Thread Rating:
  • 3 Vote(s) - 3.33 Average
  • 1
  • 2
  • 3
  • 4
  • 5
অভিশপ্ত গ্রাম
#1
Wink 
অভিশপ্ত গ্রাম

রাত তখন গভীর। কালীপুর গ্রামের আকাশে চাঁদ উঠেছে পূর্ণিমার, কিন্তু তার আলো যেন অভিশপ্ত—ঠান্ডা, ফ্যাকাশে, আর ভয়াল। গ্রামের পুকুরের ধার ঘন কুয়াশায় ঢাকা, আর দূরের বাঁশঝাড় থেকে বাতাসের শব্দ আসছে যেন কারো ফিসফিসানি। রাহুকের পা দুটো কাঁপছে, কিন্তু সে থামতে পারছে না। তার হাতে মোবাইল ফোনটা আঁকড়ে ধরা—যে ফোনটা এখন তার জীবনের একমাত্র সাক্ষী, আর মৃত্যুর কারণ।

কয়েক ঘণ্টা আগের কথা মনে পড়ছে রাহুকের। সে গ্রামে এসেছে মাত্র তিন দিন হলো। বাবার মৃত্যুর পর শহরের ফ্ল্যাট ছেড়ে এসেছে এই পুরনো চৌধুরী বাড়িতে। গ্রামবাসী তাকে স্বাগত জানায়নি। চোখে চোখে যেন একটা ভয় মিশ্রিত সন্দেহ। প্রথম রাতেই সে শুনেছে পুরনো গল্প—পুকুরের অভিশাপ, জমিদারের লোভ, আর প্রতি পূর্ণিমায় একটা মৃত্যু। রাহুক হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। সে আধুনিক মানুষ, ইঞ্জিনিয়ার, শহরের ছেলে। ভূত-প্রেতে তার বিশ্বাস নেই।

কিন্তু আজ রাতে সব বদলে গেছে।

পূর্ণিমার রাতে গ্রামের লোকেরা জড়ো হয়েছিল পুরনো শিব মন্দিরের পিছনে, জঙ্গলের গভীরে একটা গোপন জায়গায়। রাহুক কৌতূহলবশত তাদের পিছু নিয়েছিল। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গিয়েছিল। আর যা দেখেছে, তা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য।

মন্দিরের পিছনে একটা ছোট্ট খোলা জায়গা। চারদিকে মশাল জ্বলছে। গ্রামের মাতব্বর হারুন মিয়া দাঁড়িয়ে আছে মাঝখানে, তার হাতে একটা ছুরি। আর তার সামনে বাঁধা একটা ছেলে—বয়স আঠারো-উনিশ। গ্রামেরই কারো ছেলে, যার চোখে ভয় আর অশ্রু। চারদিকে গ্রামের প্রভাবশালী লোকেরা—চৌধুরী বাড়ির দূর সম্পর্কের আত্মীয়, পঞ্চায়েতের সদস্যরা, এমনকি গ্রামের মৌলভি পর্যন্ত। তারা গান গাইছে, একটা পুরনো মন্ত্র—যেন অভিশাপকে শান্ত করার জন্য বলি দিচ্ছে।

"এই বলি না দিলে অভিশাপ যাবে না," হারুন মিয়া বলেছিল। "প্রতি পূর্ণিমায় একজনকে দিতে হয়। না হলে পুকুরের সেই আত্মা ফিরে আসবে, সবাইকে নিয়ে যাবে।"

রাহুক লুকিয়ে ভিডিও করছিল। মোবাইলের ক্যামেরা জুম করে সব রেকর্ড করছিল—ছুরি ওঠা, ছেলেটার চিৎকার, রক্ত পড়া, আর লোকদের মুখে সেই ভয় মিশ্রিত সন্তুষ্টি। এটা শুধু কুসংস্কার নয়—এটা খুন। সিরিয়াল কিলিং, যাকে তারা অভিশাপের নামে ঢাকছে। হয়তো বছরের পর বছর ধরে চলছে এই গোপন রিচুয়াল। জমিদারের বংশধররা এটাকে বজায় রেখেছে যাতে তাদের ক্ষমতা থাকে, আর গ্রামের লোকেরা ভয়ে চুপ থাকে।

কিন্তু রাহুকের পায়ের তলায় একটা ডাল ভেঙে শব্দ হয়েছিল। সবাই ঘুরে তাকিয়েছে। "কে ওখানে?" হারুন মিয়ার চিৎকার। রাহুক পালাতে শুরু করেছে। আর এখন সে দৌড়াচ্ছে জীবনের শেষ দৌড়।

পিছনে পায়ের শব্দ—কমপক্ষে দশ-পনেরো জন। লাঠি, দা, রশি নিয়ে তারা দৌড়াচ্ছে। "ধর ওকে! ও সব দেখে ফেলেছে!" হারুন মিয়ার গর্জন। "ভিডিও করেছে! পুলিশে দিলে সব শেষ!"

রাহুকের শ্বাস ভারী। গ্রামের সরু পথ দিয়ে দৌড়াচ্ছে সে। চারদিকে ধানখেত, কিন্তু তার মধ্যে লুকানোর জায়গা নেই। মোবাইলটা পকেটে ঢোকানো, কিন্তু সে জানে এটাই তার একমাত্র প্রমাণ। যদি পালাতে পারে, শহরে গিয়ে পুলিশকে দিতে পারে। কিন্তু কীভাবে? গ্রামের রাস্তা বন্ধ, আর এরা সবাই এক।

"ওই যে ও!" একজন চেঁচিয়ে উঠল। রাহুক ঘুরে দেখল—দূরে মশালের আলো। তারা কাছে আসছে। সে জঙ্গলের দিকে দৌড়াল। গ্রামের পিছনে একটা ছোট পাহাড়—স্থানীয়রা বলে "মৃত্যুর পাহাড়"। উঁচু নয়, কিন্তু নিচে খাদ, পাথর আর জঙ্গল। অনেকে সেখান থেকে পড়ে মরেছে, বলা হয় আত্মহত্যা। কিন্তু এখন রাহুক বুঝেছে—এরা ফেলে দেয়।

পা দুটো ব্যথা করছে। কাঁটা বিঁধছে। গাছের ডাল মুখ চেপে ধরছে। কিন্তু সে থামছে না। মনে পড়ছে শহরের জীবন—অফিস, বন্ধুরা, তার প্রেমিকা যে অপেক্ষা করছে। "না, আমি মরব না," সে ফিসফিস করে। মোবাইল বের করে সে দ্রুত একটা মেসেজ টাইপ করার চেষ্টা করে—পুলিশের নাম্বারে ভিডিও সেন্ড করার। কিন্তু নেটওয়ার্ক নেই। গ্রামে সিগন্যাল কম, আর জঙ্গলে তো নেইই।

পিছনে হাসির শব্দ। "হা হা হা! পালাচ্ছে দেখ! কোথায় পালাবি রাহুক বাবু?" একজনের গলা—গ্রামের যুবক রফিক। "তোর বাবাও তো জানত সব। কিন্তু চুপ ছিলেন। তুই কেন নাক গলালি?"

রাহুকের হৃদয় ধক করে উঠল। বাবা জানত? তাই কি বাবা মরেছে অকালে? হার্ট অ্যাটাক বলা হয়েছিল, কিন্তু এখন সন্দেহ হচ্ছে।

সে আরও দ্রুত দৌড়াল। পাহাড়ের গোড়ায় পৌঁছেছে। উঠতে শুরু করল। পাথরে পা আঁকড়ে, হাতে ঘাস ধরে। পিছনে লোকেরা কাছে। মশালের আলোয় তার ছায়া দেখা যাচ্ছে। "উঠছে পাহাড়ে! ধর ওকে!"

রাহুকের শরীর ঘামে ভিজে গেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে পাহাড়ের মাঝামাঝি পৌঁছেছে। নিচে খাদ—গভীর অন্ধকার। যদি পড়ে, বাঁচার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু পিছনে তারা। সে থামল না। উপরে উঠতে লাগল।

হঠাৎ একটা পাথর ছুঁড়ে মারল কেউ। রাহুকের পিঠে লাগল। ব্যথায় চিৎকার করে সে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু হাত দিয়ে ধরে ফেলল। "ধরা পড়লে মরব," সে ভাবল। মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে সে দ্রুত ভিডিওটা চেক করল—হ্যাঁ, রেকর্ড হয়েছে। সব প্রমাণ আছে।

পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছেছে সে। চারদিকে জঙ্গল, কিন্তু পালানোর রাস্তা নেই। পিছনে লোকেরা উঠে আসছে। হারুন মিয়া সামনে। তার মুখে হাসি—ভয়ংকর হাসি। "শেষ রাহুক বাবু। তুই অনেক দেখে ফেলেছিস।"

রাহুক পিছিয়ে গেল। তার পা খাদের কিনারায়। "তোমরা খুনি! সবাই খুনি! এটা বলি নয়, খুন!" সে চেঁচিয়ে বলল।

লোকেরা হাসতে লাগল। "হা হা হা! বলি না তো কী? অভিশাপকে শান্ত করতে হয়। তোর বংশই তো শুরু করেছে এই অভিশাপ। জমিদার চন্দ্রশেখর তোর পূর্বপুরুষ। তার লোভে মেয়েটা মরেছে। এখন আমরা শুধু বজায় রাখি।"

রাহুকের মাথা ঘুরে গেল। তার পূর্বপুরুষ? তাই কি তার বাবা চুপ ছিলেন?

"মোবাইল দে," হারুন মিয়া এগিয়ে এল। "না দিলে কষ্ট দিয়ে মারব।"

রাহুক মোবাইলটা আঁকড়ে ধরল। "না! এটা পুলিশ পাবে!"

লোকেরা আরও হাসল। "পুলিশ? এই গ্রামে পুলিশ আসে না। আমরাই আইন।"

তারা এগিয়ে এল। রাহুক পিছিয়ে গেল। তার পা পিছলে গেল খাদের কিনারায়। সে চিৎকার করল, কিন্তু হাত ধরার কেউ নেই। লোকেরা হাসতে হাসতে দেখল—রাহুক পড়ে গেল নিচে। মোবাইলটা তার হাত থেকে ছিটকে গেল জঙ্গলে।

অন্ধকারে তার চিৎকার মিলিয়ে গেল। আর লোকেরা হাসতে হাসতে ফিরে গেল গ্রামে। "আরেকটা দুর্ঘটনা," হারুন মিয়া বলল। "পাহাড় থেকে পড়ে মরেছে। অভিশাপের শিকার।"
কিন্তু জঙ্গলে মোবাইলটা পড়ে আছে। স্ক্রিনে ভিডিওটা এখনো প্লে হচ্ছে...
Like Reply
Do not mention / post any under age /rape content. If found Please use REPORT button.


Messages In This Thread
অভিশপ্ত গ্রাম - by কাল্পনিক অতিথি - 28-01-2026, 10:19 AM



Users browsing this thread: