06-02-2026, 12:15 PM
অধ্যায় দুই
শব্দের আড়ালে ছায়াশরীর
সকাল ১১টা বেজে দশ মিনিট। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক গলে বনানীর তীব্র রোদ এসে পড়েছে মোর্শেদের বিছানায়। ঘুমের ভেতর থেকে অস্বস্তি নিয়ে সে পাশ ফিরল, কিন্তু রোদের তেজ তাকে আর ঘুমাতে দিল না। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে সাধারণত মানুষের ঘুম ভোরে ভেঙে যায়, কিন্তু মোর্শেদের এই অভ্যাস নেই। তার রাতগুলো শেষ হয় অনেক দেরিতে, তাই দিন শুরু হয় মধ্য-দুপুরে।
আড়মোড়া ভেঙে যখন সে উঠে বসল, তখন মাথাটা বেশ ভারী হয়ে আছে। গতরাতের সেই হুইস্কি আর আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে কাটানো সময়গুলোর রেশ যেন এখনো শিরা-উপশিরায় মিশে আছে। সে আলস্যভরা পায়ে জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিল। বাইরে বনানী ডিওএইচএসের সুশীতল নীরবতা। নিচে তার রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০ কভার দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে ড্রয়ার থেকে মার্লবরোর প্যাকেট আর লাইটারটা বের করল। বাসি মুখে সিগারেটের প্রথম টানে যে ঝাঁঝালো ধোঁয়াটা ফুসফুসে ঢুকল, সেটাই যেন তাকে মনে করিয়ে দিল যে সে এখনো তার নিজের ইকোসিস্টেমে বেঁচে আছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণত গভীর রাতের কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা কথা মানুষকে সকালে তাড়না দেয়, কিন্তু মোর্শেদ এই মুহূর্তে বেশ নিস্পৃহ। কাল রাতে সামিনা নামের সেই রহস্যময়ী নারীর সাথে হওয়া দীর্ঘ কথোপকথন তার মাথায় এই মুহূর্তে তেমন কোনো ঢেউ তুলছে না। বরং সে খুব নির্লিপ্তভাবে তার আজকের দিনটার পরিকল্পনা করতে শুরু করল। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে বসতেই দেখল তার মামা-মামী হয়তো খেয়েদেয়ে নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন । টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে রুটি আর অমলেট। মোর্শেদ নির্বিকারভাবে নাস্তাটা শেষ করল।
নাস্তা শেষে এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি হাতে সে আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো। কফির তিতকুটে স্বাদ জিভে লাগতেই হঠাৎ এক নিমেষে গতরাতের সেই শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে ধাক্কা দিল— "মানুষ চিনে নেওয়া কঠিন"। এতক্ষণ যে স্মৃতিটাকে সে অবদমিত করে রেখেছিল, তা এক তীব্র টানে সামনে চলে এল। মোর্শেদ কফির মগটা টেবিলে রেখে দ্রুত ল্যাপটপটা খুলল। তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী হার্টবিটটা কেন যেন এই মুহূর্তে একটু অনিয়মিত হয়ে উঠছে।
সে সোজা চলে গেল মেসেঞ্জারে। অবচেতন মনে সে আশা করেছিল, হয়তো সামিনার কোনো একটা মেসেজ এসে পড়ে আছে। কিন্তু ইনবক্স একদম ফাঁকা । মোর্শেদ কিছুটা ইতস্তত করে কিবোর্ডে আঙুল রাখল। সে টাইপ করল: "শুভ সকাল। আপনার রঙ আর ক্যানভাসের জগত কি আজ খুব ব্যস্ত? নাকি বাচ্চারা আপনাকে খুব জ্বালাচ্ছে?"
মেসেজটা সেন্ড করার পর সে দেখল পাশে কেবল একটা ধূসর টিক চিহ্ন। অর্থাৎ মেসেজটা সামিনার ফোনে পৌঁছায়নি, সে অনলাইনে নেই। সামিনা বলেছিল সে এক মধ্যবিত্ত কলেজ শিক্ষিকা, হয়তো এই সময়ে সে যাত্রাবাড়ীর কোনো ঘিঞ্জি ক্লাসরুমে বাচ্চাদের আঁকাআঁকি শেখাচ্ছে।
বিরক্ত হয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের সেই 'রাইডার্স গ্রুপ'-এ ঢুকল। তার সেই পাহাড়ি ছবির নিচে কমেন্টের সংখ্যা এখন কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে। সোহেল, রিয়াজরা আরও অনেক চটকদার কথা লিখেছে, তাকে 'লিভিং লিজেন্ড' বলে আকাশচুম্বী প্রশংসা করেছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে কয়েকজনকে উত্তর দিল, কিন্তু কোনোভাবেই সে লেখায় মন বসাতে পারল না। তার চোখ বারবার খুঁজছে সেই আইডিটা—সামিনা জাহান।প্রোফাইল পিকচারে থাকা সেই অন্ধকার জানালার বৃষ্টিভেজা ছবিটা যেন এখন তার সামনে এক প্রকাণ্ড দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে সামিনার ওয়ালে গিয়ে আবার স্ক্রল করতে লাগল। কাল রাতে দেখা সেই আর্টস আর ক্র্যাফটের ছবিগুলো ছাড়া আর কিছুই নতুন নেই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত তথ্য নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে গ্রাস করতে শুরু করল। বনানীর এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। কাল রাতে সে ছিল এই ইকোসিস্টেমের রাজা, আর আজ এক রহস্যময়ী নারীর নীরবতা তাকে এক সাধারণ দাসে পরিণত করেছে। সামিনার কোনো খোঁজ নেই, তার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে মোর্শেদের মনে সংশয় দানা বাঁধল।
আড়মোড়া ভেঙে যখন সে উঠে বসল, তখন মাথাটা বেশ ভারী হয়ে আছে। গতরাতের সেই হুইস্কি আর আধশোয়া হয়ে ল্যাপটপে কাটানো সময়গুলোর রেশ যেন এখনো শিরা-উপশিরায় মিশে আছে। সে আলস্যভরা পায়ে জানালার কাছে গিয়ে পর্দাটা সরিয়ে দিল। বাইরে বনানী ডিওএইচএসের সুশীতল নীরবতা। নিচে তার রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ৩৫০ কভার দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে ড্রয়ার থেকে মার্লবরোর প্যাকেট আর লাইটারটা বের করল। বাসি মুখে সিগারেটের প্রথম টানে যে ঝাঁঝালো ধোঁয়াটা ফুসফুসে ঢুকল, সেটাই যেন তাকে মনে করিয়ে দিল যে সে এখনো তার নিজের ইকোসিস্টেমে বেঁচে আছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, সাধারণত গভীর রাতের কোনো বিশেষ মুহূর্ত বা কথা মানুষকে সকালে তাড়না দেয়, কিন্তু মোর্শেদ এই মুহূর্তে বেশ নিস্পৃহ। কাল রাতে সামিনা নামের সেই রহস্যময়ী নারীর সাথে হওয়া দীর্ঘ কথোপকথন তার মাথায় এই মুহূর্তে তেমন কোনো ঢেউ তুলছে না। বরং সে খুব নির্লিপ্তভাবে তার আজকের দিনটার পরিকল্পনা করতে শুরু করল। বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ডাইনিং টেবিলে বসতেই দেখল তার মামা-মামী হয়তো খেয়েদেয়ে নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছেন । টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে রুটি আর অমলেট। মোর্শেদ নির্বিকারভাবে নাস্তাটা শেষ করল।
নাস্তা শেষে এক মগ কড়া ব্ল্যাক কফি হাতে সে আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো। কফির তিতকুটে স্বাদ জিভে লাগতেই হঠাৎ এক নিমেষে গতরাতের সেই শব্দগুলো তার মস্তিষ্কে ধাক্কা দিল— "মানুষ চিনে নেওয়া কঠিন"। এতক্ষণ যে স্মৃতিটাকে সে অবদমিত করে রেখেছিল, তা এক তীব্র টানে সামনে চলে এল। মোর্শেদ কফির মগটা টেবিলে রেখে দ্রুত ল্যাপটপটা খুলল। তার পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী হার্টবিটটা কেন যেন এই মুহূর্তে একটু অনিয়মিত হয়ে উঠছে।
সে সোজা চলে গেল মেসেঞ্জারে। অবচেতন মনে সে আশা করেছিল, হয়তো সামিনার কোনো একটা মেসেজ এসে পড়ে আছে। কিন্তু ইনবক্স একদম ফাঁকা । মোর্শেদ কিছুটা ইতস্তত করে কিবোর্ডে আঙুল রাখল। সে টাইপ করল: "শুভ সকাল। আপনার রঙ আর ক্যানভাসের জগত কি আজ খুব ব্যস্ত? নাকি বাচ্চারা আপনাকে খুব জ্বালাচ্ছে?"
মেসেজটা সেন্ড করার পর সে দেখল পাশে কেবল একটা ধূসর টিক চিহ্ন। অর্থাৎ মেসেজটা সামিনার ফোনে পৌঁছায়নি, সে অনলাইনে নেই। সামিনা বলেছিল সে এক মধ্যবিত্ত কলেজ শিক্ষিকা, হয়তো এই সময়ে সে যাত্রাবাড়ীর কোনো ঘিঞ্জি ক্লাসরুমে বাচ্চাদের আঁকাআঁকি শেখাচ্ছে।
বিরক্ত হয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের সেই 'রাইডার্স গ্রুপ'-এ ঢুকল। তার সেই পাহাড়ি ছবির নিচে কমেন্টের সংখ্যা এখন কয়েকশ ছাড়িয়ে গেছে। সোহেল, রিয়াজরা আরও অনেক চটকদার কথা লিখেছে, তাকে 'লিভিং লিজেন্ড' বলে আকাশচুম্বী প্রশংসা করেছে। মোর্শেদ যান্ত্রিকভাবে কয়েকজনকে উত্তর দিল, কিন্তু কোনোভাবেই সে লেখায় মন বসাতে পারল না। তার চোখ বারবার খুঁজছে সেই আইডিটা—সামিনা জাহান।প্রোফাইল পিকচারে থাকা সেই অন্ধকার জানালার বৃষ্টিভেজা ছবিটা যেন এখন তার সামনে এক প্রকাণ্ড দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে সামিনার ওয়ালে গিয়ে আবার স্ক্রল করতে লাগল। কাল রাতে দেখা সেই আর্টস আর ক্র্যাফটের ছবিগুলো ছাড়া আর কিছুই নতুন নেই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত তথ্য নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে গ্রাস করতে শুরু করল। বনানীর এই নিঃসঙ্গতা যেন তাকে গিলে খেতে আসছে। কাল রাতে সে ছিল এই ইকোসিস্টেমের রাজা, আর আজ এক রহস্যময়ী নারীর নীরবতা তাকে এক সাধারণ দাসে পরিণত করেছে। সামিনার কোনো খোঁজ নেই, তার বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে মোর্শেদের মনে সংশয় দানা বাঁধল।
সামিনার টাইমলাইনটা মোর্শেদ সারা দিনে অন্তত দশবার স্ক্রল করল। সেখানে রহস্যময়ী এক নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। কিছু জলরঙের ছবি, অর্ধেক আঁকা এক জোড়া চোখ, আর একটা পুরনো ভাঙা জানালার ফ্রেম—ব্যস, এটুকুই। কোনো মানুষের মুখ নেই, কোনো ব্যক্তিগত আড্ডার ছবি নেই, এমনকি কোনো চেক-ইন পর্যন্ত নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা মোর্শেদকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। সামিনা জাহান কি আদৌ কোনো রক্ত-মাংসের মানবী? নাকি কেউ তাকে নিয়ে কোনো সূক্ষ্ম কৌতুক করছে? এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে সে কি শেষ পর্যন্ত কোনো 'ক্যাটফিশ' বা ফেক আইডির ফাঁদে পা দিল? তার মতো একজন ঝানু রাইডার, যে পাহাড় আর সমতলের হাজার হাজার মাইল একাকী পাড়ি দিয়েছে, সে কি সামান্য কিছু শব্দের মায়াজালে আটকা পড়ে গেল?
নিজের ওপর একটা চাপা বিরক্তি নিয়ে মোর্শেদ ফেসবুকের রাইডার্স কমিউনিটি গ্রুপটাতে আবার ঢুকল। এবার সে কেবল সামিনার অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজতে চাইছে। সে সার্চ বক্সে গিয়ে সামিনার নাম লিখে গ্রুপটির ভেতরকার অ্যাক্টিভিটি চেক করতে শুরু করল। কিন্তু ফলাফল সেই শূন্য। সামিনা এই গ্রুপে কোনো পোস্ট দেয়নি, অন্য কারও ছবিতে কোনো কমেন্ট করেনি, এমনকি মোর্শেদের ছবির নিচে ওই একটা মন্তব্য ছাড়া আর কোথাও তার উপস্থিতির চিহ্ন নেই।
মোর্শেদ ভাবতে লাগল, রাইডার্স গ্রুপে সামিনার আসার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? সে তো বাইকার নয়, ট্রাভেলারও নয়। একজন আর্ট টিচার, যার জগত তুলি আর ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ, সে কেন হঠাৎ এমন একটা উগ্র গতির নেশায় বুঁদ হওয়া মানুষের ভিড়ে এসে ভিড়ল? আর এসেই বা কেন সরাসরি মোর্শেদকেই বেছে নিল? সামিনা কি তাকে আগে থেকেই চেনে? নাকি সেও মোর্শেদের মতোই কোনো একাকীত্বের গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পথ চলতে চলতে এখানে এসে ঠেকেছে?
ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। তার মনের ভেতর প্রশ্নের পাহাড় জমছে। সে নিজের মনেই ঠিক করে নিল, সামিনার সাথে যদি আবার কথা বলার সুযোগ হয়, তবে সবার আগে এই প্রশ্নটাই সে করবে—"সামিনা, এই অচেনা গতির দুনিয়ায় আপনার প্রবেশের কারণটা ঠিক কী ছিল?"
মেসেঞ্জারের সেই ধূসর টিক চিহ্নটা এখনো নীল হয়ে ওঠেনি। সামিনা এখনো অফলাইন। মোর্শেদ কফির মগের তলানিতে জমে থাকা ঠান্ডা তিতকুটে তরলটুকু এক চুমুকে শেষ করল। সামিনার এই রহস্যময় নীরবতা তাকে যতটা না বিচলিত করছে, তার চেয়ে বেশি করছে আকর্ষিত। সে বুঝতে পারছে, এই ছায়া শরীরী নারীর রহস্য ভেদ না করা পর্যন্ত তার রাতের ঘুম আর দুপুরের শান্তি—দুই-ই এখন থেকে অনিশ্চিত।
মোর্শেদ ভাবতে লাগল, রাইডার্স গ্রুপে সামিনার আসার উদ্দেশ্য কী হতে পারে? সে তো বাইকার নয়, ট্রাভেলারও নয়। একজন আর্ট টিচার, যার জগত তুলি আর ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ, সে কেন হঠাৎ এমন একটা উগ্র গতির নেশায় বুঁদ হওয়া মানুষের ভিড়ে এসে ভিড়ল? আর এসেই বা কেন সরাসরি মোর্শেদকেই বেছে নিল? সামিনা কি তাকে আগে থেকেই চেনে? নাকি সেও মোর্শেদের মতোই কোনো একাকীত্বের গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে পথ চলতে চলতে এখানে এসে ঠেকেছে?
ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মোর্শেদের কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। তার মনের ভেতর প্রশ্নের পাহাড় জমছে। সে নিজের মনেই ঠিক করে নিল, সামিনার সাথে যদি আবার কথা বলার সুযোগ হয়, তবে সবার আগে এই প্রশ্নটাই সে করবে—"সামিনা, এই অচেনা গতির দুনিয়ায় আপনার প্রবেশের কারণটা ঠিক কী ছিল?"
মেসেঞ্জারের সেই ধূসর টিক চিহ্নটা এখনো নীল হয়ে ওঠেনি। সামিনা এখনো অফলাইন। মোর্শেদ কফির মগের তলানিতে জমে থাকা ঠান্ডা তিতকুটে তরলটুকু এক চুমুকে শেষ করল। সামিনার এই রহস্যময় নীরবতা তাকে যতটা না বিচলিত করছে, তার চেয়ে বেশি করছে আকর্ষিত। সে বুঝতে পারছে, এই ছায়া শরীরী নারীর রহস্য ভেদ না করা পর্যন্ত তার রাতের ঘুম আর দুপুরের শান্তি—দুই-ই এখন থেকে অনিশ্চিত।
কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভাবে সিগারেট খাওয়ার পর হুট করে মোর্শেদ খেয়াল করল, তার সামিনাকে পাঠানো মেসেজটা রিসিভড হয়েছে। কিন্তু সামিনা সেটির রিপ্লাই করা তো পরের কথা, দেখেও নি। একটা চাপা রাগ আর অপমান বোধ মোর্শেদ কে গ্রাস করল। অনলাইনে এসে চলেও গেল, অথচ রিপ্লাই ও করল না? রাগতভাবেই বাইক এর চাবিটা হাতে নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার দিকে এগোলো মোর্শেদ। গতি ছাড়া আর কোনওভাবে এই আগুন নিভবে না।
সামিনার জীবনের ইকোসিস্টেম মোর্শেদের থেকে একদম আলাদা। এখানে বিলাসবহুল একাকীত্বের কোনো অবকাশ নেই, আছে মধ্যবিত্তের হিসেবী আর হাঁপিয়ে ওঠা ব্যস্ততা। সকাল সাড়ে ছয়টায় অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। ডিভোর্সি মেয়ে হিসেবে বাপের বাড়িতে থাকার কিছু অলিখিত নিয়ম আছে। সংসারে নিজের জায়গাটা অটুট রাখতে তাকে সারাক্ষণই এক ধরণের তটস্থ অবস্থায় থাকতে হয়। অসুস্থ মায়ের পথ্য তৈরি থেকে শুরু করে সকালের নাস্তা—সবটাই সামিনাকে করতে হয় কলেজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনেক আগে।
সামিনার জীবনের ইকোসিস্টেম মোর্শেদের থেকে একদম আলাদা। এখানে বিলাসবহুল একাকীত্বের কোনো অবকাশ নেই, আছে মধ্যবিত্তের হিসেবী আর হাঁপিয়ে ওঠা ব্যস্ততা। সকাল সাড়ে ছয়টায় অ্যালার্ম বাজার আগেই তার ঘুম ভেঙে যায়। ডিভোর্সি মেয়ে হিসেবে বাপের বাড়িতে থাকার কিছু অলিখিত নিয়ম আছে। সংসারে নিজের জায়গাটা অটুট রাখতে তাকে সারাক্ষণই এক ধরণের তটস্থ অবস্থায় থাকতে হয়। অসুস্থ মায়ের পথ্য তৈরি থেকে শুরু করে সকালের নাস্তা—সবটাই সামিনাকে করতে হয় কলেজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার অনেক আগে।
সকালবেলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সামিনা যখন নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিল, তখন তার মাথায় গতরাতের কোনো স্মৃতিই সেভাবে ভিড় করেনি। বরং মনে মনে সে মিলিয়ে নিচ্ছিল দুপুরের টিফিনে কী নেবে আর আজ কোন ক্লাসে কী পড়াবে। তার জগতটা খুব সীমাবদ্ধ—কলেজের ক্লাসরুম, ছাত্রছাত্রীদের শোরগোল আর বাড়ির কিছু নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। ড্রয়ার থেকে শাড়ি বের করে পরার সময় সে একবারও ফোনের দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করল না। তার ফোনটা এখন কেবলই যোগাযোগের একটা যন্ত্র, নেশা নয়।
ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে সে যখন যাত্রাবাড়ীর জ্যাম আর ধুলোবালির মধ্যে দিয়ে কলেজের পথে রওনা হলো, তখনো সে একবারের জন্যও ইন্টারনেট অন করেনি। সামিনা জানে, একবার অনলাইন হওয়া মানেই এক অদৃশ্য জগতের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়া। আর সেই জগতে মোর্শেদের মতো মানুষেরা শব্দের মায়াজাল বিছিয়ে রাখে। সামিনা সেই মায়ায় এখনই পা দিতে চায় না।
কলেজে পৌঁছানোর পর থেকেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। স্টাফ রুমে সহকর্মীদের সাথে টুকটাক কথা আর ক্লাসে ক্লাসে ঘুরে বেড়ানো। দুপুরের দিকে চতুর্থ শ্রেণির একটি আর্ট ক্লাস ছিল। সামিনা আজ ঠিক করেছিল বাচ্চাদের খুব সাধারণ কিছু আঁকা শেখাবে। ক্লাসরুমে ঢুকে সে চকের ডাস্টার হাতে ব্ল্যাকবোর্ডটা পরিষ্কার করল। আজ তার শেখানোর কথা ছিল একটি রিকশা।
বোর্ডে চক ঘষতে ঘষতে সামিনা হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তার অবচেতন মনের গভীর কোনো কোণ থেকে গতরাতের সেই রাইডার মিস্টার মোর্শেদের গলার স্বর যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। বিশেষ করে মোর্শেদের সেই বাইকের বর্ণনা। চক চলতে লাগল অবাধ্যের মতো। সামিনা রিকশার চাকা আঁকতে গিয়ে খেয়ালই করল না যে সে হ্যান্ডেলের জায়গায় রিকশার পরিবর্তে একটু চওড়া, ক্রোম ফিনিশড ক্রুইজার বাইকের হ্যান্ডেল এঁকে ফেলছে।
রিকশার সেই চিরচেনা হুড বা বসার সিটের বদলে বোর্ডের ওপর ফুটে উঠল একটা ভারি ৩৫০ সিসির পেশিবহুল ইঞ্জিনের আদল। চকের সাদা রেখাগুলো যেন এক অদ্ভুত গতিময়তা খুঁজে পাচ্ছিল। সামিনা যখন মগ্ন হয়ে বাইকের ফুয়েল ট্যাঙ্কের কার্ভটা ফুটিয়ে তুলছে, ঠিক তখনই ক্লাস ক্যাপ্টেন রাফসান পেছন থেকে অবাক হয়ে বলে উঠল, "ম্যাম, এটা তো রিকশা হলো না! এটা তো একদম বাইকের মতো লাগছে। ঐ যে বড় বড় রাজকীয় বাইকগুলো থাকে না? ঠিক তেমন!"
সামিনার হাতের চকের টুকরোটা মেঝেতে পড়ে দু’টুকরো হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়িয়ে বোর্ডের দিকে তাকাল। নিজের অজান্তেই সে বোর্ডে এঁকে ফেলেছে একটি রয়্যাল এনফিল্ড—ঠিক মোর্শেদ যেমনটা বর্ণনা করেছিল। ক্লাসের বাচ্চারা সবাই হোহো করে হেসে উঠল। সামিনা যেন নিজের মনের এক গোপন চুরিতে হাতে-নাতে ধরা পড়ে গেছে। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত সঙ্কোচ আর লজ্জা খেলা করতে লাগল।
সে দ্রুত ডাস্টার দিয়ে ড্রয়িংটা মুছতে শুরু করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে মিটিমিটি লাজুক হাসি। এই বয়সে এসে এমন বালখিল্য আচরণ সামিনা নিজেই নিজের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারছিল না। কেন একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের শখের বাহন তার মনের ক্যানভাসে এভাবে জায়গা দখল করে নিল? কেন সে আঁকতে গিয়ে রিকশার হাতলের বদলে হাইওয়ের সেই ক্রুইজার বাইকের গতিকে কল্পনা করে ফেলল?
বিকেলের দিকে যখন ক্লাস শেষ হলো, তখনও সামিনার ফোনের ডাটা অফ। সে জানে না বনানীর কোনো এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে একজন মানুষ তার নীল ডটটার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠছে। সে জানে না মোর্শেদ তার পুরো প্রোফাইল অন্তত দশবার তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছে। সামিনা চায় এই রহস্যটা আরও কিছুটা দীর্ঘ হোক। হাইওয়ের নীল জ্যামিতিতে যেমন বাঁক থাকে, তাদের এই সম্পর্কের বাঁকগুলোও যেন সেভাবেই লুকানো থাকে।
কলেজ থেকে ফেরার পথে বাসের জানালা দিয়ে জ্যামের দিকে তাকিয়ে সামিনা আবার নিজের মনেই হাসল। রিকশা আঁকতে গিয়ে বাইক এঁকে ফেলার সেই ঘটনাটা তাকে এক বিচিত্র আনন্দ দিচ্ছে। সে ভাবছে, যদি কখনও মোর্শেদকে এই ঘটনাটা বলা হয়, সে কি হাসবে? নাকি সেও অবাক হয়ে ভাববে যে সামিনার মতো এক শান্ত স্বভাবের কলেজ শিক্ষিকাও তার গতির নেশায় কিছুটা হলেও আক্রান্ত হয়েছে?
বাসের ভিড় আর যাত্রাবাড়ীর ধোঁয়ার মাঝে সামিনা নিজেকে খুব নিরাপদ মনে করতে লাগল, যেন এই সাধারণ জীবনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার আসল স্বাধীনতা।
সন্ধ্যার আকাশটা আজ কেমন যেন ঘোলাটে, ঠিক মোর্শেদের মনের অবস্থার মতো। বনানীর আভিজাত্য ছেড়ে সে তার মেটিওর নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। নিকুঞ্জের রেললাইনের ধারে একটা ঘিঞ্জি, বস্তিমতো এলাকা—যেখানে নাগরিক সভ্যতার চাকচিক্য এসে থমকে দাঁড়ায়। এখানে একটা পুরনো ঝুপড়ি চায়ের দোকান আছে, যেটার মালিক খলিল। খলিলের এই টং দোকানটাই মোর্শেদের গোপন আস্তানা। রাইডার কমিউনিটির সেই ‘লিভিং লিজেন্ড’ এখানে স্রেফ একজন সাধারণ খদ্দের।
মোর্শেদ দোকানের এক কোণে রাখা নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসল। সন্ধ্যার এই আলো-আঁধারিতে চারপাশের পরিবেশটা বড় বেশি অসংলগ্ন মনে হচ্ছে। সাধারণত এই সময় তার সাগরেদ বা পরিচিত ছোট ভাইয়েরা এসে ভিড় করে, কিন্তু আজ এখনো কেউ আসেনি। মোর্শেদের ভেতরটা আজ কেমন যেন হাহাকার করছে। গতরাতের সেই আলাপ আর আজকের সারাদিনের নীরবতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, আজ শুধু হুইস্কি বা মার্লবোরোর ধোঁয়ায় কাজ হবে না। তার স্নায়ুগুলো আজ আরও গাঢ় কিছু চাইছে।
খলিল নিঃশব্দে মোর্শেদের হাতে এক চিমটি কালো কুচকুচে গাঁজা আর একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে গেল। মোর্শেদ জানে, তার এই উচ্চবিত্ত ইকোসিস্টেমে সে একজন সফল মানুষ, কিন্তু এই ঝুপড়ির অন্ধকারে সে একজন পলাতক আসামি। নিজের একাকীত্ব থেকে পলাতক। সে নিপুণ হাতে সিগারেটটা থেকে তামাক বের করে গাঁজাটুকু ভরে নিল। আগুনের ছোঁয়ায় যখন প্রথম টানটা দিল, তখন চারপাশের শব্দগুলো যেন মন্থর হতে শুরু করল।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকে মোর্শেদ একবারও ফোনের নেট অন করেনি। এক ধরণের ইগো কাজ করছিল তার ভেতর—সামিনা আগে মেসেজ না দিলে সেও করবে না। কিন্তু এখন তার এক বন্ধুকে জরুরি একটা ফোন করা দরকার, একাকিত্বে ভুগছে সে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল।
নেট অন করার সাথে সাথেই ফোনের নোটিফিকেশন বারটা যেন পাগল হয়ে উঠল। একের পর এক গ্রুপ মেসেজ আর ইমেইল। কিন্তু সেই সব কোলাহলের মাঝে ‘টুং’ করে একটা শব্দ কানে বাজল—মেসেঞ্জারের সেই পরিচিত টোন। মোর্শেদের হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, তারপর প্রচণ্ড বেগে ধকধক করতে শুরু করল।
বন্ধুকে ফোন করার কথা সে বেমালুম ভুলে গেল। কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে ইনবক্সটা খুলল। দেখল, সামিনার সেই অন্ধকার জানালার প্রোফাইল পিকচারটার পাশে সবুজ বাতি জ্বলছে, আর নিচে একটা মেসেজ ঝিলিক দিচ্ছে। মোর্শেদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে এসে একটা সাধারণ টেক্সট মেসেজ তাকে এভাবে তছনছ করে দেবে, তা সে কল্পনাও করেনি।
সে মেসেজটা ওপেন করল। সামিনা লিখেছে: “দুঃখিত মিস্টার রাইডার, আজ সারাদিন ক্যানভাস আর বাস্তবের রঙ মেলাতে গিয়ে ফোনের কথা মনেই ছিল না। আর আপনার সকালের মেসেজের উত্তর? আমার বাচ্চাদের নিয়ে আমি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে আপনার ওই গতির জগতটা আমার কাছে আজ মরীচিকা মনে হচ্ছিল। তবে একটা মজার কান্ড হয়েছে আজ, শুনলে হয়তো আপনি হাসবেন।”
গাঁজার ধোঁয়া আর সামিনার শব্দের মায়া—দুটো মিলে মোর্শেদের চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। নিকুঞ্জের এই নোংরা বস্তির কোণে বসে মোর্শেদের মনে হলো, সে যেন এক বিশাল নীল জ্যামিতির কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে, যার প্রতিটি বাহু তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওই রহস্যময়ী নারীর দিকে। সে টাইপ করতে গিয়েও থেমে গেল। তার আঙুলগুলো কাঁপছে। মোর্শেদ বুঝতে পারছে, সে আজ থেকে আর কেবল রাস্তার রাইডার নেই, সে এখন সামিনার শব্দের গোলকধাঁধায় পথ হারানো এক পথিক।
চায়ের দোকানের ঝাপসা আলোয় মোর্শেদ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওখানেই সামিনার ছায়া শরীরটা লুকিয়ে আছে। সে লিখল, “কী সেই মজার কাণ্ড? আমি কি শুনতে পারি?”
বাইরে তখন রাতের ঢাকা তার নিজস্ব রূপ ধারণ করছে, কিন্তু মোর্শেদের পৃথিবীটা এখন স্রেফ ওই কয়েক ইঞ্চির স্ক্রিনে বন্দি।
নিকুঞ্জের সেই ঘিঞ্জি গলির ঝুপড়ি দোকানে তখন গাঁজার ধোঁয়া আর সস্তা চায়ের গন্ধ মিলেমিশে একাকার। মোর্শেদ তার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই ছোট কাঁচের আড়ালে অন্য কোনো গ্রহের সন্ধান পাওয়া যাবে। সামিনার টাইপ করা প্রতিটি শব্দ তার মগজে এক ধরণের ঝংকার তুলছে।
সামিনা লিখল, "শুনুন মিস্টার রাইডার, আজ কলেজে বাচ্চাদের ড্রয়িং ক্লাসে আমি যা করেছি, সেটা আমার ৩৮ বছরের জীবনে এক বিরল ঘটনা। বাচ্চাদের রিকশা আঁকা শেখাতে গিয়ে আমি ব্ল্যাকবোর্ডে মস্ত বড় একখানা বাইক এঁকে ফেলেছি! রিকশার সেই নিরীহ হাতলের বদলে আপনার ওই ক্রুজার বাইকের সেই বাঁকানো হ্যান্ডেলবার আর ফুয়েল ট্যাঙ্ক কখন যে আমার চকের নিচে ফুটে উঠেছে, আমি নিজেও জানি না। ক্লাস ক্যাপ্টেন ধরিয়ে না দিলে আমি হয়তো ওটাকেই রিকশা বলে চালিয়ে দিতাম!"
মোর্শেদ শব্দ করে হেসে উঠল। নিকুঞ্জের এই অন্ধকার আস্তানায় তার এই হাসিটা বেশ বেমানান শোনাল। আশেপাশে দুই-একজন কৌতূহলী চোখে তাকাল, কিন্তু মোর্শেদের সেদিকে খেয়াল নেই। সে দ্রুত টাইপ করল, "বলেন কী! তার মানে আপনি কি অবচেতন মনে আমার মেটিওর-এর প্রেমে পড়ে গেলেন? নাকি রাইডারের?"
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)