Thread Rating:
  • 14 Vote(s) - 3.36 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Fantasy হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে)
#76
[Image: Gemini-Generated-Image-52kjhb52kjhb52kj.png]

পর্ব ৬
গুমোট ও ছদ্মপরিচয়ের রোমাঞ্চ
 
বাইরের তপ্ত রোদের ঝলকানি পেছনে ফেলে মোর্শেদ আর সামিনা যখন থানার ভারী লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল, এক অদ্ভুত অন্ধকার আর ভ্যাপসা গরম তাদের অভ্যর্থনা জানাল। থানার নিচতলাটা যেন এক প্রাচীন গুহার মতো; বাইরের দিনের আলো এখানে ঢুকতে গিয়ে মাঝপথেই থমকে যায়। জরাজীর্ণ দেয়ালের নোনা ধরা গন্ধ আর স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের মাঝে সামিনার শরীরের সেই সতেজ সুগন্ধ এক অমায়িক বৈপরীত্য তৈরি করল।
থানার বিশাল অফিস রুমটা বড় হলেও আসবাবপত্রের ভিড়ে তা ঘিঞ্জি হয়ে আছে। রুমের শেষ প্রান্তে ওসির ঘর, যার দরজার ওপর নীল রঙের একটা পর্দা ঝুলছে। একদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হাজতখানা, যেখান থেকে মাঝেমধ্যেই শিকল নাড়াচাড়ার টুংটাং শব্দ আর গুমরে মরা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসছে। রুমের তিন পাশে তিনটি বড় কাঠের টেবিল। দুটো টেবিলে দুজন অফিসার ফাইলপত্র নিয়ে ব্যস্ত, আর মাঝখানের টেবিলটি খালি পড়ে আছে—সেখানে কেবল একটা পুরনো টেলিফোন আর ডায়েরি রাখা।
মাথার ওপর বিশাল তিনটি ব্লেডের একটি পুরনো শঙ্খ ফ্যান কোনোমতে টিকে আছে। পাখার গায়ে জমে থাকা ময়লার কালচে আস্তরণ আর ঘোরার সময় সেই কর্কশ ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ রুমের নিস্তব্ধতাকে আরও অসহ্য করে তুলছে। ফ্যানটি ঘুরছে ঠিকই, কিন্তু তা বাতাস দেওয়ার বদলে রুমের ভেতরে জমে থাকা সিগারেটের ধোঁয়া আর ভ্যাপসা গরমকে কেবল গোল হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। চারপাশের দেয়াল ঘেঁষে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে উঁচূ উঁচু সব স্টিলের আলমারি, যেগুলোর ভেতর ঠাসা হয়ে আছে বছরের পর বছর জমে থাকা ধুলোবালিমাখা লাল ফিতার ফাইল আর অসংখ্য মানুষের ভাগ্যের দলিল।
হঠাৎ করেই টেবিলে বসে থাকা এক দারোগার কোমর থেকে ঝোলানো ওয়াকিটকিটা প্রচণ্ড শব্দে ক্যাকেফোনি বা কর্কশ আওয়াজ তুলে সচল হয়ে উঠল। স্ট্যাটিক নয়েজের মাঝখান দিয়ে অস্পষ্ট এক কণ্ঠস্বর কোনো এক জরুরি খবরের সংকেত দিয়ে গেল। সেই শব্দের মধ্যেই দুই দারোগা একসাথে মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল।
মোর্শেদের বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব আর তার পেছনে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা সামিনার সেই যৌবনের প্রাচুর্যভরা শরীর দেখে অফিসার দুজনের চোখে একধরণের জিজ্ঞাসু ও কৌতূহলী দৃষ্টি ফুটে উঠল। সামিনা তার  শরীর নিয়ে যখন একটু সিঁটিয়ে গিয়ে মোর্শেদের কাঁধের পেছনে আড়াল খুঁজল, তখন তাদের সেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টির আড়ালে একধরণের লোলুপতা চিকচিক করে উঠল। রুমের এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে সামিনার সেই ঘর্মাক্ত রূপ দারোগা দুজনের কাজের গতি যেন এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিল।
তুরাগ থানার সেই গুমোট অন্ধকারে মোর্শেদের ব্যক্তিত্ব আর সামিনার শরীরের হিল্লোল এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করল। মোর্শেদ তার বলিষ্ঠ হাত দিয়ে সামিনাকে আলতো করে ইশারা করল তার সাথে এগিয়ে আসার জন্য। সামিনা তার বিশাল ও ভরাট শরীরটি নিয়ে মোর্শেদের ঠিক পাশ ঘেঁষে এগোতে লাগল। প্রতিটি পদক্ষেপে সামিনার বিশাল নিতম্বের যে ছন্দময় দোলন, তা সেই জরাজীর্ণ অফিসের ধুলোমাখা বাতাসেও এক ধরণের কামুক কম্পন ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
মোর্শেদ একদম সামনের টেবিলে বসে থাকা সেই ভুঁড়িওয়ালা দারোগার দিকে এগিয়ে গেল। দারোগাটির কপালে বিরক্তির ভাঁজ, মুখে সস্তা সিগারেটের দুর্গন্ধ। মোর্শেদ শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় বলল, "আসসালামু আলাইকুম। ডিউটি অফিসার কে এখানে?"
দারোগাটি মোর্শেদের কথার কোনো তোয়াক্কা না করে সামনের পুরনো রেজিস্টার খাতার পাতায় কলম ঘষছিল। মোর্শেদের সালামের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সে বোধ করল না। তার পরিবর্তে সে অবজ্ঞাভরে একবার চোখের চশমাটা নাকের ওপর নামিয়ে মোর্শেদকে দেখল, আর তারপরই তার লোলুপ দৃষ্টিটা স্থির হলো মোর্শেদের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা সামিনার ওপর। সামিনা তখন ঘামছিল; তার সেই চওড়া পিঠ আর ব্লাউজের টাইট হুকের ওপর ঘামের বিন্দুগুলো চিকচিক করছিল। দারোগার দৃষ্টি যেন সামিনার সেই উত্তাল শরীরের ভাঁজগুলো মেপে নিচ্ছিল।
একটু পর মুখ না তুলেই দারোগাটি খসখসে গলায় বলল, "ডিউটি অফিসার তো বাইরে গেছে রাউন্ডে। ফিরতে সময় লাগবে। উনাকে লাগলে ঐখানে গিয়ে বসেন।" বলে সে পাশের একটা খালি টেবিল আর তার সামনের জীর্ণ কাঠের বেঞ্চটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করল। তার কণ্ঠস্বরে এক ধরণের চরম অবহেলা থাকলেও চোখের মণি দুটো তখনো সামিনার ভরাট যৌবনের ওপর লেপ্টে ছিল।
মোর্শেদ পরিস্থিতির তিক্ততা বুঝতে পারল। সে সামিনার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, "চলুন সামিনা, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা লাভ নেই। ওই খালি টেবিলটার ওখানে গিয়ে বসি।"
সামিনা কেবল একবার মাথা নাড়াল। মোর্শেদের সেই নীচু স্বরের 'চলুন' শব্দটি সামিনার কানে এক ধরণের নির্ভরতার মতো শোনাল। দুজন যখন খালি টেবিলটার দিকে এগোতে শুরু করল, তখন পেছনের সেই দুই অফিসারের চোখের ক্ষুধা যেন আরও বেড়ে গেল। সামিনা যখন হাঁটছিল, তার শাড়ির নিচ দিয়ে তার উরুদ্বয়ের ঘর্ষণ আর তার বিশাল নিতম্বের ভারী ছন্দবদ্ধ নড়াচড়া সেই নিস্তব্ধ ঘরটিতে এক ধরণের শব্দহীন ঝংকার তুলছিল। তার পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই বিশাল ঝোলা খোঁপাটি তখন পেন্ডুলামের মতো ডানে-বামে বাড়ি খাচ্ছিল, যা দেখে যে কেউ সম্মোহিত হতে বাধ্য।
খালি টেবিলটার কাছে পৌঁছে মোর্শেদ প্রথমে সামিনাকে বসার জায়গা করে দিল। সামিনা যখন সেই নিচু বেঞ্চটিতে বসতে গেল, তার শরীরের ভারে পুরনো কাঠটা ক্যাঁচক্যাঁচ করে এক আর্তনাদ তুলল। বসার কারণে সামিনার নিতম্বের প্রসারণ এবং শাড়ির কুঁচিগুলো যেভাবে দুই উরুর মাঝখানে টানটান হয়ে রইল, তা মোর্শেদকে আবার সেই নিষিদ্ধ ঘ্রাণের কথা মনে করিয়ে দিল। সামিনা বসেই আঁচল দিয়ে আবার তার বুকের ওপর জমে থাকা ঘাম মুছতে লাগল, আর মোর্শেদ তার ঠিক পাশেই শরীর ঘেঁষে বসল।
মোর্শেদের গায়ের দামী তামাকের গন্ধ আর সামিনার ঘর্মাক্ত শরীরের সেই মাদকতাময় ঘ্রাণ এখন ওই খালি টেবিলটার চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে। মোর্শেদ বুঝতে পারল, এই প্রতীক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত তাকে সামিনার আরও কাছে নিয়ে যাচ্ছে, আর চারপাশের ওই পুলিশি শকুনের দৃষ্টি সামিনাকে ক্রমশ মোর্শেদের আশ্রয়ে ঠেলে দিচ্ছে।
থানার সেই গুমোট অন্ধকার আর দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতার মাঝে প্রতীক্ষার প্রতিটি পল যেন এক একটি দীর্ঘ বছরের মতো ভারী হয়ে উঠতে লাগল। মোর্শেদ আর সামিনা সেই জীর্ণ কাঠের বেঞ্চটিতে পাশাপাশি বসে আছে, কিন্তু তাদের মাঝে কোনো কথা নেই। এই নীরবতা সম্মতির নয়, বরং এক অজানা আশঙ্কার এবং অসহ্য অস্বস্তির।
বেঞ্চে বসার পর থেকেই মোর্শেদের ভেতরে এক ধরণের অস্থিরতা দানা বাঁধছিল। সে একজন চেইন-স্মোকার; অথচ বাইক চালানো থেকে শুরু করে থানায় ঢোকা পর্যন্ত গত কয়েক ঘণ্টায় তার ঠোঁটে একটা সিগারেটও পড়েনি। তার মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন নিকোটিনের তীব্র তৃষ্ণা চাগাড় দিয়ে উঠেছে। সে অবচেতনভাবেই বারবার তার জ্যাকেটের পকেটে হাত দিচ্ছিল, আবার পরক্ষণেই থানার পরিবেশের কথা চিন্তা করে হাত সরিয়ে নিচ্ছিল। তার উসখুসানিটা প্রকট হয়ে উঠল; সে বারবার পায়ের ওপর পা তুলছিল, আবার নামিয়ে রাখছিল। সামিনার শরীরের সেই ঘর্মাক্ত ঘ্রাণ আর তামাকের অভাব—দুটো মিলে মোর্শেদকে এক ধরণের অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিল।
অন্যদিকে, সামিনার অবস্থা তখন করুণ। সে বুঝতে পারছিল, পেছনের ওই টেবিলটাতে বসে থাকা দারোগাটি কেবল তার দিকে তাকিয়েই নেই, বরং তার দৃষ্টি দিয়ে সামিনার শাড়ির প্রতিটি সুতোকে যেন আলগা করে দিচ্ছে। ঠিক সেই সময় ঘরটিতে সিগারেটের কড়া ধোঁয়ার একটা কুণ্ডলী ভেসে এল। সেই ভুঁড়িওয়ালা দারোগাটি একটি সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট ধরিয়েছে। সে আয়েশ করে লম্বা একটা টান দিয়ে ধোঁয়াটা সরাসরি সামনের দিকে ছেড়ে দিল, যা ধীরগতিতে গিয়ে সামিনার চওড়া পিঠ আর তার দুলতে থাকা সেই বিশাল খোঁপাটির ওপর দিয়ে পাক খেয়ে হারিয়ে গেল।
দারোগাটির চোখের নগ্ন লালসা এখন আর লুকোনো নেই। সে তার টেবিলের ওপর কনুই রেখে গাল ঠেকিয়ে একদৃষ্টিতে সামিনার পেছনের সেই প্রাচুর্যভরা শরীরের বিভঙ্গ দেখছিল। সামিনা না তাকিয়েও তার পিঠের ওপর বিঁধে থাকা সেই শকুনি দৃষ্টি পরিষ্কার টের পাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, দারোগার ওই চোখ দুটো যেন ধারালো কোনো যন্ত্রের মতো তার শাড়ির ভাঁজগুলো চিরে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। সামিনার ফরসা চওড়া পিঠের ওপর দুলতে থাকা সেই খোঁপাটি এখন আর দুলছে না, কিন্তু দারোগার লোলুপ নজর যেন ওই চুলের জটলার নিচে লুকিয়ে থাকা তার ব্লাউজের চওড়া স্ট্র্যাপ আর টাইট হুকগুলোর বিন্যাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে।
সামিনা ভয়ে আর অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যেতে লাগল। সে তার শরীরের অবাধ্য ঢেউগুলোকে লুকিয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। সে তার দুহাত দিয়ে কোলের ওপর থাকা মোর্শেদের জ্যাকেটটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল এবং দুই উরুকে আরও চিপটে বসল। বসার ভঙ্গির এই পরিবর্তনে তার বিশাল নিতম্বের প্রসারণ সেই নড়বড়ে বেঞ্চে আরও বেশি চাপ তৈরি করল, যা পেছনের ওই লোলুপ শিকারিটির নজর কাড়তে এক মুহূর্তও দেরি করল না। সামিনা অনুভব করছিল, তার ঘাড়ের কাছে ছোট ছোট রোমগুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এক ধরণের হিমশীতল স্রোত তার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছিল, এই থানার চার দেয়ালের ভেতরে আইনের রক্ষক বলে পরিচিত এই মানুষগুলোই এখন তার শরীরের ওপর এক অদৃশ্য মানসিক ;., চালাচ্ছে।
মোর্শেদ তার নিকোটিনের তৃষ্ণার মাঝেই সামিনার এই অস্বস্তি টের পেল। সে লক্ষ্য করল, সামিনা কীভাবে বারবার নিজের আঁচল টেনে তার স্তনদ্বয়ের উন্মুক্ত হওয়া অংশটুকু ঢাকার বৃথা চেষ্টা করছে এবং তার শরীরটা মোর্শেদের দিকে আরও বেশি হেলিয়ে দিচ্ছে। সামিনার কাঁধের স্পর্শ এখন মোর্শেদের বাহুর ওপর। সামিনার শরীরটা ভয়ে কাঁপছে, আর সেই মৃদু কম্পন মোর্শেদের প্রতিটি স্নায়ুকে সজাগ করে তুলল।
দারোগাটি যখন দ্বিতীয়বার সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল, মোর্শেদ এবার ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি সেই দারোগার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন নিকোটিনের অভাবজনিত জ্বালা আর সামিনাকে রক্ষা করার এক তীব্র জেদ। দারোগাটি মোর্শেদের সেই শান্ত কিন্তু হিমশীতল চাহনি দেখে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই এক ধরণের তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে আবার সামিনার সেই উত্তাল নিতম্বের দিকে নজর ফেরাল।
থানার এই গুমোট অন্ধকার, সস্তা সিগারেটের ধোঁয়া, পুরনো ফাইলের গন্ধ আর সেই লোলুপ লালসার মাঝে সামিনা যেন এক অসহায় শিকার। তার পিঠের ওপর জমে থাকা ঘামের বিন্দুগুলো এখন আতঙ্কে আরও শীতল হয়ে গেছে। সে মনে মনে কেবল প্রার্থনা করছিল, সেই মূল দারোগা যেন দ্রুত ফিরে আসে এবং এই নরক যন্ত্রণা থেকে তাকে মুক্তি দেয়। মোর্শেদের শরীরের উষ্ণতা আর তার পাশে বসে থাকাটাই এখন সামিনার একমাত্র অবলম্বন, কিন্তু সেই ওত পেতে থাকা শকুনি দৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য তা যেন যথেষ্ট ছিল না।
পুরো ঘরটিতে এখন কেবল ফ্যানের সেই ঘড়ঘড়ানি শব্দ আর দারোগার হাতের সিগারেটের আগুনের এক ম্লান আভা ছাড়া আর কিছুই সচল নেই। প্রতীক্ষার এই প্রহর যেন সামিনার যৌবন আর মর্যাদার ওপর এক চরম পরীক্ষা নিতে শুরু করেছে।
থানার সেই গুমোট অন্ধকারে উত্তেজনার পারদ যেন আরও এক ধাপ চড়ে গেল। ভুঁড়িওয়ালা দারোগাটি তার হাতের আধা-খাওয়া সিগারেট থেকে শেষ একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা সামিনার খোঁপার দিকে তাকিয়ে ছাড়ল। এরপর সে তেরছা চোখে মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে খুব নিস্পৃহ গলায় জিজ্ঞেস করল, "তা ভাইসাহেব, আপনারা এখানে ঠিক কী কাজে আসছেন?"
 
দারোগার এই হঠাৎ প্রশ্নে সামিনা একটু চমকে উঠল। সে তার  শরীরটাকে আরও একটু গুটিয়ে নিয়ে মোর্শেদের কাঁধের পেছনে আড়াল খুঁজল। মোর্শেদ তার শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, "আজকে সজল নামের একটা ছেলেকে এই থানায় অ্যারেস্ট করে আনা হয়েছে, ছিনতাই কেসে। সেই ছেলের ব্যাপারেই কথা বলতে আসছি।"
মোর্শেদের কথা শেষ হতে না হতেই দারোগাটির ঠোঁটে এক কুৎসিত এবং জান্তব হাসি ফুটে উঠল। সে যেন আগে থেকেই সব জানত। সে এমনভাবে মাথা দোলাতে লাগল যেন কোনো বড় শিকার জালে আটকা পড়েছে। সে তার টেবিলের ওপর রাখা অ্যাশট্রেতে সিগারেটের অবশিষ্টাংশ গুঁজে দিয়ে বলল, "ও! ছিনতাই কেসের সেই চ্যাংড়া ছেলেটার লোক আপনারা? আচ্ছা, আচ্ছা। বসেন বসেন। ওই ডিউটি অফিসার আইলেই কথা বলতে পারবেন। তার আগে তো কিছু হবে না। তবে সময় লাগতে পারে ভাইসাহেব।"
দারোগাটি এবার তার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল এবং তার লোলুপ দৃষ্টি সামিনার শরীর থেকে একবারের জন্যও সরাল না। সে খুব মোলায়েম সুরে, যেন অনেক বড় উপকার করছে এমন ভঙ্গিতে বলল, "সময় কাটানোর জন্য আপনারা চাইলে সিগারেট খাইতে পারেন, সমস্যা নাই। এখানে কোনো বাধা নাই।"
দারোগার সেই 'আপনারা' শব্দটি সামিনা আর মোর্শেদ—দুজনের কানেই তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। দারোগাটি খুব সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করল যে সে সামিনাকেও এমন এক শ্রেণির নারী হিসেবে দেখছে যে কিনা থানার এই নোংরা পরিবেশে পুরুষের সাথে বসে সিগারেট ফুঁকতে দ্বিধা করবে না। সামিনার ফর্সা মুখটা অপমানে আর লজ্জায় মুহূর্তেই লাল হয়ে উঠল। সে তার সুগঠিত বুকের ওপর আঁচলটা আরও শক্ত করে টেনে ধরল, যেন ওই একটি শব্দই তার চরিত্রের ওপর একটা কালির দাগ দিয়ে গেছে।
মোর্শেদের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে তার চোখের দৃষ্টি দিয়ে দারোগাটিকে ভস্ম করে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করল। কিন্তু এই মুহূর্তে পুলিশের সাথে তর্কে যাওয়া মানেই সজলের বিপদ বাড়ানো। তার নিজের ভেতরে তখন নিকোটিনের জন্য হাহাকার চলছে। সে সামিনার দিকে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে অত্যন্ত নিচু এবং মার্জিত স্বরে জিজ্ঞেস করল, "সামিনা, আপনি কিছু মনে না করলে... আমি কি একটু সিগারেট খেতে পারি? অনেকক্ষণ ধরে হয়নি তো, মাথাটা ঝিমঝিম করছে।"
সামিনা মোর্শেদের দিকে তাকাল। মোর্শেদের চোখে তখন কেবল নিকোটিনের তৃষ্ণা নয়, বরং এই পরিস্থিতির অস্বস্তি থেকে বাঁচার একটা আকুতিও ছিল। সামিনা খুব মৃদু স্বরে বলল, "না না, আপনি খান। অসুবিধা নেই।"
সামিনার অনুমতি পেয়ে মোর্শেদ পকেট থেকে তার দামী সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করল। সে যখন একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরল, তখন পাশের সেই দারোগাটি এক দৃষ্টিতে সামিনার সেই নিতম্বের প্রসারণ আর শাড়ির টানটান ভাঁজের দিকে তাকিয়ে নিজের গোঁফ চিবোচ্ছিল। মোর্শেদ লাইটার জ্বালানোর সেই ম্লান আলোয় দেখল, সামিনা যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে রেখেছে। সিগারেটের প্রথম টানের ধোঁয়াটা যখন মোর্শেদের ফুসফুসে গেল, তখন তার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো শান্ত হতে শুরু করল ঠিকই, কিন্তু সামিনার প্রতি সেই পুলিশের অপমানজনক ইঙ্গিত তার ভেতরে একটা প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে রাখল।
পুরো রুমটিতে এখন দুটি সিগারেটের ধোঁয়া সমান্তরালভাবে ভাসছে—একটি মোর্শেদের আভিজাত্যের, অন্যটি ওই দারোগার কুৎসিত লালসার। আর সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মাঝখানে সামিনা তার যৌবনের বান ডাকা শরীর নিয়ে এক নীরব আগ্নেয়গিরির মতো বসে রইল, প্রতীক্ষা করতে লাগল সেই চূড়ান্ত মুহূর্তের জন্য।
থানার সেই গুমোট অন্ধকারে সিগারেটের ধোঁয়া যখন চারদিকে পাক খাচ্ছিল, সামিনা তখন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। পাশের ওই লোলুপ দারোগার কুৎসিত চাহনি থেকে বাঁচার জন্য সে নিজের চোখদুটো সরিয়ে নিল মোর্শেদের দিকে। আর একবার তাকাতেই সে যেন মোর্শেদের এক নতুন, আদিম পুরুষালি রূপে সম্মোহিত হয়ে পড়ল।
সামিনা আড়চোখে মোর্শেদকে দেখতে লাগল। মোর্শেদের সেই বলিষ্ঠ পুরুষালি হাত, যার ওপর দিয়ে নীল রঙের শিরার বিন্যাসগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল, সেই হাত দিয়ে সে খুব যত্ন করে সিগারেটটা ধরে আছে। মোর্শেদের নিকোটিনে পুড়ে যাওয়া কালচে ঠোঁট দুটোর মাঝখানে যখন সিগারেটের সাদা ফিল্টারটা চেপে বসছে, তখন সামিনার বুকের ভেতর এক অজানা শিহরণ বয়ে গেল। বাইক চালানোর কারণে মোর্শেদের ঘামে ভেজা চুলগুলো এখন এলোমেলো হয়ে কপালে লেপ্টে আছে, ধুলোয় কিছুটা ধূসর হয়ে গেলেও তাতে তার ভরাট চেহারার রুক্ষ সৌন্দর্য যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
মোর্শেদ যখন একটা গভীর টান দিয়ে ঠোঁটের কোণ দিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়ছিল, তখন সেই ধোঁয়াগুলো ধীরে ধীরে সামিনার মুখের পাশ দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। সামিনা অপলক দৃষ্টিতে দেখছিল মোর্শেদের হাতের আঙুলের সেই ছন্দময় নড়াচড়া। মোর্শেদ যখন তর্জনী দিয়ে টোকা দিয়ে সিগারেটের পোড়া ছাইগুলো মেঝেতে খসিয়ে দিচ্ছিল, সেই ছোট্ট ভঙ্গিটির মধ্যেও এক ধরণের রাজকীয় অবজ্ঞা ফুটে উঠছিল—যেন এই নোংরা থানা বা ওই লোলুপ পুলিশ অফিসাররা তার কাছে কিছুই নয়।
মোর্শেদের এই বলিষ্ঠ আর শান্ত উপস্থিতি সামিনার মনের ভেতরের সবটুকু ভয় যেন এক মুহূর্তে শুষে নিল। সে অনুভব করল, এই মানুষটি পাশে থাকলে তার কোনো বিপদ হতে পারে না। সামিনা অবচেতনভাবেই মোর্শেদের শরীরের সেই তপ্ত ও পরিচিত ঘ্রাণ নিজের ফুসফুসে টেনে নিল। তার মনে হলো, মোর্শেদ যেন একটা বিশাল মহীরুহ, যার ঘন ছায়ায় সে এখন পরম আশ্রয়ে আছে। ওই লোলুপ দারোগাটি হয়তো তাকে তার দৃষ্টি দিয়ে খুবলে খেতে চাইছে, কিন্তু সামিনা এখন আর আগের মতো কুঁকড়ে যাচ্ছিল না। বরং সে মোর্শেদের গায়ের সাথে নিজের ভরাট শরীরের স্পর্শটুকু আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করল।
মোর্শেদের এই পুরুষালি ব্যক্তিত্বের ছায়ায় সে আজ এমন এক সাহস পেল, যা সে আগে কখনো অনুভব করেনি। সে বুঝতে পারল, এই সম্পর্কের নাম যা-ই হোক না কেন, এই মুহূর্তে মোর্শেদই তার একমাত্র ত্রাণকর্তা। মোর্শেদের প্রতিটি নিশ্বাস আর হাতের সেই আগুনের ফুলকি সামিনাকে এক অলিখিত নিরাপত্তা দিচ্ছিল। সামিনা মোর্শেদের বাহুর খুব কাছে নিজের কাঁধটা এলিয়ে দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে নিজেকে নির্ভার করে দিল; যেন মোর্শেদের ওই একটি সিগারেটের ধোঁয়ার আড়ালেই লুকিয়ে আছে সামিনার সমস্ত রক্ষা কবজ।
ঠিক সেই মুহূর্তে ওসির ঘরের নীল পর্দাটা সরিয়ে মূল দারোগা অর্থাৎ ডিউটি অফিসারের প্রবেশ ঘটল। লোকটার পরনের ইউনিফর্ম ঘামে জবজবে হয়ে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে, আর মুখাবয়বে সারাদিনের ধকল ও বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। সে গটগট করে এগিয়ে এসে তার নির্দিষ্ট খালি টেবিলটার সামনের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল।
টেবিলে বসেই সে সামিনা বা মোর্শেদের দিকে একবারও তাকাল না। তার বদলে মাথার ওপরের সেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুরতে থাকা ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে মুখ বিশ্রী করে একটা গালি দিল। "শালা, এই গরমে জানটা কয়লা হয়ে গেল! সরকারি অফিসের এই হাল, ফ্যান ঘুরে না কি ঘোড়ার ডিম ঘুরে বোঝা দায়!" বলতে বলতে সে টেবিলের ওপর রাখা একটা পুরনো ফাইল দিয়ে নিজের মুখ আর গলায় বাতাস করতে লাগল।
পাশে বসে থাকা সেই ভুঁড়িওয়ালা লোলুপ দারোগাটি তখন নিজের সিগারেটের শেষ অংশটুকু অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে দাঁত বের করে হাসল। মূল দারোগাটি তার দিকে তাকিয়ে এক অপরিচিত ব্যক্তির কথা তুলে বলল, "বুঝলেন কাসেম সাহেব, ওই রমিজ মিয়ারে আজ রাইতে না ধরলে ওসির ঝাড়ি আমারে খাইতে হইবো। হারামজাদা কোন চিপায় যে লুকাইছে!"
ভুঁড়িওয়ালা দারোগা কাসেম মাথা দুলিয়ে সায় দিল এবং তারপর আড়চোখে সামিনার সেই বিশাল নিতম্ব আর ব্লাউজের ভেতরের চওড়া স্ট্র্যাপের অস্তিত্ব আরেকবার মেপে নিয়ে একটা অর্থবহ হাসি দিল। তাদের মধ্যে কিছুক্ষণ এই অপ্রাসঙ্গিক আর কুৎসিত রসিকতা চলল, যেন সামিনা আর মোর্শেদ সেখানে কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, বরং আসবাবপত্রের মতো পড়ে আছে।
অবশেষে, দীর্ঘ কয়েক মিনিট পর মূল দারোগাটি তার হাতের ফাইলটা সজোরে টেবিলের ওপর আছাড় মারল। সে এবার অত্যন্ত অবহেলা আর অবজ্ঞা নিয়ে মোর্শেদ আর সামিনার দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে কোনো সৌজন্য নেই, বরং আছে এক ধরণের 'ঝামেলা তাড়ানো'র বিরক্তি। সে মোর্শেদের ঠোঁটে জ্বলতে থাকা দামী সিগারেট আর তার দামী পোশাকের দিকে একবার তাকিয়ে নিজের ঘাড় মটকাল।
তারপর কর্কশ আর ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করল, "বলেন, আপনাদের জন্য কী করতে পারি?
দারোগার এই কাঠখোট্টা প্রশ্নে সামিনা আবার একটু শিউরে উঠল। মোর্শেদ তার জ্বলন্ত সিগারেটটা শান্তভাবে হাতের আঙুলের চাপে নিভিয়ে দিয়ে দারোগার চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে সজলের কথাটা পাড়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
মোর্শেদ তার সিগারেটের অবশিষ্টাংশটুকু পাশের একটি পুরনো প্লাস্টিকের বালতিতে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফেলে দিয়ে রায়হানের চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। তার কণ্ঠে কোনো জড়তা নেই, বরং এক ধরণের শান্ত আধিপত্য কাজ করছে। রায়হানের ইউনিফর্মে ঝোলানো চকচকে রূপালি নেম প্লেটটার দিকে এক পলক তাকিয়ে মোর্শেদ তার নামটা পড়ে নিল।
মোর্শেদ গম্ভীর কিন্তু মার্জিত স্বরে বলল, "অফিসার রায়হান, আজকে বিকেলে সজল নামের একটা ছেলেকে পিকআপ করে আনা হয়েছে। আমরা সজলের ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছি।"
রায়হান সাহেব নামের সেই দারোগা এবার একটু সোজা হয়ে বসলেন। 'সজল' নামটা শুনেই তার কপালে বিরক্তির রেখাগুলো আরও গভীর হলো। তিনি হাতের কলমটা দিয়ে টেবিলের ওপর বারবার শব্দ করতে করতে মোর্শেদ আর সামিনাকে আপাদমস্তক মেপে নিলেন। বিশেষ করে সামিনার শরীর যখন রায়হানের চোখের সীমানায় পড়ল, তার বিরক্তিটা যেন এক অদ্ভুত কৌতূহলে রূপ নিল।
তিনি টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে সরাসরি মোর্শেদের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "তা সজলের ঠিক কী হন আপনারা? আত্মীয়তার সম্পর্কটা কী?"
মোর্শেদ এক মুহূর্ত দেরি না করে প্রশ্নটা খুব সাবলীলভাবে ঘুরিয়ে দিল। সে সামিনার দিকে এক পলক না তাকিয়েই বলল, "সজল আমার ভাগ্নে হয়।"
মোর্শেদের এই উত্তরে রায়হানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। সে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পাশের সেই ভুঁড়িওয়ালা দারোগার দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের ইশারা করল। এরপর সামিনার শাড়ির উপর দিয়েই শারীরিক গঠনের দিকে দিকে অভদ্রের মতো তাকিয়ে রায়হান বলল, "ও! ভাগ্নে? তার মানে আপনারা সজলের মামা আর মামী? ভালো তো! মামীমাকে তো সাথে নিয়ে আসছেন দেখি বেশ তোড়জোড় করেই।"
'মামী' ডাকটা শোনামাত্র সামিনা পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে অনুভব করল তার গালের চামড়াটা যেন আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে গেছে। সে অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে মাথা নিচু করল এবং অত্যন্ত নিচু, প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল, "না... আমি সজলের খালা হই।"
সামিনার কণ্ঠস্বরটা ছিল কোমল কিন্তু সেই গুমোট ঘরে তা বেশ পরিষ্কার শোনা গেল। রায়হান সাহেব এবার একটা বিকট হাসি দিলেন। তিনি টেবিলের ওপর হাত চাপড়ে বললেন, "আরে একই তো কথা! আপনারা তাইলে ওই ছেলেটার খালা আর খালু! খালা-খালু একসাথেই যখন আসছেন, তখন তো সজলের কপাল ভালোই বলতে হয়।"
'খালু' সম্বোধনটি শোনার সাথে সাথে মোর্শেদ আর সামিনার মধ্যে এক মুহূর্তের জন্য সময় থমকে গেল। সামিনা মোর্শেদের আরও একটু কাছে ঘেঁষে গেল। সে আড়চোখে মোর্শেদের দিকে তাকাল—মোর্শেদের চোখে কোনো প্রতিবাদ নেই, বরং এক ধরণের রহস্যময় নির্লিপ্ততা। মোর্শেদ এই 'খালা-খালু' পরিচয়ের ভুলটা ভাঙানোর কোনো চেষ্টাই করল না। বরং সে এমন এক ভঙ্গিতে স্থির রইল, যেন এই মিথ্যে সম্পর্কটাই এখন তাদের এই থানার বৈরি পরিবেশে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
সামিনার মনের গভীর থেকে একটা বিচিত্র অনুভূতি উঁকি দিচ্ছিল। মোর্শেদকে পুলিশের সামনে নিজের 'স্বামী' বা 'খালু' হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়ে তার ভেতরে যে লজ্জার শিহরণ বইছিল, তার আড়ালে এক ধরণের নিষিদ্ধ সুখও ছিল।
দারোগা রায়হান এবার মোর্শেদের দিকে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "তা খালু সাহেব, ভাগ্নের জন্য পকেটে কী নিয়ে আসছেন? ছিনতাই কেস তো অত সোজা না!
দারোগা রায়হানের সেই ধূর্ত হাসি আর 'খালু সাহেব' সম্বোধনের আড়ালে যে টাকার ক্ষুধা লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে মোর্শেদের এক মুহূর্তও সময় লাগল না। সে খুব ধীরস্থিরভাবে নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে হাতের ঘাম মুছল, যেন সে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। সামিনা পাশে তখন ভয়ে সিঁটিয়ে আছে।
মোর্শেদ গলায় সামান্য গাম্ভীর্য এনে জিজ্ঞেস করল, "সজলের আসলে অপরাধটা কী অফিসার? আপনারা কেন ওকে এভাবে তুলে আনলেন?"
রায়হান সাহেব এবার টেবিলের ওপর রাখা একটা লম্বা লাঠি দিয়ে নিজের হাতের তালুতে মৃদু আঘাত করতে করতে বলতে শুরু করল, "অপরাধ? বলেন কী খালু সাহেব! আপনার ভাগ্নে তো বড় খিলাড়ি। ভরদুপুরে উত্তরার মেইন রোড থেকে এক মহিলার ভ্যানিটি ব্যাগ আর মোবাইল ছিনতাইয়ের সময় হাতেনাতে পাবলিকের কাছে ধরা খাইছে। লোকজন পিটুনি দিয়ে আমাদের হাতে তুলে দিছে।"
সামিনা এই শুনে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলতে চাইল সজল এমন ছেলে নয়, কিন্তু রায়হান তাকে কোনো সুযোগই দিল না। সে আরও একটু ঝুঁকে এসে রহস্যময় গলায় যোগ করল, "আর শুধু ছিনতাই হলে তো কথাই ছিল না। সজলকে যখন থানায় এনে সার্চ করা হইলো, তখন তার পকেটে আড়াইশ গ্রাম গাঁজা আর প্যান্টের কোমরে গোঁজা একখানা ধারালো সুইচ গিয়ার চাকু পাওয়া গেছে। বুঝতেই পারছেন, ডিনামাইট কেস!"
সামিনার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। সে ভয়ে প্রায় কাঁপতে শুরু করল। রায়হান এবার আইনের বইয়ের কাল্পনিক পাতা ওলটানোর মতো অঙ্গভঙ্গি করে বলতে লাগল, "ছিনতাইয়ের মামলা, সাথে মাদক আর দেশীয় অস্ত্র রাখা—৩৭৯ আর সাথে মাদকদ্রব্যের ওই সব কঠিন ধারা পড়বে। সব মিলিয়ে ওরে আমরা কাল সকালেই চালান করে দেব কোর্টে। বুঝতেই পারছেন, জেলে গেলে ৫-৭ বছরের আগে আর রোদের আলো দেখা হবে না ভাগ্নে সাহেবের।"
রায়হান সাহেব এবার আড়চোখে শাড়ির আড়ালে লুকোনো রেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা তৃপ্তির হাসি দিল। সে জানে, এই 'চালান করে দেওয়া'র ভয়টাই হলো সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সামিনা অসহায় চোখে মোর্শেদের দিকে তাকাল। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। মোর্শেদ বুঝতে পারল, রায়হান সজলের ঘাড়ে মিথ্যে অপবাদও চাপাচ্ছে যাতে লেনদেনের দরটা বাড়ানো যায়।
মোর্শেদ পকেট থেকে তার মানিব্যাগটা আলতো করে স্পর্শ করল। সে জানত, এখানে যুক্তি চলবে না, কেবল 'কাগজের শক্তি' চলবে। কিন্তু তার আগেই সে একবার দেখতে চাইল রায়হান আসলে কত দূর পর্যন্ত যেতে চায়। পুরো থানার সেই গুমোট অন্ধকারে সজলের ভবিষ্যৎ এখন রায়হানের কলমের ডগায় আর সামিনার সম্ভ্রম যেন সেই লোলুপ দৃষ্টির সামনে এক বিষম পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে
মোর্শেদ পরিস্থিতির গভীরতা মাপতে চাইল। সে জানত, পুলিশের এই ‘চালান’ করার হুমকির আড়ালে আসল উদ্দেশ্য হলো পকেট ভারী করা। সে তার কণ্ঠস্বরকে আরও নিচু করে, এক ধরণের সমঝোতার সুর এনে রায়হানকে বলল, “অফিসার, ছেলেটা ইমোশনাল হয়ে হয়তো ভুল করে ফেলেছে। আপনি বলেন, কীভাবে কী করে আমরা এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে পারি? যেভাবে যা করা লাগবে একটু দেখেন না, মিটিয়ে নেওয়া যায় কি না।”
মোর্শেদের মুখে ‘যা করা লাগবে’ শব্দগুলো শোনামাত্র রায়হান সাহেবের মুখভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গেল। সে চেয়ার থেকে একটু সামনে ঝুঁকে এল, তারপর হঠাৎ করেই এক বিকট অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে ঘর ভর্তি পুরনো ফাইলের ধুলো যেন কেঁপে উঠল। পাশের সেই ভুঁড়িওয়ালা দারোগাটিও তার সাথে যোগ দিল।
রায়হান হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, “কী দিবেন? ঘুষ দিবেন? আমাকে ঘুষ প্রস্তাব করছেন? আপনি জানেন না পুলিশের ডিউটি অফিসারকে ঘুষ প্রস্তাব করার অপরাধ আর সাজা কী?”
সামিনা ভয়ে মোর্শেদের হাত খামচে ধরল। তার ফর্সা মুখটা অপমানে আর আতঙ্কে মড়ার মতো সাদা হয়ে গেল। রায়হান এবার আইনের ধারা শোনানোর নাম করে সামিনার ভরাট যৌবনের ওপর চোখ বুলিয়ে অত্যন্ত কদর্যভাবে বলতে শুরু করল, “দণ্ডবিধির ১৬১ থেকে ১৬৫ ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করলে কারাদণ্ড আর জরিমানা—দুইই হতে পারে। আপনাদেরকেও সজলের পাশের সেলে ঢুকিয়ে দেব নাকি খালা-খালু সাহেব?”
বলেই রায়হান আবার সেই বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে ‘খিক খিক’ করে হাসতে শুরু করল। সেই হাসিটা ছিল অত্যন্ত নোংরা এবং অপমানজনক। হাসতে হাসতেই সে আড়চোখে সামিনার চেহারায় জমে থাকা ঘামের বিন্দুগুলোর দিকে তাকাল। সামিনা বুঝতে পারছিল, রায়হান কেবল টাকাই চাচ্ছে না, সে তার দৃষ্টি দিয়ে সামিনাকে মানসিকভাবে উলঙ্গ করে ফেলছে।
রায়হান হাসতে হাসতে মোর্শেদকে লক্ষ্য করে বলল, “ভাগ্নে তো ভেতরে গাঁজা আর চাকু নিয়ে বসে আছে, এখন মামী... থুক্কু খালা আর খালু যদি ঘুষের দায়ে ভেতরে ঢোকেন, তবে তো পুরো ফ্যামিলি রিইউনিয়ন হয়ে যাবে থানার ভেতরেই!”
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...
[+] 3 users Like KaminiDevi's post
Like Reply


Messages In This Thread
RE: হাইওয়ের নীল জ্যামিতি (চলবে) - by KaminiDevi - 09-02-2026, 08:44 PM



Users browsing this thread: 2 Guest(s)