম উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। সামিনার শরীরের প্রতিটি খাঁজ আর শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা তার সেই ভরাট অবয়ব মোর্শেদের কামনার অনলকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
শুধু শরীর নয়, মোর্শেদের নজর আটকে রইল সামিনার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটার দিকেও। বিকেলের রোদে যা তাকে মুগ্ধ করেছিল, রাতের এই মায়াবী অন্ধকারে তা যেন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে। মোর্শেদ অনুভব করল, সামিনার শরীরের ঘ্রাণ আর তার এই সজীব উপস্থিতি তার সবটুকু যৌক্তিক চিন্তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে।
সামিনা যখন মোর্শেদের কাঁধে হাত রেখে পেছনের সিটে থিতু হয়ে বসল, তখন মোর্শেদ অনুভব করল তার পিঠের ওপর সামিনার স্তনের মৃদু স্পর্শ। সেই নরম ও উষ্ণ অনুভূতিটা মোর্শেদের শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শিহরণ বইয়ে দিল। মোর্শেদ বুঝতে পারল, এই নারীর সান্নিধ্য তাকে এমন এক গোলকধাঁধায় নিয়ে যাচ্ছে যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই।
মোর্শেদ বাইকের স্টার্ট দিল। ইঞ্জিনের সেই ভারী গুমগুম শব্দের সাথে সাথে মোর্শেদের হৃদস্পন্দনও যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল। সে ভাইজরটা নামিয়ে দিয়ে বাইকটা গতির দিকে নিয়ে গেল।
রাতের ঢাকা যেন এক মায়াবী অরণ্য, আর সেই অরণ্যের বুক চিরে মোর্শেদের মেটিয়র ৩৫০ যেন ডানা মেলা এক শিকারী পাখি। এক্সপ্রেসওয়ে পেরিয়ে বাইকটা যখন মালিবাগের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন চিরচেনা সেই যানজট তাদের গতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। শত শত গাড়ির হেডলাইটের আলো আর হর্নের শব্দের মাঝে মোর্শেদ বাইকটা থিতু করল।
দীর্ঘদিনের ক্লান্তি আর দুপুরের ধকলের পর সামিনা যেন এখন অনেকটা ভারমুক্ত। সে মোর্শেদের পিঠের ওপর শরীরের ওপরের অংশের পুরো ভার ছেড়ে দিয়ে একরকম আয়েশ করে বসে আছে। ভ্যাপসা গরমে সামিনার শরীর ঘামে ভেজা, আর সেই ভেজা শাড়ি আর শরীর যেন আঠার মতো মোর্শেদের শার্টের সাথে লেপ্টে আছে। সামিনার শরীরের সেই উত্তাপ আর ভারী ওজনটা মোর্শেদের কাছে মোটেও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে না, বরং সে প্রতিটা মুহূর্ত হাড় দিয়ে উপভোগ করছে। একজন নারীর শরীরের এমন নিবিড় সান্নিধ্য মোর্শেদকে এক ধরণের অদ্ভুত পুরুষালী অহংকারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
জ্যামে স্থবির হয়ে বসে থাকতে থাকতে মোর্শেদের চোখ গেল লুকিং মিররের ওপর। আয়নায় দেখল তাদের ঠিক পেছনেই একটা সাদা রঙের প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে একজন মধ্যবয়সী লোক একা বসে—পোশাক আর হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে নির্ঘাত কোনো উবার ড্রাইভার। মোর্শেদ লক্ষ্য করল, লোকটা ড্রাইভ করার বদলে হাঁ করে তাকিয়ে আছে সামিনার দিকে। আয়নার ফ্রেমে মোর্শেদ স্পষ্ট দেখল, লোকটা যেন সামিনার পেছনের সেই রাজকীয় সৌন্দর্য আর স্তূপীকৃত খোঁপাটা চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে।
ড্রাইভারের চোখের সেই তৃষ্ণার্ত চাহনি দেখে মোর্শেদ পরিষ্কার বুঝতে পারল—লোকটা মনে মনে মোর্শেদের ভাগ্য নিয়ে চরম ঈর্ষা করছে। মোর্শেদের মতো একজন মানুষের পেছনে এমন একজন ভরাট এবং মোহময়ী নারীকে দেখে ড্রাইভারের অবদমিত কামনা যেন হিংসায় রূপ নিয়েছে।
দৃশ্যটা দেখে মোর্শেদ নিজের মনেই একটা তৃপ্তির হাসি হাসল। সে ভাবল, এই সামিনা যদি তার বাইকের ব্যাকসিটের স্থায়ী সঙ্গী হয়, তবে আজ শুধু এই ড্রাইভার কেন, পথের প্রতিটি মোড়ে শত শত পুরুষ তার দিকে এভাবেই ঈর্ষার চোখে তাকাবে। একজন পুরুষের কাছে এর চেয়ে বড় জয় আর কী হতে পারে—যখন তার অর্জিত সৌন্দর্যের দিকে পুরো পৃথিবী লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের একমাত্র মালিকানা থাকবে শুধু তার হাতে।
মালিবাগের জ্যামটা একটু কমতেই মোর্শেদ এক্সিলারেটরে মোচড় দিল। সে জানত, এই ঈর্ষাগুলোই তার গতির জ্বালানি।
মালিবাগের জ্যাম পেরিয়ে মোর্শেদ যখন যাত্রাবাড়ীর সেই পরিচিত ঘিঞ্জি গলিতে এসে থামল, তখন রাতের আঁধার আরও ঘনীভূত হয়েছে। সামিনার বাসার সামনেটা বেশ অন্ধকার। এটা একটা সস্তা দরের পুরনো চারতলা বাড়ি, যার দোতলার ছোট একটি ফ্ল্যাটে সামিনারা থাকে। বনানীর বিলাসবহুল প্রাসাদের বাসিন্দা মোর্শেদের কাছে এই পরিবেশটা একদমই বেমানান, তবু আজ এই গলির বাতাসও তার কাছে মায়াবী মনে হচ্ছে।
সামিনা বাইক থেকে নামার সময় মোর্শেদ স্থির হয়ে বসে রইল। হেলমেটের ভাইজরের ফাঁক দিয়ে সে শেষবারের মতো আজকের এই দীর্ঘ ভ্রমণের পূর্ণতাটুকু দেখে নিতে চাইল। সামিনা যখন সিট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচে দাঁড়াল, তখন তার শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই ভরাট সৌন্দর্য আর ক্লান্তিতে নুয়ে পড়া শরীরটা মোর্শেদের পুরুষালী লালসাকে আবার উসকে দিল। মোর্শেদের চোখের মনিতে তখন এক ধরণের তৃষ্ণা—যা কেবল শরীর নয়, বরং এই রহস্যময়ী নারীকে পুরোপুরি জয় করার আকাঙ্ক্ষায় জ্বলছে।
সামিনা হেলমেটটা খুলে মোর্শেদের হাতে দিয়ে মৃদু হেসে বলল, "আজ আমার জন্য আপনি অনেক করেছেন মোর্শেদ সাহেব। অনেক রাত হয়েছে, ওপরে আসবেন কি? এক কাপ চা খেয়ে যেতেন অন্তত।"
মোর্শেদ সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তার সেই হাসিতে যেমন আভিজাত্য ছিল, তেমনি ছিল এক ধরণের গভীর টান। সে মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল, "আজ আর নয় সামিনা। আপনারও অনেক বিশ্রাম দরকার। আপনার হাতের সেই কালো জাদুর চা না হয় অন্য কোনোদিন এসে খেয়ে যাব। আজ শুধু এই সুন্দর মুহূর্তগুলো নিয়ে ফিরে যাই।"
অন্যদিন আসার এই মধুর প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোর্শেদ তার বাইকের স্টার্ট দিল। সামিনা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মোর্শেদের চলে যাওয়া দেখছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে সে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল।
মোর্শেদ বাইক ছাড়ার আগে তার নিজের মাথায় থাকা হেলমেটটা খুলে পেছনের হুকে ঝোলাল, আর এতক্ষণ সামিনা যে হেলমেটটা পরে ছিল, সেটা সে নিজের মাথায় পরে নিল। সামিনার শরীরের ঘ্রাণ আর চুলের স্পর্শ লেগে থাকা সেই হেলমেটটা মোর্শেদ পরম মমতায় নিজের মাথায় জড়িয়ে নিল।
মোর্শেদ যখন গতির সাথে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে, তখন সামিনার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটা শুধু তাকে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছে না, বরং তার অস্তিত্বের একটা অংশ নিজের সাথে নিয়ে যাচ্ছে। মোর্শেদের এই নীরব পাগলামিটুকু সামিনার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণের জন্ম দিল।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)