11 hours ago
৮।
ভয়। পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম এবং শক্তিশালী অনুভূতি সম্ভবত এই ভয়। ভালোবাসার চেয়েও শক্তিশালী, ঘৃণার চেয়েও তীব্র। এই মুহূর্তে আমার শরীরের প্রতিটি কোষে যে অনুভূতিটা কাজ করছে, তার নাম ভয়। সামাজিক অপদস্থ হওয়ার ভয়, পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজের সাজানো জগতটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ভয়।
আমি বিছানায় বসে আছি। একটু আগেই তনিমা আন্টি চার্জার নিয়ে গেছেন। যাওয়ার সময় বলে গেছেন—"দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।" বাক্যটা খুব ছোট, কিন্তু এর ওজন হিমালয়ের সমান। এই ওজনের নিচে আমার সাহস চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
আমি আবার কল্পনা করলাম দৃশ্যটা—আমি পা টিপে টিপে যাচ্ছি। দরজায় হাত রাখছি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো বাবা বাথরুমে যাওয়ার জন্য বের হলেন। কিংবা মৃন্ময় পানি খেতে বের হলো। আমাকে গেস্ট রুমের দরজার সামনে চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা কী ভাববে? আমি কী কৈফিয়ত দেব? বলব চার্জার ফেরত নিতে এসেছি? রাত একটায়? কিংবা আরও খারাপ কিছু। ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। আন্টি হয়তো সত্যিই সিগন্যাল দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার মত বদলে গেল। নারীর মন তো আকাশের রঙের মতো, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। তিনি যদি তখন চিৎকার করে ওঠেন? যদি বলেন, "তন্ময়, তুই আমার ঘরে কেন?" ব্যাস! গেম ওভার। আমার জীবন শেষ।
না। এই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। কিছুতেই না। আমি কাপুরুষ হতে পারি, কিন্তু আমি বোকা নই। একটা মুহূর্তের উত্তেজনার জন্য আমি আমার সারাজীবনের সম্মান বাজি ধরতে পারি না। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ধীর পায়ে দরজার কাছে গেলাম। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য নয়, দরজাটা ভেতর থেকে লক করার জন্য। 'খট' করে ছিটকিনি লাগানোর শব্দ হলো। এই শব্দটা আমার কাপুরুষতার সিলমোহর। আমি নিজেকে নিজের ঘরে বন্দী করলাম। নিরাপদ, কিন্তু পরাজিত। বিছানায় ফিরে এলাম। লাইট নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকার ঘরে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার চোখের সামনে ভাসছে তনিমা আন্টির সেই চাহনি। চার্জারটা বুকের কাছে ধরে তিনি যেভাবে তাকিয়েছিলেন। "তোর ব্যাটারিও তো ডাউন হয়ে আছে..." আমি পাশ ফিরলাম। বালিশের নিচে মাথা গুঁজে দিলাম। কিন্তু আন্টির গলার স্বর মাথা থেকে যাচ্ছে না। তিনি কি এখন অপেক্ষা করছেন? তিনি কি দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন? ভাবছেন এই বুঝি হ্যান্ডেলটা ঘুরে উঠবে? সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। একটা, দেড়টা, দুটো।
আমি যাইনি। আমি আমার নিরাপদ দুর্গে শুয়ে শুয়ে নিজের কামনার গলা টিপে মারছি। আর ওপাশে হয়তো একজন নারী তার খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছেন। ভাবছেন—ছেলেটা ভীতু। ছেলেটা বাচ্চা।
পরের দিন সকাল। ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। রাতে প্রায় শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছিলাম। চোখ জ্বলছে। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। ভয়ে ভয়ে ডাইনিং টেবিলে গেলাম। আমার ধারণা ছিল, আজ সকালে আন্টির আচরণ বদলে যাবে। তিনি হয়তো আমার সাথে কথা বলবেন না, কিংবা রাগী দৃষ্টিতে তাকাবেন। অথবা আরও খারাপ—সবার সামনে কোনো অপমানজনক কথা বলে বসবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুই হলো না।
তনিমা আন্টি টেবিলে বসে বাবার সাথে দেশের জিডিপি আর ইনফ্লেশন নিয়ে তুমুল তর্ক করছেন। তার পরনে একটা সতেজ সুতি শাড়ি। চুলগুলো ভেজা, শ্যাম্পু করা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ভোরের শিউলি ফুল। এত স্নিগ্ধ, এত প্রাণবন্ত।
আমাকে দেখে তিনি হাসলেন। সেই স্বাভাবিক, প্রাণখোলা হাসি। "কিরে লেট লতিফ? গুড মর্নিং। বোস, চা খা।" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "গুড মর্নিং আন্টি।"
বসার সময় খেয়াল করলাম, তিনি আমার দিকে এক পলক তাকালেন। সেই তাকানোতে রাগ নেই, ঘৃণা নেই। আছে এক ধরণের কৌতুক। যেন তিনি কোনো মজার জোকস জানেন, যা শুধু আমরা দুজনই বুঝতে পারছি।
নাশতা শেষ করে বাবা আর মা বেরিয়ে গেলেন। মৃন্ময় কলেজে। বাসা ফাঁকা। আমি নিজের রুমে ল্যাপটপ অন করে বসে আছি। আসলে কোনো কাজ নেই, ভান করে বসে থাকা। একটু পর আন্টি ঢুকলেন। তার হাতে আমার সেই সাদা চার্জার। তিনি এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর চার্জারটা রাখলেন।
"নে, তোর জিনিস। থ্যাঙ্কস রে।"
আমি তাকালাম না। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বললাম, "চার্জ হয়েছে?" আন্টি একটু ঝুঁকে এলেন। তার ভেজা চুলের গন্ধ আমার নাকে লাগল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "ফোনে চার্জ হয়েছে। কিন্তু কানেকশনটা ঠিকমতো পেল না। লুজ কানেকশন ছিল বোধহয়। নাকি ভোল্টেজ কম ছিল?"
আমার বুক ধক করে উঠল। তিনি খোঁচা দিচ্ছেন। আমি তাকালাম তার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে সেই শয়তানি হাসি। "তন্ময়, তুই কি ইলেকট্রিশিয়ান ডাকবি? নাকি নিজেই চেক করবি কেন কানেকশন পেল না?" আমি ঢোক গিললাম। "আন্টি, আমি আসলে... রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টায়ার্ড ছিলাম।"
আন্টি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। হাসতে হাসতে বললেন, "হুঁ, টায়ার্ড তো থাকবিই। ওভারথিংকিং করলে মানুষ টায়ার্ড হয়ে যায়। বেশি ভাববি না তন্ময়। ব্রেইনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে। সাহসের ব্যাটারিও।" তিনি আর দাঁড়ালেন না। দুলকি চালে বেরিয়ে গেলেন। আমি বোকার মতো চার্জারটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। জড়বস্তু। কিন্তু ওটা এখন আমাকে উপহাস করছে।
সেই দুপুর থেকে শুরু হলো এক নতুন খেলা। স্নায়ুযুদ্ধ। তনিমা আন্টি আর সরাসরি কিছু বলছেন না। তিনি আমাকে আর ডাকছেন না, কোনো খোলা দরজার গল্প শোনাচ্ছেন না। কিন্তু তিনি এমন কিছু করছেন, যা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। তিনি আমার সামনে দিয়ে হাঁটার সময় শাড়ির আঁচলটা একটু অসতর্কভাবে ফেলে দিচ্ছেন। সোফায় বসার সময় তিনি আমার গা ঘেঁষে বসছেন না ঠিকই, কিন্তু এত কাছে বসছেন যে তার শরীরের তাপ আমি অনুভব করতে পারছি। টিভি দেখার সময় তিনি রিমোটটা নিতে গিয়ে আমার হাত স্পর্শ করছেন। খুব স্বাভাবিক স্পর্শ। কিন্তু তার আঙুলগুলো আমার হাতের ওপর একটু বেশি সময় থাকছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়। কিন্তু ওইটুকুই যথেষ্ট আমার হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
সেদিন বিকেলে মা ফোন করে বললেন ফিরতে দেরি হবে। আন্টি আমাকে ডাকলেন। "তন্ময়, একটু কিচেনে আয় তো। বয়ামটা খুলতে পারছি না।" আমি কিচেনে গেলাম। আন্টি একটা আচারের বয়াম হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বয়ামটা হাত থেকে নিলাম। মোচড় দিতেই খুলে গেল। "এই নিন।"আন্টি বয়ামটা নেওয়ার সময় আমার দিকে তাকালেন। তার চোখটা একটু ছোট হয়ে এল। "তোর হাতে তো অনেক জোর। বয়ামের মুখ তো খুললি। কিন্তু অন্য সময় এই জোর কই থাকে রে!”
কথাটা তনিমা আন্টি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন, যেন আচারের কথাই বলছেন। কিন্তু আমি জানি তিনি কী মিন করছেন। আমি বললাম, "কি বললেন! বুঝিনাই।” তিনি আঙুল দিয়ে একটু আচার তুলে মুখে দিলেন। চুষে খেলেন আঙুলটা। "কিছু না। মজা করছিলাম।” তিনি হাসতে হাসতে বয়াম নিয়ে চলে গেলেন। আমি কিচেনে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার শরীর ঘামছে। এই মহিলা আমাকে নিয়ে খেলছেন। ইঁদুর-বিড়াল খেলা।
পরের দুই দিন এই খেলা আরও তীব্র হলো। আন্টি যেন পণ করেছেন, তিনি মুখে কিছু বলবেন না, কিন্তু তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি আমাকে উস্কে দেবে। রাতের বেলা খাবার টেবিলে তিনি পায়ের ওপর পা তুলে বসেন। টেবিলের নিচে তার পা মাঝে মাঝে আমার পায়ে লাগে। আমি ভাবি ভুল করে লেগেছে। আমি পা সরিয়ে নিই। তিনি তখন মুচকি হাসেন। মৃন্ময় হয়তো তখনো টেবিলে আছে, বাবা আছেন। তাদের সামনেই তিনি এই নীরব ফ্লার্টিং চালিয়ে যান। এই ঝুঁকিটাই সম্ভবত তাকে আনন্দ দিচ্ছে।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায়। লোডশেডিং হয়েছে। জেনারেটর চালু হতে কয়েক মিনিট সময় লাগছে। পুরো বাসা অন্ধকার। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেলাম। তনিমা আন্টি। তিনি আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার অস্তিত্ব অনুভব করা যাচ্ছে। তনিমা আন্টি বললেন, "অন্ধকারটা সুন্দর না?" আমি বললাম, "হ্যাঁ। তবে ভয় লাগে।"
"কিসের ভয়?" তিনি আরও এক পা এগোলেন। তার বুক আমার পিঠ স্পর্শ করছে প্রায়।
"অন্ধকারে মানুষ ভুল করে ফেলে।"
আন্টি আমার কানের কাছে মুখ আনলেন। তার গরম নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে লাগছে।
"ভুল তো আলোতে হয় তন্ময়। অন্ধকারে যা হয়, তা হলো সত্য।”
আমার হাত নিশপিশ করছে। ইচ্ছে করছে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরি। তার ঔদ্ধত্য ভেঙে চুরমার করে দিই। কিন্তু সেই পুরনো ভয় আবার ফিরে এল। যদি জেনারেটর চলে আসে? যদি আলো জ্বলে ওঠে? আমি স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আন্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "তোর ব্যাটারি আসলেই ডেড রে। চার্জারেও কাজ হবে না। শক থেরাপি লাগবে।" ঠিক তখনই জেনারেটর চালু হলো। আলো জ্বলে উঠল। আন্টি সরে দাঁড়ালেন। আমি বুঝতে পারছি, আমি একটা লুপের মধ্যে আটকে গেছি। তনিমা আন্টি আমাকে পরীক্ষা করছেন। তিনি দেখছেন আমার ধৈর্যের বাঁধ কবে ভাঙে। তিনি দেখছেন আমি কবে সেই 'ছেলের মতো' খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসি।
তিনি সরাসরি ডাকছেন না, কিন্তু প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছেন—"আমি আছি। আমি প্রস্তুত। তোর শুধু সাহসটা দরকার।" রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবি, এই খেলা কতদিন চলবে? তিনি বাথরুমে যাওয়ার সময় তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে যান, দরজাটা একটু ফাঁক করে রাখেন। আমি করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি। চোখ ফিরিয়ে নিই, আবার তাকাই। তিনি সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ার সময় শাড়ির কুঁচিটা একটু ওপরে তুলে রাখেন। আমি আড়চোখে দেখি তার ফর্সা পায়ের পাতা, গোড়ালি। তিনি জানেন আমি দেখছি। তিনি সেটা এনজয় করেন।
একদিন দুপুরে মা বাসায় ছিলেন না। আন্টি ড্রয়িংরুমে সোফায় শুয়ে আছেন। আমি পানি খেতে এসেছিলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, "তন্ময়, আমার পিঠটা খুব ব্যথা করছে। একটু টিপে দিবি?" আমি থতমত খেলাম। "আমি?" "হ্যাঁ তুই। ঘরে আর কে আছে? আয় না।" আমি কাছে গেলাম। তিনি উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন। আমি তার পিঠে হাত রাখলাম। ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে তার পিঠের ত্বক দেখা যাচ্ছে। আমার হাত কাঁপছে। আমি আলতো করে চাপ দিতে লাগলাম। তনিমা আন্টি আরামে চোখ বন্ধ করলেন। "আহ! তোর হাতে জাদু আছে রে। আরেকটু জোরে দে। ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো কাঁচের পুতুল না যে ভেঙে যাব।" আমি চাপ বাড়ালাম। আমার আঙুল তার মেরুদণ্ড ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "তোর হাতটা নিচে নামা। কোমরের দিকে। ওখানে বেশি ব্যথা।"
আমি হাত নিচে নামালাম। কোমরের কাছে। শাড়ির ভাঁজ যেখানে শুরু হয়েছে। আমার আঙুল তার কোমরের নরম মাংসে ডুবল। আমার শরীরের রক্ত টগবগ করছে। এটা কি ম্যাসাজ হচ্ছে? নাকি অন্য কিছু? তনিমা আন্টি বললেন, "আরেকটু নিচে... হ্যাঁ... ওইখানে..." আমি জানি না আমি কী করছি। আমি সম্মোহিতের মতো তার নির্দেশ পালন করছি। হঠাৎ তিনি ঘুরে শুলেন। সোজা আমার দিকে তাকালেন। আমাদের মুখ খুব কাছাকাছি।
"তন্ময়..."
"জি আন্টি?"
"তুই কি সারা জীবন শুধু হুকুমই তামিল করবি? নিজে থেকে কিছু করবি না?"
"কী করব?"
"যা ইচ্ছে করে। তোর যা ইচ্ছে করে।"
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। সেই চোখে অতল গহ্বর। আমি ঝাঁপ দিতে চাই, কিন্তু আমার পায়ে শেকল। সংস্কারের শেকল। ভয়ের শেকল। ঠিক সেই মুহূর্তে কলিং বেল বেজে উঠল। মৃন্ময় কোচিং থেকে ফিরেছে। আন্টি বিরক্ত হয়ে চোখ উল্টালেন। "ধুর! টাইমিংটাই খারাপ। যা, দরজা খোল।" আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, আবার মরেও গেলাম। এই টাইমিংয়ের অভিশাপ আমাকে ছাড়ছে না।
তনিমা আন্টি এখন আর শুধু একজন অতিথি নন। তিনি আমার জীবনের এক জ্বলন্ত সমস্যা। তিনি আমার প্রতিটি মুহূর্ত দখল করে নিয়েছেন। আমি যখন বই পড়ি, অক্ষরের মাঝে তার মুখ ভাসে। আমি যখন গান শুনি, সুরে তার গলার স্বর শুনি। তিনি আমাকে পাগল করে দিচ্ছেন। ধীরে, সুনিপুণভাবে।তিনি আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, যেখান থেকে আর ফেরা যাবে না। তিনি আমাকে শেখাচ্ছেন, সংযম আর কামনার মাঝখানের সুতোটা কতটা সরু। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি গিয়ে বলি—"আন্টি, ক্ষান্ত দিন। আমি পারছি না।"
আবার মনে হয়, কেন ক্ষান্ত দেবেন? আমিই তো শুরু করেছিলাম সেই বারে গিয়ে। আমিই তো তাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। এখন তিনি খেলাটা তার হাতে তুলে নিয়েছেন। আমি এখন প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছি। স্টিয়ারিং তার হাতে। তিনি গাড়িটা কোথায় নিয়ে যাবেন—স্বর্গে না কি খাদে, সেটা একমাত্র তিনিই জানেন। আমি শুধু জানি, এই অস্থিরতা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। এই 'ভয়ঙ্কর অস্থিরতা'। চার্জার কানেকশন না পাওয়ার অস্থিরতা। আজ রাতেও হয়তো তিনি কোনো নতুন ফাঁদ পাতবেন। হয়তো পানি খাওয়ার নাম করে আমার ঘরে আসবেন। কিংবা বারান্দায় ডাকবেন। আমি প্রস্তুত থাকব। কিন্তু কিসের জন্য? পালিয়ে যাওয়ার জন্য? নাকি ধরা দেওয়ার জন্য? আমার নিজের ওপর আর কোনো বিশ্বাস নেই। আমি এখন এক বারুদস্তূপের ওপর বসে আছি, আর তনিমা আন্টি হাতে দিয়াশলাই নিয়ে আমার চারপাশে ঘুরছেন। আগুন জ্বলা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।
ভয়। পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম এবং শক্তিশালী অনুভূতি সম্ভবত এই ভয়। ভালোবাসার চেয়েও শক্তিশালী, ঘৃণার চেয়েও তীব্র। এই মুহূর্তে আমার শরীরের প্রতিটি কোষে যে অনুভূতিটা কাজ করছে, তার নাম ভয়। সামাজিক অপদস্থ হওয়ার ভয়, পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ভয়, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজের সাজানো জগতটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ভয়।
আমি বিছানায় বসে আছি। একটু আগেই তনিমা আন্টি চার্জার নিয়ে গেছেন। যাওয়ার সময় বলে গেছেন—"দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।" বাক্যটা খুব ছোট, কিন্তু এর ওজন হিমালয়ের সমান। এই ওজনের নিচে আমার সাহস চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
আমি আবার কল্পনা করলাম দৃশ্যটা—আমি পা টিপে টিপে যাচ্ছি। দরজায় হাত রাখছি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই হয়তো বাবা বাথরুমে যাওয়ার জন্য বের হলেন। কিংবা মৃন্ময় পানি খেতে বের হলো। আমাকে গেস্ট রুমের দরজার সামনে চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা কী ভাববে? আমি কী কৈফিয়ত দেব? বলব চার্জার ফেরত নিতে এসেছি? রাত একটায়? কিংবা আরও খারাপ কিছু। ঘরের ভেতরে ঢুকলাম। আন্টি হয়তো সত্যিই সিগন্যাল দিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তার মত বদলে গেল। নারীর মন তো আকাশের রঙের মতো, ক্ষণে ক্ষণে বদলায়। তিনি যদি তখন চিৎকার করে ওঠেন? যদি বলেন, "তন্ময়, তুই আমার ঘরে কেন?" ব্যাস! গেম ওভার। আমার জীবন শেষ।
না। এই ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। কিছুতেই না। আমি কাপুরুষ হতে পারি, কিন্তু আমি বোকা নই। একটা মুহূর্তের উত্তেজনার জন্য আমি আমার সারাজীবনের সম্মান বাজি ধরতে পারি না। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ধীর পায়ে দরজার কাছে গেলাম। কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য নয়, দরজাটা ভেতর থেকে লক করার জন্য। 'খট' করে ছিটকিনি লাগানোর শব্দ হলো। এই শব্দটা আমার কাপুরুষতার সিলমোহর। আমি নিজেকে নিজের ঘরে বন্দী করলাম। নিরাপদ, কিন্তু পরাজিত। বিছানায় ফিরে এলাম। লাইট নিভিয়ে দিলাম। অন্ধকার ঘরে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমার চোখের সামনে ভাসছে তনিমা আন্টির সেই চাহনি। চার্জারটা বুকের কাছে ধরে তিনি যেভাবে তাকিয়েছিলেন। "তোর ব্যাটারিও তো ডাউন হয়ে আছে..." আমি পাশ ফিরলাম। বালিশের নিচে মাথা গুঁজে দিলাম। কিন্তু আন্টির গলার স্বর মাথা থেকে যাচ্ছে না। তিনি কি এখন অপেক্ষা করছেন? তিনি কি দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন? ভাবছেন এই বুঝি হ্যান্ডেলটা ঘুরে উঠবে? সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। একটা, দেড়টা, দুটো।
আমি যাইনি। আমি আমার নিরাপদ দুর্গে শুয়ে শুয়ে নিজের কামনার গলা টিপে মারছি। আর ওপাশে হয়তো একজন নারী তার খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছেন। ভাবছেন—ছেলেটা ভীতু। ছেলেটা বাচ্চা।
পরের দিন সকাল। ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। রাতে প্রায় শেষ প্রহরে ঘুমিয়েছিলাম। চোখ জ্বলছে। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। ভয়ে ভয়ে ডাইনিং টেবিলে গেলাম। আমার ধারণা ছিল, আজ সকালে আন্টির আচরণ বদলে যাবে। তিনি হয়তো আমার সাথে কথা বলবেন না, কিংবা রাগী দৃষ্টিতে তাকাবেন। অথবা আরও খারাপ—সবার সামনে কোনো অপমানজনক কথা বলে বসবেন। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কিছুই হলো না।
তনিমা আন্টি টেবিলে বসে বাবার সাথে দেশের জিডিপি আর ইনফ্লেশন নিয়ে তুমুল তর্ক করছেন। তার পরনে একটা সতেজ সুতি শাড়ি। চুলগুলো ভেজা, শ্যাম্পু করা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে ভোরের শিউলি ফুল। এত স্নিগ্ধ, এত প্রাণবন্ত।
আমাকে দেখে তিনি হাসলেন। সেই স্বাভাবিক, প্রাণখোলা হাসি। "কিরে লেট লতিফ? গুড মর্নিং। বোস, চা খা।" আমি আমতা আমতা করে বললাম, "গুড মর্নিং আন্টি।"
বসার সময় খেয়াল করলাম, তিনি আমার দিকে এক পলক তাকালেন। সেই তাকানোতে রাগ নেই, ঘৃণা নেই। আছে এক ধরণের কৌতুক। যেন তিনি কোনো মজার জোকস জানেন, যা শুধু আমরা দুজনই বুঝতে পারছি।
নাশতা শেষ করে বাবা আর মা বেরিয়ে গেলেন। মৃন্ময় কলেজে। বাসা ফাঁকা। আমি নিজের রুমে ল্যাপটপ অন করে বসে আছি। আসলে কোনো কাজ নেই, ভান করে বসে থাকা। একটু পর আন্টি ঢুকলেন। তার হাতে আমার সেই সাদা চার্জার। তিনি এগিয়ে এসে টেবিলের ওপর চার্জারটা রাখলেন।
"নে, তোর জিনিস। থ্যাঙ্কস রে।"
আমি তাকালাম না। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বললাম, "চার্জ হয়েছে?" আন্টি একটু ঝুঁকে এলেন। তার ভেজা চুলের গন্ধ আমার নাকে লাগল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "ফোনে চার্জ হয়েছে। কিন্তু কানেকশনটা ঠিকমতো পেল না। লুজ কানেকশন ছিল বোধহয়। নাকি ভোল্টেজ কম ছিল?"
আমার বুক ধক করে উঠল। তিনি খোঁচা দিচ্ছেন। আমি তাকালাম তার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে সেই শয়তানি হাসি। "তন্ময়, তুই কি ইলেকট্রিশিয়ান ডাকবি? নাকি নিজেই চেক করবি কেন কানেকশন পেল না?" আমি ঢোক গিললাম। "আন্টি, আমি আসলে... রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। টায়ার্ড ছিলাম।"
আন্টি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। হাসতে হাসতে বললেন, "হুঁ, টায়ার্ড তো থাকবিই। ওভারথিংকিং করলে মানুষ টায়ার্ড হয়ে যায়। বেশি ভাববি না তন্ময়। ব্রেইনের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাবে। সাহসের ব্যাটারিও।" তিনি আর দাঁড়ালেন না। দুলকি চালে বেরিয়ে গেলেন। আমি বোকার মতো চার্জারটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। জড়বস্তু। কিন্তু ওটা এখন আমাকে উপহাস করছে।
সেই দুপুর থেকে শুরু হলো এক নতুন খেলা। স্নায়ুযুদ্ধ। তনিমা আন্টি আর সরাসরি কিছু বলছেন না। তিনি আমাকে আর ডাকছেন না, কোনো খোলা দরজার গল্প শোনাচ্ছেন না। কিন্তু তিনি এমন কিছু করছেন, যা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। তিনি আমার সামনে দিয়ে হাঁটার সময় শাড়ির আঁচলটা একটু অসতর্কভাবে ফেলে দিচ্ছেন। সোফায় বসার সময় তিনি আমার গা ঘেঁষে বসছেন না ঠিকই, কিন্তু এত কাছে বসছেন যে তার শরীরের তাপ আমি অনুভব করতে পারছি। টিভি দেখার সময় তিনি রিমোটটা নিতে গিয়ে আমার হাত স্পর্শ করছেন। খুব স্বাভাবিক স্পর্শ। কিন্তু তার আঙুলগুলো আমার হাতের ওপর একটু বেশি সময় থাকছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়। কিন্তু ওইটুকুই যথেষ্ট আমার হার্টবিট বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।
সেদিন বিকেলে মা ফোন করে বললেন ফিরতে দেরি হবে। আন্টি আমাকে ডাকলেন। "তন্ময়, একটু কিচেনে আয় তো। বয়ামটা খুলতে পারছি না।" আমি কিচেনে গেলাম। আন্টি একটা আচারের বয়াম হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বয়ামটা হাত থেকে নিলাম। মোচড় দিতেই খুলে গেল। "এই নিন।"আন্টি বয়ামটা নেওয়ার সময় আমার দিকে তাকালেন। তার চোখটা একটু ছোট হয়ে এল। "তোর হাতে তো অনেক জোর। বয়ামের মুখ তো খুললি। কিন্তু অন্য সময় এই জোর কই থাকে রে!”
কথাটা তনিমা আন্টি খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন, যেন আচারের কথাই বলছেন। কিন্তু আমি জানি তিনি কী মিন করছেন। আমি বললাম, "কি বললেন! বুঝিনাই।” তিনি আঙুল দিয়ে একটু আচার তুলে মুখে দিলেন। চুষে খেলেন আঙুলটা। "কিছু না। মজা করছিলাম।” তিনি হাসতে হাসতে বয়াম নিয়ে চলে গেলেন। আমি কিচেনে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার শরীর ঘামছে। এই মহিলা আমাকে নিয়ে খেলছেন। ইঁদুর-বিড়াল খেলা।
পরের দুই দিন এই খেলা আরও তীব্র হলো। আন্টি যেন পণ করেছেন, তিনি মুখে কিছু বলবেন না, কিন্তু তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি আমাকে উস্কে দেবে। রাতের বেলা খাবার টেবিলে তিনি পায়ের ওপর পা তুলে বসেন। টেবিলের নিচে তার পা মাঝে মাঝে আমার পায়ে লাগে। আমি ভাবি ভুল করে লেগেছে। আমি পা সরিয়ে নিই। তিনি তখন মুচকি হাসেন। মৃন্ময় হয়তো তখনো টেবিলে আছে, বাবা আছেন। তাদের সামনেই তিনি এই নীরব ফ্লার্টিং চালিয়ে যান। এই ঝুঁকিটাই সম্ভবত তাকে আনন্দ দিচ্ছে।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যায়। লোডশেডিং হয়েছে। জেনারেটর চালু হতে কয়েক মিনিট সময় লাগছে। পুরো বাসা অন্ধকার। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ পেছনে কারো উপস্থিতি টের পেলাম। তনিমা আন্টি। তিনি আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার অস্তিত্ব অনুভব করা যাচ্ছে। তনিমা আন্টি বললেন, "অন্ধকারটা সুন্দর না?" আমি বললাম, "হ্যাঁ। তবে ভয় লাগে।"
"কিসের ভয়?" তিনি আরও এক পা এগোলেন। তার বুক আমার পিঠ স্পর্শ করছে প্রায়।
"অন্ধকারে মানুষ ভুল করে ফেলে।"
আন্টি আমার কানের কাছে মুখ আনলেন। তার গরম নিঃশ্বাস আমার ঘাড়ে লাগছে।
"ভুল তো আলোতে হয় তন্ময়। অন্ধকারে যা হয়, তা হলো সত্য।”
আমার হাত নিশপিশ করছে। ইচ্ছে করছে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরি। তার ঔদ্ধত্য ভেঙে চুরমার করে দিই। কিন্তু সেই পুরনো ভয় আবার ফিরে এল। যদি জেনারেটর চলে আসে? যদি আলো জ্বলে ওঠে? আমি স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আন্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "তোর ব্যাটারি আসলেই ডেড রে। চার্জারেও কাজ হবে না। শক থেরাপি লাগবে।" ঠিক তখনই জেনারেটর চালু হলো। আলো জ্বলে উঠল। আন্টি সরে দাঁড়ালেন। আমি বুঝতে পারছি, আমি একটা লুপের মধ্যে আটকে গেছি। তনিমা আন্টি আমাকে পরীক্ষা করছেন। তিনি দেখছেন আমার ধৈর্যের বাঁধ কবে ভাঙে। তিনি দেখছেন আমি কবে সেই 'ছেলের মতো' খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসি।
তিনি সরাসরি ডাকছেন না, কিন্তু প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছেন—"আমি আছি। আমি প্রস্তুত। তোর শুধু সাহসটা দরকার।" রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবি, এই খেলা কতদিন চলবে? তিনি বাথরুমে যাওয়ার সময় তোয়ালেটা কাঁধে ফেলে যান, দরজাটা একটু ফাঁক করে রাখেন। আমি করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখি। চোখ ফিরিয়ে নিই, আবার তাকাই। তিনি সোফায় বসে ম্যাগাজিন পড়ার সময় শাড়ির কুঁচিটা একটু ওপরে তুলে রাখেন। আমি আড়চোখে দেখি তার ফর্সা পায়ের পাতা, গোড়ালি। তিনি জানেন আমি দেখছি। তিনি সেটা এনজয় করেন।
একদিন দুপুরে মা বাসায় ছিলেন না। আন্টি ড্রয়িংরুমে সোফায় শুয়ে আছেন। আমি পানি খেতে এসেছিলাম। আমাকে দেখে তিনি বললেন, "তন্ময়, আমার পিঠটা খুব ব্যথা করছে। একটু টিপে দিবি?" আমি থতমত খেলাম। "আমি?" "হ্যাঁ তুই। ঘরে আর কে আছে? আয় না।" আমি কাছে গেলাম। তিনি উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন। আমি তার পিঠে হাত রাখলাম। ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে তার পিঠের ত্বক দেখা যাচ্ছে। আমার হাত কাঁপছে। আমি আলতো করে চাপ দিতে লাগলাম। তনিমা আন্টি আরামে চোখ বন্ধ করলেন। "আহ! তোর হাতে জাদু আছে রে। আরেকটু জোরে দে। ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো কাঁচের পুতুল না যে ভেঙে যাব।" আমি চাপ বাড়ালাম। আমার আঙুল তার মেরুদণ্ড ছুঁয়ে যাচ্ছে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, "তোর হাতটা নিচে নামা। কোমরের দিকে। ওখানে বেশি ব্যথা।"
আমি হাত নিচে নামালাম। কোমরের কাছে। শাড়ির ভাঁজ যেখানে শুরু হয়েছে। আমার আঙুল তার কোমরের নরম মাংসে ডুবল। আমার শরীরের রক্ত টগবগ করছে। এটা কি ম্যাসাজ হচ্ছে? নাকি অন্য কিছু? তনিমা আন্টি বললেন, "আরেকটু নিচে... হ্যাঁ... ওইখানে..." আমি জানি না আমি কী করছি। আমি সম্মোহিতের মতো তার নির্দেশ পালন করছি। হঠাৎ তিনি ঘুরে শুলেন। সোজা আমার দিকে তাকালেন। আমাদের মুখ খুব কাছাকাছি।
"তন্ময়..."
"জি আন্টি?"
"তুই কি সারা জীবন শুধু হুকুমই তামিল করবি? নিজে থেকে কিছু করবি না?"
"কী করব?"
"যা ইচ্ছে করে। তোর যা ইচ্ছে করে।"
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি। সেই চোখে অতল গহ্বর। আমি ঝাঁপ দিতে চাই, কিন্তু আমার পায়ে শেকল। সংস্কারের শেকল। ভয়ের শেকল। ঠিক সেই মুহূর্তে কলিং বেল বেজে উঠল। মৃন্ময় কোচিং থেকে ফিরেছে। আন্টি বিরক্ত হয়ে চোখ উল্টালেন। "ধুর! টাইমিংটাই খারাপ। যা, দরজা খোল।" আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম, আবার মরেও গেলাম। এই টাইমিংয়ের অভিশাপ আমাকে ছাড়ছে না।
তনিমা আন্টি এখন আর শুধু একজন অতিথি নন। তিনি আমার জীবনের এক জ্বলন্ত সমস্যা। তিনি আমার প্রতিটি মুহূর্ত দখল করে নিয়েছেন। আমি যখন বই পড়ি, অক্ষরের মাঝে তার মুখ ভাসে। আমি যখন গান শুনি, সুরে তার গলার স্বর শুনি। তিনি আমাকে পাগল করে দিচ্ছেন। ধীরে, সুনিপুণভাবে।তিনি আমাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, যেখান থেকে আর ফেরা যাবে না। তিনি আমাকে শেখাচ্ছেন, সংযম আর কামনার মাঝখানের সুতোটা কতটা সরু। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি গিয়ে বলি—"আন্টি, ক্ষান্ত দিন। আমি পারছি না।"
আবার মনে হয়, কেন ক্ষান্ত দেবেন? আমিই তো শুরু করেছিলাম সেই বারে গিয়ে। আমিই তো তাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। এখন তিনি খেলাটা তার হাতে তুলে নিয়েছেন। আমি এখন প্যাসেঞ্জার সিটে বসে আছি। স্টিয়ারিং তার হাতে। তিনি গাড়িটা কোথায় নিয়ে যাবেন—স্বর্গে না কি খাদে, সেটা একমাত্র তিনিই জানেন। আমি শুধু জানি, এই অস্থিরতা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। এই 'ভয়ঙ্কর অস্থিরতা'। চার্জার কানেকশন না পাওয়ার অস্থিরতা। আজ রাতেও হয়তো তিনি কোনো নতুন ফাঁদ পাতবেন। হয়তো পানি খাওয়ার নাম করে আমার ঘরে আসবেন। কিংবা বারান্দায় ডাকবেন। আমি প্রস্তুত থাকব। কিন্তু কিসের জন্য? পালিয়ে যাওয়ার জন্য? নাকি ধরা দেওয়ার জন্য? আমার নিজের ওপর আর কোনো বিশ্বাস নেই। আমি এখন এক বারুদস্তূপের ওপর বসে আছি, আর তনিমা আন্টি হাতে দিয়াশলাই নিয়ে আমার চারপাশে ঘুরছেন। আগুন জ্বলা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)