01-02-2026, 01:16 PM
অনেকদিন গ্যাপ থাকার কারনে লিখতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে ,তাই আজকে একটা ছোট আপডেট দিয়ে শুরু করতে চাইছি ।
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ঙ)
হাসপাতালের প্রশস্ত কেবিনের এক কোণে রাখা সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে রাজীব। সামনে বিছানায় হেলান দিয়ে থাকা রহিমের দিকে নয়, ওর চোখ আটকে আছে রহিম আর জয়নালের কথাবার্তায়। সেই কাকডাকা ভোরেই জয়নাল চলে এসেছিল। চোখ দেখেই রাজীব বুঝে গিয়েছিল, বড় আব্বুর ভালো ঘুম হয়নি। চোখের নিচে কালি, কণ্ঠে চাপা ক্লান্তি। তখন কিছুই করার ছিল না, ওয়েটিং রুমে বসে থাকা ছাড়া। তবু রাজীব কিছু বলেনি। বলেনি, “সুধু সুধু কেন এসেছো?”রাজীবের মনে হয়েছিল, এমন প্রশ্ন করা মানে আব্বুর সঙ্গে জয়নালের যে আত্মিক টান, সেটাকে অকারণে খাটো করা।
তবে এসে ঝামেলা কম করেনি জয়নাল। ডাক্তার যখন বলল, আজকেই রহিমকে কেবিনে শিফট করা হবে,তখনই জয়নাল বেঁকে বসে। ওর দৃঢ় ধারণা, CCU-তে বেডের সংকুলান না হওয়াতেই ডাক্তার রহিমকে বের করে দিচ্ছে, যাতে অন্য কোনো রোগী ঢোকানো যায়। এই নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে জয়নালের তুমুল তর্ক বেঁধে গিয়েছিল। রাজীব তখনো হস্তক্ষেপ করেনি।
এক পর্যায়ে ডাক্তার বিরক্ত আর অবাক হয়ে বলে উঠেছিল,“আরেহ ভাই, আপনি তো আশ্চর্য মানুষ! সবাই চায় নিজেদের রোগী যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়, আর আপনি চাইছেন রোগী যেন সুস্থ না হয়!”
কিন্তু জয়নালের এক কথা। ওর বিশ্বাস, ডাক্তার ইচ্ছে করেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রাজীবকেই এগোতে হয়েছিল। শান্ত গলায় কথা বলে, যুক্তি দিয়ে, কাগজপত্র দেখিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছিল ওকে। আর রাজীবের হস্তক্ষেপেই এখন রহিম কেবিনে।
এমনকি বেশ সুস্থই লাগছে। এই মুহূর্তে বিছানায় হেলান দিয়ে জয়নালের সঙ্গে হাসি–তামাশা করছে। আর রাজীব দূর থেকে আব্বু আর বড় আব্বুর বন্ধুত্বটা নীরবে অ্যাডমায়ার করছে।
রাজীব ভাবছে, এত বছরে কীভাবে টিকে থাকল এই বন্ধুত্ব? চরিত্রে অমিল আছে, চিন্তায় অমিল আছে। একজন অস্থির, আরেকজন ঠান্ডা মাথার। একজন সন্দেহপ্রবণ, আরেকজন সহজ বিশ্বাসী। তবু কোথাও যেন একটা সুতো আছে, যেটা কখনো আলগা হয়নি।
তাহলে ওর আর জয়ের বন্ধুত্বটা টিকলো না কেন?
ওদের বন্ধুত্বকে কোনোদিনই দুর্বল মনে হয়নি রাজীবের। বরং সবসময়ই মনে হতো, একজন আরেকজনের জন্য সবকিছু করতে পারে। এমন না যে কথায় কথায় ঝগড়া হতো, বা অবহেলায় জমে উঠত দূরত্ব। তবু এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়ে গেল। তাও ধীরে ধীরে নয়—এক ঝটকায়। ড়াজিব এটুকু নিশ্চিত যে সম্পর্কের সুতোটা অরা দুজন দুদিক থেকে টেনেছে , কারো একজনের টানে সেই সুতো ছিরে নাই ।
যদি একজনের টানেই দড়ি ছিঁড়ত, তাহলে অন্যজন পড়ে যেত হুমড়ি খেয়ে। একপাশ শক্ত, আরেকপাশ দুর্বল—এমন হলে বোঝা যেত। কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কেউ কাউকে টেনে নামায়নি। বরং দু’পাশ থেকেই টান ছিল। সমান জেদ, সমান অনড়তা। তাই দড়ি ছিঁড়তেই ওরা দু’দিকে ছিটকে গেছে, আরো দূরে, আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে।
তাহলে ভুলটা কার?
এই প্রশ্নটা রাজীব নিজেকেই করে, আবার নিজেই থামে। একজনের ভুল হলে ব্যাপারটা সহজ হতো। দোষটা কাঁধে তুলে নেওয়া যেত। কিন্তু এখানে তা সম্ভব নয়। কয়েকদিন সবকিছু একটু অন্যরকম লেগেছিল—কথাবার্তায় অস্বস্তি, চোখে চোখ না রাখা। তারপর আবার মনে হয়েছিল, সব ঠিক হয়ে গেছে।
“রাজীব…”জয়নালের ডাকে ওর চিন্তা ভেঙে যায়।
“জি বড় আব্বু।”
“দেখ তো বাবা, তোর বড় আম্মু এখনো আসছে না কেন? একটা ফোন কর।”সবাই দেরি করছে ভেবে জয়নাল ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিরক্ত। ওর বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আর বাকিরা বাড়িতে বসে আরাম করছে , এটা জয়নাল মেনে নিতে পারছে না।
“আমার সাথে কথা হয়েছে, ওরা আসছে,” রাজীব শান্ত গলায় বলে।
“এত সময় লাগে নাকি? আমি তো জাগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। নাস্তা করবে কখন রহিম?” জয়নাল গজগজ করে।
“আরেহ, তুই হুলুস্থুল করিস না তো। এই তো স্যুপ খেলাম,” রহিম হাসতে হাসতে বলে।
“কোনো ডিসিপ্লিন নেই আমার বাড়িতে! সব একেকটা অলস!”জয়নাল রাগে গজগজ করতে থাকে।
“আহা, বললাম না হুলুস্থুল করিস না,” রহিম থামিয়ে দিয়ে আবার বলে,
“মনে তো হচ্ছে আসল খিদেটা তোরই লেগেছে। দোষ চাপাচ্ছিস আমার আর রাজীবের ওপর।”এই বলে সে খোলা হাসি হেসে ওঠে।
রহিমের হাসি দেখে জয়নাল আরো ক্ষেপে যায়। আঙুল তুলে শাসিয়ে বলে,“খবরদার হাসবি না! হাসলে এবার তোকে ICU-তে পাঠাবো।”
কিন্তু রহিমের হাসি থামে না। হাসতে হাসতেই বলে,“রাজীব বাবা, যা তো। তোর বড় আব্বুর জন্য নাস্তা নিয়ে আয়। রাক্ষসের খিদে পেলে মাথা ঠিক থাকে না।”
রহিম হা হা করে হাসতে থাকে।
রাজীব মুখ টিপে হেসে দ্রুত বেরিয়ে আসে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জয়নাল আরো রেগে যাচ্ছে। এই রাগ যেন নিজের ওপর এসে না পড়ে, এই আশঙ্কাতেই রাজীবের প্রস্থান।
করিডোরে এসে হাঁটতে হাঁটতে আবার ভর করে ওর আর জয়ের কথা। করিডোরের চেয়ারে বসে রাজীব ভাবতে থাকে—কেন ওদের বন্ধুত্ব ওদের বাবাদের মতো হলো না?
অনেক ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না। কখনো মনে হয় দোষটা তারই ছিল। আবার কখনো মনে হয় জয়ের। কিন্তু রাজীবের ভেতরের কেউ যেন বারবার বলে যায়—এটা একার কারো দোষ নয়।
কিছু সম্পর্ক ভুলের জন্য ভাঙে না, ভাঙে ভুল বোঝার জন্য।আর সেই ভুল বোঝার সামনে সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্বও একসময় হেরে যেতে পারে।
এই মুহূর্তে রাজীবের মনে হচ্ছে, ও আর জয় একে অপরকে কোনোদিনই ঠিক করে চিনতে পারেনি, বুঝতে পারেনি।জয়নাল আর রহিম পেরেছে—তাই ওরা এখনো বন্ধু।আর ও আর জয়, শুরু থেকেই ছিল দুজন দুই জগতের বাসিন্দা।
****
জয় আজকে নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে। সাধারনত জয় নিজের বাইক ছাড়া বের হয় না । তবে আজকে রানী আয়শার সঙ্গে যাবে—এই কারণেই প্রিয় বাইক রেখে গাড়ির স্টেয়ারিং ধরেছে। কারন ও রানীর পাশে থাকতে চেয়ছে। শুধু উপস্থিত থাকতে নয়, দায়িত্বটা নিজের হাতে রাখতে, গতকালের রাতে নেয়ে সংকল্প পুরন করতে। গতকাল রাতে নেয়া সংকল্পের একটা অংস ছিলো , রানির জীবনে নিজের উপস্থিতি এব্যাসলুট করা। সুধু মুখে মুখে নয় সত্যিকারে রানির দায়িত্ব তুলে নেয়া । আর জয় এখন এই মুহুরতে নিজের বাইকের প্রতি ছেলেমানুষি আকর্ষণ ছেড়ে গাড়ির স্টেয়ারিং ধরে সেই পথেই প্রথম পা রেখছে।
গারি চালাতে চালাতে জয় বার বার রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে পেছন টা দেখে নিচ্ছে , পেছনে এক দারুন দৃশ্য চলছে ।
পেছনের সিটে আয়শা আর রানী পাশাপাশি বসে আছে। জয় বারবার রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রাখছে। খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে, আয়শা রানীর একটা হাত নিজের কোলে তুলে নিয়ে ধরে রেখেছে। হাতটা স্বাভাবিক স্নেহে ধরে রেখছে।
এই দৃশ্যটা জয়ের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। মনেমনে ভাবে, এই তো একজন পুরুষের জীবনের একান্ত কাম্য দৃশ্য। নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নারী, মা আর ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি নিঃশর্ত স্নেহে বাঁধা।
জয় নিজেকে হঠাৎ ভীষণ ভাগ্যবান মনে করে। মা আর প্রেমিকাকে একে অপরের পছন্দ করানোর জন্য তাকে কোনোদিন আলাদা করে কষ্ট করতে হবে না—এই ভাবনাটা ওর মুখে আপনাতেই একটা হাসি এনে দেয়। একটু আগে রানীকে পাশের সিটে বসাতে না পারার যে দুঃখটা ছিলো সেটা এখন নেই বললেই চলে ।
হাসতে হাসতে জয় আবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকায়। এইবার রানীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়।
চোখাচোখি হতেই জয়ের হাসি আরো চওড়া হয়। দাঁত বেরিয়ে আসে।
রানী তখন আয়শার সঙ্গে কথা বলছিলো ,এক ফাঁকে চোরা চোখে সামনের দিকে তাকিয়েছিল। জয়কে এমন দাঁত বের করে হাসতে দেখে ও ভ্রূকুটি করে। আয়শার চোখ এড়িয়ে, চোখের ইশারায় জয়কে সাবধান করে, রাস্তার দিকে মন দিতে বলে।
কিন্তু এতে ফুরফুরে মেজাজে থাকা জয়ের হাসি কমে না। বরং বাড়ে। রানীকে ভয় দেখানোর জন্য সে স্টিয়ারিং ছেড়ে দেওয়ার ভান করে।
রানী আঁতকে ওঠে। আয়শার কোলে রাখা হাতটা একটু নড়ে যায়।
“কি রে মা?” রানীর এমন হঠাৎ কেঁপে ওঠা টের পেয়ে আয়শা তাকায় ওর দিকে। গতকালের পর থেকে রানীর সামান্য অস্বাভাবিক আচরণ ওকে এমনিতেই ভাবিয়ে তুলেছে।
রানী দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। “কই, কিছু না তো বড় আম্মু,” একটু হরবড় করে বলে।
“তাহলে এমন করে কেঁপে উঠলি যে? ভয় পেয়েছিস?” আয়শা আবার জিজ্ঞাস করে।
সামনের সিটে জয় তখন মিটমিট করে হাসছে। রানী একবার চকিতে তাকিয়ে চোখ মটকায়। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“না না, কিছুই না বড় আম্মু। এমনিতেই হয়তো হয়েছে।”
আয়শা আর কিছু বলে না। তবে রানীর হাতটা নিজের কোলে আরো ভালো করে টেনে নেয়। তারপর জানালার বাইরে তাকায়।
রানী আবার রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকায়। দেখে, জয় এখনো তাকিয়ে আছে। রানী রাগান্বিত ভঙ্গিতে ওর দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের অজান্তেই ফিক করে হেসে ফেলে।
এভাবেই খুনসুটি, চোখের ভাষা আর না-বলা কথার ভেতর দিয়ে ওরা হাসপাতালের সামনে এসে পৌঁছে যায়।
****
কিছু সম্পর্কঃ ৯ (ঙ)
হাসপাতালের প্রশস্ত কেবিনের এক কোণে রাখা সিঙ্গেল সোফায় বসে আছে রাজীব। সামনে বিছানায় হেলান দিয়ে থাকা রহিমের দিকে নয়, ওর চোখ আটকে আছে রহিম আর জয়নালের কথাবার্তায়। সেই কাকডাকা ভোরেই জয়নাল চলে এসেছিল। চোখ দেখেই রাজীব বুঝে গিয়েছিল, বড় আব্বুর ভালো ঘুম হয়নি। চোখের নিচে কালি, কণ্ঠে চাপা ক্লান্তি। তখন কিছুই করার ছিল না, ওয়েটিং রুমে বসে থাকা ছাড়া। তবু রাজীব কিছু বলেনি। বলেনি, “সুধু সুধু কেন এসেছো?”রাজীবের মনে হয়েছিল, এমন প্রশ্ন করা মানে আব্বুর সঙ্গে জয়নালের যে আত্মিক টান, সেটাকে অকারণে খাটো করা।
তবে এসে ঝামেলা কম করেনি জয়নাল। ডাক্তার যখন বলল, আজকেই রহিমকে কেবিনে শিফট করা হবে,তখনই জয়নাল বেঁকে বসে। ওর দৃঢ় ধারণা, CCU-তে বেডের সংকুলান না হওয়াতেই ডাক্তার রহিমকে বের করে দিচ্ছে, যাতে অন্য কোনো রোগী ঢোকানো যায়। এই নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে জয়নালের তুমুল তর্ক বেঁধে গিয়েছিল। রাজীব তখনো হস্তক্ষেপ করেনি।
এক পর্যায়ে ডাক্তার বিরক্ত আর অবাক হয়ে বলে উঠেছিল,“আরেহ ভাই, আপনি তো আশ্চর্য মানুষ! সবাই চায় নিজেদের রোগী যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়, আর আপনি চাইছেন রোগী যেন সুস্থ না হয়!”
কিন্তু জয়নালের এক কথা। ওর বিশ্বাস, ডাক্তার ইচ্ছে করেই এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রাজীবকেই এগোতে হয়েছিল। শান্ত গলায় কথা বলে, যুক্তি দিয়ে, কাগজপত্র দেখিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে হয়েছিল ওকে। আর রাজীবের হস্তক্ষেপেই এখন রহিম কেবিনে।
এমনকি বেশ সুস্থই লাগছে। এই মুহূর্তে বিছানায় হেলান দিয়ে জয়নালের সঙ্গে হাসি–তামাশা করছে। আর রাজীব দূর থেকে আব্বু আর বড় আব্বুর বন্ধুত্বটা নীরবে অ্যাডমায়ার করছে।
রাজীব ভাবছে, এত বছরে কীভাবে টিকে থাকল এই বন্ধুত্ব? চরিত্রে অমিল আছে, চিন্তায় অমিল আছে। একজন অস্থির, আরেকজন ঠান্ডা মাথার। একজন সন্দেহপ্রবণ, আরেকজন সহজ বিশ্বাসী। তবু কোথাও যেন একটা সুতো আছে, যেটা কখনো আলগা হয়নি।
তাহলে ওর আর জয়ের বন্ধুত্বটা টিকলো না কেন?
ওদের বন্ধুত্বকে কোনোদিনই দুর্বল মনে হয়নি রাজীবের। বরং সবসময়ই মনে হতো, একজন আরেকজনের জন্য সবকিছু করতে পারে। এমন না যে কথায় কথায় ঝগড়া হতো, বা অবহেলায় জমে উঠত দূরত্ব। তবু এত অল্প সময়ের মধ্যে সম্পর্কের সুতোটা ছিঁড়ে গেল। তাও ধীরে ধীরে নয়—এক ঝটকায়। ড়াজিব এটুকু নিশ্চিত যে সম্পর্কের সুতোটা অরা দুজন দুদিক থেকে টেনেছে , কারো একজনের টানে সেই সুতো ছিরে নাই ।
যদি একজনের টানেই দড়ি ছিঁড়ত, তাহলে অন্যজন পড়ে যেত হুমড়ি খেয়ে। একপাশ শক্ত, আরেকপাশ দুর্বল—এমন হলে বোঝা যেত। কিন্তু ওদের ক্ষেত্রে তা হয়নি। কেউ কাউকে টেনে নামায়নি। বরং দু’পাশ থেকেই টান ছিল। সমান জেদ, সমান অনড়তা। তাই দড়ি ছিঁড়তেই ওরা দু’দিকে ছিটকে গেছে, আরো দূরে, আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে।
তাহলে ভুলটা কার?
এই প্রশ্নটা রাজীব নিজেকেই করে, আবার নিজেই থামে। একজনের ভুল হলে ব্যাপারটা সহজ হতো। দোষটা কাঁধে তুলে নেওয়া যেত। কিন্তু এখানে তা সম্ভব নয়। কয়েকদিন সবকিছু একটু অন্যরকম লেগেছিল—কথাবার্তায় অস্বস্তি, চোখে চোখ না রাখা। তারপর আবার মনে হয়েছিল, সব ঠিক হয়ে গেছে।
“রাজীব…”জয়নালের ডাকে ওর চিন্তা ভেঙে যায়।
“জি বড় আব্বু।”
“দেখ তো বাবা, তোর বড় আম্মু এখনো আসছে না কেন? একটা ফোন কর।”সবাই দেরি করছে ভেবে জয়নাল ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিরক্ত। ওর বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, আর বাকিরা বাড়িতে বসে আরাম করছে , এটা জয়নাল মেনে নিতে পারছে না।
“আমার সাথে কথা হয়েছে, ওরা আসছে,” রাজীব শান্ত গলায় বলে।
“এত সময় লাগে নাকি? আমি তো জাগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। নাস্তা করবে কখন রহিম?” জয়নাল গজগজ করে।
“আরেহ, তুই হুলুস্থুল করিস না তো। এই তো স্যুপ খেলাম,” রহিম হাসতে হাসতে বলে।
“কোনো ডিসিপ্লিন নেই আমার বাড়িতে! সব একেকটা অলস!”জয়নাল রাগে গজগজ করতে থাকে।
“আহা, বললাম না হুলুস্থুল করিস না,” রহিম থামিয়ে দিয়ে আবার বলে,
“মনে তো হচ্ছে আসল খিদেটা তোরই লেগেছে। দোষ চাপাচ্ছিস আমার আর রাজীবের ওপর।”এই বলে সে খোলা হাসি হেসে ওঠে।
রহিমের হাসি দেখে জয়নাল আরো ক্ষেপে যায়। আঙুল তুলে শাসিয়ে বলে,“খবরদার হাসবি না! হাসলে এবার তোকে ICU-তে পাঠাবো।”
কিন্তু রহিমের হাসি থামে না। হাসতে হাসতেই বলে,“রাজীব বাবা, যা তো। তোর বড় আব্বুর জন্য নাস্তা নিয়ে আয়। রাক্ষসের খিদে পেলে মাথা ঠিক থাকে না।”
রহিম হা হা করে হাসতে থাকে।
রাজীব মুখ টিপে হেসে দ্রুত বেরিয়ে আসে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, জয়নাল আরো রেগে যাচ্ছে। এই রাগ যেন নিজের ওপর এসে না পড়ে, এই আশঙ্কাতেই রাজীবের প্রস্থান।
করিডোরে এসে হাঁটতে হাঁটতে আবার ভর করে ওর আর জয়ের কথা। করিডোরের চেয়ারে বসে রাজীব ভাবতে থাকে—কেন ওদের বন্ধুত্ব ওদের বাবাদের মতো হলো না?
অনেক ভেবে কোনো কূলকিনারা পায় না। কখনো মনে হয় দোষটা তারই ছিল। আবার কখনো মনে হয় জয়ের। কিন্তু রাজীবের ভেতরের কেউ যেন বারবার বলে যায়—এটা একার কারো দোষ নয়।
কিছু সম্পর্ক ভুলের জন্য ভাঙে না, ভাঙে ভুল বোঝার জন্য।আর সেই ভুল বোঝার সামনে সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্বও একসময় হেরে যেতে পারে।
এই মুহূর্তে রাজীবের মনে হচ্ছে, ও আর জয় একে অপরকে কোনোদিনই ঠিক করে চিনতে পারেনি, বুঝতে পারেনি।জয়নাল আর রহিম পেরেছে—তাই ওরা এখনো বন্ধু।আর ও আর জয়, শুরু থেকেই ছিল দুজন দুই জগতের বাসিন্দা।
****
জয় আজকে নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে। সাধারনত জয় নিজের বাইক ছাড়া বের হয় না । তবে আজকে রানী আয়শার সঙ্গে যাবে—এই কারণেই প্রিয় বাইক রেখে গাড়ির স্টেয়ারিং ধরেছে। কারন ও রানীর পাশে থাকতে চেয়ছে। শুধু উপস্থিত থাকতে নয়, দায়িত্বটা নিজের হাতে রাখতে, গতকালের রাতে নেয়ে সংকল্প পুরন করতে। গতকাল রাতে নেয়া সংকল্পের একটা অংস ছিলো , রানির জীবনে নিজের উপস্থিতি এব্যাসলুট করা। সুধু মুখে মুখে নয় সত্যিকারে রানির দায়িত্ব তুলে নেয়া । আর জয় এখন এই মুহুরতে নিজের বাইকের প্রতি ছেলেমানুষি আকর্ষণ ছেড়ে গাড়ির স্টেয়ারিং ধরে সেই পথেই প্রথম পা রেখছে।
গারি চালাতে চালাতে জয় বার বার রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে পেছন টা দেখে নিচ্ছে , পেছনে এক দারুন দৃশ্য চলছে ।
পেছনের সিটে আয়শা আর রানী পাশাপাশি বসে আছে। জয় বারবার রিয়ার ভিউ মিররে চোখ রাখছে। খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছে, আয়শা রানীর একটা হাত নিজের কোলে তুলে নিয়ে ধরে রেখেছে। হাতটা স্বাভাবিক স্নেহে ধরে রেখছে।
এই দৃশ্যটা জয়ের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়। মনেমনে ভাবে, এই তো একজন পুরুষের জীবনের একান্ত কাম্য দৃশ্য। নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই নারী, মা আর ভালোবাসা, একে অপরের প্রতি নিঃশর্ত স্নেহে বাঁধা।
জয় নিজেকে হঠাৎ ভীষণ ভাগ্যবান মনে করে। মা আর প্রেমিকাকে একে অপরের পছন্দ করানোর জন্য তাকে কোনোদিন আলাদা করে কষ্ট করতে হবে না—এই ভাবনাটা ওর মুখে আপনাতেই একটা হাসি এনে দেয়। একটু আগে রানীকে পাশের সিটে বসাতে না পারার যে দুঃখটা ছিলো সেটা এখন নেই বললেই চলে ।
হাসতে হাসতে জয় আবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকায়। এইবার রানীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়।
চোখাচোখি হতেই জয়ের হাসি আরো চওড়া হয়। দাঁত বেরিয়ে আসে।
রানী তখন আয়শার সঙ্গে কথা বলছিলো ,এক ফাঁকে চোরা চোখে সামনের দিকে তাকিয়েছিল। জয়কে এমন দাঁত বের করে হাসতে দেখে ও ভ্রূকুটি করে। আয়শার চোখ এড়িয়ে, চোখের ইশারায় জয়কে সাবধান করে, রাস্তার দিকে মন দিতে বলে।
কিন্তু এতে ফুরফুরে মেজাজে থাকা জয়ের হাসি কমে না। বরং বাড়ে। রানীকে ভয় দেখানোর জন্য সে স্টিয়ারিং ছেড়ে দেওয়ার ভান করে।
রানী আঁতকে ওঠে। আয়শার কোলে রাখা হাতটা একটু নড়ে যায়।
“কি রে মা?” রানীর এমন হঠাৎ কেঁপে ওঠা টের পেয়ে আয়শা তাকায় ওর দিকে। গতকালের পর থেকে রানীর সামান্য অস্বাভাবিক আচরণ ওকে এমনিতেই ভাবিয়ে তুলেছে।
রানী দ্রুত নিজেকে সামলে নেয়। “কই, কিছু না তো বড় আম্মু,” একটু হরবড় করে বলে।
“তাহলে এমন করে কেঁপে উঠলি যে? ভয় পেয়েছিস?” আয়শা আবার জিজ্ঞাস করে।
সামনের সিটে জয় তখন মিটমিট করে হাসছে। রানী একবার চকিতে তাকিয়ে চোখ মটকায়। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলে,
“না না, কিছুই না বড় আম্মু। এমনিতেই হয়তো হয়েছে।”
আয়শা আর কিছু বলে না। তবে রানীর হাতটা নিজের কোলে আরো ভালো করে টেনে নেয়। তারপর জানালার বাইরে তাকায়।
রানী আবার রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকায়। দেখে, জয় এখনো তাকিয়ে আছে। রানী রাগান্বিত ভঙ্গিতে ওর দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের অজান্তেই ফিক করে হেসে ফেলে।
এভাবেই খুনসুটি, চোখের ভাষা আর না-বলা কথার ভেতর দিয়ে ওরা হাসপাতালের সামনে এসে পৌঁছে যায়।
****
কিছু প্রশ্নের উত্তর নেই,
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।
তবু প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকে,
ঠিক আমার মতো —
অর্ধেক জেগে, অর্ধেক নিঃশব্দ।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)