09-02-2026, 08:00 PM
(This post was last modified: 09-02-2026, 08:23 PM by gungchill. Edited 2 times in total. Edited 2 times in total.)
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ঙ) এর বাকি অংশ
আয়শা আর রানী যখন করিডর দিয়ে হেটে আসছিলো , তখনো রাজিব কোরিডরে বসা , ও নাস্তা আনতে যায়নি , কারন ও জানতো বাসা থেকে খাবার কিছুক্ষনের মাঝেই পৌঁছে যাবে । আয়শার সাথে ওর কথা হয়েছিলো । ওদের দেখে রাজিব উঠে দাড়ায়, হাসি মুখে সামনে এগিয়ে জেতে নেয় , ঠিক তখনি পেছনে জয়ের আবির্ভাব হয় , হাতে টিফিন ক্যারিয়ার । এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় রাজিব , চোখাচোখি হয় জয়ের সাথে । চোখাচোখি হতেই দুজনেই প্রায় একসাথে চোখ সরিয়ে নেয়—যেন কেউ প্রথমে থামলে অন্যজনের ভেতরের কথা বেরিয়ে পড়বে।
রাজিব নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর সামনে এগোয় না। জয়ের মুখটা দেখেই রাজিবের পা দুটো থমকে যায়। ঠিক ভয় নয়, ঠিক রাগও নয়—একটা পুরোনো পরিচিত অনুভূতি, যেটা এখন আর পরিচিত লাগে না। একসময় যাদের দূরত্ব বোঝারই কথা ছিল না, তাদের মাঝখানে এখন কয়েক কদম ফাঁক পড়ে গেছে—আর সেই ফাঁকটা পেরোতে রাজিবের অদ্ভুত লাগে।
জয় নিজেও একটু থমকে দাড়ায় , হাতে ধরে টিফিন ক্যারিয়ারের উপর হাতের চাপ আরো কিছুটা বারে , চোখে রাগ নেই—আছে একটা ছোট্ট ভুল।হয়তো ভুলও নয়, কিন্তু ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।
রাজিব , জয়ের দিকটা উপেক্ষা করেই রানী আর আয়শার দিকে তাকায়। হাঁটার সময় আয়শা রানীর একটা হাত ধরে রেখেছে। রাজিব একটা ছোট শ্বাস ফেলে। রানীকে স্বাভাবিকই লাগছে তার কাছে। এতে একটু স্বস্তি পায় রাজিব।
সকালে রানীকে ফোন করে সে ডাক্তাররা রহিম সম্পর্কে যতটা ভালো খবর বলেছিল, তার চেয়েও একটু বাড়িয়ে বলেছিল—রানী যেন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে।
রানী একবার রাজিবের দিকে তাকিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবেই চোখ ফিরিয়ে নেয়। ঠিক তখনই রাজিবের চোখে একটা ব্যাপার ধরা পড়ে। রানী শুধু ভারমুক্তই নয়—ওর চোখের কোণে যেন একটা হালকা উজ্জ্বলতা লেগে আছে, আর ঠোঁটের কোণে একটা চেপে রাখা হাসি।
রাজিব একটু অবাক হয়। অনেক দিন পর রানীর মুখে এমন একটা সহজ ভাব দেখছে সে। তবে বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে না। বরং ভালোই লাগে। গতকাল ওকে এমন ভয় পেতে দেখার পর, আজ এই মুখটাই রাজিবের জন্য যথেষ্ট।
আয়শার দিকে তাকিয়ে ওর মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। আয়শা যেমন এখনো রানীর হাত ধরে আছে, রাজিবের বুঝতে অসুবিধা হয় না—কেন রানী এতটা ভারমুক্ত। নিশ্চয়ই আয়শা আর জান্নাতই গত রাত আর আজকের সকালটা ওর পাশে থেকে ওকে এই অবস্থায় এনে দিয়েছে।
ভেতরে গিয়েই রানীর নজর প্রথমে পড়ে ওর আব্বুর উপর। গাড়ির ভেতরে জয়ের সঙ্গে খুনসুটির রেশ ধরে এতক্ষণ চোখের কোণে যে ঝিলিকটা ছিল, সেটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে যায়। তার জায়গা নেয় এক ধরনের শান্ত দৃষ্টি।
হ্যাঁ, রানী দেখতে পাচ্ছে—রহিম এখন ভালো আছে। বন্ধু জয়নালের সঙ্গে গল্প করছে।
রানীর বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শ্বাস খুব ধীরে বেরিয়ে আসে। তার সঙ্গে প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে শব্দটা—“আব্বু…”
এটা ডাকার ডাক না। যেন একটা পরীক্ষা। মানুষটা সত্যিই আছে কি না, সেটুকু যাচাই করে নেওয়া।
গতকাল এই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলবে ভেবে পুরো পৃথিবীটা হঠাৎ খুব কঠিন লেগেছিল। তাই এই একটুকু শব্দ দিয়ে রানী যেন নিজেকে বুঝিয়ে নেয়—মানুষটা এখনো আছে।
রহিম মেয়ের দিকে তাকায়। প্রথমেই ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে ওঠে। তারপর নজর যায় রানীর নরম দৃষ্টির দিকে। ঠিক তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে রহিমের। এই প্রথম একটু ভয় পায় সে। ভয়টা নিজের জন্য নয়—আবার পুরোপুরি নিজের জন্যও।
নিচের ঠোঁটে হালকা একটা কাঁপুনি দেখা দেয়, এতটাই ক্ষীণ যে চোখে পড়ার কথা নয়।
“আব্বু…”
মেয়ের মুখে শব্দটা শুনেই রহিম বুঝে নেয়। এই ডাক বলে দেয়, গতকাল রানী কতটা ভয় পেয়েছিল।
রহিম হাত বাড়ায়। রানী হেঁটে আসে। এই হাঁটার মধ্যেও একটা অনিশ্চয়তা চোখে পড়ে রহিমের—যেন সে নিজেও ঠিক জানে না, সত্যিই আব্বুর কাছেই আসছে কি না।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে যায়। রহিম নিজেই সেটা হালকা করার চেষ্টা করে। রানীর হাত ধরে নরম গলায় বলে,“খুব ভয় পেয়েছিলি রে মা। ভয় নেই, আমি এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না।”
রানীর চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
আধশোয়া ভঙ্গিতে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। তখন সে টের পায় সেই উষ্ণতা—রক্তের উষ্ণতা—যে উষ্ণতা কোনো ডাক্তারের ওষুধ, কোনো নার্সের সেবা এনে দিতে পারে না।
এই উষ্ণতা রহিমের একার নয়, রানীর শরীরের একারও নয়। দুজনের শরীরে বয়ে চলা একই রক্তই এই উষ্ণতা তৈরি করেছে—যার কোনো বিকল্প নেই, যা আর কেউ তৈরি করতে পারে না।
চোখ তুলে রহিম তাকায় রাজিবের দিকে। ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। শরীর আর পোশাকে ক্লান্তির ছাপ, সারারাত না ঘুমানোর চিহ্ন স্পষ্ট।সেই সব ক্লান্তির চিহ্ন ছাপিয়ে উঠেছে তৃপ্তি—আর তার ছায়া হয়ে আছে, তৃপ্তির আড়ালে চাপা পড়া ভয়।
রহিম ভেবে পায় না—কীভাবে সে এখনো নিজের ছেলে-মেয়ের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এদের জন্য সে আসলে কী করেছে, আর কী করতে পারেনি। কান্নাটা আর ঠোঁটের কাঁপুনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না , ছোট্ট দু’ফোঁটা জল হয়ে চোখে চিকচিক করতে থাকে ।
কেবিনের ভেতরটা এখন ভেজা আবেগে ভরপুর। রহিম জড়িয়ে রেখেছে রানীকে—চোখে জমে আছে জলের ফোঁটা। রানী বাবার বুকে মিশে নিঃশব্দে কাঁদছে। রাজিব একটু দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছে। তার মনে কী চলছে, বোঝা খুব মুশকিল নয়—এখন সব ঠিক আছে, কিন্তু একটা ঝড় এলেই সব ওলটপালট হতে পারে।পাশে বসে জয়নাল নীরবে দেখছে। আয়শা দাঁড়িয়ে আছে, মুখে মৃদু হাসি। জয় সবার পেছনে—ওর দৃষ্টি শুধু রানীর হালকা হালকা কেঁপে ওঠা পিঠের ওপর নিবদ্ধ।
প্রথম নীরবতা ভাঙলো আয়শা। হাসিমুখে একটু এগিয়ে এসে, রানীর পিঠে হাত রেখে রহিমকে জিজ্ঞেস করলো,“এখন কেমন আছেন ভাই?”
একই সময় জয়নাল পাশ থেকে হাত রাখলো রহিমের কাঁধে।
আয়শা আর জয়নালের নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া যেন রহিমকে নিজের আবেগ কন্ট্রোলের শক্তি যোগান দিলো। রানীকে ছেড়ে সে ওকে সোজা করে দাঁড় করালো। ঠোঁট চেপে সাহসী হাসিতে দু’বার হালকা ঝাঁকুনি দিলো রানীর দু’বাহু ধরে—যেন বলতে চাইছে, আব্বু এখনো আছে।তারপর হাসিমুখে আয়শার দিকে তাকিয়ে বলল,“এখন ভালো আছি। আপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম, ভাবি”—বলে একটু হাসার চেষ্টা করল।
“এই কষ্টের সুদে–আসলে শোধ নেবো ভাই। একদম নিয়ম মেনে চলবেন, আর ক্লাস করা বন্ধ—একদম টোটাল অফ,”বলে আয়শা এখনো হালকা কাঁদতে থাকা রানীর কাঁধ এক বাহুতে জড়িয়ে ধরলো। রানীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,“কি বলিস মা, তুই, আমি আর সবাই মিলে কঠিন সাজা দেবো তোর আব্বুকে।”
বলবার সময় আয়শার গলাও ধরে এলো। বারবার আফরোজার কথা মনে পড়ছে—এই সময় আফরোজা থাকলে কী করতো, সেই ভাবটাই ভেসে উঠছে মনে।
আয়শার এই মৃদু শাসনে জয়নালের কণ্ঠে একটু কঠোরতা এলো। বলল,“শালা, যদি আর কোচিংয়ের নাম নিবি, আমি তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”
কথাটা শুনে রানী আয়শার বুকে মুখ গুঁজেই হালকা হেসে ওঠে। চোখের কোণটা আঙুলের ডগায় মুছে নেয় সে—কান্না থামেনি, কিন্তু এখন আর ভাঙন নেই।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজিব ধীরে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে। এতক্ষণ যে চাপা ভয়টা বুকের ভেতর আটকে ছিল, সেটা আর নেই। সে দেয়ালের দিকে হেলান দেয়—মাথাটা হালকা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য। ভাবটা এমন, পরে কী হবে দেখা যাবে—এই মুহূর্তটা থাক।
জয় সবার শেষে একটু এগিয়ে এলো। চোখেমুখে হালকা দুষ্টুমি ধরে রেখে বলল,
“কি ব্যাপার ছোট আব্বু, কিছুদিন আগে আমাকে খুব সাহস দিচ্ছিলেন—এখন নিজেই চিতপটাং!”
রহিম হেসে উঠলো। বলল,“মাঝে মাঝে তোদের ইয়াংম্যানদের একটু খাটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় রে।”
আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। তবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণ। এই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলো। এভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়—নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে।
বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলো। বেঁচে থাক এই উষ্ণতা।
*****
আয়শা আর রানী যখন করিডর দিয়ে হেটে আসছিলো , তখনো রাজিব কোরিডরে বসা , ও নাস্তা আনতে যায়নি , কারন ও জানতো বাসা থেকে খাবার কিছুক্ষনের মাঝেই পৌঁছে যাবে । আয়শার সাথে ওর কথা হয়েছিলো । ওদের দেখে রাজিব উঠে দাড়ায়, হাসি মুখে সামনে এগিয়ে জেতে নেয় , ঠিক তখনি পেছনে জয়ের আবির্ভাব হয় , হাতে টিফিন ক্যারিয়ার । এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় রাজিব , চোখাচোখি হয় জয়ের সাথে । চোখাচোখি হতেই দুজনেই প্রায় একসাথে চোখ সরিয়ে নেয়—যেন কেউ প্রথমে থামলে অন্যজনের ভেতরের কথা বেরিয়ে পড়বে।
রাজিব নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর সামনে এগোয় না। জয়ের মুখটা দেখেই রাজিবের পা দুটো থমকে যায়। ঠিক ভয় নয়, ঠিক রাগও নয়—একটা পুরোনো পরিচিত অনুভূতি, যেটা এখন আর পরিচিত লাগে না। একসময় যাদের দূরত্ব বোঝারই কথা ছিল না, তাদের মাঝখানে এখন কয়েক কদম ফাঁক পড়ে গেছে—আর সেই ফাঁকটা পেরোতে রাজিবের অদ্ভুত লাগে।
জয় নিজেও একটু থমকে দাড়ায় , হাতে ধরে টিফিন ক্যারিয়ারের উপর হাতের চাপ আরো কিছুটা বারে , চোখে রাগ নেই—আছে একটা ছোট্ট ভুল।হয়তো ভুলও নয়, কিন্তু ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা।
রাজিব , জয়ের দিকটা উপেক্ষা করেই রানী আর আয়শার দিকে তাকায়। হাঁটার সময় আয়শা রানীর একটা হাত ধরে রেখেছে। রাজিব একটা ছোট শ্বাস ফেলে। রানীকে স্বাভাবিকই লাগছে তার কাছে। এতে একটু স্বস্তি পায় রাজিব।
সকালে রানীকে ফোন করে সে ডাক্তাররা রহিম সম্পর্কে যতটা ভালো খবর বলেছিল, তার চেয়েও একটু বাড়িয়ে বলেছিল—রানী যেন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে।
রানী একবার রাজিবের দিকে তাকিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবেই চোখ ফিরিয়ে নেয়। ঠিক তখনই রাজিবের চোখে একটা ব্যাপার ধরা পড়ে। রানী শুধু ভারমুক্তই নয়—ওর চোখের কোণে যেন একটা হালকা উজ্জ্বলতা লেগে আছে, আর ঠোঁটের কোণে একটা চেপে রাখা হাসি।
রাজিব একটু অবাক হয়। অনেক দিন পর রানীর মুখে এমন একটা সহজ ভাব দেখছে সে। তবে বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে না। বরং ভালোই লাগে। গতকাল ওকে এমন ভয় পেতে দেখার পর, আজ এই মুখটাই রাজিবের জন্য যথেষ্ট।
আয়শার দিকে তাকিয়ে ওর মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। আয়শা যেমন এখনো রানীর হাত ধরে আছে, রাজিবের বুঝতে অসুবিধা হয় না—কেন রানী এতটা ভারমুক্ত। নিশ্চয়ই আয়শা আর জান্নাতই গত রাত আর আজকের সকালটা ওর পাশে থেকে ওকে এই অবস্থায় এনে দিয়েছে।
“ কিরে তুই এখানে দাড়িয়ে কেনো?” কাছে আসতেই আয়শা জিজ্ঞাসা করে ,
হাল্কা হাসে রাজিব , বলে “ বড় আব্বু নাস্তা কিনতে পাঠিয়েছে , হেব্বি রেগে আছে তোমাদের দেরি দেখে”
রাজিবের কথা শুনে রানী চেপে রাখা হাসি ফিক করে বেরিয়ে আসে , আয়শা ভ্রূকুটি করে আর পেছনে জয় নিসব্দে আই রোল করে ।
“ বাদ দে তোর বড় আব্বুর কথা , সে তো মনে করে , আমি মেশিন , রান্না হও বলবে আর রান্না হয়ে যাবে , চল ভেতরে”
রাজিব ও মুচকি হাসল , তারপর ওদের নিয়ে ভেতরে গেলো ,
******
হ্যাঁ, রানী দেখতে পাচ্ছে—রহিম এখন ভালো আছে। বন্ধু জয়নালের সঙ্গে গল্প করছে।
রানীর বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শ্বাস খুব ধীরে বেরিয়ে আসে। তার সঙ্গে প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে শব্দটা—“আব্বু…”
এটা ডাকার ডাক না। যেন একটা পরীক্ষা। মানুষটা সত্যিই আছে কি না, সেটুকু যাচাই করে নেওয়া।
গতকাল এই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলবে ভেবে পুরো পৃথিবীটা হঠাৎ খুব কঠিন লেগেছিল। তাই এই একটুকু শব্দ দিয়ে রানী যেন নিজেকে বুঝিয়ে নেয়—মানুষটা এখনো আছে।
রহিম মেয়ের দিকে তাকায়। প্রথমেই ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে ওঠে। তারপর নজর যায় রানীর নরম দৃষ্টির দিকে। ঠিক তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে রহিমের। এই প্রথম একটু ভয় পায় সে। ভয়টা নিজের জন্য নয়—আবার পুরোপুরি নিজের জন্যও।
নিচের ঠোঁটে হালকা একটা কাঁপুনি দেখা দেয়, এতটাই ক্ষীণ যে চোখে পড়ার কথা নয়।
“আব্বু…”
মেয়ের মুখে শব্দটা শুনেই রহিম বুঝে নেয়। এই ডাক বলে দেয়, গতকাল রানী কতটা ভয় পেয়েছিল।
রহিম হাত বাড়ায়। রানী হেঁটে আসে। এই হাঁটার মধ্যেও একটা অনিশ্চয়তা চোখে পড়ে রহিমের—যেন সে নিজেও ঠিক জানে না, সত্যিই আব্বুর কাছেই আসছে কি না।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে যায়। রহিম নিজেই সেটা হালকা করার চেষ্টা করে। রানীর হাত ধরে নরম গলায় বলে,“খুব ভয় পেয়েছিলি রে মা। ভয় নেই, আমি এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না।”
রানীর চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
আধশোয়া ভঙ্গিতে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। তখন সে টের পায় সেই উষ্ণতা—রক্তের উষ্ণতা—যে উষ্ণতা কোনো ডাক্তারের ওষুধ, কোনো নার্সের সেবা এনে দিতে পারে না।
এই উষ্ণতা রহিমের একার নয়, রানীর শরীরের একারও নয়। দুজনের শরীরে বয়ে চলা একই রক্তই এই উষ্ণতা তৈরি করেছে—যার কোনো বিকল্প নেই, যা আর কেউ তৈরি করতে পারে না।
চোখ তুলে রহিম তাকায় রাজিবের দিকে। ছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। শরীর আর পোশাকে ক্লান্তির ছাপ, সারারাত না ঘুমানোর চিহ্ন স্পষ্ট।সেই সব ক্লান্তির চিহ্ন ছাপিয়ে উঠেছে তৃপ্তি—আর তার ছায়া হয়ে আছে, তৃপ্তির আড়ালে চাপা পড়া ভয়।
রহিম ভেবে পায় না—কীভাবে সে এখনো নিজের ছেলে-মেয়ের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এদের জন্য সে আসলে কী করেছে, আর কী করতে পারেনি। কান্নাটা আর ঠোঁটের কাঁপুনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না , ছোট্ট দু’ফোঁটা জল হয়ে চোখে চিকচিক করতে থাকে ।
*****
প্রথম নীরবতা ভাঙলো আয়শা। হাসিমুখে একটু এগিয়ে এসে, রানীর পিঠে হাত রেখে রহিমকে জিজ্ঞেস করলো,“এখন কেমন আছেন ভাই?”
একই সময় জয়নাল পাশ থেকে হাত রাখলো রহিমের কাঁধে।
আয়শা আর জয়নালের নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া যেন রহিমকে নিজের আবেগ কন্ট্রোলের শক্তি যোগান দিলো। রানীকে ছেড়ে সে ওকে সোজা করে দাঁড় করালো। ঠোঁট চেপে সাহসী হাসিতে দু’বার হালকা ঝাঁকুনি দিলো রানীর দু’বাহু ধরে—যেন বলতে চাইছে, আব্বু এখনো আছে।তারপর হাসিমুখে আয়শার দিকে তাকিয়ে বলল,“এখন ভালো আছি। আপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম, ভাবি”—বলে একটু হাসার চেষ্টা করল।
“এই কষ্টের সুদে–আসলে শোধ নেবো ভাই। একদম নিয়ম মেনে চলবেন, আর ক্লাস করা বন্ধ—একদম টোটাল অফ,”বলে আয়শা এখনো হালকা কাঁদতে থাকা রানীর কাঁধ এক বাহুতে জড়িয়ে ধরলো। রানীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,“কি বলিস মা, তুই, আমি আর সবাই মিলে কঠিন সাজা দেবো তোর আব্বুকে।”
বলবার সময় আয়শার গলাও ধরে এলো। বারবার আফরোজার কথা মনে পড়ছে—এই সময় আফরোজা থাকলে কী করতো, সেই ভাবটাই ভেসে উঠছে মনে।
আয়শার এই মৃদু শাসনে জয়নালের কণ্ঠে একটু কঠোরতা এলো। বলল,“শালা, যদি আর কোচিংয়ের নাম নিবি, আমি তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো।”
কথাটা শুনে রানী আয়শার বুকে মুখ গুঁজেই হালকা হেসে ওঠে। চোখের কোণটা আঙুলের ডগায় মুছে নেয় সে—কান্না থামেনি, কিন্তু এখন আর ভাঙন নেই।
একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজিব ধীরে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ে। এতক্ষণ যে চাপা ভয়টা বুকের ভেতর আটকে ছিল, সেটা আর নেই। সে দেয়ালের দিকে হেলান দেয়—মাথাটা হালকা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য। ভাবটা এমন, পরে কী হবে দেখা যাবে—এই মুহূর্তটা থাক।
জয় সবার শেষে একটু এগিয়ে এলো। চোখেমুখে হালকা দুষ্টুমি ধরে রেখে বলল,
“কি ব্যাপার ছোট আব্বু, কিছুদিন আগে আমাকে খুব সাহস দিচ্ছিলেন—এখন নিজেই চিতপটাং!”
রহিম হেসে উঠলো। বলল,“মাঝে মাঝে তোদের ইয়াংম্যানদের একটু খাটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় রে।”
আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছে। তবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণ। এই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলো। এভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়—নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে।
বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলো। বেঁচে থাক এই উষ্ণতা।
*****
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)