27-01-2026, 12:45 AM
৭
রাত তিনটে। শহরের এই সময়টাকে আমার মনে হয় 'সত্যের সময়'। দিনের বেলা আমরা সবাই কোনো না কোনো মুখোশ পরে থাকি—ভদ্রতার মুখোশ, ব্যস্ততার মুখোশ, কিংবা সুখের মুখোশ। কিন্তু রাত তিনটের এই গভীর নির্জনতায় মুখোশগুলো খসে পড়ে। তখন আমরা শুধুই রক্ত-মাংসের মানুষ, যার ভেতরে এক সমুদ্র হাহাকার আর আদিম ক্ষুধা লুকিয়ে থাকে।
আমি বিছানায় শুয়ে আছি, কিন্তু ঘুম আসছে না। চোখের সামনে ভাসছে লিফটের সেই দৃশ্য। তনিমা আন্টির সেই আরক্ত চোখ, সেই আকুতি—"লাভ মি ডার্লিং..."। শরীর থেকে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গোসলের পরেও মনে হচ্ছে তার স্পর্শটা আমার চামড়ার নিচে রয়ে গেছে। এটা কি ঘৃণা? নাকি করুণা? নাকি অন্য কিছু? ফোনটা বালিশের পাশে রাখা ছিল। হঠাৎ ভাইব্রেশনের শব্দে নড়ে উঠল।স্ক্রিনের আলোয় ঘরটা মুহূর্তের জন্য আলোকিত হল। হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন, সেন্ডার: তনিমা আন্টি।
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আন্টি কি জেগে আছেন? আমি কাঁপা হাতে ফোনটা আনলক করলাম। একটা লম্বা মেসেজ। "তন্ময়, ঘুমাচ্ছিস? জানি অনেক রাত। ঘুম আসার কথা না। আমারও আসছে না। শোন, আজ রাতে যা হয়েছে... আই মিন, লাকি বারে এবং গাড়িতে... আমি আসলে সেন্সে ছিলাম না। আমি জানি না আমি কী বলেছি বা কী করেছি। ব্ল্যাকআউট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবছা আবছা মনে পড়ছে তুই আমাকে খুব কেয়ারফুলি হ্যান্ডেল করেছিস। ইউ বিহেভড লাইক এ ট্রু জেন্টলম্যান। আমি মাতাল অবস্থায় তোকে যা বলেছি, বা যদি খারাপ কোনো বিহেভ করে থাকি—প্লিজ ফরগেট ইট। ওটা আমি ছিলাম না, ওটা ছিল অ্যালকোহল আর আমার ডিপ্রেশন। তুই আমার ছেলের মতো। আমি তোকে ওই নজরে দেখি না রে। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। এন্ড এগেইন থ্যাঙ্কস ফর সেভিং মাই ইজ্জত। কাল সকালে দেখা হবে।"
মেসেজটা আমি দুইবার পড়লাম। খুব গুছিয়ে লেখা। বোঝা যাচ্ছে, নেশা কেটে গেছে। তিনি এখন ড্যামেজ কন্ট্রোল মোডে আছেন। তিনি নিজেকে 'মা' বা 'বড় বোন' এর আসনে আবার বসাতে চাইছেন। 'তুই আমার ছেলের মতো'—লাইনটা পড়ে আমার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটল। ছেলের মতো? ছেলেরা কি লিফটের কোণায় এভাবে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চায়? মাতাল হলেও অবচেতন মন তো মিথ্যা বলে না। ফ্রয়েড তো তাই বলে গেছেন। আমি কোনো রিপ্লাই দিলাম না। সিন করলাম, কিন্তু নীল দাগ ওঠার আগেই ফোনটা রেখে দিলাম। সব কথার উত্তর দিতে নেই। মাঝে মাঝে নীরবতা শব্দের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
পরের তিন-চার দিন কাটল এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তার মধ্য দিয়ে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক। তনিমা আন্টি সকালে ঘুম থেকে উঠছেন, নাশতার টেবিলে বাবার সাথে রাজনীতির আলাপ করছেন, মায়ের সাথে হাসাহাসি করছেন। তার আচরণে সেই রাতের কোনো চিহ্ন নেই। তিনি এমনভাবে আমার সাথে কথা বলছেন যেন আমরা দুজনেই অ্যামনেসিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত। সেই রাতটা যেন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
আমরা আবার বের হচ্ছি। তেজগাঁও ভূমি অফিস, গুলশানের ব্যাংক, আর রাজউকের করিডোর। কিন্তু সমস্যাটা হলো আমার ভেতরে। আমার ভেতরের 'তন্ময়' আর আগের মতো নেই। সেই রাতে লিফটের ওই কয়েক মিনিটের ঘটনা আমার মস্তিষ্কের নিউরনে একটা শর্টসার্কিট ঘটিয়ে দিয়েছে। আগে আমি তাকে দেখতাম 'মায়ের বান্ধবী' হিসেবে। এখন আমি তাকে দেখি 'নারী' হিসেবে। আমাদের সমাজ আমাদেরকে ছোটবেলা থেকে শেখায়—কিছু সম্পর্ক পবিত্র, কিছু সীমানা অলংঘনীয়। মায়ের বান্ধবী মানেই মা। তার দিকে তাকানো পাপ, তার শরীর নিয়ে ভাবা মহাপাপ। কিন্তু শরীর কি আর পাপ-পুণ্যের ধার ধারে? টেস্টোস্টেরন কি সম্পর্কের সমীকরণ মেনে ক্ষরিত হয়?
আমি এখন চোরের মতো তাকে দেখি। রিকশায় যখন তিনি পাশে বসেন, আমি আড়চোখে তার গলার ভাঁজটা দেখি। তার হাতের আঙুলগুলো দেখি। তিনি যখন কথা বলার সময় চুলে হাত বোলান, আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কম্পন হয়। এই কম্পনটা শ্রদ্ধার নয়, কামনার। আমি নিজেকে ধিক্কার দিই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলি, "ছিঃ তন্ময়! তুই এত নিচ? উনি তোর বয়সের দ্বিগুণ। উনি তোকে বিশ্বাস করেন।" কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে পড়ে সেই রাতের কথা। তার শরীরের ভার আমার ওপর। তার গরম নিঃশ্বাস। তার সেই ফিসফিসানি—"মেইক মি ইওরস"। তানিম আন্টি মাতাল ছিলেন, ঠিক আছে। কিন্তু ওই মাতাল অবস্থাতেই তিনি আমার পৌরুষকে একটা সিগন্যাল দিয়ে গেছেন। সেই সিগন্যালটা আমি কিছুতেই ইগনোর করতে পারছি না।
তনিমা আন্টি যে অত্যন্ত রূপবতী এবং শরীর সচেতন, সেটা আমি নতুন করে আবিষ্কার করলাম। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে বাঙালি নারীরা সাধারণত মুটিয়ে যান, শরীরে ভাঁজ পড়ে। কিন্তু আন্টি নিয়মিত জিম করেন। তার শরীর ছিপছিপে, টানটান। জিন্স আর টি-শার্টে তাকে যখন দেখি, তখন মনে হয় তিনি ত্রিশের কোঠার কোনো যুবতী। তার গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতো। আর তার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে—দামি ফ্রেঞ্চ পারফিউম আর তার শরীরের ঘাম মিশিয়ে এক মাদকতাময় গন্ধ। রিকশায় হুড তুলে যখন আমরা পাশাপাশি বসি, সেই গন্ধটা আমাকে মাতাল করে দেয়। আমি মদ্যপান করি না, কিন্তু এই গন্ধ শুঁকে আমার নেশা হয়।
সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় তাস খেলা হচ্ছে। বাবা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছেন। মা, বাবা, আন্টি আর আমি—চারজন মিলে ডাইনিং টেবিলে বসেছি। খেলা হচ্ছে 'টোয়েন্টি নাইন'। আন্টি আর আমি পার্টনার। মা আর বাবা পার্টনার। আন্টি বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। তিনি স্লিভলেস একটা কামিজ পরেছেন। গায়ের ওপর পাতলা ওড়না। খেলা জমে উঠেছে। কার্ড নিতে যখনই ঝুঁকছেন, তার ওড়নাটা সরে যাচ্ছে। আমি খুব কাছ থেকে তার কাঁধ, তার বুকের ওপরের অংশ দেখতে পাচ্ছি। আমার কান গরম হয়ে যাচ্ছে। আমি চোখ সরিয়ে নিতে চাইছি, কিন্তু পারছি না। চুম্বক যেমন লোহাকে টানে, নিষিদ্ধ জিনিসও মানুষকে তেমনই টানে।
দিনগুলো এভাবেই কাটছিল। এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা। আন্টি আমাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন, আর আমি সেই স্বাভাবিকতার আড়ালে অস্বাভাবিক হয়ে উঠছি। আমি বুঝতে পারছিলাম, আন্টির মধ্যেও একটা পরিবর্তন আসছে। তিনি হয়তো মুখে বলছেন "তুই ছেলের মতো", কিন্তু তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অন্য কথা বলছে। তিনি এখন আমার সামনে একটু বেশিই সচেতনভাবে শরীর এলেমেলো করেন। রিকশায় ওঠার সময় তিনি আমার হাত ধরেন সাপোর্টের জন্য, যদিও তার সাপোর্টের দরকার নেই। মাঝে মাঝে আমাদের চোখাচোখি হয়, এবং তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নেন। সেই দৃষ্টিতে লজ্জা থাকে, যেটা 'ছেলের মতো' কাউকে দেখলে হওয়ার কথা না।
চতুর্থ দিন রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি আমার ঘরে শুয়ে আছি। কানে হেডফোন, কিন্তু গান বাজছে না। দরজায় টোকা পড়ল। খুব মৃদু। আমি হেডফোন নামালাম।
"কে?"
"আমি রে। তনিমা।"
আমি উঠে দরজা খুললাম। তনিমা আন্টি দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে একটা সিল্কের নাইটি। তার ওপর একটা পাতলা শ্রাগ জড়ানো। চুলগুলো খোলা, পিঠের ওপর ছড়ানো। সদ্য ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়েছেন বোধহয়, ত্বকটা চকচক করছে। তাকে এই আধো আলোয় মোহনীয় লাগছে। নিষিদ্ধ আপেলের মতো।
আমি দরজার ফ্রেমে হাত রেখে দাঁড়ালাম। "কিছু বলবেন আন্টি? এত রাতে?" তিনি একটু ইতস্তত করলেন। হাতে তার আইফোন আর একটা সাদা ক্যাবল। "তন্ময়, আসলে একটা প্রবলেম হয়েছে। আমার ফোনের চার্জারটা কাজ করছে না। বোধহয় অ্যাডাপ্টারটা নষ্ট হয়ে গেছে। চার্জ একদম জিরো। সকালে কয়েকটা ইম্পরট্যান্ট কল করতে হবে। তোর চার্জারটা কি একটু দিবি?"
আমি তার হাতের দিকে তাকালাম। তারপর তার মুখের দিকে। তার ঠোঁটে একটা হালকা হাসি লেগে আছে। এই হাসিটা কি নিরীহ? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ইঙ্গিত আছে? আমি বললাম, "অবশ্যই। ভেতরে আসুন। আমি দিচ্ছি।" তিনি ভেতরে ঢুকলেন। আমার অগোছালো রুম। বিছানার ওপর বই ছড়ানো। তিনি ল্যাপটপের দিকে তাকালেন।
"মুভি দেখছিলি? ডিস্টার্ব করলাম?"
"না না। এমনিই স্ক্রল করছিলাম।"
আমি সুইচবোর্ড থেকে আমার চার্জারটা খুললাম। সেটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আন্টি চার্জারটা নেওয়ার সময় আমার আঙুল স্পর্শ করলেন। বিদ্যুৎচমকের মতো একটা অনুভূতি হলো। তিনি চার্জারটা হাতে নিয়ে সেটা ঘোরাতে লাগলেন। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু নিচু গলায় বললেন, "আমার ফোনে তোর চার্জারটা ঢোকানো যাবে তো? মানে... কম্প্যাটিবল হবে তো?"
কথাটা খুব সাধারণ। টেকনিক্যাল প্রশ্ন। কিন্তু তার বলার ভঙ্গি, তার গলার স্বর, আর তার চোখের চাউনিতে মনে হলো তিনি চার্জার এবং ফোনের কথা বলছেন না। তিনি অন্য কিছু মিন করছেন। 'ঢোকানো' শব্দটা তিনি এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যে আমার শ্বাস আটকে গেল। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার চোখের মনিতে আমার প্রতিবিম্ব। সেখানে ভয় নেই, আছে কৌতুক আর আমন্ত্রণ। আমি শুকনো গলায় বললাম, "যাবে আন্টি। সব ছিদ্র... মানে পোর্ট তো একই।" আমার মুখ দিয়ে 'ছিদ্র' শব্দটা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি নিজেই লজ্জিত হলাম। কিন্তু আন্টি হাসলেন। শব্দ করে না, চোখের হাসি।
তিনি বললেন, "ওহ আচ্ছা। সেইম পোর্ট। দ্যাটস গুড। তাহলে তো ফিট করবে ভালোই।" তিনি চার্জারটা বুকের কাছে ধরলেন। "তোর কি এখন লাগবে? নাকি আমি নিয়ে গিয়ে আমার রুমে চার্জ দেব? আমার রুমে সকেটটা বিছানার কাছেই। শুয়ে শুয়ে ফোনটা টিপতে পারব।"
আমি দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের মাঝখানের দূরত্ব মাত্র এক ফুট। আমি তার শরীরের ঘ্রাণ পাচ্ছি। সেই পরিচিত নেশা ধরানো ঘ্রাণ। আমি বললাম, "নিয়ে যান। আমার এখন লাগবে না। আমার তো ফুল চার্জ আছে।" আন্টি এক পা এগোলেন। আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, "ফুল চার্জ? তাই নাকি? দেখে তো মনে হচ্ছে তোর ব্যাটারিও ডাউন হয়ে আছে। চার্জ দরকার।"
আমার হৃৎপিণ্ড গলার কাছে উঠে এল। তিনি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করছেন? নাকি এটা আমার কল্পনা? আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তিনি সরে দাঁড়ালেন। দরজার দিকে পা বাড়ালেন। "থ্যাঙ্কস রে। চার্জারটা নিলাম। কাল সকালে ফেরত পাবি। আর যদি রাতে দরকার হয়..." তিনি দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। সেই তাকানোতে একটা তীব্র আহ্বান ছিল। "...তাহলে এসে নিয়ে যাস। আমার দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।" আমি সঙ্গে বললাম, “না না, আন্টি, প্রয়োজন নেই আমার অ্যার রাতে। আপনি দরজা লাগিয়ে দিয়েন।’’
তনিমা আন্টি বেরিয়ে গেলেন। তার সিল্কের নাইটির খসখস শব্দ আর পারফিউমের রেশটুকু রেখে গেলেন আমার ঘরে। আমি দরজার দিকে তাকিয়েই রইলাম। তিনি চলে যাচ্ছেন করিডোর দিয়ে। তার হাঁটার ছন্দে একটা দোলা। সেই দোলা আমার মস্তিষ্কে তুফান তুলছে। 'দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।'
তনিমা আন্টি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি কতক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সময় সেখানে থমকে গিয়েছিল। তার সিল্কের নাইটির খসখস শব্দটা মিলিয়ে গেছে করিডোরের অন্ধকারে, কিন্তু আমার ঘরের বাতাসে এখনো তার অস্তিত্ব প্রবল। ফরাসি পারফিউমের সেই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে মিশে আছে এক অদ্ভুত আমন্ত্রণ।
আমি চার্জারের খালি সকেটটার দিকে তাকালাম। প্লাগ পয়েন্টটা হা করে আছে। একটু আগে সেখানে একটা কানেকশন ছিল, এখন নেই। আমার বুকের ভেতরটাও ঠিক ওই সকেটটার মতো শূন্য অনুভব করছে। কিন্তু এই শূন্যতা বিষাদের নয়, এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতার।
আমি বিছানায় বসলাম। বসা হলো না, উঠে দাঁড়ালাম। আবার বসলাম। শরীরের ভেতরে অ্যাড্রেনালিন রাশ হচ্ছে। মস্তিষ্কের নিউরনগুলো পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। আন্টির শেষ কথাগুলো কানের পর্দায় ইকো হচ্ছে—"দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।"
এই বাক্যের মানে কী? আমি কি ভুল শুনলাম? নাকি নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছি? মানুষের মন বড় অদ্ভুত জিনিস। সে যা শুনতে চায়, সেটাই শোনে। আন্টি হয়তো খুব সহজভাবেই বলেছিলেন। হয়তো তিনি মিন করেছেন, চার্জার ফেরত নেওয়ার জন্য বা অন্য কোনো প্রয়োজনে যদি যেতে হয়, তাহলে নক করার দরকার নেই, ধাক্কা দিলেই হবে। এর মধ্যে কোনো যৌনতা নেই, কোনো আহ্বান নেই। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি? চার্জারটা বুকের কাছে ধরার ভঙ্গি? আর সেই ফিসফিসানি—"তোর ব্যাটারিও তো ডাউন হয়ে আছে"?
আমি মাথা দুই হাতে চেপে ধরলাম। আচ্ছা, আমি যদি এখন ভুল করে থাকি? যদি আমি নিজের কামনার বশবর্তী হয়ে ভুল সিগন্যাল রিড করে থাকি? কল্পনা করলাম দৃশ্যটা— আমি পা টিপে টিপে গেস্ট রুমের সামনে গেলাম। দরজায় ধাক্কা দিলাম। দরজা খুলল। আমি ভেতরে ঢুকলাম। আন্টি হয়তো তখন বিছানায় শুয়ে ফোনে কথা বলছেন, কিংবা বই পড়ছেন। আমাকে দেখে তিনি অবাক হয়ে উঠে বসলেন। আমি কোনো কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম, বা চুমু খেতে গেলাম। আর ঠিক তখন তিনি চিৎকার করে উঠলেন। "তন্ময়! কী করছিস তুই! ছাড় আমাকে! রাশেদা! জামিল ভাই! বাঁচাও!" সেই চিৎকারে ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যাবে। বাবা দৌড়ে আসবেন, মা আসবেন, মৃন্ময় আসবে। তারা দেখবে আমি আন্টির ওপর চড়াও হয়েছি। আন্টি তখন হয়তো কাঁদবেন, বলবেন—"আমি ভাবতেই পারিনি রাশেদা, তোর ছেলে এমন জানোয়ার! আমি চার্জার নিতে গিয়েছিলাম, আর ও সেটাকে কী মনে করেছে দেখ!" ছিঃ! ছিঃ! ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে আমার সাজানো জগতটা ধ্বংস হয়ে যাবে। বাবা আমাকে জুতাপেটা করবেন, মা হয়তো হার্ট অ্যাটাক করবেন। আর মৃন্ময়? যে ভাইটা আমাকে হিরো ভাবে, সে আমাকে দেখবে এক জঘন্য ধর্ষক হিসেবে। আমার ভার্সিটি, আমার ক্যারিয়ার, আমার সামাজিক পরিচয়—সব ড্রেনে ভেসে যাবে।
রাত তিনটে। শহরের এই সময়টাকে আমার মনে হয় 'সত্যের সময়'। দিনের বেলা আমরা সবাই কোনো না কোনো মুখোশ পরে থাকি—ভদ্রতার মুখোশ, ব্যস্ততার মুখোশ, কিংবা সুখের মুখোশ। কিন্তু রাত তিনটের এই গভীর নির্জনতায় মুখোশগুলো খসে পড়ে। তখন আমরা শুধুই রক্ত-মাংসের মানুষ, যার ভেতরে এক সমুদ্র হাহাকার আর আদিম ক্ষুধা লুকিয়ে থাকে।
আমি বিছানায় শুয়ে আছি, কিন্তু ঘুম আসছে না। চোখের সামনে ভাসছে লিফটের সেই দৃশ্য। তনিমা আন্টির সেই আরক্ত চোখ, সেই আকুতি—"লাভ মি ডার্লিং..."। শরীর থেকে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গোসলের পরেও মনে হচ্ছে তার স্পর্শটা আমার চামড়ার নিচে রয়ে গেছে। এটা কি ঘৃণা? নাকি করুণা? নাকি অন্য কিছু? ফোনটা বালিশের পাশে রাখা ছিল। হঠাৎ ভাইব্রেশনের শব্দে নড়ে উঠল।স্ক্রিনের আলোয় ঘরটা মুহূর্তের জন্য আলোকিত হল। হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন, সেন্ডার: তনিমা আন্টি।
বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আন্টি কি জেগে আছেন? আমি কাঁপা হাতে ফোনটা আনলক করলাম। একটা লম্বা মেসেজ। "তন্ময়, ঘুমাচ্ছিস? জানি অনেক রাত। ঘুম আসার কথা না। আমারও আসছে না। শোন, আজ রাতে যা হয়েছে... আই মিন, লাকি বারে এবং গাড়িতে... আমি আসলে সেন্সে ছিলাম না। আমি জানি না আমি কী বলেছি বা কী করেছি। ব্ল্যাকআউট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবছা আবছা মনে পড়ছে তুই আমাকে খুব কেয়ারফুলি হ্যান্ডেল করেছিস। ইউ বিহেভড লাইক এ ট্রু জেন্টলম্যান। আমি মাতাল অবস্থায় তোকে যা বলেছি, বা যদি খারাপ কোনো বিহেভ করে থাকি—প্লিজ ফরগেট ইট। ওটা আমি ছিলাম না, ওটা ছিল অ্যালকোহল আর আমার ডিপ্রেশন। তুই আমার ছেলের মতো। আমি তোকে ওই নজরে দেখি না রে। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। এন্ড এগেইন থ্যাঙ্কস ফর সেভিং মাই ইজ্জত। কাল সকালে দেখা হবে।"
মেসেজটা আমি দুইবার পড়লাম। খুব গুছিয়ে লেখা। বোঝা যাচ্ছে, নেশা কেটে গেছে। তিনি এখন ড্যামেজ কন্ট্রোল মোডে আছেন। তিনি নিজেকে 'মা' বা 'বড় বোন' এর আসনে আবার বসাতে চাইছেন। 'তুই আমার ছেলের মতো'—লাইনটা পড়ে আমার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটল। ছেলের মতো? ছেলেরা কি লিফটের কোণায় এভাবে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে চায়? মাতাল হলেও অবচেতন মন তো মিথ্যা বলে না। ফ্রয়েড তো তাই বলে গেছেন। আমি কোনো রিপ্লাই দিলাম না। সিন করলাম, কিন্তু নীল দাগ ওঠার আগেই ফোনটা রেখে দিলাম। সব কথার উত্তর দিতে নেই। মাঝে মাঝে নীরবতা শব্দের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
পরের তিন-চার দিন কাটল এক অদ্ভুত দ্বৈত সত্তার মধ্য দিয়ে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক। তনিমা আন্টি সকালে ঘুম থেকে উঠছেন, নাশতার টেবিলে বাবার সাথে রাজনীতির আলাপ করছেন, মায়ের সাথে হাসাহাসি করছেন। তার আচরণে সেই রাতের কোনো চিহ্ন নেই। তিনি এমনভাবে আমার সাথে কথা বলছেন যেন আমরা দুজনেই অ্যামনেসিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত। সেই রাতটা যেন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
আমরা আবার বের হচ্ছি। তেজগাঁও ভূমি অফিস, গুলশানের ব্যাংক, আর রাজউকের করিডোর। কিন্তু সমস্যাটা হলো আমার ভেতরে। আমার ভেতরের 'তন্ময়' আর আগের মতো নেই। সেই রাতে লিফটের ওই কয়েক মিনিটের ঘটনা আমার মস্তিষ্কের নিউরনে একটা শর্টসার্কিট ঘটিয়ে দিয়েছে। আগে আমি তাকে দেখতাম 'মায়ের বান্ধবী' হিসেবে। এখন আমি তাকে দেখি 'নারী' হিসেবে। আমাদের সমাজ আমাদেরকে ছোটবেলা থেকে শেখায়—কিছু সম্পর্ক পবিত্র, কিছু সীমানা অলংঘনীয়। মায়ের বান্ধবী মানেই মা। তার দিকে তাকানো পাপ, তার শরীর নিয়ে ভাবা মহাপাপ। কিন্তু শরীর কি আর পাপ-পুণ্যের ধার ধারে? টেস্টোস্টেরন কি সম্পর্কের সমীকরণ মেনে ক্ষরিত হয়?
আমি এখন চোরের মতো তাকে দেখি। রিকশায় যখন তিনি পাশে বসেন, আমি আড়চোখে তার গলার ভাঁজটা দেখি। তার হাতের আঙুলগুলো দেখি। তিনি যখন কথা বলার সময় চুলে হাত বোলান, আমার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কম্পন হয়। এই কম্পনটা শ্রদ্ধার নয়, কামনার। আমি নিজেকে ধিক্কার দিই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বলি, "ছিঃ তন্ময়! তুই এত নিচ? উনি তোর বয়সের দ্বিগুণ। উনি তোকে বিশ্বাস করেন।" কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে পড়ে সেই রাতের কথা। তার শরীরের ভার আমার ওপর। তার গরম নিঃশ্বাস। তার সেই ফিসফিসানি—"মেইক মি ইওরস"। তানিম আন্টি মাতাল ছিলেন, ঠিক আছে। কিন্তু ওই মাতাল অবস্থাতেই তিনি আমার পৌরুষকে একটা সিগন্যাল দিয়ে গেছেন। সেই সিগন্যালটা আমি কিছুতেই ইগনোর করতে পারছি না।
তনিমা আন্টি যে অত্যন্ত রূপবতী এবং শরীর সচেতন, সেটা আমি নতুন করে আবিষ্কার করলাম। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে বাঙালি নারীরা সাধারণত মুটিয়ে যান, শরীরে ভাঁজ পড়ে। কিন্তু আন্টি নিয়মিত জিম করেন। তার শরীর ছিপছিপে, টানটান। জিন্স আর টি-শার্টে তাকে যখন দেখি, তখন মনে হয় তিনি ত্রিশের কোঠার কোনো যুবতী। তার গায়ের রং কাঁচা হলুদের মতো। আর তার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে—দামি ফ্রেঞ্চ পারফিউম আর তার শরীরের ঘাম মিশিয়ে এক মাদকতাময় গন্ধ। রিকশায় হুড তুলে যখন আমরা পাশাপাশি বসি, সেই গন্ধটা আমাকে মাতাল করে দেয়। আমি মদ্যপান করি না, কিন্তু এই গন্ধ শুঁকে আমার নেশা হয়।
সেদিন সন্ধ্যায় বাসায় তাস খেলা হচ্ছে। বাবা অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছেন। মা, বাবা, আন্টি আর আমি—চারজন মিলে ডাইনিং টেবিলে বসেছি। খেলা হচ্ছে 'টোয়েন্টি নাইন'। আন্টি আর আমি পার্টনার। মা আর বাবা পার্টনার। আন্টি বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। তিনি স্লিভলেস একটা কামিজ পরেছেন। গায়ের ওপর পাতলা ওড়না। খেলা জমে উঠেছে। কার্ড নিতে যখনই ঝুঁকছেন, তার ওড়নাটা সরে যাচ্ছে। আমি খুব কাছ থেকে তার কাঁধ, তার বুকের ওপরের অংশ দেখতে পাচ্ছি। আমার কান গরম হয়ে যাচ্ছে। আমি চোখ সরিয়ে নিতে চাইছি, কিন্তু পারছি না। চুম্বক যেমন লোহাকে টানে, নিষিদ্ধ জিনিসও মানুষকে তেমনই টানে।
দিনগুলো এভাবেই কাটছিল। এক অদ্ভুত লুকোচুরি খেলা। আন্টি আমাকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন, আর আমি সেই স্বাভাবিকতার আড়ালে অস্বাভাবিক হয়ে উঠছি। আমি বুঝতে পারছিলাম, আন্টির মধ্যেও একটা পরিবর্তন আসছে। তিনি হয়তো মুখে বলছেন "তুই ছেলের মতো", কিন্তু তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ অন্য কথা বলছে। তিনি এখন আমার সামনে একটু বেশিই সচেতনভাবে শরীর এলেমেলো করেন। রিকশায় ওঠার সময় তিনি আমার হাত ধরেন সাপোর্টের জন্য, যদিও তার সাপোর্টের দরকার নেই। মাঝে মাঝে আমাদের চোখাচোখি হয়, এবং তিনি দৃষ্টি সরিয়ে নেন। সেই দৃষ্টিতে লজ্জা থাকে, যেটা 'ছেলের মতো' কাউকে দেখলে হওয়ার কথা না।
চতুর্থ দিন রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি আমার ঘরে শুয়ে আছি। কানে হেডফোন, কিন্তু গান বাজছে না। দরজায় টোকা পড়ল। খুব মৃদু। আমি হেডফোন নামালাম।
"কে?"
"আমি রে। তনিমা।"
আমি উঠে দরজা খুললাম। তনিমা আন্টি দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে একটা সিল্কের নাইটি। তার ওপর একটা পাতলা শ্রাগ জড়ানো। চুলগুলো খোলা, পিঠের ওপর ছড়ানো। সদ্য ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়েছেন বোধহয়, ত্বকটা চকচক করছে। তাকে এই আধো আলোয় মোহনীয় লাগছে। নিষিদ্ধ আপেলের মতো।
আমি দরজার ফ্রেমে হাত রেখে দাঁড়ালাম। "কিছু বলবেন আন্টি? এত রাতে?" তিনি একটু ইতস্তত করলেন। হাতে তার আইফোন আর একটা সাদা ক্যাবল। "তন্ময়, আসলে একটা প্রবলেম হয়েছে। আমার ফোনের চার্জারটা কাজ করছে না। বোধহয় অ্যাডাপ্টারটা নষ্ট হয়ে গেছে। চার্জ একদম জিরো। সকালে কয়েকটা ইম্পরট্যান্ট কল করতে হবে। তোর চার্জারটা কি একটু দিবি?"
আমি তার হাতের দিকে তাকালাম। তারপর তার মুখের দিকে। তার ঠোঁটে একটা হালকা হাসি লেগে আছে। এই হাসিটা কি নিরীহ? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ইঙ্গিত আছে? আমি বললাম, "অবশ্যই। ভেতরে আসুন। আমি দিচ্ছি।" তিনি ভেতরে ঢুকলেন। আমার অগোছালো রুম। বিছানার ওপর বই ছড়ানো। তিনি ল্যাপটপের দিকে তাকালেন।
"মুভি দেখছিলি? ডিস্টার্ব করলাম?"
"না না। এমনিই স্ক্রল করছিলাম।"
আমি সুইচবোর্ড থেকে আমার চার্জারটা খুললাম। সেটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। আন্টি চার্জারটা নেওয়ার সময় আমার আঙুল স্পর্শ করলেন। বিদ্যুৎচমকের মতো একটা অনুভূতি হলো। তিনি চার্জারটা হাতে নিয়ে সেটা ঘোরাতে লাগলেন। তারপর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু নিচু গলায় বললেন, "আমার ফোনে তোর চার্জারটা ঢোকানো যাবে তো? মানে... কম্প্যাটিবল হবে তো?"
কথাটা খুব সাধারণ। টেকনিক্যাল প্রশ্ন। কিন্তু তার বলার ভঙ্গি, তার গলার স্বর, আর তার চোখের চাউনিতে মনে হলো তিনি চার্জার এবং ফোনের কথা বলছেন না। তিনি অন্য কিছু মিন করছেন। 'ঢোকানো' শব্দটা তিনি এমনভাবে উচ্চারণ করলেন যে আমার শ্বাস আটকে গেল। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার চোখের মনিতে আমার প্রতিবিম্ব। সেখানে ভয় নেই, আছে কৌতুক আর আমন্ত্রণ। আমি শুকনো গলায় বললাম, "যাবে আন্টি। সব ছিদ্র... মানে পোর্ট তো একই।" আমার মুখ দিয়ে 'ছিদ্র' শব্দটা বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি নিজেই লজ্জিত হলাম। কিন্তু আন্টি হাসলেন। শব্দ করে না, চোখের হাসি।
তিনি বললেন, "ওহ আচ্ছা। সেইম পোর্ট। দ্যাটস গুড। তাহলে তো ফিট করবে ভালোই।" তিনি চার্জারটা বুকের কাছে ধরলেন। "তোর কি এখন লাগবে? নাকি আমি নিয়ে গিয়ে আমার রুমে চার্জ দেব? আমার রুমে সকেটটা বিছানার কাছেই। শুয়ে শুয়ে ফোনটা টিপতে পারব।"
আমি দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালাম। আমাদের মাঝখানের দূরত্ব মাত্র এক ফুট। আমি তার শরীরের ঘ্রাণ পাচ্ছি। সেই পরিচিত নেশা ধরানো ঘ্রাণ। আমি বললাম, "নিয়ে যান। আমার এখন লাগবে না। আমার তো ফুল চার্জ আছে।" আন্টি এক পা এগোলেন। আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, "ফুল চার্জ? তাই নাকি? দেখে তো মনে হচ্ছে তোর ব্যাটারিও ডাউন হয়ে আছে। চার্জ দরকার।"
আমার হৃৎপিণ্ড গলার কাছে উঠে এল। তিনি কি আমার সাথে ফ্লার্ট করছেন? নাকি এটা আমার কল্পনা? আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তিনি সরে দাঁড়ালেন। দরজার দিকে পা বাড়ালেন। "থ্যাঙ্কস রে। চার্জারটা নিলাম। কাল সকালে ফেরত পাবি। আর যদি রাতে দরকার হয়..." তিনি দরজার কাছে গিয়ে থামলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। সেই তাকানোতে একটা তীব্র আহ্বান ছিল। "...তাহলে এসে নিয়ে যাস। আমার দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।" আমি সঙ্গে বললাম, “না না, আন্টি, প্রয়োজন নেই আমার অ্যার রাতে। আপনি দরজা লাগিয়ে দিয়েন।’’
তনিমা আন্টি বেরিয়ে গেলেন। তার সিল্কের নাইটির খসখস শব্দ আর পারফিউমের রেশটুকু রেখে গেলেন আমার ঘরে। আমি দরজার দিকে তাকিয়েই রইলাম। তিনি চলে যাচ্ছেন করিডোর দিয়ে। তার হাঁটার ছন্দে একটা দোলা। সেই দোলা আমার মস্তিষ্কে তুফান তুলছে। 'দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।'
তনিমা আন্টি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আমি কতক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম জানি না। সময় সেখানে থমকে গিয়েছিল। তার সিল্কের নাইটির খসখস শব্দটা মিলিয়ে গেছে করিডোরের অন্ধকারে, কিন্তু আমার ঘরের বাতাসে এখনো তার অস্তিত্ব প্রবল। ফরাসি পারফিউমের সেই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে মিশে আছে এক অদ্ভুত আমন্ত্রণ।
আমি চার্জারের খালি সকেটটার দিকে তাকালাম। প্লাগ পয়েন্টটা হা করে আছে। একটু আগে সেখানে একটা কানেকশন ছিল, এখন নেই। আমার বুকের ভেতরটাও ঠিক ওই সকেটটার মতো শূন্য অনুভব করছে। কিন্তু এই শূন্যতা বিষাদের নয়, এক ভয়ঙ্কর অস্থিরতার।
আমি বিছানায় বসলাম। বসা হলো না, উঠে দাঁড়ালাম। আবার বসলাম। শরীরের ভেতরে অ্যাড্রেনালিন রাশ হচ্ছে। মস্তিষ্কের নিউরনগুলো পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। আন্টির শেষ কথাগুলো কানের পর্দায় ইকো হচ্ছে—"দরজা খোলাই থাকবে। একটু ধাক্কা দিলেই খুলে যাবে।"
এই বাক্যের মানে কী? আমি কি ভুল শুনলাম? নাকি নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে নিচ্ছি? মানুষের মন বড় অদ্ভুত জিনিস। সে যা শুনতে চায়, সেটাই শোনে। আন্টি হয়তো খুব সহজভাবেই বলেছিলেন। হয়তো তিনি মিন করেছেন, চার্জার ফেরত নেওয়ার জন্য বা অন্য কোনো প্রয়োজনে যদি যেতে হয়, তাহলে নক করার দরকার নেই, ধাক্কা দিলেই হবে। এর মধ্যে কোনো যৌনতা নেই, কোনো আহ্বান নেই। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি? চার্জারটা বুকের কাছে ধরার ভঙ্গি? আর সেই ফিসফিসানি—"তোর ব্যাটারিও তো ডাউন হয়ে আছে"?
আমি মাথা দুই হাতে চেপে ধরলাম। আচ্ছা, আমি যদি এখন ভুল করে থাকি? যদি আমি নিজের কামনার বশবর্তী হয়ে ভুল সিগন্যাল রিড করে থাকি? কল্পনা করলাম দৃশ্যটা— আমি পা টিপে টিপে গেস্ট রুমের সামনে গেলাম। দরজায় ধাক্কা দিলাম। দরজা খুলল। আমি ভেতরে ঢুকলাম। আন্টি হয়তো তখন বিছানায় শুয়ে ফোনে কথা বলছেন, কিংবা বই পড়ছেন। আমাকে দেখে তিনি অবাক হয়ে উঠে বসলেন। আমি কোনো কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম, বা চুমু খেতে গেলাম। আর ঠিক তখন তিনি চিৎকার করে উঠলেন। "তন্ময়! কী করছিস তুই! ছাড় আমাকে! রাশেদা! জামিল ভাই! বাঁচাও!" সেই চিৎকারে ফ্ল্যাটের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যাবে। বাবা দৌড়ে আসবেন, মা আসবেন, মৃন্ময় আসবে। তারা দেখবে আমি আন্টির ওপর চড়াও হয়েছি। আন্টি তখন হয়তো কাঁদবেন, বলবেন—"আমি ভাবতেই পারিনি রাশেদা, তোর ছেলে এমন জানোয়ার! আমি চার্জার নিতে গিয়েছিলাম, আর ও সেটাকে কী মনে করেছে দেখ!" ছিঃ! ছিঃ! ভাবতেই আমার গা শিউরে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে আমার সাজানো জগতটা ধ্বংস হয়ে যাবে। বাবা আমাকে জুতাপেটা করবেন, মা হয়তো হার্ট অ্যাটাক করবেন। আর মৃন্ময়? যে ভাইটা আমাকে হিরো ভাবে, সে আমাকে দেখবে এক জঘন্য ধর্ষক হিসেবে। আমার ভার্সিটি, আমার ক্যারিয়ার, আমার সামাজিক পরিচয়—সব ড্রেনে ভেসে যাবে।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)