Thread Rating:
  • 14 Vote(s) - 3.36 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
#84
থানার সেই গুমোট অন্ধকার, ফাইলের স্তূপ আর নোনা ধরা দেয়ালের ভ্যাপসা গন্ধ পেছনে ফেলে মোর্শেদ আর সামিনা যখন বাইরে বের হলো, তখন ঢাকার আকাশে বিকেলের এক মায়াবী রূপ খেলা করছে। দুপুরের সেই চামড়া পুড়িয়ে দেয়া রোদের তেজ এখন আর নেই। সূর্যের আলোটা কেমন যেন নরম হয়ে এসেছে, চারপাশের জরাজীর্ণ দালানকোঠা আর রাস্তার ধুলোবালিও সেই আলোয় এক অদ্ভুত সৌন্দর্যে সেজেছে।
থানার ভেতরে ওসির রুমে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় এবং দুশ্চিন্তায় দুজনের শরীরই ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে ছিল। বাইরের খোলামেলা জায়গায় আসতেই বিকেলের একঝিলিক হিমেল বাতাস যখন তাদের ঘামে ভেজা শরীরে আলতো করে ছুঁয়ে গেল, তখন এক নিমেষেই দুজনের স্নায়ুতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল। সেই ঠান্ডা বাতাসের পরশে ঘাম শুকানোর যে আরাম, তা যেন শরীরের সাথে সাথে মনটাকেও এক লহমায় ফুরফুরে করে দিল। মোর্শেদ তার জ্যাকেটের চেইনটা একটু আলগা করে দিয়ে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল।
ঠিক এই সময়, থানার বারান্দার এক কোণ থেকে সজল ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তার পরনের শার্টটা কুঁচকানো, চুলগুলো অবিন্যস্ত, আর চোখেমুখে এক ধরণের জড়তা। সে গুটিগুটি পায়ে এসে সামিনার সামনে দাঁড়াতেই সামিনার ভেতরের দমানো ক্ষোভটা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।
সামিনা রাগী চোখে সজলের দিকে তাকাল। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সজল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল, খালার চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই। সামিনা তিব্র এবং শাসনের গলায় বলতে শুরু করল—
"কী রে সজল? খুব তো বীরপুরুষ হয়েছিস! একবারও কি নিজের কথা ভাবার আগে তোর মায়ের মুখটার কথা মনে পড়ল না? আর কত কষ্ট দিবি আমাদের সবাইকে? আর কত এভাবে তোর মা-কে তিলে তিলে জ্বালিয়ে মারবি তুই? ওদিকে তোর মা দুশ্চিন্তায় রক্তচাপ বাড়িয়ে বিছানায় পড়ে আছে, আর তুই এখানে থানার লক-আপে বসে আছিস! লজ্জা করে না তোর?"
সামিনা এক মুহূর্ত থামল না। তার গলার স্বরে অভিমান আর ক্ষোভ মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সে আবার বলতে শুরু করল— "তোর এই বয়সে হাতে বই থাকার কথা, অথচ তোর হাতে এখন হাতকড়ার দাগ! জীবনে কি কাউকে একটু শান্তিতে থাকতে দিবি না তুই? আমাদের মুখ পুড়িয়ে তোর কী লাভ হলো বল তো? নিজের জীবনটা তো ধ্বংস করছিসই, সাথে আমাদের মাথাগুলোও সমাজের কাছে নিচু করে দিলি। আর কতদিন আমরা তোর এই নোংরামি সামলাব?"
সজল কোনো উত্তর দিতে পারল না। সামিনার প্রতিটি কথা চাবুকের মতো তার কানে বাজছিল। সে অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠে বলল, "মাফ করে দেন খালা। আমি বুঝতে পারি নাই এত কিছু হবে। আমায় এবারের মতো মাফ করেন।"
সামিনা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার ভেতরে জমে থাকা বছরের পর বছর ক্ষোভগুলো যেন আজই উগরে দিতে চাইছিল। ঠিক তখনই মোর্শেদ এগিয়ে এল। সে খুব শান্তভাবে সামিনার কাঁধে নিজের হাতটা রাখল। মোর্শেদের হাতের সেই শক্ত অথচ ভরসার স্পর্শে সামিনা হঠাৎই থমকে গেল।
মোর্শেদ নিচু স্বরে বলল, "থাক সামিনা, অনেক হয়েছে। ছেলেটা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। শাসনের চেয়ে এখন বোধহয় ওর একটু অনুশোচনা করার সুযোগ দেওয়া দরকার। বিকেলের এই বাতাসটা উপভোগ করেন, রাগ কমিয়ে শান্ত হন।"
মোর্শেদের শান্ত ও গভীর গলার স্বরে সামিনার উত্তপ্ত মেজাজটা মুহূর্তেই জল হয়ে গেল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। বিকেলের সেই মিঠে রোদ তখনো তাদের ঘিরে এক মোহময় আবেশ তৈরি করে রেখেছে।
সামিনার শাসনের তুবড়ি ছোটানোর মাঝেই মোর্শেদ এবার একটু সময় নিয়ে সজলের দিকে খুঁটিয়ে তাকাল। ছেলেটার বয়স খুব বেশি না হলেও উচ্চতায় সে প্রায় মোর্শেদের কাছাকাছিই। তবে বয়সের তুলনায় হাড় জিরজিরে শরীরটা এখনো ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। অবিন্যস্ত এক মাথা রুক্ষ চুল, আর গালে অযত্নে বেড়ে ওঠা একগাল দাড়ি তাকে একটা বুনো ছোকরাটে ভাব দিয়েছে। সজলের চেহারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তার চোখ। সেখানে যেন অবদমিত এক ধরণের আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে; এক ধরণের জেদ আর অস্থিরতা। তবে এই মুহূর্তে সামিনার শাসনের চাবুক আর মোর্শেদের আভিজাত্যের সামনে লজ্জায় সেই আগুন অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে।
সজল মাথা তুলে মোর্শেদের দিকে তাকাল। তার সেই আগুনের জায়গায় এখন কেবল গভীর এক কৃতজ্ঞতা। এরপর সে অপরাধীর মতো দুজনের উদ্দেশ্যেই মাথা নোয়াল। অস্ফুট স্বরে বলল, "আমারে মাফ করে দেন। আপনারা না থাকলে আজ আমার কপালে কী ছিল জানি না। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের।"
মোর্শেদ সজলের চোখের দিকে তাকিয়ে এক ধরণের বিশেষ সম্ভাবনা লক্ষ্য করল। বহু মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা থেকে সে জানে, কার চোখে কী লুকিয়ে থাকে। সজলের ওই কৃতজ্ঞতার চাহনিটা মোর্শেদের খুব পছন্দ হলো। এই চোখগুলো বড্ড বিশ্বস্ত; এমন এক ধরণের আনুগত্য সেখানে খেলা করছে যা সচরাচর দেখা যায় না। মোর্শেদ নিজের মনেই ভাবল—এই ছেলেটাকে যদি ঠিকঠাক মতো 'লীড' দেওয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে সে তার অনেক বড় কাজে আসবে। বিশ্বস্ত চোখ চিনে নিতে মোর্শেদের ভুল হয় না।
মোর্শেদ তার পকেট থেকে দামী লেদার মানিব্যাগটা বের করল। সেখান থেকে দুটো এক হাজার টাকার চকচকে নোট বের করে সজলের দিকে বাড়িয়ে ধরল। মোর্শেদের গলার স্বর এখন অনেক কোমল, কিন্তু তাতে আদেশের সুর স্পষ্ট।
সে বলল, "এই নাও। এখনই সরাসরি বাসায় চলে যাবে। আজ আর রাস্তায় একদম আড্ডা দিতে বের হবে না। ফেরার পথে বাসার জন্য ভালো কিছু খাবার বা দরকারি কিছু কিনে নিয়ে যেও। মা-র সাথে বসে বাসায় গিয়ে খেও।"
সজল স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। মোর্শেদের বাড়ানো টাকাগুলোর দিকে সে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন সে কোনো অলৌকিক কিছু দেখছে। যাত্রাবাড়ীর এই ঘিঞ্জি গলিতে বড় হওয়া ছেলেটার কাছে বনানীর এই প্রভাবশালী মানুষের এমন অযাচিত মমতা আর দু’হাজার টাকার নোটগুলো কোনো স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু মনে হলো না। কৃতজ্ঞতায় সজলের চোখগুলো আবার ভিজে এল।
মোর্শেদ যখন পকেট থেকে নোটগুলো বের করে সজলের দিকে এগিয়ে দিল, তখন সামিনা হুট করেই মোর্শেদের হাতটা চেপে ধরল। তার চোখেমুখে এবার একরাশ বিরক্তি আর রাগ ফুটে উঠেছে। সামিনা তীক্ষ্ণ গলায় বলল, "আপনি ওকে টাকা দিচ্ছেন কেন মোর্শেদ সাহেব? ও এমনিতেই অপরাধী, তার ওপর আপনি ওকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? এভাবে টাকা দিলে ওর সাহস আরও বেড়ে যাবে।"
মোর্শেদ খুব শান্ত চোখে সামিনার দিকে তাকাল। সামিনার রাগী চেহারাটাও তার কাছে এই মুহূর্তে বেশ মায়াবী লাগছে। সে নিচু স্বরে, গভীর এক শান্ত গলায় সামিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করল, "আচ্ছা সামিনা, এখন এসব কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ছেলেটা অনেক ধকলের ওপর দিয়ে গেছে। ও আগে ঠিকঠাক মতো বাসায় পৌঁছাক। বাসায় গিয়ে কিছু খেলে ওর মাথাটা একটু ঠান্ডা হবে। বাকি শাসন পরে করলেও চলবে।"
কথাটা শেষ করেই মোর্শেদ সামিনার হাতের বাঁধন আলগা করে সজলের হাতের তালুতে জোড় করে টাকাগুলো গুঁজে দিল। সজল একবার নোটগুলোর দিকে তাকাল, আর একবার মোর্শেদের দিকে। তার চোখে তখন প্রবল দ্বিধা—এই টাকা সে নেবে কি নেবে না। সজল ভয়ার্ত চোখে সামিনার দিকে তাকাল, যেন সে তার খালার অনুমতির অপেক্ষা করছে।
সামিনা প্রথমে মুখ শক্ত করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও, মোর্শেদের অকাট্য যুক্তি আর সজলের সেই অসহায় চাহনি দেখে তার মনটা একটু নরম হলো। সে আলতো করে সজলের দিকে তাকাল। সামিনার সেই চোখের চাউনিতে এবার আগের মতো কঠোরতা নেই, বরং এক ধরণের মৌন প্রশ্রয় লুকানো ছিল।
খালার চোখে সেই গ্রিন সিগন্যাল বা প্রশ্রয় দেখতে পেয়েই সজল আর দ্বিধা করল না। সে কাঁপা কাঁপা হাতে মোর্শেদের থেকে টাকাগুলো গ্রহণ করল। কৃতজ্ঞতায় তার মাথাটা আবার নুয়ে এল। মোর্শেদ তার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে বলল, "যাও এবার, দেরি করো না।"
সজল টাকাগুলো পকেটে পুরে নিতেই সামিনা কড়া গলায় বলে উঠল, "দাঁড়াও আগে! এখনই যাওয়ার দরকার নেই। আগে তোমার মা-কে একটা ফোন করে নেই, নইলে ওদিকে উনি দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে যাবেন।"
সামিনা তার ভ্যানিটি পার্সটা খুলে একটা ফোন বের করল। মোর্শেদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে গেল না যে, সেটা বেশ পুরোনো মডেলের একটা শাওমি ফোন। ফোনের স্ক্রিনটা জায়গায় জায়গায় মাকড়সার জালের মতো ফেটে আছে। বনানীর ঝকঝকে দুনিয়ায় অভ্যস্ত মোর্শেদের চোখে এই ভাঙা ফোনটা সামিনার জীবনযুদ্ধের এক নীরব সাক্ষী হয়ে ধরা দিল।
সামিনা তার বড় বোন রুবানার নম্বর বের করে ডায়াল করল। ফোনের ওপাশে রুবানা আপার উৎকণ্ঠার শব্দ হয়তো মোর্শেদ শুনতে পাচ্ছিল না, কিন্তু সামিনার উত্তরগুলো ছিল স্পষ্ট।
"সালাম আপা। না না, কোনো সমস্যা নেই। এই তো, মাত্র সব শেষ করে বের হলাম... হ্যাঁ, সজল আমার সাথেই আছে। ওকে এখনই একটা রিকশা ডেকে বাসে তুলে দিচ্ছি। ও সরাসরি বাসায় চলে আসবে।"
কথা বলার মাঝেই সামিনা আড়চোখে একবার মোর্শেদের দিকে তাকাল। মোর্শেদও তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চার চোখের মিলনে এক অদ্ভুত মৌন কথোপকথন হয়ে গেল—যেন সামিনা তাকে নিঃশব্দে ধন্যবাদ জানাচ্ছে, আর মোর্শেদ তার চোখে নতুন কোনো নীল জ্যামিতির ধাঁধা খুঁজছে।
সামিনা ফোনের ওপাশে আবার বলতে শুরু করল, "না আপা, আজকে আর আসব না। টঙ্গী তো অনেক দূর, আপনি তো জানেনই রাস্তার জ্যামের কী অবস্থা। আজ নিজের বাসাতেই ফিরি... না আপা, খাওয়া-দাওয়া আরেকদিন হবে। আচ্ছা, অন্য সময় এসে খেয়ে যাব। আপনি বরং বাসায় আসিয়েন একদিন। আসি তাহলে, আসসালামু আলাইকুম।"
ফোনের আলাপ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে সামিনা খেয়াল করল, সজল এক অদ্ভুত জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকে আর মোর্শেদকে দেখছে। ছেলেটার চোখে যেন এক ধরণের কৌতূহল—সে কি তার খালার সাথে এই অচেনা সুদর্শন লোকটার কোনো অদৃশ্য সম্পর্কের সুতো খুঁজে পাচ্ছে?
সজলের সেই চাউনি দেখে সামিনা হঠাৎ খুব লজ্জা পেয়ে গেল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে না কি এক অজানা শিহরণে আরক্ত হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে কথা শেষ করে ফোনটা ব্যাগে পুরে ফেলল। নিজের অস্বস্তি ঢাকতে সজলের দিকে তাকিয়ে দ্রুত বলল, "কী দেখছিস অমন হাঁ করে? যা এবার, দেরি করিস না একদম!"
সজল টাকাগুলো পকেটে পুরে নিতেই মোর্শেদ তার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা মার্জিত এবং দামী বিজনেস কার্ড বের করল। কার্ডটা সজলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মোর্শেদ শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "এই নাও, এটা আমার কার্ড। এতে আমার পার্সোনাল নম্বর আছে। কাল দুপুরে ঠিক এই সময়ে আমাকে একটা ফোন করবে। ভুলে যেও না কিন্তু।"
সজল বিস্ময়ভরা চোখে কার্ডটা নিল। একজন দামী বাইক রাইডার এবং প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে এমন প্রস্তাব পাওয়া তার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হলো। সে মোর্শেদকে একটা গভীর সালাম দিয়ে এবং সামিনার দিকে শেষবার কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে দ্রুতপায়ে থানার গেটের বাইরে মিলিয়ে গেল।
সজল চলে যাওয়ার পর সামিনা একটু সময় নিল নিজেকে সামলাতে। সে মোর্শেদের খুব কাছে এগিয়ে এল। বিকেলের মরা আলোয় সামিনার চোখে তখন কৌতূহল। সে ভ্রু কুঁচকে মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আচ্ছা, কার্ডের এই ঘটনাটা ঠিক কী মোর্শেদ সাহেব? ওকে হুট করে নিজের নম্বর দিয়ে কাজ দেওয়ার প্রস্তাব দিলেন যে?"
মোর্শেদ তার বাইকের চাবিকাঠিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে একটা রহস্যময় হাসি হাসল। সে সামিনার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, "সব কাজ কি আর টাকার জন্য হয় সামিনা? কিছু কাজ করা হয় বিনিয়োগ হিসেবে। আমি সজলের চোখে এক ধরণের বিশ্বস্ততা দেখেছি। আর সত্যি বলতে, আমার ছোটখাটো কিছু প্রজেক্টে ওর মতো চটপটে ছেলেরই প্রয়োজন।"
সামিনা একটু বাঁকা হাসল। "বিনিয়োগ? নাকি আপনার অন্য কোনো মতলব আছে? আমাকে ইমপ্রেস করার জন্য ওকে কাজ দিচ্ছেন না তো?"
মোর্শেদ এবার এক পা এগিয়ে সামিনার আরও কাছে এল। তাদের দুজনের মাঝের দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। মোর্শেদ নিচু স্বরে বলল, "যদি বলি আপনাকে ইমপ্রেস করার জন্য আমি পুরো থানাটাই কিনে নিতে পারতাম, তাহলে কি খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে?"
সামিনা মোর্শেদের এমন সরাসরি উত্তরে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একটু লজ্জা মেশানো স্বরে বলল, "আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন। বনানীর মানুষগুলো কি আপনার মতোই ফ্লার্ট করতে ওস্তাদ?"
মোর্শেদ হাসতে হাসতে সামিনার খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমি সবার সাথে ফ্লার্ট করি না সামিনা। কেবল তাদের সাথেই করি, যাদের চোখে আমি 'নীল জ্যামিতির' ধাঁধা খুঁজে পাই। আপনার সেই 'রঙিন ম্যাডাম' ইমেজটা কিন্তু এখন এই বিকেলের রোদে আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে।"
সামিনা তার পুরোনো শাওমি ফোনটা ব্যাগে পুরতে পুরতে মুখ টিপে হাসল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার কথার জালে সে প্রতিমুহূর্তে জড়িয়ে যাচ্ছে। থানার রুক্ষ চত্বরটা যেন এই দুই অসম বয়সী মানুষের কাছে হঠাৎ করেই এক রোমান্টিক উদ্যানে পরিণত হলো।
সামিনা আলতো করে বলল, "অনেক হয়েছে, এবার চলুন। জ্যাম বাড়ার আগে আমায় আমার ইকোসিস্টেমে পৌঁছে দিন।"সজল চলে যাওয়ার পর মোর্শেদ ধীরপায়ে তার মেটিওর ৩৫০ বাইকটা আনতে গেল। পার্কিং থেকে বাইকটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসার সময় তার দৃষ্টি আবার গিয়ে আটকে গেল সামিনার ওপর। সামিনা তখন একা দাঁড়িয়ে আছে। বিকেলের ম্লান আলো তার মুখে এসে পড়েছে।
মোর্শেদ বাইকের ওপর থেকেই অপলক চোখে সামিনাকে দেখল। সারাদিনের ধকল, থানার সেই বিভীষিকাময় কয়েকটা ঘণ্টা আর ভাগ্নেকে নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে সামিনার ভরাট চেহারায় এখন একরাশ ক্লান্তির ছাপ। শুধু মুখশ্রীতে নয়, তার সারা শরীরেও সেই অবসাদ যেন এক মায়াবী মেঘের মতো লেপ্টে আছে। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে কিছুটা ঝুলে পড়েছে, অবিন্যস্ত চুলের কয়েকটা গুছি কপালে লেপ্টে আছে ঘামে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম ক্লান্তিতেও সামিনাকে মোর্শেদের চোখে কোনো অংশে কম সুন্দর লাগছে না। বরং এই বিধ্বস্ত রূপটাই যেন তাকে আরও বেশি কাম্য করে তুলেছে। মোর্শেদের রক্তে এক ধরণের আদিম নেশা চড়ে বসতে শুরু করল। সে অনুভব করল, তার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কামনার অসুরটাকে জাগিয়ে তোলার জন্য এই সামিনাই যথেষ্টের উর্ধ্বে।
বাইকের ইঞ্জিনের ভরাট গুমগুম শব্দের মাঝে মোর্শেদ এক গভীর উপলব্ধি তে ডুবে গেল। সে বুঝতে পারল, সে কেবল সামিনার শরীরে নয়, বরং তার এই রহস্যময় মন আর শরীরের এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে শুরু করেছে। মোর্শেদের মতো একজন অভিজ্ঞ, নিরাসক্ত মানুষের পক্ষে কোনো নারীর প্রেমে পড়া ছিল প্রায় অসম্ভব এক ব্যাপার। কিন্তু সামিনার এই ঘর্মাক্ত স্নিগ্ধতা আর তার ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে মোর্শেদ আজ অসহায়। সে মনে মনে হাসল; সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে, এই নারীর প্রেমে পুরোপুরি হাবুডুবু খেতে তার খুব বেশি সময় লাগবে না।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 6 users Like KaminiDevi's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে) - by KaminiDevi - 10-02-2026, 03:09 PM



Users browsing this thread: 3 Guest(s)