26-01-2026, 12:57 AM
৬
মগবাজার থেকে ধানমন্ডি খুব বেশি দূর নয়, কিন্তু আজকের এই পথটাকে আমার কাছে মনে হচ্ছে সাহারা মরুভূমির চেয়েও দীর্ঘ। গাড়ির জানালা বন্ধ, এসি চলছে ফুল স্পিডে, তবুও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার পাশে বসে থাকা তনিমা আন্টি এখন আর সেই স্মার্ট, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নারী নন; তিনি এখন বিধ্বস্ত এক মানবিক ধ্বংসস্তূপ।
উবার ড্রাইভার ফজর আলী লোকটা বেশ নির্বিকার। সে তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তার দিকে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, তার কান পড়ে আছে পেছনের সিটে। মাঝেমধ্যে রিয়ার ভিউ মিররে তার চোখ চকচক করে উঠছে। ওই দৃষ্টিতে কৌতূহল আছে, আর আছে এক ধরণের নোংরা আনন্দ। ঢাকা শহরের ড্রাইভাররা পেছনের সিটের অনেক গোপন নাটকের নীরব দর্শক। তারা জানে, এই শহরের ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে কী কী লুকিয়ে থাকে।
আন্টি প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। মাথাটা জানালার কাঁচে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু হঠাৎ তিনি নড়ে উঠলেন। তার হাতটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে আমার হাতের ওপর এসে পড়ল। আমি শিউরে উঠলাম। তার হাতের তালু ঘর্মাক্ত এবং অস্বাভাবিক গরম।
তিনি বিড়বিড় করে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করলেন। প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না, শুধু ফিসফিসানি। তারপর স্বর একটু স্পষ্ট হলো। "হোয়াই? হোয়াই ডোন্ট ইউ লাভ মি ডার্লিং?"
আমি আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলাম। আন্টি আমাকে তার 'ডার্লিং' ভাবছেন। মাতাল অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্ক সময়ের হিসাব গুলিয়ে ফেলে। তিনি হয়তো ভাবছেন তিনি পঁচিশ বছর আগের কোনো এক রাতে, কোনো এক লং ড্রাইভে তার প্রাক্তন স্বামী বা প্রেমিকের পাশে বসে আছেন। তিনি আমার দিকে সরে এলেন। তার মাথাটা রাখলেন আমার কাঁধে। তারপর মুখটা ঘষতে থাকলেন আমার বুকে। "লুক অ্যাট মি... প্লিজ... এম আই নট বিউটিফুল? আমাকে দেখো। আমাকে ছোঁও।"
তার গলার স্বরে এমন এক আকুতি, যা শুনলে যেকোনো সুস্থ মানুষের মায়া হওয়ার কথা। কিন্তু আমার মায়া হওয়ার বদলে আতঙ্ক হচ্ছে। তিনি বিড়বিড় করে এমন সব শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করলেন যা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেল। ইংরেজি ভাষার এই শব্দগুলো সাধারণত পর্নোগ্রাফি বা খুব ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলছিলেন, "মেইক মি ইওরস... ডেস্ট্রয় মি... আমি তোমার হতে চাই, যেভাবে তুমি চাও..."
আমি পাথর হয়ে বসে আছি। আমার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছে যে মনে হচ্ছে বুকের পাঁজর ভেঙে যাবে। ড্রাইভার ফজর আলী কি শুনতে পাচ্ছে? শোনারই কথা। আন্টির গলা যদিও খাদে নামানো, কিন্তু এই নিস্তব্ধ গাড়িতে প্রতিটি শব্দই হাতুড়ির মতো বাজছে। আমি আড়চোখে মিররের দিকে তাকালাম। ফজর আলীর চোখ রাস্তার দিকে। সে হয়তো ভান করছে শোনার, কিংবা শুনেও না শোনার ভান করছে।
আন্টির হাত আমার শার্টের বোতামের ওপর। তিনি খামচে ধরে আছেন। তার নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধের সাথে মিশে আছে দামি পারফিউম। এই মিশ্র গন্ধটা আমার নাকে এসে ধাক্কা মারছে। তিনি ক্রমাগত বলে চলেছেন, "তুমি কেন আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ? আমি তো তোমারই। আমাকে নাও... প্লিজ..."
আমি নিচু গলায়, দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, "আন্টি, প্লিজ। চুপ করুন। ড্রাইভার আছে। আমরা বাসায় যাচ্ছি।" আমার কথা তার কানে পৌঁছাল বলে মনে হলো না। তিনি এখন অন্য জগতে। সেই জগতে তিনি প্রত্যাখ্যাত, তিনি একাকী, এবং তিনি মরিয়া হয়ে একটু উষ্ণতা খুঁজছেন।
হঠাৎ তিনি আমার গালের কাছে মুখ আনলেন। তার ঠোঁট আমার কানের লতি স্পর্শ করল। একটা ভেজা, আঠালো স্পর্শ। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। আমি পুরুষ। আমার বয়স তেইশ। আমার শরীরে টেস্টোস্টেরন আছে। একজন নারী, তিনি যেই হোন না কেন, যখন এভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে স্পর্শ করেন, তখন শরীর তার নিজস্ব নিয়মে সাড়া দিতে চায়। এক মুহূর্তের জন্য আমার ভেতরে একটা আদিম উত্তেজনা তৈরি হলো। খুব জঘন্য একটা অনুভূতি। পরমুহূর্তেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। ছিঃ! আমি কী ভাবছি? ইনি আমার মায়ের বয়সী। ইনি মাতাল। ইনি নিজের মধ্যে নেই। আমি যদি এখন সুযোগ নিই, বা সামান্যতম প্রশ্রয় দিই, তবে আমার আর রাস্তার নেড়ি কুকুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
আমি খুব সাবধানে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে আন্টিকে একটু ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "আন্টি, সোজা হয়ে বসুন। প্লিজ।" তিনি সরলেন না। বরং আরওঁ এলিয়ে পড়লেন। তার শরীরের পুরো ভার এখন আমার ওপর। তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সেই একই প্রলাপ—"লাভ মি... লাভ মি..."
গাড়িটা পান্থপথের সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। বাইরে হকাররা ফুল আর বেলুন বিক্রি করছে। কাঁচের ওপাশে স্বাভাবিক জীবন, আর এপাশে এক মাতাল নাটকের মঞ্চ। আমি নিজেকে সামলালাম। এখন উত্তেজনা বা ঘৃণার সময় নয়, এখন ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সময়। যেকোনো মূল্যে এই মহিলাকে নিরাপদে এবং গোপনে বাসায় ঢোকাতে হবে।
আমি পকেট থেকে ফোন বের করলাম। হাত কাঁপছে। মৃন্ময়ের নাম্বারে ডায়াল করলাম। ও নিশ্চয়ই এতক্ষণে পড়ার টেবিলে, অথবা গেম খেলছে। একবার রিং হতেই ও ধরল। "হ্যালো ভাইয়া? তোমরা কোথায়? আম্মা ফোন দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করছিল তোমরা ফিরেছ কি না।" আমি ফিসফিস করে বললাম, "শোন, কথা কম বল। মন দিয়ে শোন। আমরা আসছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। বাবা কোথায়?"
"বাবা ড্রয়িংরুমে। টিভি দেখছে।"
"সর্বনাশ। শোন, তুই এক্ষুনি একটা কাজ করবি। বাবাকে তোর রুমে ডেকে নিয়ে যা। বলবি তোর ম্যাথ প্রবলেম সলভ করে দিতে, বা কম্পিউটার কাজ করছে না—যেকোনো একটা বাহানা। বাবাকে যেন ড্রয়িংরুমে না দেখি। আর মেইন দরজাটা হালকা চাপিয়ে রাখবি, লক করবি না। আমি বেল বাজাব না।"
মৃন্ময় চালাক ছেলে। ও গলার স্বর শুনেই বুঝেছে পরিস্থিতি জটিল। "ভাইয়া, কিছু হয়েছে? আন্টির কিছু হয়েছে?"
"পরে বলব। যা বললাম কর। বাবা যেন কোনোভাবেই মেইন ডোরের দিকে না আসে। জলদি যা।"
ফোন কেটে দিলাম। গাড়ি সাতাশ নম্বর পার হয়ে ধানমন্ডির দিকে ঢুকছে। আমার বুকের ওপর আন্টির মাথাটা এখন ভারী পাথরের মতো। তিনি আর কথা বলছেন না। বিড়বিড়ানি থামিয়ে এখন শুধু ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন। সম্ভবত অ্যালকোহল তার শরীরে পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসেছে। তিনি সেমি-কনশাস স্টেজে চলে গেছেন। এটা ভালো, আবার খারাপও। ভালো কারণ তিনি আর অশ্লীল কথা বলছেন না। খারাপ কারণ তাকে এখন পাঁজাকোলা করে নামাতে হবে।
ধানমন্ডি ৯/এ-তে ঢোকার সময় আমি ফজর আলীকে বললাম, "ভাই, গেটের একদম ভেতরে ঢোকাবেন। লিফটের সামনে।" ফজর আলী মাথা নাড়ল। দারোয়ান মোতালেব গেট খুলে দিল। গাড়িটা পার্কিং লটে, লিফটের ঠিক সামনে এসে থামল। আমি দ্রুত ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। ফজর আলী আড়চোখে পেছনের সিটের দিকে তাকিয়ে বলল, "ম্যাডামের শরীর কি খুব খারাপ স্যার? ধরমু?" আমি কঠিন গলায় বললাম, "না, আমি পারব। আপনি যান।" সে আর কথা বাড়াল না।
এখন আসল চ্যালেঞ্জ। আমি আন্টিকে ডাকলাম। "আন্টি! আন্টি! উঠুন। আমরা এসেছি।" তিনি চোখ মেললেন না। গোঙানির মতো শব্দ করলেন। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। তারপর এপাশ দিয়ে ঘুরে এসে তার দিকের দরজা খুললাম। "নামুন আন্টি। প্লিজ, একটু শক্ত হোন।" আমি তার হাত ধরে টান দিলাম। তিনি বস্তার মতো আমার গায়ের ওপর এসে পড়লেন। তার পায়ে হিল জুতো। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। আমি তার এক হাত আমার কাঁধের ওপর দিয়ে নিলাম, অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরলাম। তার শরীরের সবটুকু ভার আমার ওপর।
ভাগ্য ভালো, লিফটটা নিচতলায় ছিল। এবং লবিতে কেউ নেই। মোতালেব চাচা গেটের বাইরে টুল নিয়ে বসে আছে। সে দেখেনি। আমি কোনোরকমে আন্টিকে টেনে লিফটের ভেতরে ঢোকালাম। গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম টিপে দিলাম। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই আমি আয়নায় আমাদের দুজনকে দেখলাম।
দৃশ্যটা বীভৎস এবং করুণ। আমার চুল এলোমেলো, শার্টের একপাশ কুঁচকে আছে। আর আমার কাঁধে ঝুলে আছেন তনিমা আন্টি। তার চোখ বন্ধ, মুখটা হা হয়ে আছে, লিপস্টিক ছড়িয়ে গেছে ঠোঁটের চারপাশে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা কোনো সৈনিক।
লিফট ওপরে উঠছে। হঠাৎ আন্টি নড়ে উঠলেন। তিনি চোখ মেললেন। ঘোলাটে, রক্তজবা চোখ। তিনি আমার দিকে তাকালেন। খুব কাছে। এত কাছে যে আমি তার চোখের মনির ভেতরের কালো গহ্বরটা দেখতে পাচ্ছি। তিনি হঠাৎ হেসে উঠলেন। মাতাল হাসি। "তুমি... তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ? কেন? আমি কি রাক্ষসী?" আমি বললাম, "না আন্টি। চুপ করুন। আমরা এসে গেছি।" তিনি আমার কথা শুনলেন না। তিনি তার দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। লিফটের ওইটুকু জায়গায় আমি নড়তে পারছি না। তিনি আমাকে কাছে টানলেন। "কিস মি... জাস্ট ওয়ানস... একটা চুমু দাও। কেউ জানবে না। কেউ না..."
তিনি তার মুখটা আমার মুখের দিকে এগিয়ে আনলেন। আমি প্রাণপণ শক্তিতে মাথাটা পেছনে সরালাম। তার ঠোঁট আমার গালে ঘষা খেল। আমার মনে হলো কোনো গরম লোহা আমার গাল স্পর্শ করেছে। আমি ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু লিফটের ওয়ালে পিঠ ঠেকে আছে। "আন্টি! কী করছেন! " তিনি আমাকে ছাড়লেন না। বরং আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। "ডোন্ট রিজেক্ট মি... আমি মরে যাচ্ছি... একটু আদর..."
ঠিক সেই মুহূর্তে লিফটের দরজা খোলার শব্দ হলো। 'টুং'। চারতলা। আমি এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিলাম। তিনি টাল সামলাতে না পেরে লিফটের দেয়ালে বাড়ি খেলেন। আমি দ্রুত তাকে আবার ধরলাম, যাতে পড়ে না যান। আমার কপাল ঘামছে, হাত কাঁপছে। যদি দরজা খোলার পর দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন?
না, কেউ নেই। করিডোর ফাঁকা। আমাদের ফ্ল্যাটের দরজাটা সামান্য ফাঁক করা। মৃন্ময় কাজ করেছে। আমি দ্রুত আন্টিকে পাঁজাকোলা করে ধরলাম। এখন আর তাকে হাঁটিয়ে নেওয়া সম্ভব না। তিনি হাঁটার শক্তি হারিয়েছেন। আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম। ছিমছাম শরীর হওয়ায় বেঁচে গেছি, অ্যার সঙ্গে বিপদের সময় মানুষের গায়ে অসুরের শক্তি চলে আসে।
আমি নিঃশব্দে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। ড্রয়িংরুম অন্ধকার। শুধু করিডোরের আলো জ্বলছে। বাবার রুম থেকে উচ্চস্বরে টিভি বা কথার আওয়াজ আসছে না। মৃন্ময় হয়তো বাবাকে কোনো জটিল অংকের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। আমি শ্বাস বন্ধ করে করিডোর পার হলাম। গেস্ট রুমটা করিডোরের শেষ মাথায়। আন্টি আমার কোলে বিড়বিড় করছেন, "হোয়্যার এম আই? স্বর্গ? এটা কি স্বর্গ?" আমি মনে মনে বললাম, "না আন্টি, এটা ধানমন্ডি। আর আমরা নরক পার হয়ে এসেছি।"
গেস্ট রুমে ঢুকে আমি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। তিনি বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই হাত-পা ছড়িয়ে দিলেন। আমি দ্রুত তার পায়ের জুতো দুটো খুলে দিলাম। সালোয়ারের ওড়নাটা, যেটা গলার কাছে প্যাঁচানো ছিল, সেটা আলগা করে একপাশে রাখলাম যাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট না হয়। এসিটা অন করে দিলাম। টেম্পারেচার চব্বিশ।
তিনি পাশ ফিরে শুতে শুতে শেষবারের মতো অস্পষ্ট গলায় বললেন, "তন্ময়... ডোন্ট লিভ মি..." আমি দাঁড়ালাম না। লাইট নিভিয়ে দিলাম। শুধু বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা আলতো করে টেনে দিলাম।
করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি হাঁপাচ্ছি। বুকটা এখনো ধড়ফড় করছে। আমি নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। মৃন্ময় তার রুমের দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল। আমাকে দেখে থাম্বস আপ দেখাল। অর্থাৎ—'মিশন সাকসেসফুল'। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না।
নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম। তারপর সোজা ফ্লোরে বসে পড়লাম। কার্পেটের ওপর। আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে পানি খাওয়ার শক্তি আমার নেই। আজ রাতে আমি যা দেখলাম, যা অনুভব করলাম—তা আমি ভুলব কীভাবে? তনিমা আন্টি—যাকে আমি তিন দিন আগেও একজন দাপুটে, স্মার্ট, এবং জীবনমুখী নারী হিসেবে জানতাম, তার ভেতরের এই অন্ধকার রূপটা আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। তার ওই আকুতি, "লাভ মি ডার্লিং"—এটা কোনো কামনার ডাক ছিল না। এটা ছিল এক গভীর, অতলান্তিক একাকীত্বের আর্তনাদ। একজন মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হলে নিজের বয়সের অর্ধেক বয়সী একটা ছেলের কাছে শরীর ঘঁষে উষ্ণতা খুঁজতে পারে?
আমার শরীরের ঘিনঘিনে অনুভূতিটা এখনো যাচ্ছে না। লিফটে তার সেই স্পর্শ, সেই মাতাল নিঃশ্বাস—সব আমার চামড়ার নিচে গেঁথে গেছে। আমি বাথরুমে ঢুকলাম। শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি। আমি জামাকাপড় পরেই শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। পানি আমার শরীর ধুয়ে দিচ্ছে, কিন্তু মনের ময়লা কি ধুতে পারবে?
পুরুষ হিসেবে আমার যে সামান্য উত্তেজনা হয়েছিল, সেটার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। ফ্রয়েড হয়তো বলবেন এটা অবচেতন মনের খেলা, ইড আর সুপার-ইগোর দ্বন্দ্ব। কিন্তু আমি কোনো থিওরি শুনতে চাই না। আমি শুধু জানি, আমি আজ রাতে এমন একটা সীমানা পার করেছি, যেখান থেকে আর সহজে ফেরা যাবে না। আমাদের এই অসম সম্পর্কটা আর কখনো আগের মতো সহজ হবে না। কাল সকালে যখন আন্টির জ্ঞান ফিরবে, তিনি হয়তো সব ভুলে যাবেন। ব্ল্যাকআউট হয়ে যাবে। তিনি আবার সেই স্মার্ট, হাসিখুশি তনিমা আন্টি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসবেন। কিন্তু আমি? আমি কীভাবে তার চোখের দিকে তাকাব? আমি তো জানি, ওই হাসির আড়ালে কোন কাঙাল সত্তা লুকিয়ে আছে।
রাত গভীর হচ্ছে। বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। আমার মনে হলো, আমরা সবাই আসলে ভিখারি। কেউ টাকার জন্য হাত পাতে, কেউ একটু ভালোবাসার জন্য, আর কেউ বা বিস্মৃতির জন্য। তনিমা আন্টি আজ মদ দিয়ে তার স্মৃতি মুছতে চেয়েছিলেন। আর আমি এখন পানির নিচে দাঁড়িয়ে আজকের রাতটা মুছতে চাইছি। ফোনটা বেজে উঠল। বের করে দেখলাম, মা ফোন করেছেন।
"হ্যালো মা?"
"তন্ময়, কিরে তোরা ঘুমিয়ে পড়েছিস? আমি নিচে। লিফটে উঠছি। তনিমা খেয়েছে?"
আমি গলা ঝেড়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। "হ্যাঁ মা। আন্টি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। জার্নি আর দৌড়াদৌড়িতে খুব ক্লান্ত ছিলেন তো।"
"আচ্ছা। ঠিক আছে। দরজা খোল। আমার চাবিটা ব্যাগের তলায়, খুঁজে পাচ্ছি না।"
আমি ভেজা কাপড়ে বাথরুম থেকে বের হলাম। একটা তোয়ালে দিয়ে গা মুছলাম, টি-শার্টটা বদলালাম। মুখে একটা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলাম। এখন আমাকে অভিনয় করতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অভিনয়—স্বাভাবিক থাকার অভিনয়।
মগবাজার থেকে ধানমন্ডি খুব বেশি দূর নয়, কিন্তু আজকের এই পথটাকে আমার কাছে মনে হচ্ছে সাহারা মরুভূমির চেয়েও দীর্ঘ। গাড়ির জানালা বন্ধ, এসি চলছে ফুল স্পিডে, তবুও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমার পাশে বসে থাকা তনিমা আন্টি এখন আর সেই স্মার্ট, দোর্দণ্ড প্রতাপশালী নারী নন; তিনি এখন বিধ্বস্ত এক মানবিক ধ্বংসস্তূপ।
উবার ড্রাইভার ফজর আলী লোকটা বেশ নির্বিকার। সে তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তার দিকে, কিন্তু আমি নিশ্চিত, তার কান পড়ে আছে পেছনের সিটে। মাঝেমধ্যে রিয়ার ভিউ মিররে তার চোখ চকচক করে উঠছে। ওই দৃষ্টিতে কৌতূহল আছে, আর আছে এক ধরণের নোংরা আনন্দ। ঢাকা শহরের ড্রাইভাররা পেছনের সিটের অনেক গোপন নাটকের নীরব দর্শক। তারা জানে, এই শহরের ভদ্রতার মুখোশের আড়ালে কী কী লুকিয়ে থাকে।
আন্টি প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। মাথাটা জানালার কাঁচে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। কিন্তু হঠাৎ তিনি নড়ে উঠলেন। তার হাতটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে আমার হাতের ওপর এসে পড়ল। আমি শিউরে উঠলাম। তার হাতের তালু ঘর্মাক্ত এবং অস্বাভাবিক গরম।
তিনি বিড়বিড় করে ইংরেজিতে কথা বলা শুরু করলেন। প্রথমে বোঝা যাচ্ছিল না, শুধু ফিসফিসানি। তারপর স্বর একটু স্পষ্ট হলো। "হোয়াই? হোয়াই ডোন্ট ইউ লাভ মি ডার্লিং?"
আমি আড়ষ্ট হয়ে বসে রইলাম। আন্টি আমাকে তার 'ডার্লিং' ভাবছেন। মাতাল অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্ক সময়ের হিসাব গুলিয়ে ফেলে। তিনি হয়তো ভাবছেন তিনি পঁচিশ বছর আগের কোনো এক রাতে, কোনো এক লং ড্রাইভে তার প্রাক্তন স্বামী বা প্রেমিকের পাশে বসে আছেন। তিনি আমার দিকে সরে এলেন। তার মাথাটা রাখলেন আমার কাঁধে। তারপর মুখটা ঘষতে থাকলেন আমার বুকে। "লুক অ্যাট মি... প্লিজ... এম আই নট বিউটিফুল? আমাকে দেখো। আমাকে ছোঁও।"
তার গলার স্বরে এমন এক আকুতি, যা শুনলে যেকোনো সুস্থ মানুষের মায়া হওয়ার কথা। কিন্তু আমার মায়া হওয়ার বদলে আতঙ্ক হচ্ছে। তিনি বিড়বিড় করে এমন সব শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করলেন যা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেল। ইংরেজি ভাষার এই শব্দগুলো সাধারণত পর্নোগ্রাফি বা খুব ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত ছাড়া ব্যবহার করা হয় না। তিনি বলছিলেন, "মেইক মি ইওরস... ডেস্ট্রয় মি... আমি তোমার হতে চাই, যেভাবে তুমি চাও..."
আমি পাথর হয়ে বসে আছি। আমার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছে যে মনে হচ্ছে বুকের পাঁজর ভেঙে যাবে। ড্রাইভার ফজর আলী কি শুনতে পাচ্ছে? শোনারই কথা। আন্টির গলা যদিও খাদে নামানো, কিন্তু এই নিস্তব্ধ গাড়িতে প্রতিটি শব্দই হাতুড়ির মতো বাজছে। আমি আড়চোখে মিররের দিকে তাকালাম। ফজর আলীর চোখ রাস্তার দিকে। সে হয়তো ভান করছে শোনার, কিংবা শুনেও না শোনার ভান করছে।
আন্টির হাত আমার শার্টের বোতামের ওপর। তিনি খামচে ধরে আছেন। তার নিঃশ্বাসে অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধের সাথে মিশে আছে দামি পারফিউম। এই মিশ্র গন্ধটা আমার নাকে এসে ধাক্কা মারছে। তিনি ক্রমাগত বলে চলেছেন, "তুমি কেন আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছ? আমি তো তোমারই। আমাকে নাও... প্লিজ..."
আমি নিচু গলায়, দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, "আন্টি, প্লিজ। চুপ করুন। ড্রাইভার আছে। আমরা বাসায় যাচ্ছি।" আমার কথা তার কানে পৌঁছাল বলে মনে হলো না। তিনি এখন অন্য জগতে। সেই জগতে তিনি প্রত্যাখ্যাত, তিনি একাকী, এবং তিনি মরিয়া হয়ে একটু উষ্ণতা খুঁজছেন।
হঠাৎ তিনি আমার গালের কাছে মুখ আনলেন। তার ঠোঁট আমার কানের লতি স্পর্শ করল। একটা ভেজা, আঠালো স্পর্শ। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। আমি পুরুষ। আমার বয়স তেইশ। আমার শরীরে টেস্টোস্টেরন আছে। একজন নারী, তিনি যেই হোন না কেন, যখন এভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে স্পর্শ করেন, তখন শরীর তার নিজস্ব নিয়মে সাড়া দিতে চায়। এক মুহূর্তের জন্য আমার ভেতরে একটা আদিম উত্তেজনা তৈরি হলো। খুব জঘন্য একটা অনুভূতি। পরমুহূর্তেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। ছিঃ! আমি কী ভাবছি? ইনি আমার মায়ের বয়সী। ইনি মাতাল। ইনি নিজের মধ্যে নেই। আমি যদি এখন সুযোগ নিই, বা সামান্যতম প্রশ্রয় দিই, তবে আমার আর রাস্তার নেড়ি কুকুরের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
আমি খুব সাবধানে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে আন্টিকে একটু ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম। "আন্টি, সোজা হয়ে বসুন। প্লিজ।" তিনি সরলেন না। বরং আরওঁ এলিয়ে পড়লেন। তার শরীরের পুরো ভার এখন আমার ওপর। তিনি ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সেই একই প্রলাপ—"লাভ মি... লাভ মি..."
গাড়িটা পান্থপথের সিগন্যালে দাঁড়িয়েছে। বাইরে হকাররা ফুল আর বেলুন বিক্রি করছে। কাঁচের ওপাশে স্বাভাবিক জীবন, আর এপাশে এক মাতাল নাটকের মঞ্চ। আমি নিজেকে সামলালাম। এখন উত্তেজনা বা ঘৃণার সময় নয়, এখন ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টের সময়। যেকোনো মূল্যে এই মহিলাকে নিরাপদে এবং গোপনে বাসায় ঢোকাতে হবে।
আমি পকেট থেকে ফোন বের করলাম। হাত কাঁপছে। মৃন্ময়ের নাম্বারে ডায়াল করলাম। ও নিশ্চয়ই এতক্ষণে পড়ার টেবিলে, অথবা গেম খেলছে। একবার রিং হতেই ও ধরল। "হ্যালো ভাইয়া? তোমরা কোথায়? আম্মা ফোন দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করছিল তোমরা ফিরেছ কি না।" আমি ফিসফিস করে বললাম, "শোন, কথা কম বল। মন দিয়ে শোন। আমরা আসছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব। বাবা কোথায়?"
"বাবা ড্রয়িংরুমে। টিভি দেখছে।"
"সর্বনাশ। শোন, তুই এক্ষুনি একটা কাজ করবি। বাবাকে তোর রুমে ডেকে নিয়ে যা। বলবি তোর ম্যাথ প্রবলেম সলভ করে দিতে, বা কম্পিউটার কাজ করছে না—যেকোনো একটা বাহানা। বাবাকে যেন ড্রয়িংরুমে না দেখি। আর মেইন দরজাটা হালকা চাপিয়ে রাখবি, লক করবি না। আমি বেল বাজাব না।"
মৃন্ময় চালাক ছেলে। ও গলার স্বর শুনেই বুঝেছে পরিস্থিতি জটিল। "ভাইয়া, কিছু হয়েছে? আন্টির কিছু হয়েছে?"
"পরে বলব। যা বললাম কর। বাবা যেন কোনোভাবেই মেইন ডোরের দিকে না আসে। জলদি যা।"
ফোন কেটে দিলাম। গাড়ি সাতাশ নম্বর পার হয়ে ধানমন্ডির দিকে ঢুকছে। আমার বুকের ওপর আন্টির মাথাটা এখন ভারী পাথরের মতো। তিনি আর কথা বলছেন না। বিড়বিড়ানি থামিয়ে এখন শুধু ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছেন। সম্ভবত অ্যালকোহল তার শরীরে পুরোপুরি জাঁকিয়ে বসেছে। তিনি সেমি-কনশাস স্টেজে চলে গেছেন। এটা ভালো, আবার খারাপও। ভালো কারণ তিনি আর অশ্লীল কথা বলছেন না। খারাপ কারণ তাকে এখন পাঁজাকোলা করে নামাতে হবে।
ধানমন্ডি ৯/এ-তে ঢোকার সময় আমি ফজর আলীকে বললাম, "ভাই, গেটের একদম ভেতরে ঢোকাবেন। লিফটের সামনে।" ফজর আলী মাথা নাড়ল। দারোয়ান মোতালেব গেট খুলে দিল। গাড়িটা পার্কিং লটে, লিফটের ঠিক সামনে এসে থামল। আমি দ্রুত ভাড়া মিটিয়ে দিলাম। ফজর আলী আড়চোখে পেছনের সিটের দিকে তাকিয়ে বলল, "ম্যাডামের শরীর কি খুব খারাপ স্যার? ধরমু?" আমি কঠিন গলায় বললাম, "না, আমি পারব। আপনি যান।" সে আর কথা বাড়াল না।
এখন আসল চ্যালেঞ্জ। আমি আন্টিকে ডাকলাম। "আন্টি! আন্টি! উঠুন। আমরা এসেছি।" তিনি চোখ মেললেন না। গোঙানির মতো শব্দ করলেন। আমি গাড়ি থেকে নামলাম। তারপর এপাশ দিয়ে ঘুরে এসে তার দিকের দরজা খুললাম। "নামুন আন্টি। প্লিজ, একটু শক্ত হোন।" আমি তার হাত ধরে টান দিলাম। তিনি বস্তার মতো আমার গায়ের ওপর এসে পড়লেন। তার পায়ে হিল জুতো। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছেন না। আমি তার এক হাত আমার কাঁধের ওপর দিয়ে নিলাম, অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরলাম। তার শরীরের সবটুকু ভার আমার ওপর।
ভাগ্য ভালো, লিফটটা নিচতলায় ছিল। এবং লবিতে কেউ নেই। মোতালেব চাচা গেটের বাইরে টুল নিয়ে বসে আছে। সে দেখেনি। আমি কোনোরকমে আন্টিকে টেনে লিফটের ভেতরে ঢোকালাম। গ্রাউন্ড ফ্লোরের বোতাম টিপে দিলাম। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই আমি আয়নায় আমাদের দুজনকে দেখলাম।
দৃশ্যটা বীভৎস এবং করুণ। আমার চুল এলোমেলো, শার্টের একপাশ কুঁচকে আছে। আর আমার কাঁধে ঝুলে আছেন তনিমা আন্টি। তার চোখ বন্ধ, মুখটা হা হয়ে আছে, লিপস্টিক ছড়িয়ে গেছে ঠোঁটের চারপাশে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সদ্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা কোনো সৈনিক।
লিফট ওপরে উঠছে। হঠাৎ আন্টি নড়ে উঠলেন। তিনি চোখ মেললেন। ঘোলাটে, রক্তজবা চোখ। তিনি আমার দিকে তাকালেন। খুব কাছে। এত কাছে যে আমি তার চোখের মনির ভেতরের কালো গহ্বরটা দেখতে পাচ্ছি। তিনি হঠাৎ হেসে উঠলেন। মাতাল হাসি। "তুমি... তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ? কেন? আমি কি রাক্ষসী?" আমি বললাম, "না আন্টি। চুপ করুন। আমরা এসে গেছি।" তিনি আমার কথা শুনলেন না। তিনি তার দুই হাত দিয়ে আমার গলা জড়িয়ে ধরলেন। লিফটের ওইটুকু জায়গায় আমি নড়তে পারছি না। তিনি আমাকে কাছে টানলেন। "কিস মি... জাস্ট ওয়ানস... একটা চুমু দাও। কেউ জানবে না। কেউ না..."
তিনি তার মুখটা আমার মুখের দিকে এগিয়ে আনলেন। আমি প্রাণপণ শক্তিতে মাথাটা পেছনে সরালাম। তার ঠোঁট আমার গালে ঘষা খেল। আমার মনে হলো কোনো গরম লোহা আমার গাল স্পর্শ করেছে। আমি ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে চাইলাম, কিন্তু লিফটের ওয়ালে পিঠ ঠেকে আছে। "আন্টি! কী করছেন! " তিনি আমাকে ছাড়লেন না। বরং আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন। "ডোন্ট রিজেক্ট মি... আমি মরে যাচ্ছি... একটু আদর..."
ঠিক সেই মুহূর্তে লিফটের দরজা খোলার শব্দ হলো। 'টুং'। চারতলা। আমি এক ঝটকায় তাকে সরিয়ে দিলাম। তিনি টাল সামলাতে না পেরে লিফটের দেয়ালে বাড়ি খেলেন। আমি দ্রুত তাকে আবার ধরলাম, যাতে পড়ে না যান। আমার কপাল ঘামছে, হাত কাঁপছে। যদি দরজা খোলার পর দেখি বাবা দাঁড়িয়ে আছেন?
না, কেউ নেই। করিডোর ফাঁকা। আমাদের ফ্ল্যাটের দরজাটা সামান্য ফাঁক করা। মৃন্ময় কাজ করেছে। আমি দ্রুত আন্টিকে পাঁজাকোলা করে ধরলাম। এখন আর তাকে হাঁটিয়ে নেওয়া সম্ভব না। তিনি হাঁটার শক্তি হারিয়েছেন। আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম। ছিমছাম শরীর হওয়ায় বেঁচে গেছি, অ্যার সঙ্গে বিপদের সময় মানুষের গায়ে অসুরের শক্তি চলে আসে।
আমি নিঃশব্দে ফ্ল্যাটে ঢুকলাম। ড্রয়িংরুম অন্ধকার। শুধু করিডোরের আলো জ্বলছে। বাবার রুম থেকে উচ্চস্বরে টিভি বা কথার আওয়াজ আসছে না। মৃন্ময় হয়তো বাবাকে কোনো জটিল অংকের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। আমি শ্বাস বন্ধ করে করিডোর পার হলাম। গেস্ট রুমটা করিডোরের শেষ মাথায়। আন্টি আমার কোলে বিড়বিড় করছেন, "হোয়্যার এম আই? স্বর্গ? এটা কি স্বর্গ?" আমি মনে মনে বললাম, "না আন্টি, এটা ধানমন্ডি। আর আমরা নরক পার হয়ে এসেছি।"
গেস্ট রুমে ঢুকে আমি তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। তিনি বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই হাত-পা ছড়িয়ে দিলেন। আমি দ্রুত তার পায়ের জুতো দুটো খুলে দিলাম। সালোয়ারের ওড়নাটা, যেটা গলার কাছে প্যাঁচানো ছিল, সেটা আলগা করে একপাশে রাখলাম যাতে ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট না হয়। এসিটা অন করে দিলাম। টেম্পারেচার চব্বিশ।
তিনি পাশ ফিরে শুতে শুতে শেষবারের মতো অস্পষ্ট গলায় বললেন, "তন্ময়... ডোন্ট লিভ মি..." আমি দাঁড়ালাম না। লাইট নিভিয়ে দিলাম। শুধু বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে রাখলাম। ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা আলতো করে টেনে দিলাম।
করিডোরে দাঁড়িয়ে আমি হাঁপাচ্ছি। বুকটা এখনো ধড়ফড় করছে। আমি নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালাম। মৃন্ময় তার রুমের দরজা সামান্য ফাঁক করে উঁকি দিল। আমাকে দেখে থাম্বস আপ দেখাল। অর্থাৎ—'মিশন সাকসেসফুল'। আমি কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালাম না।
নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলাম। তারপর সোজা ফ্লোরে বসে পড়লাম। কার্পেটের ওপর। আমার খুব তৃষ্ণা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। কিন্তু রান্নাঘরে গিয়ে পানি খাওয়ার শক্তি আমার নেই। আজ রাতে আমি যা দেখলাম, যা অনুভব করলাম—তা আমি ভুলব কীভাবে? তনিমা আন্টি—যাকে আমি তিন দিন আগেও একজন দাপুটে, স্মার্ট, এবং জীবনমুখী নারী হিসেবে জানতাম, তার ভেতরের এই অন্ধকার রূপটা আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছে। তার ওই আকুতি, "লাভ মি ডার্লিং"—এটা কোনো কামনার ডাক ছিল না। এটা ছিল এক গভীর, অতলান্তিক একাকীত্বের আর্তনাদ। একজন মানুষ কতটা নিঃসঙ্গ হলে নিজের বয়সের অর্ধেক বয়সী একটা ছেলের কাছে শরীর ঘঁষে উষ্ণতা খুঁজতে পারে?
আমার শরীরের ঘিনঘিনে অনুভূতিটা এখনো যাচ্ছে না। লিফটে তার সেই স্পর্শ, সেই মাতাল নিঃশ্বাস—সব আমার চামড়ার নিচে গেঁথে গেছে। আমি বাথরুমে ঢুকলাম। শাওয়ার ছেড়ে দিলাম। ঠান্ডা পানি। আমি জামাকাপড় পরেই শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে রইলাম। পানি আমার শরীর ধুয়ে দিচ্ছে, কিন্তু মনের ময়লা কি ধুতে পারবে?
পুরুষ হিসেবে আমার যে সামান্য উত্তেজনা হয়েছিল, সেটার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। ফ্রয়েড হয়তো বলবেন এটা অবচেতন মনের খেলা, ইড আর সুপার-ইগোর দ্বন্দ্ব। কিন্তু আমি কোনো থিওরি শুনতে চাই না। আমি শুধু জানি, আমি আজ রাতে এমন একটা সীমানা পার করেছি, যেখান থেকে আর সহজে ফেরা যাবে না। আমাদের এই অসম সম্পর্কটা আর কখনো আগের মতো সহজ হবে না। কাল সকালে যখন আন্টির জ্ঞান ফিরবে, তিনি হয়তো সব ভুলে যাবেন। ব্ল্যাকআউট হয়ে যাবে। তিনি আবার সেই স্মার্ট, হাসিখুশি তনিমা আন্টি হয়ে ডাইনিং টেবিলে বসবেন। কিন্তু আমি? আমি কীভাবে তার চোখের দিকে তাকাব? আমি তো জানি, ওই হাসির আড়ালে কোন কাঙাল সত্তা লুকিয়ে আছে।
রাত গভীর হচ্ছে। বাইরে কোথাও একটা কুকুর ডাকছে। আমার মনে হলো, আমরা সবাই আসলে ভিখারি। কেউ টাকার জন্য হাত পাতে, কেউ একটু ভালোবাসার জন্য, আর কেউ বা বিস্মৃতির জন্য। তনিমা আন্টি আজ মদ দিয়ে তার স্মৃতি মুছতে চেয়েছিলেন। আর আমি এখন পানির নিচে দাঁড়িয়ে আজকের রাতটা মুছতে চাইছি। ফোনটা বেজে উঠল। বের করে দেখলাম, মা ফোন করেছেন।
"হ্যালো মা?"
"তন্ময়, কিরে তোরা ঘুমিয়ে পড়েছিস? আমি নিচে। লিফটে উঠছি। তনিমা খেয়েছে?"
আমি গলা ঝেড়ে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। "হ্যাঁ মা। আন্টি খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। জার্নি আর দৌড়াদৌড়িতে খুব ক্লান্ত ছিলেন তো।"
"আচ্ছা। ঠিক আছে। দরজা খোল। আমার চাবিটা ব্যাগের তলায়, খুঁজে পাচ্ছি না।"
আমি ভেজা কাপড়ে বাথরুম থেকে বের হলাম। একটা তোয়ালে দিয়ে গা মুছলাম, টি-শার্টটা বদলালাম। মুখে একটা হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলাম। এখন আমাকে অভিনয় করতে হবে। পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অভিনয়—স্বাভাবিক থাকার অভিনয়।


![[+]](https://xossipy.com/themes/sharepoint/collapse_collapsed.png)