Thread Rating:
  • 22 Vote(s) - 2.64 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
Romance কিছু সম্পর্ক
কিছু সম্পর্কঃ ৯ ()  এর বাকি অংশ  

আয়শা আর রানী যখন করিডর দিয়ে হেটে আসছিলো , তখনো রাজিব কোরিডরে বসা , ও নাস্তা আনতে যায়নি , কারন ও জানতো বাসা থেকে খাবার কিছুক্ষনের মাঝেই পৌঁছে যাবে । আয়শার সাথে ওর কথা হয়েছিলো । ওদের দেখে রাজিব উঠে দাড়ায়, হাসি মুখে সামনে এগিয়ে জেতে নেয় , ঠিক তখনি পেছনে জয়ের আবির্ভাব হয় , হাতে টিফিন ক্যারিয়ার । এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় রাজিব , চোখাচোখি হয় জয়ের সাথে । চোখাচোখি হতেই দুজনেই প্রায় একসাথে চোখ সরিয়ে নেয়যেন কেউ প্রথমে থামলে অন্যজনের ভেতরের কথা বেরিয়ে পড়বে

রাজিব নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, আর সামনে এগোয় নাজয়ের মুখটা দেখেই রাজিবের পা দুটো থমকে যায়ঠিক ভয় নয়, ঠিক রাগও নয়একটা পুরোনো পরিচিত অনুভূতি, যেটা এখন আর পরিচিত লাগে না একসময় যাদের দূরত্ব বোঝারই কথা ছিল না, তাদের মাঝখানে এখন কয়েক কদম ফাঁক পড়ে গেছেআর সেই ফাঁকটা পেরোতে রাজিবের অদ্ভুত লাগে

জয় নিজেও একটু থমকে দাড়ায় , হাতে ধরে টিফিন ক্যারিয়ারের উপর হাতের চাপ আরো কিছুটা বারে , চোখে রাগ নেইআছে একটা ছোট্ট ভুলহয়তো ভুলও নয়, কিন্তু ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা 

রাজিব , জয়ের দিকটা উপেক্ষা করেই রানী আর আয়শার দিকে তাকায়হাঁটার সময় আয়শা রানীর একটা হাত ধরে রেখেছেরাজিব একটা ছোট শ্বাস ফেলেরানীকে স্বাভাবিকই লাগছে তার কাছেএতে একটু স্বস্তি পায় রাজিব

সকালে রানীকে ফোন করে সে ডাক্তাররা রহিম সম্পর্কে যতটা ভালো খবর বলেছিল, তার চেয়েও একটু বাড়িয়ে বলেছিলরানী যেন দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে
রানী একবার রাজিবের দিকে তাকিয়ে আবার স্বাভাবিকভাবেই চোখ ফিরিয়ে নেয়ঠিক তখনই রাজিবের চোখে একটা ব্যাপার ধরা পড়েরানী শুধু ভারমুক্তই নয়ওর চোখের কোণে যেন একটা হালকা উজ্জ্বলতা লেগে আছে, আর ঠোঁটের কোণে একটা চেপে রাখা হাসি 
রাজিব একটু অবাক হয়অনেক দিন পর রানীর মুখে এমন একটা সহজ ভাব দেখছে সেতবে বিষয়টা নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবে নাবরং ভালোই লাগেগতকাল ওকে এমন ভয় পেতে দেখার পর, আজ এই মুখটাই রাজিবের জন্য যথেষ্ট

আয়শার দিকে তাকিয়ে ওর মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠেআয়শা যেমন এখনো রানীর হাত ধরে আছে, রাজিবের বুঝতে অসুবিধা হয় নাকেন রানী এতটা ভারমুক্তনিশ্চয়ই আয়শা আর জান্নাতই গত রাত আর আজকের সকালটা ওর পাশে থেকে ওকে এই অবস্থায় এনে দিয়েছে
 
কিরে তুই এখানে দাড়িয়ে কেনো?” কাছে আসতেই আয়শা জিজ্ঞাসা করে ,  
 
হাল্কা হাসে রাজিব , বলে বড় আব্বু নাস্তা কিনতে পাঠিয়েছে , হেব্বি রেগে আছে তোমাদের দেরি দেখে
 
রাজিবের কথা শুনে রানী চেপে রাখা হাসি ফিক করে বেরিয়ে আসে , আয়শা ভ্রূকুটি করে আর পেছনে জয়  নিসব্দে আই রোল করে ।
 
বাদ দে তোর বড় আব্বুর কথা , সে তো মনে করে , আমি মেশিন , রান্না হও বলবে আর রান্না হয়ে যাবে , চল ভেতরে
 
রাজিব ও মুচকি হাসল , তারপর ওদের নিয়ে ভেতরে গেলো ,
 
******
 
ভেতরে গিয়েই রানীর নজর প্রথমে পড়ে ওর আব্বুর উপরগাড়ির ভেতরে জয়ের সঙ্গে খুনসুটির রেশ ধরে এতক্ষণ চোখের কোণে যে ঝিলিকটা ছিল, সেটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে যায়তার জায়গা নেয় এক ধরনের শান্ত দৃষ্টি

হ্যাঁ, রানী দেখতে পাচ্ছেরহিম এখন ভালো আছেবন্ধু জয়নালের সঙ্গে গল্প করছে

রানীর বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শ্বাস খুব ধীরে বেরিয়ে আসেতার সঙ্গে প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে শব্দটা—“আব্বু…”

এটা ডাকার ডাক নাযেন একটা পরীক্ষামানুষটা সত্যিই আছে কি না, সেটুকু যাচাই করে নেওয়া

গতকাল এই মানুষটাকে হারিয়ে ফেলবে ভেবে পুরো পৃথিবীটা হঠাৎ খুব কঠিন লেগেছিলতাই এই একটুকু শব্দ দিয়ে রানী যেন নিজেকে বুঝিয়ে নেয়মানুষটা এখনো আছে
 
রহিম মেয়ের দিকে তাকায়প্রথমেই ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে ওঠেতারপর নজর যায় রানীর নরম দৃষ্টির দিকেঠিক তখনই বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে রহিমেরএই প্রথম একটু ভয় পায় সেভয়টা নিজের জন্য নয়আবার পুরোপুরি নিজের জন্যও

নিচের ঠোঁটে হালকা একটা কাঁপুনি দেখা দেয়, এতটাই ক্ষীণ যে চোখে পড়ার কথা নয়

আব্বু…”
মেয়ের মুখে শব্দটা শুনেই রহিম বুঝে নেয়এই ডাক বলে দেয়, গতকাল রানী কতটা ভয় পেয়েছিল

রহিম হাত বাড়ায়রানী হেঁটে আসেএই হাঁটার মধ্যেও একটা অনিশ্চয়তা চোখে পড়ে রহিমেরযেন সে নিজেও ঠিক জানে না, সত্যিই আব্বুর কাছেই আসছে কি না

কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেবিনের বাতাস ভারী হয়ে যায়রহিম নিজেই সেটা হালকা করার চেষ্টা করেরানীর হাত ধরে নরম গলায় বলে,খুব ভয় পেয়েছিলি রে মাভয় নেই, আমি এত তাড়াতাড়ি যাচ্ছি না

রানীর চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে

আধশোয়া ভঙ্গিতে রহিম মেয়েকে বুকে টেনে নেয়তখন সে টের পায় সেই উষ্ণতারক্তের উষ্ণতাযে উষ্ণতা কোনো ডাক্তারের ওষুধ, কোনো নার্সের সেবা এনে দিতে পারে না

এই উষ্ণতা রহিমের একার নয়, রানীর শরীরের একারও নয়দুজনের শরীরে বয়ে চলা একই রক্তই এই উষ্ণতা তৈরি করেছেযার কোনো বিকল্প নেই, যা আর কেউ তৈরি করতে পারে না

চোখ তুলে রহিম তাকায় রাজিবের দিকেছেলেটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেশরীর আর পোশাকে ক্লান্তির ছাপ, সারারাত না ঘুমানোর চিহ্ন স্পষ্টসেই সব ক্লান্তির চিহ্ন ছাপিয়ে উঠেছে তৃপ্তিআর তার ছায়া হয়ে আছে, তৃপ্তির আড়ালে চাপা পড়া ভয়

রহিম ভেবে পায় নাকীভাবে সে এখনো নিজের ছেলে-মেয়ের কাছে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছেএদের জন্য সে আসলে কী করেছে, আর কী করতে পারেনি কান্নাটা আর ঠোঁটের কাঁপুনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না , ছোট্ট দুফোঁটা জল হয়ে চোখে চিকচিক করতে থাকে ।  
 
*****  
 
কেবিনের ভেতরটা এখন ভেজা আবেগে ভরপুররহিম জড়িয়ে রেখেছে রানীকেচোখে জমে আছে জলের ফোঁটারানী বাবার বুকে মিশে নিঃশব্দে কাঁদছেরাজিব একটু দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখছেতার মনে কী চলছে, বোঝা খুব মুশকিল নয়এখন সব ঠিক আছে, কিন্তু একটা ঝড় এলেই সব ওলটপালট হতে পারেপাশে বসে জয়নাল নীরবে দেখছেআয়শা দাঁড়িয়ে আছে, মুখে মৃদু হাসিজয় সবার পেছনেওর দৃষ্টি শুধু রানীর হালকা হালকা কেঁপে ওঠা পিঠের ওপর নিবদ্ধ

প্রথম নীরবতা ভাঙলো আয়শাহাসিমুখে একটু এগিয়ে এসে, রানীর পিঠে হাত রেখে রহিমকে জিজ্ঞেস করলো,এখন কেমন আছেন ভাই?”

একই সময় জয়নাল পাশ থেকে হাত রাখলো রহিমের কাঁধে

আয়শা আর জয়নালের নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া যেন রহিমকে নিজের আবেগ কন্ট্রোলের শক্তি যোগান দিলোরানীকে ছেড়ে সে ওকে সোজা করে দাঁড় করালোঠোঁট চেপে সাহসী হাসিতে দুবার হালকা ঝাঁকুনি দিলো রানীর দুবাহু ধরেযেন বলতে চাইছে, আব্বু এখনো আছেতারপর হাসিমুখে আয়শার দিকে তাকিয়ে বলল,এখন ভালো আছিআপনাদের অনেক কষ্ট দিলাম, ভাবি”—বলে একটু হাসার চেষ্টা করল

এই কষ্টের সুদেআসলে শোধ নেবো ভাইএকদম নিয়ম মেনে চলবেন, আর ক্লাস করা বন্ধএকদম টোটাল অফ,”বলে আয়শা এখনো হালকা কাঁদতে থাকা রানীর কাঁধ এক বাহুতে জড়িয়ে ধরলোরানীর দিকে তাকিয়ে আবার বলল,কি বলিস মা, তুই, আমি আর সবাই মিলে কঠিন সাজা দেবো তোর আব্বুকে

বলবার সময় আয়শার গলাও ধরে এলোবারবার আফরোজার কথা মনে পড়ছেএই সময় আফরোজা থাকলে কী করতো, সেই ভাবটাই ভেসে উঠছে মনে
আয়শার এই মৃদু শাসনে জয়নালের কণ্ঠে একটু কঠোরতা এলোবলল,শালা, যদি আর কোচিংয়ের নাম নিবি, আমি তোর ঠ্যাং ভেঙে ঘরে বসিয়ে রাখবো

কথাটা শুনে রানী আয়শার বুকে মুখ গুঁজেই হালকা হেসে ওঠেচোখের কোণটা আঙুলের ডগায় মুছে নেয় সেকান্না থামেনি, কিন্তু এখন আর ভাঙন নেই

একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজিব ধীরে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়েএতক্ষণ যে চাপা ভয়টা বুকের ভেতর আটকে ছিল, সেটা আর নেইসে দেয়ালের দিকে হেলান দেয়মাথাটা হালকা পেছনে ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্যভাবটা এমন, পরে কী হবে দেখা যাবেএই মুহূর্তটা থাক

জয় সবার শেষে একটু এগিয়ে এলোচোখেমুখে হালকা দুষ্টুমি ধরে রেখে বলল,
কি ব্যাপার ছোট আব্বু, কিছুদিন আগে আমাকে খুব সাহস দিচ্ছিলেনএখন নিজেই চিতপটাং!”

রহিম হেসে উঠলোবলল,মাঝে মাঝে তোদের ইয়াংম্যানদের একটু খাটিয়ে নিতে ইচ্ছে হয় রে

আগের গুমোট ভাবটা কেটে গেছেতবে কেবিনের ভেতরটা এখনো উষ্ণএই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে সম্পর্কগুলোএভাবেই কিছু সম্পর্ক আমাদের জীবনকে, শরীরকে উষ্ণতা দেয়নির্জীব শীতলতা থেকে দূরে সরিয়ে আনে

বেঁচে থাক এই সম্পর্কগুলোবেঁচে থাক এই উষ্ণতা 
 
*****  
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


[+] 1 user Likes gungchill's post
Like Reply


Messages In This Thread
কিছু সম্পর্ক - by gungchill - 29-07-2025, 04:17 PM
RE: কিছু সম্পর্ক - by gungchill - 09-02-2026, 08:00 PM



Users browsing this thread: 1 Guest(s)