07-02-2026, 06:47 PM
![[Image: Whats-App-Image-2026-02-06-at-9-19-38-PM.jpg]](https://i.ibb.co.com/DHTPh7pB/Whats-App-Image-2026-02-06-at-9-19-38-PM.jpg)
তৃতীয় পর্ব
অবয়বের নিষিদ্ধ ভূগোল
রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০-এর ইঞ্জিনের ভরাট গুমগুম শব্দটা যখন সাইনবোর্ডের ধারের সেই ভাঙাচোরা চায়ের দোকানের সামনে এসে থামল, তখন চারপাশের বাতাসে কেবল ভোরের কাঁচা রোদের গন্ধ। মোর্শেদ তার গ্লাভস পরা হাত দিয়ে চাবিটা ঘুরিয়ে বাইকটা বন্ধ করল। ইঞ্জিনের শব্দটা এক ঝটকায় থেমে যেতেই চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে বাইক থেকে পুরোপুরি নামল না, কেবল স্ট্যান্ডটা নামিয়ে বাইকের ওপর একপাশে কাত হয়ে আয়েশ করে বসল।
সামনে ছোট টিনের ছাপড়া ঘর, উপরে প্লাস্টিকের তেরপল টাঙানো। ভেতরে কেরোসিনের চুলার ওপর ধোঁয়া ওঠা বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা উপরে তুলে গম্ভীর গলায় ডাকল, “মামা, এক প্যাকেট মার্লবরো রেড দেন। আর এক কাপ কড়া লিকারের চা, চিনি ছাড়া।”
দোকানের মালিক বৃদ্ধ লোকটা তখনও ঠিকমতো চোখ মেলতে পারেনি। আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে মোর্শেদের বাইকের গ্লসি কালো বডি আর ইঞ্জিনের ক্রোম ফিনিশিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেল। তারপর হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল, “মামা, লিকার তো মাত্র বসাইলাম। আগের লিকার বাসি হইয়া গেছে, ফালাইয়া দিছি। নতুনটা হইতে মিনিট দশেক সময় লাগব।”
মোর্শেদ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল ৬টা বেজে ৩০ মিনিট। সে বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের ওপর ডান হাতটা রেখে নির্লিপ্তভাবে বলল, “অসুবিধা নাই। আমার তাড়াহুড়ো নেই। আপনি আপনার মতো সময় নিয়ে বানান।”
এই এলাকাটা দিনের বেলা থাকে মানুষের নরকগুলজার। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, রিকশার বেল আর বাসের তীব্র হর্নে বাতাস সবসময় ভারী হয়ে থাকে। কিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ঢাকার এই প্রবেশপথ বা সাইনবোর্ড এলাকাটা এখন যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। রাস্তাটা একদম ফাঁকা নয়, তবে খুব একটা ব্যস্তও নয়। মাঝে মাঝে দুই-একটা দূরপাল্লার নাইট কোচ ধুলো উড়িয়ে সপাটে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাদের হেডলাইটের হলুদ আলো তখনো মোর্শেদের চোখে এসে বিঁধছে। দুই-একটা প্রাইভেট কারের চাকা পিচঢালা রাস্তার ওপর যে সরু শব্দ তুলছে, তা কান পাতলে শোনা যায়।
ভোরের ঠান্ডা বাতাসটা এখন বেশ প্রবল। কোনো বাধা ছাড়াই সেটা মোর্শেদের খোলা মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে, আর সেই ছোঁয়াটা এক ধরণের আদিম প্রশান্তি দিচ্ছে। মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী শরীরের চামড়া এই বাতাসের চুমু বা স্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই নির্জন হাইওয়ে, ধুলোর গন্ধ আর ভোরের এই নীলচে আলো—এটাই এখন তার একমাত্র সত্যিকারের জগত।
সে সিগারেটটা বের করল। এক প্যাকেট মার্লবরো থেকে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে দিয়াশলাই জ্বালানোর আগমুহূর্তে সে আশপাশটা আবার দেখে নিল। রাস্তার ধারের ঘাসগুলোর ওপর শিশির জমে আছে, যা দূর থেকে হীরের টুকরোর মতো চিকচিক করছে। দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা ঘষতেই একটা কমলা রঙের অগ্নিশিখা অন্ধকার আর স্নিগ্ধতার বুক চিরে জেগে উঠল। মোর্শেদ দীর্ঘ একটা টান দিল। তামাকের কড়া স্বাদ আর ধোঁয়া তার ফুসফুসে প্রবেশ করতেই তার অস্থির স্নায়ুগুলো শিথিল হতে শুরু করল।
সে তার ল্যাপটপ আর বনানীর দশতলার আভিজাত্য থেকে অনেক দূরে এখন একাকী এক যাত্রী। বাইকের মেটালিক বডিটা তার উরুর নিচে বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। মোর্শেদ ভাবল, মানুষ যখন গতির নেশায় ছুটে চলে, তখন সে নিজের অনেক কিছু পেছনে ফেলে আসে। কিন্তু যখন কোথাও থামে, তখন সেই ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আবার ছায়ার মতো তাকে ঘিরে ধরে। আকাশের এক কোণে সূর্যটা লাল আভা ছড়াতে শুরু করেছে। কুয়াশার পাতলা চাদরটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর উন্মোচিত হচ্ছে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ কালো ফিতেটা, যা তাকে হয়তো এক অজানা গন্তব্যের দিকে ডাকছে।
চাওয়ালা তখন চিনি ছাড়া লিকারের কাপটা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে এল। কাপ থেকে বের হওয়া গরম ধোঁয়া মোর্শেদের হাতের সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। মোর্শেদ চায়ে একটা চুমুক দিল। কড়া তেতো লিকারটা তার জিভে এক ধরণের ঝাঁঝালো অনুভূতি তৈরি করল। সে দূরে দিগন্তের দিকে তাকাল, যেখানে আকাশ আর রাস্তা এক হয়ে গেছে। আজ তার এই বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে পৃথিবীর আর কোনো কোলাহল মিলবে না। সে শুধুই একজন রাইডার, যার গন্তব্য হয়তো কোনো মানচিত্রে নেই, আছে কেবল তার অবচেতন মনের গভীর কোনো অতৃপ্তিতে।
সিগারেটের শেষ অংশটা সে রাস্তার ধারে ছুড়ে ফেলল। আগুনের সেই টুকরোটা বাতাসের তোড়ে নিভে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ জ্বলে রইল। মোর্শেদ আবার চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবল, এই পথটাই তার আসল বাড়ি। এখানে কোনো পিছুটান নেই, কোনো জটিল সমীকরণ নেই, আছে শুধু সে আর তার নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া।
কড়া লিকারের সেই তেতো স্বাদটা জিভ দিয়ে তালুতে ঠেকিয়ে সে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল সামনের ধূসর হাইওয়ের দিকে। এই সাতসকালে গন্তব্যহীনভাবে সে এখানে কেন এসে থামল, সেটা নিজের কাছেও পরিষ্কার নয়। তার অবচেতন মন কি তাকে কোনো কিছুর টানে এখানে নিয়ে এসেছে? সে কি আরও সামনে এগিয়ে যাবে? দাউদকান্দি পেরিয়ে কুমিল্লার দিকে কি একবার ঘুরে আসবে? নাকি এই চায়ের দোকানের তেরপলের নিচেই আরও কিছুক্ষণ বসে থাকবে?
তার ভেতরের চিরচেনা সেই দোলাচলটা আবার শুরু হলো। হাইওয়ের এই মুক্ত বাতাস তাকে টানছে, আবার মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তাকে বলছে আরও কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে, যা তাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে বাধ্য করে।
ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই হাত চলে গেল জ্যাকেটের পকেটে। সেখান থেকে আইফোনটা বের করে স্ক্রিনটা আনলক করল সে। অভ্যাসবশতই তার আঙুল চলে গেল মেসেঞ্জার আইকনে। সামিনার ইনবক্সটা খুলতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। নামের পাশে সবুজ বাতিটা নেই। সে স্ক্রল করে ওপরে তাকাতেই দেখল— ‘এক্টিভ ৬ আওয়ারস এগো’।
মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মানে কাল রাতে তাদের সেই তীব্র কথোপকথন শেষে অফলাইনে যাওয়ার পর সামিনা আর অনলাইনে আসেনি। সামিনার কি তাকে মনে নেই? নাকি সামিনা তাকে ইচ্ছে করেই এই অপেক্ষার যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছে? ঢাকার জ্যামের মতো সামিনাও যেন এক এক সময় তার জীবনের সবটুকু গতি স্তব্ধ করে দেয়।
মোর্শেদ ফোনটা বাইকের ট্যাংকের ওপর রেখে আবার সিগারেটে টান দিল। ধোঁয়াগুলো বাতাসের সাথে লড়ে লড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিজের হাতের তালুর দিকে। ৪৫ বছর—সংখ্যাটা অনেক বড় শোনায়। এই বয়সে এসে তার পরিচিত অনেক বন্ধুই আজ মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে, কেউ কেউ চশমার পুরু কাঁচের আড়ালে নিজেদের যৌবনকে চিরতরে কবর দিয়ে ফেলেছে। তারা এখন রিটায়ারমেন্ট আর সন্তানদের কলেজ-কলেজ নিয়ে চিন্তিত। নিজেকে তারা স্বেচ্ছায় ‘বুড়ো’ বানিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু মোর্শেদ কি সে দলে? সে নিজের ছয় ফুট দুই ইঞ্চির পেটানো শরীরটার দিকে তাকাল। রাইডিং জ্যাকেটের নিচে তার সুঠাম চওড়া কাঁধ আর মজবুত পেশিগুলো এখনও পঁচিশ বছরের তরুণের মতো টানটান। এই শরীরটাকে সে নিজের ইকোসিস্টেমের মতো করেই পরম যত্নে গড়ে তুলেছে। দিনের পর দিন জিমের ঘাম আর হাইওয়ের ধুলোবালি তাকে দিয়েছে এক ইস্পাতকঠিন অবয়ব।
পার্থক্য শুধু সামান্য কিছু জায়গায়। সে বাইকের রিয়ার ভিউ মিররে নিজের মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করল। হেলমেট খোলা অবস্থায় অবাধ্য চুলগুলো এখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। কপালের দুই কোণ থেকে চুলগুলো একটু পেছনে হটেছে, আর কানের পাশের চুলগুলোতে রুপোলি পাক ধরেছে। কাঁচাপাকা সেই দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার এই কাঠিন্য কেবলই অভিজ্ঞতার দান। এই মুখটা রোদ চেনে, এই মুখটা বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপ্টা চেনে। হাইওয়ের ধুলো তার ত্বকের লোমকূপে মিশে গিয়ে তাকে এক ধরণের অমসৃণ আভিজাত্য দিয়েছে।
হ্যাঁ, বয়সটা তার চেহারায় কথা বলে, কিন্তু তার রক্তে নয়। তার ভেতরের সেই আদিম ক্ষুধা, গতির প্রতি সেই তীব্র আসক্তি—এগুলো আজও সেই পঁচিশের উত্তাপ নিয়েই বেঁচে আছে। হয়তো সেই কারণেই সামিনার মতো এক রহস্যময়ী নারীর শব্দগুলো তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করতে পেরেছে। সে জানে, এই পোক্ত শরীর আর অভিজ্ঞ মনের মিশেলটাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
চায়ের কাপটা এখন প্রায় খালি। সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা সে পিষে ফেলল জুতো দিয়ে। ফোনটা আবার হাতে নিয়ে সামিনার সেই ‘লাস্ট এক্টিভ’ সময়টার দিকে তাকাল। ছয় ঘণ্টা আগের সেই সামিনা কি এখন তার নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে? নাকি এখনও সে ঘুমের রাজ্যে সেই ‘নীল জ্যামিতি’র নকশা বুনছে?
চায়ের কাপের একদম নিচে জমে থাকা শেষ ঠান্ডা লিকারটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে মোর্শেদ একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। চায়ের সেই তেতো স্বাদটা যেন তার মনের অস্থিরতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মেটিওর-এর সিটে হেলান দিয়ে সে আকাশের নীলচে আভার দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল কাল রাতের সেই নিকষ অন্ধকার ঘরের দৃশ্য।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে মোর্শেদ জীবনটাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছে। তার জীবনে নারীসঙ্গ কোনো নতুন বিষয় নয়। ডিভোর্সের পরের এই পাঁচ বছরে কত নারী তার এই বনানীর ফ্ল্যাটে এসেছে, কতজনের সাথে সে নিছক শরীরের প্রয়োজনে রাত কাটিয়েছে, তার হিসেব সে রাখেনি। অভিজ্ঞ মোর্শেদ জানে নারীর শরীরের ঘ্রাণ কেমন হয়, জানে কামনার চূড়ায় পৌঁছে কীভাবে নিস্তেজ হতে হয়। কিন্তু সামিনা?
সামিনা যেন এক সম্পূর্ণ অন্যরকম গোলকধাঁধা। মোর্শেদ নিজের মনেই একটা বাঁকা হাসি হাসল। যার গলার আওয়াজ সে শোনেনি, যার মুখটা পর্যন্ত সে ভালো করে দেখেনি, সেই এক ছায়ামানবী তাকে এভাবে শাসন করছে? সামিনার কোনো অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে, নাকি সে মোর্শেদের একাকীত্বের ইকোসিস্টেম থেকে জন্ম নেওয়া কোনো এক মায়া?
কাল রাতের সেই উত্তেজনার কথা মনে পড়তেই মোর্শেদের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে ভাবল, একজন পঁয়তাল্লিশ বছরের পোক্ত মানুষ, যার শরীর আর মন অভিজ্ঞতায় ঠাসা, সে কেন একজন সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণের মতো আচরণ করছে? কাল রাতে যখন মেসেঞ্জারের নীল আলোয় সামিনার শব্দগুলো তার ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠছিল, তখন মোর্শেদের মনে হচ্ছিল সে যেন পঁচিশ বছর আগে তার প্রথম প্রেমের উত্তেজনায় কাঁপছে।
সামিনার শব্দগুলো ছিল ভীষণ তীক্ষ্ণ, অনেকটা কামুক ফিসফিসানির মতো। সে যখন বলেছিল, "মিস্টার রাইডার, আপনি কি জানেন নীল জ্যামিতি আসলে কী? এটা শরীরের সেই বাঁক, যা কোনো স্কেল দিয়ে মাপা যায় না।"—তখন মোর্শেদের মনে হয়েছিল তার এসি ১৬ ডিগ্রিতে থাকা ঘরটা হঠাৎ করেই অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠেছে।
মোর্শেদ কাল রাতে একাই ছিল সেই বিশাল ফ্ল্যাটে। বাইরের বারান্দায় অন্ধকার, আর ভেতরে কেবল তার ফোনের আলো। সামিনার কল্পনা যেন ফোনের আলোয় প্রোজেক্টরের মত তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠতে চাইছিল। তার অভিজ্ঞ মন যেন সামিনার সেই ছায়াশরীরকে অনুভব করতে চাইছিল।
উত্তেজনাটা ছিল অবর্ণনীয়। সে অনুভব করছিল তার পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠছে, হৃদস্পন্দন যেন মেটিওর-এর ইঞ্জিনের গর্জনের চেয়েও তীব্র হয়ে বাজছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে যেখানে আবেগগুলো স্তিমিত হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে সামিনা তার ভেতরে কামনার এক আদিম দাবানল জ্বেলে দিয়েছে। মোর্শেদ নিজের অবচেতন মনেই সামিনার সেই অদৃশ্য শরীরটাকে কল্পনা করতে শুরু করেছিল। সামিনার শাড়ির আঁচলটা অবাধ্যভাবে খসে পড়ছে, আর তার নিচে উন্মোচিত হচ্ছে সেই রহস্যময় 'নিষিদ্ধ ভূগোল'।
সেই নিঃসঙ্গ রাতে, মোর্শেদ একাই সেই উত্তেজনার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। কোনো স্পর্শ ছাড়াই, কেবল শব্দের জাদুতে সে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল এক অলীক কামনার কাছে। যখন সব শেষ হলো, যখন সে নিস্তেজ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল, তখন এক ধরণের অপরাধবোধ নয়, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। সে ভাবল, এটা কি সামিনার জাদু? নাকি নিছকই তার দীর্ঘদিনের জমানো একাকীত্বের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ?
সামিনা তাকে একাই উত্তেজিত করে তোলে, আবার একাই তাকে নিস্তেজ হতে বাধ্য করে। এই যে একতরফা এক মরণখেলা, এতে মোর্শেদ যেন এক অসহায় পুতুল। সে চায় সামিনাকে রক্ত-মাংসের শরীরে অনুভব করতে। সে চায় তার সেই 'নীল জ্যামিতি'র প্রতিটি রেখাকে নিজের হাতের তালুতে মানচিত্রের মতো পড়ে নিতে।
চায়ের দোকানের সেই শব্দগুলো—কেতলির টগবগানি, দূরে বাসের হর্ন—সবই যেন এখন মোর্শেদের কাছে ফিকে মনে হচ্ছে। তার মনের ভেতরে কেবল কাল রাতের সেই কামুক আলাপগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সামিনা কি জানে, সে মোর্শেদের মতো এক শক্ত মানুষকে কতটা দুর্বল করে ফেলেছে? সামিনা কি জানে, তার একেকটা মেসেজ মোর্শেদের অভিজ্ঞ রক্তে কতটা প্রলয় ঘটিয়ে দেয়?
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের শিরাগুলো ফুটে উঠেছে। এই শরীরটা, যা হাজার মাইল রাইড করেও ক্লান্ত হয় না, তা আজ একজন নারীর অদেখা অবয়বের কাছে নতজানু। সে আবার ভাবল, আজ সকালে কি সামিনা সত্যিই আয়নার সামনে দাঁড়াবে? সে কি তার সেই নিষিদ্ধ ভূগোলের একটা নকশা তাকে পাঠাবে?
মোর্শেদের কামনার এই আগুন এখন আর কেবল মনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এটা তার পেশিতে, তার রক্তে, তার নিঃশ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সে জানে, এই হাইওয়ে তাকে আজ কোনো শান্ত গন্তব্যে নিয়ে যাবে না। যতক্ষণ না সে সামিনার সেই ছবির দেখা পাচ্ছে, ততক্ষণ তার এই অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাবে। সে কোনো আনারি কিশোর নয়, অথচ সামিনার প্রতিটি শব্দ তাকে নতুন করে জন্মানোর স্বাদ দিচ্ছে।
সে আবার সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াগুলো কুয়াশার সাথে মিশে গিয়ে এক বিমূর্ত রূপ নিল। মোর্শেদ বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে বলল, "আমি কি হারছি? নাকি এটাই শুরু?"
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারের ওপর দুই হাত রেখে সোজা হয়ে বসল। চারপাশটা এখনো সেই মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা। হাইওয়ের এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। এবার আর কোনো টেক্সট নয়, বরং নিজের এই মুহূর্তের একটা প্রতিচ্ছবি সে সামিনাকে পাঠাতে চায়।
সে ফোনটাকে এমনভাবে সেট করল যাতে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ ধূসর পথ আর তার বাইকের সামনের অংশটা ফ্রেমের ভেতর চলে আসে। মোর্শেদ নিজে বাইকের সিটের ওপর একটু উঁচু হয়ে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসল। তার ডান হাতটা শক্তভাবে ধরে আছে মেটিওর-এর সেই ক্রোম ফিনিশিংয়ের হ্যান্ডেলবার। সেই হ্যান্ডেল ধরা হাতের আঙুলের ভাঁজে ধরা আছে একটা আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের অগ্রভাগ থেকে পাতলা নীলচে ধোঁয়ার একটা রেখা ভোরের বাতাসে কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।
ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত সেই হাইওয়ে, যা কুয়াশার ভেতর দিয়ে ক্রমে অস্পষ্ট হতে হতে কোথাও যেন এক অসীম শূন্যতায় হারিয়ে গেছে। আকাশের রংটা ধোঁয়াটে ধূসর, যেন কোনো বিষণ্ণ শিল্পীর ক্যানভাস। মোর্শেদ কয়েকটা ছবি তুলল। একটা ছবিতে তার হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, আর হাতের রোমগুলো ভোরের শিশিরে ভিজে একটু চিকচিক করছে।
সবচেয়ে নিখুঁত ছবিটা বেছে নিয়ে সে সামিনার ইনবক্সে গেল। ছবির নিচে ছোট করে লিখল— “গুড মর্নিং। এই ধূসর সকালে আপনার 'নীল জ্যামিতি'র রঙ কি একটু ছড়ানো যাবে? আমি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি।”
সে সেন্ড বাটনে চাপ দিল। মেসেঞ্জারের সেই চিরচেনা শব্দটা হলো, কিন্তু ছবির নিচে যে গোল চিহ্নটা থাকে, সেটা ভরাট হলো না। কেবল একটা ফাঁপা টিক চিহ্ন (Single Tick) দেখা গেল। মোর্শেদ স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। না, মেসেজটা ডেলিভারড হয়নি।
তার মানে সামিনা এখনো অনলাইন হয়নি। ছয় ঘণ্টা আগে সেই যে সে তার মায়াবী জগত নিয়ে আড়ালে চলে গেছে, এখনো ফেরেনি। সামিনার ফোনটা হয়তো এখন তার মাথার কাছে কোনো টেবিলের ওপর নির্জীব পড়ে আছে, কিংবা সে হয়তো এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মোর্শেদের বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম হাহাকার খেলে গেল। এই যে এত আয়োজন, পঁয়তাল্লিশ বছরের এক অভিজ্ঞ পুরুষের এই যে কিশোরের মতো আকুলতা—সবই যেন একতরফা। সে জানে সামিনা অনলাইনে এলে তবেই এই ছবির সার্থকতা। অথচ এই মুহূর্তে হাইওয়ের এই ঠান্ডা বাতাস আর জ্বলন্ত সিগারেটের উত্তাপটুকু শেয়ার করার মতো কেউ নেই।
সে ফোনটা আবার বাইকের ট্যাংকের ওপর রাখল। সামনের রাস্তাটা এখন আরও বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে। সামিনা কি ইচ্ছে করেই দেরি করছে? নাকি সে মোর্শেদকে এই প্রতীক্ষার আগুনে পুড়িয়ে আরও বেশি পরিপক্ক করে নিতে চায়?
মোর্শেদ সিগারেটে শেষ একটা লম্বা টান দিয়ে সেটা রাস্তার পাশে ছুড়ে মারল। আগুনের ফুলকিটা কিছুক্ষণ জ্বলল, তারপর শিশিরভেজা ঘাসের ওপর নিভে গেল। সে জানে, যতক্ষণ না সামিনার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠছে, ততক্ষণ মোর্শেদের এই হাইওয়ে রাইডও যেন অসম্পূর্ণ। সে নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকল, ভোরের সেই ধূসর একাকীত্বের ভেতর সামিনার এক চিলতে উপস্থিতির জন্য।
মোর্শেদ বাইকের চাবি অন করল। মেটিওর-এর ৩৫০ সিসির ইঞ্জিনটা একবার গর্জে উঠে ধকধক ছন্দে স্থির হলো। হাইওয়ের সেই ধূসর সকালটা এখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল রোদে রূপ নিচ্ছে। মোর্শেদের মনে হলো, এই স্থবির হয়ে বসে থাকা তার জন্য নয়। সে গ্লাভস জোড়া পরে নিল, হেলমেটের ভাইজার নামিয়ে দিয়ে ক্লাচ রিলিজ করল। বাইকটা সামনের অনন্ত পথের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে সে এগিয়ে চলল দাউদকান্দির দিকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শীতের ভোরের সেই আমেজ উবে গিয়ে মাথার ওপর কড়া রোদ চড়তে শুরু করেছে। জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে রোদের তেজ এখন পিঠে বিঁধছে। সাধারণ সময়ে মোর্শেদ এই রাইডটা দারুণ উপভোগ করত। হাইওয়ের বাতাস যখন তার বুক চিরে বেরিয়ে যায়, তখন সে এক ধরণের আদিম স্বাধীনতা অনুভব করে। কিন্তু আজ সেই স্বাধীনতা যেন কোথাও একটা শেকলে আটকে আছে।
সে যতবারই বাইকের গতি বাড়াচ্ছে, ততবারই তার মন অবচেতনভাবে বাম পকেটের দিকে চলে যাচ্ছে—যেখানে ফোনটা সাইলেন্ট মুডে রাখা। প্রতিটা সিগন্যালে, প্রতিটা বাঁকে তার মনে হচ্ছে—এই বুঝি ফোনটা কেঁপে উঠল! এই বুঝি সামিনার থেকে একটা মেসেজ এলো!
দাউদকান্দি ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন সে বাইক নিয়ে যাচ্ছে, নিচে মেঘনা নদীর শান্ত নীল জল রোদে চিকচিক করছে। মোর্শেদ এক মুহূর্তের জন্য বাইকের গতি কমাল। এই বিশাল জলরাশি, এই আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশ—সবই আজ সামিনার অদেখা অবয়বের কাছে ম্লান মনে হচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ মোর্শেদ নিজের ওপর বিরক্ত বোধ করল। সে তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। কত নারী তার জীবনে এসেছে, কতবার সে শরীর আর মনের আদান-প্রদান করেছে—কিন্তু কোনো এক ছায়ামানবীর জন্য এমন স্থবির আকুলতা তার পুরুষালি অহংকারে একটু হলেও আঘাত দিচ্ছে।
বেলা দুইটা। রোদের তেজ এখন চরমে। হাইওয়ের পিচ থেকে তাপের হল্কা বের হচ্ছে, যা হেলমেটের ভেতরেও মোর্শেদকে ঘেমে নেয়ে একাকার করে ফেলছে। সে দাউদকান্দির একটা মোড় থেকে বাইকটা ঘোরাল। আর না, সামনে গিয়ে লাভ নেই। তার শরীর এখন ক্লান্ত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত তার মন। সামিনা এখনো অফলাইন। সেই যে কাল রাতে সে একটা রহস্যের চাদর বিছিয়ে দিয়ে চলে গেল, তারপর থেকে আর কোনো চিহ্ন নেই।
ফেরার পথটা মোর্শেদের কাছে বড্ড দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর মনে হতে লাগল। যে রাইডিং তাকে মুক্তি দিত, আজ সেই রাইডিং যেন তাকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছে। হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে যখন সে বনানীর দিকে ঢুকছে, তখন শহরের জ্যাম আর মানুষের চিৎকার তার বিরক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
অবশেষে বনানীর সেই পরিচিত ফ্ল্যাটের পার্কিংয়ে সে বাইকটা থামাল। মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তখনো তার উরুর নিচে অনুভূত হচ্ছে, ঠিক যেমন তার মনের ভেতর সামিনাকে নিয়ে জমানো উত্তাপটুকু। সে হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রাখল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখল—ধুলো আর রোদে মুখটা কালচে হয়ে গেছে, চোখের কোণে এক রাশ ক্লান্তি।
লিফটে করে দশতলায় ওঠার সময় সে আবার ফোনটা বের করল। ডাটা কানেকশন অন আছে, কিন্তু নোটিফিকেশন প্যানেলটা একদম খালি। সামিনা এখনো আসেনি। সামিনা তাকে কোনো ছবি পাঠায়নি।
ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই এসির সেই কৃত্রিম ঠান্ডা বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু এই আভিজাত্য, এই বিশাল ফ্ল্যাট—সবই এখন তার কাছে একটা খাঁচা মনে হচ্ছে। জ্যাকেটটা সোফার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে বারান্দার দিকে তাকাল। দুপুরের কড়া রোদ জানালার কাঁচ চিরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে।
মোর্শেদ এক গ্লাস বরফ মেশানো জল নিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মনে এক ধরণের তিতকুটে হতাশা দানা বাঁধছে। সে কি সামিনার কাছে কেবল একটা খেলার পুতুল? নাকি সামিনা তাকে এভাবেই অভুক্ত রেখে তার তৃষ্ণাকে আরও তীব্র করতে চায়? পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে এই ধরণের ভার্চুয়াল বিরহ তাকে যেন এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ফেলে দিচ্ছে।
সে চোখ বন্ধ করল। সামিনা তাকে ছবি দেয়নি, কিন্তু তার মনের ক্যানভাসে সামিনা এখন হাজারো রঙে আঁকা এক নিষিদ্ধ মানচিত্র। যে মানচিত্রের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁক আর গভীর উপত্যকা সে আজ স্পর্শ করতে চেয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে সে ফিরে এসেছে একরাশ ক্লান্তি আর শূন্যতা নিয়ে।
মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, “সামিনা, আপনি কি সত্যিই আছেন? নাকি আপনি কেবল আমার এই একাকীত্বের ইকোসিস্টেমের একটা অসুখ?”
সামনে ছোট টিনের ছাপড়া ঘর, উপরে প্লাস্টিকের তেরপল টাঙানো। ভেতরে কেরোসিনের চুলার ওপর ধোঁয়া ওঠা বড় একটা অ্যালুমিনিয়ামের কেতলি। মোর্শেদ হেলমেটের ভাইজারটা উপরে তুলে গম্ভীর গলায় ডাকল, “মামা, এক প্যাকেট মার্লবরো রেড দেন। আর এক কাপ কড়া লিকারের চা, চিনি ছাড়া।”
দোকানের মালিক বৃদ্ধ লোকটা তখনও ঠিকমতো চোখ মেলতে পারেনি। আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসে মোর্শেদের বাইকের গ্লসি কালো বডি আর ইঞ্জিনের ক্রোম ফিনিশিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভ্যাবাচ্যকা খেয়ে গেল। তারপর হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বলল, “মামা, লিকার তো মাত্র বসাইলাম। আগের লিকার বাসি হইয়া গেছে, ফালাইয়া দিছি। নতুনটা হইতে মিনিট দশেক সময় লাগব।”
মোর্শেদ পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল ৬টা বেজে ৩০ মিনিট। সে বাইকের ফুয়েল ট্যাংকের ওপর ডান হাতটা রেখে নির্লিপ্তভাবে বলল, “অসুবিধা নাই। আমার তাড়াহুড়ো নেই। আপনি আপনার মতো সময় নিয়ে বানান।”
এই এলাকাটা দিনের বেলা থাকে মানুষের নরকগুলজার। হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, রিকশার বেল আর বাসের তীব্র হর্নে বাতাস সবসময় ভারী হয়ে থাকে। কিন্তু এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। ঢাকার এই প্রবেশপথ বা সাইনবোর্ড এলাকাটা এখন যেন এক দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। রাস্তাটা একদম ফাঁকা নয়, তবে খুব একটা ব্যস্তও নয়। মাঝে মাঝে দুই-একটা দূরপাল্লার নাইট কোচ ধুলো উড়িয়ে সপাটে বেরিয়ে যাচ্ছে, তাদের হেডলাইটের হলুদ আলো তখনো মোর্শেদের চোখে এসে বিঁধছে। দুই-একটা প্রাইভেট কারের চাকা পিচঢালা রাস্তার ওপর যে সরু শব্দ তুলছে, তা কান পাতলে শোনা যায়।
ভোরের ঠান্ডা বাতাসটা এখন বেশ প্রবল। কোনো বাধা ছাড়াই সেটা মোর্শেদের খোলা মুখের ওপর আছড়ে পড়ছে, আর সেই ছোঁয়াটা এক ধরণের আদিম প্রশান্তি দিচ্ছে। মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী শরীরের চামড়া এই বাতাসের চুমু বা স্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই নির্জন হাইওয়ে, ধুলোর গন্ধ আর ভোরের এই নীলচে আলো—এটাই এখন তার একমাত্র সত্যিকারের জগত।
সে সিগারেটটা বের করল। এক প্যাকেট মার্লবরো থেকে একটা সিগারেট ঠোঁটে চেপে ধরে দিয়াশলাই জ্বালানোর আগমুহূর্তে সে আশপাশটা আবার দেখে নিল। রাস্তার ধারের ঘাসগুলোর ওপর শিশির জমে আছে, যা দূর থেকে হীরের টুকরোর মতো চিকচিক করছে। দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা ঘষতেই একটা কমলা রঙের অগ্নিশিখা অন্ধকার আর স্নিগ্ধতার বুক চিরে জেগে উঠল। মোর্শেদ দীর্ঘ একটা টান দিল। তামাকের কড়া স্বাদ আর ধোঁয়া তার ফুসফুসে প্রবেশ করতেই তার অস্থির স্নায়ুগুলো শিথিল হতে শুরু করল।
সে তার ল্যাপটপ আর বনানীর দশতলার আভিজাত্য থেকে অনেক দূরে এখন একাকী এক যাত্রী। বাইকের মেটালিক বডিটা তার উরুর নিচে বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে। মোর্শেদ ভাবল, মানুষ যখন গতির নেশায় ছুটে চলে, তখন সে নিজের অনেক কিছু পেছনে ফেলে আসে। কিন্তু যখন কোথাও থামে, তখন সেই ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আবার ছায়ার মতো তাকে ঘিরে ধরে। আকাশের এক কোণে সূর্যটা লাল আভা ছড়াতে শুরু করেছে। কুয়াশার পাতলা চাদরটা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর উন্মোচিত হচ্ছে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ কালো ফিতেটা, যা তাকে হয়তো এক অজানা গন্তব্যের দিকে ডাকছে।
চাওয়ালা তখন চিনি ছাড়া লিকারের কাপটা হাতে নিয়ে দোকানের বাইরে এল। কাপ থেকে বের হওয়া গরম ধোঁয়া মোর্শেদের হাতের সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। মোর্শেদ চায়ে একটা চুমুক দিল। কড়া তেতো লিকারটা তার জিভে এক ধরণের ঝাঁঝালো অনুভূতি তৈরি করল। সে দূরে দিগন্তের দিকে তাকাল, যেখানে আকাশ আর রাস্তা এক হয়ে গেছে। আজ তার এই বাইকের ইঞ্জিনের গর্জনের সাথে পৃথিবীর আর কোনো কোলাহল মিলবে না। সে শুধুই একজন রাইডার, যার গন্তব্য হয়তো কোনো মানচিত্রে নেই, আছে কেবল তার অবচেতন মনের গভীর কোনো অতৃপ্তিতে।
সিগারেটের শেষ অংশটা সে রাস্তার ধারে ছুড়ে ফেলল। আগুনের সেই টুকরোটা বাতাসের তোড়ে নিভে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ জ্বলে রইল। মোর্শেদ আবার চায়ে চুমুক দিয়ে ভাবল, এই পথটাই তার আসল বাড়ি। এখানে কোনো পিছুটান নেই, কোনো জটিল সমীকরণ নেই, আছে শুধু সে আর তার নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ ছায়া।
কড়া লিকারের সেই তেতো স্বাদটা জিভ দিয়ে তালুতে ঠেকিয়ে সে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে রইল সামনের ধূসর হাইওয়ের দিকে। এই সাতসকালে গন্তব্যহীনভাবে সে এখানে কেন এসে থামল, সেটা নিজের কাছেও পরিষ্কার নয়। তার অবচেতন মন কি তাকে কোনো কিছুর টানে এখানে নিয়ে এসেছে? সে কি আরও সামনে এগিয়ে যাবে? দাউদকান্দি পেরিয়ে কুমিল্লার দিকে কি একবার ঘুরে আসবে? নাকি এই চায়ের দোকানের তেরপলের নিচেই আরও কিছুক্ষণ বসে থাকবে?
তার ভেতরের চিরচেনা সেই দোলাচলটা আবার শুরু হলো। হাইওয়ের এই মুক্ত বাতাস তাকে টানছে, আবার মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তাকে বলছে আরও কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিতে। এই নিঃসঙ্গতার মধ্যে এক ধরণের অদ্ভুত স্বাধীনতা আছে, যা তাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে বাধ্য করে।
ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই হাত চলে গেল জ্যাকেটের পকেটে। সেখান থেকে আইফোনটা বের করে স্ক্রিনটা আনলক করল সে। অভ্যাসবশতই তার আঙুল চলে গেল মেসেঞ্জার আইকনে। সামিনার ইনবক্সটা খুলতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। নামের পাশে সবুজ বাতিটা নেই। সে স্ক্রল করে ওপরে তাকাতেই দেখল— ‘এক্টিভ ৬ আওয়ারস এগো’।
মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার মানে কাল রাতে তাদের সেই তীব্র কথোপকথন শেষে অফলাইনে যাওয়ার পর সামিনা আর অনলাইনে আসেনি। সামিনার কি তাকে মনে নেই? নাকি সামিনা তাকে ইচ্ছে করেই এই অপেক্ষার যন্ত্রণায় ফেলে রেখেছে? ঢাকার জ্যামের মতো সামিনাও যেন এক এক সময় তার জীবনের সবটুকু গতি স্তব্ধ করে দেয়।
মোর্শেদ ফোনটা বাইকের ট্যাংকের ওপর রেখে আবার সিগারেটে টান দিল। ধোঁয়াগুলো বাতাসের সাথে লড়ে লড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিজের হাতের তালুর দিকে। ৪৫ বছর—সংখ্যাটা অনেক বড় শোনায়। এই বয়সে এসে তার পরিচিত অনেক বন্ধুই আজ মেদবহুল শরীরের অধিকারী হয়েছে, কেউ কেউ চশমার পুরু কাঁচের আড়ালে নিজেদের যৌবনকে চিরতরে কবর দিয়ে ফেলেছে। তারা এখন রিটায়ারমেন্ট আর সন্তানদের কলেজ-কলেজ নিয়ে চিন্তিত। নিজেকে তারা স্বেচ্ছায় ‘বুড়ো’ বানিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু মোর্শেদ কি সে দলে? সে নিজের ছয় ফুট দুই ইঞ্চির পেটানো শরীরটার দিকে তাকাল। রাইডিং জ্যাকেটের নিচে তার সুঠাম চওড়া কাঁধ আর মজবুত পেশিগুলো এখনও পঁচিশ বছরের তরুণের মতো টানটান। এই শরীরটাকে সে নিজের ইকোসিস্টেমের মতো করেই পরম যত্নে গড়ে তুলেছে। দিনের পর দিন জিমের ঘাম আর হাইওয়ের ধুলোবালি তাকে দিয়েছে এক ইস্পাতকঠিন অবয়ব।
পার্থক্য শুধু সামান্য কিছু জায়গায়। সে বাইকের রিয়ার ভিউ মিররে নিজের মুখটা একবার দেখার চেষ্টা করল। হেলমেট খোলা অবস্থায় অবাধ্য চুলগুলো এখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে। কপালের দুই কোণ থেকে চুলগুলো একটু পেছনে হটেছে, আর কানের পাশের চুলগুলোতে রুপোলি পাক ধরেছে। কাঁচাপাকা সেই দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে মোর্শেদ বুঝতে পারল, তার এই কাঠিন্য কেবলই অভিজ্ঞতার দান। এই মুখটা রোদ চেনে, এই মুখটা বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপ্টা চেনে। হাইওয়ের ধুলো তার ত্বকের লোমকূপে মিশে গিয়ে তাকে এক ধরণের অমসৃণ আভিজাত্য দিয়েছে।
হ্যাঁ, বয়সটা তার চেহারায় কথা বলে, কিন্তু তার রক্তে নয়। তার ভেতরের সেই আদিম ক্ষুধা, গতির প্রতি সেই তীব্র আসক্তি—এগুলো আজও সেই পঁচিশের উত্তাপ নিয়েই বেঁচে আছে। হয়তো সেই কারণেই সামিনার মতো এক রহস্যময়ী নারীর শব্দগুলো তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করতে পেরেছে। সে জানে, এই পোক্ত শরীর আর অভিজ্ঞ মনের মিশেলটাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
চায়ের কাপটা এখন প্রায় খালি। সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা সে পিষে ফেলল জুতো দিয়ে। ফোনটা আবার হাতে নিয়ে সামিনার সেই ‘লাস্ট এক্টিভ’ সময়টার দিকে তাকাল। ছয় ঘণ্টা আগের সেই সামিনা কি এখন তার নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে? নাকি এখনও সে ঘুমের রাজ্যে সেই ‘নীল জ্যামিতি’র নকশা বুনছে?
চায়ের কাপের একদম নিচে জমে থাকা শেষ ঠান্ডা লিকারটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে মোর্শেদ একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল। চায়ের সেই তেতো স্বাদটা যেন তার মনের অস্থিরতার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। মেটিওর-এর সিটে হেলান দিয়ে সে আকাশের নীলচে আভার দিকে তাকিয়ে থাকল, কিন্তু তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল কাল রাতের সেই নিকষ অন্ধকার ঘরের দৃশ্য।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে মোর্শেদ জীবনটাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছে। তার জীবনে নারীসঙ্গ কোনো নতুন বিষয় নয়। ডিভোর্সের পরের এই পাঁচ বছরে কত নারী তার এই বনানীর ফ্ল্যাটে এসেছে, কতজনের সাথে সে নিছক শরীরের প্রয়োজনে রাত কাটিয়েছে, তার হিসেব সে রাখেনি। অভিজ্ঞ মোর্শেদ জানে নারীর শরীরের ঘ্রাণ কেমন হয়, জানে কামনার চূড়ায় পৌঁছে কীভাবে নিস্তেজ হতে হয়। কিন্তু সামিনা?
সামিনা যেন এক সম্পূর্ণ অন্যরকম গোলকধাঁধা। মোর্শেদ নিজের মনেই একটা বাঁকা হাসি হাসল। যার গলার আওয়াজ সে শোনেনি, যার মুখটা পর্যন্ত সে ভালো করে দেখেনি, সেই এক ছায়ামানবী তাকে এভাবে শাসন করছে? সামিনার কোনো অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে, নাকি সে মোর্শেদের একাকীত্বের ইকোসিস্টেম থেকে জন্ম নেওয়া কোনো এক মায়া?
কাল রাতের সেই উত্তেজনার কথা মনে পড়তেই মোর্শেদের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। সে ভাবল, একজন পঁয়তাল্লিশ বছরের পোক্ত মানুষ, যার শরীর আর মন অভিজ্ঞতায় ঠাসা, সে কেন একজন সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুণের মতো আচরণ করছে? কাল রাতে যখন মেসেঞ্জারের নীল আলোয় সামিনার শব্দগুলো তার ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠছিল, তখন মোর্শেদের মনে হচ্ছিল সে যেন পঁচিশ বছর আগে তার প্রথম প্রেমের উত্তেজনায় কাঁপছে।
সামিনার শব্দগুলো ছিল ভীষণ তীক্ষ্ণ, অনেকটা কামুক ফিসফিসানির মতো। সে যখন বলেছিল, "মিস্টার রাইডার, আপনি কি জানেন নীল জ্যামিতি আসলে কী? এটা শরীরের সেই বাঁক, যা কোনো স্কেল দিয়ে মাপা যায় না।"—তখন মোর্শেদের মনে হয়েছিল তার এসি ১৬ ডিগ্রিতে থাকা ঘরটা হঠাৎ করেই অগ্নিকুণ্ড হয়ে উঠেছে।
মোর্শেদ কাল রাতে একাই ছিল সেই বিশাল ফ্ল্যাটে। বাইরের বারান্দায় অন্ধকার, আর ভেতরে কেবল তার ফোনের আলো। সামিনার কল্পনা যেন ফোনের আলোয় প্রোজেক্টরের মত তার মস্তিষ্কে ভেসে উঠতে চাইছিল। তার অভিজ্ঞ মন যেন সামিনার সেই ছায়াশরীরকে অনুভব করতে চাইছিল।
উত্তেজনাটা ছিল অবর্ণনীয়। সে অনুভব করছিল তার পেশিগুলো টানটান হয়ে উঠছে, হৃদস্পন্দন যেন মেটিওর-এর ইঞ্জিনের গর্জনের চেয়েও তীব্র হয়ে বাজছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে যেখানে আবেগগুলো স্তিমিত হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে সামিনা তার ভেতরে কামনার এক আদিম দাবানল জ্বেলে দিয়েছে। মোর্শেদ নিজের অবচেতন মনেই সামিনার সেই অদৃশ্য শরীরটাকে কল্পনা করতে শুরু করেছিল। সামিনার শাড়ির আঁচলটা অবাধ্যভাবে খসে পড়ছে, আর তার নিচে উন্মোচিত হচ্ছে সেই রহস্যময় 'নিষিদ্ধ ভূগোল'।
সেই নিঃসঙ্গ রাতে, মোর্শেদ একাই সেই উত্তেজনার সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। কোনো স্পর্শ ছাড়াই, কেবল শব্দের জাদুতে সে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিল এক অলীক কামনার কাছে। যখন সব শেষ হলো, যখন সে নিস্তেজ হয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল, তখন এক ধরণের অপরাধবোধ নয়, বরং এক অদ্ভুত শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। সে ভাবল, এটা কি সামিনার জাদু? নাকি নিছকই তার দীর্ঘদিনের জমানো একাকীত্বের এক ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ?
সামিনা তাকে একাই উত্তেজিত করে তোলে, আবার একাই তাকে নিস্তেজ হতে বাধ্য করে। এই যে একতরফা এক মরণখেলা, এতে মোর্শেদ যেন এক অসহায় পুতুল। সে চায় সামিনাকে রক্ত-মাংসের শরীরে অনুভব করতে। সে চায় তার সেই 'নীল জ্যামিতি'র প্রতিটি রেখাকে নিজের হাতের তালুতে মানচিত্রের মতো পড়ে নিতে।
চায়ের দোকানের সেই শব্দগুলো—কেতলির টগবগানি, দূরে বাসের হর্ন—সবই যেন এখন মোর্শেদের কাছে ফিকে মনে হচ্ছে। তার মনের ভেতরে কেবল কাল রাতের সেই কামুক আলাপগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। সামিনা কি জানে, সে মোর্শেদের মতো এক শক্ত মানুষকে কতটা দুর্বল করে ফেলেছে? সামিনা কি জানে, তার একেকটা মেসেজ মোর্শেদের অভিজ্ঞ রক্তে কতটা প্রলয় ঘটিয়ে দেয়?
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের শিরাগুলো ফুটে উঠেছে। এই শরীরটা, যা হাজার মাইল রাইড করেও ক্লান্ত হয় না, তা আজ একজন নারীর অদেখা অবয়বের কাছে নতজানু। সে আবার ভাবল, আজ সকালে কি সামিনা সত্যিই আয়নার সামনে দাঁড়াবে? সে কি তার সেই নিষিদ্ধ ভূগোলের একটা নকশা তাকে পাঠাবে?
মোর্শেদের কামনার এই আগুন এখন আর কেবল মনের ভেতর সীমাবদ্ধ নেই। এটা তার পেশিতে, তার রক্তে, তার নিঃশ্বাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সে জানে, এই হাইওয়ে তাকে আজ কোনো শান্ত গন্তব্যে নিয়ে যাবে না। যতক্ষণ না সে সামিনার সেই ছবির দেখা পাচ্ছে, ততক্ষণ তার এই অস্থিরতা তাকে কুরে কুরে খাবে। সে কোনো আনারি কিশোর নয়, অথচ সামিনার প্রতিটি শব্দ তাকে নতুন করে জন্মানোর স্বাদ দিচ্ছে।
সে আবার সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াগুলো কুয়াশার সাথে মিশে গিয়ে এক বিমূর্ত রূপ নিল। মোর্শেদ বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে বলল, "আমি কি হারছি? নাকি এটাই শুরু?"
মোর্শেদ বাইকের হ্যান্ডেলবারের ওপর দুই হাত রেখে সোজা হয়ে বসল। চারপাশটা এখনো সেই মায়াবী কুয়াশার চাদরে ঢাকা। হাইওয়ের এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে এক অদ্ভুত নেশায় পেয়ে বসেছে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। এবার আর কোনো টেক্সট নয়, বরং নিজের এই মুহূর্তের একটা প্রতিচ্ছবি সে সামিনাকে পাঠাতে চায়।
সে ফোনটাকে এমনভাবে সেট করল যাতে হাইওয়ের সেই দীর্ঘ ধূসর পথ আর তার বাইকের সামনের অংশটা ফ্রেমের ভেতর চলে আসে। মোর্শেদ নিজে বাইকের সিটের ওপর একটু উঁচু হয়ে আধশোয়া ভঙ্গিতে বসল। তার ডান হাতটা শক্তভাবে ধরে আছে মেটিওর-এর সেই ক্রোম ফিনিশিংয়ের হ্যান্ডেলবার। সেই হ্যান্ডেল ধরা হাতের আঙুলের ভাঁজে ধরা আছে একটা আধখাওয়া জ্বলন্ত সিগারেট। সিগারেটের অগ্রভাগ থেকে পাতলা নীলচে ধোঁয়ার একটা রেখা ভোরের বাতাসে কুন্ডলী পাকিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।
ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখা যাচ্ছে দিগন্তবিস্তৃত সেই হাইওয়ে, যা কুয়াশার ভেতর দিয়ে ক্রমে অস্পষ্ট হতে হতে কোথাও যেন এক অসীম শূন্যতায় হারিয়ে গেছে। আকাশের রংটা ধোঁয়াটে ধূসর, যেন কোনো বিষণ্ণ শিল্পীর ক্যানভাস। মোর্শেদ কয়েকটা ছবি তুলল। একটা ছবিতে তার হাতের পেশিগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে, আর হাতের রোমগুলো ভোরের শিশিরে ভিজে একটু চিকচিক করছে।
সবচেয়ে নিখুঁত ছবিটা বেছে নিয়ে সে সামিনার ইনবক্সে গেল। ছবির নিচে ছোট করে লিখল— “গুড মর্নিং। এই ধূসর সকালে আপনার 'নীল জ্যামিতি'র রঙ কি একটু ছড়ানো যাবে? আমি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি।”
সে সেন্ড বাটনে চাপ দিল। মেসেঞ্জারের সেই চিরচেনা শব্দটা হলো, কিন্তু ছবির নিচে যে গোল চিহ্নটা থাকে, সেটা ভরাট হলো না। কেবল একটা ফাঁপা টিক চিহ্ন (Single Tick) দেখা গেল। মোর্শেদ স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল কয়েক মুহূর্ত। না, মেসেজটা ডেলিভারড হয়নি।
তার মানে সামিনা এখনো অনলাইন হয়নি। ছয় ঘণ্টা আগে সেই যে সে তার মায়াবী জগত নিয়ে আড়ালে চলে গেছে, এখনো ফেরেনি। সামিনার ফোনটা হয়তো এখন তার মাথার কাছে কোনো টেবিলের ওপর নির্জীব পড়ে আছে, কিংবা সে হয়তো এখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মোর্শেদের বুকের ভেতর একটা সূক্ষ্ম হাহাকার খেলে গেল। এই যে এত আয়োজন, পঁয়তাল্লিশ বছরের এক অভিজ্ঞ পুরুষের এই যে কিশোরের মতো আকুলতা—সবই যেন একতরফা। সে জানে সামিনা অনলাইনে এলে তবেই এই ছবির সার্থকতা। অথচ এই মুহূর্তে হাইওয়ের এই ঠান্ডা বাতাস আর জ্বলন্ত সিগারেটের উত্তাপটুকু শেয়ার করার মতো কেউ নেই।
সে ফোনটা আবার বাইকের ট্যাংকের ওপর রাখল। সামনের রাস্তাটা এখন আরও বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে। সামিনা কি ইচ্ছে করেই দেরি করছে? নাকি সে মোর্শেদকে এই প্রতীক্ষার আগুনে পুড়িয়ে আরও বেশি পরিপক্ক করে নিতে চায়?
মোর্শেদ সিগারেটে শেষ একটা লম্বা টান দিয়ে সেটা রাস্তার পাশে ছুড়ে মারল। আগুনের ফুলকিটা কিছুক্ষণ জ্বলল, তারপর শিশিরভেজা ঘাসের ওপর নিভে গেল। সে জানে, যতক্ষণ না সামিনার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠছে, ততক্ষণ মোর্শেদের এই হাইওয়ে রাইডও যেন অসম্পূর্ণ। সে নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে থাকল, ভোরের সেই ধূসর একাকীত্বের ভেতর সামিনার এক চিলতে উপস্থিতির জন্য।
মোর্শেদ বাইকের চাবি অন করল। মেটিওর-এর ৩৫০ সিসির ইঞ্জিনটা একবার গর্জে উঠে ধকধক ছন্দে স্থির হলো। হাইওয়ের সেই ধূসর সকালটা এখন ধীরে ধীরে উজ্জ্বল রোদে রূপ নিচ্ছে। মোর্শেদের মনে হলো, এই স্থবির হয়ে বসে থাকা তার জন্য নয়। সে গ্লাভস জোড়া পরে নিল, হেলমেটের ভাইজার নামিয়ে দিয়ে ক্লাচ রিলিজ করল। বাইকটা সামনের অনন্ত পথের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ঢাকার কোলাহল পেছনে ফেলে সে এগিয়ে চলল দাউদকান্দির দিকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শীতের ভোরের সেই আমেজ উবে গিয়ে মাথার ওপর কড়া রোদ চড়তে শুরু করেছে। জ্যাকেটের ভেতর দিয়ে রোদের তেজ এখন পিঠে বিঁধছে। সাধারণ সময়ে মোর্শেদ এই রাইডটা দারুণ উপভোগ করত। হাইওয়ের বাতাস যখন তার বুক চিরে বেরিয়ে যায়, তখন সে এক ধরণের আদিম স্বাধীনতা অনুভব করে। কিন্তু আজ সেই স্বাধীনতা যেন কোথাও একটা শেকলে আটকে আছে।
সে যতবারই বাইকের গতি বাড়াচ্ছে, ততবারই তার মন অবচেতনভাবে বাম পকেটের দিকে চলে যাচ্ছে—যেখানে ফোনটা সাইলেন্ট মুডে রাখা। প্রতিটা সিগন্যালে, প্রতিটা বাঁকে তার মনে হচ্ছে—এই বুঝি ফোনটা কেঁপে উঠল! এই বুঝি সামিনার থেকে একটা মেসেজ এলো!
দাউদকান্দি ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন সে বাইক নিয়ে যাচ্ছে, নিচে মেঘনা নদীর শান্ত নীল জল রোদে চিকচিক করছে। মোর্শেদ এক মুহূর্তের জন্য বাইকের গতি কমাল। এই বিশাল জলরাশি, এই আদিগন্ত বিস্তৃত আকাশ—সবই আজ সামিনার অদেখা অবয়বের কাছে ম্লান মনে হচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞ মোর্শেদ নিজের ওপর বিরক্ত বোধ করল। সে তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। কত নারী তার জীবনে এসেছে, কতবার সে শরীর আর মনের আদান-প্রদান করেছে—কিন্তু কোনো এক ছায়ামানবীর জন্য এমন স্থবির আকুলতা তার পুরুষালি অহংকারে একটু হলেও আঘাত দিচ্ছে।
বেলা দুইটা। রোদের তেজ এখন চরমে। হাইওয়ের পিচ থেকে তাপের হল্কা বের হচ্ছে, যা হেলমেটের ভেতরেও মোর্শেদকে ঘেমে নেয়ে একাকার করে ফেলছে। সে দাউদকান্দির একটা মোড় থেকে বাইকটা ঘোরাল। আর না, সামনে গিয়ে লাভ নেই। তার শরীর এখন ক্লান্ত, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ক্লান্ত তার মন। সামিনা এখনো অফলাইন। সেই যে কাল রাতে সে একটা রহস্যের চাদর বিছিয়ে দিয়ে চলে গেল, তারপর থেকে আর কোনো চিহ্ন নেই।
ফেরার পথটা মোর্শেদের কাছে বড্ড দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর মনে হতে লাগল। যে রাইডিং তাকে মুক্তি দিত, আজ সেই রাইডিং যেন তাকে আরও বেশি নিঃসঙ্গ করে তুলেছে। হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে যখন সে বনানীর দিকে ঢুকছে, তখন শহরের জ্যাম আর মানুষের চিৎকার তার বিরক্তিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
অবশেষে বনানীর সেই পরিচিত ফ্ল্যাটের পার্কিংয়ে সে বাইকটা থামাল। মেটিওর-এর ইঞ্জিনের উত্তাপ তখনো তার উরুর নিচে অনুভূত হচ্ছে, ঠিক যেমন তার মনের ভেতর সামিনাকে নিয়ে জমানো উত্তাপটুকু। সে হেলমেটটা খুলে বাইকের ওপর রাখল। আয়নায় নিজের মুখটা দেখল—ধুলো আর রোদে মুখটা কালচে হয়ে গেছে, চোখের কোণে এক রাশ ক্লান্তি।
লিফটে করে দশতলায় ওঠার সময় সে আবার ফোনটা বের করল। ডাটা কানেকশন অন আছে, কিন্তু নোটিফিকেশন প্যানেলটা একদম খালি। সামিনা এখনো আসেনি। সামিনা তাকে কোনো ছবি পাঠায়নি।
ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই এসির সেই কৃত্রিম ঠান্ডা বাতাস তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু এই আভিজাত্য, এই বিশাল ফ্ল্যাট—সবই এখন তার কাছে একটা খাঁচা মনে হচ্ছে। জ্যাকেটটা সোফার ওপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে বারান্দার দিকে তাকাল। দুপুরের কড়া রোদ জানালার কাঁচ চিরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইছে।
মোর্শেদ এক গ্লাস বরফ মেশানো জল নিয়ে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মনে এক ধরণের তিতকুটে হতাশা দানা বাঁধছে। সে কি সামিনার কাছে কেবল একটা খেলার পুতুল? নাকি সামিনা তাকে এভাবেই অভুক্ত রেখে তার তৃষ্ণাকে আরও তীব্র করতে চায়? পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে এই ধরণের ভার্চুয়াল বিরহ তাকে যেন এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতায় ফেলে দিচ্ছে।
সে চোখ বন্ধ করল। সামিনা তাকে ছবি দেয়নি, কিন্তু তার মনের ক্যানভাসে সামিনা এখন হাজারো রঙে আঁকা এক নিষিদ্ধ মানচিত্র। যে মানচিত্রের প্রতিটি পাহাড়ি বাঁক আর গভীর উপত্যকা সে আজ স্পর্শ করতে চেয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে সে ফিরে এসেছে একরাশ ক্লান্তি আর শূন্যতা নিয়ে।
মোর্শেদ বিড়বিড় করে বলল, “সামিনা, আপনি কি সত্যিই আছেন? নাকি আপনি কেবল আমার এই একাকীত্বের ইকোসিস্টেমের একটা অসুখ?”
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)