05-02-2026, 11:19 AM
প্রথম অধ্যায়ঃ একাকীত্বের ইকোসিস্টেম
রাত বারোটা বেজে দশ। ঢাকার বনানীর ফ্ল্যাটের দশতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মোর্শেদ তার তৃতীয় সিগারেটটা ধরাল। সামনের প্যানোরামিক উইন্ডো দিয়ে রাতের ঢাকা শহরটাকে একটা বিশাল আলোকোজ্জ্বল ক্যানভাস মনে হয়, কিন্তু মোর্শেদের কাছে এটা কেবলই কংক্রিটের জঙ্গল।
নিচে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তার ৩৫০ সিসির রয়্যাল এনফিল্ড মেটিওর ক্রুজার বাইকটা কভার দিয়ে ঢাকা অবস্থায় পড়ে আছে—ঠিক যেন এক ঘুমন্ত শিকারী। পঁয়তাল্লিশ বছরের মোর্শেদের জীবনে এই বাইকটা কেবল একটা বাহন নয়, এটা তার মুক্তি। পাঁচ বছর আগে যখন তার দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘটেছিল, তখন এই ঘরটা এক অদ্ভুত নীরবতায় ডুবে গিয়েছিল। শুরুতে সেই নীরবতা তাকে গিলতে আসত, কিন্তু এখন সে এটাতেই অভ্যস্ত। এখন তার নিজস্ব একটা 'ইকোসিস্টেম' গড়ে উঠেছে—যেখানে কড়া কফি, কখনও হুইস্কির ধক, মার্লবরো রেড এর ধোঁয়া আর মাঝরাতে হাইওয়ের নির্জনতায় বাইকের গতির গর্জনই প্রধান অনুষঙ্গ।
সেদিন বন্ধুদের আড্ডা থেকে ফিরে মোর্শেদ ফেসবুকের সেই জনপ্রিয় 'রাইডার্স গ্রুপে' নিজের একটা পাহাড়ি ভ্রমণের ছবি পোস্ট করল। কুয়াশা ঘেরা বান্দরবানের রাস্তায় তার দানবীয় বাইকটার সেই ছবিটার নিচে মুহূর্তেই রিঅ্যাকশন আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল।
কমেন্ট বক্সে স্ক্রল করতে করতে মোর্শেদের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। রাইডার্স কমিউনিটিতে তার নামটা গত কয়েক বছরে বেশ ভারি হয়েছে। ছোট ভাইদের কাছে সে এক 'লিভিং লিজেন্ড'—যে সংসার বা সামাজিকতার মায়া কাটিয়ে দুই চাকার ওপর জীবনকে খুঁজে নিয়েছে।
প্রথম কমেন্টটা সোহেলের। গত বছর সাজেক ট্রিপে ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল। ও লিখেছে, “বস, আপনি একাই একশো! আমাদের মত ফ্যামিলি ম্যানদের কাছে আপনি এক একটা দীর্ঘশ্বাস। কবে বেরোচ্ছেন আবার?”
নিচে রিয়াজ যোগ করেছে, “মোর্শেদ ভাই মানেই তো ফ্রিডম। আপনার এই মেটিওরটা যখন নীলগিরির বাঁকে কাত হয়, তখন মনে হয় পাহাড়টাও আপনার প্রেমে পড়ে গেছে! স্যালুট বস!”
আরেকজন একটু রসিকতা করে লিখেছে, “ভাই, সলো রাইডিং তো অনেক হলো। এবার পেছনে কাউকে বসিয়ে একটা ‘কাপল গোল’ সেট করেন না!”
মোর্শেদ আলতো করে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে চোখ রাখল। অ্যাশট্রেতে আগের সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা গুঁজে দিয়ে পকেট থেকে বের করল নতুন একটা মার্লবরো রেড। ফ্লিন্ট জ্বালিয়ে গভীর একটা টান দিল সে। ধোঁয়াটা ফুসফুসে আটকে রেখে জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে রইল। কাঁচের প্রতিচ্ছবিতে নিজের পঁয়তাল্লিশ বছরের মুখটা আবছা দেখা যাচ্ছে। দাড়িগুলো কাঁচাপাকা, চোখের নিচে সামান্য কালচে আভা। একেই হয়তো লোকে 'ম্যাচিউরড লুক' বলে প্রশংসা করে, কিন্তু মোর্শেদ জানে এর পেছনে কতগুলো বিনিদ্র রাত জমা আছে।
সিলিং ফ্যানের মৃদু ঘূর্ণন আর এসির গুঞ্জনের মাঝে ঘরটা আবার সেই চেনা নিস্তব্ধতায় ভরে উঠল। এই ইকোসিস্টেমে সে রাজা, কিন্তু মাঝে মাঝে এই সিংহাসনটা খুব বেশি ঠান্ডা মনে হয়। টেবিলে রাখা ক্রিস্টাল গ্লাসের তলায় জমে থাকা হুইস্কির হলদেটে দাগটার দিকে চোখ গেল তার। মনে মনে ভাবল, “আজ কি আরেক পেগ হবে? নাকি শরীরের ওপর আর অত্যাচার না করে কালকের ট্যুরের ম্যাপটা দেখব?”
সে জানে, এক গ্লাস হুইস্কি হয়তো আজকের একাকিত্বের তীক্ষ্ণতা কমিয়ে আনবে, কিন্তু কাল ভোরে বাইকের ক্ল্যাচ ছাড়ার সময় যে একাগ্রতা দরকার, সেটা হয়তো শিথিল হয়ে যাবে। গ্লাসের পাশের আধখোলা বোতলটা তাকে প্রলুব্ধ করছিল। অ্যালকোহলের সেই বিশেষ গন্ধটা ঘরময় ভাসছে, যা ইদানীং তার পারফিউমের চেয়েও বেশি আপন।
মোর্শেদ ল্যাপটপটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই একটা নোটিফিকেশন তার মনোযোগ কেড়ে নিল।
আইডির নাম 'সামিনা জাহান'। প্রোফাইল পিকচারে কোনো মানুষের চেহারা নেই, কেবল একটা অন্ধকার জানলা দিয়ে বৃষ্টির ঝাপটা আসার ছবি। কমেন্টটা ছিল ছোট কিন্তু তীক্ষ্ণ—
"পাহাড়ের এই বাঁকে বৃষ্টির সময় বাইক চালানো কি খুব বেশি বিপজ্জনক নয়?"
মোর্শেদ সাধারণত অচেনা মানুষের কমেন্টে রিপ্লাই দেয় না। কিন্তু এই প্রশ্নটার মধ্যে এক ধরণের প্রচ্ছন্ন মায়া বা আগলে রাখার সুর ছিল, যা তাকে অবাক করল। সে কিবোর্ডে আঙুল ছোঁয়াল —
"বিপজ্জনক তো বটেই, তবে ওই বিপদের মধ্যেই আসল নেশা লুকিয়ে আছে। জীবনটা তো এমনিতেই অনেকটা খাদের কিনারে চলা।"
কমেন্টটা করে মোর্শেদ ভাবতে থাকল, এই গ্রুপে এইটা কি সত্যিই মেয়ে? নাকি ফেইক আইডি? বাংলাদেশে ফিমেল রাইডার নেই বললেই চলে। কি মনে করে মোর্শেদ যা করে না কখনও তাই করে বসল, একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। দু মিনিট পরই ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করে ওপাশ থেকে মেসেজ এলো -
সামিনা: "নেশা কি শুধু গতিতে? নাকি নিজের একাকীত্বকে পেছনে ফেলে আসার চেষ্টায় মানুষ পাহাড়ে ছোটে?"
মোর্শেদ সিগারেটের শেষ অংশটা অ্যাশট্রেতে পিষে দিল। উত্তরটা দিতে তার একটু সময় লাগল। মেসেঞ্জারে টাইপিং ডটগুলো বার বার উঠছে আর নামছে।
মোর্শেদ: "একাকীত্ব কি অত সহজে পেছনে ফেলা যায়? ওটা তো ছায়ার মতো সাথে ঘোরে। আপনি হঠাৎ এই কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন?"
সামিনা: "কারণ আমার মনে হলো, ওই পাহাড়ী কুয়াশার ভেতরে আপনার বাইকের হেডলাইটের আলোটা আসলে কাউকে খুঁজছে। হয়তো নিজেকেই।"
মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে গেল। ওপারে থাকা মানুষটি তাকে চেনে না, দেখেওনি, অথচ প্রথম আলাপে সে তার মনের সেই দেয়ালটা চিনে ফেলেছে যা মোর্শেদ গত পাঁচ বছর ধরে সযত্নে গড়ে তুলেছিল।
সামিনা: "বিরক্ত করছি না তো? আসলে রাতগুলো মাঝে মাঝে বড্ড লম্বা মনে হয়। বিশেষ করে যখন চারপাশের দেওয়ালগুলো কথা বলতে শুরু করে।"
মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারল, এই রাতের ইকোসিস্টেমে সে আর একা নয়। ওপারে আরও একজন নিঃসঙ্গ মানুষ তার মতো করেই অস্তিত্বের লড়াই করছে। সে টাইপ করল—
মোর্শেদ: "না, বিরক্ত নই। বরং মনে হচ্ছে অনেকদিন পর কেউ একজন ঠিক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আপনার দেয়ালগুলো কি খুব বেশি অভিযোগ করে? নাকি ওগুলোও আমার মতো কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে?"
সামিনা: (খানিকটা সময় নিয়ে উত্তর এল) “অভিযোগ করার বয়স তো পার করে এসেছি মোর্শেদ সাহেব। এখন দেয়ালগুলো কেবল প্রশ্ন করে। যেমন ধরুন, এই যে মধ্যরাতে একজন অপরিচিত রাইডারের সাথে আমি জীবনের দর্শন নিয়ে আলাপ করছি—এটা কি একাকীত্ব, নাকি স্রেফ কৌতূহল?”
মোর্শেদ একটা মুচকি হাসি হাসল। মেয়েটির কথায় ধার আছে, আবার একটা মখমলে আবরণও আছে। সে লিখল—
মোর্শেদ: “কৌতূহল তো বিপজ্জনক। বিশেষ করে যদি সেই কৌতূহল একজন বাইকারের প্রতি হয়। আমরা কিন্তু খুব একটা সুবিধার মানুষ নই। বাতাসের টানে উধাও হয়ে যাওয়া আমাদের স্বভাব।”
সামিনা: “উধাও হওয়া তো এক ধরণের আর্ট। সবাই পারে না। তবে আপনার প্রোফাইল তো বলছে আপনি কেবল বাতাসের টানে ছোটেন না, আপনি আপনার মেটিওর ৩৫০-এর গর্জনে নিজের হাহাকার ঢাকতে পছন্দ করেন। এই যে আপনি এখন সিগারেট খাচ্ছেন, আপনার কি মনে হয় না ধোঁয়ার ওই কুণ্ডলীগুলো আপনার না বলা কথাগুলোর চেয়েও বেশি স্পষ্ট?”
মোর্শেদ চমকে উঠল। সে আসলেও তখন একটা নতুন সিগারেট ধরিয়েছে।
মোর্শেদ: “আপনি কি জ্যোতিষী? নাকি আমার জানালার বাইরে ল্যাম্পপোস্টে বসে আড়ি পাতছেন? আমার সিগারেট খাওয়ার খবর আপনি জানলেন কী করে?”
সামিনা: “জ্যোতিষী নই, তবে মানুষের নিঃসঙ্গতার একটা গন্ধ থাকে। যারা এই ইকোসিস্টেমে বাস করে, তারা একে অপরের নিঃশ্বাস টের পায়। আর ল্যাম্পপোস্টে বসার মতো বয়স বা শরীর—কোনোটাই আমার নেই। ৩৮ বছরের একজন নারী ল্যাম্পপোস্টে বসলে সেটা বড়জোর একটা কমেডি সিন হতে পারে।”
মোর্শেদ: “৩৮? আপনি তো তাহলে বেশ অল্পবয়সী। পঁয়তাল্লিশের এই বুড়োকে তো আপনি চাইলে এখন থেকেই ‘আঙ্কেল’ বলে সম্মোধন করতে পারেন। তাতে অন্তত আপনার কৌতূহলটা একটু নিরাপদ দূরত্বে থাকবে।”
সামিনা: “আঙ্কেল? (একটা হাসির ইমোজি এল) রাইডারদের কোনো বয়স হয় না মোর্শেদ সাহেব। তাদের থাকে শুধু সিসি আর মাইলেজ। আর পঁয়তাল্লিশ বছর তো পুরুষের জন্য স্রেফ একটা ‘ক্লাসিক’ বয়স। যেমন আপনার বাইকটা—যতই পুরনো মডেল হোক, রাস্তার ধুলো ওড়াতে তার জুড়ি নেই।”
মোর্শেদ এবার একটু নড়েচড়ে বসল। কথাগুলো বেশ মিষ্টি অথচ তীরের মতো বিঁধছে।
মোর্শেদ: “আপনার কথার প্যাঁচ বেশ মারাত্মক। বুঝতে পারছি না এটা কি প্রশংসা নাকি সাবলীল ফ্লার্টিং। তবে এই বয়সে এসেও কেউ যদি ‘ক্লাসিক’ বলে ডাক দেয়, তবে সেটা অগ্রাহ্য করার মতো ক্ষমতা আমার অন্তত নেই।”
সামিনা: “ফ্লার্টিং? আপনি কি মাঝরাতে সব অপরিচিত মহিলার মেসেজেই ফ্লার্টিং খুঁজে পান? নাকি আপনার অবচেতন মন চাইছে কেউ একজন আপনাকে একটু অন্যভাবে দেখুক? বাইকের গিয়ার বদলানো সহজ মোর্শেদ সাহেব, কিন্তু মনের গিয়ার বদলানো অনেক কঠিন।”
মোর্শেদ কিবোর্ড থেকে আঙুল সরিয়ে নিল। সামিনার প্রতিটি শব্দ যেন এই অন্ধকার ঘরের ভেতর ইকো করছে। সে একটা নতুন সিগারেট ধরাল। জানালার কাঁচের ওপাশে বনানী ডিওএইচএস-এর শুনশান রাস্তা। দূরে এয়ারপোর্ট রোডের দিকে কোনো একটা ভারি ট্রাকের চাকা ঘষার শব্দ নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে গেল। মোর্শেদ ধোঁয়া ছাড়ল, ঘরের নীলচে আলোয় সেই ধোঁয়াগুলো দলা পাকিয়ে যাচ্ছে।
মোর্শেদ: “মনের গিয়ার শিফট করার মেকানিক্সটা আমার জানা নেই সামিনা। তবে আমি সাধারণত সোজা পথেই চলি। বনানী ডিওএইচএসের এই নিরিবিলি ব্লকে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি তো, তাই হয়তো শব্দের মারপ্যাঁচ খুব একটা বুঝি না। আপনি কি এই শহরেরই বাসিন্দা?”
সামিনা: “আমি শহরের অন্য প্রান্তের মানুষ। যে প্রান্তে রাত কোনোদিন ঘুমায় না। যাত্রাবাড়ীর জ্যাম আর হট্টগোলের মধ্যে আমার বাস। আপনার মতো ডিওএইচএসের রাজকীয় আভিজাত্য আমার জানালায় এসে লাগে না। সেখানে কেবল বাসের হর্ন আর মানুষের কোলাহল।”
মোর্শেদ ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সে জানে বনানীর এই দশতলা বিল্ডিংটা তার কাছে একটা নিঃসঙ্গ দুর্গ। ১৬টি ফ্ল্যাট থেকে মাসে চার লাখ টাকার মতো ভাড়া আসে, সাথে বেইলি রোডের দোকানটার আয়। তার কোনো অফিস যাওয়ার তাড়া নেই, বসের ঝাড়ি নেই। এই অলস প্রাচুর্যই তাকে অকাল বার্ধক্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না, তা সে জানে না।
মোর্শেদ: “যাত্রাবাড়ী? তার মানে তো আপনি বেশ লড়াকু মানুষ। আমাদের এই ডিওএইচএসের নীরবতা কিন্তু মাঝে মাঝে খুব ভীতিজনক। বড় মস্ত বড় বাড়ি, কিন্তু কথা বলার মানুষ নেই। আমার এই ঘরে কেবল এক দূর সম্পর্কের মামা আর মামী থাকেন। তারা নিজেদের জগত নিয়ে ব্যস্ত, আমি আমার। আপনার পরিবারে নিশ্চয়ই অনেক মানুষ?”
সামিনা: “হ্যাঁ, আমি আমার বাবা-মায়ের সাথেই থাকি। তবে আমার জগতটা একটু অন্যরকম। চারুকলায় পড়েছিলাম, রঙ আর ক্যানভাস নিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখন যাত্রাবাড়ীর একটা ছোট কলেজে বাচ্চাদের আর্ট শেখাই। খুব সামান্য বেতন, হয়তো আপনার বাইকের এক মাসের মেইনটেন্যান্স খরচও তার চেয়ে বেশি। তবুও দিন শেষে বাচ্চাদের খাতার ওই কাঁচা হাতের আঁকিবুকিগুলো দেখে মনে হয়, জীবনটা হয়তো একদম বৃথা নয়।”
মোর্শেদ টাইপ করতে গিয়ে থামল। সামিনার কথায় কোনো আক্ষেপ নেই, বরং এক ধরণের সতেজতা আছে। সে ভাবল, যে মেয়েটার বেতন তার একদিনের হাতখরচের সমান হতে পারে, তার মনটা কত বেশি স্বচ্ছ। মোর্শেদের জীবনে টাকার অভাব নেই, কিন্তু সামিনার মতো ওই ছোট ছোট আনন্দগুলোও নেই।
মোর্শেদ: “টাকা দিয়ে কি আর জীবনের মানে খুঁজে পাওয়া যায় সামিনা? আপনার মতো সৃজনশীল মানুষেরা তো আমাদের মতো ‘বিলিয়নিয়ার’দের চেয়ে অনেক বেশি ধনী। আপনি অন্তত কিছু সৃষ্টি করছেন। আর আমি? আমি শুধু রাস্তার মাইলফলক গুনি। আপনার কলেজের বাচ্চারা তো আপনাকে অনেক ভালোবাসে নিশ্চয়ই?”
সামিনা: “ভালোবাসে কি না জানি না, তবে ওরা আমাকে ‘রঙিন ম্যাডাম’ বলে ডাকে। আচ্ছা মোর্শেদ সাহেব, আপনি যে বললেন আপনার পরিবারে তেমন কেউ নেই, আপনার বাবা-মা কি...?”
মোর্শেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সিগারেটের ছাইটা ট্রের ওপর ঝেড়ে সে লিখল—
মোর্শেদ: “বাবা-মা দুজনেই অনেক আগে চলে গেছেন। এই বাড়িটা তাদেরই স্মৃতি। মামা-মামী আছেন বলেই বাড়িটা বাড়ি মনে হয়, নয়তো এটা একটা মিউজিয়াম হয়ে যেত। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার এই রাজকীয় একাকীত্বের চেয়ে আপনার ওই ঘিঞ্জি যাত্রাবাড়ীর শোরগোল অনেক ভালো। সেখানে অন্তত প্রাণের স্পন্দন আছে।”
সামিনা: “ঘিঞ্জি জায়গাগুলো দেখতে ভালো লাগে না মোর্শেদ সাহেব, কিন্তু সেখানে মানুষ মানুষকে অনুভব করতে পারে। আপনি যখন বাইক নিয়ে হাইওয়েতে ছোটেন, তখন কি একবারও মনে হয় না যে এই গতি শেষে ফেরার মতো কোনো আপন মুখ থাকলে ভালো হতো?”
মোর্শেদ স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে কোনো একটা স্পোর্টস বাইক উচ্চ শব্দে চলে গেল। সেই শব্দের রেশটুকু ঘরে মিলিয়ে যেতেই মোর্শেদ টাইপ করল—
মোর্শেদ: “হয়তো মনে হয়। তবে ফেরার জায়গাগুলো যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ অজানার দিকেই বেশি টান অনুভব করে। আপনি কি কখনো এমন কোনো রাইডারের পেছনে বসেছেন, যে আপনাকে কুয়াশাভেজা কোনো ভোরে নিয়ে যাবে?”
সামিনা: (খানিকটা দুষ্টুমির সুরে) “আমি তো মধ্যবিত্ত কলেজ টিচার, আমার ঘোরাঘুরি লোকাল বাসে আর রিকশায়। তবে কল্পনা করতে দোষ নেই। আপনার মেটিওরটা কি খুব বেশি ঝাঁকুনি দেয়? নাকি পেছনে বসা মানুষটাকে খুব সাবধানে আগলে রাখে?”
মোর্শেদ: “সেটা নির্ভর করে পেছনের মানুষটা কতটা শক্ত করে ধরতে পারে তার ওপর। যদি সে ভয় পায়, তবে ঝাঁকুনি বেশি লাগবে। আর যদি সে গতির সাথে নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারে, তবে মনে হবে সে মেঘের ওপর দিয়ে উড়ছে।”
সামিনা: “উড়তে তো সবাই চায়। কিন্তু ডানার ভার বইবার ক্ষমতা কজনের থাকে? আচ্ছা, আজ অনেক রাত হলো। কাল ভোরে আমাকে কলেজে যেতে হবে, বাচ্চাদের খাতা দেখতে হবে। আপনি তো নিশ্চয়ই দুপুর পর্যন্ত ঘুমোবেন?”
মোর্শেদ একটা ম্লান হাসি হাসল।
মোর্শেদ: “আমার দিন আর রাতের পার্থক্য খুব কম। তবে আজ হয়তো একটু তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে যাবে। আপনার ‘রঙিন ম্যাডাম’ পরিচয়ের বাইরেও একজন মানুষকে আজ খুঁজে পেলাম বলে মনে হচ্ছে। সাবধানে থাকবেন সামিনা।”
সামিনা: (খানিকটা সময় নিয়ে) “খুঁজে পাওয়াটা সহজ মোর্শেদ সাহেব, কিন্তু চিনে নেওয়াটা কঠিন। মানুষ তো বহুরূপী। আপনি যাকে ‘মানুষ’ হিসেবে দেখছেন, সে হয়তো কেবল একলা রাতের একটা কাল্পনিক প্রতিচ্ছবি। তবুও, আপনার এই খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাটুকুকে সম্মান জানাই।”
মোর্শেদ কিবোর্ড থেকে হাত সরিয়ে নিল। ল্যাপটপের নীলচে আলোয় তার চেহারায় এক ধরণের অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে। সে অ্যাশট্রের দিকে তাকাল—সেখানে সিগারেটের ফিল্টারগুলোর একটা ছোটখাটো পাহাড় জমেছে। সারা ঘর ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আছে, ঠিক যেন তার জীবনের গত পাঁচটা বছরের প্রতিচ্ছবি। জানালার বাইরে বনানী ডিওএইচএসের নিস্তব্ধতা এখন আরও গাঢ়। দূরে একটা বাইকের ইঞ্জিনের গর্জন শোনা গেল, হয়তো কোনো রাইডার তার মতোই রাতের বুক চিরে ছুটে চলছে।
সামিনা: “কি হলো? চুপ হয়ে গেলেন যে? বনানীর অভিজাত নিস্তব্ধতা কি আপনাকে গিলে খেল? নাকি আমার মতো এক সাধারণ কলেজ টিচারের সাথে কথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন?”
মোর্শেদ দ্রুত টাইপ করল—
মোর্শেদ: “না, ক্লান্ত হইনি। বরং ভাবছিলাম, আমাদের জীবনের এই বৈপরীত্যের কথা। আপনি থাকেন কোলাহলের মাঝে থেকেও হৃদয়ে রঙ নিয়ে, আর আমি থাকি এই শান্ত সুশীতল ডিওএইচএস-এ, নিশ্চিত জীবন এর ভেতরে ধূসরতা নিয়ে। আমার এই দামী মেটিওর ৩৫০-এর চাকায় যতটা ধুলো ওড়ে, তার চেয়ে বেশি ধুলো জমেছে বোধহয় আমার মনের ওপর।”
সামিনা: “ধুলো ঝেড়ে ফেলা যায় মোর্শেদ সাহেব। তবে তার জন্য মনের জানালায় হাওয়া লাগাতে হয়। আচ্ছা, আপনি যখন বাইক নিয়ে বের হন, তখন কি একবারও মনে হয় না যে এই গতিটা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যের চেয়ে বরং নিজেকেই হারিয়ে ফেলার জন্য?”
মোর্শেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সামিনা তাকে ঠিক কত গভীরে গিয়ে আঘাত করছে, তা সে হয়তো নিজেও জানে না। তার মামা-মামী এখন পাশের ঘরে ঘুমিয়ে। এই বিশাল বাড়িতে মোর্শেদ কেবল একজন রাজকীয় অতিথি। সে আবার লিখল—
মোর্শেদ: “হয়তো নিজেকে হারানোর জন্যই এই ছোটাছুটি। কিন্তু আজ কেন যেন মনে হচ্ছে, মাঝে মাঝে হারিয়ে যাওয়া মানুষকেও খুঁজে নিতে হয়। আপনি কি কোনোদিন আমার বাইকের পেছনে বসে এই কুয়াশাভরা ঢাকার রাত দেখবেন? অবশ্য যাত্রাবাড়ী থেকে বনানী অনেক দূর, মাঝপথে হয়তো আপনি ভয় পেয়ে যাবেন।”
সামিনা: “ভয়? যে নারী প্রতিদিন বাসের ভিড় ঠেলে কলেজে যায়, তার কাছে ভয় শব্দটা খুব বিলাসিতা। তবে হ্যাঁ, কোনোদিন যদি আকাশ খুব বেশি মেঘলা থাকে আর আপনার গতির নেশা আমাকে না টলায়, তবে হয়তো দেখা যেতেও পারে। তবে তার আগে আপনাকে আমার ওই ‘ঘিঞ্জি’ যাত্রাবাড়ীর গন্ধ সহ্য করার ক্ষমতা রাখতে হবে।”
মোর্শেদ: “আমি আসব সামিনা। আপনার সেই চেনা কোলাহলের ভেতর থেকেই আপনাকে খুঁজে বের করব। একদিন হয়তো আপনার কলেজের গেটে কোনো এক ক্লাসিক বাইকের গর্জন শুনতে পাবেন। দেখবেন, আপনার সেই রঙিন ছাত্রছাত্রীরা আমাকে দেখে অবাক হচ্ছে।”
সামিনা: “সেটা দেখা যাবে। আপাতত নিজের ইকোসিস্টেমে ফিরে যান। রাত এখন শেষের দিকে। কাল ভোরে কিন্তু আমার বাচ্চারা আমার অপেক্ষায় থাকবে। শুভরাত্রি, মিস্টার রাইডার।”
মোর্শেদ ল্যাপটপটা বন্ধ করল। ঘরটা এখন ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, কিন্তু তার মনের ভেতরে এক ধরণের স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে। সে বিছানায় গা এলিয়ে দিল, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। তার মাথায় এখন শুধু ঘুরছে সামিনার সেই কথাগুলো— "মানুষ চিনে নেওয়া কঠিন।" মোর্শেদ জানালার পর্দা সরিয়ে নিচে তাকাল। তার কালো রঙের মেটিওরটা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চিকচিক করছে।
কে এই সামিনা? একটা ফেসবুকের বাইকার গ্রুপে সে এলোই বা কি করে? সত্যিই কি একজন মহিলা? চেনা কেউ ঠাট্টা করছে? কথা বলে তো সেরকম লাগল না।
সামিনার আইডিতে ঘুরতে লাগলো মোর্শেদ। কোনও ছবি দেওয়া নেই। শুধু বিভিন্ন আর্টস এন্ড ক্র্যাফট।
মোর্শেদের নিজের ছবিই প্রোফাইলে দেওয়া। নিশ্চয়ই পর্দার ওইপাশের সেই ভদ্রমহিলা তাকে ইতোমধ্যেই দেখে নিয়েছে। মোর্শেদের কল্পনায় তখনও আবছা হয়ে আছে সামিনা নামের রহস্যময়ী নারীটি। চেহারা, অবয়ব, কন্ঠ সবই অচেনা। কেবলই একটা ধারণা রয়ে গেছে।
আচ্ছা? কাল আবার কথা হবে তো? নাকি হারিয়ে যাবে ফেসবুক থেকে? এসব ভাবতে ভাবতেই একাকিত্বে মাখা রাতটাকে বুজে থাকা চোখের অন্ধকারে মিশিয়ে দিল মোর্শেদ।
আচ্ছা? কাল আবার কথা হবে তো? নাকি হারিয়ে যাবে ফেসবুক থেকে? এসব ভাবতে ভাবতেই একাকিত্বে মাখা রাতটাকে বুজে থাকা চোখের অন্ধকারে মিশিয়ে দিল মোর্শেদ।
আমি চলে গেলেও রেশ থেকে যাবে...


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)