08-02-2026, 12:16 PM
বনানীর কোনো দামী রেস্তোরাঁ নয়, কোনো নির্জন হাইওয়ে নয়—কমলাপুরের এক ঘিঞ্জি টং দোকানের সামনে, সেলিমের বাসের চাকার হিসেবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের কাছে এখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে দামী সংকেতটা বেজে চলেছে। সামিনার এই দ্বিতীয়বারের কল মোর্শেদকে এক অনস্বীকার্য সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল—সামিনা তাকে চাইছে। অন্তত এই মুহূর্তে, এই তপ্ত দুপুরে, সামিনা তার সাথে যুক্ত হতে চাইছে।
মোর্শেদের চারপাশের শব্দগুলো যেন নিভে গেল। সেলিমের বকবকানি, রিকশার বেল, দূরে ট্রেনের বাঁশি—সবকিছু ম্লান হয়ে শুধু ওই ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দটাই তার কানে বাজতে লাগল। মোর্শেদ ফোনটা কানের কাছে তোলার আগে এক মুহূর্তের জন্য নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল স্ক্রিনে। তারপর কাঁপা হাতে সবুজ বাটনটা স্লাইড করল।
কমলাপুরের সেই ধুলোবালি আর সেলিমের বাসের চাকার হিসাবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের পৃথিবীটা একটা ফোনের স্ক্রিনে এসে থমকে গেছে। ফোনের ভাইব্রেশনটা তার হাতের তালু ছাপিয়ে শিরদাঁড়া পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। মোর্শেদ ফোনটা কানে তুলল। তার গলার ভেতরটা হঠাত্ মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত জড়তা, যেন শব্দগুলো গলার ভেতরেই দলা পাকিয়ে আটকে আছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই আত্মবিশ্বাসী মানুষটি আজ কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে।
সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিচু এবং খসখসে গলায় বলল, "হ্যালো।"
ওপাশ থেকে যে উত্তরটি এল, সেটি শোনার জন্য মোর্শেদ প্রস্তুত ছিল না। এক লহমায় তার চারপাশের জগতটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
"মোর্শেদ? আপনি কি ব্যস্ত? আপনাকে কল করে কি বিরক্ত করলাম?"
প্রথমবারের মতো সামিনার গলা শুনতে পেল মোর্শেদ। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কণ্ঠের কারুকাজ। সামিনার গলা কোনো চঞ্চল কিশোরীর মতো নয়, আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কোনো প্রৌঢ়ার মতো ফ্যাঁসফেঁসেও নয়। এমনকি কোনো গায়িকার মতো সুর করে বলা মাধুর্যও এতে নেই। এটা এক্কেবারে স্বাভাবিক, ভরাট এবং গভীর এক নারীর কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠে এক ধরণের কর্তৃত্ব আছে, আবার আছে এক রহস্যময় বিষাদ। এই ভরাট কণ্ঠস্বর মোর্শেদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করল। তার মনে হলো, এই স্বর যেন অনেক চেনা, অনেকদিন ধরে হারানো কোনো সুর।
মোর্শেদের এক মুহূর্ত আগের সেই অপমানবোধ আর বিরক্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার ভেতরে সেই পুরোনো খেলোয়াড় সুলভ ফ্লার্ট করার প্রবণতাটা জেগে উঠল। সে একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে হালকা স্বরে বলল, "হ্যাঁ, ভীষণ ব্যস্ত। আপনার অপেক্ষায় ব্যস্ত। কাল থেকে তো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করেই যাচ্ছি। আপনি তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন।"
মোর্শেদ ভেবেছিল তার এই মন্তব্যে সামিনা হয়তো একটু লজ্জিত হবে কিংবা কিছুটা কৌতুক করবে। কিন্তু সামিনা তার এই চতুর ফ্লার্ট করার চেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। তার কণ্ঠে কোনো লঘুতা এল না। বরং এক ধরণের সিরিয়াস ভাব ফুটে উঠল।
সামিনা কিছুটা থমকে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "মোর্শেদ, আমাকে একটা হেল্প করতে পারবেন?"
সামিনার গলায় হঠাত্ এই অসহায়ত্ব বা অনুরোধের সুর মোর্শেদকে চমকে দিল। তার সব ফ্লার্ট করার ইচ্ছে এক নিমেষে উধাও। বনানীর সেই উদ্ধত রাইডার এখন সচেতন হয়ে উঠল। সামিনার মতো একজন নারী, যে তাকে এতদিন অবজ্ঞার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছিল, সে আজ সরাসরি সাহায্য চাইছে?
মোর্শেদ শক্ত হয়ে বসল। কমলাপুরের তপ্ত বাতাস আর সেলিমের হইচই তার কান পর্যন্ত আর পৌঁছাচ্ছে না। সে গম্ভীর গলায় বলল, "বলুন সামিনা। কী করতে হবে আমাকে?"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু চুপ করে থাকল। সেই নীরবতা মোর্শেদের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল। সামিনা কী বলতে চায়? সে কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে? নাকি এই সাহায্যই হবে তাদের অদেখা দেয়ালটা ভেঙে ফেলার প্রথম সূত্র?
মোর্শেদ তার রয়্যাল এনফিল্ডের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরল। সে বুঝতে পারছে, গল্পের মোড় এখন আর মেসেঞ্জারের চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটা বাস্তব জীবনের কোনো এক জটিল বাঁক নিতে যাচ্ছে।
সামিনার সেই ভরাট কণ্ঠস্বর যখন মোর্শেদের কানে বাজল, তার ভেতরের সবটুকু আভিজাত্য আর গতরাতের জমানো অভিমান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সামিনার গলায় এক ধরণের চাপা উদ্বেগ, যা মোর্শেদকে মুহূর্তেই সতর্ক করে তুলল। সে আর এখন কোনো রাইডার নয়, কোনো কোটিপতি বাড়িওয়ালা নয়—সে এখন স্রেফ একজন পুরুষ, যে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর ডাক শুনেছে।
মোর্শেদ মেরুদণ্ড সোজা করে বসল, তার গলার স্বরে এখন গভীর মমতা আর দায়িত্ববোধ। সে বলল, "অবশ্যই সামিনা। কী হেল্প বলুন? আপনি কি ঠিক আছেন? কোনো বিপদ হয়েছে কি আপনার?"
ওপাশ থেকে সামিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠস্বরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এল তার। "না, আমি ঠিক আছি। শুনুন মোর্শেদ, আমার আজকে একটা খুব বড় কাজ আছে। আমাকে একটু টঙ্গি যেতে হবে এখনই। খুবই জরুরি দরকার। কিন্তু আমি কোনোভাবেই এই দুপুরের জ্যাম ঠেলে যাওয়ার মতো সাহস পাচ্ছি না। বাসে বা রিকশায় গেলে আমি সময়মতো পৌঁছাতে পারব না। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন, প্লিজ?"
টঙ্গি! কমলাপুর থেকে টঙ্গি—পুরো ঢাকা শহরটা যেন এক অগ্নিকুণ্ড পার হয়ে যাওয়ার মতো পথ। কিন্তু মোর্শেদের মাথায় তখন দূরত্বের কোনো হিসেব নেই। সামিনা তাকে চেয়েছে, সামিনা তার বাইকের সেই পেছনের সিটটার অধিকার চেয়েছে—এই উপলব্ধিতে মোর্শেদের রক্তে যেন বসন্তের হাওয়া খেলে গেল।
মোর্শেদ কোনো দ্বিধা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আপনি এখন কোথায় আছেন?"
সামিনা উত্তর দিল, "আমি আমার কলেজের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। যাত্রাবাড়ীর যে গলিটার কথা বলেছিলাম, তার মুখেই।"
মোর্শেদ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে তার বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে বলল, "আপনি আপনার লাইভ লোকেশনটা এখনই মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিন। আমি এক্ষুনি আসছি। যত জ্যামই থাকুক, আমাকে আটকাতে পারবে না। সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগবে সামিনা। আপনি শুধু ওখানেই থাকুন।"
সামিনা ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাইল, হয়তো কোনো কৃতজ্ঞতা, কিন্তু মোর্শেদ আর কথা বাড়াল না। সে ফোনের লাল বাটনটা চেপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল।
সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল। ইঞ্জিনের সেই গম্ভীর 'থাম্প' শব্দটা শোনার সাথে সাথেই সেলিম সজোরে একটা গালি দিয়ে উঠল।
"ওই হারামি! কই যাস? আইলি মাত্র পাঁচ মিনিট, এর মইদ্যেই ফুড়ুত? চা টা তো চুলে দিছে মামা!" সেলিমের চোখেমুখে এক ধরণের বিরক্তমাখা বিস্ময়।
মোর্শেদ হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে কেবল বলল, "একটু জরুরি কাজ পইড়া গেল রে সেলিম। যামু আর আসমু।"
সেলিম দমবার পাত্র না। সে হাত নাড়িয়ে আপত্তি জানিয়ে বলল, "থো তোর জরুরি কাম! এই কড়া রৌদ্রে কোন পীরের দরগায় যাবি তুই? বইসা চা-টা খা।"
মোর্শেদ সেলিমের আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাইকের গিয়ারে চাপ দিল। কিন্তু বেরোনোর ঠিক আগমুহূর্তে তার নজর পড়ল সেলিমের মাথার কাছে বেঞ্চিতে রাখা অতিরিক্ত হেলমেটটার দিকে। মোর্শেদ চিরকাল একা রাইড করে অভ্যস্ত। তার মেটিওরের দুই পাশের স্যাডেল ব্যাগে দামী রাইডিং গিয়ার থাকলেও তার বাইকে কোনো 'পিলিয়ন হেলমেট' বা পেছনের যাত্রীর জন্য অতিরিক্ত হেলমেট নেই। অথচ আজ তার পেছনের সিটে একজন বসবে। সামিনা। তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই মোর্শেদ একটা ঝুঁকি নিল।
সে বাইকটা আবার একটু নিউট্রাল করে সেলিমের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "তোর ওই হেলমেটটা একটু দে তো সেলিম।"
সেলিম আকাশ থেকে পড়ল। সে উপহাসের সুরে দাঁত বের করে বলল, "আরে লর্ড সাবে কয় কি! তুই পিলিয়ন নিবি কবের থেইকা? তোর বাইকের পিছনের সিটে তো আজীবন ময়লা ছাড়া কিছু দেখলাম না। হঠাৎ কোন মালরে তুলবি?"
মোর্শেদ সেলিমের হাত থেকে ওর সাধারণ মানের লাল রঙের হেলমেটটা একরকম কেড়ে নিল। তারপর নিজের দামী হেলমেটটা সিটের পেছনের হুকে ঝুলিয়ে এবং সেলিমের হেলমেটটা নিজের মাথায় গলাতে গলাতে মুচকি হাসল। পঁয়তাল্লিশ বছরের গম্ভীর মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে আজ এক অদ্ভুত চপলতা।
সেলিম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। মোর্শেদ বাইকের ক্লাচ ছাড়তে ছাড়তে রসিকতা করে বলল, "আরে ভাই, দিনকাল ভালো না। টাকার খুব অভাব বুঝলি? তাই আজ থেকে 'পাঠাও' রাইড শুরু করলাম। পিলিয়ন না নিলে ইনকাম হবে কোত্থেকে?"
সেলিম হো হো করে হেসে উঠল। "শালা ফকিরি রাইডার! তোরে দিয়া আর কিচ্ছু হইবো না!"
সেলিমের অট্টহাসি আর কমলাপুরের ধুলোমাখা বাতাস পেছনে ফেলে মোর্শেদ তার বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। তার পকেটে এখন সামিনার লাইভ লোকেশনটা ধিকধিক করছে। ঢাকার এই জ্যাম, এই উত্তাপ আর এই একাকীত্বের অবসান হতে আর মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। মোর্শেদ জানে, এই যাত্রা আর যাই হোক, কোনো সাধারণ 'পাঠাও' রাইড হবে না।
১৫ মিনিট সময় চেয়েছিল মোর্শেদ, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা আর রয়্যাল এনফিল্ডের ৩৫০ সিসি ইঞ্জিনের সম্মিলিত শক্তিতে সে ঠিক ১৩ মিনিটের মাথায় যাত্রাবাড়ীর সেই নির্দিষ্ট গলিটার মুখে এসে পৌঁছাল। ঢাকার এই ভরদুপুরের জ্যাম আর আগুনের মতো তপ্ত বাতাস তাকে আটকাতে পারেনি। বাইকের চাকা যখন সামিনার পাঠানো লোকেশনের ঠিক ওপর এসে থামল, মোর্শেদের বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে।
সামনে একটা সাদামাটা দোতলা বিল্ডিং। দেওয়ালে শ্যাওলা আর লোনা ধরা দাগ, সাইনবোর্ডে লেখা 'কিশলয় আর্ট অ্যান্ড প্রাইভেট কলেজ'। কোনো আহামরি দৃশ্য নেই এখানে। রাস্তাটা কেমন একটা বিষণ্ণ ধূসর রোদে মাখা। আশেপাশের দোকানপাটগুলো দুপুরের তন্দ্রায় ঢুলছে। হয়তো বাচ্চাদের অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে, নয়তো এখনো ছুটির সময় হয়নি—পুরো এলাকাটাতে একটা ঝিমধরা নিস্তব্ধতা।
মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা তুলল। ঘাম তার কপাল বেয়ে চোখের কোণে এসে বিঁধছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। এই ধুলোবালি আর জীর্ণতার মাঝেই মোর্শেদের চোখ দুটো হঠাত্ স্থির হয়ে গেল।
রাস্তার ওপাশে, কলেজের লোহার গেটটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক নারী।
মোর্শেদ তাকে আগে কখনও দেখেনি। সামিনা তাকে একটা সেলফি পাঠিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনও দিন ভিডিও কলেও মুখ দেখায়নি। কিন্তু এই ধূসর রাস্তার ভিড় আর অযাচিত কোলাহলের মধ্যে মোর্শেদের চিনতে এক মুহূর্তও ভুল হলো না। সামিনার উপস্থিতির মধ্যেই এমন একটা কিছু আছে, যা মোর্শেদের চোখকে চুম্বকের মতো টেনে নিল। সামিনা যেন এই ভাঙাচোরা গলি আর তপ্ত দুপুরের মাঝে কোনো এক ভুল করে চলে আসা মানবী।
মোর্শেদ বাইক থেকে নামল না, কেবল ডেনিম জিন্সের ওপর এক পা রেখে ভারসাম্য বজায় রেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সামিনা দাঁড়িয়ে আছে। মোর্শেদের কল্পনা আর বাস্তবের মাঝে যে ব্যবধান ছিল, তা এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল। সামিনা মাঝারি উচ্চতার এক নারী, আন্দাজে পাঁচ ফুট তিন থেকে ছয়ের মধ্যে হবে। তবে তার শরীরের গঠন এতটাই ভরাট আর মাংসল যে তাকে দেখে মোর্শেদের ভেতরের পশুটো এক লহমায় জেগে উঠল। সামিনার শরীরে মেদের আধিক্য নেই, বরং আছে এক ধরণের নিটোল পূর্ণতা। যাকে বলে এক্কেবারে ‘ডবকা’ গঠন।
সামিনা একটি সবুজ রঙের সুতির শাড়ি আর কালো রঙের হাফস্লিভ ব্লাউজ পরেছে। রোদ আর উত্তাপে তার ফর্সা গোলগাল মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে, যেন ফেটে রক্ত বের হবে। মোর্শেদ বিস্ময় আর আদিম লালসা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা তার কল্পনার চাইতেও অনেক বেশি লাস্যময়ী। সবুজ শাড়ির অবহেলার প্যাঁচেও তার ভরাট নিতম্বের বিশালতা আড়াল হয়নি। সামিনার পাছা যে বেশ চওড়া এবং ভারীর দিকে, তা সামনে থেকে দেখেও টের পাওয়া যাচ্ছে। শাড়ির কুঁচিগুলো সেখানে গিয়ে টানটান হয়ে আছে, যেন ভেতরের মাংসল গোলকগুলো অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মোর্শেদ মনে মনে কল্পনা করল, এই ভারী নিতম্বের ওপর দিয়ে শাড়ির কাপড় যখন ঘর্ষিত হয়, তখন নিশ্চয়ই এক ধরণের মাদকতা তৈরি হয়।
মোর্শেদের চোখ এবার গেল সামিনার চুলে। কালো কুচকুচে চুলগুলোতে রাস্তার ধুলোর একটা হালকা আস্তরণ জমেছে। চুলগুলো মাথার ওপর একটা বিশাল খোঁপা করে বাঁধা। সেই খোঁপার আয়তন দেখেই মোর্শেদের বুকটা ধক করে উঠল। এত বিশাল খোঁপা সচরাচর দেখা যায় না। খোঁপাটি সামিনার ঘাড়ের ঠিক উপরে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে, যা দেখে বোঝা যায় সামিনার চুল যেমন লম্বা তেমনি ঘন। এই খোঁপাটি সামিনার চেহারায় একদিকে যেমন শিক্ষিকার গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তার উন্মুক্ত ঘাড় আর কানের পাশের ঘাম মোর্শেদকে এক নিষিদ্ধ আমন্ত্রন জানাচ্ছে।
মোর্শেদ অনুভব করল, তার প্যান্টের ভেতরটা আবার টাইট হয়ে আসছে। প্রথম দর্শনেই সে সামিনার ওই উঁচু খোঁপা থেকে শুরু করে তার লালচে মুখ, আর ওই ঢেউ খেলানো হাইওয়ের মতো ভারী শরীরটার প্রেমে পড়ে গেল। এ প্রেম কোনো পবিত্র প্রেম নয়, এ হলো কামনায় মাখানো এক দগদগে তৃষ্ণা। সামিনার ওই বিশাল নিতম্ব আর ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক মোর্শেদকে বুঝিয়ে দিল যে, আজকের এই যাত্রা স্রেফ টঙ্গি যাওয়ার যাত্রা নয়—এটা সামিনার শরীরের গহিন অরণ্যে প্রবেশের এক রাজকীয় সূচনা।
মোর্শেদ হেলমেটটা হাতে নিয়ে এক হাত দিয়ে ঘাম মুছল। তার চোখ এখনো সামিনার নিতম্বের সেই ভারী ভাঁজগুলোর ওপর আটকে আছে। সে বুঝতে পারল, আজ এই তপ্ত দুপুরে সে শুধু এক নারীকেই উদ্ধার করতে আসেনি, সে এসেছে নিজের অবদমিত কামনার এক চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
মোর্শেদ বাইকটা নিয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ শুনে সামিনা মুখ তুলল। তার চোখে এক ধরণের দ্বিধা আর কৃতজ্ঞতার মিশ্রণ। সে জানত মোর্শেদ আসবে, কিন্তু বনানীর সেই আভিজাত্য ফেলে এই নরককুণ্ডে মোর্শেদ এত দ্রুত হাজির হবে, তা হয়তো সে ভাবেনি।
মোর্শেদ বাইকটা সামিনার ঠিক সামনে এসে থামাল। দুজনের চোখের পলক এক হলো। এই প্রথম। ডিজিটাল পর্দার ওপারে থাকা ছায়াশরীরটি এখন তার থেকে মাত্র তিন হাত দূরে। সামিনার ভরাট শরীরের বাঁকগুলো রোদে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা মোর্শেদের গত রাতের সেই আদিম কল্পনাগুলোকে আবার উস্কে দিল। কিন্তু মোর্শেদ এখন সংযত। সে কেবল হেলমেটটা খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে রইল।
সামিনা একটু ম্লান হাসল। সেই হাসিটা মোর্শেদের পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ হৃদয়ে একটা কামড় দিল। সামিনা খুব নিচু স্বরে বলল, "আপনি আসলেই চলে এলেন?"
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, "আমি কথা রাখলে এভাবেই রাখি সামিনা। এবার বলুন, টঙ্গি কতক্ষণে পৌঁছাতে হবে?"
সামিনা মোর্শেদের পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো আর তার সাদা শার্টের হাতা গোটানো রুদ্ররূপের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিল। তাদের চারপাশের ধূসর জগতটা যেন এক নিমেষে রঙিন হতে শুরু করল।
মোর্শেদের চারপাশের শব্দগুলো যেন নিভে গেল। সেলিমের বকবকানি, রিকশার বেল, দূরে ট্রেনের বাঁশি—সবকিছু ম্লান হয়ে শুধু ওই ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দটাই তার কানে বাজতে লাগল। মোর্শেদ ফোনটা কানের কাছে তোলার আগে এক মুহূর্তের জন্য নিজের প্রতিচ্ছবি দেখল স্ক্রিনে। তারপর কাঁপা হাতে সবুজ বাটনটা স্লাইড করল।
কমলাপুরের সেই ধুলোবালি আর সেলিমের বাসের চাকার হিসাবের হট্টগোলের মাঝে মোর্শেদের পৃথিবীটা একটা ফোনের স্ক্রিনে এসে থমকে গেছে। ফোনের ভাইব্রেশনটা তার হাতের তালু ছাপিয়ে শিরদাঁড়া পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। মোর্শেদ ফোনটা কানে তুলল। তার গলার ভেতরটা হঠাত্ মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক অদ্ভুত জড়তা, যেন শব্দগুলো গলার ভেতরেই দলা পাকিয়ে আটকে আছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের এই আত্মবিশ্বাসী মানুষটি আজ কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলছে।
সে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে খুব নিচু এবং খসখসে গলায় বলল, "হ্যালো।"
ওপাশ থেকে যে উত্তরটি এল, সেটি শোনার জন্য মোর্শেদ প্রস্তুত ছিল না। এক লহমায় তার চারপাশের জগতটা নিঃশব্দ হয়ে গেল।
"মোর্শেদ? আপনি কি ব্যস্ত? আপনাকে কল করে কি বিরক্ত করলাম?"
প্রথমবারের মতো সামিনার গলা শুনতে পেল মোর্শেদ। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল কণ্ঠের কারুকাজ। সামিনার গলা কোনো চঞ্চল কিশোরীর মতো নয়, আবার বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কোনো প্রৌঢ়ার মতো ফ্যাঁসফেঁসেও নয়। এমনকি কোনো গায়িকার মতো সুর করে বলা মাধুর্যও এতে নেই। এটা এক্কেবারে স্বাভাবিক, ভরাট এবং গভীর এক নারীর কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠে এক ধরণের কর্তৃত্ব আছে, আবার আছে এক রহস্যময় বিষাদ। এই ভরাট কণ্ঠস্বর মোর্শেদের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আবেশ তৈরি করল। তার মনে হলো, এই স্বর যেন অনেক চেনা, অনেকদিন ধরে হারানো কোনো সুর।
মোর্শেদের এক মুহূর্ত আগের সেই অপমানবোধ আর বিরক্তি কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার ভেতরে সেই পুরোনো খেলোয়াড় সুলভ ফ্লার্ট করার প্রবণতাটা জেগে উঠল। সে একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে হালকা স্বরে বলল, "হ্যাঁ, ভীষণ ব্যস্ত। আপনার অপেক্ষায় ব্যস্ত। কাল থেকে তো ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করেই যাচ্ছি। আপনি তো ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিলেন।"
মোর্শেদ ভেবেছিল তার এই মন্তব্যে সামিনা হয়তো একটু লজ্জিত হবে কিংবা কিছুটা কৌতুক করবে। কিন্তু সামিনা তার এই চতুর ফ্লার্ট করার চেষ্টাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করল। তার কণ্ঠে কোনো লঘুতা এল না। বরং এক ধরণের সিরিয়াস ভাব ফুটে উঠল।
সামিনা কিছুটা থমকে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল, "মোর্শেদ, আমাকে একটা হেল্প করতে পারবেন?"
সামিনার গলায় হঠাত্ এই অসহায়ত্ব বা অনুরোধের সুর মোর্শেদকে চমকে দিল। তার সব ফ্লার্ট করার ইচ্ছে এক নিমেষে উধাও। বনানীর সেই উদ্ধত রাইডার এখন সচেতন হয়ে উঠল। সামিনার মতো একজন নারী, যে তাকে এতদিন অবজ্ঞার চাদরে মুড়িয়ে রেখেছিল, সে আজ সরাসরি সাহায্য চাইছে?
মোর্শেদ শক্ত হয়ে বসল। কমলাপুরের তপ্ত বাতাস আর সেলিমের হইচই তার কান পর্যন্ত আর পৌঁছাচ্ছে না। সে গম্ভীর গলায় বলল, "বলুন সামিনা। কী করতে হবে আমাকে?"
সামিনা ওপাশ থেকে একটু চুপ করে থাকল। সেই নীরবতা মোর্শেদের বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাতে শুরু করল। সামিনা কী বলতে চায়? সে কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে? নাকি এই সাহায্যই হবে তাদের অদেখা দেয়ালটা ভেঙে ফেলার প্রথম সূত্র?
মোর্শেদ তার রয়্যাল এনফিল্ডের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরল। সে বুঝতে পারছে, গল্পের মোড় এখন আর মেসেঞ্জারের চ্যাটিংয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটা বাস্তব জীবনের কোনো এক জটিল বাঁক নিতে যাচ্ছে।
সামিনার সেই ভরাট কণ্ঠস্বর যখন মোর্শেদের কানে বাজল, তার ভেতরের সবটুকু আভিজাত্য আর গতরাতের জমানো অভিমান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সামিনার গলায় এক ধরণের চাপা উদ্বেগ, যা মোর্শেদকে মুহূর্তেই সতর্ক করে তুলল। সে আর এখন কোনো রাইডার নয়, কোনো কোটিপতি বাড়িওয়ালা নয়—সে এখন স্রেফ একজন পুরুষ, যে তার কাঙ্ক্ষিত নারীর ডাক শুনেছে।
মোর্শেদ মেরুদণ্ড সোজা করে বসল, তার গলার স্বরে এখন গভীর মমতা আর দায়িত্ববোধ। সে বলল, "অবশ্যই সামিনা। কী হেল্প বলুন? আপনি কি ঠিক আছেন? কোনো বিপদ হয়েছে কি আপনার?"
ওপাশ থেকে সামিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠস্বরে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এল তার। "না, আমি ঠিক আছি। শুনুন মোর্শেদ, আমার আজকে একটা খুব বড় কাজ আছে। আমাকে একটু টঙ্গি যেতে হবে এখনই। খুবই জরুরি দরকার। কিন্তু আমি কোনোভাবেই এই দুপুরের জ্যাম ঠেলে যাওয়ার মতো সাহস পাচ্ছি না। বাসে বা রিকশায় গেলে আমি সময়মতো পৌঁছাতে পারব না। আপনি কি আমাকে সাহায্য করবেন, প্লিজ?"
টঙ্গি! কমলাপুর থেকে টঙ্গি—পুরো ঢাকা শহরটা যেন এক অগ্নিকুণ্ড পার হয়ে যাওয়ার মতো পথ। কিন্তু মোর্শেদের মাথায় তখন দূরত্বের কোনো হিসেব নেই। সামিনা তাকে চেয়েছে, সামিনা তার বাইকের সেই পেছনের সিটটার অধিকার চেয়েছে—এই উপলব্ধিতে মোর্শেদের রক্তে যেন বসন্তের হাওয়া খেলে গেল।
মোর্শেদ কোনো দ্বিধা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল, "আপনি এখন কোথায় আছেন?"
সামিনা উত্তর দিল, "আমি আমার কলেজের সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। যাত্রাবাড়ীর যে গলিটার কথা বলেছিলাম, তার মুখেই।"
মোর্শেদ এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে তার বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে বলল, "আপনি আপনার লাইভ লোকেশনটা এখনই মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিন। আমি এক্ষুনি আসছি। যত জ্যামই থাকুক, আমাকে আটকাতে পারবে না। সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগবে সামিনা। আপনি শুধু ওখানেই থাকুন।"
সামিনা ওপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাইল, হয়তো কোনো কৃতজ্ঞতা, কিন্তু মোর্শেদ আর কথা বাড়াল না। সে ফোনের লাল বাটনটা চেপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল।
সে পাশে বসা সেলিমের দিকে একবারও তাকাল না। সেলিমের সেই বাসের চাকার হিসেব, বন্ধুদের আড্ডা আর গাঁজার ধোঁয়া—সব এখন মোর্শেদের কাছে মূল্যহীন। সে তার রয়্যাল এনফিল্ডের চাবিটা অন করল। ইঞ্জিনের সেই গম্ভীর 'থাম্প' শব্দটা শোনার সাথে সাথেই সেলিম সজোরে একটা গালি দিয়ে উঠল।
"ওই হারামি! কই যাস? আইলি মাত্র পাঁচ মিনিট, এর মইদ্যেই ফুড়ুত? চা টা তো চুলে দিছে মামা!" সেলিমের চোখেমুখে এক ধরণের বিরক্তমাখা বিস্ময়।
মোর্শেদ হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে কেবল বলল, "একটু জরুরি কাজ পইড়া গেল রে সেলিম। যামু আর আসমু।"
সেলিম দমবার পাত্র না। সে হাত নাড়িয়ে আপত্তি জানিয়ে বলল, "থো তোর জরুরি কাম! এই কড়া রৌদ্রে কোন পীরের দরগায় যাবি তুই? বইসা চা-টা খা।"
মোর্শেদ সেলিমের আপত্তিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাইকের গিয়ারে চাপ দিল। কিন্তু বেরোনোর ঠিক আগমুহূর্তে তার নজর পড়ল সেলিমের মাথার কাছে বেঞ্চিতে রাখা অতিরিক্ত হেলমেটটার দিকে। মোর্শেদ চিরকাল একা রাইড করে অভ্যস্ত। তার মেটিওরের দুই পাশের স্যাডেল ব্যাগে দামী রাইডিং গিয়ার থাকলেও তার বাইকে কোনো 'পিলিয়ন হেলমেট' বা পেছনের যাত্রীর জন্য অতিরিক্ত হেলমেট নেই। অথচ আজ তার পেছনের সিটে একজন বসবে। সামিনা। তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই মোর্শেদ একটা ঝুঁকি নিল।
সে বাইকটা আবার একটু নিউট্রাল করে সেলিমের দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "তোর ওই হেলমেটটা একটু দে তো সেলিম।"
সেলিম আকাশ থেকে পড়ল। সে উপহাসের সুরে দাঁত বের করে বলল, "আরে লর্ড সাবে কয় কি! তুই পিলিয়ন নিবি কবের থেইকা? তোর বাইকের পিছনের সিটে তো আজীবন ময়লা ছাড়া কিছু দেখলাম না। হঠাৎ কোন মালরে তুলবি?"
মোর্শেদ সেলিমের হাত থেকে ওর সাধারণ মানের লাল রঙের হেলমেটটা একরকম কেড়ে নিল। তারপর নিজের দামী হেলমেটটা সিটের পেছনের হুকে ঝুলিয়ে এবং সেলিমের হেলমেটটা নিজের মাথায় গলাতে গলাতে মুচকি হাসল। পঁয়তাল্লিশ বছরের গম্ভীর মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে আজ এক অদ্ভুত চপলতা।
সেলিম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল। মোর্শেদ বাইকের ক্লাচ ছাড়তে ছাড়তে রসিকতা করে বলল, "আরে ভাই, দিনকাল ভালো না। টাকার খুব অভাব বুঝলি? তাই আজ থেকে 'পাঠাও' রাইড শুরু করলাম। পিলিয়ন না নিলে ইনকাম হবে কোত্থেকে?"
সেলিম হো হো করে হেসে উঠল। "শালা ফকিরি রাইডার! তোরে দিয়া আর কিচ্ছু হইবো না!"
সেলিমের অট্টহাসি আর কমলাপুরের ধুলোমাখা বাতাস পেছনে ফেলে মোর্শেদ তার বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। তার পকেটে এখন সামিনার লাইভ লোকেশনটা ধিকধিক করছে। ঢাকার এই জ্যাম, এই উত্তাপ আর এই একাকীত্বের অবসান হতে আর মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্ব। মোর্শেদ জানে, এই যাত্রা আর যাই হোক, কোনো সাধারণ 'পাঠাও' রাইড হবে না।
১৫ মিনিট সময় চেয়েছিল মোর্শেদ, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা আর রয়্যাল এনফিল্ডের ৩৫০ সিসি ইঞ্জিনের সম্মিলিত শক্তিতে সে ঠিক ১৩ মিনিটের মাথায় যাত্রাবাড়ীর সেই নির্দিষ্ট গলিটার মুখে এসে পৌঁছাল। ঢাকার এই ভরদুপুরের জ্যাম আর আগুনের মতো তপ্ত বাতাস তাকে আটকাতে পারেনি। বাইকের চাকা যখন সামিনার পাঠানো লোকেশনের ঠিক ওপর এসে থামল, মোর্শেদের বুকের ভেতর তখন হাজারটা ড্রাম একসাথে বাজছে।
সামনে একটা সাদামাটা দোতলা বিল্ডিং। দেওয়ালে শ্যাওলা আর লোনা ধরা দাগ, সাইনবোর্ডে লেখা 'কিশলয় আর্ট অ্যান্ড প্রাইভেট কলেজ'। কোনো আহামরি দৃশ্য নেই এখানে। রাস্তাটা কেমন একটা বিষণ্ণ ধূসর রোদে মাখা। আশেপাশের দোকানপাটগুলো দুপুরের তন্দ্রায় ঢুলছে। হয়তো বাচ্চাদের অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে, নয়তো এখনো ছুটির সময় হয়নি—পুরো এলাকাটাতে একটা ঝিমধরা নিস্তব্ধতা।
মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা তুলল। ঘাম তার কপাল বেয়ে চোখের কোণে এসে বিঁধছে, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। এই ধুলোবালি আর জীর্ণতার মাঝেই মোর্শেদের চোখ দুটো হঠাত্ স্থির হয়ে গেল।
রাস্তার ওপাশে, কলেজের লোহার গেটটার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে এক নারী।
মোর্শেদ তাকে আগে কখনও দেখেনি। সামিনা তাকে একটা সেলফি পাঠিয়েছে ঠিকই কিন্তু কোনও দিন ভিডিও কলেও মুখ দেখায়নি। কিন্তু এই ধূসর রাস্তার ভিড় আর অযাচিত কোলাহলের মধ্যে মোর্শেদের চিনতে এক মুহূর্তও ভুল হলো না। সামিনার উপস্থিতির মধ্যেই এমন একটা কিছু আছে, যা মোর্শেদের চোখকে চুম্বকের মতো টেনে নিল। সামিনা যেন এই ভাঙাচোরা গলি আর তপ্ত দুপুরের মাঝে কোনো এক ভুল করে চলে আসা মানবী।
মোর্শেদ বাইক থেকে নামল না, কেবল ডেনিম জিন্সের ওপর এক পা রেখে ভারসাম্য বজায় রেখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সামিনা দাঁড়িয়ে আছে। মোর্শেদের কল্পনা আর বাস্তবের মাঝে যে ব্যবধান ছিল, তা এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল। সামিনা মাঝারি উচ্চতার এক নারী, আন্দাজে পাঁচ ফুট তিন থেকে ছয়ের মধ্যে হবে। তবে তার শরীরের গঠন এতটাই ভরাট আর মাংসল যে তাকে দেখে মোর্শেদের ভেতরের পশুটো এক লহমায় জেগে উঠল। সামিনার শরীরে মেদের আধিক্য নেই, বরং আছে এক ধরণের নিটোল পূর্ণতা। যাকে বলে এক্কেবারে ‘ডবকা’ গঠন।
সামিনা একটি সবুজ রঙের সুতির শাড়ি আর কালো রঙের হাফস্লিভ ব্লাউজ পরেছে। রোদ আর উত্তাপে তার ফর্সা গোলগাল মুখটা টকটকে লাল হয়ে আছে, যেন ফেটে রক্ত বের হবে। মোর্শেদ বিস্ময় আর আদিম লালসা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সামিনা তার কল্পনার চাইতেও অনেক বেশি লাস্যময়ী। সবুজ শাড়ির অবহেলার প্যাঁচেও তার ভরাট নিতম্বের বিশালতা আড়াল হয়নি। সামিনার পাছা যে বেশ চওড়া এবং ভারীর দিকে, তা সামনে থেকে দেখেও টের পাওয়া যাচ্ছে। শাড়ির কুঁচিগুলো সেখানে গিয়ে টানটান হয়ে আছে, যেন ভেতরের মাংসল গোলকগুলো অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মোর্শেদ মনে মনে কল্পনা করল, এই ভারী নিতম্বের ওপর দিয়ে শাড়ির কাপড় যখন ঘর্ষিত হয়, তখন নিশ্চয়ই এক ধরণের মাদকতা তৈরি হয়।
মোর্শেদের চোখ এবার গেল সামিনার চুলে। কালো কুচকুচে চুলগুলোতে রাস্তার ধুলোর একটা হালকা আস্তরণ জমেছে। চুলগুলো মাথার ওপর একটা বিশাল খোঁপা করে বাঁধা। সেই খোঁপার আয়তন দেখেই মোর্শেদের বুকটা ধক করে উঠল। এত বিশাল খোঁপা সচরাচর দেখা যায় না। খোঁপাটি সামিনার ঘাড়ের ঠিক উপরে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে, যা দেখে বোঝা যায় সামিনার চুল যেমন লম্বা তেমনি ঘন। এই খোঁপাটি সামিনার চেহারায় একদিকে যেমন শিক্ষিকার গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে, অন্যদিকে তার উন্মুক্ত ঘাড় আর কানের পাশের ঘাম মোর্শেদকে এক নিষিদ্ধ আমন্ত্রন জানাচ্ছে।
মোর্শেদ অনুভব করল, তার প্যান্টের ভেতরটা আবার টাইট হয়ে আসছে। প্রথম দর্শনেই সে সামিনার ওই উঁচু খোঁপা থেকে শুরু করে তার লালচে মুখ, আর ওই ঢেউ খেলানো হাইওয়ের মতো ভারী শরীরটার প্রেমে পড়ে গেল। এ প্রেম কোনো পবিত্র প্রেম নয়, এ হলো কামনায় মাখানো এক দগদগে তৃষ্ণা। সামিনার ওই বিশাল নিতম্ব আর ভরাট শরীরের প্রতিটি বাঁক মোর্শেদকে বুঝিয়ে দিল যে, আজকের এই যাত্রা স্রেফ টঙ্গি যাওয়ার যাত্রা নয়—এটা সামিনার শরীরের গহিন অরণ্যে প্রবেশের এক রাজকীয় সূচনা।
মোর্শেদ হেলমেটটা হাতে নিয়ে এক হাত দিয়ে ঘাম মুছল। তার চোখ এখনো সামিনার নিতম্বের সেই ভারী ভাঁজগুলোর ওপর আটকে আছে। সে বুঝতে পারল, আজ এই তপ্ত দুপুরে সে শুধু এক নারীকেই উদ্ধার করতে আসেনি, সে এসেছে নিজের অবদমিত কামনার এক চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে।
মোর্শেদ বাইকটা নিয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গেল। ইঞ্জিনের গম্ভীর শব্দ শুনে সামিনা মুখ তুলল। তার চোখে এক ধরণের দ্বিধা আর কৃতজ্ঞতার মিশ্রণ। সে জানত মোর্শেদ আসবে, কিন্তু বনানীর সেই আভিজাত্য ফেলে এই নরককুণ্ডে মোর্শেদ এত দ্রুত হাজির হবে, তা হয়তো সে ভাবেনি।
মোর্শেদ বাইকটা সামিনার ঠিক সামনে এসে থামাল। দুজনের চোখের পলক এক হলো। এই প্রথম। ডিজিটাল পর্দার ওপারে থাকা ছায়াশরীরটি এখন তার থেকে মাত্র তিন হাত দূরে। সামিনার ভরাট শরীরের বাঁকগুলো রোদে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা মোর্শেদের গত রাতের সেই আদিম কল্পনাগুলোকে আবার উস্কে দিল। কিন্তু মোর্শেদ এখন সংযত। সে কেবল হেলমেটটা খুলে সামিনার দিকে তাকিয়ে রইল।
সামিনা একটু ম্লান হাসল। সেই হাসিটা মোর্শেদের পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ হৃদয়ে একটা কামড় দিল। সামিনা খুব নিচু স্বরে বলল, "আপনি আসলেই চলে এলেন?"
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল, "আমি কথা রাখলে এভাবেই রাখি সামিনা। এবার বলুন, টঙ্গি কতক্ষণে পৌঁছাতে হবে?"
সামিনা মোর্শেদের পেশিবহুল হাতের শিরাগুলো আর তার সাদা শার্টের হাতা গোটানো রুদ্ররূপের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিল। তাদের চারপাশের ধূসর জগতটা যেন এক নিমেষে রঙিন হতে শুরু করল।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)